—বাঁধানো দাঁত খসে গেছে, দুপাটি নতুন দাঁত বেরিয়েছে, গায়েও জোর পেয়েছি। আলো জ্বেলে আরশিতে না দেখলে ঠিক বুঝতে পারা যাবে না।
—চল, যাওয়া যাক, কলকাতার বাস এখনও পাওয়া যাবে। বউবাজার তরুণধাম হোটেলে ঘর খালি আছে, আমি খবর নিয়েছি। এখন সেখানেই উঠব। তারপর সুবিধে মতন একটা বাড়ি নেওয়া যাবে।
হোটেলে এসে আরশিতে মুখ দেখে উদ্ধব বললেন, এঃ, বয়স কমেছে বটে, কিন্তু চেহারাটা গুণ্ডা গুণ্ডা দেখাচ্ছে। তোমার তো দিব্বি রূপ হয়েছে জগু, একেবারে কার্তিক। দেখো ভাই, আমার শিকার তুমি যেন কেড়ে নিও না।
জগবন্ধু বললেন, আমি শিকার করতে চাই না।
—বেশ বেশ, তুমি শুকদেব গোঁসাই হয়ে তপস্যা ক’রো। এখন আমার মতলবটা শোন। প্রেমের মৃগয়া তো করবই, কিন্তু তাতে দিন কাটবে না। রসা রোডে একটা নতুন রঙের দোকান খুলব, পাল অ্যাণ্ড গাঙ্গুলী। তুমি বিনা মূলধনে অংশীদার হবে, লাভের বখরা পাবে। ব্যাঙ্কে দশ লাখ টাকা নতুন অ্যাকাউণ্টে জমা আছে। দেখবে ছ মাসের মধ্যে নতুন কারবারটি ফাঁপিয়ে তুলব। মনে থাকে যেন—তুমি হচ্ছ জলধর গাঙ্গুলী, আমি উমেশ পাল। রাত অনেক হয়েছে, এখন খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়া যাক।
পরদিন সকালে চা খেতে খেতে জগবন্ধু বললেন, এখন কি করতে চাও বল।
উদ্ধব বললেন, সমস্ত রাত ভেবেছি, ঘুমুতে পারি নি। শুনেছি বালিগঞ্জ আর নতুন দিল্লীই হচ্ছে প্রেমের জায়গা। দিল্লি তো বহুদূর, আমি বলি কি বালিগঞ্জেই আস্তানা করা যাক।
—ওখানে তুমি সুবিধে করতে পারবে না। তোমার বয়স কমেছে বটে, পুরো তরুণ না হলেও হাফ তরুণ হয়েছ, কিন্তু তোমার চাল—চলন সাবেক কালের, ফ্যাশন জান না, লেখাপড়াও তেমন শেখনি। কিছু মনো ক’রো না ভাই, তোমার পালিশের অভাব আছে। ওদিককার মেয়েরা ইংরিজী ফ্রেঞ্চ বলে, বিলিতী কবিতা আওড়ায়। আবার শুনেছি পেণ্টুলুন পরে, ভুরু কামায়, রং মাখে, বল নাচে, সিগারেট খায়, মোটর হাঁকায়। আই সি এস, আই এ এস, বিলাত—ফেরত ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার বা বড় চাকরে ছাড়া আর কারও দিকে ফিরেও তাকায় না।
—তাদের চাইতে আমার টাকা ঢের বেশী, রোজগারও বেশী করতে পারব। ভাল বাড়ি, আসবাব, মোটর, কিছুরই অভাব হবে না।
—তা মানলুম। কিন্তু তুমি টেবিলে বসে ছুরি—কাঁটা—চামচ চালাতে পারবে? হাপুস—হাপুস শব্দ না করে তো খেতেই পার না। শুনেছি কড়াইশুঁটির দানা আর বড়ি ভাজা ছুরি দিয়ে তুলে মুখে তোলাই আধুনিক দস্তুর। তা তুমি পারবে?
—চিমটে দিয়ে তুলে খেলে চলবে না?
—না। তা ছাড়া তুমি টেবিল ক্লথে ঝোল ফেলে নোংরা করবে, তা দেখলেই তোমার মার্গিতব্যা মারমুখো হবেন।
—বেশ, তুমিই বল কোথায় সুবিধে হবে।
—খবরের কাগজে গাদা গাদা পাত্র—পাত্রীর বিজ্ঞাপন বার হয়। তা থেকেই বেছে নিতে হবে। এই তো আজকের কাগজ রয়েছে, পড় না।
উদ্ধব পড়তে লাগলেন। বুলবুলি, লক্ষ্মী বোন আমার, ফিরে এস, বাবা মা শোকে শয্যাশায়ী। খঞ্জনকুমারের নাচের পার্টিতেই তুমি যোগ দিও। আরে গেল যা! বাবা নেংটু, বাড়ি ফিরে এস, ম্যাট্রিক দিতে হবে না, সিনেমাতেই তোমাকে ভর্তি করা হবে। আরে খেলে যা!
জগবন্ধু বললেন, ওসব কি পড়ছ, পাত্র—পাত্রীর কলম পড়।
—এম এ পাশ, স্বাস্থ্যবতী বাইশ বৎসরের গুহ পাত্রীর জন্য উচ্চপদস্থ পাত্র চাই। বরপণ যোগ্যতা অনুসারে। সুন্দরী নৃত্যগীতনিপুণা বিশ বৎসরের আই এ, নৈকষ্য কুলীন মুখোপাধ্যায় পাত্রীর জন্য আই সি এস পাত্র চাই।…দেখ জগু, এসব চলবে না, সেই মামুলী বর—কনের সম্বন্ধ করে বিয়ে, শুধু বয়সটাই বেড়ে গেছে আর সঙ্গে নৃত্য—গীত, এম এ, বি এ যোগ হয়েছে। অন্য উপায় দেখ।
আচ্ছা, এই রকম একটা বিজ্ঞাপন কাগজে ছাপালে কেমন হয়। পঁয়ত্রিশ বৎসর বয়স্ক উদারপ্রকৃতি সদবংশীয় বাঙালী বহু—লক্ষপতি ব্যবসায়ী, কোনও আত্মীয় নাই, বিবাহের উদ্দেশ্যে সুন্দরী মহিলার সহিত আলাপ করিতে চান। অসবর্ণে আপত্তি নাই। উভয় পক্ষের মনের মিল হইলে শীঘ্রই বিবাহ। বক্স নম্বর অমুক।
—খাসা হয়েছে, ছাপাবার জন্য আজই পাঠিয়ে দাও।
বিজ্ঞাপন বার হবার তিন—চার দিন পর থেকেই রাশি রাশি উত্তর আসতে লাগল। একটি চিঠি এই রকম। —৫নং ঘুঘুবাগান রোড, কলিকাতা। টেলিফোন নর্থ ২৩৪। মহাশয়, আপনার বিজ্ঞাপন দৃষ্টে জানাইতেছি যে কাতলামারি এস্টেটের একমাত্র স্বত্বাধিকারিণী রাজকুমারী শ্রীযুক্তেশ্বরী স্পন্দচ্ছন্দা চৌধুরানী আপনার সহিত আলাপ করিতে ইচ্ছুক। ইনি পরমাসুন্দরী এবং অশেষ গুণবতী। ইণ্টারভিউএর সময় সন্ধ্যা সাতটা হইতে আটটা। ইতি। শ্রীরামশশী সরকার, সদর নায়েব।
উদ্ধব বললেন, ভালই মনে হচ্ছে, তবে পাত্রীর নামটা বিদকুটে। আর এস্টেটটি নিশ্চয় ফোঁপরা তাই রাজকুমারী ধনী বর খুঁজছেন। তা হোক। হোটেলে তো টেলিফোন আছে, এখনই জানিয়ে দেওয়া যাক আজ সন্ধ্যায় আমরা দেখা করতে যাব।
জগবন্ধু বললেন, তোমার দেখছি তর সয় না। একটা চিঠি লিখে দাও না যে পরশু যাবে। তাড়াতাড়ি করলে ভাববে তোমার গরজ খুব বেশী।
–তুমি বোঝ না, কোনও কাজে গড়িমসি ভাল নয়।
উদ্ধব টেলিফোন ধরে ডাকলেন, নর্থ টু থ্রি ফোর।…ইয়েস। একটু পরে মেয়েলী গলায় সাড়া এল, কাকে চান?
—শ্রীযুক্তেশ্বরী আছেন কি? আমি হচ্ছি উমেশ পাল, আলাপের জন্য আমিই বিজ্ঞাপন দিয়েছিলুম।
