জগবন্ধু বললেন, আচ্ছা, জোয়ান না হয় হওয়া গেল, কিন্তু বাড়ির লোককে কি বলবে?
–বাড়িতে যাব কেন। খোঁজ না পেলে সবাই মনে করবে যে মরে গেছি। আমরা অন্য নাম নিয়ে অন্য জায়গায় থাকব। তুমি জগবন্ধুর বদলে জলধর হবে, আমি উদ্ধবের বদলে উমেশ হব। কেউ চিনতে পারবে না, নিশ্চিন্ত হয়ে ফুর্তি করা যাবে।
একাদশীর দিন তাঁরা ধুতরো ফল পেড়ে ভিতর থেকে ছোলা বার করে নিলেন। ছোলা ফুলে কুল আঁটির মতন বড় হয়েছে। তার পর কদিন তাঁরা গোপনে নানা রকম ব্যবস্থা করে ফেললেন, যাতে ভবিষ্যতের নিজেদের আর পরিবারবর্গের কোনও অভাব না হয়। উদ্ধব উমেশ পালের নামে ব্যাঙ্কে একটা নতুন অ্যাকাউণ্ট খুলতে যাচ্ছিলেন। জগবন্ধু বললেন, যদি পরে ফিরে আসতে হয় তবে টাকাটা বার করতে পারবে না; উদ্ধব আর উমেশ পালের নামে জয়েণ্ট অ্যাকাউণ্ট কর। উদ্ধব তাই করলেন।
চতুর্দশীর দিন জগবন্ধু বললেন, দেখ, বয়স কমাতে হয় তুমি কমাও। আমার কোনও দরকার নেই।
উদ্ধব বললেন তা কি হয়, এক যাত্রায় পৃথক ফল হতে পারে না। তুমি সঙ্গে না থাকলে আমি কিছুই করতে পারব না।
–বেশ, আমি কিন্তু দিন কতক পরেই ফিরে আসব।
–ফিরবে কেন, তোমারই তো সুবিধে বেশী। পরিবার বহুদিন গত হয়েছেন, নির্ঝঞ্ঝাটে আর একটি ঘরে আনবে।
–কটা ছোলা খেতে চাও হে?
–আমি বেশ করে ভেবে দেখলুম চারটে খাওয়াই ভাল। এখন আমাদের দুজনেরই বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। চল্লিশ বাদ গিয়ে হবে পঁচিশ, একেবারে তাজা তরুণ।
–কিন্তু বুদ্ধিও তো খাজা তরুণের মতন হবে। এতদিন ব্যবসা করে যে বুদ্ধিটি পাকিয়েছ তা একটা খেয়ালের বশে কাঁচিয়ে দিতে চাও? আমি বলি কি, দুটো ছোলা খাও, তাতে বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর হবে। প্রায় জোয়ানেরই মতন, অথচ বুদ্ধি বেশী কেঁচে যাবে না।
উদ্ধব নাক সিটকে বললেন, রাম বল। পঁয়তাল্লিশে কারবার ফালাও করা যেতে পারে, দেদার খদ্দেরও যোগাড় করা যেতে পারে, কিন্তু মনের মানুষ—ওই যাকে বলেছ মার্গিতব্যা —পাকড়াও করা যাবে না। আধবুড়োর কাছে কোনও মেয়ে ঘেঁষবে না। আচ্ছা, মাঝামাঝি করা যাক, তিনটে করে ছোলা খাওয়া যাবে, পঁয়ত্রিশ বছর বয়স হলে মন্দ হবে না। আজকাল তো ধেড়ে আইবুড়ো মেয়ের অভাব নেই।
একটু ভেবে জগবন্ধু বললেন, আচ্ছা উদ্ধব, তুমি তো নব—কলেবর ধারণ করে উধাও হবার জন্য ব্যস্ত হয়েছ। তোমার তিরোধান হলে পরিবারের কি দশা হবে ভেবে দেখেছ? তোমার দুঃখ হবে না?
–নাঃ। সম্পত্তি যখন রেখে যাচ্ছি তখন দুঃখ কিসের। তবে দিন কতক কান্নাকাটি করবে, তা না হলে যে ভাল দেখাবে না। গহনা খুলতে হবে, মাছ পেঁয়াজ পুঁই শাক মসুর ডাল ছাড়তে হবে, তার জন্যও কিছু দিন একটু কষ্ট হবে। তারপর তোফা আলোচালের ভাত ঘি মটর ডাল পটোল ভাজা ঘন দুধ আম কলা সন্দেশ খেয়ে খেয়ে ইয়া লাশ হবে আর হরদম পান দোক্তা চিবুবে। ঝাঁটা গোঁফের খোঁচা আর তামাকের গন্ধ সইতে হবে না, বেআক্কেলে মিনসের তোয়াক্কা রাখতে হবে না, মনের সুখে বউদের ওপর তম্বি করবে আর গুরু—মহারাজের সঙ্গে কাশী হরিদ্বার হিল্লি দিল্লী মক্কা ঘুরে বেড়াবে। ছেলে দুটো তো লাট হয়ে যাবে। বাপ—পিতামহর বসত বাড়ি বেচে ফেলে ফরক হবে, মেট্রো প্যাটার্নের ইমারত তুলবে, দামী দামী মোটর কিনবে। কারবারটা মাটি না করে এই যা চিন্তা। মরুক গে, আমি আর ওসব ভাবব না। আর তোমার তো কোনও ভাবনাই নেই। ছেলেটি অতি ভাল, তুমি সরে গেলে নিশ্চয় ঘটা করে শ্রাদ্ধ করবে।
—আমি কিন্তু তোমার একটা হিল্লে লেগে গেলেই ফিরে আসব। অবশ্য তোমার সঙ্গে রোজই দেখা করব।
—আগে কাঁচা বয়সের সোয়াদটা চেখে দেখ, তার পর যা ভাল বোধ হয় ক’রো।
উনিশে বৈশাখ বুধবার অমাবস্যা। সন্ধ্যার সময় দুই বন্ধু দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে উপস্থিত হলেন। দুজনেই একটি করে ক্যাম্বিসের হালকা ব্যাগ নিয়েছেন, তাতে কিছু জামা কাপড় এবং অন্যান্য নিতান্ত দরকারী জিনিস আছে, আর যা দরকার পরে কিনে নেবেন। জগবন্ধু বললেন, উদ্ধব ভাই, আমার কথা শোন, আলেয়ার পিছনে ছুটো না, ঘরে ফিরে চল। বেশ আছ, সুখে থাকতে কেন ভূতের কিল খাবে।
উদ্ধব বললেন, সাহস না করলে কোনও কাজেই সিদ্ধি হয় না, ব্যবসায় নয়, তুমি যাকে প্রেমের মৃগয়া বল তাতেও নয়। আর দেরি করবার দরকার কি, ঘাট থেকে লোকজন সব চলে গেছে, প্রক্রিয়াটি সেরে ফেলা যাক। বেশী রাত পর্যন্ত এখানে থাকলে মন্দিরের লোকে নানারকম প্রশ্ন করবে।
উদ্ধব একটি গামছা পরে ঘাটের চাতালে জামা কাপড় জুতো রাখলেন। জগবন্ধুও দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে জলে নামবার জন্য প্রস্তুত হলেন। বন্ধুর মুখে আর নিজের মুখে তিনটি করে ছোলা পুরে দিয়ে উদ্ধব বললেন, নাও, বেশ করে চিবিয়ে গিলে ফেল। এইবার মনে মনে সংকল্প কর।…হয়েছে তো?
তারপর জগবন্ধুর হাত ধরে জলে নেমে উদ্ধব বললেন, এস, দুজনে এক সঙ্গে মন্ত্রটি বলে ডুব দেওয়া যাক।—বম মহাদেব ধুস্তুরস্বামী, দস্তুর মত প্রস্তুত আমি।
জল থেকে উঠে গা মুছতে মুছতে জগবন্ধু প্রশ্ন করলেন কি রকম বোধ হচ্ছে? যে অন্ধকার, তোমার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। একটা টর্চ আনলে হত।
উদ্ধব কাপড় পরতে পরতে বললেন, বম ভোলানাথ, কেয়া বাত কেয়া বাত! মাথায় আবার চুল গজিয়েছে হে। শরীরটা খুব হালকা হয়ে গেছে, লাফাতে ইচ্ছে করছে। দাঁতের বেদনাও নেই। ধন্য ব্যাঙ্গমা—ব্যাঙ্গমী! যদি ধরা দিতে তবে সোনার খাঁচায় রেখে বাদাম পেস্তা আঙুর বেদানা খাওয়াতুম। তোমার কি রকম হল হে?
