–আমার বয়স যখন বারো তখনই বাবা সাত বছরের পুত্রবধূ ঘরে আনলেন। খিদে না হতেই যদি খাবার জোটে তবে ভোজনের সুখ হবে কেমন করে? তা ছাড়া গিন্নীর মেজাজটি চিরকালই রুক্ষু, প্রেম করবার মানুষ তিনি নন। আর চেহারাটি তো তোমার দেখাই আছে। তবে হক কথা বলব, মাগী রাঁধে যেন অমৃত!
–কি রকম হলে তুমি খুশী হতে বল তো?
–যা হবার নয় তা বলে আর লাভ কি। তবু মনের কথা বলছি শোন। হুইল দেওয়া ছিপে যেমন করে রুই কাতলা ধরা হয় সেই রকম আর কি। ফাতনা নড়ে উঠল, টোপ গিলেই চোঁ করে সরে গেল, তার পর টান মেরে কাছে আনলুম আবার সুতো ছাড়লুম, এই রকম খেলিয়ে খেলিয়ে বউ ঘরে তুলতে পারলেই জীবনটা সার্থক হত।
—ও, তুমি নটবর নাগর হয়ে প্রেমের মৃগয়া করতে চাও! এ বয়সে ওসব চিন্তা ভাল নয় ভাই। পত্নী যে ভাবেই ঘরে আসুন—কচি বেলায় বা ধেড়ে বয়সে, প্রেমের আগে বা পরে—তিনি চিরকালই মার্গিতব্যা, অর্থাৎ খোঁজবার আর চাইবার জিনিস।
—কি বললে, মার্গিতব্যা? তা থেকেই বুঝি মাগী হয়েছে?
—তা জানি না, সুনীতি চাটুজ্যে মশাই বলতে পারেন।
উদ্ধব পাল একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ভড়াক করে তামাক টানতে লাগলেন।
যে শিমুল গাছের তলায় এঁরা বসেছিলেন তার উপরে একটি পাখি হঠাৎ ডেকে উঠল—ওঠ ওঠ ওঠ ওঠ। আর একটা পাখি সাড়া দিলে—উঠি উঠি উঠি উঠি।
উদ্ধব বললেন, কি পাখি হে? বেশ মজার ডাক তো।
প্রথম পাখিটা মোটা সুরে আবার ডাকল–ব্যাং ব্যাং গমী গমী গমী। অন্য পাখিটা মিহি সুরে উত্তর দিলে—ব্যাং ব্যাং গমা গমা গমা।
জগবন্ধু রোমাঞ্চিত হয়ে চুপি চুপি বললেন, কি আশ্চর্য ব্যাপার!
উদ্ধব বললেন ব্যাঙ্গমা—ব্যাঙ্গমী নয় তো?
—চুপ চুপ। শুনে যাও কি বলছে।
ব্যাঙ্কমা—ব্যাঙ্গমীর আলাপ শুরু হল। কলকাতার টেলিফোনের মতন অস্পষ্ট আওয়াজ, কিন্তু বোঝা যায়।
—নীচে কারা রয়েছে রে ব্যাঙ্গমী?
—দুটো বুড়ো।
—কি করছে ওরা?
—তামাক খাচ্ছে আর বক বক করছে।
—ও, তাই নাকে দুর্গন্ধ লাগছে আর কাশি আসছে। কি বলছে ওরা?
—একটা বুড়ো বলছে তার জীবনই বৃথা, প্রেম করবার সুবিধে পায় নি। আর একটা বুড়ো তাকে বোঝাচ্ছে।
—বুড়ো বয়সে ধেড়ে রোগ ধরেছে। এই বলে ব্যাঙ্গমা তার সাংয়কালীন কোষ্ঠশুদ্ধি করলে। উদ্ধব আর জগবন্ধু রুমাল দিয়ে মাথা মুছে একটু সরে বসলেন।
ব্যাঙ্গমী বললে, তোমার তো নানারকম বিদ্যে আছে, একটা উপায় বাতলে দাও না। আহা বুড়ো বেচারার মনে বড় দুঃখ, যাতে তার শখ মেটে তার ব্যবস্থা কর।
ব্যাঙ্গমা বললে, জোয়ান হবার শখ থাকে তো তার প্রক্রিয়া বাতলাতে পারি, কিন্তু ওদের সাহস হবে কি? বোধ হয়ে পেরে উঠবে না।
—পারুক না পারুক তুমি বল না।
উদ্ধব ফিসফিস করে বললেন, নোট করে নাও হে, নোট করে নাও। জগবন্ধু তার নোটবুকে লিখতে লাগলেন।
ব্যাঙ্গমা বললে, ধুস্তুরী ছোলা। এক—একটি ছোলা খেলে দশ—দশ বছর বয়স কমে যায়।
–সে আবার কি জিনিস? কোথায় পাওয়া যায়?
–তৈরী করতে হয়। ওই বেড়ার দক্ষিণ দিকে নীল ধুতরোর ঝোপ আছে, তাতে বড় বড় ফল ধরেছে। কৃষ্ণপক্ষ পঞ্চমীর সন্ধ্যায় ধুতরো ফল চিরে তার ভেতরে ছোলা গুঁজে দিতে হবে, একটি ফলে একটি ছোলা। একাদশীর মধ্যে সেই ছোলা রস টেনে নিয়ে ফুলে উঠবে, তখন বার করে নেবে। তার পর অমাবস্যা সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটে ছোলা চিবিয়ে খেয়ে সংকল্প করবে। মনে থাকে যেন, একটি ছোলায় দশ বছর বয়স কমবে, পাঁচটিতে পঞ্চাশ বছর।
–যদি দশ—বিশটা খায়?
–তবে পূর্বজন্মে ফিরে যাবে। তার পর শোন। সংকল্পের পর এই মন্ত্রটি বলে গঙ্গায় একটি ডুব দেবে—
বম মহাদেব ধুস্তুরস্বামী,
দস্তুর মত প্রস্তুত আমি।
ডুব দেবা মাত্র বয়স কমে যাবে।
–আচ্ছা, যদি ফের আগের বয়সে ফিরে আসতে চায়?
–খুব সোজা। পূর্ণিমার সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বেলপাতা চিবিয়ে খাবে, যটা ছোলা খেয়েছিলে তটা বেলপাতা। তার পর এই মন্ত্রটি বলে একটি ডুব দেবে–
বম মহাদেব, সকল বস্তু
আগের মতন আবার অস্তু।
ব্যাঙ্গমা—ব্যাঙ্গমী নীরব হল। আরও কিছু শোনবার আশায় খানিকক্ষণ সবুর করে উদ্ধব বললেন, বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। যা শোনা গেল তাই যথেষ্ট। প্রক্রিয়াটি যা বললে তা মালবীয়জীর কায়কল্পের চাইতে ঢের সোজা, বিপদেরও ভয়ও দেখছি না।
জগবন্ধু বললেন, ধুতরোর রস হচ্ছে বিষ তা জান?
–আরে ছোলার মধ্যে কতই আর রস ঢুকবে। ব্যাঙ্গমার কথা যদি মিথ্যেই হয় তবে বড় জোর একটু নেশা হবে। আমরা তো আর মুঠো খানিক ছোলা খাব না।
–তবে চল, দেখা যাক বেড়ার দক্ষিণে নীল ধুতরোর গাছ আছে কি না।
দুজনে গিয়ে দেখলেন, ধুতরো গাছের জঙ্গল, বড় বড় ফল ধরেছে। জগবন্ধু বললেন, বোধ হয় পরশু কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমী, বাড়ি গিয়ে পাঁজি দেখতে হবে। সেদিন ছোলা আর একটা ছুরি নিয়ে আসা যাবে।
পঞ্চমীর দিন উদ্ধব আর জগবন্ধু ধুতরোর বনে এসে দশ—বারোটা ফল চিরে তার মধ্যে ছোলা পুরে দিলেন। তার পরের কদিন তাঁরা নানারকম ভাবনায় আর উত্তেজনায় কাটালেন। জগবন্ধু অনেক বার বললেন, কাজটা ভাল হবে না। উদ্ধব বললেন, অত ভয় কিসের, এমন সুযোগ ছাড়তে আছে! আমাদের বরাত খুব ভাল তাই ব্যাঙ্গমা—ব্যাঙ্গমীর কথা নিজের কানে শুনেছি! আমার মনে হয় হরপার্বতী দয়া করে পাখির রূপ ধরে আমাদের হদিস বাতলে দিয়েছেন। এই বলে উদ্ধব হাত জোড় করে বার বার কপালে ঠেকাতে লাগলেন।
