ভোলার মা কিন্তু ধনু মামার অন্তিম ইচ্ছা পালন করেন নি, বড় বাণ্ডিলটাও খুলে দেখেছেন। তাতে বিস্তর নোট আছে বটে, কিন্তু তার দাম এক পয়সাও নয়, সমস্ত কাঁচি দিয়ে কুচি কুচি করে কাটা! তাঁর দৈবলব্ধ ধনের অপব্যবহার যাতে না হয় ধনুমামা তার পাকা ব্যবস্থা করে গেছেন। ভোলার মা সেই নোটের কুচি ঝেঁটিয়ে ফেলে দিলেন। হুঁকোটি ভোলার ভোগে লাগেনি, তার মা আছড়ে ভেঙে ফেলে রুপোর পাত খুলে নিলেন। কিন্তু আমাকে বঞ্চিত করেন নি, গণেশ—মার্কা রুপোর আংটিটা আমাকে দিয়েছিলেন। ধনু মামার সেই স্মৃতিচিহ্ন আমি সযত্নে রেখেছি।
১৩৬২ (১৯৫৫)
ধুস্তুরী মায়া
উদ্ধব পাল আর তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু জগবন্ধু গাঙ্গুলীর বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। উদ্ধব বেঁটে মোটা শ্যামবর্ণ মাথায় টাক, কাঁচা—পাকা ছাঁটা গোঁফ। উডমণ্ট স্ট্রীটে এঁর একটি ইমারতী রঙের বড় দোকান আছে, এখন দুই ছেলে সেটি চালায়। জগবন্ধু লম্বা রোগা ফরসা, গোঁফ—দাড়ি নেই। ইনি জামরুলতলা হাই—স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন, এখন অবসর নিয়েছেন। দুই বন্ধু দক্ষিণ কলকাতায় আবুহোসেন রোডে কাছাকাছি বাস করেন। ছেলেরা রোজগার করছে, মেয়েরা সুপাত্রে পড়েছে, সেজন্য সংসারের ভাবনা থেকে এঁরা নিষ্কৃতি পেয়েছেন। দুজনেরই স্বাস্থ্য ভাল, শখও নানারকম আছে, সুতরাং বুড়ো বয়সে এঁদের বেশ আনন্দেই থাকবার কথা।
রোজ বিকেল বেলা এঁরা ঢাকুরের লেকে হেঁটে যান এবং জলের ধারে একটি বড় শিমুল গাছের তলায় বসে সন্ধ্যা সাতটা আটটা পর্যন্ত গল্প করেন, তার পর বাড়ি ফেরেন। দুজনেই সেকেলে লোক, সিগারেট চুরুট পাইপ পছন্দ করে না। প্রত্যেকে ঝুলিতে একটা হুঁকো আর তামাক—টিকে—সাজানো দুটি কলকে নিয়ে যান এবং গল্প করতে করতে মুহুর্মুহু ধূমপান করেন।
বৈশাখ মাস, সন্ধ্যা সাতটাতেও একটু আলো আছে। জগবন্ধু নিজের হুঁকো থেকে কলকেটি তুলে উদ্ধবের হাতে দিয়ে বললেন, আজ তোমার দাঁতের খবর কি?
উদ্ধব উত্তর দিলেন, তোমার সেই মাজনে কোনও উপকার হল না, পড়ে না গেলে কনকনানি যাবে না! তুমি খাসা আছ, দুপাটি বাঁধিয়ে মুড়ি কড়াইভাজা নারকেল গলদা চিংড়ি সবই চিবিয়ে খাচ্ছ। আমার তো পান সুদ্ধু ছাড়তে হয়েছে।
–ছেঁচে খাও না কেন?
–আরে ছ্যা, তাতে সবাই ভাববে একেবারে থুত্থুড়ে বুড়ো হয়ে গেছি। তার চাইতে না খাওয়া ভাল। বুড়ো হওয়ার অশেষ দোষ।
–শুধু দোষ দেখছ কেন, ভালর দিকটাও দেখ। খাটতে হচ্ছে না, ছেলেরা সব করে দিচ্ছে। সবাই খাতির করে, কোথাও গেলে সব চাইতে আরামের চেয়ারটিতে বসতে দেয়, পাড়ায় সভা হলে তোমাকেই সভাপতি করে। গুরুজন নেই, ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করতে হয় না, অন্য লোকেই প্রণাম করে।
–থামলে কেন, বলে যাও না। মেয়েরা সব দাদু জেঠা মেসো বলে, বুড়োদের দিকে আড় চোখে তাকায় না, আমরা যেন ইট পাথর গরু ছাগল।
–তাতে তোমার ক্ষতিটা কি?
–ক্ষতি নয়? আমাদের পুরুষ মানুষ বলেই গণ্য করে না। দেখ জগু, জীবনটা বৃথাই কাটল।
–বৃথা কেন, তোমার কিসের অভাব? উপযুক্ত দুই ছেলে রয়েছে, গিন্নী রয়েছেন, ব্যবসায় দেদার টাকা আসছে, শরীর ভালই আছে। তোমার ও দাঁত নড়া ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। বাত ডায়াবেটিস ব্লাডপ্রেশার কিছুই নেই, এই বয়সেও নিমন্ত্রণে গিয়ে দু দিস্তে লুচি আর দেদার মাছ মাংস দই মিষ্টান্ন খেতে পার। আমি অবশ্য তোমার মতন মজবুত নই, বড়লোকও নই, কিন্তু দুঃখ করবারও কিছু নেই। কজন বুড়ো আমাদের মতন ভাগ্যবান?
উদ্ধব পাল হুঁকোয় একটি দীর্ঘ টান দিয়ে কলকেটি বন্ধুর হাতে দিলেন। তারপর বললেন, দেখ জগু, যখন বয়স ছিল তখন কোন ফুর্তিই করতে পাই নি। কর্তার হুকুমে ইস্কুলের পড়া শেষ না করেই দোকানে ঢুকেছি, ব্যবসা আর রোজগার ছাড়া আর কিছুতে মন দেবার অবকাশ ছিল না।
জগবন্ধু গাঙ্গুলী বললেন, এখন তো দেদার অবকাশ, যত খুশি আনন্দ কর না।
–চেষ্টা করেছি, কিন্তু এই বয়সে তা হবার নয়। ছোঁড়াদের দেখে বাইসিকেল চড়ে সনসনিয়ে ছুটতে আর মোটর চালাতে ইচ্ছে করে, কিন্তু শক্তি নেই। আজকাল অ্যাং ব্যাং চ্যাং সবাই বিলেত ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে আসছে। আমারও ইচ্ছে হয়, কিন্তু ইংরিজী বলতে পারি না, হ্যাট—কোট পায়জামা—আচকান পরতে পারি না, কাঁটা—চামচ দিয়ে খেলে পেট ভরে না, কাজেই যাবার জো নেই। আবার সেকেলে ফুর্তিও সয় না। বছর চারেক আগে কাশীতে এক সাধুবাবার প্রসাদী বড়—তামাকের ছিলিমে একটি টান মেরেছিলুম, তার পর ঘণ্টা দুই ত্রিভুবন অন্ধকার। সেদিন আমার বেয়াই জগন্নাথ দত্তর বাগানে গিয়ে উপরোধে পড়ে চার গেলাস খেয়েছিলুম –রম—পঞ্চ না কি বললে। খেয়ে যাই আর কি, কেবল হেঁচকি আর হেঁচকি, তার পর বমি।
–ফুর্তিরও সাধনা দরকার, জোয়ান বয়স থেকে অভ্যাস করতে হয়। এখন আর ওসব করতে যেয়ো না।
–তার পর এই সেদিন তোমার সঙ্গে স্বপনপুরী সিনেমায় ‘লুটে নিল মন’ দেখেছিলুম। দেখা ইস্তক মনটা খিঁচড়ে আছে। জীবনের যা সব চাইতে বড় সুখ—প্রেম, তাই আমার ভোগ হল না।
–অবাক করলে তুমি। বাড়িতে সতীলক্ষ্মী গৃহিণী আছেন তবু বলছ প্রেম হয় নি? শাস্ত্রে বলে–জীর্ণমন্নং প্রশংসিত ভার্যাঞ্চ গতযৌবনাম। অর্থাৎ ভাত হজম হলে আর স্ত্রী বৃদ্ধা হলেই লোকে প্রশংসা করে। এখন না হয় দুজনে বুড়ো হয়েছ, কিন্তু প্রথম বয়সে প্রেম হয় নি এ কি রকম কথা?
