বৃদ্ধিচাঁদ আপিস—ঘরে তালা লাগিয়ে তার চাবিটা আমাকে দিয়ে বললেন, কাল সকালে বৈজনাথবাবুকে দিয়ে আসবি। বৈজনাথ ছিলেন ফার্মের বড়বাবু, দূর সম্পর্কে মালিকের শালা।
আমার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে আর বৃদ্ধিচাঁদের তোরঙ্গ মাথায় নিয়ে আমি আগে আগে চললাম, বৃদ্ধিচাঁদ আমার পিছনে চললেন। স্টেশন খুব কাছে। সেখানে পৌঁছে টিকিট কেনা মাত্র ট্রেন এসে পড়ল। তোরঙ্গটা আমার হাত থেকে নিয়ে বৃদ্ধিচাঁদ উঠে পড়লেন, আর আমাকে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে বললেন, তোর বকশিস। তখনই ট্রেন ছাড়ল।
আমি তাড়াতাড়ি কাকারবাসায় ফিরে এলাম এবং নোটের বাণ্ডিলটা সুদ্ধ ব্যাগটা বালিশের মতন মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুম মোটেই হল না। বৃদ্ধিচাঁদের হাসিটা ছিল ছোঁয়াচে। সমস্ত রাত জেগে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগলাম। আমার একটা তোবড়া টিনের তোরঙ্গ ছিল, তাতেই সর্বস্ব থাকত। সকালে সেই তোরঙ্গে নোটের বাণ্ডিল রেখে বৈজনাথবাবুর বাড়ি গিয়ে তাকে অপিসের চাবি দিলাম। বৃদ্ধিচাঁদ বহরমপুর গেছেন শুনে তিনি বললেন, বহুত তাজ্জ্বব কি বাত। তখনই তিনি প্রয়াগদাসের কাছে গেলেন।
বেলা দশটা নাগাদ হই হই কাণ্ড। সমস্ত শহরে রটে গেল—বৃদ্ধিচাঁদ বিস্তর টাকা নিয়ে পালিয়েছেন, ফার্মের আপিস পুলিসে ঘেরাও করেছে, প্রয়াগদাসের দু জন উকিলও সেখানে গেছেন। আমি কাকাকে বললাম, আমার মনিব তো ফেরার, এখানে থেকে কি করব, কলকাতায় গিয়ে কাজের চেষ্টা করি গে। কাকার তখন বুদ্ধি লোপ পেয়েছে, কিছুই বললেন না। আমি আমার টিনের তোরঙ্গ নিয়ে কলকাতায় চলে গেলাম। শুনেছিলাম দুদিন পরে পুলিশ আমাকে সাক্ষী তলব করেছিল, কিন্তু আমি তখন নাগালের বাইরে।
এর পরের কথা খুব সংক্ষেপে বলছি। কলকাতায় পৌঁছেই নামটা বদলে ধনঞ্জয় করলাম। যে হোটেলে উঠেছিলাম, দু দিন পরে সেখানেই বাজার সরকারের চাকরি জুটে গেল। তার জন্যে অবশ্য পঞ্চাশ টাকা জমানত দিতে হয়েছিল।
ভোলা বলল, ধনু মামা, আসল কথাই তো আপনি বললেন না। কত টাকা সরিয়েছিলেন?
—এখন পর্যন্ত ঠিক করে গুণতে পারি নি,—খাজাঞ্চীর কাজ তো আমার রপ্ত নেই। একবার গুণে হল দেড় লাখের কাছাকাছি, আর একবার হল চোদ্দ হাজার কম, আর একবার ত্রিশ হাজার বেশী। ভাবলাম, দুত্তোর, ঠিক করে জেনে কি হবে, টাকা তো ব্যাংকে দিচ্ছি না, আমার কাছেই থাকবে। তারপর রোজগারের চেষ্টায় লেগে গেলাম, সে সব বৈষয়িক কথা তোদের ভাল লাগবে না। একটা বিয়েও করেছিলাম, কিন্তু বউটা টিকল না। আমার এই রুপো বাঁধানো কলি হুঁকোটি সেই বিয়েতেই দান পেয়েছিলাম। পঞ্চাশ বছর ধরে অনেক রকম ব্যবসা করেছি, তেজারতিও করেছি। রোজগার মন্দ হয় নি। আমার বাবুগিরি আর বদখেয়াল ছিল না, তাই পুঁজির টাকা খরচ হয় নি, বরং একটু বেড়েই গেছে। শেষ বয়সে আর রোজগারের ইচ্ছে রইল না, শক্তিও গেছে, তাই কলকাতা ছেড়ে এই নিরিবিলিতে বাস করতে এসেছি। এইবার গীতাখানা একবার পড়ে ফেলতে হবে।
ভোলা বলল, বৃদ্ধিচাঁদের কি হল?
—তাঁর নামে হুলিয়া বেরিয়েছিল, শুনেছি তিনি সাধু সেজে হরিদ্বারে ছিলেন, পুলিস সেখানেই তাঁকে ধরে। অনেক দিন মামলা চলল, বৃদ্ধিচাঁদ তার জবান বন্দিতে বলেছিলেন—চুরি তো করেছে সেই শয়তান হাব্বু শালা, আমি শুধু বদনামের ভয়ে ভেগেছিলাম। তাঁর কথা কেউ বিশ্বাস করে নি। বৃদ্ধিচাঁদের নিশ্চয় জেল হত, কিন্তু তাঁর ভাবীজী তাঁকে বাঁচিয়ে দিলেন। স্ত্রীর অনুরোধে প্রয়াগদাস মকদ্দমা মিটিয়ে ফেললেন, শুনেছি বৃদ্ধিচাঁদ আসামে গিয়ে কাঠের কারবার ফে�দেছিলেন।
ভোলা বলল, আচ্ছা ধনু মামা, আপনার অত টাকা কাকে দিয়ে যাবেন?
—তোর মাকে অনেক টাকা দেব, আমার খুব সেবা করছে কিনা। বাকী আমার সঙ্গেই যাবে।
—সেকি! মরে গেলে কেউ টাকা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে নাকি?
—আমি ঠিক পারব, তোরা দেখে নিস।
ধনু মামার কথা শেষ হল। আমি তাঁর কাছে বিদায় নিয়ে বাড়ি চলে গেলাম।
সাত দিন পরে একজন লোক আমাদের ইস্কুলে খবর দিল, ধনু মামা হঠাৎ মারা গেছেন, ভোলাকে তার মা এখনই বাড়ি যেতে বলছেন। ছুটি নিয়ে আমিও ভোলার সঙ্গে গেলাম।
ধনু মামাকে উঠোনে শোয়ানো হয়েছে। তাঁর মুখ একটু ফাঁক হয়ে আছে, যেন হাসতে হাসতেই মারা গেছেন। পাড়ার জন কতক মেয়ে পুরুষ ভোলার মাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছেন। তিনি চিৎকার করে হাত নেড়ে বলছেন, পাজী হতভাগা নিমকহারাম বুড়ো, এত দিন সেবা যত্ন করলাম, আর দিয়ে গেলেন মোটে দু শ! সর্বনেশে কুচুণ্ডে জোচ্চোর ছ্যাঁচড়। আমাকে না হয় ফাঁকি দিলি, দান ধ্যানের জন্যও তো রেখে যেতে পারতিস!
ভোলা খোঁজ নিয়ে আমাকে যা জানাল তা এই। —ধনু মামার তোরঙ্গ থেকে দুটো বাণ্ডিল আর একটা লেখা কাগজ বেরিয়েছে। ছোট বাণ্ডিলটার উপর লেখা আছে— ভোলার জননী কল্যাণীয়া শ্রীমতী নন্দরানীকে আমার উপার্জিত এই দুই শত টাকা নগদ দান করিলাম; ইহাই যথেষ্ট, স্ত্রীলোকের অধিক লোভ ভাল নহে। বড় বাণ্ডিলের উপর লেখা আছে—খুলিবে না, ইহা আমার দৈবলব্ধ নিজস্ব ধন, যেমন আছে তেমনি আমার চিতায় দেবে। কাগজটায় লেখা আছে—আমার যে রুপো বাঁধানো ঢাকাই কলি হুঁকা আছে, তাহা শ্রীমান ভোলানাথ পাইবে; এবং আমার আঙ্গুলে যে রুপোর গণেশ—মার্কা আংটি আছে তাহা ভোলানাথের বন্ধু শ্রীমান রামেশ্বর পাইবে।
