সে সময়ে আমার চেহারাটি এমন মর্কটের মতন ছিল না, বেশ নাদুস নুদুস বেঁটে গড়ন, ফুলো ফুলো গাল, একটু বোকা বোকা ভাব। দেখতে যেন চোদ্দ—পনেরো বছরের ছেলে। লোকে বলত, এই হাবুলটা হচ্ছে হাবা গোবা। আমি মনে মনে হাসতাম আর যতটা পারি বোকা সেজে থাকতাম। তাতে লাভও হত। লোকে আমাকে বিশ্বাস করত, অনেক সময় আমার সামনে গুপ্ত কথা বলে বসত। কাকা আমাকে বৃদ্ধিচাঁদের কাছে নিয়ে গিয়ে হাত জোড় করে বললেন, হুজুর, আপনাদের আশ্রয়ে বুড়ো হয়ে গেছি, আমি আর ক দিন। দয়া করে আমার ভাইপো এই হাবুলচন্দরকে যা হয় একটা কাজ দিন।
বৃদ্ধিচাঁদ আমার মুখের দিকে চেয়ে একটু হাসলেন, তারপর পিঠে একটা কিল মেরে বললেন, আরে হাব্বু, তুই তো বৌরা পাগল আছিস, কোন কাম করবি? আচ্ছা, এখন তোকে পাঁচ টাকা মাহিনা দিব, আমার খাস আরদালী হয়ে ইধর উধর চিঠঠি লিয়ে যাবি। পারবি তো? আমি খুব ঘাড় দুলিয়ে বললাম, জী হুজুর, পারব।
তখনই আরদালীর পদে বাহাল হয়ে গেলাম। বৃদ্ধিচাঁদ শৌখিন লোক, তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে গদিতে বসতেন না, টেবিল চেয়ার আলমারি দিয়ে তাঁর আফিস—ঘর সাজিয়েছিলেন; ঘণ্টা বাজিয়ে আমাকে ডাকতেন। আমার কাজ খুব হালকা, বৃদ্ধিচাঁদের খাস কামরার দরজার পাশে একটা টুলে বসে থাকতাম, তাঁর ছোটখাটো ফরমাশ খাটতাম, মাঝে মাঝে তাঁর চিঠি বিলি করতাম। চিঠি বইবার জন্য তিনি আমাকে একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগ দিয়েছিলেন।
হাবা গোবা মনে করে সবাই আমাকে ঠাট্টা করত, আমি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকতাম আর বোকার মতন হাসতাম। কিন্তু কান সর্বদা খাড়া থাকত, গুজগুজ ফিসফিস করে কে কি বলছে সব মন দিয়ে শুনতাম। ক্রমশ আমার কানে এল—বৃদ্ধিচাঁদ খুব তুখড় কাজের লোক, সকলের সঙ্গে তাঁর ব্যবহারও ভাল। কিন্তু হাতটান আছে, ফার্মের টাকা সরিয়ে থাকেন, জুয়ো খেলেন, নেশা করেন, অন্য দোষও আছে।
রামনবমীর দিন ওঁদের নতুন খাতা হত। তার আগের দিন বড় বড় খদ্দেররা তাদের দেনা চুকিয়ে দিত। আমি বাহাল হবার পাঁচ—ছ মাস পরেই ওঁদের বছর কাবার হল, যাকে বলে সাল তামামি। রাত্রি পর্যন্ত কাজ চলবে তাই আমাদের জলখাবারের জন্যে প্রচুর কচৌড়ি আর লাড্ডু আনা হল। অনেক রাত পর্যন্ত টাকা আসতে লাগল, বৃদ্ধিচাঁদ তার কামরায় বসে নিজেই নোট আর টাকা গনতি করতে লাগলেন, আমি নোটের বাণ্ডিল বাঁধতে লাগলাম। চেক খুব কম, খুচরো টাকাও কম, বেশীর ভাগই পাঁচ শ, এক শ আর দশ টাকার নোট।
রাত এগারোটার সময় কাজ শেষ হল, আমলারা ছুটি পেয়ে চলে গেল। বৃদ্ধিচাঁদ আমাকে বললেন, হিসাব মিলাতে আমার কিছু দেরি হবে, হাব্বু, তুই দরজায় বসে থাক, আমার কামরায় কাকেও ঢুকতে দিবি না। আর শোন—এই প্যাকিটটা তোর কাছে রাখ, কাল মথুরানাথ মিসিরের কিতাবের দোকানে ফেরত দিয়ে বলবি, এসব জাসুসী কহানী (অর্থাৎ ডিটেকটিভ গল্প) বৃদ্ধিচাঁদজী পড়তে চান না, ভক্তমাল গ্রন্থ যদি থাকে তো তাঁকে যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
বই—এর প্যাকেটটা আমার চিঠি বিলির ব্যাগে পুরে আমি কামরার বাইরে পাহারায় বসলাম। বৃদ্ধিচাঁদ দরজা বন্ধ করে হিসাব মিলাতে লাগলেন। দরজার কবজার কাছে একটু ফাঁক ছিল, তাই দিয়ে আমি উঁকি মেরে দেখতে লাগলাম। ঘরে কেরোসিনের একটা বড় ল্যাম্প জ্বলছে, বৃদ্ধিচাঁদ টেবিলের উপর নোটের বাণ্ডিলগুলো নাড়াচাড়া করছেন, মাঝে মাঝে একটা বোতল থেকে মদ ঢেলে খাচ্ছেন। তাঁর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল, একটু পরেই খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দ বার হল, যেন খ্যাঁকশেয়াল ডাকছে। তিনি চেক আর খুচরো টাকা লোহার আলমারিতে বন্ধ করলেন, আর সমস্ত নোটের গোছা এক সঙ্গে খবরের কাগজে জড়িয়ে সরু দড়ি দিয়ে বাঁধলেন। তার পর পাশের ঘর থেকে একটা ছোট স্টীল ট্রাংক এনে মেঝেতে রেখে খুললেন। তাতে কাপড় চোপড় আছে।
ঠিক এই সময় আপিসে ঘরের সামনের রাস্তায় একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে দাঁড়াল। সইস চেঁচিয়ে আমাকে বলল, এ হাব্বু, মাইজী এসেছেন, বৃদ্ধিচাঁদজীকে জলদি আসতে বল।
মাইজী হচ্ছেন কারবারের মালিক, প্রয়াগদাসের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, বৃদ্ধিচাঁদ যাকে ভাবীজী অর্থাৎ বউদিদি বলেন। আমি দরজা একটু ফাঁক করে বললাম, হুজুর, মাইজী এসেছেন, আপনাকে ডাকছেন। বৃদ্ধিচাঁদ বিরক্ত হয়ে বললেন, আঃ, আসবার সময় পেলেন না, এত রাত্রে টাকা চাইতে এসেছেন! কাজের সময় যত সব বখেড়া। আমাকে তো এখনই রওনা হতে হবে, ট্রেনের টাইম হয়ে এল। হাব্বু তুই ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ভিতরে বসে থাক, কেউ যেন না ঢোকে। আমি ভাবীজীকে বিদায় করে এখনই আসছি।
বৃদ্ধিচাঁদ তাঁর তোরঙ্গের কাপড়ের মধ্যে নোটের বাণ্ডিলটা গুঁজে দিলেন। ডালা বন্ধ করতে পারলেন না, একটু উঁচু হয়ে রইল। আমাকে বললেন, হাব্বু তুই তোরঙ্গের উপরে বসে থাক, আমি তুরন্ত আসছি।
বৃদ্ধিচাঁদ বেরিয়ে যেতেই সিদ্ধিদাতা গণেশ আমাকে বুদ্ধি দিলেন। তাড়াতাড়ি তোরঙ্গ থেকে নোটের বাণ্ডিলটা বার করে আমার ব্যাগে পুরলাম আর ব্যাগে যে বই—এর প্যাকেট ছিল তা তোরঙ্গে গুঁজে দিলাম। নোটের বাণ্ডিল আর বই—এর প্যাকেট আকারে প্রায় সমান ছিল।
একটু পরে বৃদ্ধিচাঁদ ফিরে এলেন। দেখলেন, আমি তোরঙ্গের উপর গট হয়ে বসে আছি, আমার চাপে ডালাটি ঠিক হয়ে বসেছে। ডালা একটু তুলে ভিতরে হাত দিয়ে দেখলেন বাণ্ডিলটা ঠিক আছে কিনা। তার পর চাবি বন্ধ করে বৃদ্ধিচাঁদ ব্যস্ত হয়ে আমাকে বললেন, আমি এখনই বহরমপুর রওনা হচ্ছি, ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হবে। আর সময় নেই, তুই আমার তোরঙ্গটা স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দে।
