—তোর তা শিখবার কি দরকার?
—নতুন বিদ্যে শিখতে হয় রে। তুইও তো মুখে দুটো আঙুল পুরে সিটি বাজানো শিখছিস। আমার হাসিটা এখনও ঠিক হচ্ছে না, সুর দুরস্ত করতে আরও সাত দিন লাগবে। চল না আমাদের বাড়ি, ধনু মামার হাসি শুনে আসবি। একটা চার পয়সা দামের ছোট খাতা কিনে নে। ধনু মামা যদি জিজ্ঞেস করে—কি করতে এসেছ হে ছোকরা? তুই অমনি খাতা খানা এগিয়ে দিয়ে বলবি—আজ্ঞে, একটি বাণী নিতে এসেছি।
মোড়ের দোকান থেকে খাতা কিনে ভোলার সঙ্গে চললাম। তার বাপ ঠিকাদারি করেন, বেশীর ভাগ বাইরেই ঘুরে বেড়ান। বাড়িতে তার মা আছেন, দুটো ছোট ভাইও আছে। ভোলার কাছে শুনলাম, ধনঞ্জয় দত্তর তিন কুলে কেউ নেই, কিন্তু বুড়োর নাকি বিস্তর টাকা আছে। তিনি ওদের বাড়িতে স্থায়ী হয়ে বাস করবেন এতে ভোলার বাবা আর মা খুব খুশী হয়েছেন।
ধনু মামা রোগা বেঁটে মানুষ কালো রং তোবড়া গাল, আসল বা নকল কোনও দাঁত নেই? সাদা চুল, খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি গোঁফ, বোধ হয় সাত দিন নাপিতের হাত পড়ে নি। তাঁর শোবার ঘরে তক্তপোশে উবু হয়ে বসে হুঁকো টানছেন, ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেছে।
আমি প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিলাম। ভোলা পরিচয় দিল—এ আমার বন্ধু রামেশ্বর, এক ক্লাসে পড়ে।
ধনু মামা কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে ব্যাঙের মতন মোটা গলায় বললেন, কি মতলবে এসেছিস রে?
খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, আজ্ঞে বাণী নিতে।
—বাণী? সে আবার কি?
ভোলা আমার হয়ে উত্তর দিল, বাণী জানেন না? সদুপদেশ আর কি, যাতে এর আখেরে ভালো হয় সে রকম কিছু কথা আপনার কাছে চাচ্ছে।
ধনু মামার ঠোঁটে একটু হাসি ফুটে উঠল। বললেন, মন দিয়া লেখাপড়া শিখিবে, সদা সত্য কহিবে, চুরি করিবে না—এই সব তো?
আমি বললাম, আজ্ঞে হাঁ, ওই রকম যা হক কিছু।
ধনু মামা বললেন, রত্তিরে ভাল দেখতে পাই না, হাতও কাঁপে। একটা কবিতা বলছি, তুই লিখে নে, নীচে আমি দস্তখত করে দেব। লেখ—পরের ধন লইবে না, তাহাতে বিপদ; চোরের ধন লইতে পার, অতি নিরাপদ।
অদ্ভুত বাণী শুনে আমি হাঁ করে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। ধনু মামা বললেন, কি রে, পছন্দ হল না বুঝি।
ভয়ে ভয়ে বললাম, আপনি ঠাট্টা করছেন সার।
ধনু মামা মাথাটি পিছনে হেলিয়ে চোখ মিটমিট করে উপর দিকে চাইলেন। তাঁর বদনমণ্ডলের সবটা কুঁচকে গেল এবং তাতে যেন তরঙ্গ উঠতে লাগল। তারপর মুখ থেকে বিকট হাসির আওয়াজ বেরুল—খ্যাঁক খ্যাঁক খ্যাঁক। আমার গায়ে ঠেলা দিয়ে ভোলা চুপি চুপি বলল, শুনলি তো?
ধনু মামা বললেন, এই ভোলা, একে আমার কাছে এনেছিস কেন রে? এ তো দেখছি ভাল ছেলে, তোর মতন বকাটে নয়। আমার কথা শুনলে এর স্বভাব বিগড়ে যাবে।
ভোলা বলল, আপনি জানেন না ধনু মামা, এই রামেশ্বর হচ্ছে ওয়েট ক্যাট, মানে ভিজে বেড়াল। আপনি নির্ভয়ে একে উপদেশ দিতে পারেন।
ধনু মামা বললেন, উপদেশ তো তোরা বিস্তর শুনেছিস, আমি আর বেশী কি বলব। তবে যেটুকু আমি আবিষ্কার করেছি তা তো ওকে বলেই দিলাম।
সাহস পেয়ে আমি বললাম, কি করে আবিষ্কার করলেন বলুন না মামাবাবু।
প্রসন্ন মুখে ধনু মামা বললেন, জানতে চাস? আচ্ছা, বলছি। তোরা তো সোজা ইস্কুল থেকে এসেছিস, জলটল খাস নি তো? ওরে ভোলা, তোর মার কাছ থেকে পয়সা চেয়ে নিয়ে চট করে তিতু ময়রার দোকান থেকে এক পো গজা আর এক পো জিলিপি কিনে আন।
ভোলা খাবার আনতে গেল। ধনু মামা আমাকে বললেন, খাবার আসুক, তোরা খেতে খেতে আমার গল্প শুনবি। ততক্ষণ বরং তুই আমার পা টিপে দে।
আমি ধনু মামার পদসেবা করতে লাগলাম। একটু পরেই ভোলা খাবারের ঠোঙা নিয়ে এল, বাড়ির ভিতর থেকে দু গেলাস জলও আনল। ধনু মামা বললেন, খেতে লেগে যা তোরা। না না, আমার জন্য রাখতে হবে না, আমি ও সব খাই না।
গজায় কামড় দিয়ে আমি বললাম, এইবার বলুন মামাবাবু।
ধনু মামা বললেন, দেখ, যা বলব তা ঠিক তত্ত্বকথা নয়। আর কেউ হলে এসব রহস্য প্রকাশ করত না, কিন্তু আমি কারও তোয়াক্কা রাখি না। বয়েস বিস্তর হয়েছে, ডাক্তার বলেছে রক্তের চাপ দু শ চল্লিশ থেকে হঠাৎ এক শ চল্লিশে নেমেছে। লক্ষণ ভাল নয়, বেশ বুঝছি শিগগির এক দিন মুখ থুবড়ে পড়ে মরব। ফাদার কনফেসার কাকে বলে জানিস? যে পাদরীর কাছে খ্রীষ্টানরা মাঝে মাঝে নিজের কুকর্ম স্বীকার ক’রে মন হালকা করে তাকেই বলে।
ভোলা বলল, গল্প শুনেছি—গেঁয়ো লোক গঙ্গাস্নানে এসেছে, পুরুত তাকে মন্ত্র পড়াচ্ছে—আম্র চুরি, জাম্র চুরি, ভাদ্রমাসে ধান্য চুরি, মন্দ স্থানে রাত্রিযাপন, মদ্যপান আর কুঁকড়া ভক্ষণ, হক্কল পাপ বিমোচন, গঙ্গা গঙ্গা—সেই রকম নাকি?
—হাঁ। আজ তোরাই আমার ফাদার কনফেসার। আমার ইতিহাসটা বলছি শোন—
অনেক বছর আগেকার কথা। তখন আমার বয়স আঠারো—উনিশ, নাম ছিল হাবুলচন্দ্র। লেখাপড়া বেশী শিখি নি, অবস্থা খুব খারাপ, বাড়িতে মা ছাড়া কেউ ছিল না। মারা যাবার আগের দিন মা বললেন, বাবা হাবুল, এই পাড়াগাঁয়ে বেকার বসে, থাকিস নি, দহরমগঞ্জে তোর কাকার কাছে যাবি, যা হক একটা হিল্লে লাগিয়ে দেবেন।
মা মারা গেলে দহরমগঞ্জে গেলাম, বেশ বড় জায়গা। কাকা ওখানকার মস্ত কারবারী গয়াপ্রসাদ প্রয়াগদাসের ফার্মে চালান লিখতেন। এই ফার্মের পত্তন করেছিলেন গয়াপ্রসাদ। তিনি গত হলে তাঁর ছেলে প্রয়াগদাস মালিক হন। আমি যখন ওখানে যাই তখন প্রয়াগদাসের বয়েস আন্দাজ পঞ্চাশ। গুটিকতক নাবালক ছেলে মেয়ে আছে, দ্বিতীয় পক্ষের একটি স্ত্রীও আছে। প্রয়াগদাস বাতে পঙ্গু হয়ে প্রায় বিছানাতেই শুয়ে থাকতেন, অগত্যা তাঁর খুড়তুতো ভাই বৃদ্ধিচাঁদকে ম্যানেজার করে ব্যবসা চালাবার সমস্ত ভার দিয়েছিলেন। বৃদ্ধিচাঁদের বয়েস প্রায় তিরিশ, নিঃসন্তান, স্ত্রী গত হলে আর বিয়ে করেন নি।
