‘বটে! কিন্তু দশ—দশটা আলাদা দরকার কি, একটা প্রকাণ্ডদেহ যদি দিই, তাতে সব অঙ্গই, তো বড় বড় হবে।’
‘আজ্ঞে, আমি ভেবে দেখেছি, লাভ হবে না। হাতির দেহ প্রকাণ্ড, তার সুখভোগের মাত্রা তো ইঁদুরের চেয়ে বেশী নয়। সংখ্যা না বাড়লে ভোগ বাড়বে না।’
‘তুমি খুব হিসাবী দেখছি। আচ্ছা, মন নামে একটা অন্তরিন্দ্রিয় আছে, তা কটা চাও?’
‘সে কথা তো ভাবি নি প্রভু। আচ্ছা মন একটাই থাকুক।’
‘উত্তম প্রস্তাব। এরূপ জীবনকল্পনা আমার মাথাতেও আসে নি, তোমার উপরই পরীক্ষা হ’ক। কিন্তু সামলাতে পারবে তো? যদি সর্দি হয় তো দশটা নাক হাঁচবে, যদি জ্বর হয় তবে বিশটা পা কামড়াবে। আরও অসুবিধা আছে—লোকে যদি রাক্ষস ভেবে তোমাকে আক্রমণ করে?’
‘প্রভু, আপনি সুখ দুঃখ দুই—ই দিয়েছেন, তবু তো লোকে জীবন ধারণ করতে চায়। আমি দশটা জীবন একসঙ্গে ভোগ করতে চাই, দুঃখ যদি বাড়ে সুখও তো বাড়বে। আমার এই বর্তমান দেহ খুব শক্তিমান, আর আপনার প্রদত্ত অঙ্গগুলির জন্য বলবীর্য দশগুণ বাড়বে। তবে যা দেবেন মজবুত দেখেই দেবেন। আমার সঙ্গে প্রচুর ধনরত্নও আছে, সেই অর্থবলে আর বাহুবলে সকলকেই বশে এনে নবরাজ্য স্থাপন করব।’
বিধাতা বললেন, ‘তবে তাই হ’ক, তথাস্তু। সার্থকনামা দশকরণ, উত্তিষ্ঠ, ঐ ডোবার জলে তোমার নবকলেবরের প্রতিবিম্ব দেখে নাও, তারপর যথেচ্ছা ভোগের আয়োজন কর।’
এক বৎসর হয়ে গেছে। ব্রহ্মা বেদের পুঁথি নিয়ে কাটাকুটি করছেন এমন সময় তাঁর চতুর্মুণ্ডের চতুঃশিখা থরথর ক’রে কেঁপে উঠল, যাকে বলে টনক নড়া। ধ্যানস্থ হয়ে বুঝলেন দশকরণ তাঁকে আবার ডাকছেন। অদ্ভুতদেহধারীর পরিণাম জানবার জন্য তাঁর কৌতূহল হ’ল, আহ্বান পাবামাত্র ভূলোকে অবতরণ করলেন।
দশকরণ সেই গাছটির তলার বিষণ্ণ হয়ে বসে আছেন। বিধাতাকে দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে দণ্ডবৎ হলেন—কিছু কষ্টে, কারণ তাঁর নূতন যৌগিক দেহটি লম্বায় না বাড়লেও বেষ্টনে অনেকখানি।
ব্রহ্মা বললেন, ‘ভাল তো সব?’
‘কিছুই ভাল নয় প্রভু। বর তো দিলেন, কিন্তু সুখ পাচ্ছি না। আগে দুই চোখে একই দৃশ্য দেখতাম, এখন কুড়ি চোখে নানাদিকের দৃশ্য মিশে গিয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে—গাছের উপর জল, জলের মধ্যে উড়ন্ত পাখি। ভেবেছিলাম দশ রসনায় বিভিন্ন রসের আস্বাদ নিয়ে একসঙ্গে বিচিত্র অনুভূতি পাব, এখন দেখছি কটুতিক্তমধুর মিশে গিয়ে এক উৎকট উপলব্ধি হচ্ছে। দশটি উদর বোঝাই ক’রেও তৃপ্তি বাড়ছে না। দশ জোড়া পা থাকলেও দশগুণ পথ চলতে পারি না। সব অঙ্গেরই এক দশা! আচ্ছা, আপনিও তো চতুরানন চতুর্ভুজ, কিরকম বোধ করেন?’
‘কিছুই বোধ করি না, ওসব মাথমুণ্ডু আমার নিজের নয়। মানুষ সৃষ্টি করবার পর হঠাৎ একদিন দেখি আমার চারটে মাথা চারটে হাত গজিয়েছে। এ হচ্ছে মানুষের কাজ, তারা আমার সৃষ্টির শোধ তুলেছে আমারই স্কন্ধে। তা এখন কি চাও বল।’
‘আপনি বলুন কি করলে আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।’
‘বাপু, পরামর্শ দেওয়া আমার কাজ নয়। আর তোমার উদ্দেশ্য যে কি তারও স্পষ্ট ধারণা তোমার নেই। যা চাও নিজেই স্থির ক’রে বল।’
‘আমার একটা মনই গোলযোগের কারণ। এখন কৃপা ক’রে দশটি মন দিন, তাতে প্রত্যক্ষগুলো আর জট পাকাবে না, আলাদা মনের খোপে খোপে থাকবে।’
ব্রহ্মা তথাস্তু ব’লে প্রস্থান করলেন।
আর এক বৎসর কেটে গেছে। ব্রহ্মার আবার টনক নড়ল, দশকরণ ডাকছেন। বিরক্ত হ’য়ে বললেন, ‘আঃ লোকটা জ্বালিয়ে মারলে। যাই হ’ক, শেষ অবধি দেখতে হবে।’
ব্রহ্মা এসে দশকরণকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিহে, এবার সুবিধে হল?’
দশকরণ কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘কই আর হ’ল প্রভু, দশটা মনে আরও গোলযোগ বেড়েছে। যতই চেষ্টা করি মনে হয় ভিন্ন ভিন্ন লোক ভোগ করছে। একবার বোধ হয় আমি দেবদত্ত—মিষ্টান্ন খাচ্ছি, আবার ভাবি আমি গঙ্গা দত্ত—সংগীত শুনছি। তখনই আবার দেখি আমি অনঙ্গদত্ত—প্রেমালাপে মগ্ন, পুনশ্চ আমি ত্রিভঙ্গদত্ত—গেঁটেবাতে কাতর। সমস্ত অনুভূতি কেন্দ্রস্থ করতে পারছি না, কেবলই বিক্ষেপ হয়। আমার মনগুলোও দিয়েছেন হরেক রকমের—চালাক, বোকা, শান্ত, সহিষ্ণু, রাগী, উদার, হিংসুটে, নিষ্ঠুর, দয়ালু। এই দেখুন না, আপনার কাছে যে মনের কথা জানাব তাতেও বাধা। প্রত্যেক মন চায়—আমি বলব, আমি বলব। কোনও গতিকে রফা ক’রে একটি মন এখন মুখপাত্র হয়েছে!’
‘হুঁ, এ রকম যে হবে তা আগেই অনুমান করেছিলাম। এখন কি চাও?’
‘প্রভু, কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনিও তো উপায় বলবেন না। এখন বরং পূর্বদেহ পূর্বমন ফিরিয়ে দিন, দিনকতক প্রকৃতিস্থ হ’য়ে ভেবে চিন্তে দেখি, তারপর আবার আপনার শরণাপন্ন হব।’
ব্রহ্মা বললেন, ‘তথাস্তু।’
তার পর আরও পাঁচ বৎসর কেটে গেছে। ব্রহ্মা দশকরণের কথা ভুলে গেছেন, তাঁর কাছে কোন ডাকও আর আসেনি। একদিন তিনি সৃষ্টি চিন্তা করছেন, ভাবছেন—বেঁটে শরীরের সঙ্গে পীতচর্ম আর খাঁদা নাক দিলে কেমন হয়, এমন সময় তাঁর তৃতীয় মূণ্ডের দ্বিতীয় কর্ণ সুড়সুড় করে উঠল। হাত দিয়ে পেলেন—একটি ষটপদ সহস্রাক্ষ বিচিত্রপক্ষ পতঙ্গ, যার নাম প্রজাপতি। দেখেই দশকরণকে মন পড়ে গেল।
লোকটার হ’ল কি, আর তো সাড়াশব্দ নেই, মারা গেল নাকি? বোধ হয় হতাশ হ’য়ে নিজের রাজ্যে ফিরে গেছে। কিন্তু গিয়েই বা কি করবে, এই সাত বৎসর পরে তার ছেলে তো আর দখল দেবে না। ধ্যানস্থ হ’য়ে দেখলেন, দশকরণ বেঁচে আছেন, দর্ভাবতীর নিকটেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিধাতা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের মূর্তিতে তখনই সেখানে নেমে এলেন।
