গোপপল্লী। একটা মেটে ঘরের মটকায় চ’ড়ে দশকরণ খড় দিয়ে চাল ছাইছেন, ঘরের সামনে একটি গোপনারী শিশুকে খাওয়াচ্ছে আর হাত নেড়ে দশকরণকে কাজ বাতলাচ্ছে।
ব্রহ্মা ডাকলেন, ‘ওহে দশকরণ, হচ্ছে কি?’
দশকরণ নেমে এসে অপরিচিত ব্রাহ্মণকে প্রণাম ক’রে বললেন, ‘কে আপনি দ্বিজবর?’
‘আরে আমি ব্রহ্মা, তোমার খোঁজ নিতে এসেছি। তারপর তোমার গবেষণা কতদূর এগল? চেহারাটা চাষাড়ে হয়ে গেছে দেখছি। এখন করা হয় কি, আছ কেমন?’
‘খুব ভাল আছি প্রভু। এই গৃহের স্বামী অসুস্থ, অন্য পুরুষ নেই, বর্ষাও আসন্ন, তাই আমিই ঘরের চালটা মেরামত করে দিচ্ছি।’
‘সুখ হচ্ছে?’
‘পরিশ্রম হচ্ছে, অভ্যাস নেই কিনা! সুখী হবে এই গোপ—দম্পতি।’
‘এখানেই থাকা হয় বুঝি?’
‘না, গ্রামের প্রান্তে থাকি, তবে কাজের জন্য নানা স্থানে ঘুরে বেড়াতে হয়।’
‘দর্ভাবতী রাজ্যের সংবাদ কি, তোমার সেই ধনরত্নের থলিটার কি হ’ল?’
‘রাজ্য পুত্রের হাতে, আর ধন যা এনেছিলাম তার কিছু খরচ হয়ে গেছে, অবশিষ্ট রাজকোষে ফেরত দিয়েছি। রাজ্যের লোক এখন আমাকে চিনতে পারে না, আর দুরভিসন্ধি নেই জেনে কেউ অনিষ্টও করে না।’
‘রাজমহিষীরা কোথায়?’
‘জ্যেষ্ঠা পত্নী আমার কাছেই আছেন। কনিষ্ঠা আসতে চান না।’
‘তা হ’লে আবার সংসারধর্ম করছ। আমি ভেবেছিলাম বুঝি বানপ্রস্থের অন্তে সন্ন্যাস নিয়েছ। তোমার সেই উৎকট খেয়ালের কি হল—সেই মহাভোগায়তন দশদেহসংঘাত?’
দশকরণ সহাস্যে বললেন, ‘সে সমস্যার সমাধান হ’য়ে গেছে প্রভু। এখন আমি দশকরণ নই, কোটিকরণ; তারও একীকরণ হয়ে গেছে। গোছাবাঁধা দশটা দেহমনের দরকার কি, দেখছি যত জীব আছে সব মিলে আমি, এখন ভোগের ইয়ত্তা নেই। ভারী সুবিধা হয়েছে, সকলের সুখদুঃখ পৃথক ক’রেও বুঝতে পারি, একত্রও বুঝতে পারি।’
‘কি রকম?’
‘সেদিন বাঘে একটা গরু মারলে। অবলা গরুর মৃত্যুযন্ত্রণা আর ক্ষুধার্ত বাঘের ভোজনসুখ দুই—ই বুঝলাম। গ্রামের লোকে মিলে কুঠারাঘাতে বাঘটা মারলে। অসহায় বাঘের আর্তনাদ আর দলবদ্ধ গ্রামবাসীর উল্লাস তাও বুঝলাম।’
‘ভাল মন্দ সবই নির্বিকার সাক্ষী হয়ে দেখ?’
‘তা কেন দেখব। বাঘটাকে প্রথম মার আমিই দিয়েছিলুম, মৃগয়া অভ্যাস ছিল কিনা। আপনি অপক্ষপাতে ভাল মন্দ মিশিয়ে জগৎ সৃষ্টি করেছেন, আবার প্রবল স্বার্থবোধও দিয়েছেন। তাই বাঘে গরু মানুষ মারে, মানুষে বাঘ মারে, মানুষকেও মারে। যখন রাজা ছিলাম, তখন নিজের সুখটাই অগ্রগণ্য ছিল। তার পর সুখবৃদ্ধির নূতন উপায় মাথায় এল, আপনার বরে দশমনা হলাম। নিজের দশটা অংশের স্বার্থসিদ্ধি তো সব সময় করা যায় না, তাই রফা করতে হল। যথাসম্ভব সবকটাকে সুখে রাখবার চেষ্টা করতাম, না পারলে গোটাকতককে নিগৃহীত করতাম। তার পর স্বার্থবুদ্ধি আরও ব্যাপক হ’ল, বুঝলাম দশটা দেহমন যথেষ্ট নয়, একসঙ্গে জড়িয়ে থাকাও অনর্থকর, পৃথক থেকেও একত্ব—বোধ হয়। এখন কোটিকরণ হয়েছি, বিস্তর ইন্দ্রিয় বিস্তর দেহমন। তাই মধ্যম পন্থা আরও বেশী শিখেছি। সর্ব অবয়বের লাভালাভ বুঝে চলতে হয় প্রভু আপনার মতন নির্মম সাক্ষী হয়ে থাকতে পারি না।’
‘লাভালাভ বিচারে ভুল ক’র না?’
‘করি বই কি। সেটা আপনার দোষ—যেমন বুদ্ধি দিয়েছেন তেমনই তো হবে, ঘ’ষে মেজে ঠেকে শিখে আর কতই বাড়বে।’
‘আচ্ছা দশকরণ, বুঝলাম তোমার অনেক দেহ, অনেক মন। কিন্তু তোমার আত্মা কটা?’
‘সমস্যায় ফেললেন প্রভু। বৃদ্ধ মান্ডুক বলতেন বটে—জীবাত্মা, পরমাত্মা, প্রত্যাগাত্মা, সর্বাভূতান্তরাত্মা—এইসব কটমটে কথা। আমার কটা আছে তা তো জানি না।’
‘হয়তো এককালে জানবে। না জানলেও তোমার কাজ আটকাবে না।’
এমন সময় একটি লোক এসে ডাকলে, ‘ওহে এককড়ি, আজ যে বুড়ো জরৎখরের কুলত্যাগিনী বউটার একটা গতি করবার কথা, তার পর গ্রামের ছেলেদের ধনুর্বিদ্যা শেখাবে, তার পর সন্ধ্যায় ভরতরাজার উপাখ্যান শোনাবে বলেছিলে। তোমার আর কত দেরি?’
ব্রহ্মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এককড়ি কে?’
দশকরণ বললেন, ‘আজ্ঞে আমি। ওরা কোটিকরণ একীকরণ বোঝে না, সংক্ষেপে এককড়ি বলে। তুমি এগোও হে, আমি হাতের কাজটা শেষ ক’রেই যাচ্ছি। প্রভু, আমার একটি শেষ প্রার্থনা আছে। বয়স তো অনেক হ’ল গবেষণাও ঢের ক’রে দেখলাম। এইবার মুক্তির সন্ধান দিন।’
ব্রহ্মা হেসে বললেন, ‘বল কি হে, তোমার এতগুলো সত্তাকে ফাঁকি দিয়ে তুমি একাই মুক্তি চাও?’
‘ঠিক বলেছেন। থাক গে, মুক্তির দরকার নেই।’
‘দরকার না থাকলেও তুমি পেয়ে গেছ।’
‘দোহাই পিতামহ, পরিহাস করবেন না।’
‘আরে মুক্তির পথ কি একটা? তোমার রাজবুদ্ধি তোমাকে মুক্তির রাজমার্গ দেখিয়েছে।’
বিধাতা অন্তর্হিত হলেন। দশকরণ আবার মটকায় চ’ড়ে ভাবতে লাগলেন—এ কি রকম মুক্তি, লোকে ছাড়তেই চায় না, নাইবার খাবার অবসর নেই।
১৩৪৯ (১৯৪২)
দাঁড়কাগ
কাঞ্চন মজুমদার অনেক কাল পরে তার বন্ধু, যতীশ মিত্রের আড্ডায় এসেছে। তাকে দেখে সকলে উৎসুক হয়ে নানারকম সম্ভাষণ করতে লাগল।-আরে এস এস, এত দিন কোথায় ডুব মেরে ছিলে। বিদেশে বেড়াতে গিয়েছিলে নাকি? ব্যারিস্টারিতে খুব রোজগার হচ্ছে বুঝি, তাই গরিবদের আর মনে পড়ে না?
প্রবীণ পিনাকী সর্বজ্ঞ বললেন, বে-খা করলে, না এখনও আইবড় কার্তিক হয়ে আছ?
কাঞ্চন বলল, কই আর বিয়ে হল সর্বজ্ঞ মশাই, পাত্রীই জুটছে না।
