বৃদ্ধমন্ত্রী আকাশ থেকে পড়ে বললেন, ‘সে কি মহারাজ, আপনি এখনও যুবা, চুল পাকে নি, দাঁত পড়ে নি, শরীর অজর, বাহু সবল, বুদ্ধি তীক্ষ্ন, কি দুঃখে কালই বনে যাবেন? এখন বিশ বৎসর ওকথা তুলবেন না।’
রাজা ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘না, আমার যাওয়াই স্থির। কুমারের অভিষেক আজই হ’য়ে যাক। উৎসবটা পরে করলেই চলবে।’
মন্ত্রী বললেন, ‘হাঁ, কি দুর্দৈব! মহারাজ, হঠাৎ এমন মত কেন আপনার হ’ল? দর্ভাবতী রাজ্যের অবস্থাটা ভেবে দেখুন। রাজপুত্র এখনও বালক, সবে বাইশ বৎসরে পড়েছেন, আমিও জরাগ্রস্ত। রাজ্য চালনা কি আমাদের কাজ? কুমার, তুমি মহারাজকে বুঝিয়ে বল না।’
কুমার নতমস্তকে উত্তর দিলেন, ‘আমি আর কি বলব। পিতা যদি ধর্মার্থে তৃতীয় আশ্রম গ্রহণ করেন তবে আমি তাতে বাধা দিয়ে পাপের ভাগী কেন হব। তাঁর পদানুসরণ করে অগত্যা আমিই রাজ্য চালাব।’
যুবমন্ত্রী বললেন, ‘আর আমরাও তো আছি, ভয় কি।’
বৃদ্ধমন্ত্রী তখন হতাশ হয়ে স্থবির রাজপুরোহিতকে বললেন, ‘ধর্মজ্ঞ মাণ্ডুক, এই সংকটে একমাত্র আপনিই মহারাজ দশকরণকে সদবুদ্ধি দিতে পারেন।’
মাণ্ডুক বললেন, ‘মহারাজ, পঞ্চাশোর্ধ্বে বনপ্রস্থান নৃপতির পক্ষে অবশ্যকৃত নয়। দশরথ অতি বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেছিলেন। দু—বার জরাগ্রস্ত হয়েও সিংহাসন ছাড়েন নি। যদি পরমার্থই আপনার অভিপ্রেত হয়, তবে রাজর্ষি জনকের তুল্য নির্লিপ্তচিত্তে প্রজাপালনে নিযুক্ত থেকে মোক্ষানুসন্ধান করুন।’
দশকরণ কিছুতেই সম্মত হলেন না। এদিকে তাঁর বনগমনের সংবাদ কিঞ্চিৎ রঞ্জিত হয়ে অন্তঃপুরে পৌঁছে গেছে। ছোটরানী মহা উৎসাহে সভায় এসে বললেন, ‘আর্যপুত্র, আমি প্রস্তুত, দ্বিপ্রহরের মধ্যেই সমস্ত গুছিয়ে ফেলব। সঙ্গে বেশী কিছু নেব না, শুধু আমার অলংকার তিন মঞ্জুষা, বসন দশ পেটিকা, এটা—সেটা বিশ পেটিকা। আর তিনজন সখী, আর দশজন দাসী, আর শুকসারী, আর আমার প্রিয় মার্জারী দধিমুখী। আপনি গোটাদশেক বড় বড় স্কন্ধাবার পাঠাবার ব্যবস্থা করুন, তাতেই আমদের কুলিয়ে যাবে। উঃ ভারী মজা হবে, দিনকতক ঝামেলা থেকে বাঁচা যাবে। সঙ্গে আবার ভেজাল জোটাবেন না যেন।’
রাজা বললেন, ‘ওসব কিছুই যাবে না। যুবরাজ কাল তোমাকে পিত্রালয়ে পাঠিয়ে দেবেন।’
ছোটরানী রাগে দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন। বড়রানী দেবপূজায় ব্যস্ত ছিলেন, এখন সংবাদ পেয়ে এসে বললেন, ‘মহারাজ, একি শুনছি! আমি সহধর্মিনী পট্টমহিষী, আমাকে ফেলে যাবেন না তো?’
রাজা উত্তর দিলেন, ‘তুমি এখানেই তোমার পুত্রের কাছে থাকবে। আর ইচ্ছা হয় তো বারাণসীতে বাস করতে পার।’
যুক্তি, ধর্মোপদেশ, অনুনয়, ক্রন্দন কিছুতেই কিছু হ’ল না। রাজা দশকরণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সভা ভঙ্গ হ’ল।
দ্বিপ্রহরে দশকরণের নিভৃত কক্ষে গিয়ে রাজবয়স্য প্রগলভক বললেন, ‘মহারাজ, এতকাল আমার কাছে কিছুই গোপন করেন নি। আজ একবার মনের কথাটি খুলে বলতে আজ্ঞা হ’ক। ধর্মে আপনার বেশী মতি আছে, তা তো বোধ হয় না, পরকালের চিন্তাও করতে দেখি নি। পুত্রকলত্রের উপদ্রব সইতে না পেরে বনে পালাচ্ছেন না তো?’
রাজা বললেন, ‘খেপেছ, তাহলে পুত্রকলত্রকেই বনে পাঠাতাম।’
‘তবে কি জন্য যাচ্ছেন?’
দশকরণ একটু হেসে বললেন, ‘ফুর্তি করবার জন্য।’
‘অবাক করলেন মহারাজ। রাজপদে থেকে ফুর্তি হবে না আর বনে গিয়ে হবে! ফুর্তি চান তো এখানেই তার বাধা কি? আরও গুটিদশেক মহিষী গৃহে আনুন, নৃত্যগীতনিপুণা ভাল ভাল বারাঙ্গনা বাহাল করুন, কাকাক্ষীনদীতটে সুবিশাল প্রমোদ—কানন রচনা করুন, তাতে মনোরম সৌধ তুলুন। উৎকলিঙ্গ থেকে নিপুণ সুপকার, গান্ধার থেকে পলান্নপাচক, গৌড়ভূমি থেকে লডডুকলাবিৎ আনান। আর ময়লাদ্রির গন্ধসম্ভার, সিংহলের রত্নাভরণ, বাহ্ণিকজাত বিচিত্র আস্তরণ, যবন—দেশের আসব—’
‘থাম থাম, ওসব আমার খুব জানা আছে। শুধু বিলাস সামগ্রীতে কিছু হয় না, ভোগের শক্তি চাই।’
‘আপনার শক্তি কম কি? আর বনে গেলেই কি শক্তি বাড়বে?’
‘মূর্খ, তুমি বুঝবে না। যদি আবার কখনও দেখা হয় তখন বুঝিয়ে দেব। যাও এখন বিরক্ত ক’রো না।’
রাজাকে উন্মাদ ভেবে, প্রগলভক বিষণ্ণ মনে চলে গেলেন।
পরদিন ভোরবেলা, দশকরণ রথারূঢ় হ’য়ে রাজ্য ত্যাগ করলেন। সঙ্গে নিলেন শুধু একটি নাতিবৃহৎ থলি। বহুদূরে এসে রথ আর সারথিকে ফিরিয়ে দিলেন, তার পর থলিটি কাঁধে নিয়ে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলেন।
দশকরণ একটি গাছের তলায় ব’সে একান্তঃকরণে ব্রহ্মার আরাধনা করতে লাগলেন। তিন দিন তিন রাত অতিক্রান্ত হ’ল, অবশেষে ব্রহ্মা দর্শন দিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি চাও?’
দশকরণ সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতান্তে বললেন, ‘প্রভু, আমার পিতৃদত্ত নামটি সার্থক করুন।’
‘তার মানে?’
‘আমার প্রত্যেক ইন্দ্রিয় দশগুণ ক’রে দিন। অর্থাৎ চক্ষু, বিংশতি কর্ণ, দশ নাশা, দশ জিহ্বা, দশগুণ বিস্তৃত ত্বক।’
‘আর বাক—পাণি—পাদাদি কর্মেন্দ্রিয়? হৃৎ—ক্লোম—জঠরাদি যন্ত্র?’
‘তাও দশ—দশগুণ।’
বিধাতা সবিস্ময়ে বললেন, অর্থাৎ তুমি একাই দশজন হ’তে চাও। তোমার মতলবটা কি?
‘প্রভু, তবে খুলে বলি শুনুন! আমার দেহটা তো মোটে সাড়ে তিন হাত বানিয়েছেন, আর ইন্দ্রিয়াদি যা দিয়েছেন তাও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। কতই বা দেখব, কতই শুনব, কতই খাব, কতটুকুই বা ভোগ করব? আমি মহালোভী পুরুষ, আমার ইন্দ্রিয় বর্ধন করে ভোগশক্তি দশগুণ বাড়িয়ে দিন।’
