বকুর ভরসা হ’ল না। বললেন—তা পেরে উঠবেন কি ক’রে? শত্রু অতি প্রবল, হটাতে পারবেন না। নিখিল—বঙ্গীয়—সর্পনাশক ফাণ্ডের সমস্ত টাকা ওরা হাত করেছে।
রামগিধড় খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বললেন—আমরা সর্প নই। ফান্ড না থাক দাঁত আছে, নখ আছে। বাবা দক্ষিণরায় আমাদের সহায়। তাঁর কৃপায় সমস্ত শত্রু নিপাত হবে।
তিনি কে?
চেন না? তেত্রিশ কোটির মধ্যে তিনিই এখন জাগ্রত, আর সবাই ঘুমচ্ছেন। বাবা তোমার ডাক শুনতে পেয়েছেন। নাও, এখন ক্রীডে সই কর। অতি সোজা ক্রীড— কেবল বাবার নিত্যিকার খোরাক যোগাতে হবে—তার বদলে পাবে শত্রু মারবার ক্ষমতা আর কাউনসিলে অপ্রতিহত প্রতাপ।
কিন্তু গবরমেণ্ট?
‘গবরমেণ্টের মাংসও বাবা খেয়ে থাকেন—’
বংশলোচন বাধা দিয়া বলিলেন—’ওকি চাটুজ্যেমশায়!’
চাটুজ্যে কহিলেন—’হাঁ হাঁ মনে আছে,আচ্ছা, খুব ইশারায় বলছি। রামগিধড় বুঝিয়ে দিলেন, একেবারে রামরাজ্য হবে। শত্রুর বংশ লোপাট, সবাই ভাই—ব্রাদার। দিব্যি ভাগ—বাটোয়ারা ক’রে খাবে। সকলেই মন্ত্রী, সকলেই লাট।’
কিন্তু ঐ রামজাদুটা ঢিট হবে তো?
ঢিট ব’লে ঢিট! একেবার ঢ—য় দীর্ঘ ঈ ঢীট! তাকে তুমি নিজেই বধ ক’রো।
বকুবাবুর মাথা গুলিয়ে গিয়েছিল। এইবার তাঁর কৃত্রিম দন্তে অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল। ক্রীড সই করে দিয়ে বললেন—বাবা দক্ষিণরায় কি জয়!
রমগিধড় বললেন—হুয়া, হুয়া, আর সব ঠিক হুয়া।
এই স্থির হ’ল যে কাল ফাইভ—আপ—প্যাসেঞ্জারে বকুবাবু তাঁর সুন্দরবনের জমিদারিতে রওনা হবেন। সেখানে পৌঁছলে রামগিধড় তাঁকে সঙ্গে ক’রে নিয়ে বাবার আশীর্বাদ পাইয়ে দেবেন।
বকুবাবুর মাথা বিগড়ে গেল। সমস্ত রাত তিনি খেয়াল দেখলেন রামগিধড় হুয়া হুয়া করছে। রামরাজ্য, কাউনসিলে অপ্রতিহত প্রতাপ, লাট, মন্ত্রী—এসব বড় বড় কথা তাঁর মনে ঠাঁই পায় নি। রামজাদু মরবে আর তিনি কাউনসিলে ঢুকবেন—এইটেই আসল কথা। তার পর রামরাজ্যই হ’ক আর রাক্ষসরাজ্যই হ’ক, দেশের লোক বাঁচুক বা বাবার পেটে যাক, তাতে তাঁর ক্ষতি—বৃদ্ধি নেই।
তারপর সোঁদরবনে গভীর অমাবস্যা রাত্রে বাবা তাঁকে দর্শন দিলেন।
বিনোদ বলিলেন—’চাটুজ্যেমশায়, আপনি বড় ফাঁকি দিচ্ছেন। বাবুর মূর্তিটা কি রকম তা বলুন?’
চাটুজ্যে। বলব না, ভয় পাবে। বিশেষ ক’রে এই উদোটা।
উদয় বলিল—’মোটেই না। হাজারিবাগে থাকতে কতবার আমি রাত্তিরে একলা উঠেছি। বউ বলত—’
চাটুজ্যে বলিলেন—’বউ বলুক গে। বাবা প্রথমটা সৌম্য ব্রাহ্মণের মূর্তি ধ’রে দেখা দিয়েছিলেন। বকুলালকে বললেন—বৎস, আমি তোমার প্রার্থনায় খুশী হয়েছি। এখন বর কি নেবে বল।’
বকুবাবু বললেন—বাবা, আগে রামজাদুটাকে মার, ও আমার চিরকালের শত্রু।
বাবা বললেন—দেশের হিত?
বকু উত্তর দিলেন—হিত—টিত এখন থাক বাবা। আগে রামজাদু।
বাবা বলিলেন—তাই হ’ক। ক্রীড সই করেছ, এখন তোমায় জাতে তুলে দি—
এতেক কহিয়া প্রভু রায় মহাশয়
ধরিলেন নিজ রূপ দেখে লাগে ভয়।
পর্বত প্রমাণ দেহ মধ্যে ক্ষীণ কটি,
দুই চক্ষু ঘোরে যেন জ্বলন্ত দেউটি।
হলুদ বরন তনু তাহে কৃষ্ণ রেখা,
সোনার নিকষে যেন নীলাঞ্জন লেখা।
কড়া কড়া খাড়া খাড়া গোঁফ দুই গোছা,
বাঁশঝাড় যেন দেয় আকাশেতে খোঁচা।
মুখ যেন গিরিগূহা রক্তবর্ণ তালু,
তাহে দন্ত সারি সারি যেন শাঁখ আলু।
দু—চোয়াল বহি পড়ে সাদা সাদা গেঞ্জ,
আছাড়ি পাছাড়ি নাড়ে বিশ হাত লেঞ্জ।
ছাড়েন হুংকার প্রভু দন্ত কড়মড়ি,
জীব জন্তু যে যেখানে ভাগে দড়বড়ি।
ভয় পাঞা দেবগণ ইন্দ্রে দেয় ঠেলা,
কহে—দেবরাজ হান বজ্র এইবেলা।
ইন্দ্র বলে, ওরে বাপা কিবা বুদ্ধি দিলে,
রহিবে পিতার নাম আপুনি বাঁচিলে।
চক্ষে বান্ধ ফেটা বাপা কানে দাও রুই,
কপাট ভেজাঞা সুখা খাও ঢোঁক দুই।
বাবা দক্ষিণরায় তাঁর ল্যাজটি চট ক’রে বকুবাবুর সর্বাঙ্গে বুলিয়ে দিলেন। দেখতে দেখতে বকুলাল ব্যাঘ্ররূপ ধারণ করলেন।
বাবা বললেন,—যাও বৎস, এখন চ’রে খাও গে।’
চাটুজ্যে হুঁকায় মনোনিবেশ করিলেন। বিনোদবাবু বলিলেন—’তার পর?’
‘তারপর আবার কি! বকুলাল কেঁদেই আকুল। ও বাবা, একি করলে? আমি ভাত খাব কি ক’রে? শোব কোথায়? সিল্কের চোগা—চাপকান পরব কি ক’রে? গিন্নী যে আর চিনতে পারবে না গো!
বাবা অন্তর্ধান। রামগিধড় বললেন—আবার ক্যা হুয়া? গোল মত কর। এখন ভাগো,শত্রু পকড়—পকড়কে খাও গে। বকুলাল নড়েন না, কেবল ভেউ ভেউ কান্না। রামগিধড় ঘ্যাক ক’রে তাঁর পায়ে কামড়ে দিলে। বকুলাল ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে পালালেন।
পরদিন সকালে ক—জন চাষা দেখতে পেলে একটি বৃদ্ধ বাঘ পগারের ভেতরে ধুঁকছে। চ্যাংদোলা ক’রে নিয়ে গেল ডেপুটিবাবুর বাড়ি। তিনি বললেন—এমন বাঘ তো দেখি নি, গাধার মত রং। আহা, শেয়ালে কামড়েছে, একটু হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দি। একটু চাঙ্গা হোক, তারপর আলিপুর নিয়ে যেয়ো; বকশিশ মিলবে।
বকুবাবু এখন আলিপুরেই আছেন। আর দেখাসাক্ষাৎ করিনে—ভদ্দরলোককে মিথ্যে লজ্জা দেওয়া।
বিনোদবাবু বলিলেন—’আচ্ছা চাটুজ্যেমশায়, বাবা দক্ষিণরায় কখনও গুলি খেয়েছেন?’
‘গুলি তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।’
‘তিনি না খান, তাঁর ভক্তরা কেউ খান নি কি?’
‘দেখ বিনোদ, ঠাকুর—দেবতার কথা নিয়ে তামাশা ক’রো না, তাতে অপরাধ হয়। আচ্ছা ব’স তোমরা—আমি উঠি।’
দশকরণের বাণপ্রস্থ
দর্ভাবতীর রাজা দশকরণ একদিন রাজসভায় পদার্পণ ক’রেই বললেন, ‘আমার পঞ্চাশ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছে, কালই আমি বানপ্রস্থে যাব।’
