খবরের কাগজে নানারকম কেচ্ছা বার হ’তে লাগল। বকুলাল দত্ত—সেটাকে কে চেনে? চোদ্দ বছর আগে কার কাছে চাকরি করত? সে চাকরি গেল কেন? কেরানীর অত পয়সা কি করে হ’ল? হে দেশবাসিগণ, বকুলাল অত সোডাওআটার কেনে কেন? কিসের সঙ্গে মিশিয়ে খায়? বকুর বাগানবাড়িতে রাত্রে আলো জ্বলে কেন? বকুলাল কালো, কিন্তু তার ছোট ছেলে ফরসা হ’ল কেন? সাবধান বকুলাল, তুমি শ্রীযুক্ত রামজাদুর সঙ্গে পাল্লা দিতে যেয়ো না, তা হ’লে আরও অনেক কথা ফাঁস ক’রে দেব। বকুবাবুও পালটা জবাব ছাপতে লাগলেন, কিন্তু তত জুতসই হ’ল না, কারণ তাঁর তরফে তেমন জোরালো সাহিত্যিক—গুণ্ডা ছিল না।
বকুবাবু ক্রমে বুঝলেন যে তিনি হটে যাচ্ছেন, ভোটাররা সব বেঁকে দাঁড়াচ্ছে। একদিন তিনি অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে ব’সে আছেন এমন সময় তাঁর মনে পড়ল যে চোদ্দ বৎসর আগে দেবতার দয়ায় তাঁর অদৃষ্ট ফিরে যায়। এবারেও কি তা হবে না? বকুলাল ঠিক করলেন আর একবার তেমনি ক’রে কায়মনোবাক্যে তিনি তেত্রিশ কোটিকে ডাকবেন। শুধু বঙ্গমাতার ওপর নির্ভর করা চলবে না, কারণ তিনি তো আর সত্যিকার দেবতা নন—বঙ্কিম চাটুজ্যের হাতে গড়া। তাঁর কোনও যোগ্যতা নেই, কেবল লোককে খেপিয়ে দিতে পারেন।
রাত্রি দশটার সময় বকুবাবু তাঁর আপিস—ঘরে ঢুকে দরোয়ানকে ব’লে দিলেন যে তাঁর অনেক কাজ, কেউ যেন বিরক্ত না করে। এবার আর শোবার ঘরে নয়, কারণ গিন্নী থাকলে তপস্যার বিঘ্ন হ’তে পারে। বকুলাল ইজিচেয়ারে শুয়ে এই মর্মে একটি প্রার্থনা রুজু করলেন।—’হে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর দুর্গা কালী ইত্যাদি, পূর্বে তোমরা একবার আমার মান রেখেছিলে, আমিও তোমাদের যথাযোগ্য পুজো দিয়েছি। তার পর নানান ধান্দায় আমি ব্যস্ত, তোমাদের তেমন খোঁজখবর নিতে পারি নি—কিছু মনে ক’রো না বাবারা। কিন্তু গিন্নী বরাবরই তোমাদের কলাটা মুলোটা যুগিয়ে আসছেন, সোনা—রুপোও কিছু কিছু দিয়েছেন। ঐ যে তাঁর রুপোর তাম্রকুণ্ড, কোষাকুষি, ঘণ্টা, পঞ্চপ্রদীপ, শালগ্রামের সোনার সিংহাসন, সে তো আমারই টাকায় আর তোমাদেরই জন্যে। আর আমিও দেখ, এখন একটু ফুরসৎ পেয়েই ধম্ম—কম্মে মন দিয়েছি, টিকি রেখেছি, গো—সেবা করছি। এখন আমার এই নিবেদন, রামজাদু ব্যাটাকে ঘায়েল কর। ওকে ভোটে হারাবার কোনও আশা দেখছি না। দোহাই তেত্রিশ কোটি দেবতা, ওটাকে বধ কর। কিন্তু এক্ষুনি নয়, নমিনেশন—পেপার দেবার দুদিন পরে,—নয়তো আর একটা ভূঁইফোড় দাঁড়াবে। কলেরা, বসন্ত, বেরিবেরি, হার্টফেল, গাড়িচাপা যা হয়। আমি আর বেশী কি বলব, তোমরা তো হরেক রকম জান। দাও বাবারা, বজ্জাত ব্যাটার ঘাড় মটকে দাও—রেমোর রক্ত দাও—রক্তং দেহি, রক্তং দেহি।’ …..বকুলালবাবু নিবিষ্ট হয়ে এই রকম সাধনা করছেন, এমন সময়ে সেই ঘরে টুপ ক’রে একটি শব্দ হ’ল।’
নগেনের ঠোঁট নড়িয়া উঠিল। আস্তে আস্তে বলিল—’দ—’
চাটুজ্যে গর্জন করিয়া বলিলেন—’চোপরাও। —বকুবাবুর আপিসের কড়িকাঠে একটি টিকটিকি আটকে ছিল । সে যেমনি হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙবে অমনি খ’সে গিয়ে টুপ করে বকুলালের টেবিলে পড়ল। বকুলাল চমকে উঠে দেখলেন—টেবিলের ওপর একটি টিকটিকি, আর তার নীচেই একখানা পোস্টকার্ড।
পোস্টকার্ডটি পূর্বে নজরে পড়ে নি। এখন বকুবাবু প’ড়ে দেখলেন তাতে লিখেছে—মহাশয়, শুনেছি আপনি ইলেকশনে সুবিধে করে উঠতে পারছেন না। যদি আমার সাহায্য নেন আর উপদেশ—মত চলেন তবে জয় অবশ্যম্ভাবী। কাল সন্ধ্যায় আপনার সঙ্গে দেখা করব। ইতি। শ্রীরামগিধড় শর্মা।
বকুলালবাবু উৎফুল্ল হয়ে বললেন—জয় মা কালী, জয় বাবা তারকনাথ ব্রহ্মা বিষ্ণু পীর পয়গম্বর। এই পোস্টকার্ডখানি তোমাদেরই লীলা, তা আমি বেশ বুঝতে পারছি। কাল তোমাদের ঘটা ক’রে পুজো দেব, নিশ্চিন্ত থাক। তার পর খুব মনে মনে বললেন—যাতে দেবতারাও টের না পান—উঁহু বিশ্বাস নেই, আগে কাজ উদ্ধার হ’ক তখন দেখা যাবে।
সমস্ত রাত, তারপর সমস্ত দিন বকুবাবু ছটফট ক’রে কাটালেন। যথাকালে রামগিধড় শর্মা দেখা দিলেন। ছোট্ট মানুষটি, মেটেমেটে রং, ছুঁচলো মুখ, খাড়া—খাড়া কান। পরনে পাটকিলে রঙের ধুতি—মেরজাই গায়ের রঙের সঙ্গে বেশ মিশ খেয়ে গেছে। কথা কন কখনও হিন্দী, কখনও বাংলা। বকুলাল খুব খাতির করে বললেন—বইঠিয়ে। আপনি আর্যসমাজী? রামগিধড় বললেন—নহি নহি। বকু জিজ্ঞাসা করলেন—মহাবীর দল? প্যাক্টওয়ালা? কৌসিল—তোড়? চরখা—বাজ? রামগিধড় ওসব কিছুই নন, তিনি একজন পলিটিক্যাল পরিব্রাজক। বকুবাবু ভক্তিভরে পায়ের ধুলো নিলেন। রামগিধড় বললেন—বস হুয়া হুয়া।
তার পর কাজের কথা শুরু হ’ল। রামগিধড় জানতে চাইলেন বকুবাবুর রাজনীতিক মতামত কি, তিনি স্বরাজী, না অরাজী, না নিমরাজী, না গররাজী? বকু বললেন, তিনি কোনওটাই নন, তবে দরকার হ’লে সবতাতেই রাজী আছেন। তিনি চান দেশের একটু সেবা করতে, কিন্তু রামজাদু থাকতে তা হবার জো নেই। রামগিধড় বললেন—কোনও চিন্তা নেই, তুমি ব্যাঘ্রপার্টিতে জয়েন কর।
বকুবাবু আঁতকে উঠলেন। রামগিধড় বললেন—আমি অতি গুহ্য কথা প্রকাশ ক’রে বলছি শোন। এই পার্টির সভ্যসংখ্যা একেবারে গোনাগুনতি তিন’শ তেষট্টি। আমি এর সেক্রেটারি। একটিমাত্র ভেকান্সি আছে, তাতে ইচ্ছা করলে তুমি আসতে পার। কাউনসিলের সমস্ত সীট আমরাই দখল করব।
