বিনোদবাবু বলিলেন—’ আচ্ছা চাটুজ্যেমশায়, আপনি বকুবাবুর মনের কথা জানলেন কি ক’রে?’
চাটুজ্যে বলিলেন— ‘সে তোমরা বুঝবে না। কলিকাল, কিন্তু প্রকৃত ব্রাহ্মণ দু—চারটি এখনও আছেন। গরিব বটে, কিন্তু কাশ্যপ গোত্র, পদ্মগর্ভ ঠাকুরের সন্তান। কেদার চাটুজ্যের এই বুড়ো হাড়ে ঋষিদের গুঁড়ো বর্তমান। একটু চেষ্টা করলে লোকের হাঁড়ির খবর জানতে পারি, মনের কথা তো কোন ছার। তার পর বকুলালবাবু ঐ রকম একমনে তপস্যা করতে লাগলেন। তাঁর দু—চোখ বেয়ে ধারা বইতে লাগল, বাহ্যজ্ঞান নেই, কেবল ধনং দেহি। এমন সময় নীচে থেকে একটি আওয়াজ এল—টিংটিং। বকুলাল লাফিয়ে উঠে দেশলাই জ্বাললেন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে উঠোনে আলো ফেলে দেখলেন—’
নগেন রোমাঞ্চিত হইয়া আবার বলিয়া ফেলিল—’দক্ষিণরায়!’
চাটুজ্যেমশায় মুখ খিঁচাইয়া ভেংচাইয়া বলিলেন—দাক্ষিণরায়! তোমার ম্যাথা! গ্যাল্পোটা তুমিই ব্যালো না, আমি আর ব’কে মরি কেন।’
উদয় খুশি হইয়া বলিল— ‘নগেন মামার ঐ মস্ত দোষ, মানুষকে কথা কইতে দেয় না। আমার শালীর পাকাদেখার দিন—’
চাটুজ্যে অস্থির হইয়া বলিলেন—’আরে গ্যালো যা! একজন থামলেন তো আর একজন পোঁ ধরলেন! যা আমি আর বলব না।’
বিনোদবাবু বলিলেন—’আহা কেন তোমরা রসভঙ্গ কর! ব্রাহ্মণকে বলতেই দাও না।’
চাটুজ্যে বলিতে লাগিলেন—’বকুলালবাবু উঠোনে দেখলেন—ব্রহ্মার হাঁস, শিবের ষাঁড়, বিষ্ণুর গড়ুর কেউই নেই, শুধু এক কোণে একটি লাল বাইসাইকেল ঠেসানো রয়েছে। হেঁকে বললেন—কোন হ্যায়? টেলিগ্রাফ পিয়ন সিঁড়ির দরজায় ধাক্কা দিতে গিয়েছিল, এখন সামনে এসে বললে—তার হ্যায়।
কিসের তার? বকুবাবুর বুক দুরদুর ক’রে উঠল। কই, তিনি তো লটারির টিকিট কেনেন নি। তবে কি গিন্নীর কি ছেলেপিলের অসুখ? আজ বিকেলেই তো চিঠি পেয়েছেন সব ভাল। বকুলাল হুড়মুড় করে নেমে এলেন।
তারের খবর— ভুতো হঠাৎ মারা গেছে, পিসীও এখন তখন, শীগগির চলে এস। বকুবাবু ইয়া আল্লা বলে লাফিয়ে উঠলেন, তার পর মানিব্যাগটি পকেট থেকে বার করে পিয়নের হাতে উবুড় ক’রে দিলেন। পিয়ন বেচারা আসবার আগেই জেনে নিয়েছিল যে খারাপ খবর, বকশিস চাওয়া চলবে না। এখন অযাচিত তিন টাকা ছ আনা পেয়ে ভাবলে শোকে বাবুর মাথা বিগড়ে গেছে। সে সই নিয়েই পালাল।
ভুতো তা হলে মরেছে? সত্যিই মরেছে? বা রে ভুতো, বেড়ে ছোকরা! নিশ্চয় মদ খেয়ে লিভার পচিয়েছিল। জাঁকিয়ে শ্রাদ্ধ করতে হবে। বকুবাবু সেই রাত্রেই হুগলী রওনা হলেন।
বকুবাবুর বরাত ফিরে গেল। তবে দশ লাখ নয়, মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। টাকাটা কম হওয়ায় প্রথমটা একটু মন খুঁতখুঁত করেছিল, কিন্তু ক্রমে সয়ে গেল। বাড়ি হ’ল, গাড়ি হ’ল, সব হ’ল। বকুলাল নানারকম কারবার ফাঁদলেন। তারপর যুদ্ধ বাধল, বকুলাল একই মাল পাঁচবার চালান দিতে লাগলেন, ধুলো—মুঠো সোনা—মুঠো হতে লাগল। টাকার আর অবধি নেই, কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বকুর বুদ্ধিটা মোটা হয়ে পড়ল। এই রকমে বছর চোদ্দ কেটে গেল।’….
এই পর্যন্ত বলিয়া চাটুজ্যেমশাই তামাক টানিয়া দম লইতে লাগিলেন। বিনোদবাবু বলিলেন—’কই চাটুজ্যেমশায়, বাঘ কই?’
চাটুজ্যে বলিলেন—’আসবে, আসবে, ব্যস্ত হয়ো না, সময় হলেই আসবে। বকুবাবু যেদিন পঞ্চান্ন বৎসরে পড়লেন, সেই রাত্রে বঙ্গমাতা তাঁকে বললেন— ‘বৎস বকু, বয়স তো ঢের হ’ল, টাকাও বিস্তর জমিয়েছ। কিন্তু দেশের কাজ কি করলে? বকুলাল জবাব দিলেন—মা, আমি অধম সন্তান, বক্তৃতা দেওয়া আসে না, ম্যালেরিয়ার ভয়ে দেশে যেতে পারি না, খদ্দর আমার সয় না—সুখের শরীর—দেশী মিলের ধুতিতেই পেট কেটে যায়। আর—বোমা দূরে থাক,—একটা ভুঁই—পটকা ছোঁড়বার সাহসও আমার নেই। কি কর্তব্য, তুমিই বাতলে দাও। খাটুনির কাজ আর এ বয়সে পেরে উঠব না, সোজা যদি কিছু থাকে তাই ব’লে দাও মা। বঙ্গমাতা বললেন—কাউন্সিলে ঢুকে পড়।
মা তো ব’লে খালাস, কিন্তু ঢোকা যায় কি ক’রে? বকুলাল মহা ফাঁপরে পড়লেন। অনেক ভেবে—চিন্তে একজন মাতব্বর সায়েবকে ধ’রে বললেন—তিন হাজার টাকা ড্রংকেন সেলার্স হোমে দিতে রাজী আছেন যদি গবরমেণ্ট তাঁকে কাউন্সিলে নমিনেট করে। সায়েব বললেন—টাকা তিনি গ্ল্যাডলি নেবেন, কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না, কারণ গবরমেণ্ট যার—তার কাছে ঘুষ নেয় না। বকুবাবু মুখ চুন ক’রে ফিরে এলেন। তার পর একজন রাজনীতিক চাঁইকে বললেন—আমি ইলেকশনে দাঁড়াতে চাই, আমায় দলে ভরতি ক’রে নিন, ক্রীড কি আছে দিন সই করে দিচ্ছি। চাঁইমশাই বললেন—দুত্তোর ক্রীড, আগে লাখ টাকা বার করুন দেখি, আমাদের নিখিল—বঙ্গীয়—সর্পনাশক ফাণ্ডের জন্য—সাপ না মারলে পাড়াগাঁয়ের লোক সাপোর্ট করবে কেন? বকুবাবু বললেন—ছি ছি, দেশের কাজ করব তার জন্যে টাকা? ঘুষ আমি দিই না। ফিরে এসে স্থির করলেন, সব ব্যাটা চোর। খরচ যদি করতেই হয়, তিনি নিজে বুঝে সুঝে করবেন।
কলকাতায় সুবিধে করতে না পেরে বকুবাবু ঠিক করলেন, সাউথ—সুন্দরবন—কনস্টিটুয়েন্সি থেকে দাঁড়াবেন। সেখানে সম্প্রতি কিছু জমিদারি কিনেছিলেন, সেজন্য ভোট আদায় করা সোজা হবে। ইলেকশনের দু—তিন মাস আগে থেকেই তিনি উঠে—পড়ে লেগে গেলেন।
তারপর হঠাৎ একদিন খবর এল যে বকুলালের পুরনো শত্রু রামজাদুবাবু রাতারাতি খদ্দরের সুট বানিয়ে বক্তৃতা দিতে শুরু করেছেন। তিনিও ঐ সোঁদরবন থেকে দাঁড়াবেন। বকুবাবুর দ্বিগুণ রোখ চেপে গেল—তিনি টেরিটিবাজার থেকে একটি তিন নম্বরের টিকি কিনে ফেললেন, দেউড়িতে গোটা—দুই ষাঁড় বাঁধলেন, আর বাড়ির রেলিং এর ওপর ঘুঁটে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন।
