বিনোদ। কী রকম?
চাটুজ্যে। বুদ্ধির দোষে বেচারা সব নষ্ট করলে—অমন মান, অমন ঐশ্বর্য। বাবার কৃপা হয়েছিল, কিন্তু শেষটায় বকুর মতিচ্ছন্ন হ’ল।
বিনোদ। কোন বাবা?
চাটুজ্যে। বাবা দক্ষিণরায়।
উদয় বলিল—’আমার এক পিসশ্বশুরের নাম দক্ষিণামোহন রায়।’
চাটুজ্যে। উদো, তুই হাসালি, হাসালি। পিসশ্বশুর নয় রে উদো—দেবতা, কাঁচা—খেকো দেবতা, বাঘের দেবতা।
চাটুজ্যে হাতজোড় করিয়া তিনবার কপালে ঠেকাইলেন। তারপর সুর করিয়া কহিতে লাগিলেন—
‘নমামি দক্ষিণরায় সোঁদরবনে বাস,
হোগলা উলুর ঝোপে থাকেন বারোমাস।
দক্ষিণেতে কাকদ্বীপ শাহাবাজপুর,
উত্তরেতে ভাগীরথী বহে যত দূর,
পশ্চিমে ঘাটাল পুবে বাকলা পরগণা—
এই সীমানার মাঝে প্রভু দেন হানা।
গোবাঘা শার্দুল চিতে লক্কড় হুড়ার,
গেছো—বাঘ কেলে—বাঘ বেলে—বাঘ আর।
ডোরা কাটা ফোঁটা—কাটা বাঘ নানা জাতি—
তিন শ তেষট্টি ঘর প্রভুর যে জ্ঞাতি।
প্রতি অমাবস্যা হয় প্রভুর পুণ্যাহ,
যত প্রজা ভেট দেয় মহিষ বরাহ।
ধুমধাম নৃত্য গীত হয় সারানিশি,
গাঁক গাঁক হাঁক ডাকে কাঁপে দশদিশি।
কলাবৎ ছয় বাঘ ছত্রিশ বাঘিনী,
ভাঁজেন তেঅটতালে হালুম্ব রাগিণী।
ডেলা ডেলা পেলা দেন শ্রীদক্ষিণ রায়,
হরষিত হঞা সবে কামড়িয়া খায়।
প্রভুর সেবায় হয় জীবহিংসা নিত্য,
পহরে পহরে তাঁর জ্ব’লে উঠে পিত্ত।
বড় বড় জন্তু প্রভু খান অতি জলদি,
হিংসার কারণে তাঁর বর্ণ হৈল হলদি।
ছাগল শুয়ার গরু হিন্দু মুছলমান ,
প্রভুর উদরে যাঞা সকলে সমান।
পরম পন্ডিত তেঁহ ভেদজ্ঞান নাঞি,
সকল জীবের প্রতি প্রভুর যে খাঁঞি।
দোহাই দক্ষিণরায় এই কর বাপা—
অন্তিমে না পাঞি যেন চরণের থাপা।’
বিনোদ বলিলেন—’ও পাঁচালি কোত্থেকে পেলেন?’
চাটুজ্যে। রায়মঙ্গল। আমার একটা পুঁথি আছে, তিন শ বছরের পুরনো। সেটা নেবার জন্যে চিমেশ মিত্তির ঝুলোঝুলি। ছোকরা তার উপর প্রবন্ধ লিখে ইউনিভার্সিটি থেকে ডাক্তার উপাধি পেতে চায়। দেড় শ অবধি দিতে চেয়েছিল, আমি রাজী হইনি। প্রবন্ধ লিখতে হয় আমিই লিখব। নাড়ীজ্ঞান আছে, ডাক্তার হতে পারলে বুড়ো বয়সের একটা সম্বল হবে।
বিনোদ। যাক তার পর?
চাটুজ্যে। বকুলালবাবুর কথা বলছিলাম। পনর বৎসর পূর্বে তাঁর অবস্থা ভাল ছিল না। পরিবার দেশে থাকত, তিনি কলকাতার একটা মেসে থেকে রামজাদু অ্যাটর্নির আপিসে আশি টাকা মাইনের চাকরি করতেন। রামজাদুবাবু তাঁর ক্লাস—ফ্রেণ্ড, সেই সূত্রে চাকরি। এখন বকুবাবুর একটু হাতটান ছিল। বিপক্ষের ঘুষ খেয়ে একটা সমন ধরাতে দেরি করিয়ে দেন। রামজাদুবাবু কড়া লোক, ছেলেবেলার বন্ধু বলে রেয়াত করলেন না। ব্যাপার জানতে পেরে বকুলালকে যাচ্ছেতাই অপমান করলেন। বকুবাবুও তেরিয়া হয়ে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বাসায় চলে এলেন। মন খারাপ, মেসের বামুনকে বললেন রাত্রে কিচ্ছু খাবেন না। তার পর হেদোর ধারে গেলেন মাথা ঠাণ্ডা করতে। রাগের মাথায় চাকরি ছাড়লেন, কিন্তু সংসার চলে কিসে? পুঁজি তো সামান্য। রামজাদুর উপর প্রচণ্ড আক্রোশ হ’ল। আরে উকিলবাড়ি অমন একটু—আধটু উপরি অনেকে নিয়ে থাকে, তা বলে কি পুরনো বন্ধুকে অপমান করতে হয়? আচ্ছা, এর শোধ একদিন বকুলাল নেবেনই।
রাত নটায় মেসে ফিরে এলেন। মেস খাঁ খাঁ, সেদিন শনিবার সব মেম্বার থিয়েটার দেখতে গেছে। বকুলাল নিঃশব্দে বাসায় ঢুকে দেখতে পেলেন রান্নাঘরের ভেতর—
নগেন বলিল—’দক্ষিণরায়?’
চাটুজ্যে বলিলেন—’রান্নাঘরের ভেতর মেসের ঝি বকুবাবুর পশমী আসনে—যেটা তাঁর গিন্নী বুনে দিয়েছিলেন—তাইতে বসে তাঁরই থালায় লুচি খাচ্ছে, মেসের ঠাকুর তাকে বাতাস করছে। ঝি আধ হাত জিব কেটে দেড় হাত ঘোমটা টানলে। অন্য দিন হ’লে বকুবাবু কুরুক্ষেত্র বাধাতেন, কিন্তু আজ দেখেও দেখলেন না। চুপটি ক’রে ওপরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
তার পর অগাধ চিন্তা। কি করা যায়? কোত্থেকে টাকা আসবে? তাঁর এক বিধবা পিসী হুগলীতে থাকেন, বিপুল সম্পত্তি, ওয়ারিশ একটিমাত্র ছেলে ভুতো। ভুতোছোঁড়া অতি হতভাগা, অল্প বয়সেই অধঃপাতে গেছে। কিন্তু পিসী তাকে নিয়েই ব্যস্ত, অমন উপযুক্ত ভাইপো বকুলালের দিকে ফিরেও তাকান না। বুড়ীর কাছে কোনও প্রত্যাশা নেই।
বকুলাল ভাবলেন, ভগবানের কি বিচার! লক্ষ্মীছাড়া ভুতো হ’ল দশ লাখের মালিক, আর তারই মামাতো ভাই বকুর অদ্যভক্ষ—ধনুর্গুণ। তাঁর ক্লাসফ্রেণ্ড—ঐ বজ্জাত রামজাদুটা—মক্কেল ঠকিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা উপায় করছে, আর তিনি একটি সামান্য চাকরির জন্য লালায়িত। দুত্তোর ভগবান।
কিন্তু বকুলাল তাঁর এক ভক্ত বন্ধুর কাছে শুনেছিলেন, ভগবানকে যদি একমনে ভক্তিভরে ডাকা যায় তা হ’লে তিনি ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। আচ্ছা, তাই একবার ক’রে দেখলে হয় না? যে কথা সেই কাজ। বকুলাল তড়াক করে উঠে পড়লেন, স্টোভ জ্বালালেন, চা ক’রে তিন পেয়ালা খেলেন। আজ তিনি ভররাত ভগবানকে ডাকবেন।
বকুলাল আলো নিবিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে তপস্যা শুরু করলেন।— ‘হে ভক্তবৎসল হরি! হে ব্রহ্মা, হে মহাদেব, দয়া কর। সেকালে তোমরা ভক্তের আবদার শুনতে, আজ কেন এই গরিবের প্রতি বিমুখ হবে? হে দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী, তোমাদের যে কেউ ইচ্ছে করলে আমার একটা হিল্লে লাগিয়ে দিতে পার। বর দাও—বর দাও—বেশী নয়, মাত্র এক লাখ। উঁহু, এক লাখে কিছুই হবে না,—গিন্নীই গয়না গড়িয়ে অর্ধেক সাবাড় করবেন। রামজেদোটার কিছু কম হবে তো দশ লাখ আছে। আমার অন্তত পাঁচ লাখ চাই—না, না, দশ লাখ। দোহাই দেবতারা, তোমাদের কাছে এক লাখও যা দশ লাখও তাই, তাতে এই বিশ্বসংসারের কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। অনেককে তো কোটি কোটি দিয়ে থাক, আমায় না হয় মাত্র দশ লাখ দিলে। লাখ টাকায় একটা বাড়ি, হাজার—পঞ্চাশ যাবে ফার্নিচার করতে, তারপর আরও পঞ্চাশ হাজার যাবে এটা—সেটায়। এই ধর একটা ভাল মোটরকার। উঁহু একটায় হবে না, গিন্নীই সেটা আঁকড়ে ধরে থাকবেন, হরদম থিয়েটার আর গঙ্গাস্নান। আচ্ছা তাঁর জন্যে না হয় একটা ফোর্ড গাড়ি মোতায়েন করে দেওয়া যাবে,—সেকেন্ডহ্যাণ্ড ফোর্ড, —মেয়েছেলের বেশী বাড় ভাল নয়। আর ঐ রামজাদুটা—রাসকেলকে কেউ যদি বেঁধে নিয়ে আসে তো ফুটপাথের ওপর তার হামদো মুখখানা ঘষি। ঘষি আর দেখি, যতক্ষণ না চোখ মুখ খয়ে গিয়ে তেলপানা হয়ে যায়। হে বুদ্ধদেব, যিশুখ্রীষ্ট, শ্রীচৈতন্য, আজকের মতন তোমরা আমায় মাপ কর, তোমরা এসব পছন্দ কর না তা জানি। দোহাই বাবাসকল, আজ আমার এই তপস্যায় তোমরা বাগড়া দিও না, এরপর তোমাদের একদিন খুশী করে দেব। হে নারায়ণ, হে দর্পহারী কৃষ্ণ, হে পয়গম্বর, হে ব্রাহ্মের ব্রহ্ম, ইহুদীর যেহোভা, পার্সীর অহুর, দেব দৈত্য যক্ষ রক্ষ, শয়তান—অ্যাঁ! রামো রামো। তা শয়তানেই বা আপত্তি কি, না হয় শেষটায় নরকে যাব। যাক, অত বাছলে চলে না। হে তেত্রিশ কোটির যে কেউ দয়া কর—দয়া কর। আমি একান্তঃকরণে ভক্তিভরে ডাকছি—ধনং দেহি, ধনং দেহি।’
