যুধিষ্ঠির পরম অবজ্ঞাভরে বললেন, ‘হলধর, তুমি মহাবীর, কিন্তু শাস্ত্র কিছুই জান না। ভগবান মনু কি বলেছেন শোন—
অপ্রাণিভির্ষৎ ক্রিয়তে তল্লোকে দ্যূতমুচ্যতে।
প্রাণিভিঃ ক্রিয়তে যস্তু স বিজ্ঞেয়ঃ সমাহ্বয়ঃ।।
অর্থাৎ অপ্রাণী নিয়ে যে খেলা তাকেই লোকে দ্যূত বলে, আর প্রাণী নিয়ে খেলার নাম সমাহ্বয়। কুরুরাজ আমাকে অপ্রাণিক দ্যূতেই আমন্ত্রণ করেছেন, কিন্তু দুর্দৈববশে আমাদের অক্ষ থেকে প্রাণী বেরিয়েছে। অতএব এই দ্যূত অসিদ্ধ।’
কর্ণ করতালি দিয়ে বললেন, ‘ধর্মরাজ, তুমি সার্থকনামা।’
বলরাম বললেন, ‘ধর্মরাজের শাস্ত্রজ্ঞান অগাধ, যদিও কাণ্ডজ্ঞানের কিঞ্চিৎ অভাব দেখা যায়। মেনে নিচ্ছি এই দ্যূত অসিদ্ধ। সেক্ষেত্রে পূর্বের দ্যূতও অসিদ্ধ, শকুনি তাতেও ঘুর্ঘুরগর্ভ অক্ষ নিয়ে খেলেছিলেন। কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র, আপনার শ্যালকের অশাস্ত্রীয় আচরণের জন্য পাণ্ডবগণ বৃথা ত্রয়োদশ বর্ষ নির্বাসন ভোগ করেছেন। এখন তাঁদের পিতৃরাজ্য ফিরিয়ে দিন, নতুবা পরকালে আপনার নরকভোগ অবশ্যম্ভাবী।’
যুধিষ্ঠির উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘আমি কোনও কথা শুনতে চাই না, দ্যূতপ্রসঙ্গে আমার ঘৃণা ধরে গেছে। আমরা যুদ্ধ করেই হৃতরাজ্য উদ্ধার করব। জ্যেষ্ঠতাত, প্রণাম, আমরা চললাম।’
তখন পাণ্ডবগণ মহা উৎসাহে বার বার সিংহনাদ করতে করতে নিজ শিবিরে যাত্রা করলেন। কৃষ্ণ বলরামও তাঁদের সঙ্গে গেলেন।
ফিরে এসেই যুধিষ্ঠির বললেন, ‘আমার প্রথম কর্তব্য মৎকুনিকে মুক্তি দেওয়া। এই হতভাগ্য মূর্খের সমস্ত উদ্যম ব্যর্থ হয়েছে। চল, তাকে আমরা প্রবোধ দিয়ে আসি।’
একুট আগেই পাণ্ডবশিবিরে সংবাদ এসে গেছে দ্যূতসভায় কি একটা প্রচণ্ড গোলযোগ হয়েছে। যুধিষ্ঠিরাদি যখন কারাগৃহে এলেন তখন দুই প্রহরী তর্ক করছিল—মৎকুনির মুণ্ডচ্ছেদ করা উচিত, না শুধু নাসাচ্ছেদেই আপাতত কর্তব্য পালন হবে।
যুধিষ্ঠিরের মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে মৎকুনি মাথা চাপড়ে বললেন, ‘হা, দৈবই দেখছি সর্বত্র প্রবল। আমি গোধিকাকে বেশী খাইয়ে তার দেহে অত্যধিক বলাধান করেছি, তাই সে কৃতঘ্ন জীবন লম্ফঝম্ফ ক’রে আমার সর্বনাশ করেছে। বলদেব তবু সামলে নিয়েছিলেন, কিন্তু ধর্মরাজ শেষটায় শাস্ত্র আউড়ে সব মাটি করে দিলেন। মুক্তি পেয়ে আমার লাভ কি, দুর্যোধন আমাকে নিশ্চয় হত্যা করবে।’
বলরাম বললেন, ‘মৎকুনি, তোমার কোনও চিন্তা নেই, আমার সঙ্গে দ্বারকায় চল। সেখানে অহিংস সাধুগণের একটি আশ্রম আছে, তাতে অসংখ্য উৎকুণ—মৎকুন—মশক—মুষিকাদির নিত্য সেবা হয়। তোমাকে তার অধ্যক্ষ করে দেব, তুমি নব নব গবেষণায় সুখে কালযাপন করতে পারবে।’
১৩৫০ (১৯৪৩)
দক্ষিণরায়
চাটুজ্যেমশায় বলিলেন—’বাঘের কথা যদি বল, তো রুদ্রপ্রয়াগের বাঘ। ইয়া কেঁদো কেঁদো। সোঁদরবন থেকে সেখানে গ্রীষ্মকালে হাওয়া বদলাতে যায়। কিন্তু এমনি স্থানমাহাত্ম্য যে কাউকে কিছু বলে না, সব তীর্থযাত্রী কিনা। কেবল সায়েব ধ’রে ধ’রে খায়।’
বিনোদ উকিল বলিলেন—’খাসা বাঘ তো। এখানে গোটাকতক আনা যায় না? চটপট স্বরাজ হয়ে যেত,—স্বদেশী, বোমা, চরকা, কাউন্সিল—ভাঙা কিছুই দরকার হ’ত না।’
সন্ধ্যাবেলা বংশলোচনবাবুর বৈঠকখানায় গল্প চলিতেছিল। তিনি নিবিষ্ট হইয়া একটি ইংরেজী বই পড়িতেছেন—How to be happy though married। তাঁর শালা নগেন এবং ভাগনে উদয়, এরাও আছে।
চাটুজ্যে হুঁকায় একমিনিটব্যাপী একটি টান মারিয়া বলিলেন—’তুমি কি মনে কর সে চেষ্টা হয় নি?’
—’হয়েছিল নাকি? কই, রাউলাট—রিপোর্টে তো সে কথা কিছু লেখেনি।’
—’ভারী এক রিপোর্ট পড়েছ। আরে গবরমেণ্ট কি সবজান্তা? There are more things…কি বলে গিয়ে।’
—’ব্যাপারটা কি হয়েছিল খুলেই বলুন না।’
চাটুজ্যে ক্ষণকাল গম্ভীর থাকিয়া বলিলেন—’হুঁ।’
নগেন বলিল—’বলুন না চাটুজ্যেমশায়।’
চাটুজ্যে উঠিয়া দরজা ও জানালায় উঁকি মারিয়া দেখিলেন। তারপর যথাস্থানে আসিয়া পুনরায় বলিলেন—’হুঁ।’
বিনোদ। দেখছিলেন কি?
চাটুজ্যে। দেখছিলুম হরেন ঘোষালটা আবার হঠাৎ এসে না পড়ে। পুলিশের গোয়েন্দা, আগে থেকে সাবধান হওয়া ভাল।
বংশলোচন বই রাখিয়া কহিলেন—’ওসব ব্যাপার নাই বা আলোচনা করলেন। হাকিমের বাড়ি ওরকম গল্প না হওয়াই ভাল।’
চাটুজ্যে বলিলেন—’ঠিক কথা। আর, ব্যাপারটাও বড় অলৌকিক, শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। নাঃ, যাক ও কথা। তারপর, উদো, তোর বউ বাপের বাড়ি থেকে ফিরছে কবে?’
বিনোদ উদয়কে বাধা দিয়া বলিলেন—’ব্যাপারটা শুনতেই বা দোষ কি। চলুন আমার বাসায়, সেখানে হাকিম নেই।’
বংশলোচন বলিলেন, ‘আরে না না।’ এখানেই হ’ক। তবে চাটুজ্যেমশায়, বেশী সিডিশস কথাগুলো বাদ দিয়ে বলবেন।’
চাটুজ্যেমশায় বলিলেন—’মা ভৈঃ। আমি খুব বাদসাদ দিয়েই বলছি—বেশীদিনের কথা নয়, বকু দত্তর নাম শুনেছ বোধ হয়, আমাদের মজিলপুরের চরণ ঘোষের মেসো—’
বিনোদ। বকুলাল দত্ত? কপালীটোলায় যার মস্ত বাড়ি ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট ভাঙছে? তিনি তো মারা গেছেন, শুনেছি কাউন্সিলে ঢুকতে পারেন নি ব’লে মনের দুঃখে।
চাটুজ্যে। ছাই শুনেছ। বকুবাবু আছেন, তবে এখন চেনা দুষ্কর। এক আনা খরচ করলেই দেখে আসতে পার, কেবল রবিবার বিকেলে এক টাকা।
