মহা সমারোহে দ্যূতসভা বসেছে। ধৃতরাষ্ট্র স্থির থাকতে পারেন নি, হস্তিনাপুর থেকে দুদিনের জন্য কৌরবশিবিরে এসেছেন, খেলার ফলাফল দেখে ফিরে যাবেন। শকুনির দক্ষতায় তাঁর অগাধ বিশ্বাস, কুরুপক্ষের জয় সম্বন্ধে তাঁর কিছু মাত্র সন্দেহ নেই।
সভায় কৃষ্ণবলরাম, পঞ্চপাণ্ডব, দুর্যোধনাদি সহ ধৃতরাষ্ট্র, শকুনি, দ্রোণ, কর্ণ প্রভৃতি সকলে উপস্থিত হ’লে পিতামহ ভীষ্ম বললেন, ‘আমি এই দ্যূতসভার সম্যক নিন্দা করি। কিন্তু আমি কুরুরাজের ভৃত্য, সেজন্য অত্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই গর্হিত ব্যাপার দেখতে হবে।’
দ্রোণাচার্য বললেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে একমত।’
ভীষ্ম বললেন, ‘মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, এই সভায় দ্যূতনীতিবিরুদ্ধ কোনও কর্ম যাতে না হয় তার বিধান তোমার কর্তব্য। আমি প্রস্তাব করছি শ্রীকৃষ্ণকে সভাপতি নিযুক্ত করা হ’ক।’
দুর্যোধন আপত্তি তুললেন, ‘শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবপক্ষপাতী।’
কৃষ্ণ বললেন, ‘কথাটা মিথ্যা নয়। আর, আমার অগ্রজ উপস্থিত থাকতে আমি সভাপতি হ’তে পারি না।’
তখন ধৃতরাষ্ট্র সর্বসম্মতিক্রমে বলরামকে সভাপতি পদে বরণ করলেন।
বলরাম বললেন, ‘বিলম্বে প্রয়োজন কি, খেলা আরম্ভ হ’ক। হে সমবেত সুধীবৃন্দ, এই দ্যূতে কুরুপক্ষে শকুনি পান্ডবপক্ষে যুধিষ্ঠির নিজ নিজ একটিমাত্র অক্ষ নিয়ে খেলবেন। প্রত্যেকে তিনবার মাত্র অক্ষপাত করবেন। যাঁর বিন্দুসমষ্টি অধিক হবে তাঁরই জয়। এই দ্যূতের পণ সমগ্র কুরুপাণ্ডব রাজ্য। পরাজিত পক্ষ বিজয়ীকে রাজ্য সমর্পণ ক’রে এবং যুদ্ধের বাসনা পরিহার ক’রে সদলে চিরবনবাসী হবেন। সুবলনন্দন শকুনি, আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ, আপনিই প্রথম অক্ষপাত করুন।’
শকুনি সহাস্যে অক্ষ নিক্ষেপ ক’রে বললেন, ‘এই জিতলাম।’ তাঁর পাশাটি পতনমাত্র একটু গড়িয়ে গিয়ে স্থির হ’লে তাতে ছয় বিন্দু দেখা গেল। কর্ণ এবং দুর্যোধনাদি সোল্লাসে উচ্চৈচঃস্বরে বললেন, ‘আমাদের জয়।’
বলরাম বললেন, ‘যুধিষ্ঠির, এইবার আপনি ফেলুন।’
যুধিষ্ঠিরের পাশা একবার ওলটাবার পর স্থির হ’লে তাতেও ছয় বিন্দু উঠল। পাণ্ডবরা বললেন, ‘ধর্মরাজের জয়।’
বলরাম বললেন, ‘তোমরা অনর্থক চিৎকার করছ। কারও জয় হয় নি, দুই পক্ষই এখন পর্যন্ত সমান।’
শকুনি গম্ভীরবদনে বললেন, ‘এখনও দুই ক্ষেপ বাকী, তাতেই জিতব।’
দ্বিতীয়বারে শকুনি পাশা আর গড়াল না, পড়েই স্থির হ’ল। পৃষ্ঠে পাঁচ বিন্দু। যুধিষ্ঠিরের পাশায় পূর্ববৎ ছয় বিন্দু উঠল। শকুনি লক্ষ্য করলেন তাঁর পাশাটি কাঁপছে।
পাণ্ডবপক্ষ আনন্দে গর্জন ক’রে উঠলেন। বলরাম ধমক দিয়ে বললেন, ‘খবরদার, ফের চিৎকার করলেই সভা থেকে বার ক’রে দেব।’
সভা স্তব্ধ। শেষ অক্ষপাত দেখবার জন্য সকলেই শ্বাসরোধ ক’রে উদগ্রীব হয়ে রইলেন!
শকুনি পাংশুমুখে তৃতীয়বার পাশা ফেললেন। পাশাটি কর্দম—পিণ্ডবৎ ধপ ক’রে পড়ল। এক বিন্দু।
যুধিষ্ঠিরের পাশায় আবার ছয় বিন্দু উঠল। বলরাম মেঘমন্দ্র স্বরে ঘোষণা করলেন, ‘যুধিষ্ঠিরের জয়।’
তখন সভাস্থ সকলে সবিস্ময়ে দেখলেন, যুধিষ্ঠিরের পতিত পাশা ধীরে ধীরে লাফিয়ে শকুনির পাশার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সভায় তুমুল কোলাহল উঠল, মায়া মায়া, কুহক, ইন্দ্রজাল!
দুর্যোধন হাত পা ছুড়ে বললেন, ‘যুধিষ্ঠির নিকৃতি আশ্রয় করেছেন, তাঁর জয় আমরা মানি না। সাধু ব্যক্তির পাশা কখনও চ’লে বেড়ায়?’
বলরাম বললেন, ‘আমি দুই অক্ষই পরীক্ষা করব।’
যুধিষ্ঠির তখনই তাঁর পাশা তুলে নিয়ে বলরামকে দিলেন। শকুনি নিজের পাশাটি মুষ্টিবদ্ধ ক’রে বললেন, ‘আমার অক্ষ কাকেও স্পর্শ করতে দেব না।’
বলরাম বললেন, ‘আমি এই সভার অধ্যক্ষ, আমার আজ্ঞা অবশ্যপাল্য।’
শকুনি উত্তর দিলেন, ‘আমি তোমার আজ্ঞাবহ নই।’
বলরাম কিঞ্চিৎ মত্ত অবস্থায় ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে শকুনির গালে একটি চড় মেরে পাশা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘হে সভ্যমণ্ডলী, আমি এই দুই অক্ষই ভেঙে দেখব ভিতরে কি আছে।’ এই বলে তিনি শিলাবেদীর উপরে একে একে দুটি পাশা আছড়ে ফেললেন।
শকুনির পাশা থেকে একটি ঘুরঘুরে পোকা বার হ’য়ে নির্জীববৎ ধীরে ধীরে দাড়া নাড়তে লাগল। যুধিষ্ঠিরের পাশা থেকে একটি ছোট টিকটিকি বেরিয়ে তখন পোকাটিকে আক্রমণ করলে।
বাত্যাহত সাগরের ন্যায় সভা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। ধৃতরাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কি হয়েছে?’
বলরাম উত্তর দিলেন, ‘বিশেষ কিছু হয় নি, একটি ঘুর্ঘুর কীট শকুনির অক্ষে ছিল—’
ধৃতরাষ্ট্র সভয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কামড়ে দিয়েছে? কি ভয়ানক!’
‘কামড়ায় নি মহারাজ, শকুনির অক্ষের মধ্যে ছিল। এই কীট অতি অবাধ্য, কিছুতেই কাত বা চিত হ’তে চায় না, অক্ষের ভিতর পুরে রাখলে অক্ষ সমেত উবুড় হয়। যুধিষ্ঠিরের অক্ষ থেকে একটি গোধিকা বেরিয়েছে। এই প্রাণী আরও দুর্ধর্ষ, স্বয়ং ব্রহ্মা একে কাত করতে পারেন না। গোধিকার গন্ধ পেয়ে ঘুর্ঘুর ভয়ে অবসন্ন হয়েছিল, তাই শকুনি অভীষ্ট ফল পান নি।’
ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার জয় হ’ল?’
বলরাম বললেন, ‘যুধিষ্ঠিরের। দুই পক্ষই কূট পাশক নিয়ে খেলেছেন, অতএব কপটতার আপত্তি চলে না। শুনেছি শকুনি অতি চতুর, কিন্তু এখন দেখছি যুধিষ্ঠির চতুরতর।’
যুধিষ্ঠির তখন জনান্তিকে বলরামকে মৎকুনির বৃত্তান্ত জানালেন। বলরাম তাঁকে বললেন, ‘ধর্মরাজ, আপনার কুণ্ঠার কিছুমাত্র কারণ নেই, কূট পাশকের ব্যবহার দ্যূতবিধিসম্মত।’
