মৎকুনি তাঁর কটিলগ্ন থলি থেকে একটি গজদন্তনির্মিত অক্ষ বার করলেন। যুধিষ্ঠির লক্ষ্য করলেন, অক্ষটি শকুনির অক্ষেরই অনুরূপ, তেমনিই সুগঠিত সুমসৃণ, ধার এবং পৃষ্ঠগুলি ঈষৎ গোলাকার, প্রতি বিন্দুর কেন্দ্রে একটি সূক্ষ্ম ছিদ্র।
মৎকুনি বললেন, ‘মহারাজ, তিনবার ক্ষেপণ ক’রে দেখুন।’
যুধিষ্ঠির তাই করলেন, তিনবারই ছয় বিন্দু উঠল। তিনি আশ্চর্য হয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলেন, কিন্তু মৎকুনি ঝটিতি কেড়ে নিয়ে থলির ভিতর রেখে বললেন, ‘এই মন্ত্রপূত অক্ষ অনর্থক নাড়াচাড়া নিষিদ্ধ, তাতে গুণহানি হয়।’
যুধিষ্ঠির বললেন, ‘আপনার অক্ষটি নির্ভরযোগ্য বটে। কিন্তু এর পর আপনি যে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না তার জন্য দায়ী কে?’
‘দায়ী আমার মুণ্ড। আপনি এখন থেকে আমাকে বন্দী ক’রে রাখুন, দুজন খড়গপাণি প্রহরী নিরন্তর আমার সঙ্গে থাকুক। তাদের আদেশ দিন—যদি আপনার পরাজয়ের সংবাদ আসে তবে তখনই মুণ্ডুচ্ছেদ করবে। মহারাজ, এখন আপনার বিশ্বাস হয়েছে?’
‘হয়েছে। কিন্তু শকুনির কূট পাশক যদি আমার কূটতর পাশকের দ্বারা পরাভূত হয় তবে তা ধর্মবিরুদ্ধ কপট দ্যূত হবে।’
‘হায় হায় মহারাজ, এখনও আপনার কপটতার আতঙ্ক গেল না! আপনারা দুজনেই তো যন্ত্রগর্ভ কূট পাশক নিয়ে খেলবেন, এতে কপটতা কোথায়? মল্লযুদ্ধে যদি আপনার বাহুবল বিপক্ষের চেয়ে বেশী হয় তবে সেকি কপটতা? যদি আপনার কৌশল বেশী থাকে সে কি কপটতা? শকুনির পাশাতে যে কূট কৌশল নিহিত আছে তা আমারই, আপনার পাশাতে যে কূটতর কৌশল আছে তাও আমার। ধর্মরাজ, এই তৃতীয়দ্যূতসভায় বস্তুত আমিই উভয় পক্ষ, আপনি আর শকুনি নিমিত্তমাত্র।’
যুধিষ্ঠির বললেন, ‘মৎকুনি, আপনার বক্তৃতা শুনে আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। ধর্মের গতি অতি সূক্ষ্ম, আমি কঠিন সমস্যায় পড়েছি। এক দিকে লোকক্ষয়কর নৃশংস যুদ্ধ, অন্য দিকে কূট দ্যূতক্রীড়া। দুইই আমার অবাঞ্ছিত, কিন্তু যুদ্ধে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা যেমন রাজধর্মবিরুদ্ধ, সেইরূপ জ্যেষ্ঠতাতের আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করাও আমার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। আপনার মন্ত্রণা আমি অগত্যা মেনে নিচ্ছি, আজই কুরুরাজের কাছে দূত পাঠাব। আপনি এখন থেকে সশস্ত্র প্রহরী দ্বারা রক্ষিত হয়ে গুপ্তগৃহে বাস করবেন, কুরুপাণ্ডব কেউ আপনার খবর জানবেন না। যদি জয়ী হই, আপনি গান্ধাররাজ্য পাবেন। যদি পরাজিত হই তবে আপনার মৃত্যু। এখন আপনার পাশকটি আমাকে দিন।’
‘মহারাজ, আপনার কাছে পাশক থাকলে পরিচর্যার অভাবে তার গুণ নষ্ট হবে। আমার কাছেই থাকুক, আমি তাতে নিয়ত মন্ত্রাধান করব এবং দূতযাত্রার পূর্বে আপনাকে দেব। ইচ্ছা করেন তো আপনি প্রত্যহ একবার আমার কাছে এসে খেলে দেখতে পারেন।’
যুধিষ্ঠির বললেন, ‘মৎকুনি, আপনার অতি তুচ্ছ জীবন আমার হাতে, কিন্তু আমার বুদ্ধি রাজ্য ধর্ম সমস্তই আপনার হাতে। আপনার বশবর্তী হওয়া ভিন্ন আমার এখন অন্য গতি নেই।’
পরদিন যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতৃবৃন্দকে আসন্ন দ্যূতের কথা জানালেন। ধর্মরাজের এই বুদ্ধিভ্রংশের সংবাদে সকলেই কিয়ৎক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকবার পর তাঁকে যেসব কথা বললেন তার বিবরণ অনাবশ্যক। যুধিষ্ঠির নিশ্চল হয়ে সমস্ত গঞ্জনা নীরবে শুনলেন, অবশেষে বললেন, ‘ভ্রাতৃগণ, আমি তোমাদের জ্যেষ্ঠ, আমাকে তোমরা রাজা ব’লে থাক। অপরের বুদ্ধি না নিয়েও রাজা নিজের কর্তব্য স্থির করতে পারেন। যুদ্ধে অসংখ্য নরহত্যার চেয়ে দ্যূতসভায় ভাগ্যনির্ণয় আমি শ্রেয় মনে করি। জয় সম্বন্ধে আমি কেন নিঃসন্দেহ তার কারণ আমি এখন প্রকাশ করতে পারব না। যদি তোমরা আমার উপর নির্ভর করতে না পার তো স্পষ্ট বল, আমি কুরুরাজকে সংবাদ পাঠাব—হে জ্যেষ্ঠতাত, আমি ভ্রাতৃগণ কর্তৃক পরিত্যক্ত, তারা আমাকে পাণ্ডবপতি বলে মানে না, দ্যূতসভায় রাজ্যপণের অধিকার আমার আর নেই, আমার অঙ্গীকার—ভঙ্গের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ অগ্নিপ্রবেশে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছি আপনি যথাকর্তব্য করবেন।’
তখন অর্জুন অগ্রজের পাদস্পর্শ ক’রে বললেন, ‘পাণ্ডবপতি, আপনি প্রসন্ন হ’ন, আমাদের কটুক্তি মার্জনা করুন, আমাকে সর্ববিষয়ে আপনার অনুগত ব’লে জানবেন।’
তারপর ভীম নকুল সহদেবও যুধিষ্ঠিরের ক্ষমা ভিক্ষা করলেন। যুধিষ্ঠির সকলকে আশীর্বাদ করে তাঁর গৃহে চলে গেলেন।
দ্রৌপদী এতক্ষণ কোনও কথা বলেন নি। যে মানুষ এমন নির্লজ্জ যে দু—দু বার হেরে গিয়ে চূড়ান্ত দুঃখভোগের পরেও আবার জুয়ো খেলতে চায় তাকে ভর্ৎসনা করা বৃথা। যুধিষ্ঠির চ’লে গেলে দ্রৌপদী সহদেবের দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টিপাত ক’রে বললেন, ‘ছোট আর্যপুত্র, হাঁ ক’রে দেখছ কি? ওঠ, এখনই দ্রুতগামী চতুরশ্বযোজিত রথে দ্বারকায় যাত্রা কর, বাসুদেবকে সব কথা ব’লে এখনই তাঁকে নিয়ে এস। তিনিই একমাত্র ভরসা, তোমরা পাঁচ ভাই তো পাঁচটি অপদার্থ জড়পিণ্ড।’
দশ দিনের মধ্যে কৃষ্ণকে নিয়ে সহদেব পাণ্ডবশিবিরে ফিরে এলেন। রথ থেকে নেমে কৃষ্ণ বললেন, ‘দাদাও আসছেন।’ যুধিষ্ঠির সহর্ষে বললেন, ‘কি আনন্দ, কি আনন্দ! দ্রৌপদী অতি ভাগ্যবতী, তাঁর আহ্বানে কৃষ্ণ বলরাম কেউ স্থির থাকতে পারেন না।’
ক্ষণকাল পরে দারুকের রথে বলরাম এসে পৌঁছলেন। রথ থেকেই অভিবাদন ক’রে বললেন, ‘ধর্মরাজ, শুনলাম আপনারা উত্তম কৌতূকের আয়োজন করেছেন। কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধ আমি দেখতে চাই না, কিন্তু আপনাদের খেলা দেখবার আমার প্রবল আগ্রহ। এখানে নামব না, আমরা দুই ভাই পাণ্ডবদের কাছে থাকলে পক্ষপাতের অপযশ হবে, তা ছাড়া এখানে পানীয়ের ভাল ব্যবস্থা নেই। কৃষ্ণ এখানে থাকুক, আমি দুর্যোধনের আতিথ্য নেব। দ্যূতসভায় আবার দেখা হবে। চালাও দারুক।’ এই ব’লে বলরাম কৌরবশিবিরে চ’লে গেলেন।
