যথাবিধি কুশলপ্রশ্নাদি বিনিময়ের পর সঞ্জয় বললেন, ‘পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ, কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকেই আপনার কাছে পাঠাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বিদুর এই অপ্রিয় কার্যে কিছুতেই সম্মত না হওয়ায় রাজাজ্ঞায় আমাকেই আসতে হয়েছে। আমি দূত মাত্র, আমার অপরাধ নেবেন না। ধৃতরাষ্ট্র এই বলেছেন—বৎস যুধিষ্ঠির, তোমরা পঞ্চ ভ্রাতা অমার শত পুত্রের সমান স্নেহপাত্র। এই লোকক্ষয়কর জ্ঞাতিধ্বংসী আসন্ন যুদ্ধ যে কোনও উপায়ে নিবারণ করা কর্তব্য। আমি অশক্ত অন্ধ বৃদ্ধ, আমার পুত্রেরা অবাধ্য এবং যুদ্ধের জন্য উৎসুক। আমি বহু চিন্তা করে স্থির করেছি যে হিংস্র অস্ত্রযুদ্ধের পরিবর্তে অহিংস দ্যূতযুদ্ধেই উভয় পক্ষের বৈরভাব চরিতার্থ হ’তে পারে। অতি কষ্টে আমার পুত্রগণ ও তাদের মিত্রগণকে এতে সম্মত করেছি। অতএব তুমি সবান্ধব কৌরব—শিবিরে এসে আর একবার সুহৃদদ্যূতে প্রবৃত্ত হও। পণ পূর্ববৎ সমগ্র কুরুপাণ্ডবরাজ্য। যদি দুর্যোধনের প্রতিনিধি শকুনির পরাজয় ঘটে তবে কুরুপক্ষ সদলে রাজ্য ত্যাগ ক’রে চিরতরে বনবাসে যাবে। যদি তুমি পরাস্ত হও তবে তোমরাও রাজ্যের আশা ত্যাগ ক’রে চিরবনবাসী হবে। বৎস, তুমি কপটতার আশঙ্কা ক’রো না। আমি দুই প্রস্থ অক্ষ সজ্জিত রাখব, তুমি স্বহস্তে নিজের জন্য বেছে নিও, অবশিষ্ট অক্ষ শকুনি নেবেন। এর চেয়ে অসন্দিগ্ধ ব্যবস্থা আর কি হ’তে পারে? সঞ্জয়ের মুখে তোমার সম্মতি পাবার আশায় উদগ্রীব হ’য়ে রইলাম। হে তাত যুধিষ্ঠির তোমার সুমতি হ’ক , তোমাদের পঞ্চ ভ্রাতার কল্যাণ হ’ক, অষ্টাদশ অক্ষ্মৌহিণী সহ কুরুপান্ডবের প্রাণ রক্ষা হ’ক।’
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, ‘জ্যেষ্ঠতাত কি স্বয়ং এই বাণী রচনা করেছেন? আমার মনে হয় তাঁর মন্ত্রদাতা দুর্যোধন আর শকুনি, বৃদ্ধ কুরুরাজ শুধু শুকপক্ষিবৎ আবৃত্তি করেছেন। মহামতি সঞ্জয়, আপনি আমাকে কি করতে বলেন?’
‘ধর্মপুত্র, আমি কুরুরাজ্যের আজ্ঞাপতি বার্তাবহ মাত্র, নিজের মত জানাবার অধিকার আমার নেই। আপনি রাজবুদ্ধি ও ধর্মবুদ্ধি আশ্রয় করুন, আপনার মঙ্গল হবে।’
‘তবে আপনি কুরুরাজকে জানাবেন যে তিনি আমাকে অতি দুরূহ সমস্যায় ফেলেছেন, আমি সম্যক বিবেচনা ক’রে পরে তাঁকে উত্তর পাঠাব। এখন আপনি বিশ্রামান্তে আহারাদি করুন, কাল ফিরে যাবেন।’
‘না মহারাজ, আমাকে এখনই ফিরতে হবে, বিশ্রামের অবসর নেই। ধর্মপুত্রের জয় হোক।’ এই ব’লে সঞ্জয় বিদায় নিলেন।
মৎকুনি পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘মহারাজ, আপনি ঠিক উত্তর দিয়েছেন। এইবার আমার মন্ত্রণা শুনুন। আজই অপরাহ্নে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে একজন বিশ্বস্ত দূত পাঠান, কিন্তু আপনার ভ্রাতারা যেন জানতে না পারেন। আপনার দূত গিয়ে বলবে—হে পূজ্যপাদ জ্যেষ্ঠতাত, আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য, অতি অপ্রিয় হ’লেও তৃতীয়বার দ্যূতক্রীড়ায় আমি সম্মত আছি। আপনার আয়োজিত অক্ষে আমার প্রয়োজন নেই, আমি নিজের অক্ষেই নির্ভর করব। শকুনিও নিজের অক্ষে খেলবেন। আপনি যে পণ নির্ধারণ করেছেন তাতেও আমার সম্মতি আছে। শুধু এই নিয়মটি আপনাকে মেনে নিতে হবে যে শকুনি আর আমি প্রত্যেকে একটিমাত্র অক্ষ নিয়ে খেলব এবং তিনবার মাত্র অক্ষক্ষেপণ করব, তাতে যার বিন্দুসমষ্টি অধিক হবে তারই জয়।’
যুধিষ্ঠির বললেন, ‘হে সুবলনন্দন মৎকুনি, আপনি সম্পর্কে আমার মাতুল হন,কিন্তু এখন বোধ হচ্ছে আপনি বাতুল। আমি কোন ভরসায় আবার শকুনির সঙ্গে খেলতে স্পর্ধা করব? যদি আপনি আমাকে শকুনির অনুরূপ অক্ষ প্রদান করেন তাতে সমান সমান প্রতিযোগ হবে, কিন্তু আমার জয়ের স্থিরতা কোথায়? ধৃতরাষ্ট্রের আয়োজিত অক্ষে আপত্তির কারণ কি? আমার ভ্রাতাদের মত না নিয়েই বা কেন এই দ্যূতক্রীড়ায় সম্মতি দেব? তিনবার মাত্র অক্ষ ক্ষেপণের উদ্দেশ্য কি? বহুবার ক্ষেপণেই তো সংখ্যাবৃদ্ধির সম্ভাবনা অধিক। আর আপনি যে দুর্যোধনের চর নন তারই বা প্রমাণ কি?’
মৎকুনি বললেন, ‘মহারাজ, স্থিরোভব। আপনার সমস্ত সংশয় আমি ছেদন করছি। যদি আপনি ধৃতরাষ্ট্রের আয়োজিত অক্ষ নিয়ে খেলেন তবে আপনার পরাজয় অনিবার্য। ধূর্ত শকুনি সে অক্ষে খেলবে না, হাতে নিয়ে ইন্দ্রজালিকের ন্যায় বদলে ফেলে নিজের আগেকার অক্ষেই খেলবে। আমি এতকাল বাহ্লীক দুর্গে নিশ্চেষ্ট ছিলাম না, নিরন্তর গবেষণায় প্রচণ্ডতর মন্ত্রশক্তিযুক্ত অক্ষ উদভাবন করেছি। আপনাকে এই নবযন্ত্রান্বিত আশ্চর্য অক্ষ দেব, তার কাছে এলেই শকুনির পুরাতন অক্ষ একেবারে বিকল হয়ে যাবে। মহারাজ, আপনার জয়ে কিছুমাত্র সংশয় নেই। আপনার ভ্রাতারা যুদ্ধলোলুপ, আপনার তুল্য স্থিরবুদ্ধি দূরদর্শী নন। তাঁরা আপনাকে বাধা দেবেন, ফলে এই রক্তপাতহীন বিজয়ের মহা সুযোগ আপনি হারাবেন। আপনি আগে ধৃতরাষ্ট্রকে সংবাদ পাঠান, তার পর আপনার ভ্রাতাদের জানাবেন। তাঁরা ভর্ৎসনা করলে আপনি হিমালয়বৎ নিশ্চল থাকবেন।’
‘কিন্তু দ্রৌপদী? আপনি তাঁর কটুবাক্য শোনেন নি।’
‘মহারাজ, স্ত্রীজাতির ক্রোধ তৃণাগ্নিতুল্য, তাতে পর্বত বিদীর্ণ হয় না। কদিনেরই বা ব্যাপার, আপনার জয়লাভ হ’লে সকল নিন্দুকের মুখ বন্ধ হবে। তারপর শুনুন—আমার যন্ত্র অতি সূক্ষ্ম, সেজন্য এক দিনে অধিকবার অক্ষক্ষেপণ অবিধেয়। শকুনির অক্ষও দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকে না, সেজন্য সে আনন্দে আপনার প্রস্তাবে সম্মত হবে। আপনার জয়ের পক্ষে তিনবার ক্ষেপণই যথেষ্ট। অক্ষ আমার সঙ্গেই আছে, পরীক্ষা ক’রে দেখুন।’
