সহদেব বললেন, ‘মহারাজ এখন রাজকার্যে ব্যস্ত, ওবেলা আসতে বল।’
সহদেবের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্য যুধিষ্ঠির ব্যগ্র হয়েছিলেন। বললেন, ‘না না, এখনই তাঁকে নিয়ে এস।’
আগন্তুক বক্রপৃষ্ঠ প্রৌঢ় বলিকুঞ্চিত শীর্ণ মুণ্ডিত মুখ, মাথায় প্রকাণ্ড পাগড়ি, গলায় নীলবর্ণ রত্নহার, পরনে ঢিলে ইজের, তার উপর লম্বা জামা। যুক্তকর কপালে ঠেকিয়ে বললেন, ‘ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জয়।’
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে আপনি সৌম্য?’
আগন্তুক উত্তর দিলেন, ‘মহারাজ, ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন, আমার বক্তব্য কেবল রাজকর্ণে নিবেদন করতে চাই।’
যুধিষ্ঠির বললেন, ‘সহদেব, তুমি এখন যেতে পার। ছোলার বস্তাগুলো খুলে দেখ গে, পোকাধরা না হয়।’ সহদেব বিরক্ত হ’য়ে সন্দিগ্ধ মনে চ’লে গেলেন।
আগন্তুক অনুচ্চস্বরে বললেন, ‘মহারাজ, আমি সুবলপুত্র মৎকুনি, শকুনির বৈমাত্র—ভ্রাতা।’
‘বলেন কি, আপনি আমাদের পূজনীয় মাতুল। প্রণাম প্রণাম, কি সৌভাগ্য—এই সিংহাসনে বসতে আজ্ঞা হ’ক।’
‘না মহারাজ, এই নিম্ন আসনই আমার উপযুক্ত। আমি দাসীপুত্র, আপনার সংবর্ধনার অযোগ্য।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, তবে ঐ শৃগালচর্মাবৃত বেদীতে উপবেশন করুন। এখন কৃপা ক’রে বলুন কি প্রয়োজনে আগমন হয়েছে। মাতুল, আগে তো কখনও আপনাকে দেখি নি।’
‘দেখবেন কি করে মহারাজ। আমি অন্তরালেই বাস করি, তা ছাড়া গত তের বৎসর বিদেশে ছিলাম। কুব্জতার জন্য ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন আমার সাধ্য নয়, সে কারণে যন্ত্রমন্ত্রবিদ্যার চর্চা ক’রে তাতেই সিদ্ধিলাভ করেছি। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা আমাকে বরদানে কৃতার্থ করেছেন। পান্ডবরাজ শুনেছি দ্যূতক্রীড়ায় আপনার পটুতা অসামান্য, অক্ষহৃদয় আপনার নখদর্পণে।’
‘হুঁ, লোকে তাই বলে বটে।’
‘তথাপি শকুনির হাতে আপনার পরাজয় ঘটেছে। কেন জানেন কি?’
যুধিষ্ঠির ভ্রূ কুঞ্চিত ক’রে বললেন, ‘শকুনি ধর্মবিরুদ্ধ কপট দ্যূতে আমাকে হারিয়েছিলেন।’
মৎকুনি একটু হেসে বললেন, ‘দ্যূতে কপট আর অকপট ব’লে কোনও ভেদ নেই। অক্ষক্রীড়ায় দৈবই উভয় পক্ষের অবলম্বন, অজ্ঞ লোকে তাকে অকপট বলে। যদি এক পক্ষ দৈবের উপর নির্ভর করে এবং অপর পক্ষ পুরুষকার দ্বারা জয়লাভ করে, তবে পরাজিত পক্ষ কপটতার অভিযোগ আনে। ধর্মরাজ, আপনার দৈবপাতিত অক্ষ শকুনির পুরুষকারপাতিত অক্ষের নিকট পরাস্ত হয়েছে। আপনি প্রবলতর পুরুষকার আশ্রয় করুন, রাবণবাণের বিরুদ্ধে রামবাণ প্রয়োগ করুন, দ্যূতলক্ষ্মী আপনাকেই বরণ করবেন।’
‘মাতুল, আপনার বাক্য আমার ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। লোকে বলে শকুনির অক্ষের অভ্যন্তরে এক পার্শ্বে স্বর্ণপট্ট নিবদ্ধ আছে, তারই ভারে সেই পার্শ্ব সর্বদা নিম্নবর্তী হয় এবং উপরে গরিষ্ঠ বিন্দুসংখ্যা প্রকাশ করে।’
‘মহারাজ, লোকে কিছুই জানে না। স্বর্ণগর্ভ বা পারদগর্ভ পাশক নিয়ে অনেকে খেলে বটে, কিন্তু তার পতন সুনিশ্চিত নয়, বহুবারের মধ্যে কয়েকবার ভ্রংশ হ’তেই হবে। আপনারা তো অনেক বাজি খেলেছিলেন, একবারও কি আপনার জিত হয়েছিল?’
যুধিষ্ঠির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘একবারও নয়।’
‘তবে? শকুনি কাঁচা খেলোয়াড় নন, তিনি অব্যর্থ পাশক না নিয়ে কখনই আপনার সঙ্গে খেলতেন না।’
‘কিন্তু এখন এসব কথার প্রয়োজন কি। যুদ্ধ আসন্ন, পুনর্বার দ্যূতক্রীড়ার সম্ভাবনা নেই, শকুনিকে হারাবার সামর্থ্যও আমার নেই।’
‘ধর্মপুত্র, নিরাশ হবেন না, আমার গূঢ় কথা এইবারে শুনুন। শকুনির অক্ষ আমারই নির্মিত, তার গর্ভে আমি মন্ত্রসিদ্ধ যন্ত্র স্থাপন করেছি, সেজন্য তার ক্ষেপ অব্যর্থ। দুরাত্মা শকুনি যন্ত্রকৌশল শিখে নিয়ে আমাকে গজভুক্তকপিত্থবৎ পরিত্যাগ করেছে। সে আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল যে, পাণ্ডবগণের নির্বাসনের পর দুর্যোধন আমাকে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপদ দেবে। আপনারা বনে গেলে, যখন দুর্যোধনকে প্রতিশ্রুতির কথা জানালাম, তখন সে বললে—আমি কিছুই জানি না, মামাকে বল। শকুনি বললে—আমি কি জানি, দুর্যোধনের কাছে যাও। অবশেষে দুই নরাধম আমাকে ছলেবলে দুর্গম বাহ্লীক দেশে পাঠিয়ে সেখানে কারারুদ্ধ করে রাখে। আমি তের বৎসর পরে কোনও গতিকে সেখান থেকে পালিয়ে এসে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।’
যুধিষ্ঠির বললেন, ‘ও, এখন বুঝি আমাকেই অক্ষরূপে চালনা ক’রে রাজ্যলাভ করতে চান!’
‘ধর্মরাজ, আমার পূর্বাপরাধ মার্জনা করুন, যা হবার তা হ’য়ে গেছে, এখন আমাকে আপনার পরম হিতাকাঙ্ক্ষী ব’লে জানবেন। আমি বামন হ’য়ে ইন্দ্রপ্রস্থরূপ চন্দ্রে হস্তপ্রসার করেছিলাম, তাই আমার এই দুর্দশা। আপনি বিজয়ী হ’য়ে শকুনিকে বিতাড়িত ক’রে আমাকে গান্ধাররাজ্য দেবেন, তাতেই আমি সন্তুষ্ট হব।’
‘আপনার নির্মিত অক্ষে আমার সর্বনাশ হয়েছে তারই পুরস্কারস্বরূপ?’
মৎকুনি জিহ্বা দংশন ক’রে বললেন, ‘ও কথা তুলবেন না মহারাজ! আমার বক্তব্য সবটা শুনুন। আমি গুপ্ত সংবাদ পেয়েছি—সঞ্জয় এখনই ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞায় আপনার কাছে আসছেন। দুর্যোধন আর শকুনির প্ররোচনায় অন্ধ রাজা আবার আপনাকে দ্যূতক্রীড়ায় আহ্বান করছেন। মহারাজ, এই মহা সুযোগ ছাড়বেন না।’
এমন সময় রথের ঘর্ঘর ধ্বনি শোনা গেল। মৎকুনি ত্রস্ত হ’য়ে বললেন, ‘ঐ সঞ্জয় এসে পড়লেন। দোহাই মহারাজ, ধৃতরাষ্ট্রের প্রস্তাব সদ্য প্রত্যাখ্যান করবেন না, বলবেন যে আপনি বিবেচনা ক’রে পরে উত্তর পাঠাবেন। সঞ্জয় চ’লে গেলে আমার সব কথা আপনাকে জানাব। আমি আপাতত ঐ পাশের ঘরে লুকিয়ে থাকছি।’
