অসিতা বলল, তিলোত্তমার মন কোথায় ফিরে গেল তা তো বললেন না সার।
—তার মন বুদ্ধি চিত্ত অহংকার কিছুই ছিল না, আত্মাও ছিল না। তিলোত্তমা একটা রোবট। পুরাণকথা শেষ করে চুঞ্চু মশায় প্রশ্ন করলেন, বৎস সিদ্ধিনাথ, এখন কিঞ্চিৎ সুস্থ বোধ করছ কি? মোহ অপগত হয়েছে?
আমি লাফ দিয়ে উঠে বললুম, একদম সেরে গেছি সার। আমার মানসী তিলোত্তমাও এক্সপ্লোড করে বিলীন হয়েছে।
চুঞ্চু মশায় বললেন, এখনও বলা যায় না, কিছু ধোঁয়া থাকতে পারে। দেখ সিদ্ধিনাথ, তোমার চটপট বিবাহ হওয়া দরকার, তোমার বাপ মায়েরও সেই ইচ্ছা। আমার ছোট শালী নবদুর্গা দেখতে নেহাত মন্দ নয়, কাল বিকেলে আমাদের বাড়িতে এসে তাকে একবার দেখো।
আমি উত্তর দিলুম, দেখবার দরকার নেই সার। ছায়া দেখে একবার ভুলেছি, কায়া দেখে আর ভুলতে চাই না। ওই নবদুর্গা না বনদুর্গা কি নাম বললেন ওকেই বিয়ে করব। আপনি যখন বলছেন তখন আর কথা কি।
চুঞ্চু মশায় বললেন, ঠিক বলেছ সিদ্ধিনাথ। দশ মিনিট দেখে তুমি কি আর বুঝবে, আমি ত দশ বছরেও নবদুর্গার দিদি জয়দুর্গার ইয়ত্তা পাই নি। বিবাহ হয়ে যাক, তারপর ধীরে সুস্থে যত দিন খুশি দেখো।
তার পর চুঞ্চু মশায় বাবাকে বললেন, বাবা মা রাজী হলেন, দু মাসের মধ্যে নবদুর্গার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল।
গোপালবাবু বললেন, সিদ্ধিনাথের ইতিহাস তো শেষ হল, এখন নমিতা তোমার মন্তব্য বলতে পার।
নমিতা বললেন, আপনার গিন্নীকে এই কেচ্ছা শুনিয়েছেন?
সিদ্ধিনাথ বললেন, শুনিয়েছি। আরও অনেক রকম জীবনস্মৃতি তাঁকে বলেছি, কিন্তু পতিবাক্যে তাঁর আস্থা নেই, আমার কোনও কথাই তিনি বিশ্বাস করেন না।
—জীবনস্মৃতি না ছাই, বকবক করে আবোলতাবোল বানিয়ে বলেছেন। আগাগোড়া মিথ্যে, শুধু নবদুর্গা সত্যি।
১৩৬১ (১৯৫৪)
* সিদ্ধিনাথের পূর্বকথা ”গল্পকল্প” পুস্তকে আছে।
তৃতীয়দ্যূতসভা
মহাভারতে আছে প্রথম দ্যূতসভায় যুধিষ্ঠির সর্বস্ব হেরে যাবার পর ধৃতরাষ্ট্র অনুতপ্ত হ’য়ে তাঁকে সমস্ত পণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পাণ্ডবেরা যখন ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন দুর্যোধনের প্ররোচনায় ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে আবার খেলবার জন্য ডেকে আনান। এই দ্বিতীয় দ্যূতসভাতেও যুধিষ্ঠির হেরে যান এবং তার ফলে পাণ্ডবদের নির্বাসন হয়।
শকুনি—যুধিষ্ঠির কিরকম পাশা খেলেছিলেন? তাঁদের খেলায় ছক আর ঘুঁটি ছিল না উভয় পক্ষ পণ উচ্চারণ করেই অক্ষপাত করতেন, যাঁর দান বেশী পড়ত তাঁরই জয়। মহাভারতে দূতপর্বাধ্যায়ে যুধিষ্ঠিরের প্রত্যেকবার পণ ঘোষণার পর এই শ্লোকটি আছে—
এতচশ্রুত্বা ব্যবসিতো নিকৃতিং সমুপাশ্রিতঃ
জিতমিত্যেব শকুনির্যুধিষ্ঠিরমভাষতঃ।।
অর্থাৎ পণঘোষণা শুনেই শকুনি নিকৃতি (শঠতা) আশ্রয় ক’রে খেলায় প্রবৃত্ত হলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে বললেন—জিতলাম। এতে বোঝা যায় যে পাশা ফেলবার সঙ্গে সঙ্গে এক একটা বাজি শেষ হ’ত।
অনেকেই জানেন না যে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কিছুদিন পূর্বে যুধিষ্ঠির আরও একবার শকুনির সঙ্গে পাশা খেলেছিলেন। ব্যাসদেব মহাভারত থেকে তৃতীয়দ্যূত পর্বাধ্যায়টি কেন বাদ দিয়েছেন তা বলা শক্ত। হয়তো কোন রাজনীতিক কারণ ছিল, কিংবা তিনি ভেবেছিলেন যে আসন্ন কলিকালে কুটিল দ্যূতপদ্ধতির রহস্য প্রকাশ জনসাধারণের পক্ষে অনিষ্টকর হবে। বর্তমান বৈজ্ঞানিক যুগে প্রতারণার যেসব উপায় উদ্ভাবিত হয়েছে তার তুলনায় শকুনি—যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলা ছেলেখেলা মাত্র, সুতরাং এখন সেই প্রাচীন রহস্য প্রকাশ করলে বেশী কিছু অনিষ্ট হবে না।
কুরুক্ষেত্র—যুদ্ধের পঁচিশ দিন পূর্বের কথা। যুধিষ্ঠির সকাল বেলা তাঁর শিবিরে ব’সে আছেন, সহদেব তাঁকে সংগৃহীত রসদের ফর্দ প’ড়ে শোনাচ্ছেন। অর্জুন পাঞ্চালশিবিরে মন্ত্রণাসভায় গেছেন, নকুল সৈন্যদের কুচকাওয়াজে ব্যস্ত। ভীম যে এক শ গদা ফরমাস দিয়েছিলেন তা পৌঁছে গেছে, এখন তিনি প্রত্যেকটি আস্ফালন করে এক এক জন ধৃতরাষ্ট্রের নামে উৎসর্গ করছেন। সব গদা শাল কাঠের, কেবল একটি কাপড়ের খোলে তুলো ভরা। এটি দুর্যোধনের ১৮নং ভ্রাতা বিকর্ণের জন্য। ছোকরার মতিগতি ভাল, দ্রৌপদীর ধর্ষণের সময় সে প্রবল প্রতিবাদ করেছিল।
সহদেব পড়ছিলেন, ‘যবশক্তু দ্বাদশ মন, চণকচূর্ণ অষ্ট লক্ষ মন, অভগ্ন চণক পঞ্চাশ লক্ষ মন—’
ফর্দ শুনে শুনে যুধিষ্ঠিরের বিরক্তি ধরছিল। কিছু আগ্রহ প্রকাশ না করলে ভাল দেখায় না, সেজন্য প্রশ্ন করলেন, ‘ওতেই কুলিয়ে যাবে?’
সহদেব বললেন, ‘খুব। মোটে তো সাত অক্ষৌহিণী, আর যুদ্ধ শেষ হ’তে বড় জোর দিন—কুড়ি, প্রতিদিন মরবেও বিস্তর। তারপর শুনুন—ঘৃত লক্ষ কুম্ভ—’
‘তুমি আমাকে পথে বসাবে দেখছি। অত অর্থ কোথায় পাব?’
‘অর্থের প্রয়োজন কি, সমস্তই ধারে কিনেছি, জয়লাভের পর মিষ্টবাক্যে শোধ করবেন। তৈল দ্বিলক্ষ কুম্ভ, লবণ অর্ধ লক্ষ মন—’
‘থাক থাক। যা ব্যবস্থা করবার ক’রে ফেল বাপু, আমাকে ভোগাও কেন। আমি রাজধর্ম বুঝি নীতিশাস্ত্র বুঝি। অঙ্ক কষা বৈশ্যের কাজ, আমার মাথায় ওসব ঢোকে না।’
এমন সময় প্রতিহার এসে জানালে, ‘ধর্মরাজ এক অভিজাত কল্প কুব্জপুরুষ আপনার দর্শনপ্রার্থী। পরিচয় দিলেন না; বললেন, তাঁর বার্তা অতি গোপনীয়, সাক্ষাতে নিবেদন করবেন।’
