পুরঞ্জয় বললেন, অতি উত্তম রচনা। কোষপাল, এই পণ্ডিতপ্রবরকে এক শত স্বর্ণমুদ্রা দাও।
ডম্বরু পূর্ববৎ মাথা নেড়ে বললেন, না মহারাজ, নির্বোধ আত্মবর্গীর দান আমি নিতে পারি না, গুরুদেবের নিষেধ আছে। আমার প্রশস্তিতে যে উৎকট চাটুবাক্য আছে তা আপনি বিনা দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন।
ক্রুদ্ধ হয়ে পুরঞ্জয় বললেন, ওহে দ্বিজগর্দভ, দেবতা রাজা আর প্রণয়িনীর স্তুতিতে অতিরঞ্জন থাকেই, তা অলংকার শাস্ত্রসম্মত। আমি তোমার কবিত্বই বিচার করেছি, সত্যাসত্য গ্রাহ্য করি নি। কোষপাল, এই কাণ্ডজ্ঞানহীন মূর্খ ব্রাহ্মণকে এক রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে বিদায় কর।
দক্ষিণা না নিয়েই ডম্বরু প্রস্থান করলেন। অনেক দিন পরে তিনি দশার্ণ দেশে উপস্থিত হলেন এবং সেখানকার রাজা উদায়ুধের সভায় গিয়ে পূর্ববৎ প্রশস্তি পাঠ করলেন।
উদায়ুধ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ওহে চাটুকার মিথ্যাভাষী ব্রাহ্মণ, ব্যাজস্তুতি দ্বারা তুমি আমায় অপমান করেছ। দূর হও রাজ্য থেকে।
উৎফুল্ল হয়ে ডম্বরু বললেন, সাধু, সাধু! মহারাজ, আপনার জয় হোক, আপনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, আমার প্রশস্তিতে যে অত্যুক্তি আছে তা মেনে নেন নি। আপনি নির্বোধ নন, আত্মগর্বীও নন, তবে উদ্ধত বটে। আমি আপনারই আশ্রয়ে বাস করব। আমার সংসারযাত্রার জন্য যথোচিত বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিন এবং একটি সুলক্ষণা সুপাত্রীও যোগাড় করে দিন যাকে বিবাহ করে আমি গৃহী হতে পারি।
অট্টহাস্য করে উদায়ুধ বললেন, হে পণ্ডিতমূর্খ, তোমার স্পর্ধা কম নয় যে আমাকে পরীক্ষা করতে এসেছে! তোমার তুল্য ধৃষ্ট কপটভাষী পুরুষকে আমি আশ্রয় দিতে পারি না। কোষপাল, দশ রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে এই উন্মাদকে বিদায় কর।
ডম্বরু মুদ্রা নিলেন না।
ক্ষুব্ধ ডম্বরু আবার পথ চলতে লাগলেন। তাঁর সম্বল সেই ক্ষুদ্র সুবর্ণখণ্ড বিক্রয় করে যে অর্থ পেয়েছিলেন তা নিঃশেষ হয়ে গেছে। অপরাহ্নকালে অত্যন্ত শ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে তিনি মালব রাজ্যে উপস্থিত হলেন। শিপ্রা নদীর তীরে এসে ডম্বরু ভাবতে লাগলেন, অহো দূরদৃষ্ট! রাজাদের পরীক্ষার জন্য আমি যে উপায় অবলম্বন করেছিলাম তা বিফল হয়েছে, দুই রাজা নির্বোধ প্রতিপন্ন হয়েছেন, তৃতীয় রাজা, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও অকারণে আমার প্রতি বিমুখ হয়েছেন। এখন কি করা যায়? হে দেবী সরস্বতী, আমাকে রক্ষা কর।
নদীতীরে উপবিষ্ট হয়ে ডম্বরু ব্যাকুল মনে বাগদেবীকে ডাকতে লাগলেন। সহসা শুনতে পেলেন, মধুর কণ্ঠে কে বলছে—দ্বিজবর, আপনি কি বিপদাপন্ন?
চমকিত হয়ে ডম্বরু দেখলেন, এই সদ্যঃস্নাতা সিক্তবসনা সুন্দরী তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। দণ্ডবৎ হয়ে প্রণাম করে ডম্বরু বললেন, ভগবতি ভারতি দেবি নমস্তে! আমাকে রক্ষা কর।
বীণানিক্কণের ন্যায় হাস্য করে সুন্দরী বললেন, দেবী টেবী নই, আমি সামান্য শিল্পিনী। আমার নাম শিলীন্ধ্রী, রাজপুরীর অঙ্গনাদের জন্য পুষ্পালংকার রচনা করে জীবিকা নির্বাহ করি। নদীতে স্নান করে উঠে দেখলাম আপনি কাতরোক্তি করছেন। দয়া করে বলুন কি হয়েছে।
ডম্বরু বললেন, আমি বৃহস্পতিকল্প আচার্য রোহিতের প্রিয় শিষ্য পণ্ডিত ডম্বরু বিশ্ববিদ্যোদধি। নিখিল শাস্ত্রে পরাদর্শী হয়ে সম্প্রতি গুরুর আশ্রম থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছি। তিনি বলেছেন, বৎস, তুমি বিদ্যায় পরিপ্লুত হয়েছ, এখন কোনও নৃপতিকে তুষ্ট করে তাঁর সভাকবি বা সভাপণ্ডিত হও, কিন্তু নির্বোধ আর আত্মগর্বী লোকের সংশ্রবে থেকো না, তাদের দানও নিও না। আমি একে একে কাশীরাজ বৎসরাজ ও দশার্ণরাজের সকাশে উপস্থিত হয়ে তাঁদের পরীক্ষা করেছি, কিন্তু দেখলাম প্রথম দুই রাজা নির্বোধ আত্মগর্বী, এবং তৃতীয় রাজা বুদ্ধিমান হলেও অত্যন্ত উদ্ধত ও ক্রোধী, আমার প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আমি এখন নিঃস্ব শ্রান্ত ক্ষুধাতুর, কি করা উচিত স্থির করতে পারছি না।
শিলীন্ধ্রী বললেন, আপনি দয়া করে আমার কুটীরে এসে বিশ্রাম ও ক্ষুন্নিবৃত্তি করুন। সংকোচ করবেন না, আমি আমার বৃদ্ধা জননীর সহিত বাস করি। কাল অবন্তীরাজের সভায় যাবেন। তিনি অতি বুদ্ধিমান নরপতি, নিশ্চয় আপনার প্রার্থনা পূর্ণ করবেন।
ডম্বরু বললেন, ভদ্রে আমি আজই অবন্তীরাজের কাছে গিয়ে তাঁকে পরীক্ষা করতে চাই। যদি সফলকাম হই তবেই তোমার আতিথ্য গ্রহণ করব, নতুবা দেবী সরস্বতীর আরাধনায় প্রায়োপবেশনে প্রাণ বিসর্জন দেব।
শিলীন্ধ্রী প্রশ্ন করলেন, দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আপনি নৃপতিদের কিরূপে পরীক্ষা করেছিলেন?
ডম্বরু আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা বিবৃত করলেন। শিলীন্ধ্রী স্মিতমুখে বললেন, পণ্ডিতবর, আপনি মিথ্যা প্রিয়বাক্য বলেছিলেন সেজন্য অভীষ্ট ফল পান নি। অবন্তী রাজ তীক্ষ্নবুদ্ধি গুণগ্রাহী, তাঁর কাছে গিয়ে আপনি সত্যভাষণ করুন, তাঁর দোষ গুণ সবই কীর্তন করুন।
ডম্বরু বললেন, সুন্দরী, তোমার মন্ত্রণা মন্দ নয়, মিথ্যা স্তুতি করে তিন বার ব্যর্থকাম হয়েছি, এবারের সত্য স্তুতি করে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এদেশের রাজার দোষ গুণ আমি কিছুই জানি না, সত্যভাষণ কি করে করব?
শিলীন্ধ্রী বললেন, ভাববেন না, আমি আপনাকে সমস্ত শিখিয়ে দিচ্ছি। একটু পরেই মহারাজ সান্ধ্যসভায় সমাসীন হবেন, আপনি সেখানে চলুন, আপনাকে পথ দেখিয়ে দেব।
