—শুনছি ব্রিটেন নাকি ফার্স্ট পাওয়ার থেকে থার্ড পাওয়ারে নেমে গেছে, চায়না আর একটু উঠলেই ব্রিটেন ফোর্থ হয়ে যাবে।
—চিরকাল সমান যায় না নন্দীবাবু। ইণ্ডিয়া যদি মিলিটারি মাইণ্ডেড হয় তবে ব্রিটেন হয়তো ফিফথ পাওয়ার হয়ে যাবে।
–গড ফরবিড। আরও সব বিশ্রী কথা শুনছি।
-–কি শুনছেন?
ছোট ছেলের মতন হঠাৎ হাউ হাউ করে কেঁদে জয়রাম বললেন, ওই আমেরিকানরা সার। সিটিং অন দাই ব্রেস্ট অ্যান্ড পুলিং আউট দাই বিয়ার্ড বাই দি হ্যাণ্ডফুল, বুকে বসে দাড়ি ওড়াচ্ছে। বিউটিফুল গার্লস ধরে ধরে নিজের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। আর, আমাদের হোলি গীতায় যা আছে—জায়তে বর্ণসংকরঃ। অ্যাটম আর হাইড্রোজেন বোমা চালাচালি করছে। বেশী মদ খেয়ে পাইলট যদি বেসামাল হয় তবে তো আপনাদের দেশের ওপরেই বোমা ফাটবে। তা হলে কি সর্বনাশ হবে সার।
-যত সব ননসেন্স। ডোন্ট ওঅরি নন্দীবাবু আমরা নিরাপদে আছি।
—নো সার, ভেরি গ্রেভ সিটয়েশন। আপনারা এখানে চলে আসুন, অল ব্রিটিশ পিপল, নেহরুজী আপনাদের আশ্রয় দেবেন, যেমন তিব্বতীদের দিয়েছেন। হিমালয় অঞ্চলে প্রচুর ঠাণ্ডা জায়গা আছে, সেখানে আরামে থাকবেন। আমেরিকা আর রাশিয়া ঝগড়া করে মরুক, লেট ইওরোপ গো ট হল।
–নন্দীবাবু এই দেশ কি আমাদের পক্ষে খুব নিরাপদ? শুনেছি আপনাদের এক পাওআরফল গড় আছেন, কল্কি অবতার, মিস্টার নেহরু কোনও রকমে তাঁকে ঠেকিয়ে রেখেছেন। নেহরু, যখন থাকবেন না তখন ওই কল্কি অবতার এদেশে অবতীর্ণ হবেন, প্রকাণ্ড তলোয়ার দিয়ে সমস্ত ননহিন্দুকে কেটে ফেলবেন। তার চাইতে পাকিস্তানই তো ভাল, ওরা চিরকালই ফেথফল, আমাদের তাড়াতে চায় নি।
–পাকিস্তানে জায়গা পাবেন না সার, আমেরিকানরা আপনাদের থাকতে দেবে না। গড় ওড ইণ্ডিয়াই আপনাদের পক্ষে ভাল। কোনও ভয় নেই, শুধু একটা ডিক্লারেশন সই করবেন যে আপনারা স্পিরিচুয়াল হিন্দু। আপনাদের পৈতৃক খীষ্টধর্ম, বীফ, পোক, হইস্কি কিছুই ছাড়বার দরকার নেই, তবে একখানি গীতা সর্বদা সঙ্গে রাখবেন।
সিমসন বললেন, গুড আইডিয়া, ভেবে দেখব। গুড বাই নন্দী বাবু আপনি বিশ্রাম করনে। এই এক বাক্স চকোলেট আপনার জন্যে এনেছি, খাবেন।
ডম্বরু পণ্ডিত
আচার্য রোহিত তাঁর শিষ্য ডম্বরুকে বললেন, বৎস, তুমি নিখিল বিদ্যায় পারদর্শী হয়েছ, স্নাতক হবার পরেও এখানে দশ বৎসর স্নাতকোত্তর গবেষণা করেছ, তোমার যৌবনও উত্তীর্ণপ্রায়। আর আমার কাছে বৃথা কালক্ষেপ করে লাভ কি? এখন তুমি এই ব্রহ্মচর্যাশ্রম থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গার্হস্থ্যে প্রবেশ কর।
ডম্বরু প্রণিপাত করে রোহিতের চরণে একটি ক্ষুদ্র সুবর্ণখণ্ড রেখে বললেন, গুরুদেব আমি অতি দরিদ্র, এই যৎকিঞ্চিত দক্ষিণা গ্রহণ করে আমাকে কৃতার্থ করুন।
শিষ্যের মস্তকে করার্পণ করে রোহিত প্রসন্নবদনে বললেন, ওহে ডম্বরু, তুমি পঁচিশ বৎসর আমার যে সেবা করেছ তাই প্রচুর দক্ষিণা, অর্থে আমার প্রয়োজন নেই। আমি জানি তুমি দরিদ্র, এই সুবর্ণখণ্ড তোমার পথের সম্বল হ’ক।
ডম্বরু বললেন, গুরুদেব, আপনার দয়ার সীমা নেই। যাত্রার পূর্বে আপনার কাছে আরও কিঞ্চিৎ বিদ্যা ভিক্ষা চাচ্ছি।
রোহিত সহাস্যে বললেন, বৎস, নিমজ্জিত কুম্ভের ন্যায় তুমি বিদ্যায় পরিপ্লুত হয়েছ, তোমার অন্তরে আর বিন্দুমাত্র ধারণের স্থান নেই। এখন কোনও গুণবান নৃপতিকে তুষ্ট করে তার সভাকবি বা সভাপণ্ডিত হও। কিন্তু নির্বোধ আত্মগর্বী লোকের সংশ্রবে থেকো না, তাদের দানও নিও না।
ডম্বরু নতমস্তকে যুক্তকরে বললেন, গুরুদেব, আমাকে একটি উপাধি দেবেন না?
—কি উপাধি তুমি চাও?
—যদি যোগ্য মনে করেন তবে কৃপা করে আমাকে বিশ্ববিদ্যোদধি উপাধি দিন।
রোহিত হাস্য করে বললেন, তথাস্তু। হে পণ্ডিত ডম্বরু, বিশ্ববিদ্যোদধি, তোমার সর্বত্র জয় হ’ক। দেবী সরস্বতী তোমাকে রক্ষা করুন, দেবগুরু বৃহস্পতি তোমাকে সুবুদ্ধি দিন।
পথে যেতে যেতে ডম্বরু একটি প্রশস্তি রচনা করলেন। কিছু দিন পর্যটনের পর তিনি শুনলেন কাশীরাজ বিতর্দন অতি গুণবান নৃপতি। তাঁরই আশ্রয়ে বাস করবেন এই স্থির করে ডম্বরু রাজসভায় উপস্থিত হয়ে এই প্রশস্তি পাঠ করলেন—
চন্দ্র সূর্য ম্লান তব যশের প্রভায়,
পরাজিত শত্রুকুল ছুটিয়া পালায়।
দেববৃন্দ হতমান নিরানন্দ অতি,
অসূয়ায় শয্যাগত ইন্দ্র সুরপতি।
উর্বশী মেনকা রম্ভা ছাড়ি স্বর্গধাম।
তোমারে ঘিরিয়া নৃত্য করে অবিরাম।
পদ্মালয়া করেছেন তোমারে বরণ,
একাকী বৈকুণ্ঠে হরি করেন ক্রন্দন।
ডম্বরু পন্ডিত আমি গাহি তব জয়,
মহারাজ, মোর প্রতি কিবা আজ্ঞা হয়?
কাশীরাজ বিতর্দন প্রীতি হয়ে বললেন, বাঃ অতি সুন্দর প্রশস্তি। কোষপাল, এই বিপ্রকে এক শত স্বর্ণমুদ্রা দাও।
ডম্বরু মাথা নেড়ে বললেন, না মহারাজ, নির্বোধ আত্মগর্বী লোকের দান আমি নিতে পারি না।
আশ্চর্য হয়ে রাজা বললেন, নির্বোধ আত্মগর্বী বলছ কাকে?
—আপনাকে। আমার প্রশস্তিতে যে উৎকট অত্যুক্তি আছে তা আপনি অম্লানবদনে মেনে নিয়েছেন।
অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বিতর্দন বললেন, নির্বোধ আত্মগর্বী তুমি নিজে! যদি ব্রাহ্মণ না হতে তবে ধৃষ্টতার জন্য তোমাকে শূলে চড়াতাম। কোষপাল, এক রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে এই গণ্ডমূর্খকে বিদায় কর।
মুদ্রা না নিয়েই ডম্বরু কাশীরাজসভা ত্যাগ করলেন। তার পর বহু দিন পর্যটন করে বৎসরাজধানী কৌশাম্বী নগরীতে উপস্থিত হলেন এবং বৎসরাজ পুরঞ্জয়ের সভায় গিয়ে পূর্ববৎ প্রশস্তি পাঠ করলেন।
