ডম্বরুকে উপদেশ দিতে দিতে কিছু দূর তার সঙ্গে গিয়ে শিলীন্ধ্রী বললেন, বামে ওই কুঞ্জবনের মধ্যে আমার গৃহ। দক্ষিণের ওই পথ রাজভবনের সিংহদ্বারে শেষ হয়েছে, আপনি সোজা চলে যান।
শিলীন্ধ্রী প্রণাম করে বিদায় নিলেন।
মালবরাজ বিক্রমাদিত্য তাঁর রাজধানী অবন্তী অর্থাৎ উজ্জয়িনীর সভা অলংকৃত করে বসে আছেন। দৈনিক রাজকার্য তিনি প্রাতঃকালীন সভাতেই সম্পন্ন করে থাকেন এখন এই সান্ধ্যসভায় চিত্তবিনোদনের জন্য সভাসদবর্গের সহিত মিলিত হয়েছেন।
রুক্ষকেশ মলিনবেশ ধূলিধূসরদেহ ডম্বরু রাজসভায় প্রবেশ করলেন, ব্রাহ্মণ দেখে কেউ তাকে বাধা দিল না। রাজার সম্মুখে এসে আশীর্বাদের ভঙ্গীতে করতল বিন্যস্ত করে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন, তাঁর বাক্যস্ফূর্তি হল না।
রাজা বললেন, ব্রাহ্মণ, আপনাকে অত্যন্ত অবসাদগ্রস্ত দেখছি। আপনি হস্ত পদ মুখ প্রক্ষালন করুন, দুগ্ধ পান করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন, তার পর সুস্থ হলে আপনার বক্তব্য বলবেন। প্রতিহারী, এই বিপ্রকে বিশ্রামকক্ষে নিয়ে গিয়ে সেবার ব্যবস্থা কর।
ডম্বরু বললেন, মহারাজ, আমি সংকল্প করেছি, আমার বক্তব্য শুনে যদি আপনি প্রসন্ন হন তবেই জলস্পর্শ করব। অতএব যা বলছি অবধান করুন—
মহাবল মহামতি বিক্রম ভূপতি,
তব রাজ্যে প্রজাগণ সুখে আছে অতি।
শিষ্ট জন দুগ্ধ ঘৃত মৎস্য মাংসে তুষ্ট,
শূলে চড়িয়াছে যত দুরাচার দুষ্ট।
বহু জ্ঞানী গুণী আছে আশ্রয়ে তোমার,
অধিকন্তু কতিপয় আছে চাটুকার।
আছে নবরত্ন তব যশস্বী প্রচণ্ড,
যদিও কয়েক জন শুধু কাচখণ্ড।
আছে তব তিন ভার্যা মহিষী প্রেয়সী,
দশ উপভার্যা নৃত্যগীতপটীয়সী।
তথাপি অবলা বালা শিলীন্ধ্রীর প্রতি,
কেন তব লোভ ওহে প্রৌঢ় নরপতি?
বিশ্ববিদ্যোদধি আমি ডম্বরু পণ্ডিত,
নির্ভয়ে কহিয়া থাকি যাহা সমুচিত।
নিবেদন করিলাম লোকে যাহা কয়,
মহারাজ, মোর প্রতি কিবা আজ্ঞা হয়?
ডম্বরুর ভাষণ শুনে বিক্রমাদিত্যের গৌরবর্ণ মুখমণ্ডল আরক্ত হল। নবরত্ন সভার দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি প্রশ্ন করলেন, আপনারা কি বলেন?
বেতালভট্ট বললেন, মহারাজ, এই বিশ্ববিদ্যোদধির উপযুক্ত পুরস্কার—মস্তক—মুণ্ডন, দধিলেপন ও গর্দভবাহনে বহিষ্কার।
রাজা আবার প্রশ্ন করলেন, কবি কালিদাস কি বলেন?
কালিদাস বললেন, মহারাজ, অনুমতি দিন এই ব্রাহ্মণকে আমি অন্তরালে নিয়ে যাই। কিছুক্ষণ পরে আবার এঁকে আপনার সকাশে আনব।
রাজা অনুমতি দিলেন। ডম্বরুর হাত ধরে কালিদাস বললেন, পণ্ডিত, এস আমার সঙ্গে। মাথা নেড়ে হাত টেনে ডম্বরু বললেন, রাজার অভিপ্রায় না জেনে আমি ‘পাদমেকং ন গচ্ছামি’।
ডম্বরুর কানে কানে কালিদাস বললেন, রাজা প্রসন্ন হয়েছেন। আমার সঙ্গে এস, তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
দুই দণ্ড কাল অতীত হলে কালিদাস রাজসভায় ফিরে এলেন, তাঁর পশ্চাতে দু জন রাজভৃত্য ডম্বরুকে ধরাধরি করে এনে রাজার সম্মুখে অর্ধশয়ান অবস্থায় রাখল। ডম্বরুর দেহ পরিষ্কৃত, মস্তক তৈলাক্ত, উদর স্ফীত, চক্ষু অর্ধনিমীলিত।
উদবিগ্ন হয়ে বিক্রমাদিত্য প্রশ্ন করলেন, কি হয়েছে এই ব্রাহ্মণের?
কালিদাস বললেন, ভয় নেই মহারাজ। এই ডম্বরু পণ্ডিত পথশ্রমে ও ক্ষুধায় অবসন্ন ছিলেন, তার ফলে এঁর কিঞ্চিৎ বুদ্ধিভ্রংশও হয়েছিল। আমার সনির্বন্ধ অনুরোধে ইনি স্নান ক’রে নব বস্ত্র প’রে খাদ্য গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ উপবাসের পর গুরুভোজনের জন্য ইনি উত্থানশক্তিহীন হয়ে পড়েছেন। তথাপি এঁর ভাষণের পরিশিষ্টস্বরূপ আরও কিছু আপনাকে এখনই নিবেদন করতে চান।
—বেশ তো, কি বলতে চান বলুন না।
—মহারাজ, আকণ্ঠ দধি চিপিটক রম্ভা লড্ডু ভোজনের ফলে এঁর বাকশক্তিও এখন লোপ পেয়েছে, অথচ নিজের বক্তব্য জানাবার জন্য ইনি ব্যগ্র। যদি অনুমতি দেন তবে এঁর প্রতিনিধি হয়ে আমিই নিবেদন করি।
বিক্রমাদিত্য অনুমতি দিলেন। ডম্বরুর পূর্ব ইতিহাস বিবৃত করে কালিদাস বললেন, মহারাজ, এই ডম্বরু পণ্ডিত বিশ্ববিদ্যোদধি হলেও অতি সরলমতি এবং লোকব্যবহারে অনভিজ্ঞ। রাজসভায় আসার পূর্বে দুর্দৈবক্রমে শিলীন্ধ্রীর সঙ্গে এঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেই ব্যাপিকা প্রগলভা দুর্বিনীতা রমণী এঁকে যা শিখিয়েছে তাই ইনি শুক পক্ষীর ন্যায় আবৃত্তি করেছেন।
রাজা বললেন, ডম্বরু তাঁর ভ্রম বুঝতে পেরেছেন?
—মহারাজ ডম্বরু বলতে চান, আপনার সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ জ্ঞান না থাকায় শিলীন্ধ্রীর বাক্যই উনি মেনে নিয়েছিলেন। এখন উদরপূর্তির পর ইনি বুঝেছেন যে পরপ্রত্যয়ে চালিত হওয়া মূঢ়বুদ্ধির লক্ষণ। অতএব ইনি আপনার আশ্রয়ে থেকে আপনার সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করে যথার্থ প্রশস্তি রচনা করতে চান। আপনি কৃপা করে ডম্বরুর প্রার্থনা পূরণ করুন, এঁকে অন্যতম সভাসদের পদ দিন।
—কোন কর্মের ইনি যোগ্য?
—মহারাজ , আপনার সভায় বিদূষক নেই, ডম্বরুকে বিদূষক নিযুক্ত করুন।
—বলেন কি! ইনি তো শুষ্ককাষ্ঠতুল্য নীরস, কৌতুকের কিছুমাত্র বোধ আছে মনে হয় না।
—মহারাজ, কৌতুক উৎপাদনের সহজাত শক্তি এঁর আছে, নিজের অজ্ঞাতসারেই ইনি আপনার এবং এই রাজসভার সকলের মনোরঞ্জন করতে পারবেন, যেমন আজ করেছেন।
রাজা সহাস্যে বললেন, উত্তম প্রস্তাব। ওহে ডম্বরু পণ্ডিত, তোমাকে বিদূষকের পদ দিলাম। মন্ত্রী, কবি কালিদাসের সঙ্গে পরামর্শ করে তুমি ডম্বরুর জন্য উপযুক্ত বৃত্তি ও বাসগৃহের ব্যবস্থা করে দাও।
