-তা ভালই এসেছে। ফুলের মালা, ফলের তোড়া, গরদের জোড়, নামাবলী, দুধখাবার রুপোর গৈলাস, গড়গড়ার রুপোর মখনল, বাক্স বাক্স সন্দেশ আর চন্দ্ৰপলি, ল্যাংড়া আম, মিহি পেশোয়ারী চাল, গাওয়া ঘি, আরও কত কি।
–পাকা রুই মাছ দিয়েছে?
–না, তা তো কেউ দেয় নি।
–তবে কি ছাই দিয়েছে। তোর বউকে শিগগির ডাক।
নাতবউ শিবানী আধঘোমটা দিয়ে ঘরে এল। জয়রাম বললেন, এই শিবি, আজ পেশোয়ারী চালের চাট্টি পোলাও করবি, শুধু আমার জন্যে, বুঝলি? পাঁচ ভূতকে খাওয়ালে ওই টুকু চাল কদিন টিকবে। নতুন বাজার থেকে ভাল পোনা মাছ আনিয়ে দই আদা লংকা গরম মসলা দিয়ে গরগরে করে কালিয়্য রাঁধবি
ডাক্তার উমেশ গুহ বললেন, পোলাও কালিয়া এখন থাকুক সার। আপনার এ বয়সে লঘু পথ্যই ভাল।
–হুঁ। বয়সটা কত ঠাওর করেছ ডাক্তার?
–সেকি, জানেন না? আজ যে আপনি এক শ বছরে পা দিয়েছেন, তাই তো আমরা জয়ী করছি। এমন দীর্ঘ আয়, কত লোকের ভাগ্যে হয়!
–এক শ বছর না তোমার মুণ্ডু। মোটে সত্তর, এই তো সবে সেদিন পয়ষট্টি বছর বয়সে রিটায়ার করলুম। এই শিবে শালা আর ওর বাপ হরে ব্যাটা মিছিমিছি বয়স বাড়িয়ে আমাকে ভয় দেখায়, না খাইয়ে মেরে ফেলতে চায়, আমার সম্পত্তির ওপর ওদের দারণ টান। শাস্ত্রে লিখেছে না-পত্ৰাদপি ধনভাজাং ভীতিঃ। উমেশ ডাক্তারকেও ওরা হাত করেছে।
শিবানী বলল, কারও কথা শুনবেন না দাদ, আপনার জন্যে পোলাও কালিয়াই রাঁধব। তার পর ডাক্তারের দিকে চেয়ে ফিসফিস করে বলল, শিউলি-বোঁটার রঙ দেওয়া গলা ভাত আর শিঙিমাছের ঝোল।
জয়রাম বললেন, শিবি, তোর দেখছি একটু দয়ামায়া আছে। দুটো ল্যাংড়া আম ছাড়িয়ে দে তো দিদি, আর খান দুই চন্দ্রপুলি, দেখি কেমন উপহার দিয়েছে। চট করে দে, বড়সায়েব আসবার আগেই খেয়ে নি।
–সেকি দাদা, একটু আগেই তো দুধ-সন্দেশ খেলেন। বিকেল বেলা একটু আম আর চন্দ্রপুলি খাবেন এখন।
-সব বেটা বেটী শালা শালী সমান, আমাকে উপোস করিয়ে মেরে ফেলতে চায়। দাঁড়া, সবাইকে কলা দেখাচ্ছি। আমি ফের বিয়ে করব, নতুন বউকে সব সম্পত্তি দেব।
শিবরাম বলল, এমন গুঞ্ছড়ে যাবো বরকে বিয়ে করবে কে?
–লটকী নর্স বিয়ে করবে। এই লটকী, তোকে পঞ্চাশ ভরি। গোট দেব, দু হাতে দশ-দশ গাছ চুড়ি দেব, এই বাড়িখানা তোকে দেব, বিয়ে করতে রাজী আসিছ?
নর্স লতিকা বলল, আহা আগে বলেন নি কেন কাবাবু আর একজনকে যে কথা দিয়ে ফেলেছি। আপনি দেখুন না, যদি বুঝিয়ে সুজিয়ে কি ভয় দেখিয়ে লোকটাকে ভাগাতে পারেন।
নর্স চলে গেলে শিবরাম বলল, দাদ, বেশ তো, লতিকা খাস্তগিরকে বিয়ে কর, মজা টের পাবে। যেমন তুমি চোখ বুজবে অমনি তোমার পেয়ারের লটকী একটা জোয়ান বর বিয়ে করবে আর মনের সাধে দুজনে তোমার সম্পত্তি ওড়াবে।
শিবরামের বড়সায়েব হ্যারি সিমসন এসে পড়লেন। যাঁরা ঘরে ছিলেন তাঁরা সকলেই উঠে গেলেন। মহা খাতির করে শিবরাম সায়েবকে জয়রামের কাছে নিয়ে এল।
জয়রামের শীর্ণ হতে ঝাঁকুনি দিয়ে সিমসন বললেন, হাডুডু, এ গ্রেট ডে নন্দী বাব। আপনার জন্মদিন আরও বহুবার আসক এই কামনা করি। ইউ লক ভেরি ওয়েল।
হাত জোড় করে গদগদ স্বরে জয়রাম বললেন, অ্যাজ ইউ হ্যাভ কেল্ট মি সার, যেমন আমাকে রেখেছেন। উইশ হউ লঙ লাইফ, ইউ, ইওর মিসিস অ্যান্ড চিলড্রেন। লং লিভ মেসার্স সিমসন স্মিথ অ্যান্ড কম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, লঙ লিভ কুইন ভিক্টোরিয়া অ্যাণ্ড ব্রিটিশ এম্পায়ার–
শিবরাম বলল, কি বলছ দাদ, কুইন ভিক্টোরিয়া তো ষাট বছর হল মরেছেন।
-বেগ ইওর পাড়ন। লঙ লিভ কুইন এলিজাবেথ নম্বর ট, আই অ্যাম হ্যর মোস্ট অম্বল সবজেক্ট সার।
সিমসন সহাস্যে বললেন, নন্দী বাবু, আপনাদের দেশ বারো বৎসর হল ইনডিপেন্ডেন্ট হয়েছে, তার খবর রাখেন না?
হাত নেড়ে জয়রাম বললেন, নো ইনডিপেন্ডেন্স সার। অ্যাশ, ওনলি অ্যাশ, শুধু ছাই। চাল পঁয়ত্রিশ টাকা, পোনা মাছ পাঁচ টাকা, নো পিওর ঘি।
–যুদ্ধের পর যেমন সব দেশে তেমনি আপনাদের দেশেও দাম চড়ে গেছে। কিন্তু লোকের আয়ও তো বেশ বেড়েছে। দেদার নতুন নতুন বিল্ডিং উঠছে, পথে অসংখ্য মোটর কার চলছে–
-থীভস সার, অল থীভস। ব্রিটিশ আমলে আমাদের ছেলে ভাইপো শালা জামাইএর চাকরি জোটানো সহজ ছিল, কারণ আপনদের আত্মীয়রা কেউ তুচ্ছ কেরানীর কাজ চাইতেন না। কিন্তু এখন একটা সামান্য পোস্টের জন্যে বড় বড় কর্তারা সুপারিশ পাঠান, তাঁদেরও এক পাল বেকার আত্মীয় আছে কিনা?
–তা হলেও তো আপনাদের এই ইণ্ডিয়ান ইউনিয়নের লোকে মোটের ওপর সুখে আছে।
–ননা সার, মোস্ট অনহ্যাপি। ইউনিয়ন অভ রিচ রাসকেলস, ফলস লীডার্স, অ্যান্ড প্রোটেকটেড গণ্ডাজ। পুওর নেহরু, ইজ হেল্পলেস।
জয়রাম ক্রমশ উত্তেজিত হচ্ছেন দেখে সিমসন বললেন, পলিটিক্স থাকুক, আপনার নিজের কথা বলুন নন্দী বাব।
স্মিতমুখে জয়রাম বললেন, সার, ইউ উইল বি হ্যাপি ট হিয়ার, আমি আবার বিবাহ করছি। একটি ভাল ইয়ং লেড়ি, আমার অবর্তমানেও যে ফেথফল থাকবে।
–রিয়ালি? নন্দীবাবু তার চাইতে একটি গুড ওল্ড লেডি বিয়ে করাই তো ভাল, আপনার যত্ন নেবে।
জয়রাম ঠোঁট উলটে বললেন, ওল্ড লেডি নো গুড।
–আপনি নিজে কি রকম?
—আই ভেরি গুড। আপনাদের তেরোটা ডিপার্টমেন্ট আমি একাই ম্যানেজ করতে পারি। সার, আমার কথা থাকুক, হোমের কথা বলুন। বড়ই মন্দ খবর শুনেছি।
-কি রকম?
