ফুল্লরা বলল, বছরের মধ্যে একটি দিন পাঁচ জামাই আর পাঁচ মেয়ে একত্র হবে, একটু ভাল খাওয়া দাওয়া করবে, জামাইকে তত্ত্ব পাঠানো হবে—এতে অন্যায়টা কি? তোমার দোকানদারি বুদ্ধি, কেবল মুনাফাই বোঝ। বংশের যা দস্তুর আছে তা কি ছাড়া যায়? দেনা তো সব বনেদী বংশেরই থাকে, তার জন্যে ভাববার কিছু নেই, আমার ভাইরা শোধ করবে।
মহাবীর বলল, আমার কিন্তু ঘোর আপত্তি আছে।
—খরচ করবেন আমার বাবা, তোমার মাথাব্যথা কেন? যেরকম একগুঁয়ে তুমি, জামাইষষ্ঠী বয়কট করবে না তো?
—নিমন্ত্রণ পেলে অবশ্যই রক্ষা করব, কিন্তু পোলাও কালিয়া চপ কাটলেট সন্দেশ রাবড়ি চর্ব্য—চূষ্য রাজভোগ খাব না।
—তবে খাবে কি, কচু না ছাতু?
—ছাতুই খাব।
—তোমার যেরকম বেয়াড়া গোঁ, ওখানে না যাওয়াই তোমার পক্ষে ভাল, একটা কেলেঙ্কারি করে বসবে। নিমন্ত্রণের চিঠি এলে একটা ছুতো করো, দোকানে কাজের চাপ, তাই যেতে পারব না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মহাবীর বলল, নিমন্ত্রণ এলে নিশ্চয়ই যাব, না এলেও যাব।
—দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করবে নাকি?
—দক্ষযজ্ঞে শিব নিজে যান নি, অনুচর বীরভদ্রকে পাঠিয়েছিলেন। সেরকম অনুচর আমার নেই, তাই নিজেই যাব। আমি কোনও উপদ্রব করব না, নিঃশব্দে অসহযোগ জানাবো।
[ অসমাপ্ত ]
জয়রাম-জয়ন্তী
জয়রাম নন্দী কোনও অসাধারণ মহাপুরুষ নন, তিনি শুধু অসাধারণ দীর্ঘজীবী। আজ তাঁর শততম জন্মদিন, তাই তাঁর আত্মীয়রা একটু জয়ন্তীর আয়োজন করেছেন। পোলাও আর মাংস রান্না হচ্ছে, কিন্তু এ বাড়িতে নয়, একটু দরে অন্য বাড়িতে, নয়তো বড়ো গন্ধ পেয়ে খাবার জন্যে আবদার করবে।
সকালে কমলানেবুর রস আর দুধ-সন্দেশ খাইয়ে বাইরের ঘরে একটা তক্তপোশে অনেকগুলো বালিশে ঠেস দিয়ে জয়রামকে বসানো হয়েছে। আজ রবিবার, সকলেরই ফুরসত আছে। স্বজনবর্গ একে একে এসে প্রণাম করছে, উপহার দিচ্ছে, দু-চারটে কথা বলে অনেকে চলে যাচ্ছে, কেউ বা অল্পক্ষণের জন্যে বসছে।
বয়সের তুলনায় জয়রামের শরীর ভালই আছে। বুভপ্রেশার বেশী নেই, ডায়াবিটিস নেই, বাত নেই। চোখে ছানি পড়ে নি, তবে দৃষ্টি কমে গেছে। খাবার লোভ খুব আছে, কিন্তু পেটরোগা। কানে কখনও ভাল শোনেন, কখনও খুব কম শোনেন। দোষের মধ্যে মাঝে মাঝে স্মৃতির ওলটপালট হয়, অতীত আর বর্তমান গুলিয়ে ফেলেন, কেউ প্রতিবাদ করলে চটে ওঠেন। মেজাজ সাধারণত ভালই থাকে, গল্প করতে ভালবাসেন, মাঝে মাঝে প্রলাপ বকেন, আবার বুদ্ধিমানের মতন কথাও বলেন। খবর জানবার আগ্রহ খুব আছে, কাগজে কি লিখেছে তা তাঁর নাতির কাছ থেকে প্রত্যহ শোনেন। বেশী তামাক খাওয়া বারণ, কিন্তু জয়রাম হাত থেকে গড়গড়ার নল নামাতে চান না, কলকে নিবে গেলেও টের পান না।
সিমসন স্মিথ অ্যান্ড কম্পানির অফিসে জয়রাম চল্লিশ বছর চাকরি করেছেন, শেষ বিশ বছর বড়বাবুর পদে ছিলেন। মনিবরা উদার, জয়রামকে মোেটা পেনশন দেন। তিনি অবসর নিলে তাঁর ছেলে হরেরাম ওই পদ পান। চার বছর হল হরেরামও অবসর নিয়েছেন, এখন তিনি নবদ্বীপে বাস করছেন। তাঁর ছেলে, অর্থাৎ জয়রামের নাতি শিবরাম ওই ফামেই কাজ করে, তারও ভবিষ্যতে বড়বাবু হবার আশা আছে।
জয়রাম তিনবার বিবাহ করেছিলেন, এখন তিনি বিপত্নীক। স্নান, কাপড় বদলানো, খাওয়া, মুখ ধোয়া ইত্যাদি নানা কাজে তাঁকে পরের সাহায্য নিতে হয়। রাত্রে অনেক বার তাঁর জন্যে প্রস্রাবের পাত্র এগিয়ে দিতে হয়, সকালে এনিমাও দিতে হয়। একজন দক্ষ চাকর এইসব কাজ করত, কিতু জয়রামের গালাগালি সইতে না পেরে সে চলে গেছে। অগত্যা সম্প্রতি একজন নস বহাল করা হয়েছে, লতিকা খাস্তগির। পাস করা নর্স নয়, সেজন্যে তার চার্জ কম। সে সন্ধ্যায় আসে, বেলা আটটায় চলে যায়। তার সেবায় জয়রাম এখন পর্যন্ত তুই আছেন।
আগন্তুক আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে জয়রাম প্রসন্ন মনে গল্প করছেন আর মাঝে মাঝে গড়গড়ার নির্ধম নল টানছেন, এমন সময় তার নাতি শিবরাম এসে বলল, দাদ, মস্ত খবর, আমাদের বড়সায়েব মিস্টার সিমসন তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন।
জয়রাম বললেন, বলিস কি রে, সার চার্লস সিমসন?
–আঃ, তোমার কিছুই মনে থাকে না। সার চালস তো তোমার চাইতেও বড় ছিলেন, সেই কবে মান্ধাতার আমলে মারা গেছেন। তাঁর নাতি হ্যারি সিমসন এখন সিনিয়র পার্টনার, তিনিই গুড উইশ জানাতে আসছেন। তোমার সঙ্গে ফার্মের কত কালের সম্পর্ক তা জানেন কিনা।
–জানবেই তো, কত বড় বংশের সায়েব। কিন্তু বসতে দিবি কিসে? বাড়িতে একটাও ভাল চেয়ার নেই।
–ভেবো না, তার ব্যবস্থা আমি করেছি।
জয়রাম চঞ্চল হয়ে বললেন, ওরে শিব, চট করে আমার সেই জীনের পাতলন আর মোর চাপকানটা বের করে আমাকে পরিয়ে দে। তোর বউএর কাছ থেকে একটু খোসবায় এনে ভাল করে মাখিয়ে দিস, যাতে ন্যাফথালিনের গন্ধ চাপা পড়ে। আর, একটা উড়নি বেশ করে কুচিয়ে পাকিয়ে দে, গলায় দেব। আর, আমার ঘড়ি, ঘড়ির চেন, সার চালস সিমসন যা দিয়েছিলেন।
-কেন শুধু শুধু ব্যস্ত হচ্ছ দাদ, তুমি যা পরে আছ সেই সাজেই সায়েবের সঙ্গে দেখা করবে। খাতির জানাবার জন্যে কাগ তাড়ুয়া সাজবার কোনও দরকার নেই।
উপস্থিত স্বজনবর্গের দিকে সগর্বে দৃষ্টিপাত করে জয়রাম বললেন, উঃ, মস্ত লোক ছিলেন সার চালস সিমসন। আমাকে কি রকম স্নেহ করতেন, হরদম ডাকতেন, ন্যাণ্ডি ব্যাব, ন্যাণ্ডি ব্যাব। ওরে শিব, জন্মদিনের উপহার কি সব এল তা তো দেখালি নি।
