দর্বী উলটাইয়া কুম্ভের ঢাকনি ঝটিতি বন্ধ করিয়া যম কহিলেন—’হে জাবালে, এই কোপনস্বভাব ঋষিগণের কাঠিন্য দূর হইতে এখনও বহু বিলম্ব আছে। ইঁহারা আরও অষ্টাহকাল পরিসিদ্ধ হইতে থাকুন।’
এমন সময় কয়েকজন যমদূতের সহিত খর্বট খল্লাট খালিত বিষণ্ণবদনে কুম্ভীপাকের গর্ভগৃহে প্রবেশ করিলেন।
জাবালি কহিলেন—’হে ভ্রাতৃগণ, তোমরা এখানে কেন, ব্রহ্মলোকে কি স্থানাভাব ঘটিয়াছে?’
খর্বট উত্তর দিলেন—’জাবালে, তুমি বিরক্ত করিও না, আমরা এখানে তদারক করিতে আসিয়াছি।’
যমরাজের ইঙ্গিতে কিংকরগণ বালখিল্যত্রয়কে একত্র বাঁধিয়া উত্তপ্ত পঞ্চগব্যপূর্ণ এক ক্ষুদ্রাকার কুম্ভে নিক্ষেপ করিল। কুম্ভ হইতে তীব্র চিৎকার উঠিল এবং সঙ্গে সঙ্গে কৃতান্তের বাপান্তকর বাক্যসমূহ নির্গত হইতে লাগিল। ধর্মরাজ কর্ণে অঙ্গুলি প্রদান করিয়া সরিয়া আসিয়া বলিলেন—’হে মহর্ষে, এই নরকের অনুষ্ঠানসকল অতিশয় অপ্রীতিকর, কেবল বিপন্না ধরিত্রীর রক্ষাহেতুই আমাকে তাহা সম্পন্ন করিতে হয়। যাহা হউক, আমি আর তোমার মূল্যবান সময় নষ্ট করিব না, এখন তোমার প্রতি আমার যাহা কর্তব্য তাহাই পালন করিব। দেখ, যে পাপ মনের গোচর তাহা আমি সহজেই দূর করিতে পারি। কিন্তু যাহা মনের অগোচর তাহা জন্মজন্মান্তরেও সংক্রমিত হয়, এবং তাহা শোধন করিতে হইলে কুম্ভীপাকে বার বার নিষ্কাশন আবশ্যক। তোমার যাহা কিছু দুষ্কৃত আছে তাহা তুমি জানিয়া শুনিয়াই দৌর্বল্যবশাৎ করিয়া ফেলিয়াছ, কদাপি আত্মপ্রবঞ্চনা কর নাই। সুতরাং আমি তোমাকে সহজেই পাপমুক্ত করিতে পারিব, অধিক যন্ত্রণা দিব না।’
এই বলিয়া কৃতান্ত জাবালিকে সুবৃহৎ লৌহসংদংশে বেষ্টিত করিয়া একটি তপ্ত সম্পূর্ণ কুম্ভে নিক্ষেপ করিলেন। ছ্যাঁক করিয়া শব্দ হইল।
সহস্র বিহগকাকলিতে বনভূমি সহসা ঝংকৃত হইয়া উঠিল। প্রাচীদিক নবারুণ কিরণে আরক্ত হইয়াছে। জাবালি চৈতন্য লাভ করিয়া সাধ্বী হিন্দ্রলিনীর অঙ্ক হইতে ধীরে ধীরে মস্তক উত্তোলন করিয়া দেখিলেন—সম্মুখে লোকপিতামহ ব্রহ্মা প্রসন্নবদনে মৃদুমধুর হাস্য করিতেছেন।
ব্রহ্মা বলিলেন— ‘বৎস, আমি প্রীত হইয়াছি। তুমি ইচ্ছানুযায়ী বর প্রার্থনা কর।’
জাবালি বলিলেন—’হে চতুরানন, ঢের হইয়াছে। আর বরে কাজ নাই। আপনি সরিয়া পড়ুন, আর ভেংচাইবেন না।’
ব্রহ্মা তাঁহার ভুর্জপত্ররচিত ছদ্মমুখ মোচন করিয়া কহিলেন—’জাবালে, অভিমান সংবরণ কর। তুমি বর না চাহিলেও, আমি ছাড়িব কেন? আমিও প্রার্থী। হে স্বাবলম্বী মুক্তমতি যশোবিমুখ তপস্বী, তুমি আর দুর্গম অরণ্যে আত্মগোপন করিও না, লোকসমাজে তোমার মন্ত্র প্রচার কর। তোমার যে ভ্রান্তি আছে তাহা অপনীত হউক, অপরের ভ্রান্তি তুমি অপনয়ন কর। তোমাকে কেহ বিনষ্ট করিবে না, অপরেও যেন তোমার দ্বারা বিনষ্ট না হয়। হে মহাত্মন, তুমি অমরত্ব লাভ করিয়া যুগে যুগে লোকে লোকে মানবমনকে সংসারের নাগপাশ হইতে মুক্ত করিতে থাক।’
জাবালি বলিলেন—’তথাস্তু।’
* বাল্মিকী রামায়ণ। অযোধ্যাকান্ড। হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য—কৃত অনুবাদ।
জামাইষষ্ঠী
[অসমাপ্ত । গল্পটির পেনসিলে লেখা খসড়া পাণ্ডুলিপি রাজশেখরের মৃত্যুর পরে পাওয়া যায়। লেখা অনেক আগের। শেষ করেন নি।]
মহাবীর প্রসাদ চৌধুরী—নাম অবাঙ্গালী হলেও লোকটি বাঙালী। তার উর্ধ্বতন তিন পুরুষ গোরক্ষপুরে বাস করতেন তাই ভাষায় আর আচার ব্যবহারে কিছু হিন্দী প্রভাব এসেছে। মহাবীর কলকাতায় এম. এ. ফিফথ ইয়ার পর্যন্ত পড়েছিল, সেই সময় থার্ড ইয়ারের ফুল্লরার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বাপের মৃত্যুর পর থেকে মহাবীর পড়া ছেড়ে দিয়ে হ্যারিসন রোডের পৈতৃক কাপড়ের দোকানটি চালাচ্ছে। সম্প্রতি ফুল্লরার সঙ্গে তার প্রেমোত্তর বিবাহ হয়েছে।
ফুল্লরার বাবা যদুগোপাল চন্দননগরে থাকেন, তিনি বনেদী বংশের সন্তান, কিন্তু এখন অবস্থা মন্দ হয়েছে। অনেক খরচ করে পাঁচ মেয়ের বিবাহ ভাল ঘরেই দিয়েছেন, দুজন সরকারী কর্মচারী, একজন অ্যাটর্নি, একজন প্রফেসর। শুধু ছোট জামাই মহাবীর দোকানদার। যদুগোপাল আগেকার চাল বদলাতে পারেন নি, তার ফলে তাঁর দেনা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। তিনি আশা করেন তাঁর দুই ছেলের ওকালতি আর ডাক্তরিতে ভাল পসার হবে এবং তারাই সব দেনা শোধ করবে।
একগুঁয়ে বলে মহাবীরের বদনাম আছে। শ্বশুরবাড়ির লোকেদের কাছে তাকে কিছু উপহাস আর গঞ্জনা সইতে হয়েছে। সে অনেক উপাধি পেয়েছে—খোট্টা, মেড়ো, ছাতুখোর, কাপড়াবালা, রামভকত, হনুমানজী ইত্যাদি। শালীরা বলেছে, তোমার দোকান তুলে দাও, একটা চাকরি যোগাড় করে নাও। ভগ্নিপতি কাপড় বিক্রী করে—এই পরিচয় দেওয়া যায় নাকি? স্ত্রী ফুল্লরার শাসনে তার কথাবার্তা অনেকটা দুরস্ত হয়েছে, এখন সে ঘৈলা লোটা গলাস কটোরা না বলে কলসী ঘটি গেলাস বাটি বলে।
যদুগোপালবাবুর বাড়িতে খুব আড়ম্বর করে জামাইষষ্ঠী হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি ফুল্লরা মহাবীরকে বলল, জামাইষষ্ঠী এসে পড়ল, আমি ছোড়দার সঙ্গে পরশু চন্দননগর যাচ্ছি। দিদিরা ত আগেই পৌঁছে গেছে। এবারকার ভোজে একটু বেশী ঘটা হবে। এখান থেকে দুজন বাবুর্চি যাবে, একগাড়ি আইসক্রীমও যাবে।
মহাবীর বলল, ঘটা করার কি দরকার। আমরা পাঁচটি জামাই কি পাঁচটি রাক্ষস যে ভূরিভোজন না করলে চলবে না? শ্বশুর মশায়ের তো শুনেছি মোটারকম দেনা আছে, এখন অনর্থক খরচ করাই অন্যায়। তুমি আর তোমার দিদিরা বারণ কর না কেন?
