দেবতাগণের খ্যাতি আছে— তাঁহারা অন্তর্যামী। কিন্তু বস্তুতঃ তাঁহাদিগকেও সাধারণ মনুষ্যের ন্যায় গুজবের উপর নির্ভর করিয়া কাজ করিতে হয় এবং তাহার ফলে জগতে অনেক অবিচার ঘটিয়া থাকে। অচিরে দেবরাজ ইন্দ্রের নিকট সমাচার অসিল যে মহাতেজা জাবালি মুনি শতদ্রু তীরে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন আছেন,— তাঁহার অভিসন্ধি কি তাহা এখনও সম্যক অবধারিত হয় নাই, তবে সম্ভবতঃ তিনি ইন্দ্রত্ব বিষ্ণুত্ব কিংবা ঐরূপ কোনও একটা পরমপদ আয়ত্ত না করিয়া ছাড়িবেন না। দেবরাজ চিন্তিত হইয়া আজ্ঞা দিলেন—’উর্বশীকে ডাক।’
মাতলি আসিয়া করজোড়ে নিবেদন করিলেন—’হে দেবেন্দ্র! উর্বশী আর মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হইতে চাহে না—’
ইন্দ্র কহিলেন—’হুঁ, তার ভারি তেজ হইয়াছে।’
দেবর্ষি নারদ কহিলেন—’মর্ত্যের কবিগণই স্তুতি করিয়া তাহার মস্তকটি ভক্ষণ করিয়াছেন। এখন কিছুকাল তাহাকে বিরাম দাও, দিনকতক অমরাবতীতে আবদ্ধ থাকিলে আপনিই সে মর্ত্যলোকে যাইবার জন্য আবদার ধরিবে। জাবালির জন্য অন্য কোনও অপ্সরা পাঠাও।’
মাতলি বলিলেন—’মেনকা তার কন্যাকে দেখিতে গিয়াছে। তিলোত্তমাকে অশ্বিনীকুমারদ্বয় এখনও তিন মাস বাহির হইতে দেবেন না। অলম্বুষার পা মচকাইয়াছে, নাচিতে পারিবে না। অষ্টাবক্র মুনি দেবগণের উপর বিমুখ হইয়া বাঁকিয়া বসিয়াছেন, রম্ভা তাঁহাকে সিধা করিতে গিয়াছে। নাগদত্তা হেমা সোমা প্রভৃতি তিন শত অপ্সরাকে লঙ্কেশ্বর রাবণ অপহরণ করিয়াছেন। বাকী আছে কেবল মিশ্রকেশী ও ঘৃতাচী।’
ইন্দ্র বিরক্ত হইয়া বলিলেন—’আমাকে না জানাইয়া কেন অপ্সরাদের যত্রতত্র পাঠানো হয়? মিশ্রকেশী ঘৃতাচীর বয়স হইয়াছে, তাহাদের দ্বারা কিছু হইবে না।’
নারদ বলিলেন—’হে ইন্দ্র, সেজন্য চিন্তা করিও না। জাবালিও যুবা নহেন। একটু গৃহিণী—বাহিনী—জাতীয়া অপ্সরাই তাঁহাকে ভালরকম বশ করিতে পারিবে।’
ইন্দ্র বলিলেন—’মিশ্রকেশীর চুল পাকিয়াছে, সে থাক। ঘৃতাচীকে পাঠাইবার ব্যবস্থা কর। তাহাকে একপ্রস্থ সূক্ষ্ম চীনাংশুক ও যথোপযুক্ত অলংকারাদি দাও। বায়ু, তুমি মৃদুমন্দ বহিবে। শশধর, তুমি মন্দাকিনীতে স্নান করিয়া উজ্জ্বল হইয়া লও। কন্দর্প, তুমি সেই অভ্রের পোশাকটা পরিয়া যাইবে, আবার যাতে ভস্ম না হও। বসন্ত, তুমি সঙ্গে এক শত কোকিল লইবে।’
নারদ বলিলেন—’আর এক শত বন্যকুক্কুট। ঋষি বড়ই মাংসাশী।’
ইন্দ্র বলিলেন—’আচ্ছা, তাহাও লইবে। আর দশ কুম্ভ ঘৃত, দশ স্থালী দধি, দশ দ্রোণী গুড় এবং অন্যান্য ভোজ্যসম্ভার। যেমন করিয়া হউক জাবালির ধ্যান ভঙ্গ করা চাই।’
সমস্ত আয়োজন শেষ হইলে ঘৃতাচী জাবালিবিজয়ে যাত্রা করিলেন।
জাবালির তপোবনে তখন ঘোর বর্ষা। মেঘে পর্বতে একাকার হইয়া দিগন্তে নিবিড় প্রাচীর রচনা করিয়াছে। শতদ্রুর গৈরিকবর্ণ জলে পালে পালে মৎস্য বিচরণ করিতেছে। বনে ভেকবংশের চতুর্প্রহরব্যাপী মহোৎসব চলিতেছে।
সন্ধ্যার প্রাককালে ঘৃতাচী অনুচরবর্গসহ জাবালির আশ্রমে পৌঁছিলেন। আক্রমণের উদযোগ করিতে তাঁহাদের কিছুমাত্র বিলম্ব হইল না, কারণ বহুবার এইরূপ অভিযান করিয়া তাঁহারা পরিপক্ক হইয়াছেন। নিমেষের মধ্যে মেঘ দূরীভূত হইল, ময়লানিল বহিতে লাগিল, শতদ্রুর স্রোত মন্দীভূত হইল, নির্মল আকাশে পূর্ণচন্দ্র উঠিল, পাদপসকল পুষ্পস্তবকে ভূষিত হইল, অলিকুল গুঞ্জরিতে লাগিল, ভেকগণ নীরব হইয়া পল্বলে লুকাইল।
জাবালি শতদ্রুতীরে ছিপহস্তে নিবিষ্টমনে মাছ ধরিতেছিলেন। আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তিনি বিচলিত হইয়া চারিদিকে চাহিতে লাগিলেন। সহসা ঋতুরাজ বসন্তের খোঁচা খাইয়া নিদ্রাতুর কোকিলকুল আকুল চিৎকার করিয়া উঠিল। জাবালি চমকিত হইয়া পিছন ফিরিয়া দেখিলেন, এক অপূর্ব রূপলাবণ্যবতী দিব্যাঙ্গনা কটিতটে বামকর, চিবুকে দক্ষিণকর নিবদ্ধ করিয়া নৃত্য করিতেছে।
ধীমান জাবালি সমস্ত ব্যাপারটি চট করিয়া হৃদয়ঙ্গম করিলেন। ঈষৎ হাস্যে বলিলেন—’অয়ি বরাঙ্গনে, তুমি কে, কি নিমিত্তই বা এই দুর্গম জনশূন্য উপত্যকায় আসিয়াছ? তুমি নৃত্য সংবরণ কর। এই সৈকতভূমি অতিশয় পিচ্ছিল ও উপলবিষম। যদি আছাড় খাও তবে তোমার ঐ কোমল অস্থি আস্ত থাকিবে না।’
অপাঙ্গে বিলোল কটাক্ষ স্ফূরিত করিয়া ঘৃতাচী কহিলেন—’হে ঋষিশ্রেষ্ঠ, আমি ঘৃতাচী স্বর্গাঙ্গনা। তোমাকে দেখিয়া বিমোহিত হইয়াছি, তুমি প্রসন্ন হও। এই সমস্ত দ্রব্যসম্ভার তোমারই। এই ঘৃতকুম্ভ দধিস্থালী গুড়দ্রোণী সকলই তোমার। আমিও তোমার। আমার যা কিছু আছে—নাঃ থাক।’ —এই পর্যন্ত বলিয়া লজ্জাবতী ঘৃতাচী ঘাড় নীচু করিলেন।
জাবালি বলিলেন—’অয়ি কল্যাণী, আমি দীনহীন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ। গৃহিণীও বর্তমানা। তোমার তুষ্টি বিধান করা আমার সাধ্যের অতীত। অতএব তুমি ইন্দ্রালয়ে ফিরিয়া যাও। অথবা যদি তোমার নিতান্তই মুনি ঋষির প্রতি ঝোঁক হইয়া থাকে তবে অযোধ্যায় গমন কর। তথায় খর্বট খল্লাট খালিতাদি মুনিগণ আছেন, তাঁদের মধ্যে যাঁকে ইচ্ছা এবং যতগুলিকে ইচ্ছা তুমি হেলায় তর্জনীহেলনে নাচাইতে পারিবে। আর যদি তোমার অধিকতর উচ্চাভিলাষ থাকে তবে ভার্গব দুর্বাসা কৌশিক প্রভৃতি অনলসংকাশ উগ্রতেজা মহর্ষিগণকে জব্দ করিয়া যশস্বিনী হও। আমাকে ক্ষমা দাও।’
