হিন্দ্রলিনী কহিলেন—’হে মহাতপা মুনিগণ, আমার স্বামী সরযূতটে ধ্যানস্থ আছেন। তিনি শীঘ্রই ফিরিয়া আসিবেন, আপনারা ততক্ষণ ঐ কুটির—অলিন্দে আসন গ্রহণ করিয়া বিশ্রাম করুন।’
বালখিল্যগণের অগ্রণী মহামুনি খর্বট কহিলেন—’ভদ্রে, তোমার ঐ অলিন্দ ভূমি হইতে বিতস্তিত্রয় উচ্চ, আমরা নাগাল পাইব না। অতএব এই প্রাঙ্গণেই আসন পরিগ্রহ করিলাম, তুমি ব্যস্ত হইও না।’
জাবালি তখন সরযূতীরে জম্বুবৃক্ষতলে আসীন হইয়া চিন্তা করিতেছিলেন—এই অন্নজলাবলম্বী মানবশরীরে পঞ্চভূতের কিংবিধ সংস্থান হইলে সুবুদ্ধির উৎপত্তি হয় এবং কিরূপেই বা মূর্খতা জন্মে। অপরন্তু, লাঠ্যেïষধি দ্বারা দেহস্থ পঞ্চভূত প্রকম্পিত করিলে মূর্খতা অপগত হইয়া যে সুবুদ্ধির উদয় হয়, তাহা স্থায়ী কিনা। এই জটিল তত্ত্বের মীমাংসা কিছুতেই করিতে না পারিয়া অবশেষে জাবালি উঠিয়া পড়িলেন এবং আশ্রমে ফিরিয়া আসিলেন।
জাবালি বালখিল্যগণকে কহিলেন—’অহো, আজ আমার কি সৌভাগ্য যে খর্বট খালিত প্রভৃতি মহামুনিগণ আমার এই আশ্রমে সমাগত! হে মুনিবৃন্দ, তোমাদের তো সর্বাঙ্গীণ কুশল? যাগযজ্ঞ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হইতেছে তো? ঋষিভুক রাক্ষসগণ তোমাদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টিপাত করে না তো? তোমাদের সেই কপিলা গাভীটির বাচ্চা হইয়াছে? রাজগুরু বশিষ্ঠ তোমাদের জন্য যথেষ্ট গব্যদ্রব্যের ব্যবস্থা করিয়াছেন তো?’
মহামুনি খর্বট দর্দুরধ্বনিবৎ গম্ভীরনাদে কহিলেন—’জাবালে, ক্ষান্ত হও। আপ্যায়নের জন্য আমরা আসি নাই। তুমি পাপপঙ্কে আকন্ঠ নিমগ্ন হইয়া আছ, আমরা তোমাকে উদ্ধার করিতে আসিয়াছি। প্রায়োপবেশন চান্দ্রায়ণাদি দ্বারা তোমার কিছু হইবে না। আমরা অথর্বোক্ত পদ্ধতিতে তোমাকে অগ্নিশুদ্ধ করিব, তাহাতে তুমি অন্তে পরমা গতি প্রাপ্ত হইবে। তুষানল প্রস্তুত, তুমি আমাদের অনুগমন কর।’
জাবালি বলিলেন—’হে খর্বট, তোমাদিগকে কে পাঠাইয়াছেন? রাজপ্রতিভূ ভরত, না রাজগুরু বশিষ্ঠ? আমার উদ্ধারসাধনের জন্য তোমরাই বা অত ব্যগ্র কেন? আমি অতি নিরীহ বানপ্রস্থাবলম্বী প্রৌঢ় ব্রাহ্মণ, কখনও কাহারও অনিষ্ট করি নাই, তোমাদের প্রাপ্য দক্ষিণারও অংশভাক হই নাই। তোমরা আমার পরকালের জন্য ব্যস্ত না হইয়া নিজ নিজ ইহকালের জন্য যত্নবান হও।’
তখন অতিকোপনস্বভাব খল্লাট ঋষি অশ্বধ্বনিবৎ কম্পিতকণ্ঠে বলিলেন—’রে তপোধন, তুমি অতি দুরাচার ধর্মভ্রষ্ট নাস্তিক। তোমার বাসহেতু এই অযোধ্যাপুরী অশুচি হইয়াছে, ধর্মাত্মা বিপ্রগণ অতিষ্ঠ হইয়াছেন। আমরা ভরত বা বশিষ্ঠ কাহারও আজ্ঞাবাহী নহি। ব্রাহ্মণ্যের রক্ষাহেতু আমরা প্রজাপতি ব্রহ্মা কর্তৃক সৃষ্ট হইয়াছি। তুমি আর বাক্যব্যয় করিও না, প্রস্তুত হও।’
জাবালি বলিলেন—’হে বালখিল্যগণ, আমি স্বেচ্ছায় যাইব না। তোমরা আমাকে ব্রহ্মতেজোবলে উত্তোলন কর।’
জাবালির শালপ্রাংশু বিরাট বপু দেখিয়া বালখিল্যগণ কিয়ৎক্ষণ নিম্নকণ্ঠে জল্পনা করিলেন। অবশেষে গলিতদন্ত খালিত মুনি স্খলিত স্বরে কহিলেন— ‘হে জাবালে, যদি তুমি অগ্নিপ্রবেশ করিতে নিতান্তই ভীত হইয়া থাক তবে প্রায়শ্চিত্তের নিষ্ক্রয়স্বরূপ তিন শূর্প তিল ও শত নিষ্ক কাঞ্চন প্রদান কর। আমরা যথাবিহিত যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা তোমাকে পাপমুক্ত করিব।’
জাবালি কহিলেন—’আমার এক কপর্দকও নাই, থাকিলেও দিতাম না।’
তখন খর্বট খল্লাট খালিতাদি মুনিগণ সমস্বরে কহিলেন—’রে নরাধম, তবে আমরা অভিসম্পাত করিতেছি, শ্রবণ কর। সাক্ষী চন্দ্র সূর্য তারা, সাক্ষী দেবগণ পিতৃগণ দিক—পালগণ বষটকারগণ—’
জাবালি বলিলেন—’শৌণ্ডিকের সাক্ষী মদ্যপ, তস্করের সাক্ষী গ্রন্থিচ্ছেদক। হে বালখিল্যগণ, বৃথা দেবতাগণকে আহ্বান করিতেছ, তাঁহারা আসিবেন না। বরং তোমরা জুজুগণ ও কর্ণকর্তকগণকে স্মরণ কর।’
হিন্দ্রলিনী বলিলেন—’হে আর্যপুত্র, তুমি কেন এই অল্পায়ু অপোগণ্ড অকালপক্ক কুষ্মাণ্ডগণের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা করিতেছ, উহাদিগকে খেদাইয়া দাও।’
বালখিল্যগণ কহিলেন—’রে রে রে রে—’
জাবালি তখন তাঁহার বিশাল ভূজদ্বয়ে বালখিল্যগণকে একে একে তুলিয়া ধরিয়া প্রাঙ্গণবেষ্টনীর পরপারে ঝুপ ঝুপ করিয়া নিক্ষেপ করিলেন।
বালখিল্যগণ প্রস্থান করিলে জাবালি বলিলেন—’প্রিয়ে, আমাদেরআর অযোধ্যায় বাস করা চলিবে না, কখন কোন দিক হইতে উৎপাত আসিবে তাহার স্থিরতা নাই। অতএব কল্য প্রত্যুষেই আমরা এই আশ্রম ত্যাগ করিয়া দূরে কোনও নিরুপদ্রব স্থানে যাত্রা করিব।’
পরদিন উষাকালে সস্ত্রীক জাবালি অযোধ্যা ত্যাগ করিলেন। কয়েকজন অনুগত নিষাদ তাঁহাদের সামান্য গৃহোপকরণ বহন করিয়া অগ্রে অগ্রে পথপ্রদর্শনপূর্বক চলিল। মাসাধিক কাল তাঁহারা নানা জনপদ গিরি নদী বনভূমি অতিক্রম করিয়া অবশেষে হিমালয়ের সানুদেশে শতদ্রুতীরে এক রমণীয় উপত্যকায় উপস্থিত হইলেন।
জাবালি তথায় পর্ণকুটীর রচনা করিয়া সুখে বাস করিতে লাগিলেন। পর্বতবাসী কিরাতগণ তাঁহার বিশাল দেহ, নিবিড় শ্মশ্রু ও মধুর সদয় ব্যবহার দেখিয়া মুগ্ধ হইল এবং নানাপ্রকার উপঢৌকন দ্বারা সংবর্ধনা করিল। জাবালি তথায় বিবিধ দূরহ তত্ত্বসমূহের অনুসন্ধানে নিবিষ্ট রহিলেন এবং অবসরকালে শতদ্রু নদীতে মৎস্য ধরিয়া চিত্তবিনোদন করিতে লাগিলেন।
