ঘৃতাচী কহিলেন—’হে জাবালে, তুমি নিতান্তই নীরস। তোমার ঐ বিপুল দেহ কি বিধাতা শুষ্ক কাষ্ঠে নির্মাণ করিয়াছেন? তুমি দীনহীন তাতে ক্ষতি কি, আমি তোমাকে কুবেরের ঐশ্বর্য আনিয়া দিব। তোমার ব্রাহ্মণীকে বারাণসী প্রেরণ কর। তিনি নিশ্চয়ই লোলাঙ্গী বিগতযৌবনা। আর আমার দিকে একবার দৃষ্টিপাত কর—চিরযৌবনা, নিটোলা নিখুঁতা। উর্বশী মেনকা পর্যন্ত আমাকে দেখিয়া ঈর্ষায় ছটফট করে।’
জাবালি সহাস্যে কহিলেন—’হে সুন্দরী, কিছু মনে করিও না। তুমিও নিতান্ত খুকীটি নহ। তোমার মুখের লোধ্ররেণু ভেদ করিয়া কিসের রেখা দেখা যাইতেছে? তোমার চোখের কোলে ও কিসের অন্ধকার? তোমার দন্তপঙক্তিতে ও কিসের ফাঁক?’
ঘৃতাচী সরোষে কহিলেন—’হে মূর্খ, তুমি নিশ্চয়ই রাত্র্যন্ধ, তাই অমন কথা বলিতেছে। পথশ্রমের ক্লান্তিহেতু আমার লাবণ্য এখন সম্যক স্ফূর্তি পাইতেছে না। আগে সকাল হোক, আমি দুধের সর মাখিয়া চান করি, তখন দেখিও, মুণ্ড ঘুরিয়া যাইবে—’ এই বলিয়া ঘৃতাচী আবার নৃত্য শুরু করিলেন।
অদূরবর্তী দেবদারুবৃক্ষের অন্তরালে থাকিয়া জাবালিপত্নী সমস্ত দেখিতেছিলেন। ঘৃতাচীর দ্বিতীয়বার নৃত্যারম্ভে তিনি আর আত্মসংবরণ করিতে পারিলেন না, সম্মার্জনীহস্তে ছুটিয়া আসিয়া ঘৃতাচীর পৃষ্ঠে ঘা—কতক বসাইয়া দিলেন।
তখন কন্দর্প বসন্ত শশধর মলয়ানিল সকলেই মহাভয়ে ব্যাকুল হইয়া বেগে পলায়ন করিলেন। আকাশ আবার জলদজালে আচ্ছন্ন হইল, দিঙমন্ডল তিমিরাবৃত হইল, কোকিলকুল ঢুলিতে লাগিল, মধুকরনিকর উদভ্রান্ত হইয়া পরস্পরকে দংশন করিতে লাগিল, শতদ্রু স্ফীত হইল, ভেককুল মহা উল্লাসে বিকট কোলাহল করিয়া উঠিল।
জাবালি পত্নীকে কহিলেন—’প্রিয়ে, স্থিরা ভব। ইনি স্বর্গাঙ্গনা ঘৃতাচী, ইন্দ্রের আদেশে এখানে আসিয়াছেন—ইহার অপরাধ নাই।’
হিন্দ্রলিনী কহিলেন—’হলা দগ্ধাননে নির্লজ্জে ঘেঁচী, তোর আস্পর্ধা কম নয় যে আমার স্বামীকে বোকা পাইয়া ভুলাইতে আসিয়াছিস! আর, ভো অজ্জউত্ত, তোমারই বা কি প্রকার আক্কেল যে এই উৎকপালী বিড়ালাক্ষী মায়াবিনীর সহিত বিজনে বিশ্রম্ভালাপ করিতেছিলে!’
জাবালি তখন সমস্ত ব্যাপার বিবৃত করিয়া অতি কষ্টে পত্নীকে প্রসন্না করিলেন এবং রোরুদ্যমানা ঘৃতাচীকে বলিলেন—’বৎসে, তুমি শান্ত হও। হিন্দ্রলিনী তোমার পৃষ্ঠে কিঞ্চিৎ ইঙ্গুদীতৈল মর্দন করিয়া দিলেই ব্যথার উপশম হইবে। তুমি আজ রাত্রে আমার কুটীরেই বিশ্রাম কর। কল্য অমরাবতীতে ফিরিয়া গিয়া দেবরাজ ইন্দ্রকে আমার প্রীতিসম্ভাষণ এবং ঘৃত—দধি—গুড়াদির জন্য বহু ধন্যবাদ জানাইও।’
ঘৃতাচী কহিলেন—’তিনি আমার মুখদর্শন করিবেন না। হা, এমন দুর্দশা আমার কখনও হয় নাই।’
জাবালি বলিলেন—’তোমার কোনও ভয় নাই। তুমি দেবেন্দ্রকে জানাইও যে ইন্দ্রত্বের উপর আমার কিছুমাত্র লোভ নাই, তিনি স্বচ্ছন্দে স্বর্গরাজ্য ভোগ করিতে থাকুন।’
ঘৃতাচীর পরাভব শুনিয়া দেবরাজ ইন্দ্র নারদকে কহিলেন—’হে দেবর্ষে, এখন কি করা যায়? জাবালি ইন্দ্রত্ব চাহেন না জানিয়াও আমি নিশ্চিন্ত হইতে পারিতেছি না। জনরব শুনিতেছি যে, ঐ দুর্দান্ত ঋষি সমস্ত দেবতাকেই উড়াইয়া দিতে চায়।’
নারদ কহিলেন—’পুরন্দর, তুমি চিন্তিত হইও না। আমি যথোচিত ব্যবস্থা করিতেছি।’
নৈমিষারণ্যে সনকাদি ঋষিগণের সকাশে দেবর্ষি নারদ আসিয়া জিজ্ঞাসিলেন—’হে মুনিগণ, শাস্ত্রে উক্ত আছে, সত্যযুগে পুণ্য চতুষ্পাদ, পাপ নাস্তি। কিন্তু এই ত্রেতা—যুগে পুণ্য ত্রিপাদ মাত্র এবং একপাদ পাপও দেখা দিয়েছে। ইহার হেতু কি তোমরা তাহা চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ কি?’
মুনিগণ বলিলেন—’আশ্চর্য, ইহা আমরা কেহই ভাবিয়া দেখি নাই।’
নারদ বলিলেন—’তবে তোমাদের যাগযজ্ঞ জপতপ সমস্তই বৃথা।’ ইহা কহিয়া তিনি তাঁহার কাষ্ঠবাহনে আরোহণপূর্বক ব্রহ্মার নিকট অপর এক ষড়যন্ত্র করিতে প্রস্থান করিলেন।
মুনিগণ নারদীয় প্রশ্নের মীমাংসা করিতে না পারিয়া এক মহতী সভা আহ্বান করিলেন। জম্বু, প্লক্ষ, শাল্মলী, প্লবাদি, সপ্তদীপ হইতে বিবিধ শাস্ত্রজ্ঞ বিপ্রগণ নৈমিষারণ্যেও সমবেত হইলেন। মহর্ষি জাবালি আমন্ত্রিত হইয়া আসিলেন।
অনন্তর সকলে আসন গ্রহণ করিলে সভাপতি দক্ষ প্রজাপতি কহিলেন—’ভো পণ্ডিতবর্গ! সত্যযুগে পুণ্য চতুষ্পাদ ছিল, এখন তাহা ত্রিপাদ হইয়াছে। কেন এমন হইল এবং ইহার প্রতিকার কি, যদি তোমরা কেহ অবগত থাক তবে প্রকাশ করিয়া বল।’
তখন জ্বলন্ত পাবকতুল্য তেজস্বী জামদগ্ন্য মুনি কহিলেন—’ হে প্রজাপতে, এই পাপাত্মা জাবালিই সমস্ত অনিষ্টের মূল! উহার সংস্পর্শে বসুন্ধরা ভারগ্রস্তা হইয়াছেন।’
সভাস্থ পণ্ডিতমণ্ডলী বলিলেন—’ঠিক, ঠিক, আমরা তাহা অনেকদিন হইতেই জানি।’
জামদগ্ন্য কহিলেন—’এই জাবালি ভ্রষ্টাচার উম্মার্গগামী নাস্তিক। ইহার শাস্ত্র নাই, মার্গ নাই। রামচন্দ্রকে এই পাষণ্ডই সত্যধর্মচ্যুত করিতে চেষ্টা করিয়াছিল। বালখিল্যগণকে এই দুরাত্মাই নির্যাতিত করিয়াছে। দেবরাজ পুরন্দরকেও এই পাপিষ্ঠ হাস্যাস্পদ করিয়াছে। ইহাকে বধ না করিলে পুণ্যের নষ্টপাদ উদ্ধার হইবে না।’
পণ্ডিতগণ কহিলেন—’আমরাও ঠিক তাহাই ভাবিতেছিলাম।’
দক্ষ প্রজাপতি কহিলেন—’হে জাবালে, সত্য করিয়া কহ তুমি নাস্তিক কিনা। তোমার মার্গ কি, শাস্ত্রই বা কি।’
