প্রথম প্রথম তিনি মসজিদে বসিয়া ও পরে ক্রমে সমবেত মুসল্লিদের সামনে দাঁড়াইয়া চক্ষু বড় করিয়া হাত পা ছুঁড়িয়া উদ্দেশ্যে হানাফীদিগকে গালি পাড়িতেন। এইভাবে বক্তৃতায় অভ্যস্ত হইয়া ক্রমে বাহাসের সভায় যোগ দিলেন এবং শুধু যোগ দিলেন না– নামও করিলেন।
হাজি সাহেব খুশি হইলেন। আদর করিয়া বাবা বলিয়া পিঠে হাত বুলাইলেন।
ইসমাইল সাহেব হাজি সাহেবের কদমবুচি করিলেন।
সেইদিন হইতে হাজি সাহেবের বাড়িতেই ইসমাইল সাহেবের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত হইল।
.
দুই
হানাফী-মোহাম্মদীর বাহাস ক্রমে খুবই জনপ্রিয় হইয়া উঠিল।
দূরবর্তী স্থানসমূহ হইতেও বাহাসের দাওয়াৎ আসিতে লাগিল।
চতুর্দিকে একটা জাগরণের সাড়া পড়িয়া গেল।
ইসমাইল সাহেব হাজি সাহেবকে নানা যুক্তি-তর্কের দ্বারা বুঝাইলেন যে, একটা কাগজ বাহির না করিলে প্রচারকার্য চালাইবার পক্ষে সুবিধা হইবে না; শুধু বাহাসের মজুলিস করিয়া বিশেষ কোনও ফল পাওয়া যাইবে না; একটা কাগজ বাহির করিয়া তাতে মোহাম্মদী মযহাবের দলিলাদি পেশ করিয়া হানাফী মযহাবের অসারত্ব প্রমাণ করিয়া দিলে দলে দলে হানাফী মোহাম্মদী মত অবলম্বন করিবে। এই উপলক্ষ্যে খ্রিস্টান পাদ্রীদের ধর্ম প্রচারের পদ্ধতি সম্বন্ধে স্বীয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তিনি হাজী সাহেবের নিকট খুব চটকদার করিয়া বর্ণনা করিলেন।
হাজি সাহেব সমস্ত শুনিয়া বলিলেন : সত্য নাকি বাবা?
ইসমাইল সাহেব খুব জোরের সঙ্গে বলিলেন : নিশ্চয়, হুজুর।
দশ হাজার টাকা খরচ করিয়া প্রেস কেনা হইল। হাজি সাহেবের প্রকাণ্ড বাড়ির এক অংশে প্রেস বসিল। আর এক কামরায় আফিস হইল।
‘আহলে-হাদিস-গুর্ষ’ নামক কাগজ বাহির হইল। ইসমাইল সাহেবই সম্পাদক হইলেন। তিনি নিজের সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য বিনা-বেতনেই এই দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন।
হাজি সাহেব বলিলেন : ইসমাইল মিয়া একটা মানুষ। খোদা একদিন তার এই ত্যাগের বদলা দিবেন।
‘আহলে-হাদিস-গুর্য’ চলিল। চলিল মানে বিলি-বিতরণ হইতে লাগিল। কাগজ কলমে হানাফী-নিন্দার ঝড় বহিতে লাগিল।
ক্রমে হানাফী নিন্দার সঙ্গে-সঙ্গে ইংরাজদের নিন্দাও কিছু কিছু হইতে লাগিল।
ইসমাইল সাহেব কিছুটা জাতীয়তাবাদী হইয়া পড়িলেন।
হাজি সাহেব শুনিতে পাইয়া একদিন বলিলেন : বাবা ইসমাইল; হানাফীদের সঙ্গেই আমাদের লড়াই, ইংরাজদের সঙ্গে ত আমাদের কোনও দুশমনি নেই।
ইসমাইল সাহেব বলিলেন : তা বটে, কিন্তু আজকালকার লোকেরা মতিগতি যে কি রকম হয়ে গেছে, ইংরাজকে গাল না দিয়ে কাগজ বিকায় না। গ্রাহক বেশি না হলে কাগজে যে কেবলই লোকসান হবে। আপনাকে আর কতকাল খরচান্ত করাব?
হাজি সাহেব সজোরে মাথা নাড়িয়া বলিলেন : না-না না হোক লোকসান। ইংরাজ রাজা, তাকে গাল দিয়ে শেষকালে কি একটা ফ্যাসাদে পড়ব? আমি লাভের জন্য কাগজ করি নাই; লোকসান হয় আমার হবে; খবরদার, তুমি ইংরাজদের বিরুদ্ধে কিছু লিখো না। পুলিশের হাঙ্গামার মধ্যে আমি নাই।
ইহার কিছুদিন পরে এক ভদ্রলোক হাজি সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে আসিলেন। গম্ভীর মুখে হাজি সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিলেন : আপনারা আহলে-হাদিস-গুর্য’ নামে কাগজ চালান?
–হাঁ, চালাই।
–এই কাগজের উপর সরকারের কুনজর পড়েছে।
–কেন, আমার কাগজে ত ইংরাজদের বিরুদ্ধে কোন কথা থাকে না।
–তা না থাক, সরকারের আরও গুরুতর সন্দেহ হয়েছে। আপনার কাগজের আফিস সীমান্তের ওহাবী কাফেলার শাখা।
হাজি সাহেব মাথায় হাত দিয়া কাঁদ কাঁদ স্বরে বলিলেন : কি হবে তবে, বাবা ইসমাইল।
ইসমাইল সাহেব আগন্তকের সহিত কটাক্ষ বিনিময় করিয়া বলিলেন : পুলিশে আমাদের ভয় কিসের? আমরা ত নির্দোষ।
আগন্তক বলিলেন : হোন নির্দোষ; কিন্তু পুলিশ খানাতল্লাশ না করে ছাড়বে না।
ইসমাইল সাহেব ক্রোধে হাত নাড়িয়া বলিলেন : খানাতল্লাশ করে পাবে কচু। আমরা এখানে ঢাল তলোয়ার বা বোমা লুকিয়ে রেখেছি, না?
আগন্তকও একটু উষ্ণ হইয়া বলিলেন : পাবে না কিছু মানলাম, কিন্তু ভদ্রলোকের বাড়িতে খানাতল্লাশ কত অপমানজনক, তা আপনি খেয়াল করছেন না।
ইসমাইল সাহেব ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন : মান অপমান আমরা বুঝব। কে আপনি যে আমাদের ভয় দেখাতে এসেছেন।
–আমি পুলিশেরই লোক। তবে আমিও মুসলমান, তাই মুসলমান ভদ্রলোকের ইয্যতের জন্য আগে থেকে সাবধান করতে এসেছিলাম, আপনাদের গাল শুনতে আসি নাই। চললাম।
হাজি সাহেব ইসমাইল সাহেবের দিকে চাহিয়া বলিলেন : কাজটা ভাল করলে না, বাবা। পুলিশের লোক চটিয়া দিলে? এখন কি হবে?
ইসমাইল সাহেব উপেক্ষার সঙ্গে বলিলেন : কি আর হবে? খানাতল্লাশ করে পাবে
পাক নাপাক তার কথা পরে। আমার বাড়িতে পুলিশ হানা দিবে এ অপমান আমি সহ্য করব?
–আপনি যা হয় আদেশ করুন। আমার মনে হয়, ভয়ের কোন কারণ নাই।
হাজি সাহেব কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন : ভয়ের কথা নয় বাবা, মান অপমানের কথা।
হাজি সাহেব সেইদিন বিকালে ইসমাইল সাহেবকে বলিলেন : অন্য কোথাও বাড়ি ভাড়া কর। সমস্ত প্রেস, আহলে-হাদিস-গুর্যের আফিস আমার বাড়ি থেকে সরাও। আমার বাড়িতে খানাতল্লাশ হতে দেব না। আর দেখ, প্রেস কিপারের স্থানে আমার নাম কেটে অন্য কারও নাম লিখিয়ে নাও। বুড়া বয়সে কোথায় আল্লাহ্-আল্লাহ করব, তা না করে ও-সব হাঙ্গামায় আমি কেন?
