শুধু হাতে আর কতকক্ষণ বাহাস চলে? কাজেই দুই পক্ষই সামিয়ানার খুঁটি ভাঙ্গিয়া বাহাস চালাইতে লাগিল। এ সবেও যখন অকুলান হইল, তখন উভয় পক্ষই বাড়ি হইতে রশদ সরবরাহ করিতে লাগিল।
মওলানা সাহেবরা এইরূপ বেদাঅতি ধরনে বাহাস করিতে রাজি ছিলেন না বলিয়া সভাস্থল ত্যাগ করিলেন।
কিন্তু জনতার বাহাস চলিতে লাগিল।
পুলিশ কোন মতেই শান্তিরক্ষা করিয়া উঠিতে পারিল না। কারণ জেহাদরত এই বিরাট জনতার সাহসের সামনে ধর্মহীন ঐ গুটিকতক পুলিশের সাহস কিছুতেই যথেষ্ট বিবেচিত হইল না।
ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়া দারোগা সাহেব কোতোয়ালিতে খবর দিতে নিজেই চলিয়া গেলেন।
দারোগা সাহেবের অনুপস্থিতিতে পুলিশরা দূরে দাঁড়াইয়া শান্তিরক্ষার উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন।
অবশেষে বাহাস থামিল। ততক্ষণ উভয় পক্ষে কয়েকজন হত এবং বহু আহত হইয়াছে। সুতরাং পুলিশের কর্তব্য সাধনে বিশেষ অসুবিধা হইল না। ইতিমধ্যে লাল পাগড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি হইল। তাহারা তখন সদম্ভে বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়া গ্রেফতার ও খানাতল্লাশ করিতে লাগিল।
দেখা গেল, লাল পাগড়ির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম একদম সাদাপাগড়ি শূন্য হইয়া গিয়াছে।
গ্রামের বহুলোককে গ্রেফতার করিয়া হতহতদের লাশ আসামিদের কাঁধে তুলিয়া পুলিশ যে রাস্তায় কোতোয়ালির দিকে রওয়ানা হইল, সেটা ছিল হিন্দু পাড়া। তখন সে পাড়ায় স্বামী বিবাদানন্দের সভাপতিত্বে হিন্দুদের এক বিরাট সভায় বিধবা-বিবাহ প্রচলন ও অস্পৃশ্যতা বর্জনের প্রস্তাব গৃহীত হইতেছিল। সভার লোক খানিকক্ষণ সভার কাজ স্থগিত রাখিয়া সারি বাঁধিয়া দাঁড়াইয়া কোমড়ে-দড়ি-বাঁধা-কাঁধে-লাশের-ডুলি-বওয়া মুসলমানদের মিছিল দেখিল।
দীর্ঘদিন ধরিয়া পুলিশের তদন্ত চলিল। খানাতল্লাশে গ্রামকে-গ্রাম চাষ করিয়া ফেলিল। মেয়েদের এ-বাড়ি হইতে ও-বাড়ি টানা হ্যাঁচড়া করা হইল; পুলিশের সামনে তাহাদের বে-আবরু করা হইল। ধান-চাউল, লবণ-চিনি একাকার হইল।
সরেজমিনে তদন্ত খানাতল্লাশ ও জবানবন্দির হিড়িক যখন কাটিল, তখন সদরের মামলা শুরু হইল।
বৎসরাধিককাল মামলা চলিল। উভয় পক্ষই পুলিশ ও উকিলের পায়ে বহু টাকা ঢালিল। কেহ জমি বিক্রয় করিল, কেহ বাড়ি বিক্রয় করিল, কেহ কেহ সর্বস্ব খোয়াইল; এবং পরিমাণে গ্রামের প্রায় সকলেরই অল্প-বিস্তর জেল-জরিমানা হইল।
যাহাদের জরিমানা হইল, তাহারা কষ্টে-সৃষ্টে জরিমানা আদায় করিল। যাহাদের জেল হইল, তাহারা আপিল করিল। আপিলে সর্বস্বান্ত হইয়া শেষ পর্যন্ত জন-পঞ্চাশের কারাদণ্ড বহাল থাকিল।
নির্ধারিত দিনে যখন গ্রামের যুবক-বৃদ্ধ প্রায় পঞ্চাশজন কয়েদী আত্মসমর্পণের জন্য সদরের দিকে রওয়ানা হইল, তখন হিন্দু-পাড়ায় সর্বজনীন দূর্গাপূজা হইতেছিল। এতকালের অস্পৃশ্যরাও ব্রাহ্মণ-কায়েতের সঙ্গে মন্দিরে প্রবেশ করিতেছিল।
সাদত একটা নদীর পারে স্কুল-গৃহের ছায়ায় বসিয়া সেইদিকে একদৃষ্টে চাহিয়াছিল। সে একবার কারাগামী মুসলমানদের মিছিলের দিকে, আরেকবার নদীর ওপারে সর্বজনীন পূজারত হিন্দুদের দিকে এবং সর্বশেষে নিজের মাথার উপরকার সদ্য-পরিত্যক্ত স্কুল গৃহটির দিকে চোখ ফিরাইল।
একবিন্দু অশ্রু অতি ধীরে-ধীরে তাহার গণ্ড বাহিয়া গড়াইয়া পড়িল।
ওদিকে উভয় সম্প্রদায়ের মওলানার বাহাস সভার বিবরণ দুইটি পৃথক পুস্তিকা বাহির করিয়া বিনামূল্যে বিতরণ করিলেন। দেখা গেল, উভয় পক্ষের পুস্তিকাতেই দাবি করা হইয়াছে যে বাহাসে তাহাদেরই জয় হইয়াছে।
লিভরে-কওম
ইসমাইল সাহেব ক্ষণজন্মা পুরুষ।
স্কুল হইতে মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসা হইতে স্কুল, এইভাবে বত্সরের পর বৎসর বহু স্থান বদলাইয়াও যখন কোনমতেই তিনি শ্রেণীবিশেষের মায়াজাল ছিন্ন করিতে পারিলেন না, তখন মফস্বলের শিক্ষকদের অপক্ষপাত ন্যায়-বুদ্ধিতে সন্দিহান হইয়া পুত্রহীনা বিধবা ফুফুর একমাত্র দওলত ছাগলটা পাশের গ্রামের বাজারে বিক্রয় করিয়া কাহাকেও কিছু না বলিয়া সেই রাতেই কলিকাতার গাড়িতে চড়িয়া বসিলেন।
কলিকাতায় পৌঁছিয়া একটি মসজিদে আশ্রয় লইলেন।
মফস্বলের লোক তাহার কদর না বুঝিলেও কলিকাতার লোক তাহার প্রতিভার সম্মান করিল। গলার আওয়াজ মিষ্টি হওয়ায় প্রথমে সেই মসজিদের মোয়াজ্জিন ও পরে এমাম নিযুক্ত হইলেন।
মসজিদটি ছিল কলিকাতার অল্পসংখ্যক আহলে-হাদীস মসজিদের অন্যতম।
সুতরাং হানাফীদিগের নিন্দা-কুৎসাই ছিল এখানকার প্রধান আলোচ্য বিষয়। মসজিদের মোতাওয়াল্লি সওদাগর হাজি সাহেবকে যদি খোদা একদিনের জন্যও এ দেশের বাদশা বানাইয়া দিতেন, তবে তিনি দেশকে হানাফী শূন্য করিয়া ফেলিতেন। সেদিকে সুবিধা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আপাততঃ না থাকায় অগত্যা বাহাসের সভার আয়োজন করিয়া বেনারস ও অমৃতসর হইতে মওলানা আমদানি করিবার ব্যাপারে প্রচুর টাকা খরচ করিয়াই তিনি খোদার ঐ ভুলের প্রতিকার করিবার চেষ্টা করিতেছিলেন। ইসমাইল সাহেব হানাফীদের পরিচালিত মাদ্রাসা-স্কুলে হানাফী শিক্ষকদের নিকট পড়াশোনা করিয়া অনেকটা হানাফী-ভাবাপন্ন হইয়া পড়িলেও এখন হইতে তিনি অকস্মাৎ ভীষণ পাকা মোহাম্মদী বনিয়া গেলেন।
হানাফী-নিন্দায় অচিরকাল মধ্যে তিনি হাজি সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন।
