০০. লেখক সম্পর্কে দুটি কথা

মরহুম আবুল মনসুর আহমদ-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠকীর্তি ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইয়ের সপ্তম সংস্করণ প্রকাশনা উপলক্ষ্যে কয়েকটি কথা বলতে হয়।

আবুল মনসুর আহমদ-এর দীর্ঘ আশি বছরের জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। সাহিত্যের সেই দিকটা তিনি বেছে নিয়েছিলেন যেটা ছিল সবচেয়ে কঠিন–ব্যঙ্গ-সাহিত্য। সাহিত্যের অন্যান্য আঙ্গিনায়ও স্বচ্ছন্দ্যে পদচারণা করেছেন তিনি। যে অঙ্গনেই তিনি কাজ করেছেন সেখানেই শীর্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ব্যঙ্গ-সাহিত্য বলতে গেলে উভয় বাংলায় তিনিই ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর প্রতিটি স্যাটায়ারই কালোত্তীর্ণ। সমাজপতি, ধর্মগুরু, রাষ্ট্রপতি, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী যেখানেই তিনি কোন দুর্নীতির সন্ধান পেয়েছেন সেখানেই করেছেন কশাঘাত। তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের রসাঘাত কশাঘাতে রূপ নিয়ে সমাজকে পরিশোধিত করত। এ আঘাত ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ আচার অনুষ্ঠানকেই আক্রমণ করেনি–যারা এসব প্রসঙ্গ নিয়ে মিথ্যার জাল বুনন করতেন তাদেরকেও তিনি নাস্তানাবুদ করেছেন। এসব রচনার পাঠকদের মনে হবে চরিত্রগুলো সবই চেনা। এদের কার্যকলাপও জানা।

‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ তার দীর্ঘজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল। যারা এদেশে রাজনীতি করতে আগ্রহী তাদের সকলের জন্যে এই বইটি অবশ্য পাঠ্য। এতে রয়েছে এদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস। দেশীয় রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে হলে এর সঙ্গে আরও পড়তে হবে তার লেখা ‘বাংলাদেশের কালচার’, ‘শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু’, ‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ ইত্যাদি বইগুলো।

‘রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ একজাতীয় স্মৃতিকথা আত্মজীবনী। রাজনীতির স্মৃতি এতে স্থান পেয়েছে। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, ওকালতি ইত্যাদি কর্মজীবনের বহুমুখী স্মৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘আত্মকথা। এসবের একত্রে মিশ্রণ ঘটেছে বিশালাকারের ইংরাজি গ্রন্থ ‘End of a Betrayal’। ইংরেজি উপন্যাস সাহিত্যে তাঁর দুটি অমর কীর্তি ‘জীবন ক্ষুধা’ ও ‘আবেহায়াত’।

রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য দফতরসমূহের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য দফতরসমূহের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। সাহিত্য সম্পর্কে এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে, রসসাহিত্যে আজ পর্যন্ত উভয় বাংলার কেউ তার প্রতিভার সমকক্ষ এমনকি কাছাকাছিও আসতে পারেননি। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কলকাতার খাদেম, সুলতান, দি মুসলমান, মোহাম্মদী প্রভৃতি সাপ্তাহিক ও দৈনিক কৃষক, নবযুগ ও ইত্তেহাদের সম্পাদনাকালে তিনি অনেক ক্ষণজন্মা সাংবাদিক ও সম্পাদকের গুরু, প্রশিক্ষণদাতা ছিলেন। কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, রশীদ করিম, আহসান হাবিব, ফররুখ আহমদ, খোন্দকার আবদুল হামিদ, রোকনুজ্জামান খান, কে. জি. মুস্তাফা প্রমুখ ব্যক্তিগণ কোন না কোন সময়ে তার সহকর্মী ছিলেন।

এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে খ্যাতি, যশ, সম্মান যেমন ছিল তেমনি ছিল সামরিক শাসনকালের কারাযন্ত্রণা। সে কারণেই তিনি আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর লিখেছেন। ‘শোনা’ বা ‘পড়া নয়’। বিশাল ও বিস্তৃত কর্মজীবনে তিনি মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ নওশের আলী, খাজা নাজিমুদ্দিন, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মিঞা ইফতেখারউদ্দিন, মিঞা মাহমুদ আলী কাসুরী, জি. এম. সৈয়দ, মিঞা মমতাজ দৌলতানা, আবুল হাশিম প্রমুখের সংস্পর্শে আসেন এবং ব্রিটিশ ভারত ও পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর ছিল ব্যক্তিগত পরিচয় ও গভীর হৃদ্যতার সম্পর্ক। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল ‘তুমি তুমি’ পর্যায়ের। জাতীয় কবি নজরুলের সঙ্গে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সগৌরবে লেখককে লীডার বলতেন এবং নিজেকে তাঁর শিষ্য বলতেন সেই কলকাতার কলেজ জীবন থেকেই।

তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।

এদেশে রাজনীতি করেছেন অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য চর্চা করেছেন অনেক মহীরূহ। সাংবাদিকতা করেছেন অনেক তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। কিন্তু এসবের সমারোহ ঘটাতে পেরেছেন কয়জন?

সে হিসেবে আবুল মনসুর আহমদ এক ও অদ্বিতীয়।

— মহবুব আনাম

.

বিনীত আরয

পাক-ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ মরহুম আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইখানির ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হইল।

লেখক আজ জীবিত নাই। কিন্তু তাহার দুর্লভ সাহিত্যকর্ম জাতির সামনে চিরদিন তাহাকে স্মরণীয় করিয়া রাখিবে।

এখন যাহারা রাজনীতি করিতেছেন এবং ভবিষ্যতে যাহারা রাজনীতির মাধ্যমে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় নিজদিগকে উৎসর্গ করিবার লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োজিত রহিয়াছেন তাহাদের সকলের জন্য আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইখানি দিগ-দর্শন হিসাবে কাজ করিবে বলিয়া আমার বিশ্বাস।

আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর উদীয়মান প্রজন্মের সামনে একটি জীবন্ত ইতিহাস। মূলত ইহা শুধু একখানি গ্রন্থ নয়–ইহা একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস বা রাজনৈতিক দলিল (পলিটিক্যাল ডকুমেন্ট)। এই ডকুমেন্ট দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং মাস্টার্স শ্রেণীতে অবশ্য পাঠ্য থাকা উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য জাতির, যাঁহারা কর্ণধার তাঁহারা এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ আজ পর্যন্ত গ্রহণ করেন নাই।

সাধারণভাবে প্রকাশক হিসাবে নয়– দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে মরহুম আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ অর্থাৎ এই মূল্যবান পলিটিক্যাল ডকুমেন্ট আহরণের জন্য আমি আজ দেশের ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদগণের নিকট জানাইতেছি বিনীত আর।

— মহীউদ্দীন আহমদ
ঢাকা, ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫

.

পঞ্চম সংস্করণের ভূমিকা

ছাত্রাবস্থা হইতেই সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী এবং স্যার সৈয়দ আহমদ-এর একজন অনুসারী হিসাবে একটি বিশেষ রাজনৈতিক চিন্তা এবং আদর্শে বিশ্বাসী হইয়া আমার জীবন গড়িয়া উঠিয়াছে।

মরহুম আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইখানিতে আমার আজীবনের লালিত স্বপ্ন এবং সেই চিন্তা ও আদর্শের প্রতিচ্ছবি রহিয়াছে।

এই ঐতিহাসিক বইখানি ছাপাইবার জন্য অনেক প্রকাশক লালায়িত আছেন। আমি জানি তাহাদের সেই লালসা শুধু আর্থিক কারণে রাজনৈতিক বা জাতীয় কোন উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে নহে। কিন্তু এই বইখানি ছাপাইবার পিছনে আমার লালসা–আদর্শের, অর্থের নহে।

বইখানির লেখক মরহুম আবুল মনসুর আহমদ আমার মনের গভীরের সেই চিন্তা ও আদর্শের সন্ধান পাইয়াছিলেন এবং সেই কারণেই জীবদ্দশায় তিনি কখনই তাহার এই অমূল্য বইখানি প্রকাশনার সুযোগ হইতে আমাকে বঞ্চিত করেন নাই।

তাহার ইনতেকালের পর সময়ের বিবর্তনে সাময়িক পরিবর্তন হইলেও তাহার সুযোগ্য পুত্র এককালের সংগ্রামী ছাত্রনেতা, প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক, দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক এবং দেশের সর্বাধিক প্রচারিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার কলামিস্ট ভ্রাতৃপ্রতিম জনাব মহবুব আনাম তাহার সুযোগ্য পিতার মনের খবর জানিতেন বলিয়াই এই ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ প্রকাশনার দায়িত্ব এখনও পর্যন্ত আমার উপরেই রাখিয়াছেন।

জনাব মহবুব আনাম ইচ্ছা করিলে বইখানি প্রকাশনার দায়িত্ব অন্যকে দিয়া প্রচুর অর্থ পাইতে পারেন কিন্তু তিনি তাহা করেন নাই– তাহার এই উদারতা ও মহানুভবতার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ।

– প্রকাশক
১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯

০১. রাজনীতির ক খ

রাজনীতির ক খ
পয়লা অধ্যায়

১. পরিবেশ

পথ চলিতে-চলিতে গলা ফাটাইয়া গান গাওয়া পাড়া-গাঁয়ে বহুৎ পুরান রেওয়াজ। খেতে-খামারে মাঠে-ময়দানে ভাটিয়ালি গাওয়ারই এটা বোধ হয় অনুকরণ। আমাদের ছেলেবেলায়ও এটা চালু ছিল। আমরা মকতব-পাঠশালার পড়ুয়ারাও গলা ফাটাইতাম পথে-ঘাটে। তবে আমরা নাজায়েয গান গাইয়া গলা ফাটাইতাম না। গানের বদলে আমরা গলা সাফ করিতাম ফারসী গযল গাইয়া, বয়েত যিকির করিয়া এবং পাঠ্য-পুস্তকের কবিতা ও পুঁথির পয়ার আবির্তি (আবৃত্তি) করিয়া। এ সবের মধ্যে যে পয়ারটি আমার কচি বুকে বিজলি ছুটাইত এবং আজো এই বুড়া হাড়ে যার রেশ বাজে তা এই :

আল্লা যদি করে ভাই লাহোরে যাইব
হুথায় শিখের সাথে জেহাদ করিব।
জিতিলে হইব গাযী মরিলে শহিদ
জানের বদলে যিন্দা রহিবে তৌহিদ।

একটি চটি পুঁথির পয়ার এটি। তখনও বাংলা পুঁথিতে নযর চলে নাই। ‘মহাভা-মহাভা-রতে-রক’র মত বানান করিয়া পড়িতে পার মাত্র। কারণ তখন আমি আরবী-ফারসী পড়ার মাদ্রাসা নামক মকতবের তালবিলিম। চাচাজী মুনশী ছমিরদ্দিন ফরাসী ছিলেন আমাদের উস্তাদ। শুধু পড়ার উস্তাদই ছিলেন না। খোশ এলহানে কেরাত পড়া ও সুর করিয়া পুঁথি পড়ারও উস্তাদ ছিলেন তিনি। চাচাজী এবং হুসেন আলী ফরাযী ও উসমান আলী ফকির নামে আমার দুই মামুও পুঁথি পড়ায় খুব মশহুর ছিলেন। মিঠা দরা গলায় তারা যে সব পুঁথি পড়িতেন তার অনেক মিছরাই আমার ছিল একদম মুখস্থ। উপরের পয়ারটি তারই একটি। কেচ্ছা-কাহিনীর শাহনামা। আলেফ-লায়লা, কাছাছুল আম্বিয়া, শহিদে কারবালা, মসলা মসায়েলের ফেকায়ে-মোহাম্মদী ও নিয়ামতে-দুনিয়া ও আখেরাত ইত্যাদি পুঁথি কেতাবের মধ্যে দু’চার খানা ছোট-ছোট জেহাদী রেসালাও ছিল আমাদের বাড়িতে। পশ্চিম হইতে জেহাদী মৌলবীরা বছরে দুই-তিনবার আসিতেন। আমাদের এলাকায়। থাকিতেন প্রধানতঃ আমাদের বাড়িতে। তারাই বস্তানিতে লুকাইয়া আনিতেন এ সব পুস্তক। আমাদের বাড়িতে থাকিয়া এরা মগরেবের পর ওয়াজ করিতেন। চাঁদা উঠাইতেন। লেখাপড়া-জানা লোকের কাছে এই সব কিতাব বিক্রয় করিতেন নাম মাত্র মূল্যে।

এ সবের পিছনে একটু ইতিহাস আছে। আমার বড় দাদা অর্থাৎ দাদার জ্যেষ্ঠ সহোদর আশেক উল্লা ‘গাযী সাহেব’ বলিয়া পরিচিত ছিলেন। তিনি শহিদ সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর মোজাহিদ বাহিনীতে ভর্তি হন। কিভাবে এটা ঘটিয়াছিল, তার কোন লিখিত বিবরণী নাই। সবই মুখে মুখে। তবে জানা যায় দাদা জেহাদে যান আঠার-বিশ বছরের যুবক। প্রায় ত্রিশ বছর পরে ফিরিয়া আসেন প্রায় পঞ্চাশ বছরের বুড়া! প্রবাদ আছে তিনি বাংলা ভাষা এক রকম। ভুলিয়া গিয়াছিলেন। অনেক দিন পরে তিনি বাংলা রফত করিতে পারিয়াছিলেন। তার সম্বন্ধে আমাদের পরিবারের এবং এ অঞ্চলের আলেম-ফাযেল ও বুড়া মুরুব্বীদের মুখেই এসব শোনা কথা। আমার জন্মের প্রায় ত্রিশ বছর আগে গাখী সাহেব এন্তেকাল করিয়াছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে এ অঞ্চলে বহু প্রবাদ প্রবচন ও কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। তিনি বালাকুটের জেহাদে আহত হইয়া অন্যান্য মোজাহেদদের সাহায্যে পলাইয়া আত্মরক্ষা করেন। বহুদিন বিভিন্ন স্থানে ঘুরা ফেরা ও তবলিগ করিতে করিতে অবশেষে দেশে ফিরিয়া আসেন। পঞ্চাশ বছরের বুড়া জীবনের প্রথমে বিয়া-শাদি করিয়া সংসারী হন। এক মেয়ে ও এক ছেলে রাখিয়া প্রায় পয়ষট্টি বছর বয়সে মারা যান। বন্দুকের গুলিতে উরাতের হাড়ি ভাংগিয়া গিয়াছিল বলিয়া তিনি একটু খুঁড়াইয়া চলিতেন। তাছাড়া শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি সুস্থ সবল ছিলেন এবং গ্রামের যুবকদের তলওয়ার লাঠি ও ছুরি চালনার অদ্ভুত-অদ্ভুত কৌশল শিক্ষা দিতেন। ঐ সব অদ্ভুত উস্তাদী খেলের মধ্যে কয়েকটির কথা আমাদের ছেলেবেলাতেও গায়ের বুড়াদের মুখে-মুখে বর্ণিত হইত। অনেকে হাতে-কলমে দেখাইবার চেষ্টাও করিতেন। ঐসব কৌশলের একটি ছিল এইরূপ : চারজন লোক চার ধামা বেগুন লইয়া চার কোণে আট-দশ হাত দূরে দূরে দাঁড়াইত। দাদাজী তলওয়ার হাতে দাঁড়াইতেন চারজনের ঠিক কেন্দ্রস্থলে। তামেশগিররা চারদিক ঘিরিয়া দাঁড়াইত। একজন মুখে বুড়া ও শাহাদত আংগুল ঢুকাইয়া শিস দিত। খেলা শুরু হইত। ধামাওয়ালা চারজন একসংগে দাদাজীর মাথা সই করিয়া ক্ষিপ্র হাতে বেগুন ছুরিতে থাকিত। দাদাজী চরকির মত চক্রাকারে তলওয়ার ঘুরাইতে থাকিতেন। একটা বেগুনও তার গায় লাগিত না। ধামার বেগুন শেষ হইলে খেলা বন্ধ হইত। দেখা যাইত, সবগুলি বেগুনই দুই টুকরা হইয়া পড়িয়া আছে।

দাদাজী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পুলিশের নযরবন্দী ছিলেন। সপ্তাহে একবার থানায় হাযির দিতে হইত। তখনও ত্রিশাল থানা হয় নাই’ কতোয়ালিতেই তিনি হাযিরা দিতে যাইতেন।

আশেক উল্লা সাহেব ছিলেন আছরদ্দিন ফরাযী সাহেবের তিন পুত্রের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি তখন মাদ্রাসার ছাত্র। এই সময় আমাদের গ্রাম ধানীখোলা ওহাবী আন্দোলনের ছোট খাট কেন্দ্র ছিল। ডব্লিও, ডরিও, হান্টার সাহেবের ‘স্ট্যাটিসটিক স-অব-বেংগল’ নামক বহু তথ্যপূর্ণ বিশাল গ্রন্থের ৩০৮ পৃষ্ঠায় ধানীখোলাকে ‘ময়মনশাহী’ জিলার পঞ্চম বৃহৎ শহর বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ঐ পুস্তকের ৩০৯ পৃষ্ঠায় লেখা হইয়াছে : “জিলার সমস্ত সম্পদ ও প্রভাব ফরাযীদের হাতে কেন্দ্রিভূত। তাদের মধ্যে কয়েকজন বড়-বড় জমিদারও আছেন। এঁরা সবাই ওহাবী আন্দোলনের সমর্থক। অবশ্য এদের অধিকাংশই গরীব জোতদার। এদেরই মধ্যে অল্প-কয়েকজন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বিদ্রোহী ধর্মান্ধদের শিবিরে যোগ দিয়াছিল।”

হান্টার সাহেব-বর্ণিত এই ‘অল্প-কয়েকজন’ আসলে কত জন, কোথাকার কে কে ছিলেন, পূর্ব-পাকিস্তানের ইতিহাসের ভবিষ্যৎ গবেষকরাই তা ঠিক করিবেন। ইতিমধ্যে আমি সগৌরবে ঘোষণা করিতেছি যে আমার বড় দাদা গাযী আশেক উল্লা ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন। আমাদের পারিবারিক প্রবাদ হইতে জানা যায়, টাংগাইল (তৎকালীন আটিয়া) মহকুমার দুইজন এবং জামালপুর মহকুমার একজন মোজাহেদ-ভাই তার সাথী ছিলেন। দাদাজী জীবনের শেষ পর্যন্ত তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করিয়াছিলেন। ভাগ্যক্রমে দাদাজীর এন্তেকালের প্রায় ষাট বছর পরে আমি তাঁরই এইরূপ এক মোজাহেদ-ভাইর প্রপৌত্রীকে বিবাহ করিয়াছি।

ঐ সব বিবরণ হইতে বুঝা যায় ধানীখোলা এই সময় ওহাবী আন্দোলনের। ছোট খাট আখড়া ছিল এবং সেটা ছিল আমাদের বাড়িতেই। আমার আপন দাদাজী আরমাল্লা ফরাজী সাহেবের এবং আরও বহু মুরুব্বি আলেম-ফাযেলের মুখে শুনিয়াছি যে শহীদ সৈয়দ আহমদ বেরেলভী সাহেবের সহকর্মীদের মধ্যে মওলানা এনায়েত আলী এবং তার স্থানীয় খলিফা মওলানা চেরাগ আলী ও মওলানা মাহমুদ আলী এ অঞ্চলে তবলিগে আসিতেন এবং আমাদের বাড়িতেই অবস্থান করিতেন। এদের প্রভাবে আমার প্রপিতামহ আছরদ্দিন ফরাযী সাহেব তার জ্যেষ্ঠ এবং তৎকালে একমাত্র অধ্যয়নরত পুত্রকে মোজাহেদ বাহিনীতে ভর্তি করান। তার ফলে প্রতিবেশীও আত্মীয়-স্বজনের চক্ষে আমার পরদাতার মর্যাদা ও সম্মান বাড়িয়া যায়। তাই অবশেষে পারিবারিক মর্যাদায় পরিণত হয়।

আমরা ছেলেবেলায় এই ঐতিহ্যেরই পরিবেশ দেখিয়াছি। জেহাদী মওলানাদের আনাগোনা তখনও বেশ আছে। বিশেষতঃ মগরেবের ও এশার নমাযের মাঝখানে মসজিদে এবং এশার নমাযের পর খানাপনা শেষে বৈঠকখানায়, যেসব আলোচনা হইত তার সবই জেহাদ শহিদ হুর বেহেশত দুখ ইত্যাদি সম্পর্কে। এই সব আলোচনার ফলে আলেম-ওলামাদের সহবতে আমার শিশু-মনে ঐ সব দুর্বোধ্য কথার শুধু কল্পিত ছবিই রূপ পাইত। ফলে আমার মধ্যে একটা জেহাদী মনোভাব ও ধর্মীয় গোঁড়ামি দানা বাঁধিয়া উঠিতেছিল।

দাদাজী সম্বন্ধে কিম্বদন্তিগুলি আলেম-ফাযেল মোল্লা-মৌলবীদের মুখে বরঞ্চ কিছুটা সংযত হইয়াই বর্ণিত হইত। কিন্তু পাড়ার বুড়ারা চোখে দেখা বলিয়া যে সব আজগৈবি কাহিনী বয়ান করিতেন, তাতে আমার রোমাঞ্চ হইত এবং দাদাজীর মত ‘বীর’ হওয়ার খাহেশ দুর্দমনীয় হইয়া উঠিত। আমি জেহাদে যাইবার জন্য ক্ষেপিয়া উঠিতাম। কান্নাকাটি জুড়িয়া দিতাম। বেহশতে হুরেরা শরাবন-তহুর পিয়ালা হাতে কাতারে কাতারে শহিদানের জন্য দাঁড়াইয়া আছে, অথচ আমি নাহক বিলম্ব করিতেছি, এটা আমার কাছে অসহ্য মনে হইত। অবশ্য ঐ বয়সে হুরের আবশ্যকতা, তাদের চাঁদের মত সুরতের প্রয়োজনীয়তা অথবা শরাবন তহুরার স্বাদের ভাল-মন্দ কিছুই আমি জানিতাম না। তবু এইটুকু বুঝিয়া ছিলাম যে ঐগুলি লোভনীয় বস্তু। তা যদি না হইবে, তবে হুরের সুরতের কথা শুনিয়া রোমাঞ্চ হয় কেন?

কিন্তু জেহাদের খাহেশ আমার, মিটিল না। মুরুব্বিরা অত অল্প বয়সে বেহেশতে গিয়া দুরের কবলে পড়িতে আমাকে দিলেন না। তারা বুঝাইসেন শাহাদতের পুরা ফযিলত ও হুরের সুরত উপভোগ করিতে হইলে আরও বয়স হওয়া এবং লেখা-পড়া করা দরকার।

অতএব মন দিয়া পড়াশোনা করিতে ও চড়া গলায় সুর করিয়া জেহাদী কেতাব পড়িতে লাগিলাম। কেতাবের সব কথা বুঝিতাম না। তাই উস্তাদ চাচাজীকে জিগ্গাস করিতাম : চাচাজী, লাহোর কই শিখ কি? চাচাজী বুঝাইতেন? লাহোর হিন্দুস্থানেরও অনেক পশ্চিমে একটা মুল্লুক। আর শিখা শিখেরা আর দুশমন। হিন্দুদের মত দুশমন? না, হিন্দু-সে বতর। চাচাজীর কাছে আগে শুনিয়াছিলাম, ফিরিংগীরাই আমাদের বড় দুশমন। কাজেই জিগাইতাম : ফিরিংগীর চেয়েও চাচাজী জবাব দিতেন : ফিরিংগীরা তবু খোদা মানে, ঈসা পয়গাম্বরের উম্মত তারা। শিখেরা তাও না। ধরিয়া নিলাম, শিখেরা নিশ্চয়ই হিন্দু। সে যুগে হানাফী-মোহাম্মদীতে খুব বাহাস মারামারি ও মাইল মোকদ্দমা হইত। চাচাজী মোহাম্মদী পক্ষের বড় পাণ্ডা। তাঁর মতে হানাফীরা হিন্দু-সে বদৃতর। সেই হিন্দুরা আবার নাসারা-সে বতর। তার প্রমাণ পাইতে বেশী দেরি হইল না।

২. আত্মমর্যাদা-বোধ

আমাদের পাঠশালাটা ছিল জমিদারের কাছারিরই একটি ঘর। কাছারিঘরের সামন দিয়াই যাতায়াতের রাস্তা। পাঠশালায় ঘড়ি থাকিবার কথা নয়। কাছারিঘরের দেওয়াল-ঘড়িটাই পাঠশালার জন্য যথেষ্ট। কতটা বাজিল, জানিবার জন্য মাস্টার মশায় সময়-সময় আমাদেরে পাঠাইতেন। ঘড়ির কাঁটা চিনা সহজ কাজ নয় যে দুই-তিন জন ছাত্র এটা পারিত, তার মধ্যে আমি একজন।

কিছু দিনের মধ্যে একটা ব্যাপারে আমি মনে বিষম আঘাত পাইলাম। অপমান বোধ করিলাম। দেখিলাম, আমাদের বাড়ির ও গাঁয়ের মুরুব্বিরা নায়েব আমলাদের সাথে দরবার করিবার সময় দাঁড়াইয়া থাকেন। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝি নাই। আরও কিছু দিন পরে জানিলাম, আমাদের মুরুব্বিদেরে নায়েব-আমলারা ‘তুমি’ বলেন। নায়েব-আমলারা আমাদেরেও ‘তুই তুমি’ বলিতেন। আমরা কিছু মনে করিতাম না। ভাবিতাম, আমাদের মুরুব্বিদের মতই ওরাও আদর করিয়াই এমন সম্বোধন করেন। পরে যখন দেখিলাম, আমাদের বুড়া মুরুব্বিদেরেও তারা ‘তুমি’ বলেন, তখন খবর না লইয়া পারিলাম না। জানিলাম, আমাদের মুরুব্বিদেরে ‘তুমি’ বলা ও কাছারিতে বসিতে না দেওয়ার কারণ একটাই। নায়েব-আমলারা মুসলমানদেরে ঘৃণা-হেকারত করেন। ভ ভদ্রলোক মনে করেন না। তবে ত সব হিন্দুরাই মুসলমানদেরে ঘৃণা করে! হাতে নাতে এর প্রমাণও পাইলাম। পাশের গায়ের এক গণক ঠাকুর প্রতি সপ্তাহেই আমাদের বাড়িতে ভিক্ষা করিতে আসিত। কিছু বেশী চাউল দিলে সে আমাদের হাত গণনা করিত। আমাদেরে রাজা-বাদশা বানাইয়া দিত। এই গণক ঠাকুরকে দেখিলাম একদিন নায়েব মশায়ের সামনে চেয়ারে বসিয়া আলাপ করিতেছে। নায়েব মশাই তাকে ‘আপনি’ বলিতেছেন। এই খালি-পা খালি-গা ময়লা ধুতি-পরা গণক ঠাকুরকে নায়েব বাবু এত সম্মান করিতেছেন কেন? আমাদের বাড়িতে তাকে ত কোন দিন চেয়ারে বসিতে দেখি নাই। উত্তর পাইলাম, গণক ঠাকুর হিন্দু ব্রাহ্মণ। কিন্তু আমাদের মোল্লা-মৌলবীদেরেও ত নায়েব-আমলারা ‘আপনে’ বলেন না, চেয়ারে বসান না। আর কোনও সন্দেহ থাকিল না আমার মনে। রাগে মন গিরগির করিতে থাকিল।

কাছারির নায়েব-আমলাদের বড়শি বাওয়ায় সখ ছিল খুব। সারা গায়েব মাতব্বর প্রজাদের বড় বড় পুকুরে মাছ ধরিয়া বেড়ান ছিল তাঁদের অভ্যাস। অধিকারও ছিল। গাঁয়ের মাতব্বরদেরও এই অভ্যাস ছিল। নিজেদের পুকুর ছাড়াও দল বাঁধিয়া অপরের পুকুরে বড়শি বাইতেন তাঁরাও। কিন্তু পুকুরওয়ালাকে আগে খবর দিয়াই তারা তা করিতেন। কিন্তু নায়েব-আমলাদের জন্য পূর্ব অনুমতি দরকার ছিল না। বিনা-খবরে তারা যেদিন-যার-পুকুরে-ইচ্ছা যত-জন খুশি বড়শি ফেলিতে পারিতেন।

একদিন আমাদের পুকুরেও এমনিভাবে তারা বড়শি ফেলিয়াছেন। তাদের নির্বাচিত সুবিধাজনক জায়গা বাদে আমি নিজেও পুকুরের এক কোণে বড়শি ফেলিয়াছি। নায়েব বাবুরা ঘটা করিয়া সুগন্ধি চারা ফেলিয়ো হরেক রকমের আধার দিয়া বড়শি বাহিতেছেন। আর আমি বরাবরের মত চিড়ার আধার দিয়া বাহিতেছি। কিন্তু মাছে খাইতেছে আমার বড়শিতেই বেশী। নায়েব বাবুদের চারায় মাছ জমে খুব। কিন্তু মোটেই খায় না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়া নায়েব বাবু উচ্চসুরে আমার নাম ধরিয়া ডাকিয়া বলিলেন : তোর আধার কিরে?

‘তুই’ শুনিয়াই আমার মাথায় আগুন লাগিল। অতিকষ্টে রাগ দমন করিয়া উত্তর দিলাম : চিড়া।

নায়েব বাবু হাকিলেন : আমারে একটু দিয়া যা ত।

সমান জোরে আমি হাকিলাম ও আমার সময় নাই, তোর দরকার থাকে নিয়া যা আইসা।

নায়েব বাবু বোধ হয় আমার কথা শুনিতে পান নাই। শুনিলেও বিশ্বাস করেন নাই। আবার হাকিলেন : কি কইলে?

আমি তেমনি জোরেই আবার বলিলাম : তুই যা কইলে আমিও তাই কইলাম।

নায়েব বাবু হাতের ছিপটা খুঁড়িয়া ফেলিয়া লম্বা-লম্বা পা ফেলিয়া পানির ধার হইতে পুকুরের পাড়ে উঠিয়া আসিলেন। ওঁদের বসিবার জন্য পুকুর পাড়ের লিচু গাছ তলায় চেয়ার-টেয়ার পাতাই ছিল সেদিকে যাইতে-যাইতে গলার জোরে ‘ফরাযী! ও ফরাযী! বাড়ি আছ?’ বলিয়া দাদাজীকে ডাকিতে লাগিলেন। আমি বুঝিলাম, নায়েব বাবু ক্ষেপিয়া গিয়াছেন। সংগী আমলারাও নিশ্চয়ই বুঝিলেন।

তারাও যার-তার ছিপ তুলিয়া নায়েব বাবুর কাছে আসিলেন। আমি নিজের, জায়গায় বসিয়া রহিলাম। কিন্তু নযর থাকিল ঐদিকে। দাদাজীর ডাক পড়িয়াছে কিনা! তামেশগির পাড়ার লোকেরাও নায়েব বাবুকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়াছে। নায়ের বাবু আবার গলা ফাটাইয়া চিৎকার করিলেন : “ফরাজী, তোমারে কইয়া যাই, তোমার নাতি ছোকরা আমারে অপমান করছে। আমরা আর তোমার পুকুরে বড়শি বাইমু না। মুক্তাগাছায় আমি সব রিপোর্ট করুম।”

চিৎকার শুনিয়া আমার বাপ চাচা দাদা কেউ মসজিদ হইতে কেউ বাড়ির মধ্যে হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। সকলেই প্রায় সমস্বরে বলিলেন : কেটা আপনেরে অপমান করছে? কার এমন বুকের পাটা?

নায়েব বাবু সবিস্তারে বলিলেন, আমি তাকে তুই বলিয়াছি। আমার মুরুব্বিদের এবং সমবেত প্রতিবেশীদের সকলেই যেন ভয়ে নিস্তব্ধ হইয়া গেলেন। দাদাজী হুংকার দিয়া আমার নাম ধরিয়া ডাকিলেন : এদিকি আয়। পাজি, জলদি আয়।

আমি গিয়া দাদাজীর গা ঘেষিযা দাঁড়াইতে চাহিলাম। দাদাজী খাতির না করিয়া ধমক দিয়া বলিলেন : ওরে শয়তান, তুই নায়েব বাবুরে ‘তুই’ কইছস?

আমি মুখে জবাব না দিয়া মাথা ঝুকাইয়া জানাইলাম : সত্যই তা করিয়াছি।

দাদাজী গলা চড়াইয়া আমার গালে চড় মারিবার জন্য হাত উঠাইয়া, কিন্তু মারিয়া, গর্জন করিলেন : বেআদব বেত্তমি, তুই নায়েব বাবুরে ‘তুই’ কইলি কোন্ আক্কেলে?

এবার আমি মুখ খুলিলাম। বলিলাম : নায়েব বাবু আমারে তুই কইল কেন?

দাদাজী কিছুমাত্র ঠাণ্ডা না হইয়া বলিলেন : বয়সে বড়, তোর মুরুব্বি। তানি তোরে তুই কইব বইলা তুইও তানরে তুই কইবি? এই বেত্তমিযি তুই শিখছস কই? আমরা তোরে তুই কই না? নায়েব বাবু তানার ছাওয়ালরে তুই কয় না?

আমি দাদাজীর দিকে মুখ তুলিয়া নায়েব বাবুকে এক নযর দেখিয়া লইয়া বলিলামঃ আপনে বাপজী কেউই ত বয়সে ছোট না, তবে আপনেগরে নায়েব বাবু ‘তুমি’ কয় কেন?

দাদাজী নিরুত্তর। কারও মুখে কথা নাই। নায়েব-আমলাদের মুখেও না। আমার বুকে সাহস আসিল। বিজয়ীর চিত্তচাঞ্চল্য অনুভব করিলাম। আড়-চোখে লোকজনের মুখের ভাব দেখিবার চেষ্টা করিলাম। কারও কারও মুখে মুচকি হাসির আঁচ পাইলাম।

দাদাজী হাতজোড় করিয়া নায়েব বাবুর কাছে মাফ চাহিলেন। বড়শি বাইতে অনুরোধ করিলেন। আমাকে ধমক দিয়া বলিলেন : যা বেত্তমিয শয়তান, নায়েব বাবুর কাছে মাফ চা। বাপের বয়েসী মুরুব্বিরে তুই কইয়া গোনা করছস।

আমি বিন্দুমাত্র না ঘাবড়াইয়া বলিলাম : আগে নায়েব বাবু মাফ চাউক, পরে আমি মাফ চামু।

মিটানো ব্যাপারটা আমি আবার তাজা করিতেছি দেখিয়াই বোধ হয় দাদাজী কুঁদিয়া উঠিলেন। বলিলেন : নায়েব বাবু মাফ চাইব? কেন কার কাছে?

আমি নির্ভয়ে বলিলাম : আপনে নায়েব বাবুর বাপের বয়েসী না? আপনেরে তুমি কইয়া তানি গোনা করছে না? তারই লাগি মাফ চাইব নায়েব বাবু আপনের কাছে।

দাদাজী আরও খানিক হৈ চৈ রাগারাগি করিলেন। আমারে ফসিহত করিলেন। উপস্থিত মুরুব্বিদেরও অনেকে আমাকে ধমক-সালাবত দেখাইলেন। আমাকে অটল নিরুত্তর দেখিয়া পাড়ার লোকসহ আমার মুরুব্বিরা নিজেরাই নায়েব বাবুও তার সংগীদেরে জনে-জনে কাকুতি মিনতি জানাইলেন। কিন্তু নায়েব বাবু শুনিলেন না। সংগীদেরে লইয়া মুখে গজগজ ও পায়ে দম্ দম্ করিয়া চলিয়া গেলেন।

আমাদের পরিবারের সকলের ও পাড়ার অনেকের দুশ্চিন্তায় কাল কাটিতে লাগিল। আমার মত পাগলকে লইয়া ফরাযী বাড়ির বিপদই হইয়াছে। এই মর্মে সকলের রায় হইয়া গেল। বেশ কিছুদিন আমিও দুশ্চিন্তায় কাটাইলাম। প্রায়ই শুনিতাম, আমাকে ধরিয়া কাছারিতে এমন কি মুক্তাগাছায়, নিয়া তক্তা-পিষা করা হইবে। দাদী ও মা কিছুদিন আমাকে ত পাঠশালায় যাইতেই দিলেন না। পাঠশালাটা ত কাছারিতেই।

৩. মনের নয়া খোরাক

ইতিমধ্যে দুইটি ঘটনা ঘটিল। এর একটিতে আমার শিশু মনে কল্পনার দিগন্ত প্রসারিত হইল। অপরটিতে আমার সাহস বাড়িল। যতদূর মনে পড়ে সেটা ছিল ১৯০৭ সাল। একদিন চাচাজী মুনশী ছমিরদ্দিন ফরাযী সাহেব শহর হইতে কিছুসংখ্যক চটি বই ও ইশতাহার আনিলেন। বাড়ির ও পাড়ার লোকদেরে তার কিছু কিছু পড়িয়া শুনাইলেন। তাতে আমি বুঝিলাম শহরে বড় রকমের একটা দরবার হইয়া গিয়াছে। কলিকাতা হইতে বড় বড় লোক আসিয়া ঐ দরবারে ওয়ায করিয়াছেন। ঐ সব পুস্তিকায় তা ছাপার হরফে লেখা আছে। আমি সযত্নে ঐ সব পুস্তিকা জমা করিয়া রাখিয়া দিলাম। পাঠশালার পাঠ্য বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ঐ সব পুস্তিকা পড়িবার চেষ্টা করিতাম। বুঝিতাম খুব কমই। কিন্তু যা বুঝিতাম কল্পনা করিতাম তার চেয়ে অনেক বেশী। বেশ কিছুদিন পরে বুঝিয়াছিলাম ওটা ছিল মুসলমান শিক্ষা সম্মিলনী। এতে যারা বক্তৃতা করিয়াছিলেন তাঁদের মধ্যে শিক্ষা বিভাগের ডাইরেক্টর বা এমনি কোনও বড় অফিসার মিঃ শার্প এবং হাইকোর্টের বিচারপতি জাষ্টিস শরফুদ্দিনও ছিলেন। ওঁরা আসলে কারা, তাদের পদবিগুলির অর্থ কি, তা তখন বুঝি নাই। ফলে আমি ধরিয়া নিলাম মুসলমান নবাব বাদশাদের একটা দরবার হইয়া গেল। এই বিশ্বাসের উপর কল্পনার ঘোড়া দৌড়াইতে লাগিলাম।

এর কয়েক দিন পরেই দ্বিতীয় ঘটনা। বৈলর বাজারের পাট হাটায় একটা বিরাট সভা। আমাদের পাঠশালার শিক্ষক জনাব আলিমদ্দিন মাস্টার সাহেবের উৎসাহ ও নেতৃত্বে আমরা ভলান্টিয়ার’ হইলাম। সভায় কয়েকদিন আগে হইতেই আমাদের ট্রেনিং ও সভামঞ্চ সাজানোর কাজ চলিল। ‘ভলান্টিয়ার’, ও ‘খোশ আমদেদ’ কথা দুইটি এই প্রথম শুনিলাম। মুখস্থ করিলাম। নিজের মনের মত অর্থও করিলাম। এইভাবে সভার আগে ও পরে কয়েকদিন ধরিয়া কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করিলাম। সভার উচা মঞ্চে দাঁড়াইয়া যারা বক্তৃতা করিলেন এবং যারা কাতার করিয়া বসিয়া রহিলেন, তারা সকলে মিলিয়া আমার কল্পনার চোখের সামনে আলেফ-লায়লার হারুন রশিদ বাদশার দরবারের ছবি তুলিয়া ধরিলেন। ঠিক ঐ সময়েই আলেফ-লায়লা পড়িতেছিলাম কিনা। আর দেখিবই না বা কেন? কাল আলপাকার শেরওয়ানী ও খয়েরী রং-এর উচা রুমী টুপি ত দেখিলাম এই প্রথম। চৌগা-চাপকান-পাগড়ি অনেক দেখিয়াছি। কিন্তু এ জিনিস দেখিলাম এই পয়লা। বড় ভাল লাগিল। গর্বে বুক ফুলিয়া উঠিল। মুসলমানদের মধ্যেও তবে বড় লোক আছে।

ভলান্টিয়ারের ব্যস্ততার মধ্যে বক্তৃতা শুনিলাম কম। বুঝিলাম আরও কম। তবে করতালি ও মারহাবা-মারহাবা শুনিয়া বুঝিলাম বক্তৃতা খুব ভাল হইয়াছে। কিন্তু আমার মন ছিল সভায় যে সব বিজ্ঞাপন ও পুস্তিকা বিতরণ ও বিক্রয় হইয়াছিল তার দিকেই বেশী। বিলি-করা সবগুলি এবং খরিদ-করা কয়েক খানা আমি জমা করিয়াছিলাম। তার মধ্যে মুনশী মেহেরুল্লা সিরাজগঞ্জীর ‘হিতোপদেশ মালা’ ও মওলানা খোন্দকার আহমদ আলী আকালুবীর ‘শুভ জাগরণ’ আমাকে খুবই উদ্দীপ্ত করিয়াছিল। ফলে কয়েক দিন পরে আমি নিজেই এক সভা ডাকিলাম।

খুব চিন্তা-ভাবনা করিয়াই সভার জায়গা ঠিক করিলাম। কারো বাড়িতে ত দূরের কথা, বাড়ির আশে-পাশে হইলেও তার গর্দান যাইবে। কাজেই জায়গা হইল বাংগালিয়ার ভিটায় নদীর ধারে। তার আশে-পাশে এক-আধ মাইলের মধ্যে কারও বাড়ি-ঘর নাই। হাটে-বাজারে ঢোল-শহরত করিলে জমিদারের কানে যাইবে। অতএব এক্সারসাই বুকের পাতা ছিঁড়িয়া আশে-পাশের চার-পাঁচ মসজিদের মুছল্লী সাহেবানের খেদমতে ‘ধানীখোলার প্রজা সাধারণের পক্ষে’ দাওয়াত-নামা পাঠাইলাম। কারও ঘড়ি নাই। তবু সভার সময় দিলাম বিকাল চারটা। পাঠশালা চারটায় ছুটি হয়। কাজেই সময়ের আশায় আছে।

৪. প্রজা আন্দোলনের বীজ

উদ্যোক্তারা আগেই সভাস্থলে গেলাম। লোক কেউ আসে নাই। আমরা ব্যাটবল-তিরিকাট (ক্রিকেট) লইয়া রোজ মাঠে যাইতাম। রাখালদেরে লইয়া খলিতাম। কাজেই আমাদের চার-পাঁচ জনকে একত্রে দেখিয়া রাখালরা জমা হইল। কিন্তু ব্যাটল না দেখিয়া ফিরিয়া যাইবার উপক্রম করিল। আমরা বলিলাম সভা হইবে। সভার তামাশা দেখিতে তারা থাকিয়া গেল। এক দুই তিন চার করিয়া প্রায় শ খানেক লাক সমবেত হইল। কিন্তু মাতব্বররা একজনও আসেন নাই। কাকে সভাপতি করিয়া সভার কাজ শুরু করিব তাই ভাবিতেছিলাম। এমন সময় পঁচিশ-ত্রিশ জন লোক পিছনে লইয়া সভায় আসিলেন আমাদের গ্রামের শ্রেষ্ঠ মাতব্বর যহিরুদ্দিন তরফদার সাহেব। ইনি আবুল কালাম শামসুদ্দিনের চাচা। পাঁচ গ্রামের মাতব্বর। জ্ঞানী পণ্ডিত ও সুবক্তা। তাঁকে সভাপতির পদে বরণ করিয়া আমি প্রস্তাব করিলাম। তিনি আসন গ্রহণ করিলেন। সভায় বসার কোনও চেয়ার-টেবিল ছিল না। কাজেই আসন গ্রহণ করিলেন মানে এক জায়গা হইতে উঠিয়া আরেক জায়গায় বসিলেন। পতিত জমি। দুর্বা ঘাস। কাপড় ময়লা হওয়ার কোনও ভয় ছিল না। কাজেই সবাই বসা। জীবনের প্রথম জনসভায় বক্তৃতা করিতে উঠিলাম। বয়স আমার তখন ন বছর। পাঠশালার বার্ষিক সভায় মুখস্থ কবিতা আবৃতি ও লিখিত রচনা পাঠ ছাড়া অন্য অভিজ্ঞতা নাই। কি বলিয়াছিলাম মনে নাই। তবে বক্তৃতা শেষ করিলে স্বয়ং সভাপতি সাহেব ‘মারহাবা মারহাবা’ বলিয়া করতালি দিয়াছিলেন। তার দেখাদেখি সভার সকলেই করতালি দিয়াছিল। আমার পরেই সভাপতি সাহেব দাঁড়াইলেন। কারণ ‘আর কেউ কিছু বলতে চান?’ সভাপতি সাহেবের এই আহ্বানে কেউ সাড়া দিলেন না। সভাপতি সাহেব লম্বা বক্তৃতা করিলেন। মগরেবের ওয়াক্ত পর্যন্ত সভা চলিল। পেন্সিল ও একসারসাইয় বুক পকেটে নিয়াছিলাম। সভাপতি সাহেবের ডিক্টেশন মত কয়েকটি প্রস্তাব লিখিলাম। তাতে কাছারিতে প্রজাদের শ্ৰেণীমত বসিবার আসন দাবি এবং শরার বরখেলাফ কালী পূজার মাথট আদায় মওকুফ রাখিবার অনুরোধও করা হইল। সর্ব সম্মতিক্রমে প্রস্তাব পাস হইল। কাগযটি সভাপতি সাহেব নিজের পকেটে নিলেন। বলিলেন আরও কয়েকজন মাতবর লইয়া তিনি জমিদারের সাথে দরবার করিবেন। সভাপতি সাহেবের বক্তৃতায় জমিদারদের অত্যাচার-জুলুমের অনেক কাহিনী শুনিলাম। অনেক নূতন জ্ঞান লাভ করিলাম। সে সব কথা ভাবিতে ভাবিতে বাপজী চাচাজী ও অন্যান্য মাতব্বরের সাথে বাড়ি ফিরিলাম।

অল্পদিন পরেই আমাদের অন্যতম জমিদার মুক্তাগাছার শ্রীযুক্ত যতীন্দ্র নারায়ণ আচার্য চৌধুরী বার্ষিক সফরে আসিলেন। তাঁর কাছে আমার বিরুদ্ধে এবং ঐ সভা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত রিপোর্ট দাখিল করা হইল। যতীন বাবু আমাকে কাছারিতে তলব করিলেন। পিয়াদা আমাকে নিতে আসিলে আমি তাকে বলিলাম : কর্তার কাছে আমার কোনও কাজ নাই। আমার কাছে কর্তার কাজ থাকিলে তিনিই আসিতে পারেন। তৎকালে জমিদারদেরে কর্তা বলা হইত। সম্বোধনেও বিবরণেও। পিয়াদা আমাদের গায়ের লোক। আমার হিতৈষী। আমার গর্দান যাইবে ভয়ে একথা খোদ কর্তাকে না বলিয়া নায়েব আমলাকে রিপোর্ট করিল। আমার বিরুদ্ধে ওদের আখ্যে ছিল। প্রায় বছর খানেক আগে মায়েব বাবুকে তাদের সামনে আমি তুই এর বদলে তুই বলিয়াছিলাম। নায়েব-আমলারা সে কথা ভুলেন নাই। কর্তাকে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপাইবার আশায় পিয়াদার রিপোর্টটায় রং চড়াইয়া তুই এর পুরান ঘটনাকে সেদিনকার ঘটনারূপে তার কাছে পেশ করেন।

কর্তা ছিলেন আদত রসিক সুজন। তিনি আমার বয়সের, কালচেহারার ও পাঠশালায় পড়ার কথা শুনিলেন। সব শুনিয়া প্রকাশ্য দরবারে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। বলিলেন : “ছোকরা গোকুলের শ্রীকৃষ্ণ। আমাদের কংশ বংশ ধ্বংস করতেই ওর জন্ম। আমার ডাকে সে ত আসবই না। হয়ত আমারই ওর কাছে যাইতে হৈব।”

সমবেত প্রজারা ও আমার মুরুব্বিরা এটাকে কর্তার রসিকতা বলিয়া বিশ্বাস করিলেন না। কর্তার চাপা রাগ মনে করিলেন। আমার নিরাপত্তা সম্বন্ধে চিন্তাযুক্ত হইলেন। সভার সভাপতি তরফদার সাহেব কিন্তু আদত কথা ভুলিলেন না। আমার প্রতি কর্তার মনোভাব নরম করিবার উদ্দেশ্যে মোলায়েম কথায় আমাদের দাবি-দাওয়া পেশ করিলেন। তার কুশলী মিষ্টি কথায় কর্তার মন সত্যই নরম হইল। তিনি সভায় গৃহীত প্রস্তাবের কয়েকটি মনযুর করিলেন। বাকীগুলি অন্যান্য জমিদারদের সাথে সলাপরামর্শ করিয়া পরে বিবেচনা করিবেন বলিলেন! যে কয়টি দাবি তখনই মনযুর হয় তার মধ্যে কাছারিতে প্রজাদের বসিবার। ব্যবস্থাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। সাধারণ প্রজাদের বসিবার জন্য চট ও মাতব্বর প্রজাদের জন্য লম্বা বেঞ্চির ব্যবস্থা হয়। তবে বেঞ্চি উচ্চতায় সাধারণ বেঞ্চের অর্ধেক হয়। সাধারণ বেঞ্চ উচ্চতায় চৌকির সমান। চৌকির সমান উচা বেঞ্চিতে প্রজারা বসিলে আমলা-প্ৰজায় কোনও ফারাক থাকে না বলিয়া এই ব্যবস্থা হয়। আমাদের মুরুব্বিরা এই ব্যবস্থাই মানিয়া লন। তবে সাধারণ প্রজাদের জন্য চটের বদলে পার্টির ব্যবস্থা করিতে অনুরোধ করা হয়। তখনই এ দাবি মানিয়া নেওয়া হইল লো বটে কিন্তু কয়েক বছর পরে হইয়াছিল। এইভাবে ধানীষোলায় প্রথম প্রজা আন্দোলন সফল হয়।

৫. প্রজা আন্দোলনের চারা

দুই বছর পরের কথা। তখন আমি পাঠশালার পড়া শেষ করিয়া দরিরামপুর মাইনর স্কুলে গিয়াছি। গ্রাম্য সম্পর্কে আমার চাচা মোহাম্মদ সাঈদ আলী সাহেব (পরে উঁকিল) এই সময় শহরের স্কুলে উপরের শ্রেণীতে পড়িতেন। তার উৎসাহে আমি আবার একটা প্রজা সভা ডাকি। এই সভার বিবরণী তকালে সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’ ও ‘মিহির ও সুধাকরেট ছাপা হয়। ঐ সভায় সাঈদ আলী সাহেবের রচিত একটি প্রস্তাব খুবই জনপ্রিয় হয়। তাতে দাবি করা হয় যে কাছারির নায়েব-আমলা সবই স্থানীয় লোক হইতে নিয়োগ করিতে হইবে। যুক্তি দেওয়া হয়, এতে স্থানীয় শিক্ষিত লোকের চাকরির সংস্থান হইবে। জমিদারের খাজনা সহজে বেশী পরিমাণ আদায় হইবে। কাছারিতে বসার সমস্যাও সহজেই সমাধান হইবে। এটাকে ক্ষুদ্র আকারে ‘ইণ্ডিয়ানিয়েশন-অব-সার্ভিসেস’ দাবির প্রথম পদক্ষেপ বলা যাইতে পারে। চাকুরির ব্যাপারে উচ্চস্তরে সরকারী পর্যায়ে যা হইয়া থাকে এখানেও তাই হইল। ইংরাজ সাম্রাজ্য দিল তবু চাকুরি দিল না। জমিদারও তেমনি জমিদারি দিল তবু চাকুরি দিল না। চাকুরিজীবীরা বরাবর এ-ই করিয়াছে। ভবিষ্যতেও করিবে। ‘শির দিব তবু নাহি দিব আমামা’ সবারই জেহাদী যিকির চিরকালের।

আরও তিন বছর পরে। ১৯১৪ সাল। ময়মনসিংহ শহরে মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। এই সময় জামালপুর মহকুমার কামারিয়ার চরে একটা বড় রকমের প্রজাসম্মিলনী হয়। সম্মিলনীর আগের বিজ্ঞাপনাদি ও পরে ‘মোহাম্মদ’ ও ‘মোসলেম হিতৈষী’ নামক সাপ্তাহিক দুইটিতে সম্মিলনীর বিবরণী পড়িয়া আমি আনন্দে উহূল্প হই। এই বিবরণী হইতেই আমি প্রথম মৌঃ এ. কে. ফযলুল হক, মৌলবী আবুল কাসেম, খান বাহাদুর আলিমুজ্জামান চৌধুরী, বগুড়ার মৌঃ রজিবুদ্দিন তরফদার, ময়মনসিংহের মওলানা খোন্দকার আহমদ আলী আকালুবী (পরে আমার শ্বশুর), মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রভৃতি নেতা ও আলেমের নাম জানিতে পারি। এঁরা নিশ্চয়ই বড় বড় পণ্ডিত ও বড় লোক। সকলেই গরিব প্রজার পক্ষে আছেন জানিয়া আমার অন্তরে উৎসাহ ও সাহসের বিজলি চমকিয়া যায়। এই সব বিজ্ঞাপন ও কার্যবিবরণী আমি সযত্নে বাক্সে কাপড়-চোপড়ের নিচে লুকাইয়া রাখি। এতে বিভিন্ন প্রস্তাব ছাড়াও বক্তাদের বক্তৃতার সারমর্ম দেওয়া ছিল। মাঝে মাঝে এইসব কাগ্য বাহির করিয়া মনোযোগ দিয়া পড়িতাম। তাতে প্রজাদের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে ও জমিদারী জুলুম সম্পর্কে আমার জ্ঞান বাড়ে। খাজনা মাথট আবওয়াব গাছ কাটা পুকুর খুদা জমি বিকি-কিনি ইত্যাদি অনেক ব্যাপারেই ঐ সম্মিলনীতে প্রস্তাব পাস হইয়াছিল। তার সব কথা আমি তখন বুঝি নাই সত্য, কিন্তু এটা বুঝিয়াছিলাম যে আমি নিজ গ্রামে প্রজাদের বসিবার আসন ও আমলাগিরি চাকুরির যে দাবি ও তুই-তুংকারের যে প্রতিবাদ করিয়াছিলাম, প্রজাদের দাবি তার চেয়ে অনেক বেশী হওয়া উচিৎ।

নিয়মতান্ত্রিক প্রজা-আন্দোলনের ইতিহাসে কামারিয়ার চর প্রজা সম্মিলনী এবং তার উদ্যোক্তা জনাব খোশ মোহাম্মদ সরকার (পরে চৌধুরী) সাহেবের নাম সোনার হরফে লেখা থাকার বস্তু। এই সম্মিলন চোখে না দেখিয়া শুধু রিপোর্ট পড়িয়া প্রজা-আন্দোলনের এলাকা সম্বন্ধে আমার দৃষ্টি প্রসারিত হয়। এর পর আমি বঙ্কিম চন্দ্রের বাংলার কৃষক রমেশ দত্তের বাংলার প্রজা প্রমথ চৌধুরী ‘রায়তের কথা’ ইত্যাদি প্রবন্ধগ্রন্থ এবং লালবিহারীদের ইংরাজি নভেল ‘বেংগল পেমেন্ট লাইফ’ পড়ি। শেষোক্ত বইটি আমাদের স্কুলের পাঠ্য ছিল।

স্কুলের ছুটি-ছাটা উপলক্ষে অতঃপর গ্রামের বাড়িতে গিয়া এই সব নূতন নূতন কথা বলিতে শুরু করি। আমাদের নেতা জহিরুদ্দিন তরফদার সাহেব ছাড়াও বৈলর গ্রামের পণ্ডিত ইমান উল্লাহ সাহিত্য-রত্ন সাহেব আমাকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহ ও উপদেশ দিতেন।

৬. সাম্প্রদায়িক চেতনা

আরেকটা ব্যাপার আমাকে খুবই পীড়া দিত। জমিদাররা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব প্রজার কাছ থনেই কালীপূজার মাথট আদায় করিতেন। এটা খাজনার সাথে আদায় হইত। খাজনার মতই বাধ্যতামূলক ছিল। না দিলে খাজনা নেওয়া হইত না। ফরাযী পরিবারের ছেলে হিসাবে আমি গোঁড়া মুসলমান ছিলাম। মূর্তি পূজার চাঁদা দেওয়া শেরেকী গোনা। এটা মুরুব্বিদের কাছেই শেখা মসলা। কিন্তু মুরুব্বিরা নিজেরাই সেই শেরেকী গোনা করেন কেন? এ প্রশ্নের জবাবে দাদাজী, বাপজী ও চাচাজী তারা বলিতেন : না দিয়া উপায় নাই। এটা রাজার জুলুম। রাজার জুলুম নীরবে সহ্য করা এবং গোপনে আল্লার কাছে মাফ চাওয়া ছাড়া চারা নাই। এ ব্যাপারে মুরুব্বিরা যদিস-কোরআনের বরাত দিতেন।

কিন্তু আমার মন মানিত না। শিশু-সুলভ বেপরোয়া সাহস দেখাইয়া হাম্বি তাধি করিতাম। মুরুব্বিরা ‘চুপচুপ’ করিয়া ডাইনে-বাঁয়ে নযর ফিরাইতেন। জমিদারের লোকেরা শুনিয়া ফেলিল না ত!

কালীপূজা উপলক্ষ্যে জমিদার কাছারিতে বিপুল ধূমধাম হইত। দেশ-বিখ্যাত যাত্রাপার্টিরা সাতদিন ধরিয়া যাত্রাগান শুনাইয়া দেশ মাথায় করিয়া রাখিত। হাজার হাজার ছেলে-বুড়া সারা রাত জাগিয়া সে গান-বাজনা-অভিনয় দেখিত। সারাদিন মাঠে-ময়দানে খেতে-খামারে এই সব নাটকের ভীম-অর্জনের বাখানি হইত। দর্শক শ্রোতারা প্রায় সবাই মুসলমান। কারণ এ অঞ্চলটাই মুসলমান প্রধান। আমাদের পাড়া-পড়শী আত্মীয়-স্বজন সবাই সে তামাশায় শামিল হইতেন। শুধু আমাদের বাড়ির কেউ আসিতেন না। আমার শিশুমন ঐ সব তামাশা দেখিতে উসখুস করিত নিশ্চয়। পাঠশালার বন্ধুদের পাল্লায় পড়িয়া চলিয়া যাইতাম তার কোন-কোনটায়। কিন্তু বেশীক্ষণ থাকিতে পারিতাম না। বয়স্ক কারও সংগে দেখা হইলেই তারা বলিয়া উঠিতেন : ‘আরে, তুমি এখানে তুমি যে ফরাযী বাড়ির লোক! তোমার এসব দেখতে নাই।’ শেষ পর্যন্ত আমি ঐ সব তামাশায় যাওয়া বন্ধ করিলাম। কিন্তু বোধহয় কারো নিষেধে ততটা নয়। যতটা শিশু-মনের অপমান-বোধে। কারণ সে সব যাত্রা-থিয়েটারের মজলিসেও সেই কাছারির ব্যবস্থা। ভ ভদ্রলোকদের বসিবার ব্যবস্থা। মুসলমানদের ব্যবস্থা দাঁড়াইয়া দেখার।

০২. খিলাফত ও অসহযোগ

খিলাফত ও অসহযোগ
দুসরা অধ্যায়

১. রাজনীতির পট-ভূমি

আমাদের বাদশাহি ফিরিংগিরা কাড়িয়া নিয়াছে, এই খবরে আমার মনে ফিরিংগি বিদ্বেষ জন্যে বোধহয় আমার জ্ঞানোদয়ের দিন হইতেই। কিন্তু চাচাজী ও দু-চার জন জেহাদী মৌলবীর প্রভাবে কৈশোরে ফিরিংগি বিদ্বেষের জায়গা দখল করে শিখ-বিদ্বেষ। এই শিখ-বিদ্বেষ ইংরাজের প্রতি আমার মন বেশ খানিকটা নরম করিয়া ফেলে।

এই নরম ভাব কয়েকদিন পরেই আবার গরম হইয়া ইংরাজ-বিদ্বেষ দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠে। আমি তখন দরিরামপুর মাইনর স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। এই সময় ঢাকা বিভাগের স্কুল ইন্সপেক্টর মিঃ স্টেপটন আমাদের স্কুল পরিদর্শন করিতে আসেন। কয়েকদিন আগে হইতেই আমরা স্কুল ঘর ও আংগিনা সাজানোর ব্যাপারে পরম উৎসাহে খাঁটিতেছিলাম। নির্দিষ্ট দিনে সাধ্যমত পনির জামা কাপড় পরিয়া পরম আগ্রহে এই ইংরাজ রাজপুরুষকে দেখিবার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। একজন শিক্ষকের সেনাপতিত্বে কুইক মার্চ করিয়া খানিকদূর আগবাড়িয়া গেলাম সাহেবকে ইস্তোল করিতে। জীবনের প্রথম এই ‘সাহেব’ দেখিতেছি। নূতন দেখার সম্ভাবনার পুলকে গরম রোমাঞ্চ হইতে লাগিল।

শেষ পর্যন্ত সাহেব আসিলেন। হাঁ সাহেব বটে। উঁচায় ছয় ফুটের বেশী। লাল টকটকা মুখের চেহারা। আমার খুব পছন্দ হইল। মাস্টার সেনাপতির নির্দেশে সোৎসাহে সেলিউট করিলাম। সাহেবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়িয়া মমতায় পরিণত হইল সাহেবের সংগীটিকে দেখিয়া। সাহেবের সংগীটি একজন আলেম। তার মাথায় পাগড়ি, মুখে চাপ দাড়ি, পরনে সাদা আচকান ও সাদা চুড়িদার পায়জামা। সাহেব যখন সাথে আলেম নিয়া চলেন, তখন নিশ্চয়ই তিনি মনে মনে মুসলমান। আমি ভক্তিতে গদগদ হইলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার তুল ভাংগিল। আমাদের স্কুলের সেকেন্ড পন্ডিত জনাব খিদিরুদ্দিন খাঁ সাহেবের নিকট নিলাম, লোকটা কোনও আলেম-টালেম নয়, সাহেবের চাপরাশী। শিক্ষক না হইয়া অন্য কেউ একথা বলিলে বিশ্বাস করিতাম না। তাছাড়া পভিত সাহেব আমাকে বুঝাইবার জন্য লোকটার কোমরের পেটি ও বুকের তকমা দেখাইলেন। আমার মাথায় আগুন চড়িল। স্টেপল্টন সাহেবের উপর ব্যক্তিগতভাবে এবং ইংরাজদের উপর জাতিগতভাবে আমি চটিয়া গেলাম। অদেখা শিখ-বিদ্বেষের যে ছাই-এ আমার ফিরিংগি-বিদ্বেষের আগুন চাপা ছিল, চোখের-দেখা অভিজ্ঞতার তুফানে সে ছাই উড়িয়া গেল। আমার ইংরেজী-বিদ্বেষ দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। শালা ইংরাজরা আমাদের বাদশাহি নিয়াও ক্ষান্ত হয় নাই। আমাদের আরও অপমান করিবার মতলবে আমাদের পোশাককে তাদের চাপরাশীর পোশাক বানাইয়াছে! এর প্রতিশোধ নিতেই হইবে। আমি তৎক্ষণাৎ ঠিক করিয়া ফেলিলাম, বড় বিদ্বান হইয়া ইনস্পেক্টর অফিসার হইব। নিজে আচকান পায়জামা-পাগড়ি পরিব এবং নিজের চাপশারীকে কোট-প্যান্ট-হ্যাট পরাইব।

এর পর-পরই আরেকটা ঘটনা আমার ইংরাজ-বিদ্বেষে ইন্ধন যোগাইল। আমাদের স্কুলের খুব কাছেই ত্রিশাল বাজারে এক সভা। শহর হইতে আসেন বড় বড় বক্তা। আমাদের শিক্ষক খিদিরুদ্দিন খাঁ পন্ডিত সাহেবের নেতৃত্বে আমরা ভলান্টিয়ার। বক্তাদের মুখে শুনিলাম, ইটালি নামক এক দেশের রাজা আমাদের খলিফা তুরস্কের সুলতানের ত্রিপলি নামক এক রাজ্য আক্রমণ করিয়াছেন। কথাটা বিশ্বাস হইল না। কারণ ইটালির রাজার রাজধানী শুনিলাম নোম। রোমের বাদশাহ তুরস্কের সোলতানের রাজ্য দখল করিতে চান? এটা কেমন করিয়া সম্ভব? দুই জন ত একই ব্যক্তি! মাথায় বিষম গন্ডগোল বাধিল। সেটা না থামিতেই আরেকটা। সভায় যখন রুমী টুটি পোড়াইবার আয়োজন হইল, তখন টুপির বদলে আমার মাথার আগুন ধরিয়া গেল। প্রথম কারণ বহুদিন ধরিয়া আমি একটি লাল রুমী টুপি ব্যবহার করিয়া আসিতেছি। এটি আমার টুপি না, কলিজার টুকরা। দ্বিতীয় কারণ আমার বিশ্বাস, এই টুপি খলিফার দেশেই তৈয়ার হয়। বক্তাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতায় উদ্দীপ্ত ও উন্মত্ত ছাত্র বন্ধুরা যখন রুমী টুপি পোড়ইতে লাগিল এবং তাদের চাপে শেষ পর্যন্ত আমি যখন আমার বহুদিনের সাথী সেই রুমী টুপিটাকে আগুনে নিক্ষেপ করিলাম, তখন আমার মনে হইল নমরুদ বাদশাহ যেন ইব্রাহিম নবিকে আগুনের কুন্ডে ফেলিয়া দিলেন। ইব্রাহিম নবির কথা মনে পড়িতেই আমার অবস্থাও তাঁর মত হইল। ইব্রাহিম নবি যেমন নিজের জানের টুকরা পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করিয়াছিলেন, আমিও যেন আজ আমার কলিজার টুকরা লাল কুমী টুপিটাকে তেমনি নিজ হাতে কোরবানি করিলাম। বেশ-কম শুধু এই : জিবরাইল ফেরেশতরা বেহেশতী দুম্বা বদলা দিয়া ইসমাইলকে বাঁচাইলেন, কিন্তু আমার রুমী টুপিটার বদলা দিয়া কেউ এটা বাঁচাইল না। দুঃখে ক্ষোভে আমার চোখে পানি আসিল। আমার কলিজার টু লাল রুমী টুপিটা পোড়াইবার জন্য দায়ী কে? এই ইটালি। ইটালি কে? খৃষ্টানত? নিশ্চয়ই ইংরাজ। ইংরাজের প্রতি, বিশেষ করিয়া তাদের পোশাকের প্রতি, আমার রাগ দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল।

২. পরস্পরবিরোধী চিন্তা

আমার ইংরাজ-বিদ্বেষটায় কোন স্পষ্টতা ছিল না। সে জন্য এটা বড় ঘন-ঘন উঠা-নামা করিত। অনেক সময় আমি ইংরাজের সমর্থক হইয়া উঠিলাম। উদাহরণ ‘স্বদেশী’ ব্যাপারটা। পাঠশালায় ঢুকিয়াই (১৯০৬) স্বদেশী কথাটা শুনি। মানে বুঝিয়াছিলাম কাঁচা রং পাড়ের কাপড় পরা। পাঠশালার মাস্টার মশায় ছিলেন হিন্দু। তিনি আমাদের স্বদেশী কাপড় পরিতে বলিতেন, কাপড়ের কাঁচা রং উঠিয়া যায় বলিয়া দুই-একবারের বেশি তা পরি নাই। স্বদেশী অর্থ আর কিছু তিনি তা বলেন নাই। আগের বছর ১৯০৫ সালে বড় লাট লর্ড কার্যন ময়মনসিংহে আসেন। মুরুব্বিদের সাথে লাট-দর্শনে যাই। রাস্তার গাছে-গাছে বাড়ি-ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ইংরাজীতে লেখা দেখি : ‘ডিভাইড আস্ নট’। মুরুব্বিদেরে জিগাসা করিয়া জানিতে পারি ওসব ‘স্বদেশী’ হিন্দুদের কান্ড। মুসলমানদের খেলাফে দুশমনি। এই দুশমনিটা কি, ঘরে ফিরিয়া পরে চাচাজীর কাছে পুছ করিয়াছিলাম। তিনি ব্যাপারটা আমাদের বুঝাইবার জন্য যে সব কথা বলিয়াছিলেন, তার কিছুই তৎকালে বুঝি নাই। তবে সে সব কথার মধ্যে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ, ঢাকা রাজধানী, বাংলা ও আসাম এই কয়টা শব্দই শুধু আমার মনে ছিল। ‘স্বদেশীরা’ তবে মুসলমানদের দুশমন? ভাবনায় পড়িলাম। দরিরামপুর মাইনর স্কুলে ভর্তি হওয়ার (১৯০৯) অল্পদিন পরেই দেখিলাম, একজন ভাল মাস্টার হঠাৎ বিদায় হইলেন। খোঁজ লইয়া জানিলাম, লোকটা তলে-তলে স্বদেশী বলিয়া তাকে তাড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। আর সন্দেহ রইল না যে ‘স্বদেশী’ হওয়াটা দোষের।

এর পর-পরই ঘটে স্টেপলটন সাহেবের ঘটনাটা। ইংরাজের উপর ঐ রাগের সময়েই আমি জানিতে পারি ‘স্বদেশীরা’ ইংরাজের দুশমন। ‘স্বদেশীর’ প্রতি আমার টান হইল। তারপর যখন ইটালি, মানে ইংরাজ, আমাদের খালিফার দেশ ত্রিপলি হামলা করিল, তখন ইংরাজ-বিদ্বেষ বাড়ার সাথে আমার স্বদেশী-প্রীতিও বাড়িল। ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে সম্রাট পঞ্চম জর্জের দিল্লী দরবার উপলক্ষে স্কুলের সবচেয়ে ভাল ছাত্র হিসাবে আমাকে অনেকগুলি ইংরাজী ও খানকতক বাংলা বই প্রাইয দেওয়া হয়। সে কালের তুলনায় এক স্তূপ বই। বইগুলি দুই বগলে লইয়া যখন বাড়ি ফিরিতেছিলাম তখন আতিকুল্লা নামে আমার এক বয়োজ্যেষ্ঠ মাদ্রাসার ছাত্রবন্ধু আমার প্রতি চোখ রাংগাইয়া বলিয়াছিলেন : ‘আজ মুসলমানের মাতমের দিন। ফিরিংগিরা আমাদের গলা কাটিয়াছে। তুমি কি না সেই ফিরিংগির-দেওয়া প্রাইয লইয়া হাসি-মুখে বাড়ি ফিরিতেছ?’

আমি প্রথমে মনে করিয়াছিলাম, আমার অতগুলি বই দেখিয়া বন্ধুর ঈর্ষা হইয়াছে। পরে যখন তিনি বুঝাইয়া দিলেন, ইংরাজ ‘স্বদেশী’দের কোথায় বংগ-ভংগ বাতিল করিয়াছে এবং তাতে মুসলমানদের সর্বনাশ হইয়াছে, তখন আমার ভূল ভাংগিল। বন্ধুবর আতিকুল্লা ছিলেন আমাদের সকলের বিবেচনায় একটি খবরের গেযেট, জ্ঞানের খনি। তিনি আমাকে পূর্ব-বাংলা ও আসাম প্রদেশ, রাজধানী ঢাকা ও মুসলমানদের কর্তৃত্বের কথা সবিস্তারে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। স্বদেশীরা কি কারণে এই নয়া প্রদেশ বাতিল করিবার আনোলন করিয়াছে, সে আন্দোলন সফল হওয়ায় আজ মুসলমানদের কি সর্বনাশ হইল, চোখে আংগুল দিয়া তা আমাকে বুঝাইয়া দিলেন। তিন বছর আগে চাচাজী যা-যা বলিয়াছিলেন, সে সব কথাও এখন আমার মনে পড়িল। তাঁরও কোনও-কোনও কথা আজ বুঝিতে পারিলাম। আতিক ভাই এইভাবে সব বুঝাইয়া দেওয়ায় ইংরাজের প্রতি বিদ্বেষ ত বাড়িলই, ‘স্বদেশী’র প্রতি আরও বেশি বাড়িল। আচকান পাগড়ির প্রতি স্টেপটন সাহেবের অপমান, ইটালি কর্তৃক আমার লাল রুমী টুপির সর্বনাশ, সব কথা এক সংগে মনে পড়িয়া গেল। ইংরাজী পোশাকের উপর আমার রাগ দশগুণ বাড়িয়া গেল। ইংরাজের দেওয়া পুস্তকগুলি কিন্তু ফেলিয়া দিলাম না।

ইংরাজী পোশাকের প্রতি এই বিদ্বেষ কালে ইংরাজী ভাষার উপর ছড়াইয়া পড়িল। মাইনর পাস করিয়া শহরের হাইস্কুলে ভর্তি হইয়া দেখিলাম, অবাক কান্ড। কি শরমের কথা! মাস্টার মশায়রা ক্লাসে ইংরাজীতে কথা কন। উকিল-

মোর হাকিমরা কোটে ইংরাজীতে বক্তৃতা করেন। শিক্ষিত লোক রাস্তা-ঘাটে পর্যন্ত ইংরাজীতে আলাপ করেন। যাঁরা বাংলাতে কথা বলেন তারাও তাঁদের কথা-বার্তায় প্রচুর ইংরাজী শব্দ ব্যবহার করিয়া থাকেন। এটাকে আমি মাতৃভাষা বাংলার অপমান মনে করিলাম। ইহার প্রতিবাদে শামসুদ্দিনসহ আমরা কতিপয় বন্ধু ও সহপাঠী মিলিয়া ইংরাজী শব্দের বিরুদ্ধে অভিযান চালাইলাম। ফুটবলকে ‘পদ-গোলক’ হইসেলকে ‘বাঁশি’ কম্পিটিশনকে ‘প্রতিযোগিতা’ ফিক্সচারকে ‘নির্ঘন্টপত্র’ রেফারিকে ‘মধ্যস্থ বা শালিস’ স্পোর্টসকে ‘খেলা বা ক্রীড়া’ লেসিং অলকে ‘ফিতা সুই’ লাইনসম্যানকে ‘সীমা নির্দেশক’ পুশকে ‘ধাক্কা’ অফসাইডকে ‘উল্টা দিক’ ইত্যাদি পরিভাষা প্রবর্তন করিয়া ফুটবল খেলার মাঠে সংস্কার আনিবার জোর চেষ্টা করিলাম। কিন্তু কাগজ-পত্র ছাড়া আর কোথায়ও ওসব পরিভাষার প্রচলন চেষ্টা সফল হইল না। তাছাড়া শুধু ফুটবলের ব্যাপারে সংস্কার প্রবর্তন হওয়ার দরুন আমাদের এই উদ্যম বিফল হইল।

৩. ধর্ম-চেতনা বনাম রাজনীতি-চেতনা

যা হোক, এই সংস্কার প্রচেষ্টায় মাতৃভাষার প্রতি টান ও ইংরাজীর প্রতি বিদ্বেষ যতটা ছিল রাজনৈতিক মতলব ততটা ছিল না। মুসলমানদের মধ্যে সাধারণভাবে এবং আমার মুরুব্বি ও চিনা-জানা মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা তখনও দানা বাঁধে নাই। ইতিমধ্যে আমরা অবশ্য ত্রিপলি লইয়া তুর্কী-ইতালির যুদ্ধে ইটালির বিপক্ষে আন্দোলন করিয়াছি। কিন্তু সে ব্যাপারেও আমার ধর্ম-প্রীতি যতটা ছিল রাজনৈতিক চেতনা ততটা ছিল না। তারপর শহরের হাইস্কুলে আসিয়া আমার ধর্ম চেতনাটা যেন এগ্রেসিত হইয়া উঠিল। এর কারণ ছিল। বংকিম চন্দ্রের লেখার সাথে পরিচিত হই এই সময়। প্রতিকূল অবস্থায় আমার রগ তেড়া হওয়াটা ছিল আমার একটা জন্মগত রোগ। অত প্রতাপশালী নায়েব মশায়কে তুই এর বদলা তুই বলা এই রোগেরই লক্ষণ। শহরে আসিয়া ঘটনাচক্রে ভর্তি হইলাম মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে। স্কুলটির পরিচালক হিন্দু। পঁয়ত্রিশ জন টিচারের মধ্যে পার্সিয়ান টিচারটি মাত্র মুসলমান। দেড় হাজার ছাত্রের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা তিন শর ও কম। স্কুলে ভর্তি হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দুইটা টার্মিনাল পরীক্ষায় ফাস্ট-সেকেন্ড হইয়া শিক্ষকদের স্নেহ পাইলাম বটে, কিন্তু বদনামও কামাই করিলাম। একজন শিক্ষক ক্লাসে আমাকে ‘মিয়া সাব’ বলায় জবাবে আমি তাঁকে ‘বাবুজী’ বলিয়াছিলাম। স্কুলে হৈ চৈ পড়িয়া যায়। হেড মাস্টার শ্রীযুক্ত চিন্তা হরণ মজুমদারের কাছে বিচার যায়। বিচারে আমার জয় হয়। অতঃপর শিক্ষকরা ত নয়ই ছাত্ররাও মুসলমানদেরে ‘মিয়া সাব’ বলিয়া মুখ ভেংচাইতেন না। একদিন ছোট বাজার পোস্টাফিসে গেলাম পোস্ট কার্ড খরিদ করিতে। জানালায় কোন খোপ না থাকায় গরাদের ফাঁকে হাত ঢুকাইয়া পয়সা দিতে ও জিনিস নিতে হইত। আমি সেভাবে পয়সা দিলাম। পোস্ট মাস্টার হাতে পয়সা নিলেন ও কার্ড দিলেন। আমি অতিকষ্টে ডান হাত টানিয়া বাহির করিয়া তেমনি কষ্টে বাম হাত ঢুকাইয়া কার্ড নিলাম। পোস্ট মাস্টার বিস্ময়ে আমার এই পাগলামি দেখিলেন। একথাও স্কুলে রাষ্ট্র হইল।

এমনি দিনে একবার কথা উঠিল হিন্দু ছাত্রদের দুর্গা-সরস্বতী পূজার মত আমরা স্কুলে মিলাদ উৎসব করিব। শুনিলাম বহুদিন ধরিয়া মুসলিম ছাত্রদের এই দাবি স্কুল কর্তৃপক্ষ নামনযুর করিয়া আসিতেছেন। আমি ক্ষেপিয়া গেলাম। আগামী বকরিলে স্কুল আংগিনায় গরু কোরবানি করিব বলিয়া আন্দোলন শুরু করিলাম। এবার মিলাদের অনুমতি অতি সহজেই পাওয়া গেল। পরম ধুমধামের সাথে ঐ বারই প্রথম ‘হিন্দু স্কুলে’ মিলাদ হইল। শহরের মুসলিম নেতৃবৃন্দ ভাংগিয়া পড়িলেন। যথারীতি মিলাদের পরে আমি এক বাংলা প্রবন্ধ পড়িলাম। তাতে আরবী-উর্দুর বদলে বাংলায় মিলাদ পড়িবার প্রস্তাব দিলাম। মুসলমানদের মুখের অত তারিফ এক মুহূর্তে নিন্দায় পরিণত হইল। হিন্দুরা কিন্তু আমার তারিফ করিতে লাগিলেন। এই বিপদে আমাকে বাঁচাইলেন আনন্দ মোহন কলেজের আরবী-ফারসীর অধ্যাপক মওলানা ফয়যুর রহমান। পরের দিন অপর এক স্কুলের মিলাদ সভায় তিনি আমার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়া বাংলায় মিলাদ পড়াইবার প্রস্তাব সমর্থন করিলেন।

তারপর ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাধিলে আমি মনে মনে ইংরাজের পক্ষ ইহলাম। ঐ সময় মিঃ এন. এন. ঘোষের ‘ইংল্যান্ডস ওয়ার্কস ইন ইন্ডিয়া’ নামক ইংরাজী বই আমাদের পাঠ্য ছিল। ইংরাজরা আমাদের দেশের কত উপকার ও উন্নতি বিধান করিয়াছে, ঐ বই পড়িয়া আমি তা বুঝিলাম। তাতে ইংরাজের প্রতি সদয় হইলাম।

কিন্তু বেশিদিন এভাব টিকে নাই। শিক্ষকদের প্রভাব ছাত্রদের উপর অবশ্যই পড়িয়া থাকে। এক আরবী-ফারসী শিক্ষক ছাড়া আমাদের স্কুলের পঁয়ত্রিশ জন শিক্ষকের সবাই হিন্দু। এঁরা প্রকাশ্য রাজনীতি না করিলেও কথা-বার্তায় ও চালে চলনে স্বদেশী ছিলেন। এঁদের দুই-তিন জনকে আমি খুবই ভক্তি করিতাম। এদের প্রভাব আমার মনের উপর ছিল অসামান্য। হঠাৎ একদিন একদল পুলিশ স্কুলে আসিয়া কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করিয়া নিল। এদের মধ্যে দুই-চারজন আমার সুপরিচিত। তাদের জন্য খুবই চিন্তিত ও দুঃখিত হইলাম। গ্রেফতারের কারণ খুজিলাম। ‘রাজবন্দী’, ‘অন্তরীণ’ ইত্যাদি শব্দ এই প্রথম শুনিলাম। কানে রাজনীতির বাতাস গেল। কিছু-কিছু আন্দায করিতে পারিলাম। ইংরেজের প্রতি বিদ্বেষ বাড়িল। যুদ্ধে জার্মানির জয় কামনা করিলাম। জার্মানির পক্ষে যাইবার একটা অতিরিক্ত কারণও ছিল। জার্মানির সম্রাটের উপাধি কাইযার। হাকিমভাই নামে এক ‘সবজান্তা’ বন্ধু আমাকে বলিয়াছিলেন এটা আরবী-ফারসী কায়সার শব্দের অপত্রংশ। শাহনামার কায়সার নিশ্চয়ই মুসলমান ছিলেন। সূতরাং জার্মান সম্রাটও আসলে মুসলমান এমন ধারণাও আমার হইয়া গেল। মুসলমান কায়সারকে খৃষ্টানী কাইসার বানাইবার মূলে নিশ্চয়ই ইংরাজের দুষ্ট মতলব আছে। আমরা মুসলমানরা যাতে জার্মানির পক্ষে না যাই সে জন্যই এই বদমায়েশি করিয়াছে। এই অবস্থায় যেদিন শুনিলাম তুর্কি সুলতান মুসলমানদের মহামান্য খলিফা জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে নামিয়াছেন, সেদিন এ ব্যাপারে আমার আর কোনই সন্দেহ থাকিল না। মুসলমানদের খলিফা মুসলিম বাদশা-কে সমর্থন করিবেন না? তবে কে করিবে? এর পরে সমস্ত ইচ্ছাশক্তি দিয়া জার্মানির জয় অর্থাৎ ইংরাজের পরাজয়ের জন্য মোনাজাত করিতে লাগিলাম।

৪. খিলাফত ও অসহযোগ

কিন্তু আমার মোনাজাত কবুল হইল না। অবশেষে ইংরাজই জয়ী হইল। তবে তাতে এটাও প্রমাণিত হইল যে ইংরাজের মত অতবড় দুশমন আর মুসলমানের নাই। এই সময়ে আমি ঢাকা কলেজে বি. এ. পড়ি। এস, এম, (সেক্রেটারিয়েট মুসলিম) হোস্টেলে (বর্তমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল) থাকি। খবরের কাগজ পড়ি। কমন-রুমে তর্ক-বিতর্ক করি। ল’কলেজের ছাত্র ইব্রাহিম সাহেব (পরে জজ, জাস্টিস, ভাইস চ্যান্সেলার ও মন্ত্রী) আমাদের নেতা।

১৯২০ সালে আহসান মনযিলে খেলাফত কনফারেন্স। তরুণ নবাব খাজা হবিবুল্লাহ অভ্যর্থনা-সমিতির চেয়ারম্যান। আলী ভাই, মওলানা আবুল কালাম আযাদ, মওলানা আযাদ সোবহানী, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মওলানা আকরম খাঁ, মৌঃ মুজিবুর রহমান প্রভৃতি দেশ-বিখ্যাত নেতা ও আলেম এই কনফারেন্সে যোগ দেন। ইব্রাহিম সাহেবের নেতৃত্বে আমরা ভলান্টিয়ার হই। তাঁরই বিশেষ দয়ায় আমি প্যান্ডেলের ভিতরে মোতায়েন হই। রাষ্ট্রামের কাছে দাঁড়াইয়া নেতাদের পানি ও চা দেওয়ার ফুট-ফরমায়েশ করাই আমার ডিউটি। তাতে সমাগত নেতাদের চেহারা দেখিবার এবং তাঁদের বক্তৃতা শুনিবার সৌভাগ্য আমার হয়। মওলানা মোঃ আকরম খাঁ ও মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছাড়া আর সব নেতাই উর্দুতে বক্তৃতা করেন। মওলানা আযাদ ছাড়া আর সকলের বক্তৃতা সহজ উর্দুতে হইয়াছিল বলিয়া আমি মোটামুটি বুঝিতে পারিয়াছিলাম। কিন্তু মওলানা আযাদের ভাষা কঠিন হওয়ায় তাঁর অনেক কথাই বুঝি নাই। কিন্তু তাতে কোনই অসুবিধা হয় নাই। কারণ কথায় যা বুঝি নাই তাঁর জ্যোতির্ময় চোখ-মুখের ভংগিতে ও হস্ত সঞ্চালনের অপূর্ব কায়দায় তার চেয়ে অনেক বেশি বুঝিয়া ফেলি। ফলে কথা না বুঝিয়াও আমি মওলানা আমাদের একজন পরম ভক্ত হইয়া উঠি।

এ ঘটনার পর মাস খানেকের মধ্যে ঢাকায় দেশ-বিখ্যাত বহু নেতার শুভাগমন হয়। তন্মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, মওলানা শওকত আলী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, বাবু বিপিন চন্দ্র পাল, মৌঃ ফযলুল হক, মিঃ আবুল কাসেম, মৌঃ ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রভৃতি নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেকালে আরমানিটোলা ময়দান ছাড়া করোনেশন পার্ক ও কুমারটুলির ময়দানেই মাত্র বড়-বড় জন-সভা করিবার জায়গা ছিল। আমরা ছাত্ররা দলে-দলে এই সব সভায় যোগদান করিলাম। এই সব সভার কথা যা আবছা-আবছা মনে আছে তাতে বলা যায় যে, একদিকে মহাত্মা গান্ধী ও মওলানা শওকত আলী অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে, অপরদিকে বাবু বিপিন চন্দ্র পাল ও মৌঃ ফযলুল হক অসহযোগের বিপক্ষে বক্তৃতা করিয়াছিলেন। কিন্তু তৎকালে খিলাফত ও জালিয়ান ওয়ালাবাগের জন্য জন-মত অসহযোগের পক্ষে এমন ক্ষিপ্ত ছিল যে বিরোধী বক্তারা কথায়-কথায় শ্রোতাদের দ্বারা বাধা পাইতেন। এই জন-মতের জন্যই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন অসহযোগের বিপক্ষে বক্তৃতা করিতে আসা সত্ত্বেও আন্দোলনের সমর্থনে বক্তৃতা দিয়া গিয়াছিলেন। যা হোক ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে নাগপুর কংগ্রেস খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন সমর্থন করার পর নেতাদের মতভেদ একরূপ দূর হইয়া যায়। যাঁরা অসহযোগের সমর্থন করেন নাই তাঁরা রাজনীতির আকাশে সাময়িকভাবে মেঘাচ্ছন্ন হইয়া পড়েন। এঁদের মধ্যে জিন্না সাহেব, হক সাহেব ও বিপিন পালের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

৫. আন্দোলনে যোগদান

মৌঃ ইব্রাহিম সাহেব আমাদের সক্রিয় নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছাত্রদের ছোট-খাট একাধিক মিটিং-এ বক্তৃতা দেন। হোস্টেলের আংগিনায় বক্তৃতা নিষিদ্ধ হইলে তিনি হোস্টেলের বাহিরে বক্তৃতা শুরু করেন। বর্তমানে যেখানে টি. বি. ক্লিনিক, এইখানে একটা মাটির টিপিতে দাঁড়াইয়া ইব্রাহিম সাহেব পরপর কয়েকদিন বৃক্ততা করেন। ইব্রাহিম সাহেব ছাড়া আমার আরেকজন সহপাঠী আমার উপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর নাম ছিল মিঃ আবুল কাসেম। তাঁর বাড়ি ছিল বরিশাল জিলায়। পরবর্তীকালে তিনি মোখতারি পাস করিয়া আইন ব্যবসায় করিতেন। এখন তিনি কি অবস্থায় কোথায় আছেন জানি না। কিন্তু ১৯২০ সালে প্রধানতঃ তিনিই আমাকে অসহযোগ আন্দোলনে দীক্ষিত করিয়াছিলেন। এছাড়া আবুল কালাম শামসুদ্দিন তখন কলিকাতা কারমাইকেল হোস্টেল হইতে প্রতি সপ্তাহে দুই একখানা করিয়া দীর্ঘ পত্র লিখিতেন। এইসব পত্রে অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে প্রচুর যুক্তি থাকিত এবং তিনি অতি শীঘ্রই আন্দোলনে যোগ দিতেছেন এই খবর থাকিত। ইতিমধ্যে আমি মহাত্মা গান্ধীর ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’র গ্রাহক হইয়াছিলাম। গভীর মনোযোগে ও পরম শ্রদ্ধার সংগে ইহা পড়িতাম। তাঁর লেখা আমার চিন্তা-ধারায় বিপুল প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। পরবর্তী জীবনেও এই প্রভাব আমি কাটাইয়া উঠিতে পারি নাই।

ইব্রাহিম সাহেবের নেতৃত্বে আমরা অনেক ছাত্র কলেজ ত্যাগ করিয়াছিলাম। বি. এ. পরীক্ষার তখন মাত্র কয়েকমাস বাকী। টেস্ট পরীক্ষা আগেই হইয়া গিয়াছে। অধ্যাপক শ্যালির আমি খুব প্রিয় ছাত্র ছিলাম। তাঁর সবিশেষ পীড়াপীড়িতে আমি ও আরও কতিপয় বন্ধু শেষ পর্যন্ত নামমাত্র পরীক্ষা দিয়া ফলাফলের প্রতি উদাসীনতা দেখাইয়া গ্রামে চলিয়া গেলাম। কংগ্রেস-খেলাফত কমিটির নীতি ছিল ‘ব্যাক টু ভিলেজ’। অতএব তাদের নির্দেশিত পন্থী সংগঠনে মন দিলাম। ইতিমধ্যে কলিকাতা হইতে শামসুদ্দিনও ফিরিয়া আসিয়াছেন। তিনি আমার চেয়ে এক ডিগ্রি বেশি আগাইয়াছেন।বি. এ. পরীক্ষাই দেন নাই। তার বদলে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন প্রতিষ্ঠিত ‘গৌড়ীয় সর্ববিদ্যায়তনের’ ‘উপাধি’ পরীক্ষা দিয়াছেন। সুতরাং স্থানীয় কর্মীদের কাছে চরমপন্থী বলিয়া তাঁর মর্যাদা আমার উপরে। পল্লী গঠনের কাজে তাঁরই নেতৃত্বে আমরা কাজ শুরু করিলাম। একটি জাতীয় উচ্চ বিদ্যালয় ও একটা, তাঁতের স্কুল স্থাপন করিলাম। বৈরলধানীখোলা দুই গ্রামের একই যুক্ত পল্লী সমিতি হইল। শামসুদ্দিন তার সেক্রেটারী হইলেন। বৈলর বাজারে অফিস প্রতিষ্ঠিত হইল। হাইস্কুলে হইল বৈলর বাজারে দীনেশ চন্দ্র সরকারের বিশাল আটচালা ঘরে। আমি হইলাম স্কুলের হেড-মাস্টার। শামসুদ্দিন হইলেন এসিস্ট্যান্ট হেড মাস্টার। শিক্ষক-ছাত্রে অল্পদিনেই স্কুলটি গম-গম করিতে লাগিল। শামসুদ্দিনের চাচা জনাব যহিরুদ্দিন তরফদার সাহেব আমার ছোটবেলা হইতেই প্রজা আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি কংগ্রেসে খেলাফত আন্দোলনেও আমাদের মুরুব্বি হইলেন। পল্লীসমিতির প্রেসিডেন্ট ও হাইস্কুলের সেক্রেটারী হইলেন তিনিই।

৬. পল্লী সংগঠন

হাইস্কুল হইল বিনা-বেতনের বিদ্যালয়। নিতান্ত অভাবী শিক্ষকরা ছাড়া আমরা সবাই বিনা বেতনের শিক্ষক হইলাম। স্কুলের লাইব্রেরি মানচিত্র টেবিল চেয়ার বেঞ্চি ব্ল্যাক বোর্ড ইত্যাদির ব্যয় ও পল্লী সমিতির খরচের জন্য আমরা বাজারে তোলা ও গ্রামের মুষ্টি চাউল তুলিতে লাগিলাম। সারা গ্রামের ঘরে-ঘরে মুষ্টির ঘট বসাইলাম। সপ্তাহে-সপ্তাহে নিয়মিতভাবে ঘটের চাউল ভলান্টিয়ারসহ আমরা নিজের কাঁধে ও মাথায় করিয়া সগ্রহ করিতাম।

ফলে হাইস্কুল, তাঁতের স্কুল, চরখা স্কুল ও পল্লী সমিতির কাজে কৈলর বাজার জিলা-নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। জিলা-নেতৃবৃন্দের মধ্যে মৌঃ তৈয়বুদ্দিন আহমদ, শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ প্রভৃতি অনেকেই আমাদের কাজ দেখিতে আসিতেন। এ অঞ্চলে পল্লী গ্রামে ইহাই একমাত্র জাতীয় উচ্চ বিদ্যালয় হওয়ায় আশে পাশের দশ মাইলের মধ্যেকার সর্ব হাইস্কুলের উচ্চ শ্রেণীর ছাত্ররা এই স্কুলে যোগদান করিল। তাঁতের স্কুলে চার-পাঁচ জন তাঁতীর পরিচালনায় ৪৫ টা তাঁতে কাপড় বুনার কাজ চলিল। নানা রং-এর সূতার টানায় মাঠ ছাইয়া গেল। ঐসব তাঁতে রাতদিন ঘর্ঘর আওয়াজ চলিল। পল্লী সমিতি হইতে বিনা মূল্যে গ্রামে চরখা বিতরণ ও তুলার বীজ বিলান হইল। আমাদের পল্লী সমিতি এইভাবে কিত দিনরাত কর্মচঞ্চল। এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সভা করিতাম। আমরা সপ্তাহে অন্তত একদিন। এই সব সভায় শহর হইতে দু-চার জন নেতা আসিতেন। সন্ধ্যার অনেক পরেও এই সব সভার কাজ চলিত। সভার স্থানীয় উদ্যোক্তাদের একজনের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আগে হইতেই ঠিক থাকিত। সভা শেষে নির্ধারিত বাড়িতে উদরপূর্তি খানা খাইতাম। খাওয়া-দাওয়া সারিতে-সারিতে বেশ রাত হইয়া যাইত। তবু আরা রাত্রিবাস করিতাম না। কত কাজ আমাদের। আমরা কি এক জায়গায় সময় নষ্ট করিতে পারি? এই ধরনের কথা বলিয়া নিজেদের বুযুর্গি বাড়াইতাম। পাড়াচালের চার-পাঁচ মাইল রাস্তা হাঁটিয়া এই বুযুর্গির দাম শোধ করিতাম। শহরের নেতাদের জন্য যথাসম্ভব কাছের কোন সড়কে ঘোড়াগাড়ি এন্তেযার করিত। তাঁদের গাড়িতে তুলিয়া দিয়া আমরা বাড়ি-মুখী হইতাম। পথের কষ্ট ভুলিবার জন্য আমরা গলা ফাটাইয়া ‘স্বদেশী গান’ ও ‘খেলাফতী গযল’ গাইতাম। পাঠকদের, বিশেষত তরুণ পাঠকদের কাছে বিশ্বয়কর শোনা গেলেও এটা সত্য কথা যে, আবুল কালাম শামসুদ্দিন আর আমিও গান গাইতাম। ইয়ার্কি না। সত্যই আমরা গান গাইতে পারিতাম। তার উপর আমি বাঁশি বাজাইতে পারিতাম। বস্তুতঃ কলেজ হোস্টেলে জনাব ইব্রাহিম, কাযী মোতাহার হোসেন সাহেব প্রভৃতি উপরের শ্রেণীর ছাত্রদেরও আমি ‘ওস্তাদজী’ ছিলাম। এরা সকলেই গান গাইতেন। আসল কথা এই যে শৈশবে সব লেখকই যেমন কবি থাকে, তেমনি প্রায় সকলেই গায়কও থাকেন।

৭. আন্দোলনের জনপ্রিয়তা

যা হউক, এইরূপ কর্মোদ্যমের মধ্যে আমরা শারীরিক সুখ-স্বাদের কথা ভুলিয়াই থাকিতাম। গোসল-খাওয়ার কোন সময় অসময় ছিল না। জনগণের ও কর্মীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা আমাদের চব্বিশ ঘন্টা মাতাইয়া রাখিত। ধনী-গরিব নির্বিশেষে জনগণ এই আন্দোলনকে নিতান্ত নিজের করিয়া লইয়াছিল। একটি মাত্র নযিরের উল্লেখ করি। এই সময় নিখিল-ভারত খিলাফত কমিটি আংগোরা (বর্তমান আংকারা) তহবিল নামে একটি তহবিল খুলেন যুদ্ধরত কামাল পাশাকে সাহায্য করিবার জন্য। ফেৎরার মত শিশু-বৃদ্ধ-নর-নারী নির্বিশেষে মাথা-পিছে দুই পয়সা চাঁদা উপর হইতেই নির্ধারিত হইয়াছিল। আমাদের এলাকার লোকেরা ফেত্রা দেওয়ার মতই নিষ্ঠার সাথে স্বেচ্ছায় এই চাঁদা দিল। ত্রিশ হাজার অধিবাসীর দুই গ্রাম মিলাইয়া আমরা বিনা-আয়াসে প্রায় এক হাজার টাকা তুলিলাম। তেমনি নিষ্ঠার সংগে শামসুদ্দিন ও আমি ঐ টাকার বোঝা মাথায় করিয়া জিলা খিলাফত কমিটিতে জমা দিয়া আসিলাম। একটি পয়সাও স্থানীয় সমিতির খরচ বাবত কাটিলাম না।

গঠনমূলক কাজের মধ্যে আমরা চরখা ও তুলার বীজ বিতরণ এবং শালিসের মাধ্যমে মামলা-মোকদ্দমা আপোসরণের দিকেই বেশি মনোযোগ দেই। দুই গ্রাম মিলাইয়া আমরা একটি মাত্র শালিসী পঞ্চায়েত গঠন করি। আমাদের স্থানীয় নেতা যহিরুদ্দিন তরফদার সাহেব এই পঞ্চায়েতের চেয়ারম্যান হন। ইউনিয়ন বোর্ড আইন তখনও হয় নাই। কাজেই প্রেসিডেন্ট নামটা তখনও জানা হয় নাই। ডিসট্রিক্ট বোর্ড লোক্যাল বোর্ডের চেয়ারম্যানই তখন সবচেয়ে বড় সম্মানের পদ। আমরা আমাদের পঞ্চায়েতের প্রধানকেও সেই সম্মান দিলাম। পঞ্চায়েতের বৈঠক পক্ষগণের সুবিধামত এক একদিন এক এক পাড়ায় হইত। তরফদার সাহেব বরাবরের দক্ষ বিচারক মাতব্বর। তাঁর প্রখর বুদ্ধি সুচতুর মধুর ব্যবহার ও নিরপেক্ষ বিচার সকলকে মুগ্ধ করিত। অল্পদিনেই স্থানীয় মামলা-মোকদ্দমা লইয়া কোর্ট-কাছারি যাওয়া বন্ধ হইল।

তুলার চাষ জনপ্রিয় করার ব্যাপারে আমরা সরকারী সাহায্য পাইলাম। গভর্ণমেন্টকে আমরা এই সময়ে সবচেয়ে বড় দুশমন মনে করিতাম। কাজেই সরকারী সাহায্য নেওয়ার কথাই উঠিতে পারে না। কিন্তু এই সময় সদর মহকুমার এস. ডি. ও. ছিলেন নবাবদা আবদুল আলী। তিনি গায়ে চাপকান মাথায় গুম্বযী টুপি পরিতেন বলিয়া অন্যান্য সরকারী কর্মচারী হইতে তাঁর একটা আলাদা মান-মর্যাদা ছিল জনগণের কাছে। বিশেষতঃ মুসলমানদের নিকট তিনি ছিলেন অসাধারণ জনপ্রিয়। আমরা সব কংগ্রেস খিলাফত কর্মীদের ডাকিয়া চা খাওয়াইয়া আশাতীত সম্মান দেখাইয়া তিনি বুঝাইলেন, তিনিই অসহযোগ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সমর্থক। কাজেই তিনি তুলার চাষ বাড়াইয়া দেশকে সূতায় ও কাপড়ে আত্মনির্ভরশীল করিতে চান। আমরা তাঁর কথা মানিয়া লইলাম। সরকারী তহবিলের বহু তুলার বীজ আমরা বিতরণ করিলাম।

৮. উৎসাহে ভাটা

কিন্তু আমাদের উৎসাহ এক বছরের বেশি স্থায়ী হইল না। গান্ধীজীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি-গত এক বছরে স্বরাজ আসিল না। চৌরিচূরার হাংগামার ফলে তিনি সার্বজনীন আইন অমান্য প্রত্যাহার করিলেন। কংগ্রেস নেতারা তদন্ত করিয়া রিপোর্ট দিলেন স্কুল-কলেজ ও অফিস-আদালত বয়কট ব্যর্থ হইয়াছে। এরপর ছাত্ররা জাতীয় বিদ্যালয় ছাড়িয়া দলে-দলে সরকারী ‘গোলাম-খানায়’ ঢুকিতে লাগিল। আমাদের জাতীয় বিদ্যালয়ের ও তাঁতের স্কুলের ছাত্র কমিয়া গেল। খদ্দরের কাপড় মোটা ও রং কাঁচা বলিয়া আমাদের তৈরি কাপড় বিক্রিতে মন্দা পড়িল। কারিগর শিক্ষক ও গরিব মাস্টারদের বেতন দেওয়া অসম্ভব হইয়া উঠিল। তাঁতের স্কুলের কারিগর শিক্ষকরা ছিলেন সবাই গরিব লোক। তাঁদের মাসে মাসে নিয়মিতভাবে বেতন না দিলে চলিত না। এদের বেতন বাকী পড়িতে লাগিল। তাঁতের তৈরি কাপড়গুলি নিয়মিত বিক্রি হইত না। বিক্রি হইলেও কম দাম হইত। তাতে বেতন বাকী পড়িত। বাজারের তোলা গ্রামের মুষ্টি চাউল সব ব্যাপারেই লোকের উৎসাহ কমিতে লাগিল। মাষ্টার, কারিগর ও কর্মীদের মধ্যে শৈথিল্য ও নিরুৎসাহ দেখা দিল।

আমাদের মন ও শরীরের উপর এর চাপ পড়িল। শামসুদ্দিন ছিলেন বরাবরের আমাশয় রোগী। এক বছরের কঠোর পরিশ্রম ও অনিয়মে তাঁর শরীর আরও খারাপ হইল। শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হিসাবেই তিনি ‘মোসলেম জগৎ’ নামক সাপ্তাহিক কাগজের দায়িত্ব লইয়া কলিকাতা চলিয়া গেলেন। আমি একা চরম নিরুৎসাহ ও অভাবের মধ্যে হাইস্কুল, তাঁতের স্কুল, চরখা স্কুল, পল্লীসমিতি ও শালিসী পঞ্চায়েতের কাজ চালাইতে লাগিলাম। এই দুর্দিনে ‘বড় চাচা’ যহিরুদ্দিন সাহেবের পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ এবং ডাঃ দীনেশ চন্দ্র সরকার ও ডাঃ আক্কাস আলী প্রভৃতি উৎসাহী কর্মীদের কর্মোন্মাদনার উত্তাপই আমার কর্মপ্রেরণার সলিতা কোনও মতে জ্বালাইয়া রাখিল।

কিন্তু বেশিদিন এভাবে চলিল না। শেষ পর্যন্ত আমিও রণে ভংগ দিলাম। আস্তে আস্তে সব প্রতিষ্ঠান গুটাইয়া নিজে ময়মনসিংহ শহরে চলিয়া আসিলাম। ১৯২২ সালের মাঝামাঝি জিলার জনপ্রিয় নেতা মৌঃ তৈয়বদ্দিন আহমদ পুনরায় ওকালতি শুরু করায় জিলা খিলাফত কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব আমারই উপর পড়িল। আন্দোলনে যোগ দিয়াই তৈয়বুদ্দিন সাহেব ফ্যামিলি বাড়ি পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তাঁর বাসাই খিলাফত নেতাদের বাসস্থান ছিল। আমারও হইল। তৈয়বুদ্দিন সাহেব তাঁর বড় ভাই মৌঃ শাহাবুদ্দিন উকিল সাহেবের বাসায় খাওয়া-দাওয়া করিতেন। আমরা কতিপয় নেতা তৈয়বুদ্দিন সাহেবের বাসায় মেস করিয়া খাওয়া-দাওয়া করিতাম। নেতাদের মধ্যে যাঁদের শহরে বাড়ি-ঘর নাই তাঁরা কংগ্রেস খেলাফতের টাকাতেই খাওয়া খরচ চালাইতেন। আমারও তাই হইল। কিন্তু এটা আমার ভাল লাগিত না। বিশেষতঃ টাকার অভাবে এই সময় খিলাফত কমিটির স্বতন্ত্র অফিস উঠাইয়া কংগ্রেস অফিসেরই এক কামরায় খিলাফত অফিস করিলাম। এমত অবস্থায় নেতাদের খাওয়ার তহবিলের টাকা খরচ করিলে খেলাফত অফিসের খরচায় টান পড়িত।

৯. জাতীয় বিদ্যালয়ে মাস্টারি

অতএব আমি স্থানীয় জাতীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা গ্রহণ করিলাম। এই স্কুলের হেড মাষ্টার ছিলেন আমার শিক্ষক ও মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের ভূতপূর্ব সহকারী হেডমাস্টার শ্ৰীযুক্ত ভূপতি নাথ দত্ত। তিনি ছিলেন ঋষি-তুল্য মহাপ্রাণ ব্যক্তি। ছাত্রজীবনেই তিনি আমাকে পূত্রবৎ স্নেহ করিতেন। আমাকে পাইয়া তিনি লুফিয়া নিলেন সহকারীরূপে। তাঁর নেই-শীতল ছায়ায় ও তাঁর অভিজ্ঞ পরিচালনায় আমি শিক্ষকতা শুরু করিলাম। শিক্ষার আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে এবং শিক্ষকতার টেকনিক্যাল খুঁটি-নাটি ব্যাপারে এই সময় তাঁর কাছে অনেক জ্ঞান লাভ করিলাম। স্কুলের সময় তিনি ছাত্রদের যেমন বিদ্যা শিক্ষা দিতেন, স্কুল আওয়ারের পরে তেমনি তিনি আমাদিগকে শিক্ষকতা শিক্ষা দিতেন। বেতন হিসাবে আমি চল্লিশটি টাকা পাইতাম। এই টাকাতেই আমি খেলাফত নেতাদের মধ্যে রীতিমত ধনী লোক হইয়া গেলাম। নিজের পরা ছাড়া দু’একজন গরিব সহকর্মীকেও পোষিতে পরিতাম। শিক্ষকদের মধ্যে আরবী-ফারসী শিক্ষক ছাড়া। আরও দু’জন মুসলমান ছিলেন। তাঁদের নাম ছিল মৌঃ,সাইদুর রহমান ও মৌঃ আলী হোসেন। উভয়ে নিম্নশ্রেণীর শিক্ষক ছিলেন। সাইদুর রহমান সাহেব বেতন পাইতেন ত্রিশ টাকা ও আলী হোসেন পাইতেন পঁচিশ টাকা। উভয়েই আমাদের সাথে এক মেসে থাকিতেন। খেলাফত নেতা-কর্মীদের ভার তাঁদের উপরও গড়াইত।

এই সময় খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ঝিমাইয়া আসিয়াছে। কাজেই করিবার মত কাজ আমাদের বিশেষ কিছু ছিল না। দিনের বেলা মাস্টারি করি এবং বিকাল ও রাত্রি বেলা নেতাদের বাড়ি-বাড়ি চা খাই। অগত্যা অফিসে বসিয়া আড্ডা মারি। এই সুযোগে শহরের বড় বড় নেতা যথা শ্রীযুক্ত সূর্যকুমার সোম, ডাঃ বিপিন বিহারী সেন, শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্র নাথ মৈত্রেয়, মিঃ সুধীর চন্দ্র বসু বারিস্টার (সূৰ্য্যবাবুর মেয়ের জামাই), শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ ও শ্রীযুক্ত মতিলাল পুরকায়স্থ প্রভৃতির সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হই। সুরেনবাবু ‘মধু ঘোষ’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি প্রায় আমার সমবয়স্ক। সেজন্য তাঁর সাথে বন্ধুত্ব হয়। তিনি বিপ্লবীদের ‘মধুদা’ ছিলেন। ডাঃ বিপিন সেন ও সূৰ্য্য সোম আমার পিতৃতুল্য শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। পরবর্তী জীবনে তাঁদের স্নেহও পাইয়াছিলাম অফুরন্ত। তাঁরা উভয়ে অসাম্প্রদায়িক উদার মহান ব্যক্তি ছিলেন।

এঁদের সাহচর্যে ময়মনসিংহ শহরের প্রায় বছর খানেক বড়ই আনন্দে কাটিয়াছে, সুরেন বাবু, মওলানা আযিযুর রহমান (ইনি নোয়াখালির লোক ছিলেন), মৌলবী আবদুল হামিদ দেওপুরী, অধ্যাপক মোয়াযম হোসেন, মৌঃ সাইদুর রহমান প্রভৃতি হিন্দু-মুসলমান কংগ্রেস খেলাফত নেতারা বিকালে দল বাঁধিয়া রাস্তায় বাহির হইতাম। পথচারীরা সম্ভ্রমে আমাদের পথ ছাড়িয়া দিত এবং সালাম-আদাব দিত। এমন পথ ভ্রমণে আমিই ছিলাম অন্যতম প্রধান বক্তা অবশ্য রাস্তাঘাটে। পথ চলিতে চলিতে আমার মত বকিতে কেউ পারিতেন না। আমি কোনও কোনও সময় অতি উৎসাহে বন্ধুদের সামনে করিয়া পিছন দিকে চলিতে-চলিতে বক্তৃতা করিতাম। এমন করিতে গিয়া একদিন একজন পথচারিনী মহিলার পায়ে পাড়া মারিয়া ঝটপট ঘুরিয়া হিন্দু ভংগিতে দুই হাত জোড় করিয়া মহিলাকে নমস্কার করিলাম। রাস্তায় যখন বেড়াইতে বাহির হইয়াছেন তখন নিশ্চয়ই তিনি মুসলমান নন। আমাকে এভাবে নমস্কার করিতে দেখিয়ে মহিলা হতভম্ব হইয়া গেলেন। বন্ধুরা সকলে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। কেউ কেউ বলিলেন : ‘ওটা যে বেশ্যা। একটা বেশ্যাকে তুমি সেলাম করিলে?’ আমার মুখ হইতে চট করিয়া বাহির হইল : ‘যারা বেশ্যাগামী তাদের কাছেই ইনি বেশ্যা, আমার কাছে তিনি ভদ্রমহিলা মাত্র।’ সকলে নীরব হইলেন। মেয়েটি সজল নয়নে আমার দিকে চাহিয়া রহিল।

কিন্তু বেশিদিন এভাবে চলিল না। সক্রিয় আন্দোলনের অভাবে চিন্তার প্রচুর সুযোগও পাইলাম। অবস্থাগতিকে চিন্তায় বাধ্যও হইলাম। অল্পদিনের মধ্যেই বুঝিলাম, দেশের স্বাধীনতা ও খিলাফতের জন্য সর্বস্ব ও প্রাণ বিসর্জন দিবার যে দুর্বার তাকিদে কলেজ ত্যাগ করিয়াছিলাম, সে সব ত্যাগের আজ কোন দরকার নাই। কারণ স্বাধীনতা ও খেলাফত কোনটাই উদ্ধারের কোনও সম্ভাবনা এখন নাই। মহাত্মাজী স্বরাজের মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছাইয়া দিয়াছেন। মোস্তফা কামাল খেলাফত ভাংগিয়া দিয়া মহামান্য সুলতানকে দেশ হইতে তাড়াইয়া দিয়াছেন। কাজেই আমার আপাততঃ জাতীয় বিদ্যালয়ের মাস্টারিই সার হইল। বেতন চল্লিশ টাকা এতদিন মোটেই অপ্রতুল মনে হয় নাই। কারণ তৎকালে খরচও কম ছিল। তখন এক পয়সায় এক কাপ চা, চার পয়সায় পঁচিশ টা মুখপোড়া বিড়ি ও পয়সায় দুইটা দিয়াশলাই পাওয়া যাইত। তাতে সারা দিনে চার আনার বেশি খরচ করিতে পারিতাম না। তৈয়বুদ্দিন সাহেবের বাসায় বিনা-ভাড়ায় থাকিতাম। তিন-চার বন্ধুতে একত্রে মেস করিয়া খাইতাম। পাঁচ টাকার বেশি খোরাকি লাগিত না। পোশাকে বাবুগিরি ছিল না। সস্তা মোটা খদ্দরের তহবন্দ ও পাঞ্জাবী পরিতাম। একটা ধুতিতেই একটা পাঞ্জাবী ও একটা তহবন্দ হইয়া যাইত। দুই টাকা চার আনা দিয়া বছরে দুই খানা ধুতি (প্রতিটি আঠার আনা) কিনিতাম তাতেই দুইখানা পাঞ্জাবী ও দুইখানা তহবন্দ হইয়া যাইত। দুইটা পাঞ্জাবী সিলাই করিতে দর্জি নিত বার আনা। তহবন্দ সিলাইর চার্জ ছিল দুইটা দুই আনা। পাঞ্জাবীর বাদবাকী টুকরা কাপড় হইতে সচ্ছন্দে দুইটা গান্ধী টুপি হইয়া যাইত। দুইটা টুপিতে ও দুইটা তহবন্দে কখনও চার আনা কখনও বা দুই আনা দর্জিকে দিয়াই মাফ লইতাম। সুতরাং দেখা গেল, মোট সোওয়া তিন টাকা খরচ করিয়া আমার দুইটা পাঞ্জাবী দুইটা তহবন্দ ও দুইটা টুপি হইয়া যাইত। খদ্দরটা মোটা বলিয়া মজবুতও হইত। ধুইতামও নিজেই। একনম্বর ঢাকাই বাংলা সাবান ছিল পাঁচ আনা সের। দশ পয়সায় আধা সেরের একটা দলা পাওয়া যাইত। প্রতি সপ্তাহে ঐ এক দলা সাবানে সব কাপড় ধোলাই হইয়া যাইত। কখনও কখনও এক পয়সার নীল কিনিয়া নীলের ছোপ দিতাম। কেউ ‘বাবু’ বলিলে তাও দিতাম না। তবু মোটামুটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকিতাম।

সুতরাং টাকা-পয়সার অল্পতার কথা অনেকদিন মনে করি নাই। প্রথমে মনে পড়ে আদর্শহীনতার কথা। কিসের জন্য অত প্রশংসার ছাত্র-জীবন ত্যাগ করিলাম? নিশ্চয়ই চল্লিশ টাকার স্কুল মাস্টারি করিবার জন্য নয়। ন্যাশনাল স্কুলে মাস্টারি? তারই মানে কি? চরখায় সূতা কাটা ছাড়া ‘গোলামখানা’ হাই স্কুলের পঠিতব্য ও ন্যাশনাল হাই স্কুলের পঠিতব্যে পার্থক্য কি? সব বেসরকারী স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষক এবং অনেক ছাত্র আমারই মত খদ্দর পরেন। তবে পার্থক্যটা কোথায়? বিশেষতঃ ন্যাশনাল স্কুলই হোক আর ‘গোলামখানা’ই হোক মাস্টারগণকে ত ঘড়ির কাঁটা ধরিয়াই স্কুলে আসতে হয়। বিকালে ক্লান্ত দেহে শুকনা মুখে ঘরে ফিরিতে হয়।

দেশোদ্ধারের চিত্ত-চাঞ্চল্যকর দেহমন-শিহরণকারী কাজ এতে কোথায়? মনটা ক্রমেই খারাপ হইতে লাগিল। স্কুলের কাজ ছাড়িয়া দিয়া অপেক্ষাকৃত রোমাঞ্চকর রোমান্টিক কিছু করিবার জন্য মন উতলা হইয়া গেল। কিন্তু দুইটি কারণে হঠাৎ কিছু করিতে পারিলাম না। তার একটি ছাত্রের মায়া, অপরটি টাকার মায়া ছাত্রের মায়া এইজন্য যে তাদেরে আমি ভালবাসিতাম। তারাও আমাকে ভালবাসিত। সহকর্মীরাও বলিতেন, আমি ছাত্রদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। আমি তখন দাড়ি রাখিয়াছি। দাড়ি-লুংগি টুপিতে আমি দস্তুরমত একজন মুনশী সাহেব। এমন একজন মুসলমানের পক্ষে ঐ স্কুলে জনপ্রিয় শিক্ষক হওয়া আশ্চর্যের বিষয় ছিল। কারণ ছেলেদের বেশির ভাগই ছিল ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-বৈদ্য সমাজের হিন্দু ছেলে। অধিকাংশই শহরের উকিল-মোক্তার ডাক্তার প্রভৃতি ভদ্রলোকের ছেলে। এরা আমাকে এত ভক্তিশ্রদ্ধা করিত যে এদের অনেকে রাস্তাঘাটে পর্যন্ত আমাকে পা ছুঁইয়া প্রণাম করিত। অথচ হিন্দু মাষ্টাররা এই সৌভাগ্য হইতে বঞ্চিত ছিলেন। এইসব ছেলের মধ্যে চার জনের কথা আমি জীবনে ভুলিতে পারি না। দুই জন ব্রাহ্মণ, একজন কায়স্থ ও একজন বৈদ্য। এঁরা সকলেই পরবর্তী জীবনে উচ্চ-উচ্চ দায়িত্বপূর্ণ পদের অধিকারী নেতৃস্থানীয় লোক হইয়াছেন। হিন্দু ছেলেদের মধ্যে মুসলমানদের মত গুরু-ভক্তি নাই বলিয়া স্বয়ং হিন্দু শিক্ষকদেরই একটা সাধারণ অভিযোগ আছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা এই অভিযোগ সমর্থন করে না। এই ধরনের ভক্তিমান ছেলেরা আমার হৃদয়-মন এমন জয়। করিয়াছিল যে এদের মনের দিকে চাহিয়া আমি কোনমতেই এই স্কুলের মায়া কাটাইতে পারিতাম না।

দ্বিতীয় কারণ অবশ্য এর চেয়ে কাটখোট্টা বাস্তব কারণ। মাসে মাসে যে চল্লিশটি টাকা পাই শিক্ষকতা ছাড়িয়া দিলে তা-ইবা পাইব কোথায়? খিলাফত ফন্ডে যে সামান্য পয়সা ছিল, সেক্রেটারি হিসাবে আমি অবশ্যই কোষাধ্যক্ষের নিকট হইতে তা চাহিয়া নিতে পারিতাম। কিন্তু নিজের খাওয়ার জন্য কোষাধ্যক্ষের কাছে টাকা চাওয়া আমি লজ্জার বিষয় মনে করিতাম। কাজেই স্কুলের মাস্টারি ছাড়িলে আমাকে খালি পকেটে এবং শেষ পর্যন্ত খালি পেটে থাকিতে হইবে। এটা আমার কাছে স্পষ্ট হইয়া উঠিল। এইভাবে এতদিনে বুজিলাম, দেশের স্বাধীনতাই বল, আর ধর্মের খিলাফতই বল, পেটে আগে কিছু না দিয়া দুইটার কোনওটাই উদ্ধার করা চলে না।

কলেজ ছাড়িবার সময় ল্যাংলি সাহেব ও বাপ-মা মুরুব্বিরাও এই কথাই বলিয়াছিলেন। তখন জবাব দিয়াছিলামঃ টাকা-পয়সা ও ভোগবিলাসিতা ত তুচ্ছ কথা, দেশ ও ধর্মের জন্য প্রাণ পর্যন্ত ত্যাগ করিতে পারি। এখন বুঝিতেছি, দরকার হইলে প্রাণ হয়ত সত্য-সত্যই দিতে পারি। কিন্তু তার দরকার ত মোটেই হইতেছে না। কেউত আমার প্রাণ চাইতেছে না। প্রাণ দিবার কোনও রাস্তাই তা নিজের চোখেও দেখিতেছি না। মাস্টারি ছাড়া কাজের মধ্যে ত আড্ডা মারা। উকিলরা সব কোর্টে ফিরিয়া যাওয়াতে তাঁদের বাসায়ও আগের মত আড্ডা দেওয়া চলে না। মক্কেলের ভিড়। একমাত্র চাঞ্চল্যকর কাজ কংগ্রেস-খিলাফতের সভা উপলক্ষে কলিকাতা গয়া। দিল্লী বোম্বাই যাওয়া। সেটাও আমার ভাগ্যে জুটে না। কলিকাতার পশ্চিমে আর আমার যাওয়াই হয় না। কারণ ঐ সব সভায় যাওয়ার ভাড়া ও খরচ-পত্র বহন করার মত টাকা কংগ্রেস-খিলাফত ফণ্ডে নাই। কাজেই অন্য সব কর্মী বন্ধুরা, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের নিকট হইতে টাকা যোগাড় করিয়া লয়। কিন্তু আমার তেমন কোনও বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন না থাকায় আমি কলিকাতা যাওয়ার আনন্দ হইতেও প্রায়শঃ বঞ্চিত থাকিতাম।

কাজেই সকল দিক বিবেচনা করিয়া আমি যে বাস্তব অবস্থার সম্মুখীন হইলাম, তার সোজা অর্থ এই যে, আমি খিলাফত ও স্বরাজের দোহাই দিয়া কলেজ ছাড়িয়া আসিয়া চল্লিশ টাকা বেতনের চাকরি করিতেছি। কলেজ ত্যাগের এই কি পরিণাম? এই কাজে কি স্বরাজ খিলাফত উদ্ধার হইবে? বাপ-মা মুরুব্বিদের এমন কি নিজেরে ফাঁকি দেই নাই কি? অতিশয় অস্থির-চঞ্চল হইয়া উঠিলাম। অনেক বিনিদ্র রজনী কাটাইলাম।

০৩. বেংগল প্যাক্ট

বেংগল প্যাক্ট
তেসরা অধ্যায়

১. খিলাফত্রে অবসান

১৯২২ সালের মাঝামাঝি প্রাদেশিক খিলাফত কমিটির ওয়ার্কিং কমিটির এক বৈঠক উপলক্ষে কলিকাতা গেলাম তদানিন্তন প্রাদেশিক সেক্রেটারি সৈয়দ মাজেদ বখশ সাহেবের বিশেষ অনুরোধে, কলিকাতায়ও আমার এই প্রথম পদার্পণ। খিলাফত কমিটির মিটিংএও আমার এই প্রথম উপস্থিতি। আমি অনেক আগে হইতেই প্রাদেশিক ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার থাকা সত্ত্বেও এর আগে কখনও তার মিটিং-এ যোগ দেই নাই। অল-ইন্ডিয়া-খিলাফত নেতা মওলানা শওকত আলী সাহেব ওয়ার্কিং কমিটির সমস্ত সদস্যের সাথে বিশেষতঃ জিলা-নেতৃবৃন্দের সাথে খিলাফতের বিশেষ পরিস্থিতি আলোচনা করিতে চান। সেক্রেটারি মাজেদ বখশ সাহেবের এই মর্মের পত্র পাইয়াই আমি এই সভায় অংশ গ্রহণ করিতে আসি। কলিকাতা খিলাফত কমিটির আর্থিক অবস্থা তখনও স্বচ্ছল। মফস্বলের নেতাদের হোটেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা তখনও করা হয়। সেক্রেটারি সৈয়দ মাজেদ বখশ সাহেব আমারও বন্দোবস্ত করিলেন। কিন্তু আমি হোটেলের বদলে শামসুদ্দিনের সাথে থাকাই মনস্থ করিলাম। তাই ১নং আন্তণী বাগানস্থ ‘মোসলেম জগত’ আফিসে উঠিলাম। খিলাফত কমিটির সভায় যোগ দেওয়া ছাড়াও আমার অন্য উদ্দেশ্য ছিল। খিলাফত উদ্ধারের বদলে নিজেকে উদ্ধার করা আমার আশু প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছিল। শামসুদ্দিনের মধ্যস্থতায় কোনও খবরের কাগজে একটা চাকরি যোগাড়ের সম্ভাবনা বিচারও আমার সে যাত্রায় উদ্দেশ্য ছিল। খিলাফত কমিটির কাজ সারিতে আমার দুইদিন লাগিল। মওলানা শওকত আলী সাহেবকে এতদিন শুধু দূর হইতে দেখিয়াছি, সভা-সমিতিতে বক্তৃতা শুনিয়াছি। এবারই প্রথম সামনা-সামনি কথা বলিবার গৌরব অর্জন করিলাম। মওলানা সাহেবের আশাবাদ দেখিলাম। বিস্মিত হইলাম। তখন মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে নয়াতুকী বাহিনী গ্রীক বাহিনীর কবল হইতে স্মর্না উদ্ধার করিয়াছে; গ্রীক বাহিনীকে তাড়া করিয়া নিতেছে। এই ঘটনায় সব মুসলমানেরই আনন্দ করিবার কথা। আমরাও করিয়াছি। কিন্তু মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে তুর্কীরা রাজনৈতিক সেকিউলারিষম গ্রহণ করিতেছে; পোশাক-পাতিতে ইউরোপীয় সাজিবার চেষ্টা করিতেছে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠান উঠাইয়া দিতে পারে বলিয়া গুজব রটিতেছে। স্বয়ং তুর্কীরা খিলাফত উঠাইয়া দিলে আমরা ভারতীয়রা কিরূপে আন্দোলন চালাইব, প্রধানতঃ এই কথাটার আলোচনার জন্যই মওলানা সাহেব কলিকাতা আসিয়াছেন। তাঁর মতে কামাল খিলাফত উচ্ছেদ করিতে পারেন না। আইনতঃ সে অধিকারও তাঁর নাই। খিলাফত কোন দেশ-রাষ্ট্রের অনুষ্ঠান নয়; এটা বিশ্ব-মুসলিমের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। অতএব কামাল পাশা ওটা উঠাইয়া দিলেও আমরা তা মানিব না। মওলানা সাহেবের এই বিস্ময়কর আশাবাদে পুরাপুরি শরিক হইতে না পারিলেও আমরা খিলাফত-কর্মীরা নৈরাশ্যের মধ্যে আলোর ছটা দেখিতে পাইলাম। পরম উৎসাহের মধ্যেই খিলাফত কমিটির কাজ শেষ হইল।

খিলাফতের কাজ শেষ হওয়ায় আমার কাজ শুরু হইল। শামসুদ্দিনের কাছে মনের কথা বলিলাম। তিনি আমাকে কিছু ‘কোদাল কাম’ করিবার পরামর্শ দিলেন। আমি ‘কোদাল কাম’ শুরু করিলাম। শামসুদ্দিনের কাগযে কিছু কিছু লেখা দিতে লাগিলাম। বংগীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কলেজ স্ট্রিট আফিসে যাতায়াত করিলাম। সমিতির সভাপতি ডাঃ শহীদুল্লাহ, সেক্রেটারি ভোলার কবি মোযাম্মেল হক, সমিতির সহকারী সম্পাদক মোযাফফর আহমদ (পরে কমরেড) ও কাজী নজরুল ইসলামের সাথে পরিচিত হইলাম। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও মওলানা মনিরুজ্জামানের সাথে খিলাফত কমিটিতেই পরিচিত হইয়াছিলাম। মওলানা ইসলামাবাদী সাহেব এই সময় কলিকাতায় থাকিয়া ‘ছোলতান’ নামক সাপ্তাহিক কাগজ চালাইতেন। আমি শামসুদ্দিনের পরামর্শে ‘মোহাম্মদী’ ও ‘ছোলতান’ অফিসে যাতায়াত করিয়া আমার ‘কোদাল কামের’ পরিধি বাড়াইতে লাগিলাম। ইতিমধ্যে ‘সভ্যতায় দ্বৈতশাসন’ নামক আমার এক অতিদীর্ঘ দার্শনিক-রাজনৈতিক প্রবন্ধ শামসুদ্দিনের কাগযে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হইতে লাগিল। প্রাথমিক ‘কোদাল কাম’, যথেষ্ট হইয়াছে মনে করিয়া সেবারের মত ময়মনসিংহ ফিরিয়া আসিলাম। পরে আরও কয়েকবার যাতায়াত করিলাম।

একবার ময়মনসিংহে ফিরিবার অন্য কারণ ঘটিয়াছিল। শুধু আমার নন সারা জিলার নেতা মৌঃ তৈয়বুদ্দিন আহমদ সাহেব সেবার আইন সভায় প্রার্থী হইয়াছিলেন। বেংগল প্যাক্ট। তাঁর পক্ষে ক্যানভাস করা আমার কর্তব্য ছিল। ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতা ছাড়াও রাজনৈতিক প্রশ্নও এতে জড়িত ছিল। ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে গয়া কংগ্রেসের সভাপতিরূপে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কাউন্সিল এন্ট্রি প্রোগ্রাম পেশ করেন। কংগ্রেস তাঁর মত গ্রহণ না করায় ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতেই তিনি স্বরাজ্য দল গঠন করেন। ডাঃ আনসারী হাকিম, আজমল খী, বিঠলভাই প্যাটেল, পভিত মতিলাল নেহেরু, মওলানা আকরম খাঁ, মওলানা মনিরুযযামান ইসলামাবাদী, ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় প্রভৃতি অনেক নেতা দেশবন্ধুকে সমর্থন করেন। আমি নিজে দেশবন্ধুর এই মত পরিবর্তনকে মডারেট নীতি মনে করিয়া গোড়ার দিকে এই নীতির বিরোধী ছিলাম। কিন্তু দেশবন্ধুর সাম্প্রদায়িক উদার নীতির জন্য ব্যক্তিগতভাবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাহেতু এবং আমার জিলার নেতা তৈয়বুদ্দিন সাহেব দেশবন্ধুর সমর্থক হওয়ায় আমিও মোটামুটি এই নীতির সমর্থক হইলাম। তারপর মার্চ মাসেই আইন সভার নির্বাচনে তৈয়বুদ্দিন সাহেব স্বরাজ্য দলের টিকিটে নির্বাচন প্রার্থী হওয়ায় আমার পক্ষে চিন্তা-ভাবনার আর কোনও পথ রইল না। নির্বাচনে তাঁকে সাহায্য করিবার জন্য আমি কলিকাতা ত্যাগ করিলাম।

দেশে ফিরিয়াই নির্বাচন যুদ্ধে আমি মাতিয়া উঠিলাম। কারণ তৈয়বুদ্দিন সাহেবের প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ নন, স্বয়ং ধনবাড়িয়ার বিখ্যাত জমিদার নবাব সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী সাহেব। জমিদারের প্রতি আমার চিরকালের বিদ্বেষ।তার উপর ধনবাড়ির নবাব সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিশেষ কারণ ছিল। তাঁর প্রজাপীড়নের নিত্য নতুন কাহিনী আমাদের কানে আসিত। উহাদের সত্যাসত্য বিচারের আমাদের সময় ছিল না। জমিদারের যুলুমের কাহিনী বিশ্বাস করিবার জন্য আমরা উন্মুখ হইয়াই থাকিতাম। এইবার তাঁকে নির্বাচনে হারাইয়া শোধ নিবার জন্য কাজে লাগিয়া গেলাম। আমার নিজের জন্মস্থান এই নির্বাচনী এলাকায় পড়ায় আমার কাজ বাড়িয়া গেল, সহজও হইল। নবাব বাহাদুরের বাহাদুরি’ এই শিরোনামায় জীবনের সর্বপ্রথম নির্বাচনী ইশতাহার লিখিলাম। সকলেই এক বাক্যে তারিফ করিলেন। নবাব বাহাদুরের আর রক্ষা নাই।

নির্বাচনে সত্য-সত্যই নবাব বাহাদুর হারিয়া গেলেন। বিপুল বিত্তশালী সরকার সমর্থিত বড় লোকের গরিব জননেতার কাছে পরাজয় এতদঞ্চলে এই প্রথম। অতএব আমার কলমের ঐ এক খোঁচাতেই এত বড় নবাব ভুলুণ্ঠিত হইলেন, একথা আমার বন্ধু-বান্ধবসবাই বলিলেন। আমি বিশ্বাসকরিলাম।

নির্বাচনে জিতিয়াই শামসুদ্দিনের নির্দেশমত কালিকাতায় ফিরিয়া গেলাম। আইন সভার বাজেট অধিবেশন উপলক্ষে তৈয়বুদ্দিন সাহেবও গেলেন। বলা আবশ্যক আমার ভাড়াটাও তিনিই দিলেন। শামসুদ্দিন আগেই আলাপ করিয়া রাখিয়াছিলেন। এবার যাওয়া মাত্রই ‘ছোলতানে’ ত্রিশ টাকা বেতনের চাকরি হইয়া গেল। পরে এই বেতন চল্লিশ টাকায় বর্ধিত হইয়াছিল। ছোলতানে যোগ দেওয়ায় আমি দেশবন্ধুর স্বরাজ্য দলের আরও সক্রিয় সমর্থক হইতে বাধ্য হইলাম। কারণ ‘ছোলতানের’ মালিক মওলানা ইসলামাবাদী সাহেব দেশবন্ধুর অনুরক্ত ও স্বরাজ্য দলের সমর্থক ছিলেন। আমাকেও কাজেই ঐ দলের সমর্থনে লিখিতে হইত।

২. দেশবন্ধুর বেংগল প্যাক্ট

এই সময় স্বরাজ্যদলের মোট বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ জন সদস্য ছিলেন। হিন্দু মুসলিম মেম্বর প্রায় সমান-সমান। নির্বাচিত মেম্বরদের মধ্যে এরাই ছিলেন মেজরিটি। ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় সরকারী দফতরসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণগুলির বেশির ভাগই ছিল ‘রিযার্ভ’। তারা আইন সভার বিচার্য বিষয় ছিল না। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়গুলি ছিল ট্রান্সফার্ড। অর্থাৎ ওদের উপর ভোটাভুটি করা যাইত। দেশবন্ধুর দক্ষ নেতৃত্বে পার্লামেন্টারি স্ট্রাটেজি ও টেকটিকসের দ্বারা এবং অসাধারণ বাগ্মীতার বলে স্বরাজ্য দল এই সীমাবদ্ধ ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করিয়া সরকারী দলকে অনেক নাকানি-চুবানি খাওয়াইলেন।

সার আব্দুর রহিম, মৌলভী আব্দুল করিম, মৌলভী মুজিবুর রহমান, মওলানা আকরম খাঁ ও মওলানা মনিরুযযামান ইসলামাবাদী প্রভৃতি মুসলিম নেতৃবৃন্দ এবং মিঃ জে. এম. সেনগুপ্ত, মিঃ শরৎ চন্দ্র বসু, মিঃ জে, এম, দাশ গুপ্ত ও ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় প্রভৃতি হিন্দু নেতার সহযোগিতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এই সময় (১৯২৩ এপ্রিল) ঐতিহাসিক ‘বেংগল প্যাক্ট’ নামক হিন্দু-মুসলিম চুক্তিনামা রচনা করেন। তিনি স্বরাজ্য পার্টি ও বংগীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটিকে দিয়া ঐ প্যাক্ট মনযুর করাইলেন। এই প্যাটে ব্যবস্থা করা হয় যে, সরকারী চাকুরিতে মুসলমানরা জন সংখ্যানুপাতে চাকুরি পাইবে এবং যতদিন ঐ সংখ্যানুপাতে (তৎকালে শতকরা ৫৪) না পৌঁছিবে ততদিন নূতন নিয়োগের শতকরা ৮০টি মুসলমানদেরে দেওয়া হইবে। সরকারী চাকুরি ছাড়াও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে, যথা কলিকাতা কর্পোরেশন সমস্ত মিউনিসিপ্যালিটি এবং ডিস্ট্রিক্ট ও লোকাল বোর্ডসমূহে, মুসলমানরা ঐ হারে চাকুরি পাইবে। প্যাক্টের বিরোধী হিন্দু নেতারা বলিতে লাগিলেন যে, দেশবন্ধু স্বরাজ্য দলে এবং কংগ্রেস কমিটিতে প্যাক্ট পাস করাইতে পারিলেও কংগ্রেসের প্রকাশ্য সম্মিলনীতে পারিবেন না। তাই প্রাদেশিক কংগ্রেসের প্রকাশ্য সম্মিলনীতে এই প্যাক্ট গ্রহণ করাইবার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯২৪ সালের জুন মাসে সিরাজগঞ্জ এই সম্মিলনীর অধিবেশন আহবান করিলেন। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সাহেব এই প্রকাশ্য অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হইলেন। এইসব কারণে দেশবন্ধু মুসলমানদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। আমি নীতিগতভাবে কংগ্রেসের ‘নোচেঞ্জার’ দলের সমর্থক হইয়াও শুধু এই কারণে দেশবন্ধুর একজন ভক্ত অনুরক্ত।

মওলানা ইসলামাবাদী সাহেবের ‘ছোলতানে’ সাব-এডিটরি নেওয়ার পর জানিতে পারি যে, মৌঃ ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাহেবও ছোলতানের অংশীদার। মওলানা সাহেবই কলিকাতায় থাকিয়া ‘ছোলতান’ সম্পাদনা করিতেন। সিরাজী সাহেব সময় সময় কলিকাতা আসিয়া ইসলামাবাদী সাহেবের মেহমান হইতেন। উভয়েই পুরামাত্রায় স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষপাতী হইলেও সিরাজী সাহেব সিরাজগঞ্জ সম্মিলনীর ব্যাপারে কংগ্রেসের বিরুদ্ধতা করিতেছেন বলিয়া কলিকাতায় খবর আসে। সাম্প্রদায়িক হিন্দু কংগ্রেস নেতারা ঐ প্যাক্টের দরুন দেশবন্ধুর বিরোধী। সিরাজগঞ্জের আঞ্জুমনী মুসলিম-নেতারা ঐতিহ্যগতভাবেই কংগ্রেস-বিরোধী। এই দুই দল মিলিয়া সিরাজগঞ্জ কংগ্রেস সম্মিলনী ভন্ডুল করিবার চেষ্টা করিতেছেন। সিরাজী সাহেব এদের দলে যোগ দিয়াছেন। অথচ মওলানা ইসলামাবাদী সাহেব দেশবন্ধুর ও সম্মিলনীর পুরা সমর্থক। তাঁরই নির্দেশ ও উৎসাহে আমি দেশবন্ধুর বেংগল প্যাকটের সমর্থক এবং দেশবন্ধু বিরোধী কংগ্রেস নেতাদের সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার নিন্দায় অনেকগুলি সম্পাদকীয় লিখিয়াছি। শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর মত ত্যাগী আজীবন-নির্যাতিত বাগ্মী নেতার তীব্র রসনা, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত শক্তিশালী লেখকের চাঁছাল কলম, ‘অমৃত বাজার’ পত্রিকার মত বিপুল প্রচারিত দৈনিকের পৃষ্ঠা দিনরাত দেশবন্ধুর বিরুদ্ধ প্রচারণায় নিয়োজিত। তাঁদের মূলকথা এই যে, দেশবন্ধু বাংলাদেশ মুসলমানদের কাছে বেচিয়া দিয়াছেন। এদের সংঘবদ্ধ বিরুদ্ধতা ঠেলিয়া দেশবন্ধু কর্পোরেশনের সাধারণ নির্বাচনে (১৯২৪ এপ্রিল) জয়ী হইয়াছেন। নিজে মেয়র নির্বাচিত হইয়াছেন। জনপ্রিয় তরুণ মুসলিম নেতা শহীদ সুহরাওয়ার্দীকে ডিপুটি মেয়র করিয়াছেন। সুভাষ বাবুকে চীফ একযিকিউটিভ অফিসার ও হাজী আবদুর রশিদ সাহেবকে ডিপুটি একযিকিউটিভ অফিসার করিয়াছেন এবং অনেক মুসলমান গ্র্যাজুয়েট এম. এ.-কে রাতারাতি কর্পোরেশনের মোটা বেতনের দায়িত্বপূর্ণ চাকুরি দিয়াছেন। কলিকাতা কর্পোরেশনের মত হিন্দু-প্রধান প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের পক্ষে রাতারাতি অত ভাল চাকুরি পাওয়া কল্পনারও অগোচর ছিল। কাজেই সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা দেশবন্ধু আয়োজিত সিরাজগঞ্জ কনফারেন্স পন্ড করিবার চেষ্টা করিবে এটা স্বাভাবিক। আঞ্জুমনওয়ালারাও যা কিছু কংগ্রেসী সবটার অন্ধ বিরুদ্ধতা করিবে এটাও আশ্চর্য নয়। কিন্তু সিরাজী সাহেবের মত স্বাধীনতাকামী কংগ্রেস সমর্থক সংগ্রামী রাজনৈতিক নেতা একাজ করিতেছেন কেন ইহা কলিকাতাস্থ নেতৃবৃন্দের কাছে এরূপ দুর্বোধ্য ছিল।

৩. সিরাজগঞ্জ কনফারেন্স

তাই দেশবন্ধু ও মওলানা আকরম খাঁর কথামত মওলানা ইসলামাবাদী সাহেব আমাকে সিরাজী সাহেবের নিকট পাঠান। কংগ্রেস সম্মিলনীর এক সপ্তাহ আগে এঁদের-দেওয়া রাহা খরচ লইয়া আমি সিরাজগঞ্জ গেলাম। বেংগল প্যাকটের মুদ্রিত শর্তাবলী, দেশবন্ধুর বিভিন্ন বক্তৃতার অসংখ্য কপি, প্যাকটের সমর্থনে আমি ‘ছোলতানে’ যে সব সংখ্যায় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম সেই সব সংখ্যার যত কপি পাওয়া

গেল তার সব এবং ‘ছোলতানের’ সর্বশেষ সংখ্যার হাজার খানি কপির এক বিরাট বস্তা সংগে নিলাম। গিয়া উঠিলাম সিরাজী সাহেবের বাড়ি বাণীকুঞ্জে। সিরাজী সাহেব গরিব হইলেও মেহমানদারিতে তাঁর মোজ-মর্যি ছিল একদম বাদশাহী। তাছাড়া আমাকে খুবই স্নেহ করিতেন। আমাকে তিনি সাদরে অভ্যর্থনা করিলেন এবং থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করিলেন। কিন্তু চা-নাশতা খাওয়ার সময়েই বুঝিয়া ফেলিলাম, ‘ছোলতানের’ সাম্প্রতিক লেখাসমূহের জন্য তিনি আমার উপর বেশ খাপ্পা হইয়াছেন। গত দুই-তিন মাস তিনি কলিকাতা যান নাই। কাজেই তাঁর সর্বশেষ রাজনৈতিক মতামত আমার জানা ছিল না। কথাবার্তায় বুঝিলাম, তিনি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অনেক দূর আগাই গিয়াছেন। স্থানীয় ‘নোচেঞ্জার’ কংগ্রেসী ও আঞ্জুমনী নেতাদের সহায়তায় তিনি প্রকাশ্যভাবে অনেক কাজ করিয়া ফেলিয়াছেন।

স্বভাবতঃই আমি খুব সাবধানে কথা বলিতে শুরু করিলাম। মেহমানদারিতে সিরাজী সাহেব পয়গম্বর সাহেবের অনুসরণ করিতেন। আমাকে ছাড়া তিনি খানা-পিনা ও নাশতা-পানি কিছুই খাইতেন না। তিনি অনেক সকালে উঠিলেও নাশতা খাইতে আমার জন্য অপেক্ষা করিতেন। সকালে নাশতা খাইয়া আমি শহরে বাহির হইতাম। ফিরিয়া আসিয়া দেখিতাম, তিনি আমার জন্য ক্ষুধার্ত মুখে অপেক্ষা করিতেছেন। তিনি হাসি-মুখে বলিতেন আমারে উপাস রাইখা আমি খাঁটি সৈয়দ কিনা তাই পরীক্ষা করতেছ বুঝি?

বড় বেশি অন্যায় হইয়া গিয়াছে বলিয়া তাঁর কাছে মাফ চাহিলাম। আমার মাফ চাওয়া অগ্রাহ্য করিয়া তিনি বলিলেন : আমি সৈয়দ কিনা শুধুমাত্র আমারে উপাস রাইখা তার পরীক্ষা হবে না। সৈয়দের হাত আগুনে পুড়ে না। পরীক্ষা করতে চাও আমি চুলা থনে জ্বলন্ত আংগার আইনা দিতেছি। তাই তুমি আমার হাতের তালুতে রাখ। যদি আমার হাতের তালুতে একটা ফোঁসকাও পড়ে তবে বুঝবা আমি সৈয়দের বাচ্চা নই। আমার দাবি ঝুটা।

এই কথাটা সিরাজী সাহেব আমাকে কতদিন বলিয়াছেন তার হিসাব নাই। আমাকে ছাড়া আরও অনেকের নিকট বলিয়াছেন শুনিয়াছি। তাঁরা কেউ এই ভাবে সিরাজী সাহেবের সৈয়দি পরীক্ষা করিয়াছেন কি না জানি না। কিন্তু আমি করি নাই। আমি অন্যান্য বার হাসিয়া চুপ করিতাম। কিন্তু এবার যে কঠোর দায়িত্বের মিশন লইয়া আসিয়াছি তাতে চুপ থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বলিলাম? পরীক্ষায় আমার দরকার নাই। আপনার চেহারাই সাক্ষী দেয় আপনি খাঁটি সৈয়দ।

সিরাজী সাহেব তোষামোদকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করিতেন। তোষামোদীদিগকে দস্তুরমত ঘৃণা করিতেন। কিন্তু খোদাকে ধন্যবাদ। আমার এই কথাটাকে তিনি তোষামোদ মনে করিলেন না।

এই ভাবে সিরাজী সাহেবের মন জয় করিয়া অবশেষে এক সময়ে কায়দা বুঝিয়া আমার কথাটা পাড়িলাম। কংগ্রেস সমর্থন-অসমর্থনের ঊর্ধ্বে বেংগল প্যাক্টটাকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের আক্রমণ হইতে বাঁচানো যে সকল দল ও সকল মতের মুসলমানের কর্তব্য এই দিক হইতে আমি কথা চালাইলাম। মনে করিলাম সিরাজী সাহেবের কাছে এইটাই হইবে নির্ঘাত অমোঘ অব্যর্থ যুক্তি। কিন্তু আল্লাহ। সিরাজী সাহেব যা বলিলেন তার অর্থ এই যে, দুইদিন বাদে যখন ভারতবর্ষে মুসলিম রাজ্যই কায়েম হইয়া যাইতেছে, তখন ঐ ধরনের প্যাকটে মুসলমানদের কোনও লাভ ত নাই-ই বরঞ্চ লোকসান আছে। তিনি খুব আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে বলিলেন। তিনি খাবে দেখিয়াছেন আগামী ছয় মাসের মধ্যে কাবুলের আমির ভারতবর্ষ দখল করিতেছেন। তিনি আবার স্মরণ করাইয়া দিলেন সৈয়দের স্বপ্ন মিথ্যা হইতে পারে না।

এই দিককার চেষ্টা আপাততঃ ত্যাগ করিয়া দেশবন্ধুর ব্যক্তিগত কথা তুলিলাম। হিন্দু সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা যেভাবে চারদিকে হইতে দেশবন্ধুকে আক্রমণ করিতেছে তাতে তাঁকে রক্ষা করা মুসলমানদেরই কর্তব্য। কারণ মুসলমানদের জন্যই তিনি এই ভাবে অভিমন্যু সাজিয়াছেন। এই কথায় সিরাজী সাহেবকে খানিকটা নরম মনে হইল। কিন্তু যা বলিলেন তাতে নিরাশ হইলাম। তিনি বলিলেন : দাশ সাহেব (তিনি কিছুতেই দেশবন্ধু বলিলেন না) তাঁর সাথে ওয়াদা খেলাফ করিয়াছেন। তাঁরই পরামর্শ মতে কাবুলে কংগ্রেসের শাখা খুলিতে দাশ সাহেব রাযী হইয়াছিলেন। কিন্তু লালা লাজপত রায়ের ধমকে সেই পরিকল্পনা ত্যাগ করিয়া দাশ সাহেব সিরাজী সাহেবের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছেন। এর পর দাশ সাহেবের উপর সিরাজী সাহেবের কোনও আস্থা থাকিতে পারে না।

আমার মনে পড়িল কিছুদিন আগে লালা লাজপত রায় কংগ্রেসের সহিত সমস্ত সম্পর্কচ্ছেদ করিয়া খবরের কাগযে এক বিবৃতি দিয়াছিলেন। তাতে লালাজী বলিয়াছেন যে, কংগ্রেস কাবুলের আমিরের দ্বারা ভারতবর্ষ দখল করাইয়া ভারতে মুসিলম রাজত্ব কায়েম করিবার ষড়যন্ত্র করিয়াছে। সিরাজী সাহেবের এই অভিযোগের মধ্যে আমি অকুলে কুল পাইলাম। আমি সিরাজী সাহেবকে বুঝাইলাম যে কাবুলে কংগ্রেস স্থাপন করায় বিলম্ব হইয়াছে বটে কিন্তু সে পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয় নাই। যদি হইত তবে লালা লাজপত রায় কংগ্রেস বর্জন করিতেন না। বরঞ্চ লালাজীর কংগ্রেস ত্যাগে এটাই প্রমাণিত হয় যে কংগ্রেস স্বমতে দৃঢ় আছে, দেশবন্ধুর প্রভাবেই এটা সম্ভব হইয়াছে। সুতরাং তিনি সিরাজী সাহেবের কাছে-দেওয়া ওয়াদা খেলাফ করেন নাই। তবু যদি সিরাজী সাহেবের সন্দেহ হইয়া থাকে, তবে কলিকাতা গিয়া অথবা অন্ততঃ দেশবন্ধুর সিরাজগঞ্জ আগমনের সময় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করিয়া ব্যাপারটা পরিষ্কার করা উচিৎ। তার আগে সম্মিলনীতে বাধা দেওয়া সিরাজী সাহেবের তাল দেখায় না। যে সিরাজী সাহেবের পরামর্শ গ্রহণ করিতে গিয়া দেশবন্ধু সাম্প্রদায়িকতাবাদী হিন্দু নেতাদের চক্ষুশূল হইয়াছেন তাঁকে এ ভাবে পরাজিত হইতে দিতে সিরাজী সাহেব পারেন না। আমার এই যুক্তি সিরাজী সাহেবের অন্তরে দাগ কাটিল।

সিরাজগঞ্জ সম্মিলনে দেশবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করিতে তিনি সম্মত হইলেন। ইতিমধ্যে সলিনের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকিতেও রাযী হইলেন। উহাতে আমি সন্তুষ্ট হইলাম। কারণ আমি জানিতে পারিয়াছিলাম সিরাজী সাহেবের প্রকাশ্য ও সক্রিয় সহযোগিতা না পাইলে সাম্প্রদায়িক হিন্দুরাও আজুমনী মুসলমানরা কিছুই করিতে পারিবেন না। আমি এই মর্মে মওলানা ইসলামাবাদী সাহেবকে পত্ৰ দিলাম। তিনি সন্তুষ্ট হইয়া জবাব দিলেন এবং চার দিকে ন্যর রাখিবার জন্য আমাকে সম্মিলনী পর্যন্ত সিরাজগঞ্জে থাকিতে উপদেশ দিলেন।

শুধু আমার কথাতেই সিরাজী সাহেব মত পরিবর্তন করিয়াছেন এমন দাবি আমি করি না। কারণ ইতিমধ্যে বহু বড় বড় কংগ্রেস নেতা সিরাজী সাহেবের সহিত দেখা করেন। অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান পাবনার জমিদার বিখ্যাত ব্যারিস্টার ও সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী ও করটিয়ার জমিদার জনাব ওয়াজেদ আলী খানপন্নী (চান মিয়া সাহেব) সিরাজী সাহেবের সহিত যোগাযোগ করিয়াছিলেন।

একদিন আগে হইতে দলে দলে ডেলিগেটরা আসিতে শুরু করিলেন। চান মিয়া সাহেব একদিন আগে হইতেই সিরাজগঞ্জে আসিয়া অভ্যর্থনা কমিটির আয়োজনের তদারক শুরু করিলেন। সিরাজী সাহেব নিরপেক্ষ হইয়া যাওয়ায় সম্মিলন-বিরোধী চক্রান্ত হাওয়ায় মিলাইয়া গেল।

নির্দিষ্ট দিনে বিপুল-উৎসাহ উদ্যমের মধ্যে বিরাট সাফল্যের সংগে সম্মিলনের অধিবেশন হইল। ডেলিগেটের সংখ্যাই ছিল পনর হাজারের মত। দর্শকের সংখ্যা ছিল তার অনেক গুণ। এত বড় জন-সমাবেশে অভ্যর্থনা সমিতির চেয়ারম্যানের ভাষণ, দেশবন্ধুর প্রাণস্পর্শী বক্তৃতা, মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের সুলিখিত পাণ্ডিত্যপূর্ণ অভিভাষণ ও অন্যান্য বক্তাদের বক্তৃতায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বাণী এমন সজীবতা লাভ করিয়াছিল যে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে দেশবন্ধুর বেংগল প্যাক্ট গৃহীত হইয়া গেল।

দেশবন্ধুর অত সাধের বেংগল প্যাক্ট আজ ভাংগিয়া গিয়াছে। হিন্দু ও মুসলমান দুই জাতি হইয়াছে। দেশ আজ ভাগ হইয়াছে। দুই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। দেশবন্ধুর প্রাণপ্রিয় পরাধীন দেশবাসী আজ স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক হইয়াছে। সিরাজগঞ্জের বগল বাহিয়া যমুনা নদীর অনেক পানি গড়াইয়া গিয়াছে। কিন্তু দেশবন্ধুর সেদিনকার মর্মস্পর্শী উদাত্ত আবাহন আমার কানে, এবং বোধ হয় আমার মত অনেক বাংগালীর কানে, আজো রনিয়া-রবিয়া ধ্বনিয়া উঠিতেছে : “হিন্দুরা যদি উদারতার দ্বারা মুসলমানের মনে আস্থা সৃষ্টি করিতে না পারে, তবে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য আসিবে না। হিন্দু-মুসলিম-ঐক্য ব্যতীত আমাদের স্বরাজের দাবি চিরকাল কল্পনার বস্তুই থাকিয়া যাইবে।” দেশবন্ধুর কল্পিত হিন্দু-মুসলিম-ঐক্যের বাস্তব রূপ সম্পর্কে তিনি তাঁর সিরাজগঞ্জ-বক্তৃতায় বলিয়াছিলেন : ‘হিন্দু ও মুসলমান তাদের সাম্প্রদায়িক স্বতন্ত্র সত্তা বিলোপ করিয়া একই সম্প্রদায়ে পরিণত হউক, আমার হিন্দু-মুসলিম-ঐক্যের রূপ তা নয়। ওরূপ সত্তা বিসর্জন করনাতীত।” এই বাস্তব বুদ্ধির অভাবেই আজ দেশ ভাগ হইয়াছে। ইহারই অভাবে দেশভাগ হইয়াও শান্তি আসে নাই।

০৪. প্রজা-সমিতি প্রতিষ্ঠা

প্রজা-সমিতি প্রতিষ্ঠা
চৌথা অধ্যায়

১. সাম্প্রদায়িক তিক্ততা বৃদ্ধি

১৯২৫ সালের ১৬ই জুন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ নিতান্ত আককিভাবে পরলোক গমন করেন। বাংলার কপালে দুর্ভাগ্যের দিন শুরু হয়। ঐ সালের শেষ দিকে মুসলিম লীগের আলীগড় বৈঠকের সভাপতিরূপে সার আবদুর রহিম হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের নিন্দা করিয়া ভাষণ দেন। তাতে হিন্দু নেতাদের অনেকে এবং হিন্দু সংবাদ-পত্ৰসমূহ সাধারণভাবে সার আবদুর রহিমের উপর খুব চটিয়া যান। হিন্দুদের এই আবদুর রহিম-বিদ্বেষ এতদূর তীব্র হইয়া উঠে যে ১৯২৬ সালের গোড়ার দিকে লাট সাহেব যখন সার আবদুর রহিমকে মন্ত্রী নিয়োগ করেন, তখন কোন হিন্দু নেতাই সার আবদুর রহিমের সহিত মন্ত্রিত্ব করিতে রাজী হন না। ফলে সার আবদুর রহিম পদত্যাগ করিতে বাধ্য হন। সার আবদুর রহিমের স্থলে সার আবদুল করিম গয়নবীর সাথে মন্ত্রিত্ব করিতে হিন্দু-নেতারা রাজী হন। তাতে সার আবদুল করিম গয়নবী ও ব্যারিস্টার ব্যোমকেশ চক্রবর্তী মন্ত্রী নিযুক্ত হন। এই ঘটনায় সাম্প্রদায়িক তিক্ততা বাড়িয়া যায়। মুসলমানরা এই মন্ত্রিদ্বয়কে ‘গজচক্র’ মন্ত্রিত্ব বলিয়া অভিহিত করে। আমি এই সময় জনাব মৌলবী মুজিবুর রহমান সাহেবের সম্পাদিত ‘দি মুসলমানের’ সহকারী সম্পাদকতার কাজ করি। আমাদের কাগ-সহ সব কয়টি মুসলমান সাপ্তাহিক (মুসলমান-পরিচালিত কোনও দৈনিক তখন ছিল না) এক-যোগে ‘গজচক্র’-মন্ত্রিত্বের বিরুদ্ধে কলম চালাই। মুসলমান ছাত্ররা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে। অল্প দিনেই গজচক্র মন্ত্রিদ্বয় পদত্যাগ করিতে বাধ্য হন। সার আবদুল করিম গযনবী মন্ত্রিত্ব হারাইয়া মসজিদের সামনে বাজনার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এই সময় রাজরাজেশ্বরী মিছিলের বাজনা লইয়া কলিকাতায় তৎকালের বৃহত্তম সাম্প্রদায়িক দাংগা হয়। উভয় পক্ষে এগার শত লোক হতাহত হয়। মসজিদের সামনে বাজনার দাবিতে বরিশালের জনপ্রিয় হিন্দু নেতা শ্রীযুক্ত সতীন সেন প্রসেশন করিতে যান। কুলকাঠি থানার পোনাবালিয়া গ্রামে পুলিশ-মুসলমানে সংঘর্ষ হয়। জিলা ম্যাজিস্ট্রেট ব্ল্যাণ্ডির নির্দেশে মুসলমানের উপর গুলি করা হয়। অনেক লোক হতাহত হয়। এতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে।

এই তিক্ত আবহাওয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য চেষ্টা করিতেছিল একমাত্র জিন্না-নেতৃত্বের মুসলিম লীগই। এটা কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান কাজ হওয়া সত্ত্বেও এ ব্যাপারে কার্যতঃ কংগ্রেস সম্পূর্ণ নিরুপায় হইয়া পড়িয়াছিল। মুসলিম সমাজে কংগ্রেসের প্রভাব কমিয়া গিয়াছিল অথচ শুধু হিন্দুদের পক্ষে কথা বলায়ও তাঁদের আপত্তি ছিল। ফলে তাঁদের হিন্দু-মুসলিম-ঐক্যর কথা কার্যতঃ অর্থহীন দার্শনিক আপ্তবাক্যে পর্যবসিত হইয়াছিল। সে অবস্থায় জিন্না-নেতৃত্বে মুসলিম লীগই হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রশ্নে বাস্তববাদী ছিল। রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ায় বৃটিশ সরকারের মোকাবেলায়ও মুসলিম লীগই ছিল কংগ্রেসের নিকটতম সহপথিক। ভারতবাসীর স্বায়ত্তশাসন-দাবির কার্যকারিতা পরখের জন্য ‘অল্ হোয়াইট’ সাইমন কমিশন পাঠাইবার কথাও বিলাতি পার্লামেন্টে এই সময় উঠিয়াছিল। সাম্প্রদায়িক তিক্ততার সুযোগে ইংরাজের খায়েরবাহ নাইট-নবাবরা জিন্না সাহেবকে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব হইতে অপসারণ করার জন্য কোমর বাঁধিয়া লাগিয়া যান। পাঞ্জাবের সার মিয়া মোহাম্মদ শফী এই জিন্না-বিরোধী ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বাংলার সার আবদুর রহিম বাদে আর সব নাইট-নবাবরা তাতে যোগ দেন। এই পরিবেশে ১৯২৭ সালে কলিকাতা টাউন হলে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন হয়। বরাবর কংগ্রেস ও লীগের বৈঠক একই সময়ে একই শহরে প্রায় একই প্যান্ডেলের নিচে হইত। ১৯১৬ সালের লাখনৌ প্যাকটের সময় হইতেই এই নিয়ম চলিয়া আসিতেছিল। তবু সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ও নাইট-নবাবদের ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় সাবধানতা হিসাবেই ১৯২৭ সালের মুসলিম লীগের বৈঠক ঐ সালের কংগ্রেস বৈঠকের সাথে মাদ্রাজে না করিয়া কলিকাতায় করা হয়। জিন্না সাহেবের অন্তরংগ বন্ধু ডাঃ আনসারী মাদ্রাজ কংগ্রেসের সভাপতি। তবু মিঃ জিন্ন মুসলিম লীগকে কংগ্রেসের সংস্পর্শ হইতে দূরে রাখিলেন। জিন্না-বিরোধী নাইট-নবাবরা লাহোরে এক প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম লীগ সম্মিলনীর আয়োজন করিলেন। সার মোহাম্মদ শফী তাতে সভাপতিত্ব করিলেন। বাংলার দু-চার জন নবাব-নাইট জনমত অগ্রাহ্য করিয়া একরূপ গোপনে লাহোর সম্মিলনীতে অংশ গ্রহণ করিলেন।

কলিকাতা টাউন হলে মুসলিম লীগ সম্মিলনী খুব ধুমধামের সাথে অনুষ্ঠিত হইল। আমার নেতা ও মনিব মৌলবী মুজিবুর রহমান অভ্যর্থনা সমিতির চেয়ারম্যান। ডাঃ আর. আহমদ সেক্রেটারি। চেয়ারম্যানের ইচ্ছা অনুসার্কে আমাকে অভ্যর্থনা সমিতির অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি করা হইল। আমি জীবনের প্রথম এই নিখিল ভারতীয় কনফারেন্সের কাজ ঘনিষ্ঠভাবে দেখিবার সুযোগ পাইলাম। মৌঃ মোহাম্মদ ইয়াকুব (পরে সার) এই সম্মিলনীতে সভাপতিত্ব করেন। সস্ত্রীক জিনা সাহেব এই সম্মিলনীতে যোগ দেন। আমি মিসেস রতন বাই জিন্নাকে অত কাছে হইতে এই প্রথম ও শেষবারের মত দেখিতে পাই।

মিঃ জিন্না ও মওলানা মোহাম্মদ আলীর ব্যক্তিগত বিরোধের সুযোগ লইয়া নাইট-নবাবরা অতঃপর মুসলিম লীগ কাউন্সিলে জিন্না সাহেবের উপর অনাস্থা দিবার চেষ্টা করেন। দিল্লীতে লীগ কাউন্সিলের সভা। মৌলবী মুজিবুর রহমান ও মওলানা আকরম খাঁর নেতৃত্বে বাংলার কাউন্সিলারগণ দলবদ্ধভাবে দিল্লী গেলাম জিন্না নেতৃত্বকে নাইট-নারবদের হামলা হইতে বাঁচাইতে। বাংলার প্রতিনিধিরা আমরা কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট ডাঃ আনসারীর মেহমান হই। ডাঃ আনসারীর যমুনা পারস্থ দরিয়াগঞ্জের সুবৃহৎ প্রাসাদতুল্য বাড়ি গোটাটাই আমাদের জন্য ছাড়িয়া দেওয়া হয়। আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থাও ডাঃ সাহেবই করেন।

জিন্না-বিরোধী উপদলও খুব ভোড়জোড় করে। দিল্লীর বিল্লিমারন রোডে এক বিশাল ভবনে কাউন্সিলের সভা রু হয়। কিন্তু ডাঃ আনসারীর উদ্যোগে নেতৃবৃন্দের চেষ্টায় কাউন্সিল বৈঠকের আগেই জিন্না সাহেব ও মওলানা মোহাম্মদ আলীর মধ্যকার বিরোধ মিটিয়া যায়। কাউন্সিল বৈঠকের শুরুতে উভয় নেতার মধ্যে কোলাকুলি হয়। আমরা হর্ষধ্বনি ও করতালি দিয়া তাঁদেরে অভিনন্দন জানাই। জিন্না বিরোধীরা একদম চুপ মারিয়া যান। শান্তিপূর্ণভাবে কাউন্সিলের কাজ শেষ হয়। কাউন্সিল জিন্না-নেতৃত্বে আস্থা পুনরাবৃত্তি করিয়া এবং সাম্প্রদায়িক ঐক্যের ভিত্তিস্বরূপ মুসলিম দাবি-দাওয়া সম্বন্ধে এবং ‘অলহোয়াইট কমিশন’ সম্পর্কে জিন্না সাহেবকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়া প্রস্তাব পাস করতঃ সভার কাজ সমাপ্ত হয়।

তিনদিন সম্মিলনীর কাজ করিবার জন্য এবং জিন্না-বিরোধীদের একহাত দেখাইবার জন্য আমরা যারা প্রস্তুত হইয়া আসিয়াছিলাম, একদিনে সভার কাজ শেষ হওয়ায় তারা বেকার হইলাম। আর কি করা যায়? জনাব মুজিবুর রহমানের খরচে ও নেতৃত্বে দিল্লী-আগ্রার দর্শনীয় জায়গা ও বস্তুসমূহ দেখিয়া জীবনের সাধ মিটাইলাম। অতঃপর আগ্রার বিশ্ববিখ্যাত সূরাহি প্রত্যেকে আধ ডজন করিয়া কিনিয়া কলিকাতা ফিরিলাম। পথে আসিতে আসিতে সূরাহির সংখ্যা অর্ধেক হইয়া গেল। তাতেও দামের দিক দিয়া আমাদের যথেষ্ট মুনাফা থাকিল।

২. কংগ্রেসের ব্যর্থতা

পরের বছর (১৯২৮) ডিসেম্বর মাসে কলিকাতায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন। ১৯২৭ সালের কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট ডাঃ আনসারীর উদ্যোগে স্বায়ত্ত শাসিত ভারতের শাসনতান্ত্রিক বিধানের সুপারিশ করার উদ্দেশ্যে পণ্ডিত মতিলালের নেতৃত্বে নেহরু কমিটি গঠিত হইয়াছিল। এই কমিটি যে রিপোর্ট দিয়াছিল তাতে হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধানের জন্য নয়া ফরমুলা দেওয়া হইয়াছিল। এ রিপোর্টের রচয়িতা পণ্ডিত মতিলাল নেহরু স্বয়ং কলিকাতা কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট। পক্ষান্তরে জিন্না সাহেবের পরম ভক্ত উদর মতাবলম্বী মাহমুদাবাদের রাজা সাহেব (বর্তমান রাজা সাহেবের পিতা) মুসলিম লীগ সেশনের সভাপতি। কাজেই সকলেই আশা করিতেছিল এবার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমঝোতায় হিন্দু-মুসলিম-সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবে। সাইমন কমিশনের গঠন সম্পর্কে বৃটিশ সরকারের অনমনীয় মনোভাবও উভয় প্রতিষ্ঠানের সমঝোতার রাস্তা পরিষ্কার করিয়া দিয়াছিল।

বাংলায় এই দুই প্রতিষ্ঠানের অধিবেশন হইতেছে। সুতরাং বাংলার হিন্দু-মুসলিম নেতৃবৃন্দের এদিককার দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। অতএব কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অধিবেশনের তারিখের বেশ কিছুদিন আগে ‘দি মুসলমান’ অফিসে বাংলার হিন্দু মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক আলোচনা সভা হয়। হিন্দু পক্ষ হইতে মিঃ জে, এম, সেনগুপ্ত, মিঃ শরৎচন্দ্র বসু, ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, মিঃ জে, এম, দাশগুপ্ত, মিঃ জে, সি, গুপ্ত, ডাঃ ললিত চন্দ্র দাস, মিঃ নলিনী রঞ্জন সরকার ও আরও দু-একজন উপস্থিত হন। মুসলিম পক্ষে সার আবদুর রহিম, মৌঃ ফযলুল হক, মওলানা আযাদ, মৌঃ আবদুল করিম, মৌঃ আবুল কাসেম, মৌলবী মুজিবুর রহমান, মওলানা আকরম খাঁ, মওলানা ইসলামাবাদী এবং আরও কয়েকজন এই আলোচনায় শরিক হন। নেতাদের ফুট-ফরমায়েশ করিবার জন্য মৌঃ মুজিবুর রহমানের কথামত আমিও এই সভায় উপস্থিত থাকিবার অনুমতি পাই। দেশবন্ধুর বেংগল প্যাক্ট তখনও : কাগমে-কলমে বাঁচিয়া আছে। কাজেই আলোচনা প্রধানতঃ এই প্যাকটের উপরেই চলিল। হিন্দু-মুসলিম-বিরোধ মীমাংসার সব আলোচনার ভাগ্যে যা হইয়াছে, এই আলোচনা বৈঠকের বরাতেরও অবিকল তাই হইল। কিন্তু এ বৈঠকে আমি স্যার আবদুর রহিমের মুখে যে মূল্যবান একটি কথা শুনিয়াছিলাম প্রধানতঃ সেইটি লিপিবদ্ধ করিবার জন্যই এই ঘটনার অবতারণা করিয়াছি। মুসলমানদের দাবি-দাওয়া সম্পর্কে নেতাদের বিভিন্ন যুক্তির উত্তরে ডাঃ বিধান রায় তাঁর স্বাভাবিক কাট-খোট্টা ভাষায় বলিলেন : তা হলে মুসলমানদের কথা এই স্বাধীনতা সংগ্রামে যাব না, কিন্তু চাকরিতে অংশ দাও। পাল্টা জবাবে উস্তাদ সার আবদুর রহিম সংগে-সংগে উত্তর দিলেন? তা হলে হিন্দুদের কথা এই : চাকরিতে অংশ দিব না, কিন্তু স্বাধীনতা সগ্রামে আস। সবাই হাসিয়া উঠিলেন। অতঃপর সার আবদুর রহিম সিরিয়াস হইয়া বলিলেন : ‘লুক হিয়ার ডাঃ রায়। ইউ ফরগেট দ্যাট ইউ হিন্দুয় হ্যাভ গট অনলি ওয়ান এনিমি দি বৃটিশার্স টু ফাঁইট, হোয়ারআয় উই মুসলিমস হ্যাভ গট টু ফাঁইট থ্রি এনিমিয় : দি বৃটিশার্স অনদি ফ্রন্ট, দি হিন্দু অনদি রাইট এন্ড দি মোল্লায অনদি লেফট।’ কথাটা আমি জীবনে ভুলিতে পারি নাই।

বরাবরের মতই এবারও হিন্দু-মুসলিম-সমস্যার সমাধান-চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিরোধ আরও বাড়িয়া যায়। ১৯২৮ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের প্রশ্নে দল নির্বিশেষে সব হিন্দু মেম্বররা জমিদার পক্ষে এবং দল-নির্বিশেষে সব মুসলিম মেম্বাররা প্রজার পক্ষে ভোট দেন। আইনসভা স্পষ্টতঃ সাম্প্রদায়িক ভাগে বিভক্ত হয়। পর বৎসর সুভাষ বাবুর নেতৃত্বে কৃষ্ণনগর কংগ্রেস সম্মিলনীতে দেশবন্ধুর বেংগল প্যাকেট বাতিল করা হয়। কি মুসলমানের স্বার্থের দিক দিয়া, কি প্রজার স্বার্থের দিক দিয়া, কোন দিক দিয়াই কংগ্রেসের উপর নির্ভর করিয়া চলা আর সম্ভব থাকিল না।

৩. প্রজা-সমিতির জন্ম

আমরা মুসলমান কংগ্রেসীরা মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের নেতৃত্বে কংগ্রেস বর্জন করিয়া নিখিল-বংগ প্রজা সমিতি গঠন করি (১৯২৯)। সার আবদুর রহিম এই সমিতির সভাপতি ও মওলানা আকরম খাঁ ইহার সেক্রেটারি হন। মৌঃ মুজিবুর রহমান, মৌঃ আবদুল করিম, মৌঃ ফযলুল হক, ডাঃ আবদুল্ল সুহরাওয়ার্দী, খান বাহাদুর আবদুল মোমিন সি. আই. ই. ইহার ভাইস প্রেসিডেন্ট, মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ ও মৌঃ তমিয়ুদ্দিন খাঁ জয়েন্ট সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। এইভাবে রাজনৈতিক মত-ও দল-নির্বিশেষ বাংলার সমস্ত হিন্দু নেতা জমিদারের পক্ষে কংগ্রেসে এবং সমস্ত মুসলিম নেতা প্রজার পক্ষে প্রজা-সমিতিতে সংঘবদ্ধ হইলেন। এই পরিস্থিতি লক্ষ্য করিয়া দেশপ্রিয় জে, এম. সেনগুপ্ত একদিন আফসোস করিয়াছিলেন : “আজ হইতে কংগ্রেস শুধু মুসলিম-বাংলার আস্থাই হারাইল না, প্রজাসাধারণের আস্থাও হারাইল।” মিঃ সেনগুপ্তের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে-অক্ষরেকলিয়া গিয়াছিল।

এই সময় আমি ওকালতি পাস করিয়া ‘দি মুসলমানের’ কাজ ছাড়িয়া ময়মনসিংহ জিলা কোটে প্র্যাকটিস শুরু করি। সংগে-সংগে নিখিল বংগ প্ৰজা সমিতির ময়মনসিংহ শাখা গঠন করিবার কাজে হাত দেই। অল্পদিন মধ্যেই এ কাজে আশাতিরিক্ত সাফল্য লাভ করি। এ কাজে ময়মনসিংহ বারের মোখতার মৌঃ আবদুল হাকিম ও শ্রীযুক্ত প্রমথ চন্দ্র বসু, কতোয়ালী থানার মওলানা আলতাফ হোসেন, কাতলাসেনের মৌলবী আবদুল করিম খাঁ, উকিল মৌঃ মোহাম্মদ কলম আলী, ত্রিশাল থানার মৌঃ ওয়ায়েযুদ্দিন, ঈশ্বরগঞ্জের মৌঃ আবদুল ওয়াহেদ বোকাই নগরী, ফুলপুরের মৌঃ মুজিবুর রহমান খী ফুলপুরী ও মওলানা আবদুর রহমান, নান্দাইল থানার মওলানা বোরহান উদ্দীন কামালপুরী ও মৌঃ আবদুর রশিদ খা, জামালপুরের মৌঃ তৈয়ব আলী উকিল ও মৌঃ গিয়াসুদ্দিন আহমদ, টাংগাইলের উকিল মৌঃ খোন্দকার আবদুস সামাদ, মোখর মৌঃ খোদা বখশ ও মৌঃ নিযামুদ্দিন আহমদ, নেত্রকোনার উকিল মৌঃ আবদুর রহিম ও মৌঃ আবদুস সামাদ তালুকদার, কিশোরগঞ্জের মৌঃ আফতাবুদ্দিন আহমদ, মৌঃ মোহাম্মদ ইসরাইল উকিল ও মৌঃ আবু আহমদের সহায়তার কথা আমি জীবনে ভুলিতে পারিব না। তাঁদের নিঃস্বার্থ কঠোর পরিশ্রমে অল্পকাল মধ্যেই ময়মনসিংহ প্রজা-সমিতি একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। প্রজা আন্দোলন সংঘবদ্ধ আন্দোলনের আকারে মাথা চাড়া দিয়া উঠে। পরবর্তীকালে অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মৌঃ আবদুল মজিদ ও ধনবাড়ির জমিদার নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলী প্রজা আন্দোলনে যোগ দেন। তাতে ময়মনসিংহ প্রজা সমিতির শক্তি ও মর্যাদা বাড়িয়া যায়। এই দুই জনের অর্থ সাহায্যে প্রজা-সমিতির নিজস্ব ছাপাখানা কিনিয়া ‘চাষী’ নামে প্রজা আন্দোলনের সাপ্তাহিক মুখপত্র বাহির করি।

সাহিত্যিক হিসাবে জিলার সরকারী-বেসরকারী উভয় মহলে আমার একটা বিশেষ স্নেহ-প্রীতির স্থান ছিল। কাজেই আমি ময়মনসিংহে ওকালতি শুরু করার সাথে-সাথেই সকল দলের মুসলমান নেতারা আমাকে আপন করিয়া লইলেন। শহরের যাঁরা মুরুৰি তাঁদের সকলের কাছেই আমি পরিচিত। বছর পনর আগে স্কুলের ছাত্র হিসাবে সভা-সমিতিতে বক্তৃতা করিয়া এবং প্রবন্ধ পাঠ করিয়া সুনাম অর্জন ও মুরুব্বিদের স্নেহ-ভালবাসা লাভ করিয়াছিলাম। এরাই সকলে মিলিয়া আমাকে এমন এক সম্মানের স্থানে বসাইলেন যেখানে বসিবার আমার কোন যোগ্যতা ছিল না, অভিজ্ঞতা ও বয়সের দিকে হইতেও না, মতবাদের দিক হইতেও না। এই পদটি ছিল আঞ্জুমনে-ইসলামিয়ার সহকারী সভাপতির পদ। করটিয়ার স্বনামধন্য জমিদার ওয়াজেদ আলী খানপন্নী (চান মিয়া সাহেব) আঞ্জুমনের সভাপতি। কিন্তু তিনি থাকেন কলিকাতা। কোনদিন আঞ্জুমনের সভায় আসেন না। দুইজন সহসভাপতি : একজন সার এ. কে. গযনবী; আরেক জন জিলার সর্বজনমান্য প্রবীণ নেতা খান বাহাদুর ইসমাইল। আমি যখন ময়মনসিংহ বারে যোগ দেই সেই বছরই সার এ, কে, গযনবী বাংলার লাটের একযিকিউটিভ কাউন্সিলার নিযুক্ত হন। নিয়মানুসারে তিনি আঞ্জুমনের সহ সভাপতিত্বে ইস্তাফা দেন। তাঁরই স্থলে আমাকে সর্বসম্মতিক্রমে সহসভাপতি নির্বাচন করা হয়–আমার ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও। আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা-তুল্য শ্রদ্ধেয় মৌঃ শাহাবুদ্দিন আহমদ আঞ্জুমনের সেক্রেটারি। আঞ্জুমনের অপর ভাইস প্রেসিডেন্ট খান বাহাদুর ইসমাইল সাহেব পাবলিক প্রসিকিউটর ও জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান আঞ্জুমনের সভায় উপস্থিত হওয়ারও আলোচনায় যোগ দেওয়ার সময় তাঁর খুবই কম। কাজেই আমাকেই কার্যতঃ আঞ্জুমনের প্রেসিডেন্টের কাজ করিতে হইত। আমার বয়সে অনেক বড় ও ওকালতিতে অনেক সিনিয়র মৌঃ তৈয়বুদ্দিন খান সাহেব (পরে খান বাহাদুর), শরফুদ্দিন খান সাহেব (পরে খান বাহাদুর নূরুল আমিন, আবদুল মোননম খাঁ, গিয়াসুদ্দিন পাঠান, মৌঃ মোঃ ছমেদ আলী প্রভৃতি অনেক যোগ্যতার ও মান্যগণ্য ব্যক্তি থাকিতেও আমাকে যে এই সম্মান দেওয়া হইয়াছিল তার একমাত্র কারণ ছিল আমার প্রতি মুরুব্বিদের স্নেহ।

৪. মুসলিম-সংহতি ও প্রজা-সংহতির বিরোধ

কিন্তু এই স্নেহ বেশিদিন আমাকে রক্ষা করিতে পারিল না। আঞ্জুমনের কাজ ছাড়া আরও দুইটা রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করিতাম। আমি ছিলাম জিলা প্ৰজা-সমিতির সেক্রেটারি এবং জিলা কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট। আঞ্জুমনের মধ্যে অনেক মুসলিম জমিদার থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মেম্বরই প্রজা এবং সেই হিসাবে প্রজা আন্দোলনের মোটামুটি সমর্থক। কিন্তু সকলেই একবাক্যে কংগ্রেসের বিরোধী। প্রজা আন্দোলনের জনপ্রিয়তা দেখিয়া বেশ কিছুসংখ্যক কংগ্রেস-কমী প্রজা সমিতির সমর্থক হই। প্রজা সমিতির সংগঠন উপলক্ষে আমি একটি কর্মী সম্মিলনী ডাকিলাম। আঞ্জুমনের সদস্যগণ আমাকে মুসলিম কমী সম্মিলনী ডাকিতে পরামর্শ দিলেন। আমি তাঁদেরে বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম, আমার ডাকে কার্যতঃ শুধু মুসলমান কর্মীরাই আসিবেন। প্রজা সমিতি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হইলেও ইহাতে প্রধানতঃ মুসলমানরাই আছে। শুধু-শুধি সাম্প্রদায়িক সম্মিলনী ডাকার দরকার নাই। তাতে নাহক প্রজা সমিতিকে এবং প্রজা আন্দোলনকেও সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হইবে। আঞ্জুমনীরা আমার এই যুক্তি মানিলেন না। বরঞ্চ তাঁরা বলিলেন, প্রজাদের অধিকাংশই যখন মুসলমান, হিন্দুরা যখন প্রজা আন্দোলনে আসেই না, তখন নামে আর অসাম্প্রদায়িক প্রজা সমিতির দরকার কি? সোজাসুজি মুসলিম সম্মিলনী ডাকিলেই আমার উদ্দেশ্য সফল হইবে।

দৃশ্যতঃ তাঁদের কথাও সত্য। আমার ডাকা কর্মী সম্মিলনীতে মুসলমানরাই আসিবেন, হিন্দু কর্মীরা দূর হইতে মৌখিক সহানুভূতি দেখাইবেন। এ সমস্তই সত্য কথা। কিন্তু প্রজা সমিতির ও প্রজা আন্দোলনের আদর্শগত অসাম্প্রদায়িক রূপ আমরা নষ্ট করিতে পারি না। নিখিল-বংগ প্ৰজা-সমিতির অফিস-বিয়ারার সব মুসলমান হইলেও ডাঃ নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, অধ্যাপক জে, এল, বানাজী, মিঃ অতুল গুপ্ত প্রভৃতি বড়-বড় হিন্দু মনীষী প্রজাদের দাবি-দাওয়া সমর্থন করিতেছিলেন। অবশ্য এ জিলার কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে শুধু মুসলমানরাই প্রজা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দিয়াছেন। হিন্দু কংগ্রেসীদের মধ্যে যাঁরা জমিদারি-বিরোধী তাঁরা প্রজা-সমিতিতে যোগ না দিয়া কৃষক-সমিতি, কিষাণ সভা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়াছেন। বাংলার প্রজা আন্দোলনকে এদের অনেকেই জোতদার আন্দোলন বলিয়া নিন্দা করিয়াছেন। নিছক কথা হিসাবে ওঁদের অভিযোগে অনেকখানি সত্য ছিল। কিন্তু আমার মতে ওঁদের ও-মত ছিল তৎকালের জন্য আন্ট্রা লেফটিযম। তৎকালীন কমিউনিস্ট ভাষায় শিশুসুলভ বাম পন্থা (ইনফেনটাইল লেফটিযম)। ঐ আল্টা-লেফটিযম প্রত্যক্ষভাবে না হইলেও পরোক্ষভাবে জমিদারি-বিরোধী আন্দোলনের ক্ষতি সাধন করিত পারিত। আমার ঘোরতর সন্দেহ ছিল যে জমিদার-সমর্থক কোনও কোনও কংগ্রেস-নেতা ঐ উদ্দেশ্যেই ঐ আল্টা-লেফটিযমে উষ্কানি দিতেন। আমার জ্ঞান-বিশ্বাস মতে তৎকালীন প্রজা-আন্দোলনই ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে যুগোপযোগী গণআন্দোলন। এ বিষয়ে তৎকালীন দক্ষিণ ভারতীয় কৃষক আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক রংগও আমাদের সহিত একমত ছিলেন। বাংলার কৃষক সমিতি ও কিযাণ সভার সাথে আমাদের প্রজা সমিতির পার্থক্যের দিকে তাঁর মনোযোগ আকৰ্ষণ করিলে তিনি আমাদের পথকেই ঠিক পথ বলিয়াছিলেন। এই জন্যই আমি বামপন্থীদের চাপ এড়াইয়া প্রজা-আন্দোলনই চালাইতেছিলাম। ফলে আমার জিলার প্রজা-সমিতি, চেহারা-ছবিতে একমত মুসলিম প্রতিষ্ঠান হইয়াই দাঁড়াইয়াছিল। এই দিক হইতে আমার আঞ্জুমনী বন্ধুদের কথাই ঠিক।

কিন্তু এর অন্য একটা দিকও ছিল। দেশের অর্থনৈতিক গণ-আন্দোলন হিসাবে ইহার অসাম্প্রদায়িক শ্রেণীরূপ বজায় রাখাও ছিল আবশ্যক। যতই অল্পসংখ্যক হোক এ জিলার দু’চারজন অকংগ্রেসী হিন্দু ভদ্রলোক প্রজা-আন্দোলনের গোড়া সমর্থক ও বিশ্বস্ত অনুগত সক্রিম্ম মেম্বর ছিলেন। এদের মধ্যে প্রবীণ মোখর শ্রীযুক্ত প্রমথ চন্দ্র বসু এবং উকিল শ্ৰীযুক্ত উমেশ চন্দ্র দেবনাথের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া দেশবিখ্যাত কতিপয় হিন্দু চিন্তাবিদ প্রজা-আন্দোলনের প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন। ইহাদের মধ্যে ডাঃ নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, মিঃ অতুল চন্দ্র গুপ্ত, অধ্যাপক জে, এল, বানাজী ও অধ্যাপক বিনয় সরকারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তাই আমি আঙুমনী বন্ধুদের চাপে টলিলাম না। কাজেই তাঁরাও আমার সম্মিলনীর বিরোধী হইয়া উঠিলেন। ক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে হয় সম্মিলনী পরিত্যাগ করিতে হয় অথবা আঞ্জুমনের সহ-সভাপতিত্ব ছাড়িতে হয়। আঞ্জুমনের প্রতি আদর্শগত কোনও আকর্ষণ আমার ছিল না। শহরের মুরুব্বি ও বন্ধু-বান্ধবরা আদর করিয়া একটা সম্মান দিয়াছিলেন। তাই নিয়াছিলাম। আজ তাঁরা সেটা ফেরত চাইলেন। আমি ফেরত দিলাম।

আঞ্জুমনীরা আমার কর্মী-সম্মিলনীর একই দিনে টাউন হলে এক মুসলিম সম্মিলনী আহ্বান করিলেন। আমি মনে করিলাম, ভাল কথা। ওঁদের সম্মিলনীতে যদি মফস্বল হইতে লোক আসে তবে সেখানেও প্রজাদের দাবিতে প্রস্তাব পাস হইবে। ফলে দুই সম্মিলনীই কার্যতঃ প্রজা-সম্মিলনী হইবে। কিন্তু আঞ্জুমানীরা তাঁদের সম্মিলনীকে সফল করার চেয়ে আমার সম্মিলনী ভাংগার দিকে অধিক মনোযোগ দিলেন। প্রথমে জিলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়া ১৪৪ ধারা জারির চেষ্টা করিলেন। আমার সম্মিলনীর তারিখ বহুদিন আগে ঘোষিত হইয়াছে, আমি এই আপত্তি করায় জিলা ম্যাজিস্ট্রেট নিষেধাজ্ঞা জারি করিলেন না। কিন্তু আঞ্জুমনীরা আমাকে কয়েদ করিয়া গুণ্ডামির দ্বারা আমাদের সম্মিলনী ভাংগিয়া দিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। এই সব করিতে গিয়া তাঁরা সম্মিলনীকে কার্যতঃ অনেকখানি কংগ্রেসী কর্মী-সম্মিলন করিয়া ফেলিয়াছিলেন। ফলে কোনও সম্মিলনী না হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পক্ষে খবরের কাগয়ে বাহির হইল? সাফল্যের সাথে সম্মিলনীর কার্য সমাপ্ত হইয়াছে। মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা সম্মিলনী পও করিবার যে সব চেষ্টা করিয়াছিল সে সবই ব্যর্থ হইয়াছে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছে। ময়মনসিংহ জিলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান ঘটিয়াছে ইত্যাদি।

পক্ষান্তরে কোন-কোন মুসলিম কাগযে খবর ছাপা হইল : কংগ্রেসীদের সম্মিলনী ব্যর্থ হইয়াছে। মুসলিম জনতা সম্মিলনীর প্যাণ্ডাল দখল করিয়াছে। সেই প্যাণ্ডালেই কংগ্রেস-বিরোধী প্রস্তাব পাস হইয়াছে এবং মুসলমানদের দাবি-দাওয়ার পুনরাবৃত্তি করা হইয়াছে।

আমি মনে-মনে হাসিলাম। বুঝিলাম এ ধরনের কাগযী আন্দোলন করিয়া কোনও লাভ হইবে না। প্রজা-সমিতিকে সত্য-সত্যই প্রজাদের প্রতিষ্ঠানরূপে গড়িয়া ভোলার কাজে মন দিলাম।

০৫. ময়মনসিংহে সংগঠন

ময়মনসিংহে সংগঠন
পাঁচই অধ্যায়

১. বিচিত্র সাম্প্রদায়িকতা

অতঃপর আমি শহর ফেলিয়া মফস্বলের দিকে মনোযোগ দিলাম। বস্তুতঃ বাধ্য হইয়াই আমি তা করিয়াছিলাম। মুসলিম শিক্ষিত সমাজ সাধারণভাবেই এই সময়ে কংগ্রেস-বিরোধী, হিন্দু-বিরোধী, এমনকি দেশের স্বাধীনতাবিরোধী হইয়া উঠিয়াছে। ত্রিশ-বত্রিশ জন মুসলমান উকিলের মধ্যে জনাতিনেক, পঞ্চাশ জন মোখতারের মধ্যে জন চারেক, শতাধিক মুসলিম ব্যবসায়ীর মধ্যে দু-এক জন ছাড়া আর সবাই কংগ্রেস ও হিন্দুদের নামে চটা। অসাম্প্রদায়িক কথা তাঁরা শুনিতেই রাযী না।

অথচ এদের অধিকাংশের সম্প্রদায়-প্রীতি ছিল নিতান্তই অদ্ভুত। এরা মুখে-মুখে এবং রাজনৈতিক ব্যাপারে হিন্দু ও কংগ্রেসের নাম শুনিতে পারিতেন না। কিন্তু ওকালতি ও মোখতারি ব্যবসায়ের বেলা হিন্দু সিনিয়র উকিল-মোখতারদেরেই কেস দিতেন এবং তাঁদের চেম্বারেই দেন-দরবারে কাল কাটাইতেন। কাপড়-চোপড় কিনিবার সময় এঁরা একমাত্র মুসলিম দোকান ‘মৌলবীর দোকান’ বাদ দিয়া ‘বংগলক্ষ্মী’ আর্য ভাণ্ডার’ প্রভৃতি হিন্দুর দোকান হইতে খরিদ করিতেন। হেতু জিগাসা করিলে বলিতেন,’ মৌলবীর দোকানে দাম অন্ততঃ টাকায় দু’পয়সা বেশি নেয়। পক্ষান্তরে আমরা তথাকথিত ‘হিন্দুর দালাল’ কংগ্রেসী মুসলমানরা খদ্দর কিনিবার সময়ও মুসলমানের কোনও খদ্দরের দোকান আছে কিনা খোঁজ লইতাম এবং ‘মৌলবীর দোকান’ ও অন্যান্য মুসলমান ব্যবসায়ীদেরে দোকানে খদ্দর রাখিবার পরামর্শ দিতাম।

এই সময় বংগীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি সার আঃ রহিম সেক্রেটারি মৌঃ মুজিবুর রহমান। কাজেই মুসলমানদের বিশেষ আকর্ষণ স্বরূপ আমি ঐ মুসলিম লীগের জিলা শাখা প্রতিষ্ঠা করিলাম। আমি নিজে নামে মাত্র প্রেসিডেন্ট হইয়া প্রবীণ উকিল মৌঃ আবদুস সোবহানকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মৌঃ মুজিবুর রহমান খাঁ ফুলপুরীকে উহার সেক্রেটারি করিলাম। কিন্তু ঐ মুসলিম-স্বার্থবাদী সাম্প্রদায়িক মুসলমান উকিল-মোখতারেরা মুসলিম লীগেও যোগ দিলেন না। কারণ তাঁদের মতে স্বয়ং জিন্না সাহেবও ছদ্র-কংগ্রেসী। সুতরাং মুসলিম লীগ আসলে কংগ্রেসেরই শাখা মাত্র। তাঁদের মতে আঞ্জুমনে-ইসলামিয়াই মুসলমানদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। সরকারের সমর্থনই মুসলমানদের একমাত্র পলিসি। ইংরাজরা না থাকিলে মুসলমানদের রক্ষা নাই।

মুসলমান শিক্ষিত সম্প্রদায়ের এই মনোভাবের মধ্যে কোনও যুক্তি ছিল না সত্য, কিন্তু ভণ্ডামিও ছিল না। আন্তরিকভাবেই তাঁরা বিশ্বাস করিতেন, ইংরাজের অবর্তমানে হিন্দু মেজরিটি শাসনে মুসলমানদের দুর্দশার চরম হইবে। জনৈক প্রবীণ খান সাহেব আমাকে বলিতেন : হিন্দুদের কাছে মুসলমান-প্রতিভারও কদর নাই। এই ধরুন না আমরা আপনাকে আঞ্জুমনের শীর্ষস্থানে বসাইয়াছিলাম। আর কংগ্রেস আপনাকে তিন নর ভাইস প্রেসিডেন্ট করিয়া রাখিয়াছে। কোনও দিন আপনেরে ওরা প্রেসিডেন্ট করিবে না কথাটা নিতান্ত চাছা-ছোলা কুড এবং মাকাঠিটা নিতান্ত স্কুল হইলেও কথাটার তলদেশে অনেক সত্য লুকায়িত ছিল। উহাই বাস্তব সত্য। কারণ বাস্তবজীবনে ঐ মাপিকাঠি দিয়াই সব জিনিসের বিচার হয়। অবস্থাগতিকে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তৎকালীন বিচারের মাপকাঠি ছিল উহাই। সম্ভবতঃ মধ্যবিত্তের বিচারের মাপকাঠি চিরকালই তাই।

২. কংগ্রেসের জমিদার-প্রীতি

পক্ষান্তরে কংগ্রেস কার্যতঃ ও নীতিতঃ প্রজা আন্দোলনের বিরোধী ছিল। ১৯২৮ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের বেলা কংগ্রেসী মেম্বররা যে একযোগে প্রজার স্বার্থের বিরুদ্ধে জমিদার-স্বার্থের পক্ষে ভোট দিয়াছিলেন, এটা কোন এক্সিডেন্ট বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। কংগ্রেস নেতারা প্রজা আন্দোলনকে শ্রেণী-সংগ্রাম বলিতেন। শ্রেণী সংগ্রামের দ্বারা দেশবাসীর মধ্যে আত্মকলহ ও বিভেদ সৃষ্টি করিলে স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যাহত হইবে। এটাই ছিল তাঁদের যুক্তি। কিন্তু এ জিলার ব্যাপারে দেখা গেল, এটা তাঁদের মৌখিক যুক্তিমাত্র। ময়মনসিংহ জিলা কংগ্রেস-নেতৃত্বের উপর জমিদারদের প্রভাব ছিল অপরিসীম। বোম্বাই মাদ্রাজ যুক্ত প্রদেশ ও বিহার কংগ্রেস ঐ ঐ ঐ প্রদেশের কৃষকদের স্বার্থ লইয়া সংগ্রাম করিতেছে, এই সব যুক্তি দিয়াও আমি এ জিলার কংগ্রেস-নেতাদেরে টলাইতে পারিলাম না। লাভের মধ্যে আমি কংগ্রেসীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা ও সমর্থন হারাইলাম। তাঁদের যুক্তির মধ্যে প্রজা-আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাঁদের আসল মনোভাবটা ধরা পড়িত। তাঁরা প্রজা-আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন বলিতেন এবং যুক্তিতে বোৰাই-বিহারের কৃষক আনোলন হইতে ময়মনসিংহ তথা বাংলার প্রজা-আন্দেলনের পার্থক্য দেখাইতেন। বাংলার জমিদাররা প্রধানতঃ হিন্দু এবং প্রজারা প্রধানতঃ মুসলমান। জমিদারিতে যা মহাজনি ব্যাপারেও তাই। মহাজনরা প্রধানতঃ হিন্দু এবং খাতকরা প্রধানতঃ মুসলমান। সুতরাং এদের হিসাবে, এবং কার্যতঃ সত্যই, প্রজা আন্দোলন ছিল হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমানদের আন্দোলন।

কংগ্রেসীরা শুধু প্রজা-আন্দোলনে সমর্থন দিলেন না, তা নয়। তাঁরা কৌশলে ইহার বিরুদ্ধতা করিতে লাগিলেন। কিছুসংখ্যক কংগ্রেস-কর্মী দিয়া তাঁরা একটা কৃষক সমিতি খাড়া করিলেন। সেই সমিতির পক্ষ হইতে প্রচার চলিল যে প্রজা আন্দোলন আসলে জোতদারদের আন্দোলন। ঐ আন্দোলনে কৃষকদের কোন লাভ ত হইবেই না, বরঞ্চ কৃষকদের দুর্দশা আরও বাড়িবে। জোতদারদের শক্তি ও অত্যাচার দ্বিগুণ হইবে। প্রমাণ হিসাবে তাঁরা বর্গাদারদের দখলী, স্বত্বের কথাও তুলিলেন। কংগ্রেসের সাথে প্রজা সমিতির প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ বাধিয়া গেল।

এ অবস্থায় কংগ্রেসের সাথে আমার সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদের কথা। সে সংকল্পও একবার করিলাম। কিন্তু পারিলাম না। আমার প্রাদেশিক নেতা ও কেন্দ্রীয় প্রজা সমিতির সেক্রেটারি মওলানা আকরম খাঁ সাহেব সেই মুহূর্তে ছাড়িবার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি সহকারী সেক্রেটারি মোঃ নযির আহমদ চৌধুরী সাহেবের দ্বারা সমস্ত জিলা সমিতির সেক্রেটারিদের নামে কনফিডেনশিয়াল সারকুলার জারি করাইলেন : পূর্ব বাংলার মুসলিম মেজরিটি জিলাসমূহের কংগ্রেস কমিটিগুলি মুসলমানদের দ্বারা ক্যাপচার করার চেষ্টা হওয়া উচিৎ। আমার নিজেরও মত ছিল তাই।

৩. সাংগঠনিক অসাধুতা

আমি তদনুসারে কাজে লাগিয়া গেলাম। এ ব্যাপারে এ জিলার সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় শ্রদ্ধেয় সর্বজনমান্য ঋষিতুল্য কংগ্রেস নেতা ডাঃ বিপিন বিহারী সেন আমাদেরে পূর্ণ সমর্থন দিলেন। তিনি প্রকাশ্য সভায় ঘোষণা করিলেন : যে-জিলার শতকরা আশি জন অধিবাসী মুসলমান, সে জিলার কংগ্রেস নেতৃত্ব মুসলমানদের হাতেই থাকা উচিৎ। মুসলমান ছাড়া এ জিলার কংগ্রেসকে তিনি ‘রামহীন রামায়ণ’ বলিয়া বিদ্রূপ করিয়াছিলেন। তাঁর ও তাঁর সমর্থকদের সহায়তায় আমরা পর-পর দুই বছর কংগ্রেস ক্যাপচার করিবার চেষ্টা করিলাম। দুইবারই ব্যর্থ হইলাম। ইতিহাসটি এইঃ যে বছরে আমরা এই প্রয়াস শুরু করি, সে বছর পঞ্চাশ লক্ষ অধিবাসীর এই জিলার কংগ্রেসের প্রাইমারি মেম্বর-সংখ্যা ছিল সাড়ে সাত হাজার। আমাদের দলের পক্ষে ভোট হইয়াছিল মাত্র আড়াই হাজার। আমরা মনে করিলাম, আগামী বছর আমরা প্রাইমারি মেম্বর করিব সাত দ্বিগুণে চৌদ্দ হাজার। দেখি, বেটারা আমাদের কেমনে হারায়। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করিয়া পরের বছর মেম্বর করিলাম পনর হাজার। কিন্তু ফাঁইনাল ভোটার তালিকার সময় দেখিলাম, আমাদের পনরর মোকাবেলা অপর পক্ষ করিয়াছেন সাড়ে সতর হাজার। কাজেই সেবারও হারিয়া গেলাম। পরের বছর আমরা করিলাম বাইশ হাজার। কিন্তু ফাঁইনাল ভোটার তালিকায় তাঁদের হইল পঁচিশ।

কারণ এটা সাধু প্রতিযোগিতা ছিল না। কৌশলটা ছিল এই : আমরা অপযিশন দলের পক্ষ হইতে প্রাইমারি মেম্বর তালিকা দাখিলের পরে ‘পযিশন’ দল তাঁদের মেম্বর তালিকা দাখিল করিতেন। নিজেরা পযিশনে থাকায় অর্থাৎ আফিস তাঁদের হাতে থাকায় রাতারাতি জাল মেম্বর তালিকাভুক্ত করিয়া নিজেদের পক্ষের তালিকা ভারি করা অতি সহজ ছিল। যে কোনও গণ-প্রতিষ্ঠানের অফিস-কর্তারা এটা করিতে পারেন। স্বাধীনতা লাভের পর লীগ কর্তারা আলাদা পার্টি না করিয়া মুসলিম লীগ দখল করার যে দাওয়াত দিতেন, সেটাও ছিল এইরূপ দাওয়াত। আমরা এ কৌশলের কথা জানিতাম বলিয়াই একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান দখল করিয়া মসজিদ ত্যাগ না করিয়া ইমাম বদলাইবার চেষ্টা করি নাই। কংগ্রেসের নির্বাচন এই ভাবে ‘রিগ’ করিবার অভিজ্ঞতা হইতেই তৎকালে সব দলের রাজনৈতিক নেতারা একমত হইয়া সকল প্রকার নির্বাচনে ‘ইলেকশন ট্রাইবুন্যালের’ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। আমাদের বেলায় কিন্তু ইলেকশন ট্রাইবুন্যালেও কুলায় নাই। ময়মনসিংহ জিলায় ঐরূপ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া আমরা প্রাদেশিক কংগ্রেসের কাছে নিরপেক্ষ ইলেকশন ট্রাইবুন্যালের তদন্ত দাবি করি। প্রাদেশিক কংগ্রেস সুদূর মাদ্রাজ হইতে নিরপেক্ষ মিঃ এ্যানিকে ট্রাইবুন্যাল নিযুক্ত করিয়া পাঠান। আমরা মিঃ এ্যানির কাছে জাল ভোটের অনেক সাক্ষ্য-সাবুদ দেই। কিন্তু আফিস-কর্তারা এমন নিখুঁতভাবে কাগয-পত্র ‘মিছিল’ করিয়া ফেলেন যে বিচারকের বিশেষ কিছু করিবার থাকে নাই।

এইভাবে কংগ্রেস ক্যাপচারের চেষ্টায় ব্যর্থ হইয়া একাগ্রচিত্তে প্রজাসংগঠনে লাগিয়া গেলাম। উপরোক্ত অবস্থাধীনেই আমি সংগঠনের মোড় শহর হইতে মফস্বলের দিকে ফিরাইলাম। উপরে যে সব নেতা আলেম ও বন্ধু-বান্ধবের নাম উল্লেখ করিয়াছি, তাঁদের সকলের ও প্রত্যেকের চেষ্টায় এ জিলার প্রজা-আন্দোলন দুর্বার ও প্রজা সমিতি অসাধারণ শক্তিশালী হইয়া উঠে।

৪. খান বাহাদুর ইসমাইল

আরেকটা ব্যাপারে অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসিল। আমাদের সাংগঠনিক মর্যাদাও বাড়িয়া গেল। এই সময় জিলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ গ্রাহাম এ জিলার সর্বজনমান্য প্রবীণ নেতা খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেবকে পাবলিক প্রসিকিউটরি ও জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান হইতে সরাইয়া খান বাহাদুর সাহেবেরই অন্যতম শিষ্য শরফুদ্দিন আহমদ সাহেবকে পাবলিক প্রসিকিউটরি, চেয়ারম্যানি ও খান বাহাদুরির ‘ট্রিপল ক্রাউন’ পরাইয়া দেন। বিনাকারণে বহুঁকালের পদ-মর্যাদাহারাইবার ফলে খান বাহাদুর সাহেবের চিরজীবনের স্বপ্ন ভংগ হয়। এক কালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ খান বাহাদুর সারা জিরার মুকুটহীন রাজা হঠাৎ একদিন নিজেকে অসহায় সর্বহারা দেখিলেন। এত কালের শিষ্য-শাগরেদরা তাঁকে দূর্গা-প্রতিমার মতই বিসর্জন দিলেন। পারিষদবর্গের ভগ্নাবশেষ অতি অল্পসংখ্যক লোকই বিপদে আহাজারি এবং ইংরাজ জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্দেশ্যে গালাগালি করিয়া শান্ত হইলেন। সান্ত্বনার কথা শুনিলেন তিনি আমার মুখে। আমি তাঁর গুণ, শক্তি ও জনপ্রিয়তার কথা বলিতাম। তিনি এ জিলার মুসলমানদের জন্য কি কি কাজ করিয়াছেন, সেদিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করিতাম। জনগণের প্রিয় নেতা সরকারী দরবার হইতে জনগণের মধ্যে নামিয়া আসায় তাঁকে আমি মোবারকবাদ দিতাম। তিনি যে অন্তরে বল ও সান্ত্বনা পাইতেন চোখে মুখেই তা প্রকটিত হইত।

এইভাবে তিনি প্রথমে আমার এবং পরে প্রজা-সমিতির গোঁড়া সমর্থক হইয়া উঠেন। দুইদিন আগে যিনি আমাকে মুসলিম সমাজের দুশমন ও যে প্রজা-সমিতিকে ছদ্মবেশী কংগ্রেস মনে করিতেন সেই আমাদের তারিফে তিনি পঞ্চমুখ হইলেন। ইতিপূর্বে বাংলা সরকার মুসলিম শিক্ষা সম্পর্কে রিপোর্ট করিবার জন্য খান বাহাদুর আবদুল মোমিনের নেতৃত্বে এক কমিটি গঠন করিয়াছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগে এই কমিটি এ জিলায় তদন্তে আসিয়াছিলেন। তিনজন শিক্ষাবিদের মধ্যে বোধহয় কারো তুলের দরুন আমাকেও সাক্ষী হিসাবে ডাকা হইয়াছিল। আমার যবানবন্দিতে প্রচলিত শিক্ষা-পদ্ধতির আমূল সংস্কার দাবি করি; কারিগরি শিক্ষা প্রবর্তনের সুপারিশ করি, এবং সরকারী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ধর্ম-শিক্ষা প্রচলনের বিরোধিতা করি। ইহাতে মোমিন সাহেব আমার উপর চটিয়া যান। সেই দিন সন্ধ্যায় মুসলিম ইনিষ্টিটিউটে খান বাহাদুর ইসমাইল সাহেবের সভাপতিত্বে এক অভ্যর্থনা সভায় মোমিন সাহেব কঠোর ভাষায় আমার নিন্দা করেন। আমাকে ঐ শহর হইতে বেত মারিয়া বাহির করিয়া দেওয়ার কথা হয়। জনৈক এডিশনাল এস, পি, ও ঐ সভায় বক্তৃতা করেন। তিনি ঐ কাজেরভার নেন।

আমাকে বেত মারিয়া বাহির করা না হইলেও সমাজ আটক করা হইয়াছিল। এই সময় এক মুসলমান জমিদার ভদ্রলোক তার মেয়ের বিয়ায় আমারে দাওয়াত করিলে শহরের মুসলিম নেতারা ঐ ভদ্রলোককে আলটিমেটাম দিয়া আমার নামের দাওয়াতনামা প্রত্যাহার করাইয়াছিলেন।

খান বাহাদুর ইসমাইল সাহেব ছিলেন আদত মহৎ ও ভদ্রলোক। তিনি নিজেই এসব কথা তুলিতেন, আমার আপত্তি সত্ত্বেও বলিয়া যাইতেন। আমি তখন বলিতাম। ‘আজ আর ও-সব কথা তুলিবার দরকার নাই। অবস্থা-গতিকেই ওসব ঘটিয়াছিল।‘ জবাবে তিনি গভীরভাবে বলিতেন : ‘তোমার জন্য দরকার নাই, আমার জন্যই দরকার। আমার একটা বিবেক আছে ত? তাকে সান্ত্বনা দিতে হইবে না?’ আমি বুঝিতাম ভদ্রলোকের ব্যথা কোথায়। তিনি একদিন বলিয়াছিলেন? ‘তোমারে বেত মাইরা বাইর করবার আগে হতভাগা নিমকহারামেরা আমারেই লাথি মাইরা বাইর কৈরা দিছে। পিতৃতুল্য এককালের শক্তিধক্সের বর্তমান মনোভাবকে অতি কৌশলে নাযুক হাতে হ্যাঁগুল করিতে হইত। পারিতামও। করিয়াও ছিলাম। সরকারী পদ মর্যাদার ভক্ত ছাড়াও খান বাহাদুর সাহেবের অনেক ব্যক্তিগত ভক্ত ও অনুসারী ছিলেন। খানবাহদুর সাহেব প্রজা-সমিতিতে যোগ দেওয়ায় এই সব লোক চোখ বুজিয়া প্রজা সমিতির সমর্থক হইয়া উঠিলেন। অনেকে সক্রিয়ভাবেসমিতিতে যোগদিলেন। এতদিন মফস্বলে প্রজা-সমিতির শক্তি সীমাবদ্ধ ছিল। এইবার শহরে তা প্রসারিত হইল।

. পুলিশ সুপার টেইলার

ইতিমধ্যে (ডিসেম্বর, ১৯৩১) গোলটেবিল-বৈঠক হইতে নিরাশ হইয়া মহাত্মা গান্ধী দেশে ফিরিয়া আসামাত্র গ্রেফতার হইলেন। কংগ্রেস বেআইনী ঘোষিত হইল (জানুয়ারি, ১৯৩২)। আমি তখনও কংগ্রেসের ভাইস-প্রেসিডেন্ট। ডাঃ সেন ও আমি আরও অল্প কয়েকজন ছাড়া এ জিলার কংগ্রেসের বড়-বড় নেতারা প্রায় সকলেই গ্রেফতার হইলেন। আমরা নিজেদের দলাদলি তুলিয়া অঃ সেনের বাড়িতে সকল উপালের কয়েকজন কংগ্রেসী নেতা পরামর্শ-সতা করিলাম। ডাঃ সেন ও আমি শান্তি রক্ষার আবেদন করিলাম। প্রায় সকলেই একমত হইলাম। কেবলমাত্র দুইজন হিন্দু নেতা সক্রিয় আন্দোলনের জন্য উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা করিলেন। কিন্তু অধিকাংশে বিরুদ্ধতায় তাঁদের প্রস্তাব পরিত্যক্ত হইল। পরদিন কোর্টে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছি। এমন সময় একজন ডি. এস. পি. ও একজন ইনস্পেক্টর আসিয়া জানাইলেন, আমাকে তখনি এসপি, সাহেব ডাকিয়াছেন। তাঁরা গাড়ি নিয়াই আসিয়াছিলেন।

ময়মনসিংহে সংগঠন আমি তাঁদের সাথে যাইতে বাধ্য হইলাম। বাড়িতে শোকের ছায়া পড়িল। বৈঠকখানায় অপেক্ষমান মণ্ডলেদের মুখ কাল হইয়া গেল। সকলকে আশ্বাস দিয়া আমি কোর্টে যাওয়ার পোশাকেই এস. পি. সাহেবের কাছে রওয়ানা হইলাম। কি করিয়া জানি না কথাটা প্রচার হইয়া গিয়াছিল। বাড়ি হইতে বাহির হইয়াই দেখিলাম রাস্তার দুপাশে ভিড়। সকলে ধরিয়া লইয়াছিলেন, আমি গ্রেফতার হইয়াছি। অনেকেই রুমাল উড়াইয়া আমাকে বিদায় দিলেন।

এস. পি. মিঃ টেইলার। বড় কড়া লোক বলিয়া মশহর। আমাকে দেখিয়াই তিনি গর্জিয়া উঠিলেন। বুঝিলাম আগের দিনের সভার বিকৃত রিপোর্ট তীর কানে গিয়াছে। গর্জনের উত্তরে গর্জন করা আমার চিরকালের অভ্যাস। আমি তাই করিলাম। দু’চার মিনিটেই আশ্চর্য ফল হইল। টেইলার সাহেব নরম হইলেন। কাজেই আমিও হইলাম। টেবিলের উপর সিগারেটের একটা টিন একরূপ ভরাট ছিল। তিনি আমাকে সিগারেট অফার করিলেন। সিগারেট খাইতে-খাইতে কথা-বার্তা চলিল ঝাড়া পৌনে দুই ঘন্টা। কংগ্রেসের উদ্দেশ্য, দাবি-দাওয়া কার্যক্রম হইতে শুরু কলিয়া বিলাতের কনযাভেটিভ লিবারেল লেবার পার্টির পলিটিকস্ সবই আলোচনা হইল। প্রজা সমিতি ও প্রজা আন্দোলন সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা হইল। ফলে টেইলার সাহেব শেষ পর্যন্ত স্বীকার করিলেন ভারতবাসীর স্বাধীনতা দাবি ও প্রজাদের আন্দোলন করার অধিকার আছে। তবে কংগ্রেসের বেআইনী ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ তিনি কঠোর হস্তে দমন করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি তাঁকে বুঝাইলাম আমি এবং আমার মত অনেকেই এক দল কংগ্রেসীর হিংসাত্মক কর্মপন্থার ঘোরতর বিরোধী। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করা আমরা পক্ষপাতী। তাছাড়া আমি মূলতঃ প্রজা-কর্মী। স্বাধীনতার দাবিতে আমি কংগ্রেসের সমর্থক এইমাত্র। কাজেই শেষ পর্যন্ত প্রজা-সমিতির ও প্রজা আন্দোলনের খুঁটিনাটি ও শান্তি ভংগের কথাও উঠিল। বিভিন্ন স্থানে জমিদার মহাজনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাযের তিনি দুই-একটা দৃষ্টান্তও দিলেন। আমি দেখাইলাম, ও ধরনের কার্যে প্রজা সমিতির কোনও সম্পর্ক নাই। বরঞ্চ আমি জমিদার ও মহাজনদের বে-আইনী যুলুমের বহু দৃষ্টান্ত দিলাম। ঐসব ক্ষেত্রে পুলিশের সাহায্য চাহিয়া যে বিপরীত ফল হইয়াছে, তার প্রমান দিলাম। পৌনে দুই ঘন্টা আলাপে রা-টিনটার সবগুলি সিগারেট শেষ হইল। তিনি খালি টিনের দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিলেন : ‘আরেক টিন আনাইব কি?’ আমিও তেমনি হাসিয়া জবাব দিলামঃ ‘তা ত আনিতেই হইবে। বিড়ি-খোর কংগ্রেস-কমীকে বাড়িতে বন্দী করিয়া রাখিবার ইহাই শাস্তি।‘

এই মোলাকাতের ফল আশাতিরিক্ত ভাল হইল। তিনি সরলভাবে স্বীকার করিলেন, আমার মত লোকের নেতৃত্বে প্রজা-সমিতি শক্তিশালী সংগঠন হইলে সন্ত্রাসবাদী কংগ্রেসীদের প্রভাব কমিয়া যাইবে। আমি বলিলাম, প্রজা-সমিতির কর্মী নেতারা সভা-সমিতি করিতে গেলে পুলিশ তাঁদের পিছনে লাগে। তাতে জনসাধারণ ঘাবড়াইয়া যায়। প্রজাকর্মীদের কাজের খুব অসুবিধা হয়। এই অভিযোগের আও প্রতিকারের তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন এবং আমার নিকট হইতে বিশিষ্ট প্রজা-কর্মীদের নাম নিজ হাতে লিখিয়া নিলেন।

অল্পদিন মধ্যেই ইহার সুফল পাওয়া গেল। প্রতি থানায় প্রজা-নেতাদের নামের তালিকা চলিয়া গেল। এস, পি, তাতে নির্দেশ জারি করিলেন। তালিকায় লিখিত নেতাদের কেউ ঐ এলাকায় সভা-সমিতি করিতে গেলে তাঁদের কাজে কোনও ব্যাঘাত না হয়, থানা-অফিসারদের সেদিকে লক্ষ্য রাখিতে হইবে। আমাদের দেশের পুলিশ অফিসারদের ‘ডাকিয়া’ আনিতে বলিলে ‘ধরিয়া’ আনেন, ‘ধরিয়া’ আনিতে বলিলে কান ধরিয়া আনেন। তেমনি অপরদিকে বাধা না দিতে বলিলে একদম সহায়তা ও সমর্থন রু করেন। প্রজা-কর্মীদের বেলাও তাই হইল। আগে যেখানে পুলিশ তাঁদের কাজে বাধা দিতেন, ধমক দিতেন, এখন সেখানে তাঁরা সভার আয়োজনে সহযোগিতা করিতে ও উৎসাহ দিতে লাগিলেন।

ফলে কংগ্রেস-কর্মী ও নেতারা স্বভাবতঃই আমাকে ভুল বুঝিলেন এবং ঘরে বসিয়া কেউ কেউ ন্যায়তঃই আমার নিন্দাও করিলেন। কিন্তু আমি তাঁহাদের নিন্দায় বিচলিত হইলাম না। আমি ত আর ব্যক্তিগত স্বার্থে এটা করি নাই। সাধারণভাবে জিলার সর্বত্র পুলিশ যুলুম কমিয়া যাওয়ায় কংগ্রেস-কর্মীরাও পরে আমার উপর সন্তুষ্ট হইলেন। প্রজা-কর্মীরা পরম উৎসাহে কাজ করিতে লাগিলেন। প্রজা-সমিতির সুনাম ও প্রভাব দ্রুত বাড়িতে লাগিল। কিন্তু বেশিদিন আমরা এই সুবিধা ভোগ করিতে পারিলাম না। ময়মনসিংহ হইতে টেইলার সাহেব ট্রান্সফার হওয়ার দরুনই হউক, আর সরকারী নীতি পরিবর্তনের দরুনই হউক, আবার কর্মীদের উপর যুলুম হইতে লাগিল। সভা-সমিতি ও সংগঠনের কাজ কঠিন হইল।

আমি অগত্যা অন্য পথ ধরিলাম। প্রজা-সমিতি নিয়মতান্ত্রিক প্রজা সংগঠন বলিয়া সরকার হইতে স্বীকৃতি পাইবার একদম সনাতনী চেষ্টা শুরু করিলাম। জমিদার ও প্রজা দেশের ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার দুইটা পক্ষ। জমিদার সমিতিকে সরকার স্বীকৃতি দিয়াছেন; প্রজা-সমিতিকে দিবেন না কেন? এই সব যুক্তিতর্ক দিয়া আমি সরকারের সহিত লেখালেখি শুরু করিলাম। কালে ভদ্রে সংক্ষিপ্ত উত্তর পাইতাম। তাতে শুধু বলা হইত? বিষয়টা সরকারের বিবেচনাধীন আছে। গবর্নর বা মন্ত্রীরা দেশ সফরে বাহির হইলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরফ হইতে অভিনন্দনপত্র দেওয়ার রেওয়াজ তৎকালেও ছিল। ঐ সময় এ জিলার আঞ্জুমনে ইসলামিয়া, ল্যান্ড হোলডার্স এসোসিয়েশন, গৌড়ীয় মঠ, হরি সভা, রামকৃষ্ণ মিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান ঐ সব উপলক্ষে দাওয়াতনামা পাইত। অভিনন্দন-অভ্যর্থনা তাদেরই মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কংগ্রেস মুসলিম লীগ ও প্রজা-সমিতি এইসব অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাইত না। কারণ সরকার এই সবকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলিতেন। আঙুমনে ইসলামিয়াও এই হিসাবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল। কারণ চাকুরিতে মুসলমানদের দাবি-দাওয়া এবং কংগ্রেসের বিভিন্ন আন্দোলনের বিরুদ্ধতা করিয়া আঞ্জুমনে প্রস্তাব গৃহীত হইত। তবু সরকার সমস্ত সরকারী অনুষ্ঠানেই আজুনকে দাওয়াত দিতেন বোধ হয় এই জন্য যে, আমন কখনও সরকারী কাজের প্রতিবাদ করিত না।

৬. মন্ত্রি-অভিনন্দন

এই সময় সার আবদুল করিম গয়নবী একযিকিউটিভ কাউন্সিলার হিসাবে এ জিলায় তশরিফ আনেন। জমিদার সভা ও আঞ্জুমন তাঁকে অভিনন্দন দেওয়ার আয়োজন করে। পাঁচ বছর আগে ‘গজ চক্র’ মন্ত্রী হিসাবে তাঁর নিন্দা করিয়াছিলাম, সে কথা ভুলিয়া আমি প্রজা-সমিতির তরফ হইতে তাঁকে অভিনন্দন-পত্র দিবার দাবি করি। সংশিষ্ট ব্যক্তির বিনা অনুমতিতে অলিন্দন-পত্র দেওয়া যায় না বলিয়া জিলা ম্যাজিস্ট্রেট আমার পত্ৰখানা কলিকাতা পাঠাইয়া দিলেন। গনবী সাহেব আসিলেন এবং চলিয়া গেলেন। কিন্তু আমার পত্রের জবাব আসিল না।

বছর খানেক পরে আমার চেষ্টা ফলবতী হইল। এই সময় নবাব কে. জি, এম. ফারুকী কৃষি ও সমবায় মন্ত্রী হন। আমি যখন ‘দি মুসলমানের’ সহ-সম্পাদক তখন হইতেই আমি ফারুকী সাহেবের সহিত পরিচিত। তাঁরই ময়মনসিংহ সফর উপলক্ষে আমি প্রজা-সমিতির তরফ হইতে তাঁকে অভিনন্দন দিবার প্রস্তাব করিয়া জিলা ম্যাজিট ও নবাব ফারুকী উভয়ের কাছে পত্র দিলাম। আমার প্রার্থনা মনযুর হইল। আমি অভিনন্দন-পত্রের মুসাবিদায় বসিলাম।

তৎকালে অভিন্দনপত্রের এ্যাডভান্স কপি জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দাখিল করার নিয়ম ছিল। তিনি সেজন্য আমাকে তাগিদ করিতে লাগিলেন। কিন্তু আমি দিলাম না। কারণ তা দেখিলে আমাকে উহা পড়িবার অনুমতি দেওয়া হইত না। আমি জানিতাম জিলা ম্যাজিস্ট্রেট যাই করুন অনারেবল মিনিস্টার আমার অভিনন্দন গ্রহণ করিবেনই।

যথাসময়ে শশী লজের বিশাল আংগিনায় সুরম্য সুসজ্জিত প্যাণ্ডলে মন্ত্রি অভিনন্দনের কাজ শুরু হইল। আমি বিশিষ্ট প্রজা-নেতাদের সংগে লইয়া সভায় উপস্থিত হইলাম। বুনিয়াদী অভিনন্দন-দাতা হিসাবে আঞ্জুমনের দাবি অগ্রগণ্য। আঞ্জুমনের অভিন্দন পড়া শেষ হইলেই আমি দাঁড়াইলাম। আমন ও অন্যান্য সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অভিনন্দন-পত্ৰ বরাবর ইংরাজীতে হইত। সেবারও তাই হইল। কিন্তু আমি বাংলায় অভিনন্দন-পত্র লিখিয়াছিলাম। সব অভিনন্দন পত্রেই মন্ত্রী মহোদয়ের এবং সরকারের দেদার প্রশংসা থাকিত। প্রজা-সমিতির অভিনন্দনে মন্ত্রী বা সরকারের আরিফের একটি কথাও থাকিল না। তার বদলে থাকিল জমিদার মহাজনের অত্যাচার ও প্রজা-খাতকের দুরবস্থার করুণ কাহিনী। লিখিয়াছিলাম মনোযোগ দিয়া মর্মস্পর্শী ভাষায়। পড়িলামও প্রাণ ডালিয়া। পড়া শেষ হইলে এক মিনিট স্থায়ী করতালি-ধ্বনি এবং মারহাবা-মারহাবা আওয়ায হইল। অভিনন্দনের বাঁধাই কপিটা মন্ত্রী মহোদয়ের হাতে দেওয়ার সময় তিনি আমার হাত ধরিয়া বেশ খানিকক্ষণ এমন জোরে ঝাঁকি দিতে লাগিলেন যে তাতেও আবার নূতন করিয়া কলি–ধ্বনি হইল। আমি মঞ্চ হইতে নামা-মাত্র সুট-পরা একজন অফিসার আগ বাড়িয়া আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন। বলিলেন : ‘কি শুনাইলেন আজ। কানা রুখতে পরি না।‘ দেখিলাম সত্যই ভদ্রলোকের দুই গাল বাইয়া পানি পড়িতেছে। এর হাত হইতে। একরূপ ছিনাইয়া আরেক জন অফিসার আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন। তারপরে আরেকজন-আরেকজন এইভাবে চলিল। পরে জানিয়াছিলাম, প্রথমে যে ভদ্রলোক আমাকে জড়াইয়া ধরিয়াছিলেন এবং যাঁর চোখে আমি আসু দেখিয়াছিলাম তিনি ছিলেন ইন্সপেক্টর অব রেজিস্ট্রেশন খান বাহাদুর ফযলুল কাদির এবং দ্বিতীয় জন ছিলেন কো-অপারেটিভ সহ-রেজিষার (পরে রেজিয়ার খান বাহাদুর আরশাদ আলী। সভাশেষে আমি যখন শশী লজ হইতে বাহির হইয়া আসি, তখন বহুলোক আমাকে ঘেরিয়া মিছিল করিয়া বাহির হন। আমি যেন কোনও যুদ্ধ জয় করিয়া আসিয়াছি।

অতঃপর সরকারী মহলে এবং আঞ্জুমন নেতাদের কাছে আমার কদর বাড়িয়া গেল। আজকালকার পাঠকরা হয়ত আস্তিনের আড়ালে হাসিতেছেন। কিন্তু মনে রাখিবেন ওটা ইংরাজের আমল। তৎকালে দেশে বিশেষতঃ মুসলিম সমাজে মানুষের মর্যাদা সরকারী স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির অনুপাতে উঠা-নামা করিত। অনারেবল মিনিস্টার আমার খাতির করায় পরদিন হইতে জিলা অফিসাররা আমাকে খাতির করিতে লাগিলেন। তাতে কোট-আদালতেও আমার দাম বাড়িল। রাস্তা-ঘাটেও আদাব-সালাম বেশ পাইতে লাগিলাম। ফলে প্রজা-সমিতির শক্তি বাড়িল।

০৬. প্রজা-আন্দোলন দানা বাঁধিল

প্রজা-আন্দোলন দানা বাঁধিল
ছয়ই অধ্যায়

১. সিরাজগঞ্জ প্রজা-সম্মিলনী

ময়মনসিংহ জিলার সর্বত্র যখন প্রজা আন্দোলনের বিস্তৃতি সুনাম ও শক্তি ক্রমশঃ বাড়িতেছিল, এমন সময় আরেকটি ঘটনায় প্রজা-সমিতির আরও শক্তি বৃদ্ধি পাইল। মওলানা আবুল হামিদ খাঁ ভাসানী সাহেব এই সময় (১৯৩২ সালের ডিসেম্বরে) সিরাজগঞ্জে এক প্রজা সম্মিলনী ডাকিলেন। মিঃ শহীদ সুহরাওয়াদী সম্মিলনী উদ্বোধন করিলেন। খান বাহাদুর আবুদল মোমিন সভাপতি। এই সম্মিলনী নিখিল-বংগ প্রজা সমিতির উদ্যোগে হয় নাই। মওলানা ভাসানী নিজের দায়িত্বেই ডাকিয়াছিলেন। সুতরাং শেষ পর্যন্ত ইহা একটি জিলা প্রজা সম্মিলনীতেই পর্যবসিত হইত। কিন্তু একটি বিশেষ ঘটনায় এই সম্মিলনী সারা দেশীয় গুরুত্ব লাভ করিল। সিরাজগঞ্জের এস, ডি, ও. মওলানা ভাসানী ও সম্মিলিনীর অভ্যর্থনা সমিতির মেম্বারদের উপর ১৪৪ ধারা জারি করিলেন। শহীদ সাহেব ও মোমিন সাহেব এই লইয়া গবর্নরের সহিত দরবার করেন। শেষ পর্যন্ত গবর্নর এস.ডি.ওর আদেশ বাতিল রান। এই ঘটনা খবরের কাগযে প্রকাশিত হওয়ায় বাংলার প্রায় সকল জিলা হইতে প্রজা কর্মীরা বিনা-নিমন্ত্রণে এই সম্মিলনীতে ভাংগিয়া পড়েন। ময়মনসিংহ জিলার বহু কর্মী লইয়া আমিও এই সম্মিলনীতে যোগদান করি। গিয়া দেখি এলাহি কারখানা। সম্মিলনী ত নয়, একেবারে কুম্ভ মেলা। জনতাকে জনতা। লোকের মাথা লোকে খায়। হয়তবা লক্ষ লোকই হইবে। সদ্য-ধান-কাটা ধান ক্ষেতসমূহের সীমাহীন ব্যাপ্তি। যতদূর নযর যায় কেবল লোকের অরণ্য। এই বিশাল মাঠের মাঝখানে প্যাণ্ডেল করা হইয়াছে। প্যাণ্ডাল মানে একটা চারদিক খোলা মঞ্চ। উপরে একখানা শামিয়ানা। সেই বিশাল জনতার মাথায় সে শামিয়ানাটা যেন একটি টুপিও নয় টিকি মাত্র।

সম্মিলনীর কাজ শুরু হইবার অনেক দেরি ছিল। মনে হইল একবার ডেলিগেট ক্যাম্পটা ঘুরিয়া আসি। আমার জিলার সহকর্মী ডেলিগেটরা সেখানে ছিলেন। আমি নিজে আমার এক বন্ধুর অনুরোধে তাঁর শশুর বাড়িতে মেহমান হইয়াছিলাম। কাজেই সহকর্মীদের তত্ত্ব-তালাশ লওয়া কর্তব্য। ডেলিগেট ক্যাম্পে গিয়া দেখিলাম, স্বয়ং মওলানা সাহেবই ডেলিগেটদের খোঁজ-খবর করিতেছেন। মওলানা ভাসানী সাহেবের সহিত এই আমার প্রথম পরিচয়। মওলানাকে ভাবিয়াছিলাম ইয়া বড় বুড়া পীর। দেখা পাইলাম একটি উৎসাহী যুবকের। আমার সময়বয়স্কই হইবেন নিশ্চয়। দাড়ি-মোচে একটু বেশি বয়সের দেখায় আর কি? আলাপ করিয়া খুশী হইলাম। হাসিখুশী মেজ। কর্ম চঞ্চল অস্থিরতার মধ্যেও একটা বুদ্ধির দীপ্তি ও ব্যক্তিত্ব দেখিতে পাইলাম।

যথা সময়ে সম্মিলনী শুরু হইল। সমবেত জনতার এক-চতুর্থাংশ লোক প্যান্ডালের চারিপাশ থেরিয়া বসিল। মঞ্চোপরি বসিয়া চারিদিক চাহিয়া অবাক হইলাম। জনতার তিন-চতুর্থাংশ লোক কচুরিপানার মত ভাসিয়া বেড়াইতেছে। বাকী মাত্র এক-চতুর্থাংশ লোক সভায় বসিয়াছে। তবু সভার আকার এত বিশাল যে উহাদের সকলকে শুনাইয়া বক্তৃতা করিবার মত গলা অনেক নেতারই নাই। তখনও মাইকের প্রচলন হয় নাই। কাজেই তৎকালে সভার মাঝখানে প্যাণ্ডাল করিয়া যাত্রাগানের আসরের মত বক্তারা মঞ্চের উপরে চারিদিকে ঘুরিয়া-ঘুরিয়া বক্তৃতা করিতেন। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, তৎকালে মাইক ছাড়াই নেতারা বড়-বড় সভায় বক্তৃতা করিতেন এবং শ্রোতারা নীরবে কান পাতিয়া শুনিত। সুরেন্দ্র নাথ বানার্জী, বিপিন পাল, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, মহাত্মা গান্ধী, অধ্যাপক জে, এল, বানাজী, মৌলবী ফযলুল হক, মওলানা আযাদ, মওলানা আকরম খাঁ, মৌঃ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মওলানা আবদুল্লাহিল বাকী ও কাফী, আমার শস্ত্র মওলানা আহমদ আলী আকালুবী, আমার চাচা শশুর মওলানা বিলায়েত হোসেন প্রভৃতি নেতাদের গলা সানাইর মত স্পষ্ট ও বুলডগের গলার মত বুলন্দ ছিল। তরুণ নেতাদের মধ্যে শহীদ সাহেবের গলাও উপরোক্ত নেতাদের যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিল। কিন্তু টাইপ রাইটার আবিষ্কারের ফলে যেমন লোকের হাতে লেখা খারাপ হইয়াছে, মাইক আবিষ্কৃত হওয়ায় বক্তাদের গলাও তেমনি ছোট হইয়া গিয়াছে বলিয়া মনে হয়।

যা হোক সম্মিলনীর কাজ সাফল্যের সহিত সমাধা হইল। খান বাহাদুর মোমনের ডিক্টেশনে আমার হাতের লেখা অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সম্মিলনীতে গৃহীত হইয়াছিল। ঐ সব প্রস্তাবের মধ্যে জমিদারি উচ্ছেদ, খানার নিরিখ হ্রাস, ন্যর সেলামি বাতিল, জমিদারের প্রিয়েমশনাধিকার রদ, মহাজনের সুদের হার নির্ধারণ, চক্র বৃদ্ধি সুদ বে-আইনী ঘোষণা, ইত্যাদি কৃষক-খাতকদের স্বার্থের মামুলি দাবিসমূহ ত ছিলই। তার উপরে ছিল দুইটি নয়া প্রস্তাব। কয়েক মাস আগেই ম্যাকডোনান্ড এওয়ার্ড নামে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ বাহির হইয়াছিল। সকল দলের হিন্দুরা উহার প্রতিবাদ করিতেছিলেন। কাজেই মুসলিম নেতারা মনে করিলেন, আমাদের এটা সমর্থন করা দরকার। অতএব রোয়েদাদের সমর্থনে প্রস্তাব পাস হইল। অপরটি ছিল কৃষি খাতকদের ঋণ আদায়ের উপর মরেটরিয়ম এয়োগর দাবি। এটা ছিল মোমিন সাহেবের নিজস্ব কীর্তি। তাঁরই কাছে ‘মরেটরিয়াম’ শব্দটা প্রথম শিখি। তাঁরই উপদেশমত এই প্রস্তাবটিতে কৃষি-খাতক ঋণের উপর দস্তুরমত একটি থিসিস লিখিয়া ফেলিয়াছিলাম। প্রস্তাবে বলা হইয়াছিল বাংলার কৃষি-খাতকদের ঋণের বোঝার প্রায় সবটুকুই চক্রবৃদ্ধি, সুতরাং অন্যায়। উহা শোধ করার সাধ্য কৃষকদের মাই। মূলতঃ ইহারই উপর ভিত্তি করিয়া পরবর্তীকালে ১৯৩৬ সালে বংগীয় কৃষি-খাতক আইন পাস হইয়াছিল এবং ১৯৩৭ সালে সালিশী বোর্ড স্থাপিত হইয়াছিল। এই দিকে সিরাজগঞ্জের এই কনফারেন্সের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রহিয়াছে। এই সম্মিলনীর ফলে মওলানা ভাসানী, মোমন সাহেব ও শহীদ সাহেবের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা খুবই বাড়িয়া যায়।

২. সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ

ইতিমধ্যে ১৯৩২ আগস্ট মাসে ম্যাকডোনাল্ড এওয়ার্ড বা সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ বাহির হয়। দলের মুসলিম নেতারা এর অভিনন্দন করেন। পক্ষান্তরে সকল দলের হিন্দু নেতারা ইহার তীব্র নিন্দা করেন। কংগ্রেস তখন বে-আইনী। কাজেই প্রতিষ্ঠান হিসাবে কংগ্রেস কোনও মতামত দিতে না পারিলেও জেলের বাহিরে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই সাম্প্রদায়িক রায়েদাদের নিলায় বিবৃতি দিতে লাগিলেন। মহাত্মা গান্ধীও তখন জেলে। সাম্প্রদায়িক ব্লোয়েদাদে তফসিলী হিন্দুদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হইয়াছিল। মহাত্মা গান্ধী জেলের মধ্য হইতেই ইহার প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করেন। মহাত্মা গান্ধীকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁর মধ্যস্থতায় সকল শ্রেণীর হিন্দু নেতারা তফসিলী হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ভিত্তিতে যুক্ত নির্বাচনে আপোস-রফা করেন। বৃটিশ সরকারও তৎক্ষণাৎ এই আপোস-রফা গ্রহণ করিয়া রোয়েদাদ সংশোধন করেন। এই ঘটনা হইতে আমরা ইহা আশা করিলাম যে মহাত্মাজী রোয়েদাদের মুসলিম অংশের তেমন তীব্র বিরোধিতা করিবেন না। এ আশায় আরও জোর বাঁধিল কয়েক দিনের মধ্যেই। পণ্ডিত নেহরুর অন্তরংগ বন্ধু কংগ্রেসের তরুণ নেতাদের ন্যতম মিঃ জয় প্রকাশ নারায়ণ কলিকাতার আলবাট হলের এক সভায় সাম্প্রদায়িক ব্রোয়েদাদ সমর্থন করিলেন এবংকংগ্রেসকে ব্লোয়েদাদ মানিয়া লইবার অনুরোধ করিলেন। ১৯৩৩ সালের মাঝামাঝি কথা উঠিল ১৯৩৪ সালে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের নির্বাচন হইবে। কংগ্রেসীরাও নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করিবেন কানাঘুষা শোনা গেল। কয়েক মাস আগে মহাত্মাজী হরিজন আন্দোলন শুরু করিলে তাঁকে গ্রেফতার করা হইল। তিনি আবার অনশনব্রত গ্রহণ করিলেন। সরকার এবারও মহাত্মাজীকে মুক্তি দিলেন।

৩. রাঁটি কংগ্রেস সম্মিলনী

মুক্তি পাইলেও মহাজী আইন অমান্য আন্দোলন বা কংগ্রেসের কার্যকলাপে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করিলেন না। কারণ কংগ্রেস তখনও বে-আইনী। এ অবস্থায় জেলের বাইরের কংগ্রেস-নেতাদের মধ্যে পরামর্শের সুবিধার জন্য মহাত্মাজীর সমর্থনে ডাঃ আনসারী, মিঃ রাজাগোপালাচারিয়া ও ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে ১৯৩৩ সালের মাঝামাঝি রীচিতে একটি ইনফর্মাল এ. আই. সি. সি.-র সভা হয়, ময়মনসিংহের অন্যান্য কংগ্রেস কর্মীদের সাথে আমিও এই সভায় যোগদান করি। কারণ আমরা জানিতে পারিলাম, এই সভার উদ্যোক্তারা চান যে কংগ্রেসের মুসলিম মেম্বররা যেন দলে দলে এই সভায় যোগদান করেন। আমি এই ইশারার অর্থ বুঝিলাম। কাজেই শত কাজ ফেলিয়া এই সভায় যোগ দিলাম।

রাঁচিতে গিয়া বুঝিলাম প্রধানতঃ ডাঃ আনসারীর উৎসাহেই এই সঙ্গিনী সব হইয়াছে। ডাঃ আনসারী এই সম্মিলনীর সভাপতিত্ব করিবেন ইহা আগেই ঘোষিত হইয়াছিল। তাঁর মত খ্যাতনামা কংগ্রেস-নেতা রাঁচিতে মেহমান হইয়াছেন বিহারের শিক্ষাশ্রী সার সৈয়দ আবদুল আযিযের। মন্ত্রী মহোদয়ের উৎসাই শুধু ডাঃ আনসারীর মেহমানদারিতেই সীমাবদ্ধ থাকিল না। সভায় সমবেত সমস্ত মুসলিম ডেলিগেটদের খাওয়ার ব্যবস্থার আরও তিনিই নিয়াছেন। ফলে আমরা থাকিতাম যদিও কটিয়ার জমিদার জনাব ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চান মিয়া সাহেবের রাঁচি প্রাসাদে, কিন্তু আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হইলমী সাহেবের বাড়িতে। ইহার দুইটা মাত্র ব্যাখা সম্ভব ছিল। প্রথম, মন্ত্রী আবদুল আযিয সাহেব বাহিরে ধামাধরা খেতাবধারী ‘সার’ হইলেও ভিতরে ভিতরে তিনি কংগ্রেসের সমর্থক। দ্বিতীয়, ভারত সরকারের সম্মতিক্রমেই তিনি কংগ্রেস নেতাদের মেহমানদারি করিতেছেন। প্রথম ব্যাখ্যা সম্ভব মনে হইল না। কাজেই আমরা দ্বিতীয় ব্যাখ্যাই করিলাম। কংগ্রেস আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করিয়া আইন সভায়, বিশেষতঃ কেন্দ্রীয় আইন সভায়, আসিলে আইন অমান্য আন্দোলন কমজোর, এমনকি একেবারে পরিত্যক্ত হইবে। কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে ফিরিয়া আসিবে। এই আশাতেই ভারত সরকার রাঁচি সম্মিলনীর সাফল্য চাইতেছেন। আমরা এই ব্যাখ্যাই করিলাম।

বাংলার ডেলিগেট হিন্দু মুসলিম সবাই আমরা চান মিয়া সাহেবের প্রাসাদে এক সংগে থাকিতাম। কাজেই সম্মিলনীর সময়টুকু ছাড়া অন্য সব সময়েই আমরা সাম্প্রদায়িক রোয়দাদের উপর বাহাস করিতাম। এই আলোচনার ফলে আমরা বুঝিলাম যে বাংলার হিন্দু নেতারাই রোয়েদাদের বিরুদ্ধে বেশি খাপ্পা ছিলেন। বোম্বাইর মিঃ কে, এফ. নরিম্যান মাদ্রাজের মিঃ এম, আর, মাসানী, মিঃ সত্যমূর্তি ও অধ্যাপক রংগ। প্রভৃতি সকলের মধ্যেই একটু আপোস মনোভাব দেখিতে পাইলাম। কিন্তু বাংগালী হিন্দুদের প্রায় সকলেই ছিলেন অনড়। আমাদের সাথে তর্ক করিতে করিতে অনেকে উত্তেজিত হইয়া উঠিতেন। একাধিক দিন এতে অপ্রিয় ঘটনাও ঘটিয়া গিয়াছে। অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তীর সাথে একবার ত আমার হাতাহাতির উপক্রম। তিনি বলিয়াছিলেন যে, আমার মত সাম্প্রদায়িক মনোভাবের লোকের কংগ্রেস ছাড়িয়া মুসলিম লীগে যাওয়া উচিৎ। জবাবে আমি বলিয়াছিলাম, তাঁর মত সাম্প্রদায়িক হিন্দুর কংগ্রেস ছাড়িয়া হিন্দু সভায় যোগ দেওয়া উচিৎ।

কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে সম্মিলনী আরম্ভ হইলে ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের দৃঢ়তায় বাংলার হিন্দু প্রতিনিধিরা বেশ নরম হইয়া গেলেন। মহাত্মাজী সশরীরে সম্মিলনে যোগ দিলেন না বটে, তবে সকল কাজ ও প্রস্তাবাদি রচনা তাঁর সাথে পরামর্শ করিয়াই করা হইল। রাজাজী সভায় উপস্থিত থাকিয়া এবং প্রধান অংশ গ্রহণ করিয়া মহাত্মাজীর প্রতিনিধিত্ব করিলেন। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই সম্মিলনীর কাজ শেষ হইল। আমাদের দিক হইতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব যা গৃহীত হইল, তা সাম্প্রদায়িক রায়েদাদ সম্পর্কে। দুইদিন তুমুল বাদ-বিতণ্ডার পরে কংগ্রেসের বিখ্যাত ‘না গ্রহণ না বর্জন’ প্রস্তাবটি এই সম্মিলনীতে গৃহীত হইল। এই সভার কাৰ্য্য পরিচালনায় ডাঃ আনসারীর তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার বুদ্ধি দেখিয়া আমি মুগ্ধ ও বিস্মিত হইলাম। কংগ্রেস এই মধ্যপন্থী প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া দেশকে একটা আসন্ন বিপর্যয় হইতে রক্ষা করিল, এই সান্ত্বনা লইয়া আমি বাড়ি ফিরিলাম।

৪. নির্বাচনে প্রথম প্রয়াস

১৯৩৪ সালের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে প্রজাসমিতির সভাপতি সার আবদুর রহিম কলিকাতা হইতে এবং সমিতির অন্যতম সহ-সভাপতি মৌঃ এ. কে. ফযলুল হক বরিশাল-ফরিদপুর নির্বাচনী এলাকা হইতে প্রার্থী হইলেন। ঢাকা ময়মনসিংহ নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী হইলেন সার আবদুল হালিম গযনব। আমাদের জিলার সর্বসাধারণ এবং বিশেষতঃ প্রজা-কর্মীরা সার গযনবীর রাজনীতি পছন্দ করিতাম না–প্রজার স্বার্থের দিক হইতেও না, দেশের স্বার্থের দিক হইতেও না। কাজেই আমরা তাঁর বিপক্ষে দাঁড় করাইবার যোগ্য লোক তালাশ করিতেছিলাম। এমন সময় আমি হক সাহেবের একটি পত্র পাইলাম। তাতে তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন, আমি যেন জিলার অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করিয়া গযনবীর বিরুদ্ধে একটি শক্ত ক্যানডিডেট দাঁড় করাই। ব্যাপারটার গুরুত্ব সম্পর্কে আমাকে অবহিত করিবার জন্য চিঠির উপসংহারে তিনি লিখিয়াছেন : ‘গযনবীকে কিছুতেই নির্বাচিত হইতে দেওয়া উচিৎ হইবে না। কারণ তিনি আসলে আহসান মনযিলের একটি শিখণ্ডীমাত্র। কখনও ভুলিও না যে আহসান মনযিলের সাথে আমার সংগ্রাম কোনও ব্যক্তিগত সংগ্রাম নয়। এটা আসলে আহসান মনযিলের বিরুদ্ধে মুসলিম-বাংলার লড়াই। আহসান মনযিলের কবল হইতে উদ্ধার না পাওয়া পর্যন্ত মুসলিম বাংলার রক্ষা নাই।‘

হক সাহেবের এই পত্র পাওয়ার পর আমাদের কর্তব্য বাড়িয়া গেল। আমরা আরও জোরে উপযুক্ত প্রার্থীর তালাশ করিতে লাগিলাম। দুই জিলা লইয়া নির্বাচনী এলাকা। যাকে-তাকে ত খাড়া করা যায় না। জিলার সর্বজনমান্য নেতা খান বাহাদুর মৌলবী মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেব প্রায় বছর খানেক ধরিয়া প্রজাসমিতির সমর্থক। কাজেই তাঁকেই ধরিলাম। হক সাহেবের পত্র লইয়া তাঁর সাথে দেখা করিলাম এবং দাঁড়াইতে অনুরোধ করিলাম। দুই জিলার বিশাল এলাকার দোহাই দিয়া তিনি অসম্মতি জানাইলেন। কিন্তু হক সাহেবের পত্ৰ তিনিও পাইয়াছেন বলিয়া এ ব্যাপারে তিনি চেষ্টা করিবেন আশ্বাস দিলেন।

এমনি সময়ে খান বাহাদূর সাহেবের বাড়িতে একদিন নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলীর সাথে আমার দেখা। খান বাহাদুর সাহেব হাসি মুখে বলিলেন : ‘এই নেও তোমার ক্যানডিডেট।‘ তিনি নবাবযাদার সাথে আমার পরিচয় করাইয়া দিলেন। নবাবদার চেহারা তাঁর বিনয়-নম্রতা ও ভদ্রতা দেখিয়া আমি মুগ্ধ হইলাম। জমিদারদেরে সাধারণভাবে আমি ঘৃণা করিতাম। ধনবাড়ির নবাব সাহেবকে ব্যক্তিগতভাবে আমি শ্রদ্ধা করিতাম বটে কিন্তু জমিদার হিসাবে অপর সব জমিদারদের মতই তাঁর প্রতিও আমার বিরুদ্ধ মনোভাব ছিল। জনশ্রুতিমতে ধনবাড়ির জমিদার ছিলেন অত্যাচারী জমিদারদের অন্যতম। নবাবযাদার সহিত আলাপ করিয়া এবং একটু ঘনিষ্ঠ হইয়া বুঝিলাম জমিদারের ঘরেও জমিদারি-প্রথার বিরোধী প্রজাহিতৈষী ভাল-মানুষ হওয়া সম্ভব। প্রজাসমিতির ও কংগ্রেসের সহকর্মীদের সাথে নবাবযাদার পরিচয় করাইয়া দিলাম।

নবাবযাদা হাসান আলীকে আমার খুব ভাল লাগিল। প্রজা-সমিতিতেও তাঁকে গ্রহণ রাইতেই হইবে। সেই উদ্দেশ্যে প্রজা-সমিতির ও কংগ্রেসের বন্ধুদের সাথে। তাঁর পরিচয় করাইতে এবং প্রজা-কর্মীদের কাছে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করিয়া চিত্রিত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। চেষ্টা আমার খুব বেশি করিতে হইল না। নবাবযাদা তাঁর স্বাভাবিক অমায়িক মিষ্টব্যবহারের দ্বারা ও জ্ঞান-বুদ্ধির গুণে নিজেই অধিকাংশের হৃদয় জয় ও প্রশংসা অর্জন করিলেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত প্রাচীন কড়া ও নিষ্ঠাবান নেতা-কর্মীদের কাছে আমার কিছু কিছু চেষ্টার দরকার হইল। তার কারণ নবাবদার মরহুম পিতা নবাব বাহাদুরের ঐতিহ্য ও স্মৃতি। কাজেই ঐ সব সহকর্মীর কাছে শুধু নবাবযাদার তারিফ করিলেই চলিত না। তাঁর মরহুম বাবার পক্ষে চূড়ান্ত কথা বলারও দরকার হইত। অত্যাচারী জমিদার হইয়াও ত মানুষ অন্যান্য গুণের অধিকারী হইতে পারেন। আমি নিজেই ব্যক্তিগত গুণের জন্য দু’চারজন জমিদারকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করিতাম এবং প্রজা-সহকর্মী বন্ধুদের সামনে অসংকোচে সে মনোভাব প্রকাশও করিতাম। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা জগৎ কিশোরকে তাঁর অসামান্য দানশীলতার জন্য, পাবনার জমিদার প্রমথ চৌধুরীকে তাঁর সাহিত্যিক নয়া-নীতির জন্য, সন্তোষের জমিদার প্রমথ নাথ রায় চৌধুরীকে তাঁর উদার অসাম্প্রদায়িক নাট্য-সাহিত্যের জন্য আমি ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রশংসা করিতাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথের কথা তুলিলাম না। কারণ জমিদারিটা তাঁর আসল পরিচয় নয়।

ধনবাড়ির জমিদার নবাব বাহাদুরকেও তেমনি দুইটি ঘটনায় আমি অনেক নেতা সাহিত্যিকের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা-ভক্তি ও প্রশংসা করিতাম। অনেক সময় তাঁকে লইয়া গর্বও করিতাম। কিন্তু প্রজা-আন্দোলন শুরু করিয়া এই দুইটি ঘটনাই বেমালুম তুলিয়া গিয়াছিলাম। নবাবযাদার সাথে পরিচয় হওয়া এবং তার আনুসংগিক প্রয়োজন দেখা না দেওয়া পর্যন্ত তা ভুলিয়াই ছিলাম। আজ দুইটা ঘটনাই মনে পড়িয়া গেল। বন্ধুরা তাজ্জব হইলেন। আমিও কম হইলাম না।

এই দুইটি ঘটনার প্রথমটি বাংলা ভাষা সম্পর্কে। দ্বিতীয়টি খিলাফত আন্দোলন সম্পর্কে। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষ দিকে মুসলিম-বাংলার সকল নাইট নবাব ও খেতাবধারীরা এবং উচ্চ স্তরের সরকারী কর্মচারীরা, এমনকি মফস্বলের অনেক খান বাহাদুর খান সাহেবরা পর্যন্ত, সরকারী ইংগিতে সমস্বরে রায় দিয়াছিলেন।

‘মুসলিম-বাংলার মাতৃভাষা বাংলা নয় উর্দু।‘ তখন গরিব আলেম-ওলামা ও সাহিত্যিকদের সাথে গলা মিলাইয়া যে একজন মাত্র নবাব বলিয়াছিলেন : “আমাদের মাতৃভাষা উর্দু নয় বাংলা।” তিনি ছিলেন ধনবাড়ির জমিদার নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তাঁর আত্মীয়-স্বজন সহকর্মীদের মত ঠেলিয়াই তিনি এই বিবৃতি দিয়াছিলেন। এটা তাঁর মত সরকারপন্থী মডারেট রাজনীতিকের জন্য কত বড় দুঃসাহসিকতার কাজ ছিল, পঞ্চাশ বছর পরে আজ তা অনুমান করা সহজ নয়। কিন্তু মুসলিম-বাংলার জীবন-মরণ প্রশ্নে এই সাহস দেখান তিনি তাঁর কর্তব্য মনে করিয়াছিলেন।

দ্বিতীয় ঘটনাটিও তেমিন দুঃসাহসিক ও মনোবলের পরিচায়ক। খিলাফত আন্দোলনে তখন দেশ ছাইয়া গিয়াছে। বৃটিশ ও ভারত সরকার মুসলমানদের এই আন্দোলন দমন করিবার জন্য বিশেষ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার সংকল্প করিয়াছেন। সারা ভারতবর্ষে একজন মাত্র সরকারী লোক খিলাফত সম্পর্কে যুক্তি পূর্ণ সুলিখিত পুস্তিকা প্রচার করিয়া খিলাফত আন্দোলনের ন্যায্যতা প্রমাণ করিয়াছিলেন এবং বৃটিশ ও ভারত সরকারকে দমন-নীতি হইতে বিরত থাকিয়া মুসলিম ভারতের দাবি-মত খিলাফত প্রশ্ন মীমাংসার পরামর্শ দিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন ধনবাড়ির নবাব সাহেব।

যদিও দুইটাই অবিস্মরণীয় ঘটনা, তবু তা আমার মনে পড়িল এতদিনে। আমি বলিতেও লাগিলাম বন্ধুদেরে বিস্তারিতভাবেই। তাঁরা বিশ্বাস করিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু এটাও তাঁরা বুঝিলেন, তথ্য যতই সত্য হোক, প্রয়োজন না হইলে তা কারও মনে পড়ে না আমারও না।

সকলে এক বাক্যে গযনবীর বিরুদ্ধে নবাব্যদাকে সমর্থন করিতে রাখী হইলেন। তিনি নমিনেশন পেপার ফাঁইল করিয়াছেন এবং খান বাহাদুর ইসমাইলসহ প্রজা সমিতির সকলে নবাবযাদাকে সমর্থন দিতেছেন শুনিয়া গ্যনবী সাহেব ঢাকার নবাব বাহাদুরসহ জমিদারদের এক বিরাট বাহিনী সইয়া ময়মনসিংহে আসিলেন। নবাবযাদাকে নমিনেশন প্রত্যাহার করিতে চাপ দিলেন। নবাবযাদা অল্পদিনেই আমার প্রতি এতটা আকৃষ্ট হইয়াছিলেন যে তিনি মনসুর সাব যা করেন, তাতেই আমি রাযী বলিয়া সমস্ত চাপ আমার ঘাড়ে ফেলিলেন।

মাত্র দুইদিনের পরিচয়ে অভিজাত বংশের একটি তরুণ যুবক তাঁর রাজনৈতিক ভাগ্য আমার উপর ছাড়িয়া দেওয়ায় আমি যেমন মুগ্ধ ও গর্বিত হইলাম, তেমনি আমার দায়িত্বের গুরুত্বে চিন্তাযুক্তও হইলাম। সাধ্যমত আমার দায়িত্ব পালনও করিলাম। সমবেত নেতা ও মুরুব্বিদের-দেওয়া সনাতন সব যুক্তি যথা : ইসলামের বিপদ, মুসলিম সংগতির আশু আবশ্যকতা, গয়নবী সাহেবের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা, নবাবযাদার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ শুধু এইবার বাদে, ইত্যাদি সব যুক্তির চাপ কাটাইয়া উঠিতে পারিলাম। কিন্তু একটা বিষয় আমাকে খুব চিন্তিত করিল। স্বয়ং নবাব্যাদাও চিন্তামুক্ত ছিলেন না। সেটি এই যে ম্যাট্রিক সার্টিফিকেট অনুসারে নবাবযাদার বয়স তখন পঁচিশ  হয় নাই। পঁচিশ  না হইলে আইন পরিষদের নির্বাচন-প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হয় না। গয়নবী সাহেবের সমর্থকরা আমাদের পক্ষের এই গুপ্ত কথা জানিয়া ফেলিয়াছেন এটা কথা-বার্তায় স্পষ্ট বোঝা গেল। এই প্রশ্ন রিটার্নিং অফিসার ঢাকা বিভাগের কমিশনারের নিকট উঠিলে নবাবযাদার নমিনেশন পেপার স্কুটিনিতেই বাতিল হইয়া যাইতে পারে। আমাদের নেতা হক সাহেব স্বয়ং এই দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে পাশের কামরায় ডাকিয়া নিয়া নবাবযাদার উপস্থিতিতে এ বিষয়ে তাঁর লিগ্যাল অপিনিয়ন চাহিলাম। তিনিও সেই কথাই বলিলেন। নবাব্যাদার নমিনেশন প্রত্যাহার করিয়া অত-অত মুরুব্বির অনুরোধ-উপরোধ রক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ বিবেচিত হইল। একটা পুরা দিন ঘোরর বাকযুদ্ধ করিয়া তাই অবশেষে আমরা পরাজয় স্বীকার করিলাম। নবাবযাদাকে নমিনেশন প্রত্যাহারের উপদেশ দিলাম। যে হক সাহেবের বিশেষ নির্দেশে আমরা এই সংগ্রামে অবতীর্ণ হইয়াছিলাম, তাঁরই উপস্থিতিতে এবং সম্মতিক্রমে এটা হইল বলিয়া আমাদের বিবেকও পরিষ্কার থাকিয়া গেল।

এইভাবে এ জিলায় প্রজা-সমিতির নির্বাচন-যুদ্ধে নামিবার প্রথম প্রয়াস ব্যর্থ হইল। কিন্তু এতে দুইটা নেট লাভ হইল। এক, নবাবযাদার দৃঢ় চিত্ততা ও আমার উপর তাঁর নির্ভরশীলতা আমাকে মুগ্ধ করিল। অপরদিকে আমার সততা অধ্যবসায় নবাব্যদাকেও আমার প্রতি আরও আকৃষ্ট করিল। দুই, এই গয়নবী-বিরোধিতায় এ জিলার সকল মতের নেতৃবৃন্দের মধ্যে যে সংহতি স্থাপিত হইল পরবর্তী কয়েক বছর এই সংহতি প্রজা আন্দোলনকে এ জিলায় খুব জোরদার করিয়া তুলিল।

 ০৭. প্রজা আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি

প্রজা আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি
সাতই অধ্যায়

১. সমিতিতে অন্তর্বিরোধ

কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের এই দিনে প্রজা সমিতির প্রেসিডেন্ট সার আবদুর রহিম কলিকাতা হইতে নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ সালে জিন্না সাহেবের ইণ্ডিপেন্টে পার্টির সমর্থনে তিনি কংগ্রেসী প্রার্থী মিঃ শেরওয়ানীকে পরাজিত করিয়া আইন পরিষদের প্রেসিডেন্ট (স্পিকার) নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনের পরে তিনি কলিকাতা ফিরিয়া প্রজা সমিতির ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডাকিয়া বলেন যে আইন পরিষদের শিকার হওয়ায় প্রচলিত নিয়ম অনুসারে তিনি আর প্রজা সমিতির প্রেসিডেন্ট থাকিতে পারেন না। তাঁর জায়গায় অন্য লোককে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য তিনি আমাদের নির্দেশ দেন।

সার আবদুর রহিমের স্থলবর্তী নির্বাচন করা খুব কঠিন ছিল। তিনি ছিলেন সকল দলের আস্থাভাজন। তক্কালে প্রজা সমিতি বাংলার মুসলমানদের একরূপ সর্বদলীয় প্রতিষ্ঠান নি। কংগ্রেসী-অকংগ্রেসী, সরকার-ঘেষা, সরকার-বিরোধী, সকল দলের মুসলমান রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর সমাবেশ ছিল এই প্রজা সমিতিতেই। এ অবস্থায় সার আবদুর রহিমের স্থলবর্তী নির্বাচনে ওয়ার্কিং কমিটির মধ্যে অতি সহজেই দুই দল হইয়া গেল। প্রজা সমিতির সেক্রেটারি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর নেতৃত্বে প্রবীণ, প্রজা নেতাদের একদল খান বাহাদুর আবদুল মোমিন সি, আই. ই.-কে সমিতির প্রেসিডেন্ট করিতে চাহিলেন। অপরদিকে আমরা তরুণরা জনাব মৌঃ এ. কে. ফযলুল হক সাহেবকে সভাপতি করিতে সহিলাম। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হইয়া গেল। কিন্তু প্রার্থীদ্বয়ের মধ্যে নয়– তীদের সমর্থকদের মধ্যে। ধুম ক্যানভাসিং শুরু হইল। সাধারণভাবে তরুণ দল, তথাকথিত প্রগতিবাদী দল, কংগ্রেসী ও কংগ্রেস সমর্থক দল হক সাহেবের পক্ষে। তেমনি সাধারণভাবে বুড়ার দল, খান সাহেব-খান বাহাদুর সাহেবরা সবাই মোমিন সাহেবের পক্ষে। জয়-পরাজয় অনিশ্চিত। উভয় পক্ষই বুঝিলাম শত্রুপক্ষ দুর্বল নয়। কাজেই শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই বিদায়ী সভাপতি সার আবদুর রহিমকে সালিশ মানিলাম। সার আবদুর রহিম এই শর্তে সালিশ করিতে রাযী হইলেন। তিনি সিলমোহর করা ইনভেলাপে তাঁর মনোনীত ব্যক্তির নাম লিখিয়া রাখিয়া দিল্লী চলিয়া যাইবেন। সেখান হইতে তাঁর টেলি পাইলে পর আমরা ইনভেলাপ খুলিব এবং তাঁর রায় মানিয়া লইব। উভয় পক্ষই এই শর্তে রাযী হইলাম। কিন্তু সার আবদুর রহিম এর পর যে কয়দিন কলিকাতা থাকিবেন, ততদিন উভয় পক্ষই গোপনে এ-ওর অজ্ঞাতে যার-তার ক্যানডিডেটের পক্ষে সার আবদুর রহিমকে জোর ক্যানভাস করিলাম। সার আবদুর রহিম ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির লোক। বড় একটা হাসিতেন না। তবু আমাদের কার্যকলাপে তিনি মনে-মনে নিশ্চিয়ই হাসিতে ছিলেন। সেটা বুঝিয়াছিলাম পরে।

যথাসময়ে সমিতির সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট মৌলবী আবদুল করিম সাহেবের ওয়েলেস লি স্কোয়ার বাড়িতে প্রজা সমিতির ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসিল। মৌঃ আবদুল করিম সভাপতির আসন গ্রহণ করিলেন। প্রকাশ্য সভায় কন্টাকদারের টেণ্ডার খুলিবার মত সমস্ত ফর্মালিটি সহকারে সার আবদুর রহিমের রোয়েদাদনামার সিলমোহর-করা ইনভেলাপ খোলা হইল। আমাদের সমস্ত আশা-ভরসা ও ধারণা-বিশ্বাস ধুলিসাৎ হইয়া গেল। সার আবদুর রহিম খান বাহাদুর মোমিন সাহেবকেই সভাপতি মনোনীত করিয়াছেন। মওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের দল বিজয়োল্লাস হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিলেন। আমরা নিরাশ স্তম্ভিত ও অবশেষে ক্রুদ্ধ হইলাম। সভাপতি মৌলবী আবদুল করিম তাঁর স্বভাবসুলভ শান্ত ও ধীরভাবে আমাদের রোয়েদাদ মানিয়া লইবার উপদেশ দিলেন, যদিও আমরা জানিতাম তিনি ব্যক্তিগতভাবে হক সাহেবের সমর্থক ছিলেন। . কিন্তু আমরা বিশ্বাস ভংগ করিলাম। উভয় পক্ষের মানিত সালিশের রোয়েদাদ মানিলাম না। আমরা সরল আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করিতাম প্রজা আন্দোলনের শক্তি প্রগতি ও সংগ্রামী ভূমিকার খাতিরেই হক সাহেবকে সভাপতি করা দরকার। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যাই থাক না কেন, সালিশ যখন মানিয়াছি তখন সালিশের রোয়েদাদও আমাদের মানা উচিৎ ছিল। রাজনৈতিক সাধুতার খাতিরে তাই ছিল আমাদের অবশ্য বর্তব্য। কিন্তু আমরা তা করিলাম না। বলিতে গেলে এই বিশ্বাসঘাতকতার নেতৃত্ব আমিই করিয়াছিলাম। আমি নূতন করিয়া যুক্তি খাড়া করিলাম: কোন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানেরই সভাপতির পদ এমনভাবে সালিশির দ্বারা নির্ধারণ করা যায় না। এটা গণতন্ত্রের খেলাফ। সমিতির মেরদিগকে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নাই। ইত্যাদি ইত্যাদি। অতএব আমরা নির্বাচন দাবি করিলাম।

২. প্রজা সম্মিলনীর ময়মনসিংহ অধিবেশন

ইতিপূর্বেই স্থির হইয়াছিল প্রজা সম্মিলনীর আগামী বার্ষিক অধিবেশন ময়মনসিংহে হইবে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অনুকরণে এটা আগের বছরের সম্মিলনীতেই ঠিক হইয়া থাকিত। আগের বছরের সম্মিলনী হইয়াছিল কুষ্টিয়ায়। আমরা সমিতির সভাপতি নির্বাচন লইয়া যখন ঐরূপ প্রতিদ্বন্দিতা করিতেছিলাম তখন আগামী বার্ষিক সম্মিলনী আমাদের সামনে ছিল। কাজেই সে ব্যাপারেও আমাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল। মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের মতে আগামী সম্মিলনীর সভাপতি হওয়া উচিৎ মোমিন সাহেবের। আমাদের মতে হওয়া উচিৎ হক সাহেবের। এ ব্যাপারেও মওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের দলের দাবি অধিকতর ন্যায়সংগত ছিল। গত সম্মিলনীর সভাপতি ছিলেন হক সাহেব। একজনকেই পর পর দুই বছর সম্মিলনীর সভাপতির করা ঠিক হইবে না। আমরা মনে মনে স্বীকার করলাম মওলানা সাহেবের এই যুক্তি সারবান। রাখীও হয়ত হইতাম আমরা। কিন্তু সমিতির প্রেসিডেন্টগিরি লইয়া মতভেদ হওয়ায় আমরা সম্মিলনীর সভাপতিত্ব বিনা শর্তে ছাড়িয়া দিতে সাহস করিলাম না। এ ব্যাপারে মওলানা সাহেবের সহিত কোনও আপোষরফা না হওয়ায় আমি অভ্যর্থনা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে অভ্যর্থনা সমিতির সাধারণ অধিবেশনে হক সাহেবকে সম্মিলনীর সভাপতি নির্বাচন করিলাম এবং সংবাদপত্রে ও হবিলে তা প্রচার করিলাম। মওলানা সাহেব ন্যায়তই ইহার প্রতিবাদ করিলেন। তক্কালে অভ্যর্থনা সমিতির পক্ষে সন্মিলনীর সভাপতি নির্বাচনের প্রথা চালু ছিল বটে কিন্তু কেন্দ্রীয় কোনও প্রতিষ্ঠান না থাকিলেই সেটা করা হইত নিখিল-বংগ প্রজা সমিতির মত প্রতিষ্ঠান থাকায় অভ্যর্থনা সমিতির সে অধিকার ছিল না। তবু জোর করিয়াই আমি তা করিয়া ফেলিলাম।

মওলানা আকরম খাঁ সাহেব গাবতঃই এবং ন্যায়তই আমার উপর কুদ্ধ হইলেন। নিখিল-বংগ প্রজা সমিতির সেক্রেটারি হিসাবে তিনি অন্যায়ভাবে সম্মিলনী অনিদিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা থোষণা করিলেন। এই মর্মে সমস্ত জিলা ও মহকুমা শাখায় টেলিগ্রাম করিয়া দিলেন। আমি অভ্যর্থনা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে এই বে-আইনী স্থগিত অগ্রাহ্য করিলাম। দলে দলে প্রতিনিধিদের সফিনীতে যোগ দিতে অনুরোধ করিয়া প্রতি জিলায় ও মহকুমায় টেলিগ্রাম করিয়া দিলাম এবং সংবাদপত্রে বিবৃতি দিলাম।

মওলানা সাহেবের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও বিরাট সাফল্যের সঙ্গে তিন দিনব্যাপী সম্মিলনী এবং এক মাসব্যাপী কৃষি-শিল্প-প্রদর্শনী হইল। প্রদর্শনীটা এত জনপ্রিয় হইয়াছিল যে নির্দিষ্ট এক মাস মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও আরও পনর দিন মেয়াদ বাড়াইয়া দেওয়াইয়াছিল।

৩. সম্মিলনীর সাফল্যের হেতু

কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও ময়মনসিংহ প্রজা-সম্মিলনী সফল হইবার কারণ ছিল। তার প্রথম কারণ এই যে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধতা যখন শুরু হয় তখন সম্মিলনীর আয়োজনের কাজ সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে। দ্বিতীয়তঃ সাধারণভাবে সারা বাংলায় এবং বিশেষভাবে ময়মনসিংহ জিলায় তৎকালে প্রজা-আলোলন জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে উঠিয়াছিল। প্রজা-আলোশনের জনপ্রিয়তা ছাড়া সম্মিলনীর অভ্যর্থনা সমিতিরও একটা নিজস্ব ক্ষমতা ও মর্যাদা ছিল। সম্মিলনীর সভাপতি হক সাহেব ও অন্যান্য নিমন্ত্রিত ও সমাগত নেতৃবৃন্দের সকলেরই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল। বস্তুতঃ নিখিল বংগ প্রজা সম্মিলনীর ১৯৩৫ সালের ময়মনসিংহ অধিবেশনের মত সাফল্যমণ্ডিত প্রাদেশিক কোনও সম্মিলনী বাংলায় আর হয় নাই, একথা অনেকেই বলিয়াছিলেন। অভ্যর্থনা সমিতিতে যেমন করিয়া সকল দলের ও সকল শ্রেণীর নেতৃ-সমাবেশ হইয়াছিল ময়মনসিংহ জিলায় তেমন আর হয় নাই। এই অভ্যর্থনা সমিতির চেয়ারম্যান ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও আইনবিদ ডাঃ নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত। এর তিনজন ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন খান বাহাদুর মৌঃ ইসমাইল, ডাঃ বিপিন বিহারী সেন ও মিঃ সূর্য কুমার সোম এবং জেনারেল সেক্রেটারি ছিলাম আমি। কৃষি-শিল্প-প্রদর্শনী কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মিঃ নুরুল আমিন, প্যাল কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মৌঃ আবদুল মোননম খাঁ, ফাঁইনাল কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মৌঃ মোহাম্মদ ছমেদ আলী, একোমোডেশন কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মৌ তৈয়বুদ্দিন আহমদ, লান্টিয়ার কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন মৌঃ গিয়াসুন্দিন পাঠান, লান্টিয়ার কোরের জি.ও. সি. ছিলেন মৌঃ মোয়াধ্যম হুসেন খাঁ। এতদ্ব্যতীত প্রজা সমিতি, কংগ্রেস ও আমন সকল প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট কর্মীদের অনেকেই এই অভ্যর্থনা সমিতির বিভিন্ন দফতরে দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করিয়াছিলেন। ফলতঃ একমাত্র জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান খান বাহাদুর শরফুদ্দিন আহমদ সাহেব ছাড়া এ শহরের সকল সম্প্রদায় ও দলের উল্লেখযোগ্য সকল নেতাই এই প্রজা সম্মিলনীতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। একযিবিশন কমিটির সেক্রেটারি হিসাবে জনাব নুরুল আমিন এমন অসাধারণ কর্মক্ষমতার পরিচয় দিয়াছিলেন যে তাঁর আয়োজিত প্রদর্শনী দেড় মাস কাল এই শহরকে এমনকি গোটা জিলাকে কর্মচঞ্চল করিয়া রাখিয়াছিল। সরকারী-বেসরকারী বহু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগতভাবে বহু শিল্পী কৃষক ও ব্যবসায়ী তাঁদের প্রদর্শনযোগ্য জিনিসপত্র লইয়া এই প্রদর্শনীতে যোগ দিয়াছিলেন। দৈনিক জপ্রতি এক আনা করিয়া প্রবেশ ফি থাকা সত্ত্বেও দেড় মাস ধরিয়া এই প্রদর্শনীতে প্রতিদিন হাজার হাজার লোকের ভিড় হইত। প্যান্ডাল কমিটির সেক্রেটারি হিসাবে মৌঃ আবদুল মোননম খাঁ এমন মৌলিক পরিকল্পনা প্রতিভার পরিচয় দিয়াছিলেন যে তাঁর নির্মিত ও সজ্জিত প্যাণ্ডালের মত সুদৃশ্য সুউচ্চ বিশাল ও মনোরম প্যাণ্ডাল কংগ্রেসেরও কোন প্রাদেশিক সম্মিলনীতেও হয় নাই। সুউচ্চ জোড়া মিনারযুক্ত তিনটি বিশাল তোরণ দিয়া বিরাট প্যাণ্ডলে প্ৰবেশ করিতে হইত। প্যাণ্ডালের উপরে ঠিক মধ্যস্থলে ছিল শতাধিক ফুট উচ্চ এক সুডৌল বিশালকায় গম্বয। সোলালী কাগযে মোড়া এই গুম্বয বহুদূর হইতে দেখা যাইত। মনে হইত সত্যই কোনও সুউচ্চ মসজিদের সোনালী গম্বয। এই গম্বয এতই জনপ্রিয় হইয়াছিল যে সম্মিলনী শেষ হইবার বহুদিন পর পর্যন্ত জনসাধারণের বিরুদ্ধতার দরুন প্যাণ্ডাল ভাংগা যায় নাই। যতদিন প্রদর্শনীর কাজ শেষ না হইয়াছিল, ততদিন প্রদর্শনী গ্রাউণ্ড ও প্যাণ্ডালের সবটুকু যায়গা সারা রাত আলোক-সজ্জিত থাকিত এবং রাত-দিন লোকের ভিড় থাকিত। বস্তুতঃ ময়মনসিংহ শহরের বড় বাজার ও ছোট বাজারের মধ্যবর্তী বর্তমান বিশাল ময়দানটি প্রজা সম্মিলনীর দৌলতেই আবাদ হইয়াছিল।

. মহারাজার বদান্যতা

এর আগে এই জায়গা নালা-ডুবা, বন-জংগল ও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ছিল। দিনের বেলায়ও এই জায়গায় কেউ প্রবেশ করিত না। এখানে প্রবেশ করিবার দৃশ্যতঃ। কোন রাস্তাও ছিল না। সেজন্য এই শহরে কুড়ি বছর বাস করিয়াও এবং এই ময়দানের চার পাশের দোকান-পাটে কুড়ি বছর সওদা করিয়াও অনেকে জানিত না যে এই সব দোকানের পিছনেই একটা বিশাল এলাকা বন-জংগল ও ডুবা-নালায় ভরিয়া আছে। যদিও এখান হইতেই এ শহরের সমস্ত মশার উৎপত্তি হইত বলিয়া মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষ জানিতেন, তবু এটা ভরাট ও পরিষ্কার করিবার অর্থনৈতিক দুঃসাহস কখনও করেন নাই। মিউনিসিপ্যালিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান কংগ্রেস নেতা, আমার পরম শ্রদ্ধেয় গুরুজন এবং প্রজা-সম্মিলনীর অভ্যর্থনা সমিতির সহ সভাপতি ডাঃ বিপিন বিহারী সেনের সঙ্গে সম্মিলনীর জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের কথা আলোচনা করি। সার্কিট হাউস ময়দান এ শহরের একমাত্র বড় খোলা স্থান। কিন্তু এটা সরকারী জমি। এখানে কোনও সভা-সম্মিলনী করিতে দেওয়া হয় না। কাজেই পাটগুদাম এলাকাই ছিল বড়-বড় সভা-সম্মিলনী করিবার একমাত্র স্থান। উহাদের মধ্যে একটা সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচনেই ডাঃ সেনের সহায়তা নিতে। ছিলাম। তিনিই এই পরিত্যক্ত বন-বাদাড়ের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই উদ্দেশ্যে মহারাজা শশিকাস্তের সঙ্গে দেখা করিলাম। মহারাজা শশিকান্ত উদারমনা রসিক পুরুষ ছিলেন। কিন্তু দুইটা ঘটনায় আমার উপর তাঁর রাগ থাকিবার কথা। একটা বেশ পুরান। প্রায় বছর খানেক আগের ঘটনা। একদিন মহারাজার জমিদারিতে ফুলবাড়িয়া থানার জোরবাড়ি গ্রামে একটা প্রজা-সতা হইবার কথা। আমরা কয়েকজন সভাস্থলে গিয়াছি যোহরের নামাযের শেষ ওয়াকতে বেলা সাড়ে তিনটায়। একটি পতিত জমিতে সভার উদ্যোক্তারা হোট একখানা শামিয়ানা খাটাইবার খুটি খাটা গাড়িতে ছিলেন। অতি অল্প লোকই তখন সভায় আসিয়াছে। এমন সময় অদূরবর্তী জমিদার কাঁচারি হইতে, একজন কর্মচারী দুইজন পুলিশসহ সভাস্থলে আসিয়া আমাদের জানাইলেন, স্থানটি মহারাজার খাস জমির অন্তর্ভুক্ত। ওখানে সভা হইতে দেওয়া হইবে না, এটাই মহারাজার হুকুম। সংগী পুলিশ দুইজন জমিদার কর্মচারির সমর্থন করিল। উদ্যোক্তারা আমার মত চাহিলেন। আমি শামিয়ানার খুটা খাঁটি ও টেবিল-চেয়ার লইয়া তাঁদের নিজস্ব কোনও জমিতে যাইবার নির্দেশ দিলাম। সদ্য-ধান-কাটা একটি নিচু জমিতে সভার স্থান করা হইল। পুলিশ ও জমিদারের বাধাদানের খবরটা বিদ্যুৎবেগে গ্রামময় ছড়াইয়া পড়িল। স্বাভাবিক অবস্থায় যেখানে তৎকালে এই সভায় হাজার-বার শ’র বেশি লোক হইত না, সন্ধ্যার আগেই সেখানে পাঁচ ছয় হাজার লোকের সমাগম হইল। জনতার দাবিতে অনেক রাত-তক সভা চালাইতে হইল। ঐ সভায় বক্তৃতা করিতে গিয়া সেইদিনকার ঐ ঘটনা বর্ণনা করিয়া আমি বলিয়াছিলাম পল্লী গ্রামের পতিত জমিও মহারাজার নিজের এই দাবিতে তিনি আজ একটি মাঠে আপনারা তাঁরই প্রজাসাধারণকে শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক একটা সতা করিতে দিলেন না। আমি মহারাজাকে হুঁশিয়ার করিয়া দিতে চাই, এই পন্থায় প্রজা-আন্দোলন রোধ করা যাইবে না। বরঞ্চ এতে প্রজা-আন্দোলন একদিন শক্তিশালী গণ-আন্দোলনে পরিণত হইবে। আমরা জমিদারি উচ্ছেদ করিয়া এ যুলুম একদিন বন্ধ করিবই। মহারাজার লোক কেউ এই সভায় থাকিয়া থাকিলে তিনি তাঁর। কাছে এই কথা পৌঁছাইবেন যে আজ আমরা নিজেদের গ্রামে জমিদারের কাঁচারির নিকটে একটা সভা করিতে পারিলাম না, কিন্তু একদিন আসিবে, যেদিন আমরা মহারাজার রং মহল ‘শশী লজ’কে আমাদের সন্তানদের পাঠশালা বানাইব। কথাটা মহারাজার কানে যথাসময়ে উঠিয়াছিল। তিনি আমার উপর খুব চটিয়াছিলেন।

দ্বিতীয় ঘটনাটি সাম্প্রতিক। অভ্যর্থনা সমিতি গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা চাঁদা আদায়ে শহরে বাহির হইয়াছি। ডাঃ সেন ও সূর্যবাবুর পরামর্শে আমরা হিন্দু বড় লোকদের কাছে চাঁদার জন্য ত যাইতামই, জমিদারদের কাছেও যাইতাম। এ জিলার অন্যতম বড় জমিদার নবাবযাদা হাসান আলী তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজা সমিতিতে যোগ দেন নাই বটে, কিন্তু আমাদের আন্দোলনে তাঁর সমর্থন আছে একথা তখন জানাজানি হইয়া গিয়াছে। কাজেই কখনও ডাঃ সেনকে সঙ্গে লইয়া কোনদিন নিজেরাই জমিদারদের কাছে চাঁদা চাইয়া বেড়াইতে লাগিলাম। এমনি একদিন আমরা অভ্যর্থনা সমিতির লোকজন দল বাঁধিয়া এক জমিদারের কাঁচারি ঘরে ঢুকিলাম। জমিদার বাবু এক পাশে ইবি চেয়ারে হেলান দিয়া হুক্কা টানিতেছেন। অন্যদিকে চার-পাঁচটা চৌকিতে ঢালা ফরাসে কর্মচারিরা কাজ করিতেছেন। জমিদার বাবুর নিকট আমি সুপরিচিত। তাঁর এক পুত্র আমার ক্লাস ফ্রেণ্ড ছিলেন। আরেক পুত্র আমাদের সংসী উকিল। আমাকে দেখিয়াই তিনি সোজা হইয়া বসিলেন এবং দল বাঁধিয়া আসার কারণ জিগগাসা করিলেন। আমি বেশ একটু বিস্তারিতভাবেই আমাদের উদ্দেশ্য বর্ণনা করিলাম এবং প্রসংগক্রমে এই সম্মিলনীর সাথে ডাঃ সেন ও সূর্যবাবুর সম্পর্কের কথা হয়ত একটু অতিরঞ্জিত করিয়াই বলিলাম। তিনি সব কথা শুনিয়া অসংকোচে বলিলেন : হ, চাঁদার জন্য খুব উপযুক্ত পাত্রের কাছেই আসিয়াছ। তোমরা জমিদারের মার্গে বাঁশ দিবে, আর আমরা জমিদাররা সে কাজে চাঁদা দিব?

আমিও এই পিতৃতুল্য ব্যক্তির কথার পৃষ্ঠে অসংকোচে নির্ভয়ে সমান জোরে বলিলাম : জি হাঁ, আলবত দিবেন।

আমার কথার জোর দেখিয়া ভদ্রলোক বিস্ময়ে বলিলেন : কেন দিব? আমি বলিলামঃ তেলের দাম দিবেন।

সদাহাস্যময় ভদ্রলোক ভেবাচেকা খাইয়া গেলেন। ‘তেলের দাম?’ শব্দটা তিনি দুই-তিনবার স্বগত উচ্চারণ করিলেন। অবশেষে খাযাঞ্চি বাবুর দিকে চাহিয়া উচ্চস্বরে বলিলেন : মনসুরকে দশটা টাকা এক্ষণি দিয়া দাও ত। খরচের ঘরে লেখ? তেলের দাম বাবদ প্রজা সমিতিকে। উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত নীরব। আমার সহকর্মীরাও। শুধু জমিদার বাবু স্বয়ং তাঁর প্রশস্ত গোঁফের নিচে মুচকি হাসিতেছিলেন। আমার গোঁফ টোফ না থাকায় আমার দন্তবিকাশ সকলের চোখে পড়িতেছিল। কিন্তু আমার সে হাসির অর্থ বোঝা গেল অসাধারণ সাফল্যে। এই ভদ্রলোক জীবনে এক সংগে দশ টাকা চাঁদা আর কোনও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে দেন নাই।

যথারীতি রশিদ দিয়া অতিরিক্ত নুইয়া ভদ্রলোককে আদাব দিয়া আমরা বাহির হইয়া আসিলাম। রাস্তায় নামিয়াই সহকর্মীরা আমাকে ধরিলেন : ‘ব্যাপারটা কি? তেলের দাম নিয়া কি ম্যাজিকী কথা বলিলেন, আর অমন কৃপণ ভদ্রলোক দিয়া দিলেন দশটা টাকা?’ জবাবে আমি বন্ধুদের দৃষ্টি ভদ্রলোকের কথিত বাঁশের দিকে আকর্ষণ করিলাম এবং ওকাজে তেল ব্যবহারের উপকারিতা বর্ণনা করিলাম। এতক্ষণে বন্ধুরা রসিকতাটার মর্ম বুঝিতে পারিলেন। হো হো করিয়া রাস্তার মধ্যেই এ-ওর ঘাড়ে পড়িতে লাগিলেন।

রসিকতাটা কড়ুয়া বলিয়াই বোধ হয় শহরের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। মহারাজার সংগে দেখা করিয়াই বুঝিলাম তাঁর কানেও পৌঁছিয়াছে। আমাকে দেখিয়াই মহারাজা বলিয়া উঠিলেন? কি আমার কাছে তেলের দাম আদায় করতে আসছ নাকি? ডাঃ সেন হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। আমরা দুজনেও উচ্চস্বরে হাসিয়া উঠিলাম। কাজেই আমার জবাব দেওয়ার দরকার হইল না। পরে বুঝিয়াছিলাম কথাটা চাপা দেওয়ার জন্যই ডাঃ সেন অতজোরে হাসিয়াছিলেন। যাহোক, ডাঃ সেনের যুক্তিতে মহারাজা মাতিলেন। পরদিন হইতে অসংখ্য লোক লাগিয়া গেল। বন-বাদাড় নালা-ডুবা আট হইয়া গেল। পাঁচ-ছয় মাস পরে সেখানে অসংখ্য আলোক-মালা সজ্জিত প্যাণ্ডালে-স্টলে হাজার-হাজার লোকের দিনরাত ব্যাপী সমাবেশ হইল।

৫. নবাব ফারুকী ও নলিনী বাবুর সহায়তা

অন্য একটি ঘটনায় ময়মনসিংহ প্রজা সম্মিলনীর অধিবেশনে চাঞ্চল্য এবং দর্শকের সমাবেশে বিস্ময়কর প্রাচুর্য ঘটিয়াছিল। সম্মিলনীর নির্ধারিত তারিখের মাত্র পাঁচ-ছয় দিন আগে বিশ্বস্ত লোকের মারফত খবর পাইলাম, জিলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ ডাউ প্রজা সম্মিলনীর উপর ১৪৪ ধারা জারির আদেশ দিয়াছেন। নেতৃস্থানীয় আমাদের কয়েকজনের নামে নোটিশ লেখা হইতেছে। দুই-একদিনের মধ্যেই জারি হইবে। সংবাদদাতাদের অবিশ্বাস করিবার বা তাঁদের খবরে সন্দেহ করিবার কোনও কারণ ছিল না। কাজেই বুঝিলাম বিপদ অনিবার্য। কিন্তু নিশ্চিত আসন্ন বিপদে মূষড়াইয়া পড়িলাম না। নিছক উৎপ্রেরণামে কাউকে কিছু না বলিয়া আমি কলিকাতা চলিয়া গেলাম। কৃষিমন্ত্রী অনারেবল নবাব কে. জি, এম. ফারুকীকে প্রজা সম্মিলনী উদ্বোধন করিতে ও শ্রীযুক্ত নলিনী রঞ্জন সরকারকে প্রদর্শনী উদ্বোধন করিতে রাযী করিলাম। এসব করিবার পর হক সাহেব, ডাঃ সেনগুপ্ত, মৌঃ মুজিবুর রহমান প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের সহিত দেখা করিলাম এবং সমস্ত অবস্থা বিবৃত করিলাম। একমাত্র মৌঃ মুজিবুর রহমান সাহেব নলিনী বাবু সম্পর্কে কিছুটা আপত্তি করিলেন। সমস্ত অবস্থা শুনিয়া ও বিবেচনা করিয়া শেষ পর্যন্ত তিনিও মন্দের ভাল হিসাবে আমার কাজ অনুমোদন করিলেন।

আমি উদ্বোধনী ভাষণ লিখিয়া দিব এই শর্তে নবাব ফারুকী সম্মিলন উদ্বোধন করিতে রাযী হইয়াছিলেন। অমন বিপদে আমি যে কোনও পরিশ্রমের শর্তে রাযী হইতাম। প্রতিদানে শুধু সেই দিনই জিলা ম্যাজিস্ট্রেটকে টেলিগ্রাম করিয়া তাঁর প্রজা সম্মিলনী উদ্বোধন করার সংবাদটা জানাইয়া দিতে অনুরোধ করিলাম। তিনি তৎক্ষণাৎ তা করিলেন। প্রাইভেট সেক্রেটারির মুসাবিদা করা টেলিগ্রামের শেষে তিনি নিজে হইতে যোগ করিলেন? সম্মিলনী যাতে সাফল্যমণ্ডিত হয় সে দিকে ন্যর রাখুন। আমিও নিশ্চিত হইয়া ফারুকী সাহেবের উদ্বোধনী বক্তৃতা মুসাবিদায় বসিয়া গেলাম। সে রাত্র আমি ফারুকী সাহেবের মেহমান থাকিলাম। অনেক রাত-তক খাঁটিয়া অভিভাষণ লেখা শেষ করিলাম। পরদিন সকালে তাঁকে পড়িয়া শুনাইলাম। তিনি খুশী হইয়া ওটা সেইদিনই ছাপা শেষ করিবার হুকুম দিলেন এবং আমাকে আরেকদিন থাকিয়া যাইতে অনুরোধ করিলেন। আমিও তাঁর অনুরোধ ফেলতে পারিলাম না। রাত্রে খাওয়ার পর তিনি খানা-কামরা হইতে সকলকে বাহির করিয়া দিলেন। দরজা বন্ধু করিলেন। তারপর পকেট হইতে ছাপা ভাষণটি বাহির করিয়া বলিলেন: এটা কিভাবে পড়িতে হইবে আমাকে শিখাইয়া দেন।

আমি তাই করিলাম। অনেক রাত ধরিয়া একাজ চলিল। আমি উচ্চস্বরে নাটকীয় ভংগিতে দুই-একবার পড়িয়া নবাব সাহেবকে ঠিক ঐভাবে পড়িতে বলিলাম। কোথায় হাত নাড়িতে হইবে, কোথায় শুধু ডান হাতের শাহা আংগুল তুলিতে হইবে, কোথায় সুর উদারা মুদারা তারায় উঠানামা করিবে, সব শিখাইলাম। নবাব সাহেব বাংলা পড়ায় খুব অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু অসাধারণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, এডাল্ট করিবার অসামান্য ক্ষমতা ও কাও-জ্ঞান ছিল তাঁর প্রচুর। গলার আওয়াযটিও মিঠা ও বুলন্দ। সুতরাং দুই-তিন ঘন্টার চেষ্টায় তিনি এমন সুন্দর আবৃত্তিও করিলেন যে আমি বিশিত হইলাম। ডিনার টেবিলে দাঁড় করাইয়া রিহার্সাল দেওয়াইলাম। শেষে বলিলামঃ পরীক্ষায় পাশ।

পরদিনই আমি ময়মনসিংহে ফিরিয়া আসিলাম। প্যাণ্ডলে অভ্যর্থনা সমিতির কর্মকর্তাদের সাথে দেখা। সকলের মুখে হাসি। কর্ম-তৎপরতা দ্বিগুণিত। তাঁরা জানাইলেন, আমার আকস্মিক আত্মগোপনে সকলেই ঘাবড়াইয়া গিয়াছিলেন। ১৪৪ ধারার খবরে আকাশ-বাতাস ছাইয়া গিয়াছিল। প্যাণ্ডলে লোকজনের যাতায়াত কমিয়া গিয়াছিল। একদিন সকল কাজ বন্ধ ছিল। কিন্তু পরদিনই জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট তাঁরা জানিতে পারেন নবাব ফারুকী সম্মিলনী উদ্বোধন করিতে আসিতেছেন। ডি. এম, আরও জানান যে, তিনি সকল প্রকারে সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছেন। তখন তাঁরা বুঝিতে পারেন আমি আত্মগোপন করিয়া কোথায় গিয়াছি।

. স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে সাফল্য

এইভাবে শত্রুদের মুখে ছাই দিয়া বিপুল সাফল্যের সঙ্গে প্রজা সম্মিলনীর কাজ সমাধা হইল। হক সাহেবের অভিভাষণ, নবাব ফারুকীর উদ্বোধনী ভাষণ, ডাঃ সেনগুপ্তের সারগর্ভ অভ্যর্থনা ভাষণ, শহীদ সুহরাওয়াদী ও মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদের বক্তৃতা এবং প্রদর্শনীর উদ্বোধনীতে নলিনী বাবুর ভাষণ সকল দিক দিয়া তথ্যপূর্ণ ও জনপ্রিয় হইয়াছিল। এই সম্মিলনীর ফলে সারা বাংলায় প্রজা-আন্দোলনের জয়যাত্রা শুরু হইল। বিশেষ করিয়া এ জিলার প্রজা-সমিতি একটা বিপুল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইল। অবসরপ্রাপ্ত ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবদুল মজিদ ও নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলীর অর্থ-সাহায্যে জিলা কৃষক-প্রজা সমিতির ‘মিলন প্রেস’ নামক ছাপাখানা ও ‘চাষী’ নামক সাপ্তাহিক কাগয বাহির হইল।

এই সময় জিলার সর্বত্র লোক্যাল বোর্ড ও জিলাবোর্ডের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পার্টি হিসাবে প্রজা-সমিতি সমস্ত লোকাল বোর্ডে প্রার্থী খাড়া করে। গোটা জিলার ৭২টি আসনের মধ্যে প্রজা-সমিতি ৬৪টি আসন দখল করে। তৎকালে লোক্যাল বোর্ডের নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে জিলা বোর্ডের মেম্বর নির্বাচিত হইতেন। এই নির্বাচনেও প্রজা-সমিতি জয়লাভ করে। জিলা বোর্ড প্রজা-সমিতির হাতে আসে। কিন্তু আমার একটা ভুলে সব ভণ্ডুল হইয়া যায়। জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান কে হইবেন, সেটা ঠিক করিতে বোর্ডের নবনির্বাচিত মেম্বরদের মত নেওয়া আমার উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি তা করিলাম না। পার্লামেন্টারী রাজনীতিতে তখন আমার বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা ছিল না। আমি কংগ্রেসে প্রাপ্ত ডিসিপ্লিন-বোধ হইতে সরলভাবে মনে করিলাম, প্রজা-সমিতির টিকিটে যখন মেম্বাররা নির্বাচিত হইয়াছেন, তখন প্রজা সমিতির নির্দেশই তাঁরা বিনা-আপত্তিতে মানিয়া লইবেন। এটা ছিল আমার নির্বুদ্ধিতা। প্রজা-সমিতি তখন নবজাতশিও। প্রাচীন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানেও অতটা। অন্ধ আনুগত্য আশা করা যাইতে পারে না। তাছাড়া যাঁরা নির্বাচিত হইলেন, তাঁরা নাবালক শিশু নন। জিলা বোর্ড শাসনে কার কি অভিজ্ঞতা আছে ও থাকা দরকার, এটা তাঁরা যেমন জানেন আমি বা প্রজা-সমিতির অনেকেই তা জানেন না। কাজেই চেয়ারম্যানের জন্য তোক বাছাই-এ তাঁদের মতামতের মূল্য খুব বেশি। কিন্তু অনভিজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাহেতু আমি তাঁদের জিজ্ঞাসা না করিয়া ওয়াকিং কমিটি দ্বারা এই বাছাই করাইলাম। অবসরপ্রাপ্ত ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মৌঃ আবদুল মজিদ সাহেবকে। ওয়ার্কিং কমিটি, চেয়ারম্যানির নমিনেশন দিল। মেম্বররা স্বভাবতঃই অসন্তুষ্ট হইলেন। প্রজা-সমিতির নির্দেশ অমান্য করিয়া নূরুল আমিন সাহেব নিজে প্রার্থী হইলেন ও অধিকাংশের ভোটে নির্বাচিত হইলেন। নির্বাচিত হইবার পর অবশ্য নুরুল আমিন। সাহেব ঘোষণা করিলেন যে তিনি এখনও প্রজা-সমিতির প্রতিনিধি আছেন ও থাকিবেন এবং জিলা বোর্ডে প্রজা-সমিতির নীতি কার্যকরী করিবেন। অনেক দিন তক তিনি করিলেনও তাই। কিন্তু জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচনে জিলা প্ৰজা সমিতির নেতৃত্বে যে ভাংগন ধরিয়াছিল, সেটা আর জোড়া লাগে নাই। তবু প্রজা আন্দোলন তার নিজের জোরেই অগ্রসর হইতেছিল। জিলা বোর্ড লইয়া নেতৃত্বের মধ্যে ঝগড়া হইলেও সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তার ছোঁয়া লাগে নাই। অর্থনৈতিক কর্ম পন্থার দরুন ছাত্র সমাজে প্রজা-সমিতির সমর্থক যে দল দ্রুত গড়িয়া উঠিতেছিল, তাদের মধ্যেও বিন্দুমাত্র নিরুৎসাহ দেখা দেয় নাই।

৭. প্রজা-জমিদারে আপোসের অভিনব চেষ্টা

প্রজা আন্দোলনের দুর্নিবার গতি ও অদূর ভবিষ্যতে এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এই সময় ময়মনসিংহের, তথা সারা বাঙলার জমিদারদের মনে একটা সন্ত্রাস সৃষ্টি করিয়াছিল। প্রমাণস্বরূপ তিনটি মাত্র ঘটনার উল্লেখ করিব? প্রথমতঃ, জমিদার সভার পক্ষ হইতে প্রজা-সমিতির সহিত আপোস-রফা করিবার প্রস্তাব আসে এই সময়। কংগ্রেস নেতা শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, এবং জিন্ন সাহেবের ইনডিপেটে পার্টির ডিপুটি লিভার কালীপুরের জমিদার শ্রীযুক্ত ধীরেন্দ্র কান্ত লাহিড়ী এই ব্যাপারে উদ্যোগী হন। মহারাজা শশিকান্তের শশীলজে জিলা প্ৰজা-সমিতি ও জিলা জমিদার সভার নেতৃবৃন্দের মধ্যে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা হয়। খাযনার হার, বকেয়া খানা মাফ, নযরসেলামী ও মাথট-আওয়াব লইয়াও বিস্তারিত আলোচনা হয়। কিন্তু সেটা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। প্রজা আন্দোলনের ইতিহাসের ভুলিয়া-যাওয়া বুদ্বুদ হিসাবে। যার মূল্য আছে, সেটা হইতেছে আমাদের পক্ষ হইতে একটা অভিনব প্রস্তাব। প্রস্তাবটি ছিল এই লক্ষ টাকা বা তদূর্ধ আয়ের সমস্ত জমিদারিকে এক-একটি স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটে পরিণত করিতে হইবে। প্রজাসাধারণের ভোটে একটি কাউন্সিল নির্বাচিত হইবে। সেই কাউন্সিল নিজেদের ভোটে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করিবে। একটি মন্ত্রিসভাই জমিদারি চালাইবে। জমিদার মন্ত্রিসভার কাজে হস্তক্ষেপ করিতে পারিবেন না। ইংল্যাণ্ডের রাজার মত তিনি নিয়মতান্ত্রিক হেড়-অ-দি-স্টেট থাকিবেন। জমিদারের ব্যক্তিগত খরচের জন্য প্রিতি পার্স রূপে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কনস্টিটিউশনে বরাদ্দ থাকিবে। উহা ননভোটেবল থাকিবে; অর্থাৎ কাউন্সিল উহা কমাইতে পারিবে না। এক লক্ষ টাকার মত আয়ের জমিদারিগুলি নিজেরা একত্র হইয়া লক্ষ টাকার উপরে উঠিবে; অথবা পার্শ্ববর্তী বড় জমিদারির শামিল হইবে। প্রস্তাবটি অদ্ভুত ও অভিনব হইলেও জমিদার পক্ষ এক কথায় উহা উড়াইয়া দেন নাই। বরঞ্চ তাঁদের একজন উৎসাহের সংগে উহা বিবেচনা করিতে এবং জমিদার সভার সাধারণ সভায় পেশ করিতে রাযী হইলেন।

কিন্তু একটি কথাতেই শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা ভাংগিয়া গেল। সে কথাটি এই যে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আপোস-রফার শর্তগুলো ময়মনসিংহ জিলাতেই সীমাবদ্ধ থাকিবে। যদি এখানে সফল হয় তবে দ্বিতীয় স্তরে বাংলার অন্যান্য জিলায় তা প্রয়োগ করা হইবে। এটা প্রজা-আন্দোলনে বিভেদ ও ভাংগন আনিবার দুরভিসন্ধি বলিয়া আমরা সন্দেহ করিলাম। তাই এদিকে আর অগ্রসর হইলাম না।

৮. দানবীর রাজা জগৎকশোর

দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে রাজা জগৎকিশোরের সঙ্গে। রাজা জগৎকিশোর এ জিলার জমিদারের মধ্যে বয়োজ্যষ্ঠ ছিলেন। তিনি নির্বিলাস, দানশীল ঋষিতুল্য ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর দানে বহু স্কুল-মাদ্রাসা, হাসপাতাল, এমনকি মসজিদ নির্মিত ও পরিচালিত হইয়াছে। প্রজা-আন্দোলনের চরম জনপ্রিয়তার দিনে তিনি আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। রাজা জগৎকিশোরকে আমি অন্তর দিয়া ভক্তি করিতাম। ‘বেনিভোলেন্ট মার্কি’কে যাঁরা প্রজাতন্ত্রের চেয়ে উৎকৃষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা মনে করেন, রাজা জগৎকিশোর তাঁদের জন্য লুফিয়া নিবার মত দৃষ্টান্ত ছিলেন। তিনি নির্বিলাস সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করিতেন। দয়ালু বলিয়া তিনি প্রজাদের কাছে সুপরিচিত। ধর্ম ও দাঁতব্য কাজে তাঁর দান মোটা। সুতরাং নিজেকে ধার্মিক পরোপকারী বলিয়া অহংকার করিবার তাঁর অধিকার ছিল। কিন্তু সব সত্যিকার ধার্মিকের মতই তিনি নিরহংকার ছিলেন। তাই বলিয়া কেউ তাঁকে অত্যাচারী যালেম বলিবে এটাও তিনি আশা করিতে পারেন নাই। জীবনে বোধ হয় আমার কাছেই তিনি একথা শুনেন এবং মর্মাহত হন। আমি তাঁর সাথে দেখা করিতে গেলে আগে তিনি আমাকে তাঁর মর্যাদা-মাফিক জলযোগ করাইলেন। কোন প্রকার আত্ম-প্রশংসা না করিয়াও বলিলেন তার সারমর্ম এই : সব জমিদার যেমন ভাল নয়, তেমনি সব জমিদারই খারাপ নয়। দরিদ্র নারায়ণের সেবাই সব ধনী মানুষের কর্তব্য এবং জমিদারদের মধ্যেও এ সম্পর্কে সচেতন সকলে না হইলেও কিছু লোক আছেন, অতএব প্রজা-সমিতি সব জমিদারকে এক কাতারে দাঁড় করাইয়া জমিদারের প্রতি অন্যায় এবং দেশের অনিষ্ট করিতেছে। তাঁর সুরে সুস্পষ্ট আন্তরিকতা ফুটিয়া উঠিল। আমি জবাবে রাজা বাহাদুরকে ব্যক্তিগতভাবে প্রশংসা করিয়া যা বলিলাম তার সারমর্ম এই ও দরিদ্র-নারায়ণের সেবা করা পুণ্য কাজ। এই পুণ্য-কাজ করিয়াই ধার্মিক জমিদাররা স্বর্গে যাইতে পারেন। দরিদ্র-নারায়ণ না থাকিলে সেবা করিবেন কার? কাজেই দেশে দরিদ্র-নারায়ণ থাকা দরকার। যথেষ্ট দরিদ্র না থাকিলে দেদার আর্থিক শোষণের দ্বারা তা সৃষ্ট করা অত্যাবশ্যক। আপনারা তাই করিতেছেন। যেমন ধরুন, রোগীর সুষা পুণ্য কাজ। অথচ চোখের সামনে কোন রোগী না থাকায় আর্তের সেবা-সুষার মত পুণ্য কাজ হইতে আমি বঞ্চিত। আমি পরম ধার্মিক লোক। কাজেই একটা সুস্থ লোকের পিঠে দায়ের আঘাতে একটা ঘা করিলাম। সে ঘায়ে ক্ষার-নুন দিয়া ঘাটা পচাইলাম। নালি হইল। লোকটা শয্যাশায়ী হইল। সে মরে আর কি? আমি তখন তার সেবা-শুশ্রূষা করিতে বসিলাম। দিন-রাত আহার-নিদ্রা ভুলিয়া তার সেবা করিলাম। বলেন কর্তা, আমি স্বর্গ পাইবনা?

রাজা বাহাদুর স্তষ্টিত হইলেন। আমি তথ্য-বৃত্তান্ত দিয়া এই দৃষ্টান্তের সংগে জমিদারি প্রথার হুবহু মিল দেখাইলাম। আশি বৎসরের এই মহানহৃদয় বৃদ্ধের চোখ কপালে উঠিল। তিনি ধরা গলায় মৃদু সুরে বলিতে লাগিলেন : কি বলিলে? আমরা সেবার জন্য দরিদ্র-নারায়ণ সৃষ্টি করিতেছি? সুষা করিয়া পূণ্য লাভের আশায় সুস্থ লোককে আঘাত করিয়া রোগী বানাইতেছি?

এ কথাগুলি আমার নিকট রাজা বাহাদুরের প্রশ্ন ছিল না। এগুলো ছিল তাঁর আত্ম-জিজ্ঞাসা, স্বগত উক্তি। চোখও তীর আমার দিকে ছিল না। তবু আমি এ সুযোগ হেলায় হারাইলাম না। আমি বলিলাম : জি-হাঁ কর্তা, অবস্থা ঠিক তাই।

তিনি আমার কথা শুনিলেন না বোধ হয়। কারণ এ বিষয়ে আর কোন কথা বলিলেন না। স্বগত উক্তি বন্ধ করিয়া তিনি আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন : মনসুর, আমার মনটা খুবই খারাপ হইয়া গেল। কিন্তু এ জন্য তোমাদের দোষ দেই না। বরঞ্চ তুমি আমার চোখের সামনে চিন্তার একটা নূতন দিক খুলিয়া দিয়াছ। আজ তুমি যাও, আরেক দিন তোমার সংগে আলোচনা করিব।

আর তিনি আমাকে ডাকেন নাই।

৯. গোলকপুরের জমিদার

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটিয়াছিল এরও অনেক পরে ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর কি ১৯৩৭ সালের জানুয়ারি মাসে। ঈশ্বরগঞ্জ থানার জারিয়া হাই স্কুলের খেলার মাঠে নির্বাচনী সভা। তখন আসন্ন সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষ করিয়া দেশ তাতিয়া উঠিয়াছে। প্রতিদ্বন্দিতাও আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরীর মত গরিব প্রজা-কর্মী ও খান বাহাদুর নূরুল আমিনের মত প্রভাবশালী লোকের মধ্যে। কাজেই বিরাট জনতা হইয়াছে। হঠাৎ জনতার মধ্যে চাঞ্চল্য পড়িয়া গেল। গোলকপুরের জমিদার শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী সতায় আসিয়াছেন। আমি সভাপতি। মঞ্চের উপর জমিদার বাবুর বসিবার ব্যবস্থা করিলাম। তিনি সভায় দু’চার কথা বলিতে চাহিলেন। আমি সভায় সে কথা ঘোষণা করিয়া জমিদার বাবুকে আহ্বান করিলাম। তিনি অল্প কথায় বক্তৃতা শেষ করিলেন। দেখা গেল, তিনি মহাত্মা গান্ধীর একজন ভক্ত এবং নিজে সাধু প্রকৃতির অতিশয় বিনয়ী ভদ্রলোক।

তিনি বলিলেন: ‘এ জিলার প্রজা-আন্দোলনের নেতা মনসুর সাহেব প্রাতঃ স্মরণীয় নমস্য ব্যক্তি’ বলিয়া জোড়-হাত নত মস্তকে ঠেকাইলেন। আমার প্রাতঃস্মরণীয় হওয়ার কারণও তিনি সংগে সংগেই দেখাইলেন। বলিলেন : ‘কারণ তিনি মহাত্মা গান্ধীর একজন অনুরক্ত অনুসারী লোক।‘ অপাত্রে এমন উচ্চ প্রশংসার কারণও সংগে সংগেই সুস্পষ্ট হইয়া গেল। তিনি বলিলেন : ‘অথচ এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে মনসুর সাহেব অহিংসায় বিশ্বাসী হইয়াও তিনি জমিদারদিগকে ঘৃণা করিয়া থাকেন। এখানে তিনি রাজা জগৎকিশোরের মতই বলিলেন : সব জমিদারকে ঘৃণা করা উচিৎনয়। কারণ সব জমিদারই খারাপ নয়।‘

জমিদার বাবু মহাত্মা গান্ধীর নাম করায় তাঁর কথার জবাব দেওয়া আমার পক্ষে খুবই সহজ হইল। আমি তাঁর ভদ্রতার প্রতিদানে ভদ্রতা করিয়া আমার বক্তৃতার শুরুতেই বলিলাম : মহাত্মাজীকে ইংরাজরা যেমন ভুল বুঝিয়াছিল, আমাকেও জমিদার বাবু তেমনি ভুল বুঝিয়াছেন। মহাত্মাজী ইংরাজের অভিযোগের উত্তরে বলিয়াছিলেন : আমি ইংরাজ জাতিকে ঘৃণা করি না। ইংরাজ সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃণা করি। ইংরাজ জাতির মধ্যে আমার শ্রদ্ধেয় বহু ব্যক্তি আছেন। আমিও মহাত্মাজীর ভাষা নকল করিয়া বলিতেছি : আমি জমিদারদেরে ঘৃণা করি না। জমিদারি প্রথাকেই ঘৃণা করি। বস্তুতঃ জমিদাদের মধ্যে আমার শ্রদ্ধেয় বহু ব্যক্তি আছেন, দাঁতব্য কাজে যাঁদের দান অতুলনীয়। আমরা শুধু জমিদারি প্রথাটারই ধ্বংস চাই। ব্যক্তিগতভাবে জমিদারদের ধ্বংস চাই না। এই প্রথার বিরুদ্ধেই যে আমাদের সংগ্রাম, এই কুপ্রথা যে ধনীকে দরিদ্র এবং ভাল মানুষকে খারাপ করিতেছে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতে তা বর্ণনা করিলাম। যে আমি জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে আশৈশব সংগ্রাম করিয়া আসিতেছি সেই আমিই যে জমিদারি-প্রথার চাপে খারাপ হইয়া গিয়াছিলাম, সে অপরাধ সরলভাবে স্বীকার করিলাম। এক জমিদারের দুই শরিকের মামলায় আমি কোর্টের দ্বারা সেই জমিদারির রিসিভার নিযুক্ত হইয়াছিলাম। জমিদারদের পক্ষ হইতে তাদের জমিদারি পরিচালন করিতে গিয়া ছয় মাসের মধ্যে আমি বুনিয়াদী জমিদারদের চেয়েও অত্যাচারী জমিদার হইয়া গিয়াছিলাম। এক মহালের খায়না আদায়ের জন্য শেষ পর্যন্ত আমি পুলিশের সহায়তা চাহিয়াছিলাম। জিল প্রজা-সমিতির সেক্রেটারি প্রজাদের বকেয়া খাযনা আদায়ের জন্য পুলিশের সাহায্য চাওয়ায় জিলা ম্যাজিস্ট্রেট ও এস, পি, তা হাসিয়াই খুন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা আমাকে ও-কাজে বিরত করিয়াছিলেন। নইলে কি যে কাণ্ডটা হইয়া যাইত, সে দুশ্চিন্তা ঐ সভার মধ্যেই প্রকাশ করিলাম। উপসংহারে বলিলাম : যে প্রথা আমার মতবিরোধী লোককে অত্যাচারী বানাইয়াছিল ছয় মাসে, দেড় শ’ বৎসরে ঐ প্রথা আপনাদের কতখানি অত্যাচারী বানাইয়াছে তা আপনিই বিচার করুন। সভায় হাসির হুল্লোড় পড়িয়া গেল। জমিদার বাবুও হাসিলেন। আমার কথা তার মনে এমন দাগ কাটিয়াছিল যে তিনি বীরেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী ও শৈলেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী নামক তাঁর দুই গ্র্যাজুয়েট ছেলেকে প্রজা-কমী হিসাবে গ্রহণ করিতে আমাকে অনুরোধ করিলেন। জমিদার পুত্রকে প্রজা-সমিতিতে গ্রহণ করার সম্ভাব্য আপত্তির বিরুদ্ধে তিনি নবাবযাদা হাসান আলীর নযির দিলেন। আমি নানা। যুক্তি ও দৃষ্টান্ত দিয়া উভয়ের পার্থক্য দেখাইলাম এবং শর্তাদি আরোপ করিলাম। শেষ পর্যন্ত তাঁরা প্রজা সমিতিতে যোগ দেন নাই।

০৮. আইন পরিষদে প্রজা পার্টি

আইন পরিষদে প্রজা পার্টি
আটই অধ্যায়

১. প্রজা-সমিতির নাম পরিবর্তন

ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত প্রজা সম্মিলনীর সময় হইতেই নিখিল-বংগ প্রজা সমিতির সেক্রেটারি মওলানা মোহাম্মদ আম খাঁ প্রজা-সমিতির কাজে নিরুৎসাহ হইয়া পড়েন। কিন্তু সমিতির সহকারী সেক্রেটারি সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদীর সহকারী সম্পাদক মৌঃ নযির আহম্মদ চৌধুরী পূর্বের মতই উৎসাহের সাথে সমিতির কাজ চালাইয়া যাইতে লাগিলেন। সার আবদুর রহিমের স্থলে সমিতির স্থায়ী সভাপতি নির্বাচনের জন্য ময়মনসিংহ সম্মিলনীর কিছুদিন পরেই মোহদী’ অফিসে কাউন্সিলের অধিবেশন দওয়া হইল। মওলানা সাহেবের সকল প্রকার বিরুদ্ধতা ঠেলিয়া আমরা হক সাহেবকে সভাপতি নির্বাচন করিতে সমর্থ হইলাম। মওলানা সাহেব অধিকতর নিরুৎসাহ এমনকি অসহযোগী হইয়া পড়িলেন।

নিখিল-বংগ প্রজা সম্মিলনীর পরবর্তী অধিবেশন ঢাকায় হইবে, মনমনসিংহ বৈঠকেই তা স্থির হইয়াছিল। ১৩৩৬ সালে এপ্রিল মাসে এই সম্মিলনীর অধিবেশন বসিল। বিখ্যাত দন্ত-চিকিত্সক ডাঃ আর, আহমদ অভ্যর্থনা সমিতির চেয়ারম্যান, ঢাকা বারের বিখ্যাত উকিল মৌঃ নঈমুদ্দিন আহমদ অভ্যর্থনা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি, চৌধুরী গোলাম কবির, মৌঃ রেযায়ে করিম, মির্যা আব্দুল কাদির (কাদির সরকার), ‘আমান’-সম্পাদক মৌঃ তফাযল হোসেন, খ্যাতনামা মোখতার সৈয়দ আবদুর রহিম অভ্যর্থনা সমিতির বিভিন্ন পদ অলংকৃত করেন। খান বাহাদুর আবদুল মোমিন ও মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের দল প্রতিযোগিতা না করায় এবারও জনাব ফলকেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্মিলনীর সভাপতি নির্বাচিত হন।

এই সম্মিলনী ছিল মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক জীবনেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে প্রাদেশিক আইনপরিষদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল আসন্ন। কার্যকরী সমিতির নির্দেশে আমি সম্মিলনীর বিবেচনার জন্য একটি ইলেকশন মেনিফেস্টো আগেই রচনা করিয়াছিলাম। জিন্না সাহেবের চৌদ্দ দফার নামানুকরণে আমি প্রজা পার্টির দাবিগুলোকে টানিয়া-খেচিয়া চৌদ্দতে স্ফীত-সীমিত করিয়া উহার নাম দিয়াছিলাম ‘প্রজা সমিতির চৌদ্দ দফা।‘ সেই মেনিফেস্টোতে বিনা-ক্ষতি পূরণে জমিদারি উচ্ছেদ, খাযনার নিরিখ হ্রাস, নয়র-সেলামি রহিতকরণ, খাযনা-ঋণ মওকুফ, মহাজনী আইন প্রণয়ন, সালিশী বোর্ড গঠন, হাজা-মজা নদী সংস্কার, প্রতি থানায় হাসপাতাল স্থাপন, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক বাধ্যতামূলক করণ, বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, শাসন ব্যয় হ্রাসকরণ, মন্ত্রি-বেতন এক হাজার টাকা নির্ধারণ ও রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি প্রভৃতি বিভিন্ন দাবি লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল। এই সম্মিলনীতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছিল। কুমিল্লা ও নোয়াখালী জিলার প্রজা-আন্দোলন কৃষক-আন্দোলন নামেই পরিচত ছিল। বাংলার আর সব জিলাতেই উহার নাম ছিল প্রজা-আন্দোলন। নির্বাচনের মুখে প্রজা-সমিতিকে ঐক্যবদ্ধ করা আবশ্যক বিবেচিত হওয়ায় সকল মতের কর্মীদের সমন্বয় বিধান করা হয় সমিতির নাম কৃষক-প্রজা সমিতি করিয়া। মেনিফেস্টোও কৃষক-প্রজার চৌদ্দ দফা নামে পরিচিত হয়। অসুস্থতা সত্ত্বেও সম্মিলনীর প্রধান প্রস্তাব মেইন রেযুলিউশন আমাকেই মুভ করিতে হয়। সকল জিলার নেতৃবৃন্দ ঐ প্রস্তাবের সমর্থনে বক্তৃতা করেন। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে সম্মিলনীর কাজ শেষ হয়।

২. মুসলিম ঐক্যের চেষ্টা

সমিতির নাম কৃষক-প্রজা হওয়ার সুযোগ লইয়া খান বাহাদুর মোমিন ও মওলানা আকরম খাঁর দলের কতিপয় নেতা। পূর্ব নামে সমিতি চালাইবার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হন। অল্পদিন পরেই নবাব হবিবুল্লার নেতৃত্বে কলিকাতায় ‘ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি’ গঠন করা হয়। জনাব শহীদ সুহরাওয়ার্দী ঐ পার্টিতে যোগদান করেন। খান বাহাদুর আবদুল মোমিন ও মৌঃ তমিয়ুদ্দিন খাঁ আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ পার্টিতে যোগ না দিলেও এবং কাগজে-কলমে কৃষক-প্রজা সমিতিতে কৃষক-প্রজা সমিতির সহিত সক্রিয় সম্পর্ক রাখিলেন না। মওলানা আকরম খাঁর স্থলে মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ সমিতির সেক্রেটারি নির্বাচিত হইলেন।

‘ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি’ নামক এই নয়া সংস্থায় মুসলিম বাংলার সব নাইট নবাব ও জমিদার সওদাগররা সংঘবদ্ধ হইলেন এবং পার্টি কণ্ডে পাঁচ-সাত জন বড় লোকের প্রত্যেকে দশ হাজার টাকা করিয়া চাঁদা দিয়াছেন বলিয়া খবরের কাগযে ঘোষণা করিলেন। ইহাতে আমরা কৃষক-প্রজা কর্মীরা একটু চঞ্চল হইয়া উঠিলাম। এই সময় ডাঃ আর, আহমদ, মিঃ আব্দুর রহমান সিদ্দিকী ও মিঃ হাসান ইসপাহানির, নেতৃত্বে ‘নিউ মুসলিম মজলিস’ নামে কলিকাতায় প্রগতিবাদী মুসলিম তরুণদের একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। মুসলমান নাইট-নবাব খান বাহাদুরদেরে সংঘবদ্ধ হইতে দেখিয়া এরাও একটু চিন্তাযুক্ত হইলেন। প্রতিকার কি করা যায়, এই লইয়া ইহাদের সাথে আমাদের কথাবার্তা চলিতে থাকে। ইতিমধ্যে নবাব হবিবুল্ল বাহাদুরের হাংগারফোর্ড স্ট্রিটের বাড়িতে ‘ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির’ নেতারা কৃষক-প্রজা সমিতির সহিত একটি আপোস-রফার বৈঠক আহবান করেন। প্রজা-সমিতির বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা (যথা মৌঃ ফযলুল হক, মৌঃ আব্দুল করিম, মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী) উক্ত সভায় গেলেন না। তাঁদের বদলে মৌঃ তমিযুদ্দিন খাঁ, মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ, মৌঃ আশরাফুদ্দিন চৌধুরী ও আমাকে পাঠাইলেন। সেখানে কর্মপন্থা নিয়া বিশেষ বিরোধ হইল না। কিন্তু পার্টি লিডার লইয়া আপোস-আলোচনা ভাংগিয়া গেল। আমরা চাইলাম হক সাহেবকে লিডার করিতে, তাঁরা চাইলেন নবাব হবিবুল্লাকে। মুসলমানদের নেতা মানেই এবার বাংলার প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং কোনও দলই নরম হইলাম না। আলোচনা ভাংগিয়া গেল। নেতৃত্বের ইশুতে আলোচনা ভাংগিয়া দেওয়ার ব্যাপারে মৌঃ তমিসুদ্দিন সাহেব আমাদের সংগে চলিয়া আসিলেন না। মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ যদিও মৌঃ তমিয়ুদ্দিনের মতের সমর্থক ছিলেন, অর্থাৎ নেতৃত্বের ইশুতে আলোচনা ভাংগিবার বিরোধী ছিলেন, তবু শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথে বাহির হইয়া আসেন।

কিন্তু যাঁর নেতৃত্বের জন্য আমরা এত গলদঘর্ম হইলাম তাঁর কাছে পুরস্কার পাইলাম তিরস্কার। বন্ধুবর আশরাফুদ্দিনই একাজে আমাদের নেতা ছিলেন। সুতরাং হাংগারফোর্ড স্ট্রিট হইতে বাহির হইয়া তিনি সোজা আমাদেরে ঝাউতলা রোড নিয়া গেলেন এবং হক সাহেবের নেতৃত্বের জন্য কি মরণপণ সংগ্রামটা করিলাম সবিস্তারে তার বর্ণনা করিলেন। জবাবে হক সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বলিলেন : দেখতেছি তোমরা আমার সর্বনাশ করবা। আমারে নেতা করবার কথা তোমাদেরে কে কইছিল? যেখানে মরহুম নবাব সলিমুল্লা বাহাদুরের সাহেবযাদা আছেন, সেখানে আমি লিডার হৈবার পারি? এমন অন্যায় দাবি কৈরা তোমরা আমার শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার চান্সটাও নষ্ট কৈরা দিলা? না, এসব ছেলেমি আমি মানবো না।

আমরা চোখ-চাওয়া-চাওয়ি করিলাম। আমি রসিকতা করিয়া বলিলাম। সার, আপনের একদিকে মুসলিম বেংগল ও অপরদিকে আহসান মনযিলের সংগ্রামটা আমরা ভুলতে পারি না। আশরাফুদ্দিন বলিলেন : ‘আপনে নিজে প্রধানমন্ত্রী হৈতে চান না, আমরা জানি। কিন্তু বাংলার কৃষক-প্রজারা চায় আপনেরেই তারার প্রধানমন্ত্রী রূপে। নবাব-সুবা প্রধানমন্ত্রী তারা চায় না। আপনেরে প্রধানমন্ত্রী করতে পারি কি না, তা আমরা দেখব। আপনে কথা কইতে পারবেন না। কাগজে বিবৃতিও দিতে পারবেন না। চুপ কৈরা থাকবেন।‘ হক সাহেব তাঁর অতি পরিচিত দুষ্টামিপূর্ণ হাসিটি হাসিলেন। আর কিছু বলিলেন না। অর্থাৎ তিনি রাযী হইলেন। ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির নেতারা আমাদের অসম্মতিকেই হক সাহেবের অসম্মতি ধরিয়া নিলেন। কৃষক-প্রজা পার্টি ও ইউনাইটেড পার্টির রেষারেষি চলিতে থাকিল।

. মিঃ জিন্নার সমর্থন লাভের চেষ্টা

১৯৩৪ সালের শেষ দিকে জিন্না সাহেব তাঁর লণ্ডনের স্বয়ং-নির্বাসন ত্যাগ করিয়া বোম্বাই আসেন। সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত হন। তাঁরই সমর্থনে সার আবদুর রহিম স্পিকার নির্বাচিত হন, সে কথা আগেই বলিয়াছি। ১৯৩৫ সালে তিনি মুসলিম লীগ পুনর্গঠনে মন দেন। পাঁচ বৎসর তিনি দেশে না থাকায় মুমলিম লীগ ইতিমধ্যে মৃত প্রায় হইয়া গিয়াছিল। এই সময় বংগীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ আমাদের দলের দখলে। মৌলবী মুজিবুর রহমান ইহার প্রেসিডেন্ট, ডাঃ আর, আহমদ সেক্রেটারি। আমার নিজের জিলার আমি উহার প্রেসিডেন্ট, উকিল মৌঃ আবদুস সোবহান এই সময় উহার সেক্রেটারি। এইভাবে মুসলিম লীগ তখনও আমাদের মত কং’গ্রেসী মুসলমানদেরই’ দখলে। কিন্তু আমরা সকলে প্ৰজা-আন্দোলন লইয়া এত ব্যস্ত যে মুসলিম লীগ সংগঠনের দিকে মন দিবার আমাদের সময়ই ছিল না। তবু আমরাই ছিলাম বাংলায় জিন্না নেতৃত্বের প্রতিনিধি।

আমাদের দলের ডাঃ আর. আহমদের সংগে কলিকাতার প্রভাবশালী তরুণ মুসলিম নেতা মিঃ হাসান ইস্পাহানি, তাঁর সহকর্মী আব্দুর রহমান সিদ্দিকী প্রভৃতির অন্তরংগতা ছিল অন্য দিক হইতে। তাঁরা এই সময় ‘নিউ মুসলিম মজলিস’ নামে একটি প্রগতিবাদী প্রতিষ্ঠান চালাইতেন। মিঃ হাসান ইস্পাহানি জিন্না সাহেবের একান্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। বাংলার পয়সাওয়ালা নাইট-নবাবদের সাথে টক্কর দিতে গেলে

আইন পরিষদে প্রজা পার্টি জিন্ন সাহেবের সমর্থন কাজে লাগিবে, এই সিদ্ধান্ত করিয়া মিঃ ইস্পাহানির মারফতে আমরা জিন্ন সাহেবকে দাওয়াত করিলাম। তিনি আসিলেন। ইস্পাহানিদের ৫নং ক্যামাক স্ট্রিটের বাড়িতে উঠিলেন। রাতে ডিনারের পরে আলোচনা শুরু হইল। মৌঃ ফযলুল হক, আবদুল করিম, মৌঃ সৈয়দ নওশের প্রভৃতি আমরা আট-দশজন ডিনারে আলোচনায় শরিক হইলাম।

আলোচনায় নীতিগতভাবে সকলে অতি সহজেই একমত হইলাম। মুসলমানদের একতাবদ্ধ হওয়া, নাইট-নবাবদের ধামাধরা রাজনীতি হইতে মুসলিম সমাজকে মুক্ত করা, সাম্প্রদায়িক ঐক্যের মধ্য দিয়া মুসলিম স্বার্থ রক্ষা করা ইত্যাদি ব্যাপারে কোনও মতভেদ দেখা দিল না। কিন্তু খুটিনাটি ব্যাপারে আস্তে আস্তে বিরোধ দেখা দিতে লাগিল। জিন্না সাহেব ইতিমধ্যে মুসলিম লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে নূতন গঠনতন্ত্র রচনা করিয়াছেন। তাতে মুসলিম ভারতের রাজনীতিক আদর্শ-উদ্দেশ্য সম্বন্ধে প্রগতিবাদী দাবি-দাওয়া লিপিবদ্ধ হইয়াছে। সেই আদর্শ-উদ্দেশ্যকে বুনিয়াদ করিয়া মুসলিম লীগ সর্বভারতীয় ভিত্তিতে নির্বাচন-সংগ্রাম পরিচালনা করিবে, জিন্না সাহেবের উদ্দেশ্য তাই। কাজেই আমরা বুঝিলাম, আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী হইতে বাধ্য। অতএব জিনা সাহেবের সহিত আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তৃত আলোচনা চালাইবার জন্য একটি প্রতিনিধি দল গঠন করা হইল। মৌঃ শামসুদ্দিন, মৌঃ আশরাফুদ্দিন, মৌঃ রেযায়ে করিম, নবাবযাদা হাসান আলী, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমি প্রতিনিধি দলের মের হইলাম। সৈয়দ নওশের আলী এই দলের লিডার হইলেন। সৈয়দ সাহেব দুই-একবার গিয়াই ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। আমরা যা করিব, তাতেই তাঁর মত আছে বলিয়া তিনি খসিয়া পড়িলেন। অতঃপর নেতাহীন অবস্থাতেই আমরা দিনের পর দিন আলোচনা চালাইয়া যাইতে থাকিলাম। ইতিমধ্যে আমরা আলবার্ট হলে এক জনসভার আয়োজন করিলাম। বক্তা এক জিন্না সাহেব। তিনি যুক্তিপূর্ণ সারগর্ভ বক্তৃতা করিলেন। তাতে তিনি ইংরাজের ধামাধরা তল্পিবাহক নাইট-নবাবদের কষিয়া গাল দিলেন এবং নেতৃত্ব হইতে তাহাদিগকে ঝাটাইয়া তাড়াইবার জন্য জনসাধারণকে উদাত্ত আহ্বান জানাইলেন। উপসংহারে তিনি প্রাণশশী ভাষায় বলিলেন : ‘লেট দি ক্রিম অব হিন্দু সোসাইটি বি অর্গেনাইযড় আন্ডার দি বেনার অব দি কংগ্রেস এও দি ক্রিম অব মুসলিম সোসাইটি আন্ডার দি বেনার অব দি মুসলিম লীগ। দেন লেট আস পুট আপ এ ইউনাইটেড ডিমান্ড ফর ইন্ডিপেন্ডেন্স অব আওয়ার ডিয়ার মাদারল্যান্ড। আওয়ার ডিমান্ড উইল বি ইররেফিস্টিবল।‘ কানফাটা করতালি ধ্বনি ও বিপুল উৎসাহের মধ্যে সভা ভংগ হইল।

৪. লীগ-প্ৰজা আপোস চেষ্টা

কিন্তু আলোচনা যতই দীর্ঘ হইতে লাগিল আমাদের উৎসাহ ও আশা ততই কমিতে লাগিল। জিন্না সাহেবের দাবি ছিল এই : (১) কৃষক-প্রজা সমিতিকে মুসলিম লীগের টিকিটে প্রার্থী বাড়া করিতে হইবে; (২) কৃষক-প্রজা পার্টির মেনিফেষ্টো হইতে জমিদারি উচ্ছেদ দাবি বাদ দিতে হইবে; (৩) পার্লামেন্টারী বোর্ডে কৃষক প্রজা পার্টির শতকরা ৪০ জন এবং মুসিলম লীগের শতকরা ৬০ জন প্রতিনিধি থাকিবেন; (৪) মুসলিম লীগের প্রতিনিধি জিন্না সাহেব নিজে মনোনীত করিবেন। তাঁর দাবির পক্ষে জিন্না সাহেব বলিবেন। গোটা ভারতের সর্বত্র একমাত্র মুসলিম লীগের টিকিটেই নির্বাচন চালাইতে হইবে। মুসলিমসংহতি প্রদর্শনের জন্য এটা দরকার। জমিদারি উচ্ছেদ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য এই যে ঐ দাবি বস্তুতঃ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাযেয়াফত করার দাবি। উহা মুসলিম লীগের মূলনীতি-বিরোধী। তিনি মুসলিম লীগের নয়া ছাপা গঠনতন্ত্রের ৭নং ধারা আমাদিগকে দেখাইলেন।

পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা সমিতির তরফ হইতে আমাদের দাবি ছিল? (১) কৃষক-প্রজা সমিতির টিকিটেই বাংলার নির্বাচন হইবে; তবে কেন্দ্রীয় পরিষদে কৃষকপ্রজা প্রতিনিধিরা মুসলিম লীগ পার্টির সদস্য হইবেন এবং নিখিল-ভারতীয় সমস্ত ব্যাপারে কৃষক-প্রজা সমিতি মুসলিম লীগের নীতি মানিয়া লইবে; (২) পার্লামেন্টারী বোর্ডে কৃষক-প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের প্রতিনিধি আধাআধি হইবে; (৩) মুসলিম লীগ প্রতিনিধিরাও কৃষক-প্রজা প্রতিনিধিদের মতই প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন। আমাদের দাবির পক্ষে যুক্তি ছিল এই ও বাংলার তফসিলী হিন্দুরা কৃষক-প্রজা পার্টির সমর্থক। মুসলিম লীগ টিকিটে নির্বাচন চালাইলে আমরা তাদের সমর্থন হারাই। জিন্না সাহেবের মনোনয়নের বিরুদ্ধে আমরা যুক্তি দিলাম যে পার্লামেন্টারি বোর্ডের মুসলিম লীগ প্রতিনিধিরা প্রাদেশিক লীগ ওয়ার্কিং কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত হইলে আমরা দেশের মুসলিম লীগ কর্মীদের পূর্ণ সহযোগিতা পাইব। পক্ষান্তরে নমিনেশনের পিছন দুয়ার দিয়া যদি কোনও অবাঞ্ছিত লোক পার্লামেন্টারি বোর্ডে স্থান পায় তবে কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও প্রার্থী নির্বাচনে গন্ডগোল দেখা দিবে।

জিন্না সাহেব আমাদের যুক্তি মানিলেন না। তিনি বলিলেন : কেন্দ্রীয় পরিষদে কৃষক-প্রজা প্রতিনিধির মুসলিম লীগ পার্টির যোগ দেওয়ার কথাটা বর্তমানে অর্থহীন, কারণ কেন্দ্রীয় পরিষদের নির্বাচন এখন হইতেছে না। তফসিলী হিন্দুদের সহযোগিতা সম্বন্ধে তিনি বলিলেন, স্বন্ত্র নির্বাচন প্রথার ভিত্তিতে যখন নির্বাচন হইতেছে, তখন মুসলিম লীগ টিকিটে নির্বাচিত হইবার পরও তফসিলী হিন্দুদের সহযোগিতা পাওয়া যাইবে। আর পার্লামেন্টারি বোর্ডে প্রাদেশিক লীগের প্রতিনিধি নির্বাচন সম্বন্ধে তিনি বলিলেন যে, প্রাদেশিক লীগ কৃষক-প্রজা সমিতির লোকেরই করতলগত। নির্বাচনেও তাঁদের লোকই আসিবেন। তাতে পার্লামেন্টারি বোর্ড এক দলের হইয়া পড়িবে, সর্বদলীয় মুসলমানদের হইবে না।

উভয় পক্ষ স্ব স্ব মতে অটল থাকা সত্ত্বেও আলোচনা কোন পক্ষই ভাংগিয়া দিলাম না। শেষ পর্যন্ত আপোস-চেষ্টা সফল হইবে, উভয় পক্ষই যেন এই আশায় থাকিলাম। ইতিমধ্যে আমরা জানিতে পারিলাম জিন্না সাহেব আমাদের সাথে আলোচনা চালাইবার কালে সমান্তরালভাবে ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির নাইট-নবাবদের সাথেও আলোচনা চালাইতেছেন। আমাদের প্রশ্নের জবাবে তিনি তা স্বীকার করিলেন। বলিলেন : সকল দলের মুসলমানকে এক পার্টিতে আনাই আমার উদ্দেশ্য।’

৫. উভয়সংকট

এক দিনের বৈঠকে হঠাৎ জিন্না সাহেব আমাদিগকে জানাইলেন। পার্লামেন্টারি বোর্ড সম্পর্কে জিন্না সাহেবের দাবি কৃষক-প্রজা সমিতির সভাপতি হক সাহেব ও সেক্রেটারি শামসুদ্দিন সাহেব মানিয়া লইয়াছেন, আমাদের এ বিষয়ে নূতন কথা বলিবার কোনও অধিকার নাই। আমরা বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইলাম। শামসুদ্দিন সাহেব সে দিনের আলোচনায় ছিলেন না। আমাদের বিষয় দূর করিবার জন্য জিন্না সাহেব মুচকি হাসিয়া এক টুকরা কাগজ দেখাইলেন। দেখিলাম, তাঁর কথা সত্য।

আমরা ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত হইয়া সেদিনের আলোচনা অসমাপ্ত রাখিয়াই চলিয়া আসিলাম। হক সাহেব ও শামসুদ্দিন সাহেবকে চ্যালেঞ্জ করিলাম। তাঁদের কথাবার্তা আমাদের পছন্দ হইল না। কলিকাতায় উপস্থিত কৃষক-প্রজা নেতাদের লইয়া একটি জরুরী পরামর্শ সভা ডাকিলাম। ঢাকায় বলিয়াদির জমিদার খান বাহাদুর কাযিমুদ্দিন সিদ্দিকী সাহেব আমাদের সমর্থক ছিলেন। লোয়ার সার্কুলার (নোনাতলা) রোডস্থ তাঁর বাড়িতে এই পরামর্শ বৈঠক বসিল। হক সাহেব ও শামসুদ্দিন সাহেব এই সভায় তাঁদের কাজের সমর্থনে বক্তৃতা করিলেন। তাঁরা জানাইলেন যে জিন্না সাহেব জমিদারি উচ্ছেদের দাবি মানিয়া লইয়াছেন। এ অবস্থায় পার্লামেন্টারী বোর্ডের প্রতিনিধিত্ব লইয়া ঝগড়া করিয়া আপোস-আলোচনা ভাংগিয়া দেওয়ার তাঁরা পক্ষপাতী নন। আমরা ইতিমধ্যেই খবর পাইয়াছিলাম যে সার নাষিমূদ্দিনের পরামর্শে জিন্না সাহেব জমিদারি উচ্ছেদের বিরোধিতা অনেকটা শিথিল করিয়াছেন। হক সাহেব ও শামসুদ্দিন সাহেবের কথায় এখন আমরা খুব বেকায়দায় পড়িলাম। আমরা নিজেদের সমর্থনে খুব জোর বক্তৃতা করিলাম। মুসলিম লীগের লিখিত গঠনতন্ত্রের বিরোধী জিন্ন সাহেবের ঐ মৌখিক প্রতিশ্রুতির মূল্য কি, সে সব কথাও বলিলাম। তারপর শুধু জমিদারি উচ্ছেদের কথাটাও যথেষ্ট নয়; বিনা ক্ষতিপূরণে উচ্ছেদটাই বড় কথা। আমাদের মেনিফেস্টোর কথাও তাই। এ সম্পর্কে জিন্না সাহেব হক সাহেবকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, তা সভা সমক্ষে স্পষ্ট করিয়া বলিতে আমরা হক সাহেবকে চ্যালেঞ্জ করিলাম। হক সাহেব বা শামসুদ্দিন এ ব্যাপারে সভাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিলেন না। বুঝা গেল, আসলে ক্ষতিপূরণের কথাটা তাঁরা জিন্না সাহেবের কাছে তুলেনই নাই। এই পয়েন্টে আমরা জিতিয়া গেলাম। কিন্তু এটা আমরা বুঝিলাম যে বিনা-ক্ষতিপূরণের শর্ত জিন্না সাহেব মানিয়া লইয়া থাকিলে পার্লামেন্টারী বোর্ডে মাইনরিটি হইয়াও আপোস করা উপস্থিত সদস্যগণের অধিকাংশেরই মত। যাহোক জিন্ন সাহেবের কাছে একমাত্র বিনা-ক্ষতিপূরণের ব্যাপারটা পরিষ্কার করিবার তার প্রতিনিধিদলের উপর দেওয়া হইল।

৬. আপোসের বিরোধিতা

আমরা প্রতিনিধিদলের মেম্বার। সেখান হইতে সার্কাস রোডস্থিত ডাঃ আর, আহমদের বাড়ি গেলাম। সমস্ত অবস্থা পর্যালোচনা করিলাম। আমরা একমত হইলাম যে হক সাহেব ও শামসুদ্দিন সাহেব সহ অধিকাংশ সদস্য এই আপোসের পক্ষপাতী এটা যেমন সত্য, এই আপোস করিলে কৃষক-প্রজা সমিতির অস্তিত্ব এই খানেই খতম এটাও তেমনি সত্য। আমরা সংকটের দুই শিংগার ফাঁকে পড়িলাম। একমাত্র ভরসা জিন্ন সাহেব। তিনি যদি মেহেরবানি করিয়া বিনা-ক্ষতিপূরণের দাবিটা গ্রাহ্য করেন, তবেই আমরা বাঁচিয়া যাই। সকলে মিলিয়া আল্লার দরগায় মোনাজাত করিতে লাগিলাম : জিন্না সাহেব যেন আমাদের দাবি না মানেন। নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে জীবনে আব্লেকবারমাত্র আল্লার দরগায় মোনাজাত করিয়াছিলাম। এক টাকা দিয়া ত্রিপুরা স্টেট লটারির টিকিট করিয়াছিলাম। প্রথম পুরস্কার এক লক্ষ। তৎকালে সারা ভারতবর্ষে বিশ্বাসী এথচ মোটা টাকার লটারি ছিল মাত্র এই একটি। কয়েক বছর ধরিয়া এই লটারির টিকিট কিনিতেছিলাম। টিকিট কিনার পরদিন হইতে খেলার ফল ঘোষণার দিন পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস কাল খোদার দরগায় দিনরাত মোনাজাত করিতাম জিতার জন্য। কিন্তু একবার হরিবার জন্য তেমনি মোনাজাত করিয়াছিলাম। কারণ পকেটে টিকিটসহ পাঞ্জাবিটা ধুপার বাড়ি দিয়া ফেলিয়াছিলাম। ধূপার ভাটিতে পড়িয়া তার চিহ্ন ছিল না। তেমনি এবার পাঁচ-ছয় বন্ধুতে দোয়া করিতে থাকিলাম : ‘হে খোদ, জিন্না সাহেবের মন কঠোর করিয়া দাও।‘

পরদিন নির্ধারিত সময়ে জিন্না সাহেবের সহিত দেখা করিলাম। দু’এক কথায় বুঝিলাম, বিনা-ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদে তিনি কিছুতেই রাযী হইবে না; কারণ ওটাকে তিনি ফান্ডামেন্টাল মনে করেন। তখন আমরা নিশ্চিন্ত হইয়া বিনা ক্ষতিপূরণের উপর জোর দিলাম। এমনকি, আমরা এতদূর বলিলাম যে পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠনে কৃষক-প্রজা পার্টিকে শতা ৪০-এর স্থলে আরও কমাইয়া দিলেও আমরা মানিয়া নিতে পারি, কিন্তু বিনা-ক্ষতিপূরণের প্রশ্নের মত ফাণ্ডামেন্টালে আমরা কোনও আপোস করিতে পারি না। জিন্না সাহেবের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাযেয়াফতের যুক্তির খণ্ডনে আমরা কর্নওয়ালিস, পাঁচসালা, দশমালা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উল্লেখ করিয়া দেখাইবার চেষ্টা করিলাম যে জমিদাররা আসলে জমির মালিক নয়, ইজারাদার মাত্র। তাছাড়া, কৃষক-প্রজা সমিতি বাংলার সাড়ে চার কোটি কৃষক-প্রজার কাছে এ ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ। আমরা সে ওয়াদা কিছুতেই খেলাফ করিতে পারি না। জিন্না সাহেব আমাদেরে মাফ করিবেন।

জিন্না সাহেব তাঁর অসাধারণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে বুঝিয়া ফেলিলেন, আমরা ভাংগিয়া পড়িবার চেষ্টা করিতেছি। গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরিয়া তিনি আমাদিগকে ধমকাইয়াছেন, কোনঠাসা করিয়াছেন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করিয়াছেন, কিন্তু কখনও তিনি ভাংগাভাংগি চাহেন নাই। সেটা যদি চাইতেন, তবে এক দিনেই আমাদেরে বিদায় করিয়া দিতে পারিতেন। তিনি এক কথার মানুষ। দর-কষাকষি তাঁর ধাতের মধ্যেই নাই। এমন লোক যে এক সপ্তাস্ত্রে বেশি দিন ধরিয়া দিনের পর দিন আমাদের সাথে আলোচনা চালাইয়া গিয়াছেন, তাতে কেবলমাত্র এটাই প্রমাণিত হয় যে আমাদের সাথে তাঁর মূলগত পার্থক্য যতই থাকুক, তিনি আমাদের মধ্যে ভাংগাভাংগি চান নাই। এই দিন আমাদের মধ্যে ভাংগাভাংগির মনোভাব দেখিয়া তিনি বেশ একটু চঞ্চল এবং তাঁর ধাতবিরোধী রকম নরম হইয়া গেলেন। অতিরিক্ত রকম মিষ্টি ভাষায় তিনি আমাদের দাবির অযৌক্তিকতা বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। তিনি আমাদেরে দেখাইলেন, বিনা-ক্ষতিপূরণের কথাটা আমরা নূতন তুলিতেছি। আমরা বলিলাম যে, উচ্ছেদ কথাটার মধ্যেই বিনা-ক্ষতিপূরণ নিহিত রহিয়াছে। উচ্ছেদ কথার সংগে খরিদ বা পাচেষ, হুকুম দখল বা একুইযিশন-রিকুইযিশনের পার্থক্য আমরা জিন্না সাহেবের মত বিশ্ববিখ্যাত উকিলকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম। জিন্না সাহেব আর কি করিবেন? আমাদের এই অপচেষ্টাকে তিনি শুধু চাইন্ডিশ বা শিশু-সুলভ বলিয়াই ছাড়িয়া দিলেন এবং আমাদিগকে এই ছেলেমি না করিয়া ‘সেনসিবল’ হইতে উপদেশ দিলেন।

৭. আলোচনা ব্যর্থ

কিন্তু আমরা সেনসিবল হইলাম না। কারণ আমরা মন ঠিক করিয়াই আসিয়াছিলাম। ক্ষতিপূরণের প্রশ্নেই জিন্ন সাহেবের সহিত আমাদের ভাংগাভাংগি হইল, বিনা-ক্ষতিপূরণের দাবি মানিয়া নিলে আমরা পার্লামেন্টারি বোর্ডে আরও কম সীট নিতে রাযী ছিলাম, এই মর্মে পরদিনই খবরের কাগযে বিবৃতি দিবার জন্য আমরা তৈয়ার হইতেছিলাম। আমাদের পার্টির মুসাবিদা-বিশারদ ইংরাজীতে সুপণ্ডিত অধ্যাপক হুমায়ুন কবির সাহেব এই মর্মে একটি মুসাবিদা খাড়া করিয়াই আজিকার বৈঠকে আসিয়াছিলেন। সুতরাং আমরা আর বিলম্ব করিলাম না। উঠিয়া পড়িলাম। আপোস না হওয়ার জন্য আমরা যারপরনাই দুঃখিত হইয়াছি, সেই মর্মবেদনা জানাইয়া অতিরিক্ত নুইয়া ‘আদাব আরয’ বলিয়া আমরা বিদায় হইলাম। জিন্না সাহেব আসন হইতে উঠিয়া আমাদের দিকে আসিলেন বিদায়ের শিষ্টাচার দেখাইবার জন্য। দরজার পর্দা পার হইবার আগেই জিন্না সাহেব আমাকে নাম ধরিয়া ডাকিলেন। আমি ফিরিয়া দাঁড়াইলাম। বন্ধুরা স্বভাবতঃই ফিরিলেন না। জিন্না সাহেব আমার কাছে আসিয়া আমার কাঁধে হাত দিলেন। বলিলেন : ‘ডোন্ট বি মিসগাইডেড বাই আশরাফুদ্দিন। হি ইয এ হোলহগার। ইউআরএ সেনিসিবল ম্যান। আই কোয়াইট রিএলাইয ইওর এংযাইটি ফর দি ওয়েলফেয়ার অব দি পেযেন্টস। বাট টেক ইট ফ্রম মি উইদাউট মুসলিম সলিডারিটি ইউ উইল নেভার বি এবল্টু ডু এনি গুড টু দেম।‘

আমি এ কথার বিরুদ্ধে যুক্তি দিবার জন্য মুখ খুলিতেছিলাম। ধমক দিয়া আমাকে থামাইয়া দিলেন এবং আমার কাঁধ হইতে ডান হাতটা আমার মাথায় রাখিয়া বলিলেন : ‘ডোন্ট আণ্ড উইথ মি। আই নো মোর দ্যান ইউ ডু। প্লিয গো টু এভরি হোম, এন্ড ক্যারি দি ম্যাসেজ অব মুসলিম ইউনিটি টু ইচ এন্ড এভরি মুসলিম। দ্যাট উইল সার্ব দি পেযেন্টস মোর দ্যান ইওরপ্রজা পার্টি।‘

আমি বুঝিলাম এটা তর্ক নয় আদেশ। এর বিরুদ্ধে কোন যুক্তি চলে না। কাজেই কোন কথা বলিলাম না। আসলে বলিবার সময়ই তিনি দিলেন না। কথা শেষ করিয়াই আমার মাথা হইতে হাতটা নামাইয়া আমার দিকে বাড়াইয়া দিলেন। আমি ভক্তি– ভরে ঈষৎ নুইয়া তাঁর হাত ধরিলাম। তিনি দুইটা ঝাঁকি দিয়া বলিলেন : গুড বাই এও গুডলাক।

বন্ধুরা বিশেষ কৌতূহলের সংগে আমার অপেক্ষায় বারান্দায় পায়চারি করিতেছিলেন। দু-এক মিনিটের মধ্যে আমি বাহির হইয়া আসায় তাঁদের কৌতূহলের স্থান দখল করিল বিষয়। শুধু বন্ধুবর আশরাফুদ্দিন তাঁর স্বাভাবিক ঘাড়-দোলানো হাসিমুখে বলিলেন : তোমারে নরম পাইয়া একটু আলাদা রকমে ক্যানভাস করলেন বুঝি? গলাইতে পারলেন?

সকলেই হাসিলেন। আমিও হাসিলাম। গুতেই কাজ হইল। কোনও জবাবের দরকার হইল না। তার সময়ও পাওয়া গেল না। নূতন বিষয় আমাদের সকলের মন কব্য করিল। ইসপাহানি সাহেবদের বাড়িতে জিন্ন সাহেবের জন্য যে কামরা নির্দিষ্ট ছিল, সেটা হইতে বাহির হইয়া প্রথমে একটা প্রশস্ত বারান্দায় পড়িতে হয়। সে বারান্দা পার হইয়া বিশাল ড্রয়িং রুমে ঢুকিতে হয়। আমরা ড্রয়িং রুমে ঢুকিয়াই দেখিলাম, হক সাহেব ও মোমিন সাহেব একই সোফায় পাশাপাশি বসিয়া আছেন। আমরা উভয়কেই আদাব দিলাম। হক সাহেব জিগাসা করিলেন। কি হৈল? অধ্যাপক কবির জানাইলেন ফাঁসিয়া গিয়াছে। মোমিন সাহেব আমাদের দিকে না চাহিয়া শুধু নবাব্যাদা হাসান আলীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন : তোমরা মাথা গরম রাজনৈতিক নাবালকেরা নিজেরা ত কিছু করতে পারবেই না, আমরা প্রবীণদেরেও কিছু করতে দিবে না।

আমরা মোমিন সাহেবের সহিত তর্ক না করিয়া দু’চার কথায় হক সাহেবকে আমাদের মোলকারে রিপোর্ট দিয়া চলিয়া আসিলাম।

পরদিনই খবরের কাগযে বাহির হইল জিন্না সাহেব কৃষক-প্রজা সমিতি বাদ দিয়া ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সহিত আপোস করিয়াছেন। ঐ পার্টি নিজেদের নাম বদলাইয়া মুসলিম লীগ নাম ধারণ করিয়াছেন। আমাদের পক্ষ হইতে অবশ্য বিবৃতি বাহির হইল যে ক্ষতিপূরণের প্রশ্নেই জিন্না সাহেবের সহিত আমাদের আপোস হইতে পারিনা।

ইহার পর প্রকাশ্য মাঠের সংগ্রাম অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়িল। যদিও আগের প্রাদেশিক মুসলিম লীগ আমাদেরই দখলে ছিল, কিন্তু জিন্না সাহেবের মোকাবেলায় আমাদের সে দাবি টিকিল না। তাছাড়া কৃষক-প্রজা সমিতির মত অসাম্প্রদায়িক শ্ৰেণী-প্রতিষ্ঠান আর মুসলিম লীগের মত সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান এক সংগে চালাইবার চেষ্টার মধ্যে যে অসংগতি এমন কি রাজনৈতিক অসাধুতা ছিল, অল্পদিনেই তা সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল। আমরা অবস্থা গতিকেই মুসলিম লীগের দখল ছাড়িয়া দিয়া কৃষক-প্রজা সমিতিতে মনোনিবেশ করিলাম। ফলে এই নির্বাচন যুদ্ধ কৃষক-প্রজা সমিতি ও মুসলিম লীগের সম্মুখযুদ্ধে পরিণত হইল।

০৯. নির্বাচন-যুদ্ধ

নির্বাচন-যুদ্ধ
নয়ই অধ্যায়

১. সুদূরপ্রসারী সংগ্রাম

১৯৩৭ সালের এই নির্বাচন মুসলিম বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা। যুদ্ধটা দৃশ্যতঃ কৃষক-প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগ এই দুইটি দলের পার্লামেন্টারি সংগ্রাম হইলেও ইহার পরিণাম ছিল সুদূর প্রসারী। আমরা কর্মীরা এই নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব পুরাপুরি তখনও উপলব্ধি করিতে পারি নাই সত্য কিন্তু সাধারণভাবে কৃষক প্রজাগণের এবং বিশেষভাবে মুসলিম জনসাধারণের অর্থনৈতিক কল্যাণ-অকল্যাণের দিক হইতে এ নির্বাচন ছিল জীবন-মরণ প্রশ্ন, এটা আমরা তীব্রভাবেই অনুভব করিতাম। ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর পরিশ্রমও করিয়াছিলাম সকলে। মুসলিম ছাত্র তরুণরাও সমর্থন দিয়াছিল আশাতিরিক্তরূপে।

পার্টি হিসাবে দুই দলের সুবিধা-অসুবিধা বিচার করিলে দেখা যাইবে উভয়পক্ষেরই কতকগুলি সুবিধা-অসুবিধা দুইই ছিল। মুসলিম লীগের পক্ষে সুবিধা ছিল এই কয়টি?

(১) মুসলিম জনসাধারণ মনের দিক দিয়া মোটামুটি মুসলিম সংহতির প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করিত।

(২) প্রজা-সমিতির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও তাঁর সাথে মৌঃ তমিয়ুদ্দিন খাঁ খানবাহাদুর আবদুল মোমিন সহ অনেক প্রজা-নেতা মুসলিম লীগে যোগ দিয়াছিলেন। প্রবীণ প্রজা-নেতাদের অনেকে স্বন্ত্র প্রজা-পার্টি গঠনকরিয়াছিলেন।

(৩) মওলানা আকরম খাঁ এই সময় মুসলিম বাংলার একমাত্র দৈনিক আজাদ বাহির করেন, কৃষক-প্রজা পার্টির কোনও সংবাদপত্র ছিল না।

(৪) কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে একটা নির্বাচনী মৈত্রী হয় তাতে বোশ্বই ফুক্ত প্রদেশ মাদ্রাজ ও বিহারে ঐ দুই প্রতিষ্ঠান যুক্তভাবে নির্বাচন-সংগ্রাম চালান। বাংলার নির্বাচনেও তার ঢেউ লাগে। কংগ্রেসের সমর্থক জমিয়তে-ওলামায়-হিন্দ মুসলিম লীগ প্রার্থীদের ভোট দিবার জন্য ফতোয়া জারি করেন।

(৫) মুসলিম লীগের তরফ হইতে প্রচার চালাইবার জন্য প্রচুর অর্থের ব্যবস্থা ছিল। পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা পার্টির কোনও তহবিল ছিল না। প্রার্থীরাও প্রায় সবাই গরিব।

পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা পার্টির অনুকূল অবস্থা ছিল এই কয়টি :

(১) কৃষক-প্রজা আন্দোলনের ও ব্যক্তিগতভাবে হক সাহেবের খুবই জনপ্রিয়তা ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ, মহাজনি শোষণ অবসান, কৃষি খাতকের দুরবস্থা দূরকরণ প্রভৃতি গণদাবির মোকাবেলায় মুসলিম লীগের কোনও গণ-কল্যাণের কর্মসূচী ছিল না।

(২) কৃষক-প্রজা পার্টির কর্মীরা নির্বিলাস সমাজ সেবক দেশ-কর্মী। তাঁদের জনসেবার দৃষ্টান্ত জনগণের চোখের দেখা অভিজ্ঞতা। বিনা পয়সায় পায়ে হাঁটিয়া এরা প্রচার করিতেন। পক্ষান্তরে মুসলিম লীগের বড় লোক প্রার্থীদের কর্মীরা চটকদার বেশে প্রচারে বাহির হইতেন।

(৩) মুসলিম ছাত্র-তরুণরা সকলেই প্রতিবাদী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কৃষক-প্রজা পার্টির সমর্থক ছিল।

(৪) নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে কংগ্রেস-লীগ মৈত্রী হওয়ায় বাংলার নাইট নবাবরা প্রজা-কর্মীদেরে কংগ্রেসের ভাড়াটিয়া বলিয়া গাল দিতে অসুবিধায় পড়িলেন। পক্ষান্তরে কংগ্রেস-লীগ মৈত্রী বাংলার কংগ্রেস মানিয়া না ওয়ায় তাঁদের অনেকে এবং অনেক খবরের কাগ কৃষক-প্রজা পার্টির প্রচার প্রপেগেণ্ডায় সমর্থন করেন।

(৫) পর পর কতকগুলি নাটকীয় ঘটনায় জনমত প্ৰজা-পার্টির দিকে উদ্দীপ্ত হয়ঃ (ক) হক সাহেবের পক্ষ হইতে (আসলে তাঁর অনুমতি না লইয়াই) ডাঃ আর. আহমদ বাংলার যে কোন নির্বাচনী এলাকা হইতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবার জন্য সার নাফিমুদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ করেন। (খ) বাংলার লাট সার নাযিমুদ্দিনের পক্ষে ওকালতি করায় হক সাহেব লাট সাহেবের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধংদেহি বিবৃতি দিয়া দেশময় বাহু বাহ্ পান। (গ) সার নাযিমুদ্দিনের আপন জমিদারি পটুয়াখালি নির্বাচনী এলাকাই দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ময়দান নির্বাচিত হওয়ায় ঘটনার নাটকত্ব শতগুণ বাড়িয়া যায়। সারা বাংলার, সারা ভারতের এবং শেষ পর্যন্ত সারা দুনিয়ার দৃষ্টি পটুয়াখালির দিকে নিবদ্ধ হয়।

২. পটুয়াখালি দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ

একদিকে ইংরাজ লাটের প্রিয়পাত্র সার নাযিমুদ্দিনের পক্ষে সরকারী প্রভাব ও ক্ষমতা এবং নাইট-নবাবদের দেদার টাকা, অপরদিকে খেতাববিত্তহীন বৃদ্ধ এজা নেতা হক সাহেবের পক্ষে তাঁর মুখের বুলি ‘ডাল-ভাত’ ও সমান বিত্তহীন প্রজা কর্মীরা। রোমান্টিক আদর্শবাদী ছাত্ররা স্কুল-কলেজের পড়া ফেলিয়া বাপ-মায়ের দেওয়া পকেটের টাকা খরচ করিয়া চারিদিক হইতে পটুয়াখালিতে ভাংগিয়া পড়িল। এর ঢেউ শুধু পটুয়াখালিতে সীমিত থাকিল না। সারা বাংলার বিভিন্ন নির্বাচন কেন্দ্রেও ছড়াইয়া পড়িল। হক সাহেব খাজা সাহেবের প্রায় ডবল ভোট পাইয়া নির্বাচিত, হইলেন। তাঁর বরাবরের নিজের নির্বাচন কেন্দ্র পিরোজপুর হইতেও তিনি নির্বাচিত হইলেন।

আমার নিজের জিলা ময়মনসিংহে আমাদের বিপুল জয়লাভ হইল। আমি নিজে না দাঁড়াইয়া কৃষক-প্রজা প্রার্থীদের জিতাইবার জন্য দিনরাত সভা করিয়া বেড়াইলাম। কঠোর পরিশ্রম করিলাম আমারই মত গরিব সহকর্মীদেরে লইয়া। ফলে এ জিলার প্রধান প্রধান লীগ নেতা খান বাহাদুর শরফুদ্দিন, খান বাহাদুর নূরুল আমিন, খান বাহাদুর গিয়াসুদ্দিন, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, মৌঃ আবদূল মোননম খাঁ প্রভৃতি সকলকে ধরাশায়ী করিলাম। জিলার মোট যোলটি মুসলিম সীটের মধ্যে কৃষক-প্রজা পার্টি পাইয়াছিল এগারটি, মুসলিম লীগ পাইয়াছিল মাত্র পাঁচটি। উল্লেখযোগ্য যে, জিন্না সাহেব স্বয়ং ময়মনসিংহ জিলাতেই অনেকগুলি নির্বাচন কেন্দ্রে সভা-সমিতি করিয়াছিলেন। তাঁর মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নির্বাচন বিশারদ ও ময়মনসিংহের মুসলিম ভোটারদের মনে দাগ কাটতে পারেন নাই।

৩. নয়া টেকনিক

বরিশালের পরে ময়মনসিংহ জিলাতেই কৃষক-প্রজা পার্টি সবচেয়ে বেশিহারে আসন দখল করিয়াছিল। ময়মনসিংহ জিলার এই অসামান্য সাফল্যের কারণ ছিল তিনটি। এই তিনটি কারণই ছিল এই জিলার কৃষক-প্রজা কর্মীদের প্রচার-প্রপেগেণ্ডার টেকনিক। আত্ম-প্রশংসার মত শোনা গেলেও বলা দরকার যে তিনটি টেকনিকই আমার নিজের উদ্ভাবিত। সহকর্মীদেরে ঐ টেকনিকের ব্যাপারে আগেই তালিম দিয়া লইয়াছিলাম। একটি এই : এ জিলার কৃষক-প্রজা বক্তারা মুসলিম লীগের ‘মুসলিম সংহতির শ্লোগানকে সামনাসামনি আক্রমণ, ফ্রন্টাল এটাক, করিতেন না। মুসলিম জমিদারের সংগে মুসলিম প্রজার, মুসলিম মহাজনের সাথে মুসলিম খাতকের সংহতির কথা বলা হাস্যকর, এ ধরনের মামুলি যুক্তিত ছিলই। এছাড়া অবস্থা ভেদে এবং স্থান ভেদে দরকার-মত আমাদের বক্তারা এই যুক্তি দিতেন : ‘আমরাও মুসলিম সংহতি চাই। তবে আমাদের দাবি এই যে সে মুসলিম-সংহতি হইবে কৃষক প্রজাদের কুটিরের আংগিনায়, নবাব-সুবাদের আহসান-মনযিল বা রাজ-প্রসাদে নয়। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে জমিদার-মহাজন আর কয়জন? শতকরা পঁচানব্বই জন মুসলমানই আমরা কৃষক। কাজেই আমরা কৃষক-প্রজা কর্মীরা বলি : হে মুষ্টিমেয় মুসলমান জমিদার-মহাজনেরা, আপনারা নিজেরা, পৃথক দল না করিয়া মুসলিম সংহতির খাতিরে চলিয়া আসুন পঁচানব্বই জনের দল এই কৃষক-প্রজা-সমিতিতে। এর পরে মুসলিম লীগের বক্তারা হাজার সংগতির কথা বলিয়াও সেখানে দাঁত ফুটাইতে পারিতেন না।

আমাদের দ্বিতীয় টেকনিক ছিল এইরূপ। আমাদের বক্তারা তাঁদের বক্তৃতায় বলিতেন : আমাদের বক্তৃতা ও যুক্তি-তর্ক শুনিলেন। কোন দলকে আপনারা ভোট দিবেন, আজই এই মুহূর্তে তা স্থির করিয়া ফেলিবেন না। কয়েকদিন পরেই এখানে মুসলিম লীগের সভা হইবে। আপনারা দলে দলে সে সভায় যোগদান করিবেন। মন দিয়া তাঁদের বক্তৃতা শুনিবেন। আমাদের যুক্তি ও তাঁদের যুক্তি মিলাইয়া তুলনামূলক বিচার করিবেন। তারপর ঠিক করিবেন, কোন দলকে আপনারা ভোট দিবেন। আমাদের বক্তাদের এই ধরনের বক্তৃতার মোকাবিলায় মুসলিম লীগ বক্তারা তাঁদের সভায় বলিতেন : ‘কৃষক-প্রজার লোকেরাও এখানে সভা করিতে আসিবে। তাদের কথা শুনিবেন না। তাদের সভায় যাইবেন না। ওরা মুসলিম-সংহতি-ধ্বংসকারী হিন্দু-কংগ্রেসের ভাড়াটিয়া লোক। ওদেরে ভোট দিলে মুসলমানদের সর্বনাশ হইবে।

এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের বক্তৃতায় মুসলিম জনসাধারণ স্বভাবতঃই কৃষক–প্রজা পার্টির সমর্থক হইয়া পড়িত। যে দল অপর পক্ষের বক্তৃতা শুনিয়া পরে কর্তব্য ঠিক করিতে বলে, তারা নিশ্চয়ই অপর দলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এই সাধারণ কাণ্ড-জ্ঞান মুসলিম জনসাধারণের আছে এটা যাঁরা বিশ্বাস করেন নাই তাঁরাই রাজনীতিতে হারিয়াছেন।

আমাদের তৃতীয় টেকনিক ছিল উভয় পক্ষের যুক্ত নির্বাচনী সভার আয়োজন করার দাবি। আমাদের বক্তারা কোন অঞ্চলে গিয়াই প্রস্তাব দিতেন। কি দরকার অত টাকা-পয়সা খরচ ও অতশত পরিশ্রম করিয়া দুইটা মিটিং করিয়া জনসাধারণকে তকলিফ দিবার? দুই পক্ষ মিলিয়া একটা সভা করা হউক। খরচও কম হইবে। লোকও বেশি হইবে। উভয় পক্ষের সমান সংখ্যক বক্তা সম-পরিমাণ সময় বক্তৃতা করিবেন। আমাদের পক্ষের এই প্রস্তাবে মুসলিম লীগাররা স্বভাবতঃই আপত্তি করিতেন। যেখানেই আপত্তি করিয়াছেন, পরিণাম তাঁদের পক্ষে সেখানেই খারাপ হইয়াছে। আমাদের প্রস্তাবটা ছিল দুধারি তলওয়ার : মানিলেও আমাদের জিত, না মানিলেও আমাদের জিত।

৪. উত্তর টাংগাইল

এই টেকনিকে সবচেয়ে বেশি ম্যাজিকের কাজ হইয়াছিল টাংগাইল মহকুমার মধুপুর-গোপালপুর নির্বাচন-কেন্দ্রে। এখানে নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলী আমাদের প্রার্থী। আর প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ সাহেব মুসলিম লীগ প্রার্থী। নবাবযাদা ব্যক্তিগতভাবে প্রগতিবাদী তরুণ হইলেও ‘অত্যাচারী জমিদার’ বলিয়া পরিচিত নবাব বাহাদুর নবাব আলীর পুত্র। পক্ষান্তরে ইব্রাহীম খাঁ সাহেব জনপ্রিয় শিক্ষাবিদ, সুপরিচিতি সাহিত্যিক ও প্রবীণ সমাজসেবক। তাছাড়া স্বয়ং জিল্লা সাহেব এই নির্বাচনী-কেন্দ্রে খুব ধূমধামের সাথে জন-সভা করিয়াছেন। এসবের ফল হইল এই যে নির্বাচনের মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে একদিন নবাবযাদা সকালবেলা আমার বাসায় হাযির। তার মোটর ধূলায় সাদা। নিজের চেহারা তাঁর উস্কুখুস্কু। কয়দিন ধরিয়া না জানি শেভও করেন নাই। গোসলও করেন নাই। অমন সুন্দর চেহারাখানা একদম মলিন। কত রাত ঘুমান নাই। চোখ লাল। চোখের চারধারে কালশিরা পড়িয়া গিয়াছে। এমন। অসময়ে তাঁকে দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। উদ্বিগ্নও হইলাম। কারণ জিগ্গাসা করিলাম। তিনি বলিলেন : ইলেকশনে জিতার তাঁর কোনই চান্স নাই। তিনি বড়জোর এক আনি ভোট পাইবেন; পনর আনিই পাইবেন প্রিন্সিপাল সাহেব। এ অবস্থায় ইলেকশনে লড়িয়া কোনও লাভ নাই। তিনি হাজার দশেক টাকা খরচ করিকেন বাজেট করিয়াছিলেন। অর্ধেকের বেশি খরচ হইয়া গিয়াছে। বাকী টাকাটা তাঁর নিজের ইলেকশনে নিশ্চিত অপব্যয় না করিয়া অন্যান্য গরিব প্রার্থীর পিছনে খরচ করা উচিৎ। এই কথাটা বলিবার জন্যই এবং বাকী টাকাটা লইয়াই তিনি আমার কাছে আসিয়াছেন। তিনি আর ইলেকশন করিবেন না, কর্মীদেরে তা বলিয়া আসিয়াছেন।

আমি এক ধ্যানে তার কথাগুলি শুনিলাম। এক দৃষ্টে তাঁর দিকে চাহিয়া রহিলাম। বড় লোকের আদরের দুলাল। কাঁচা সোনার মত চেহারা। জীবনে কোনও সাধ অপূর্ণ রাখেন নাই বিলাসী বাবা। কোনও নির্বাচনে হারেনও নাই আজো। অল্পদিন আগে কৃষক-প্রজা টিকিটে বিপুল ভোটাধিক্যে লোক্যাল বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে নির্বাচিত হইয়াছেন। মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান হইয়াছেন। আর আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই তরুণ মনে এমন আঘাত। পাইয়াছেন। সেটাও বড় কথা নয়। সে পরাজয়ের নিশ্চিত সম্ভাবনার সামনে কি অপরূপ বীরত্বের সাথে বুকটান করিয়া দাঁড়াইয়াছেন। না, এ তরুণকে হারিতে দেওয়া হইবে না।

এক নাগাড়ে অনেক দূর ট্রেন ও সাইকেল ভ্রমণ করিয়া অনেকগুলি সভা করিয়া মাত্র গতরাতে বাসায় ফিরিয়াছি। ভালরূপ খাওয়া-ঘুমও হয় নাই। আবার এই দশটার গাড়িতেই আরেকটা সভা করিতে যাইবার কথা। এক মুহূর্তে সিদ্ধান্ত করিয়া ফেলিলাম। নবাবযাদার নির্বাচনী এলাকাতেই যাইব। নবাবযাদাকে বলিলাম শেভ গোসল করিয়া চারটা ডাল-ভাত খাইয়া একটু বিশ্রাম করিতে। আমিও তাই করিলাম। সন্ধ্যার দিকে ধনবাড়ি পৌঁছিলাম। অনেক রাত পর্যন্ত পরবর্তী দিনসমূহের জন্য প্ল্যান প্রোগ্রাম করিলাম। সকাল হইতে সভা করিয়া চলিলাম। তিনদিনে তিনটা বড় সভা করিলাম। আর পথের ধারের সভা-সোড় সাইড মিটিং করিলাম উনিশটা। হাটের সভা করিলাম না। কর্মীরা ঢোল ও চোংগা লইয়া আগে-আগে চলিয়া যাইতেন। এক সভা শেষ করিতে-করিতে দুই-তিন মাইল দূরে আকেটা সভার আয়োজন হইয়া যাইত। সভা মানে দুই তিন পাঁচ সাতশ লোকের জমায়েত। বড় সভা যে কয়টা করিলাম তার দূইটা ছিল যুক্ত সভা।

যুক্তসভার মধ্যে খোদ ভূয়াপুরের সটাই ছিল সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। এটা ইব্রাহিম খাঁ সাহেবের কর্মক্ষেত্র। এই স্থানটাকে উন্নত করার কাজে প্রিন্সিপাল সাহেব তাঁর কর্মজীবনের বেশির ভাগ ব্যয় করিয়াছেন। এই ভূয়াপুরেই নির্বাচনী যুক্ত স। অঞ্চলের সবচেয়ে মান্যগণ্য সবচেয়ে বয়োজ্যষ্ঠ এক মুরুব্বিকে সভাপতি করা হইল প্রিন্সিপাল সাহেবের প্রস্তাব-মত। কথা হইল। তিনি আর আমি মাত্র এই দুই জন বক্তৃতা করিব। আমাদের বক্তৃতা শেষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নবাবযাদা দাঁড়াইয়া জনসাধারণকে শুধু একটা সেলামালেকুম দিবেন।

প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ রাজনীতি, সাহিত্য-সাধনা ও প্রজা-আন্দোলন সব ব্যাপারেই আমার নেতা ও মুরুব্বি। ছাত্রজীবনেও তিনি ছিলেন আমাদের নেতা ও ‘হিরো’। তাঁরই সংগে নির্বাচনী বক্তৃতার লড়াই করিতে হইতেছে। এর একটু ইতিহাস আছে। প্রিন্সিপাল সাহেব ময়মনসিংহ প্রজা-আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি টাংগাইল মহকুমা প্রজা-সমিতির প্রেসিডেন্ট। কাজেই স্বভাবতঃই তিনি নির্বাচনে প্রজা-সমিতির মনোনয়ন চাহিয়া দরখাস্ত দিলেন। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে একটা চিঠিও দিলেন। প্রজা-সমিতি তাঁর মত যোগ্য ব্যক্তি ও প্রবীণ নেতাকে মনোনয়ন দিবে নিশ্চয়ই। কিন্তু একটু অসুবিধা হইল এই যেনবাবযাদা হাসান আলী এবং প্রিন্সিপাল সাহেব একই এলাকার লোক। মনোনয়ন চাইলেন উভয়ে একই এলাকা হইতে। আমি বিষম বিপদে পড়িলাম। নবাবদাকে নিজ এলাকা হইতে নমিনেশন না দিলে আর দেওয়াই যায় না। তিনি তরুণ ও অপরিচিত। যা-কিছু পরিচয় তাঁর বাপের নামে। প্রজাদের পক্ষে সেটা সুপরিচয় নয়। পক্ষান্তরে প্রিন্সিপাল সাহেব সারা বাংলায় সুপরিচিত। যে কলেজের তিনি প্রিন্সিপাল সেই করটিয়া কলেজ মধ্য টাংগাইল নির্বাচকমণ্ডলীতে অবস্থিত। তাঁর শক্তির উৎস যে ছাত্র-শক্তি, সেই ছাত্র বাহিনী মধ্য টাংগাইলে অবস্থিত। কলেজের সেক্রেটারি টিয়া স্টেটের মোতায়ারি নবাব মিয়া সাহেব (মসউদ আলী খান পন্নী) মধ্য-টাঙ্গাইলে দাঁড়াইলে প্রিন্সিপাল সাহেবের যে অসুবিধা ও বেকায়দা হইত তাও হয় নাই। কারণ নবাব মিয়া সাহেব দাঁড়াইয়াছেন দক্ষিণ টাংগাইল নির্বাচনী এলাকাতে। এসব কথাই আমি প্রিন্সিপাল সাহেবকে পত্রে ও মূখে বুঝাইলাম। এর উপরও আরও দুইটা কথা বলিলাম। এক, তাঁর মত শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ব্যক্তিকে এ জিলার যেকোন নির্বাচনী এলাকা হইতে পাস করাইয়া আনিবার মত প্রভাব ও জনপ্রিয়তা এজা-সমিতির আছে এবং তা করিবার গ্যারান্টিও আমি দিলাম। দুই, নবাবযাদাকে তাঁর জমিদারির বাহিরে অন্য কোন নির্বাচনী এলাকাতে খাড়া করিলে লোকেরা বলিবে অত্যাচারী জমিদার হিসাবে নিজের জমিদারিতে তোট পাইবেন না বলিয়াই নবাবযাদা অন্যখানে দাঁড়াইয়াছেন। অতএব হয় নবাদকে মংপুর-গেপালপুরে দাঁড় করাইতে হয়, নয়ত তাঁকে এক বাদ দিতে হয় এই উত্মকুল রক্ষার জন্য নবাবদা ও প্রিন্সিপাল সাহেবের কেসটা কেন্দ্রীয় গামেন্টারি বোর্ডের কাছে দেওয়া হইল। তাঁরাও আমার সমর্থন করিলেন। নবাদাকে উত্তর-টাঙ্গাইল ও প্রিন্সিপাল সাহেবকে মধ্য-টাংগাইলে মনোনয়ন দেওয়া হইল।

কিন্তু প্রিন্সিপাল সাহেব আমাদের মনোনয়ন অগ্রাহ্য করিয়া উত্তর-টাংগাইলে মনোনয়নপত্র দাখিল করিলেন এবং মুসলিম লীগের টিকিট চাইলেন। মুসলিম লীগ প্রিন্সিপাল সাহেবের মত দেশ-বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবককে লুফিয়া নইলেন। এইভাবে এক কালের প্রজা-নেতা আমার সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক গুরুর বিরুদ্ধে ক্যানভাস করিবার জন্য আমি ভুয়াপুর আসিয়াছি।

বক্তৃতাও করিলাম দরদ দিয়া প্রাণ ঢালিয়া। একটা অশ্রদ্ধাপূর্ণ শক্ত কথাও বলিলাম না। শুধু ঘটনা-পরম্পরা বর্ণনা করিয়া গেলাম। প্রিন্সিপাল সাহেবও সুবক্তা রসিক বাগ্মী। কিন্তু মামলা ছিল তাঁর খুবই জটিল। সব পার্টির মতই প্রজা-সমিতিরও মনোনয়ন চাওয়ার নিয়ম ছিল, দরখাস্তে স্পষ্ট করিয়াই লেখা থাকিত : ‘প্রজা-পার্টির মনোনয়ন মানিয়া হব। মনোনয়ন না পাইলে প্রতিদ্বন্দিতা হইতে সরিয়া দাঁড়াই। স্বাধীনভাবে বা অন্য কোনও পার্টির মনোনয়ন লইয়া নির্বাচন লড়িব না।‘ আমি এই প্রতি- সভায় উপস্থিত করিলাম। প্রিন্সিপাল সাহেব স্বভাবতই স্বীকার করিলেন। তারপরে তাঁর বক্তৃতা আর ভাল জমিল না। নবাবযাদা ডবলের বেশি ভোট পাইয়া মাত করিলেন।

৫. অমানুষিক খাটুনি

এই নির্বাচন উপলক্ষে আমরা সকলেই অমানুষিক পরিশ্রম করিয়াছিলাম। স্বয়ং নবাব হাসান আলী ও মৌঃ আসাদুদদৌলা সিরাজীর মত সুখী লোকেরাও গভীর রাতে পাস্ত্রে থটিয়া নদী-নালা পার হইয়াছেন। অনেক সহকমী লইয়া আমি অন্ধকার রাতে সাইকেল কাঁধে করিয়া মাইলের পর মাইল বালুচর পার হইয়াছি। এই সবের শারীরিক প্রতিক্রিয়া অন্ততঃ আমার উপর অদ্ভুত হইয়াছিল। যেদিন তোটাভুটি শেষ হয়, সেদিন নিশ্চিত জয়ের রগন চিত্র আঁকিতে-আঁকিতে সন্ধ্যার কিছু আগে বাসায় ফিরিলাম। অনেক দিন পরে শেত-গোসল করিয়া পরিতৃপ্তির সংগে খাইয়া সন্ধ্যার সময় দরজা বন্ধ করিয়া শুইয়া পড়িলাম। আন্দায় ছয়টা-সাতটা হইবে। আমার ঘুম না ভাংগা পর্যন্ত আমাকে ডিটার্ব না করিতে নির্দেশ দিয়া শুইলাম। পরদিন রাত্রি নয়টার সময় আমার ঘুম ভাংগে। অর্থাৎ একঘুমে আমি ছাৱিশ ঘন্টা কাটাইয়া ছিলাম। এই সময়টার মধ্যে আমার বাড়িতে প্রথমে দুশ্চিন্তা ও পরে কান্নাকাটি পড়িয়াছিল। মহল্লায় জানাজানি হইয়া গিয়াছিল বন্ধু-বান্ধবের ভিড় হইয়াছিল। জানালা দিয়া আমার পেটের উঠানামা দেখিয়াই আমার জীবিত থাকা সম্বন্ধে তাঁরা নিশ্চিত হইয়াছিলেন। এই ছাবিশ ঘন্টায় আমার ক্ষুধা পেশাব পায়খানা লাগে নাই। আমার স্ত্রী বলিয়াছেন, তিনি জানালার ফাঁকে খুব লক্ষ্য রাখিয়াছিলেন, এই ছারিশ ঘন্টায় আমি তিনবারের বেশি পাশ ফিরি নাই।

৬. জয়-পরাজয়ের খতিয়ান

এত সাধের ইলেকশন, এত শ্রমের জয়, সব গোলমাল হইয়া গেল নির্বাচনের পরে। দেখা গেল, একশ উনিশটা মুসলিম আসনের মধ্যে কৃষক-প্রজা পার্টি মাত্র তেতাল্লিশটা পাইয়াছে। আমাদের হিসাব মতে মুসলিম লীগ পাইয়াছে মাত্র আটত্রিশটা। আমাদের দেশে, বিশেষতঃ মুসলিম সমাজে, তখনও পার্টি-সিস্টেম ও পার্টি-আনুগত্য সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা দানা বাঁধে নাই। কাজেই সুস্পষ্ট ইওর উপর দুইদলের মুখামুখি নির্বাচন-যুদ্ধ হওয়ার পরও দেখা গেলে যে কোন দলের ঠিক কতজন নির্বাচিত হইয়াছেন, তা অস্পষ্টই রহিয়া গিয়াছে। দেখা গেল, অনেক অদলীয় মেরও নিজেদের সুবিধামত দুই দলের কোনও একদলে ভিড়িয়া পড়িতেছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত হিসাব-নিকাশ করিয়া বুঝা গেল মুসলিম লীগ পার্টির মহিলা ও শ্রমিক সদস্য সহ ষাটজনের বেশি সদস্য হইয়া গিয়াছেন। টানিয়া-বুনিয়া আমরাও আমাদের আটান্ন জন মৈন আছেন দাবি করিতে লাগিলাম। এছাড়া পঁচিশ জন ইউরোপীয়ান ও চারজন এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এই মোট উনত্রিশ জন সদস্য লাট সাহেবের ইশরায় মুসলিম লীগ দলকেই সমর্থন করিবেন। এটা এরূপ ধরা কথা। যাঁরাই মন্ত্রিসভা গঠন করিবেন, তফসিলী হিন্দুদের অন্ততঃ কুড়িজন মেম্বর তাঁদেরই সমর্থন করিবেন, এটাও স্পষ্ট বোঝা গেল। এ সব হিসাব করিয়াও কিন্তু মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভা গঠনের সম্ভাবনা ছিল না। তৎকালে আইন পরিষদে মোট মেম্বর-সংখ্যা ছিল আড়াইশ। তার মধ্যে বিশেষ নির্বাচক-মণ্ডলীর প্রতিনিধিসহ মুসলমান ১২২, বর্ণহিন্দু ৬৪, তফসিলী হিন্দু ৩৫, ইউরোপীয়ান ২৫ ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ৪। বৰ্ণহিন্দু ও তফসিলীদের মিলাইয়া যাটের উপর ছিলেন কংগ্রেসী। এঁরা মুসলিম লীগকে কিছুতেই সমর্থন করিবেন না। মাদ্রাজা-বোম্বাই ও যুক্ত-প্রদেশের লীগ-কংগ্রেস আপোস সত্ত্বেও বাংলায় এই পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। এ অবস্থায় সমস্ত শ্বেতাংগ সদস্য, এক ডজন হিন্দু রাজা মহারাজ ও কুড়িজন তফসিলী হিন্দু মুসলিম লীগকে সমর্থন করিলেও তাঁরা মন্ত্রিসভা গঠন করিতে পারেন না। পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা সমিতি তা পারে। কারণ কৃষক-প্রজা পার্টি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। একমাত্র জামিদারি উচ্ছেদের চরমপন্থী দাবির জন্যই অধিকাংশ বর্ণহিন্দু এই পার্টির বিরোধী। এটাই ফয়সালা হইয়া যাইবে হিন্দুসমাজে নির্বাচন-যুদ্ধ হক সাহেবের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার দ্বারা। গোড়াতে শ্বেতাংগরা হক সাহেব ও তাঁর দলকে সমর্থন করিবেন না বটে, কিন্তু একটা মন্ত্রিসভা গঠিত হইয়া গেলে তারা সে মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করিবেন ইহাই শ্বেতাংগদের নীতি।

৭. কংগ্রেস-প্রজা পার্টি আপোস চেষ্টা

এ অবস্থায় মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয় দলই কৃষক-প্রজা পার্টির সংগে আপোস করিতে চাইলেন। কংগ্রেস মতি গ্রহণ করিবে না, এটা আগেই ঘোষণা করায় আমরা কংগ্রেসের সহিত কোয়েলিশন করাই অধিকতর সুবিধাজনক মনে করিলাম। কারণ এতে হক সাহেবের প্রধান মন্ত্রিত্ব অবধারিত হয়। কৃষক-প্রজা দলের বেশি লোককে মন্ত্রী করা যায়। পক্ষান্তরে মুসলিম লীগের প্রধান মন্ত্রিত্বের দাবি আছে। কাজেই মুসলিম লীগের প্রসারিত হাত অগ্রাহ্য করিয়া আমরা কংগ্রেসের সহিত কথা চালাইলাম। কংগ্রেসের সহিত মূলনীতিগত ঐক্যমত থাকায় আপোসের শর্ত নির্ধারণ অতি সহজ মনে হইল। কতিপয় বড়-বড় শর্ত ঠিক হওয়ার পরই বিশেষ ধরুরী কাজে আমি ময়মনসিংহ চলিয়া আসিলাম। কথা থাকিল, সব চূড়ান্ত হওয়ার সময় আমি আবার আসিব। মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী, মৌঃ শামসুদ্দিন, মৌঃ আশরাফুদ্দিন চৌধুরী, অধ্যাপক হুমায়ুন করিব, নবাবযাদা হাসান আলী প্রভৃতি আমার চেয়ে যোগ্য বন্ধুরা আলোচনার দায়িত্ব নেওয়ায় আমি নিশ্চিন্তে ময়মনসিংহে চলিয়া আসিলাম। দুই তিন দিন যাইতে না-যাইতেই হক সাহেবের টেলিগ্রাম পাইয়া ছুটিয়া গেলাম। হক সাহেব বড় খুশী। তিনি খুশীতে তাঁর বেলচার মত হাত দিয়া আমার পিঠে থাপ্পড় মারিতে লাগিলেন। কংগ্রেস আমাদের সকল শর্ত মানিয়া লইয়াছে। আমিও উল্লসিত হইলাম।

সেদিনই রাত্রি আটটায় মিঃ জে. সি. গুপ্তের বাড়িতে ডিনার। সেখানে চূড়ান্ত শর্তাবলী উভয় পক্ষের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক স্বাক্ষরিত হইবে। উভয় পক্ষে আট অথবা দশ জন করিয়া বোল অথবা কুড়ি জনের ডিনার। আমাদের পক্ষে হক সাহেব, সৈয়দ নওশের আলী, শামসুদ্দিন, আশরাফুদ্দিন, নবাবযাদা খানবাহাদুর হাশেম আলী, অধ্যাপক কবির, ডাঃ আর. আহমদ ও আমি প্রভৃতি, কংগ্রেস পক্ষ হইতে মিঃ শরৎ বসু, নলিনী সরকার, ডাঃ বিধান রায়, জে এম.দাশগুপ্ত, কিরণ শংকর রায়, সন্তোষ কুমার বসু, ধীরেন্দ্র নাথ মুখার্জী ও জে.সি. গুপ্ত প্রভৃতি। হৃদ্যতার আবহাওয়ার মধ্যেই আলাপ-আলোচনা চলিল। শর্তাবলী আগেই ঠিক হইয়া গিয়াছে বলিয়া আপোস রফার কোনও কথাই উঠিল না। শুধু ভবিষ্যৎ লইয়াই রংগিন চিত্র আঁকার প্রতিযোগিতা চলিল। ডিনার খাওয়া হইল। মিঃ গুপ্ত আমিরী-বাদশাহী আনার জন্য মহর ছিলেন। ডিনারে ভাই হইল। খাওয়ার পরে শর্তাবলী দস্তখতের সময় আসিল। গুপ্ত সাহেব আগেই সব টাইপ করাইয়া রেডি রাখিয়াছিলেন। তিনি সে সব কাগয হাযির করিলেন। নেতাদের ইশারায় তিনি শর্তনামাটি পড়িয়া শুনাইলেন। শর্তনামার ক্ষুদ্র ভূমিকায় দেশের এই সন্ধিক্ষণে কংগ্রেস ও কৃষক-প্রজা পার্টির মত দুইটি প্রগতিবাদী প্রতিষ্ঠানের কোয়ালিশনের আবশ্যকতা সংক্ষেপে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় বর্ণনা করা হইয়াছে। তারপরেই ক্রমিক নম্বর দিয়া মন্ত্রিসভার করণীয় কার্যাবলীর তালিকা দেওয়া হইয়াছে। তাতে কংগ্রেস ও কৃষক-প্রজা সমিতির ইলেকশন মেনিফেস্টোর প্রধান-প্রধান ধারা যথা জাতীয় দাবি, রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি, প্রজা স্বত্ব আইন, মহাজনী আইন, কৃষি ঋণ, সালিশী বোর্ড, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা ইত্যাদি সমস্ত প্রগতিমূলক কার্যক্রমই ছিল। মিঃ গুপ্তের পড়া শেষ হইলে করতালি-ধ্বনিতে কার্যক্রমটি অভিনন্দিত হইল।

করতালি-ধ্বনি থামিলে আমি দাঁড়াইলাম। আমি সেই দিনই মফস্বল হইতে আসিয়াছি বলিয়া এই প্রথম কার্যক্রমটি শুনিলাম। অতি চমৎকার হইয়াছে। এটাকে আইডিয়াল মেগনাকার্টা-অব-বেংগল বলা যায়। মুসাবিদাকারীকে ধন্যবাদ। কংগ্রেস ও কৃষক-প্রজা নেতাদেরে ধন্যবাদ। এ সব কথা বলিয়া শেষে বলিলাম : আমার সামান্য একটু সংশোধনী প্রস্তাব আছে। নেতাদের উজ্জ্বল মুখ হঠাৎ অন্ধকার হইয়া যাইতেছে দেখিয়া তাড়াতাড়ি যোগ করিলাম : এটাকে সংশোধন বলা অন্যায় হইবে শুধু ক্রমিক, নম্বরের একটু ওলট-পালট মাত্র।

৮. কংগ্রেস-নেতাদের অদূরদর্শিতা

মিঃ গুপ্তের পঠিত শর্তনামায় ক্রমিক নম্বর ছিল এইরূপ: (১) স্বরাজ দাবির প্রস্তাব গ্রহণ, (২) রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি, (৩) প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, (৪) মহাজনী আইন পাস ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি প্রস্তাব করিলাম যে শুধু ২নং দফাঁকে ৩নং ও ৪নং দফার নিচে আনিয়া ক্রমিক নম্বর সংশোধন করা হউক। আমার এই প্রস্তাবের সমর্থনে আমি যা বলিলাম তার সংক্ষিপ্ত সার-মম এই রাজনৈতিক বন্দী মুক্তির প্রশ্নে লাট সাহেব যদি ভেটো করেন তবে মন্ত্রিসভাকে আলু-সম্মানের খাতিরে পদত্যাগ করিতে হইবে। কংগ্রেস-নেতাদের কেউ কথায় কেউবা মাথা ঝুকাইয়া আমার কথায় সায় দিলেন)। সে অবস্থায় আইন-পরিষদের পুননির্বাচন হইতে পারে। (এ কথায়ও কংগ্রেস নেতারা সায় দিলেন)। সে নির্বাচনে কৃষক-প্রজা সমিতি মুসলিম লীগের কাছে হারিয়া যাইবে। কারণ সকলেই জানেন, নির্বাচনের সময় তারা কৃষক প্রজা-সমিতিকে কংগ্রেসের লেজুড় আখ্যা দিয়াছে এবং কৃষক-খাতকের কল্যাণের সমস্ত ওয়াদাকে ভাওতা বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। এখন যদি কৃষক ও খাতকদের হিতের কোনও আইন পাস না করিয়াই আমরা রাজনৈতিক ইতে পদত্যাগ করি, তবে মুসলিম লীগের সেই মিথ্যা অভিযোগকে সত্য প্রমাণ করা হইবে। অতএব আমার নিবেদন এই যে, মন্ত্রিসভা আগে কৃষক-প্রজা সমিতির ওয়াদা-মাফিক প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন করিবেন, ধাতকদেরে রক্ষার জন্য মহাজনি আইন পাস করিবেন, এবং কৃষি-খাতকদের জন্য সালিশী বোর্ড গঠন করিবেন। এসব কাজ করিবার পর রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থা করিবেন, এবং বিনা বিচারে আটকের আইন বাতিল করিকেন। লাট সাহেব এতে বাধা দিলে আমরা মন্ত্রিসভা হইতে এবং আইন-পরিষদ হইতে সদলবলে পদত্যাগ করিব, পুননির্বাচনের দাবি করিব। গোটা দেশবাসী আমাদের সমর্থন করিবে। সে নির্বাচনে কংগ্রেস সমস্ত হিন্দু সীট এবং কৃষক-প্রজা সমিতি সমস্ত মুসলিম শীট দখল করিবে।

সমবেত মুসলিম নেতাদের প্রায় সকলেই আমার কথার সমর্থন করিলেন। কিন্তু কংগ্রেস-নেতারা তা করিলেন না। তাঁরা আবেগময়ী ভাষায় বলিলেন রাজনৈতিক বন্দী-মুক্তির প্রশ্নটা জাতীয় সম্মান-অসম্মানের প্রশ্ন। বিশেষতঃ আন্দামান দ্বীপে তখন শত শত বাংগালী রাজনৈতিক বন্দী অনশন করিয়া জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে উদ্বেগজনক সময় অতিবাহিত করিতেছেন। এই প্রশ্নের সাথে কৃষক-খাতকের অর্থনৈতিক প্রশ্নের তুলনা হইতে পারে না।

উভয় পক্ষ হইতেই যুক্তি-তর্ক দেওয়া হইতে লাগিল। কিন্তু উভয় পক্ষ অটল রহিলেন। চার-পাঁচ ঘন্টা আলোচনায় এই অচল অবস্থার কোনও অবসান ঘটিল না। রাত প্রায় একটায় সময় সভা ভাগিয়া গেল। সকলেই বিমর্ষ হইয়া মিঃ গুণ্ডের বাড়ি হইতে বাহির হইলাম।

এই ঘটনা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু-নেতাদের অদূরদর্শী অনুদারতায়কিতাবে ছোট-ছোট ব্যাপার হইতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে দূরত্ব প্রসারিত হইয়াছে, এই ঘটনা তার একটা জামান প্রমাণ। যদি ঐদিন কংস কৃষক-প্রজা পার্টিতে আপোস হইয়া যাইত, তবে কি হইত একবার অনুমান করা যাক। হক সাহেবের মত সবল ও জনপ্রিয় নেতা কংগ্রেসের পক্ষে থাকিতেন, মুসলিম লীগে যাইতে বাধ্য হইতেন না। বাংলার কৃষক-প্রজারা কংগ্রেসের প্রতি আস্থাশীল হইত।

অধ্যাপক হুমায়ুন কবির নবাবধাদা হাসান আলী ও আমি নবযাদার বাড়িতে বসিয়া চরম অস্বস্তির মধ্যে ব্যাপারটার পর্যালোচনা করিলাম। কংগ্রেস-নেতাদের আবেগময়ী বক্তৃতার জবাবে শেষ পর্যন্ত আমরা রাজনৈতিক বন্দী মুক্তির দফাটা দুই নরে রাখিতেও রাখী হইয়াছিলাম, কেবল শর্ত করিয়াছিলাম যে লাট সাহেব ঐ প্রস্তাব ভেটো করিলে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করিবেন না। পদত্যাগ যদি করিতেই হয়, তবে প্রজাস্বত্ব ও মহাজনি আইন পাস করার পরই তা করা হইবে। কংগ্রেস-পক্ষ তাতেও রাযী হন নাই। আমরা তিন বন্ধুতে পর্যালোচনা করিয়া একমত হইলাম যে শরৎ বাবুকংগ্রেস-নেতাদের এই মনোতাবে অসন্তুষ্ট ও দুঃখিত হইয়াছেন। তিনি এই ইশুতে আপোস-রফা ভাংগিয়া দিতে রাখী ছিলেন না। অতএব আমরা ঠিক করিলাম রাজনীতির পাশ কর শরৎ বাবুর সাথে একা দেখা করিতে হইবে। এই রাত্রেই করিতে হইবে। কারণ আমাদের চক্ষে ঘুম নাই। আর একরাত্রে কত কি হইয়া যাইতে পারে।

৯. কংগ্রস-কৃষক প্রজা আপোস-চেষ্টা ব্যর্থ

যেমন কথা তেমনি কাজ। আমরা তিন বন্ধুতে গেলাম হক সাহেবের বাড়ি। তাঁকে অনেক বুঝাইয়া নিয়া গেলাম শরৎ বাবুর বাড়িতে। রাত্রি তখন আড়াইটা কি তিনটা। অনেক ডাকাডাকি করিয়া দারওয়ানকে জাগাইলাম। তার আপত্তি ঠেলিয়া ভিতরে গেলাম। হক সাহেবের নামের দোহাই-এ দারওয়ান অনিচ্ছা সত্ত্বেও উপরে গেল। প্রায় পনর বিশ মিনিট পরে মিসেস বোস নিচে নামিয়া আসিয়া জানাইলেন। তিনি খুবই দুঃখিত, শরৎ বাবুর মাথা ধরিয়াছে। বেদনায় ছটফট করিয়া এইমাত্র তিনি একটু সুমাইয়াছেন। তিনি কিছুতেই তাঁর ঘুম ভাংগাইবেন না।

আমরা অগত্যা নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। হক সাহেব শরৎ বাবুর উপর যা রাগিয়াছিলেন, তার সবটুকু ঢালিলেন আমাদের উপর। বিনা বাক্যব্যয়ে হক সাহেবের গালাগালি মাথায় লইয়া তাঁকে তাঁর বাসায় পৌঁছাইয়া দিলাম। আমরা সকলে একমত হইলাম যে কংগ্রেস নেতৃত্বের দোষে আজ বাংলার কপাল পুড়িল। পরবর্তী ঘটনাবলী আমাদের এই আশংকার সত্যতা প্রমাণ করিয়াছে।

ও-দিকে গুপ্ত সাহেবের বাড়িতে আমাদের আলোচনা-সভা চলিতে থাকা কালে মুসলিম লীগের এজেন্টরা কাছে-ন্যদিকেই ওৎ পাতিয়া সময় কাটাইতেছিলেন। আমাদের আপোস-রফা ভাংগিয়া যাওয়ার পরক্ষণেই তারা আমাদের সেক্রেটারি মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদকে একরূপ কিডন্যাপ করিয়া ঢাকার নবাব বাহাদুরের বাড়িতে নিয়া যান। মুসলিম লীগ নেতাদের অনেকেই সেখানে অপেক্ষা করিতেছিলেন। শামসুদ্দিন সাহেবের সহিত তারা আলোচনা করেন। শরৎ বাবুর বাড়ি হইতে সবে মাত্র আমরা হক সাহেবের বাড়িতে পৌঁছিয়াছি, অমনি শামসুদ্দিন সাহেব হাঁপাইতে-হপাইতে খবর লইয়া আসিলেন, হক সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী মানাসহ কৃষক-প্রজা পার্টির সমস্ত কার্যক্রম মানিয়া লইয়া মুসলিম লীগ আমাদের সাথে কোয়ালিশন করিতে রাযী হইয়াছেন। তখনকার মানসিক অবস্থায় হক সাহেব স্বভাবতঃই সোল্লাসে ঐ প্রস্তাব মানিয়া লইলেন। আমরাও অগত্যা সম্মতি জানাইলাম।

১০. হক মন্ত্রিসভা গঠন

হক মন্ত্রিসভা গঠন
দশই অধ্যায়

১. কৃষক-প্রজা-মুসলিম লীগ কোয়েলিশন

কংগ্রেস-নেতাদের সাথে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হওয়ায় লীগ-নেতাদের সাথে আলাপ আলোচনায় কোনও অসুবিধা হইল না। ফলে এক দিনেই সব ঠিক হইয়া গেল। এগার জনের মন্ত্রিসভা হইবে। মুসলমান ছয়, হিন্দু পাঁচ। মুসলিম ছয় জনের মধ্যে কৃষক প্রজা তিন, মুসলিম লীগ তিন। হিন্দু পাঁচ জনের মধ্য বর্ণহিন্দু তিন জন ও তফসিলী হিন্দু দুইজন থাকিবেন। মুসলিম লীগ মন্ত্রীদের নাম আগেই ঠিক হইয়া গিয়াছিল। কৃষক-প্রজা পার্টির তরফে হক সাহেব ছাড়া আর থাকিবেন মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী ও মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ। লীগ পক্ষে থাকিবেন নবাব বাহাদুর হবিবুল্লাহ, সার নাযিমুদ্দিন, মিঃ শহীদ সহরাওয়াদী। দুই-এক দিনের মধ্যে হিন্দু মন্ত্রীদেরও নাম ঠিক হইয়া গেল। বর্ণ হিন্দুদের পক্ষে থাকিবেন মিঃ নলিনী রঞ্জন সরকার, মিঃ বিজয় প্রসাদ সিংহ রায় ও কাসিম বাজারের মহারাজা শ্রীশ নন্দী। তফসিলী হিন্দুদের পক্ষে থাকিবেন মিঃ মুকুন্দ বিহারী মল্লিক ও মিঃ প্রসন্নদেব রায়কত।

২. গভীর রাত্রের নাটক

অতঃপর আমার কোনই কাজ ছিল না। তবু বন্ধুদের অনুরোধে সুয়ারিং-ই সিরিমনিটা দেখিবার জন্য কলিকাতায় আরেক দিন থাকিয়া গেলাম। পরদিন সুয়ারিং হইবে। সার্বিক শান্তি ও আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে হঠাৎ বিকালের দিকে গুজব রটিল বন্ধুবর শামসুদ্দিন বাদ পড়িয়া যাইতেছেন। শামসুদ্দিন সাহেব স্বভাবতঃই চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। আমরাও কম চঞ্চল হইলাম না। সন্ধ্যার শো সিনেমা দেখার প্ল্যান স্যাক্রিফাইস করিয়া বন্ধু-বান্ধব সহ হক সাহেবের কাছে গেলাম। তিনি গুজবের সত্যতা অস্বীকার করিলেন। আমরা খুশী হইয়া বিদায় হইলাম। কিন্তু হক সাহেব সকলকে বিদায় দিয়া শুধু আমাকে থাকিতে বলিলেন। রাত্রি নয়টার সময় তিনি একা আমাকে লইয়া বাহির হইলেন। ড্রাইভারকে কিছুই বলিলেন না। অথচ ডাইভার মাত্র পাঁচ-সাত মাইল বেগে যেন নিজের ইচ্ছামত গাড়ি চালাইতে লাগিল। অনেকক্ষণ চালাইল। মনে হইল সারা কলিকাতা শহর ঘুরিল। ঘোড়ার গাড়ি এমনকি রিকশা সামনে পড়িলেও তা পাশ কাটাইয়া গেল না। পিছন-পিছন যাইতে লাগিলাম। আমি প্রথমে এ সব কিছুই লক্ষ্য করিলাম না। কারণ হক সাহেব খুব উঁচু স্তরের কথাবার্তা বলিতে থাকিলেন। বাংলার সাত কোটি গরিব কৃষক-প্রজার ডাল-ভাত্রে ব্যবস্থা করিবার যে মহান দায়িত্ব ও পবিত্র কর্তব্য আল্লাহ আজ তাঁর ঘাড়ে চাপাইয়া দিয়াছেন, সেটা তিনি কেমন করিয়া যে পালন করিবেন, সে চিন্তায় তীর বুক কাঁপিতেছে। শুধু মুখে বলিলেন না, আমার একটা হাত টানিয়া নিয়া তীর বুকে লাগাইলেন। সত্যই তাঁর বুক ধড়ফড় করিতেছিল। পরম ভক্তিতে আমার বুক ভরিয়া গেল। এই সব কথার মধ্যে হক সাহেবের গাড়ি মাত্র দুইবার থামিল। একবার বেনিয়াপুকুর রোডের এক দর্যির দোকানে; আরেকবার মেছুয়া বাজার স্ট্রিটের এক হাকিম সাহেবের ডিস্পেনসারিতে। দুই জায়গায় তিনি বড় জোর আধ ঘন্টা খরচ করিলেন। বাকী সব সময় গাড়ি চলিতেই থাকিল। ঐ সব উঁচুস্তরের কথার উপসংহারে হক সাহেব বলিলেন যে তাঁর ঐ মহান দায়িত্ব পালনে গরিবের দুশমনরা অনেক রকমে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করিবে। এসব বিঘ্ন অতিক্রম করিতে আল্লাহ তাঁহাকে নিশ্চয়ই সাহায্য করিবেন। তবে তিনি সে কাজে আমার সহযোগিতার উপর অনেকখানি নির্ভর করেন।কারণ আমি মন্ত্রী-মেম্বর না হওয়ায় আমার মূল্য, সকলের কাছে অনেক বেশি। আমি গর্ব ও আনন্দে উৎসাহের সংগে সে আশ্বাস দিতে দিতেই গাড়ি আসিয়া একটা প্রাসাদের গাড়ি-বারান্দায় থামিল। একটা লোক দৌড়িয়া আসিয়া গাড়ির দরজা খুলিয়া হক সাহেবকে কুর্নিশ করিল। হক সাহেব বাহির হইলেন। অপর দিককার দরজা দিয়া আমি বাহির হইলাম। বাহির হইয়াই বুঝিলাম এটা মিঃ নলিনী রঞ্জন সরকারের লোয়ার সারকুলার রোডস্থ প্রসাদতুল্য বাড়ি ‘রঞ্জনী’। বারান্দার বিশাল ঘড়িতে দেখিলাম বারটা বাজিবার মাত্র পাঁচ মিনিট বাকী।

দারওয়ান আমাদেরে লইয়া দুতালায় ড্রয়িংরুমে পৌঁছাইল। বিশাল অপরূপ সজ্জিত ড্রয়িংরুম। সমস্ত ফার্নিচার শান্তি নিকেতনের তৈরি। রাবীন্দ্রিক প্যাটার্নের। এক নলিনী বাবু আমাদেরে অভ্যর্থনা করিলেন। বুঝিলাম এই এনগেজমেন্ট আগেরই ঠিক করা। বিশাল কামারার এক কোণে তিন জন ঘেষাঘেষি করিয়া বসিলাম। সংগে-সংগেই কফি আসিল। বেয়ারাকে বিদায় দিয়া নলিনী বাবু নিজে কফি তৈয়ার করিতে এবং কথা বলিতে লাগিলেন। হক সাহেব ও নলিনী বাবু উভয়েই বলিলেন যে আজিকার আলোচ্য বিষয়টা ভয়ানক গোপনীয়; সুতরাং আমি এটা কারও কাছে ঘুণাক্ষরেও বলিতে পারিব না সে মর্মে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হইবে। আমি যথারীতি সে প্রতিশ্রুতি দিলাম। এরপর অনেক ভূমিকা করিয়া, একজন অপর জনের সমর্থন করিয়া, একজন অপর জনের মুখ হইতে কথা কাড়িয়া নিয়া, যা বলিলেন তার সারমর্ম এই যে শামসুদ্দিন সাহেবকে মন্ত্রী করিতে লাট সাহেব অসম্মত হইয়াছেন। তাঁর জন্য যিদ করিলে, তাঁকে বাদ দিয়া মন্ত্রিসভা গঠন না করিলে, পরের দিন শপথ নেওয়া হয় না। মন্ত্রিসভা গঠনে বিলম্ব হইয়া যায়। শেষ পর্যন্ত হক সাহেবের মন্ত্রিসভা নাও হইতে পারে। ইউরোপীয় দল সায় নামুদ্দিনকে প্রধান মন্ত্রী করিবার চেষ্টা আজ, ত্যাগ করে নাই। লাট সাহেব শামসুদ্দিন সাহেবের বিরুদ্ধে গিয়াছেন এই জন্য যে শামসুদ্দিন সাহেব অতীতে জেল খাঁটিয়াছেন এবং বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দ্রোহিতার আই. বি. রিপোর্ট আছে। আমি তর্ক করিলাম : জেল-খাটা কংগ্রেস নেতাদের মন্ত্রী করিতে লাট-বড়লাটের খোশামোদ করিতেছেন, মন্ত্রী নির্বাচনের একক অধিকার প্রধান মন্ত্রীর লাট সাহেবের তাতে হস্তক্ষেপের কোনও অধিকার নাই। মন্ত্রিসভা গঠনের শুরুতেই যদি প্রধান মন্ত্রী লাট সাহেবের ধমকে কাৎ হইয়া পড়েন তবে লাট সাহেব সুবিধা পাইবেন, কৃষক-খাতকদের স্বার্থের প্রতি কাজেই লাট সাহেব বাধা দিবেন ইত্যাদি। আমার চেয়ে অনেক বয়স্ক ও অভিজ্ঞ এই দুই নেতা আমাকে অনেকক্ষণ ধরিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। আমি বুঝিলাম না। বরঞ্চ তাঁদের কথায় আমার সন্দেহ হইল যে লাট সাহেবের কথাটা ভাওতা মাত্র। এই দুই নেতাই শামসুদ্দিন সাহেবকে বাদ দিবার সংকল্প করিয়াছেন। কাজেই আমার যিদ বাড়িয়া গেল। তাছাড়া যুক্তিতেও তাঁরা আমার সহিত পারিয়া উঠিতেছিলেন না। তাঁদের একমাত্র যুক্তি ছিল এই যে শামসুদ্দিন সাহেবকে লাট সাহেব কিছুতেই গ্রহণ করিবেন না। তাঁরে নিয়া যিদ করিলে সার নাযিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হইয়া যাইতে পারেন। আমাদের কাছে তৎকালে এই এক যুক্তিই লাখ যুক্তির সমান। কাজেই আমি বোধ হয় দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিলাম। একদিকে প্রিয় বন্ধু ও কৃষক-প্রজা সমিতির সেক্রেটারি নির্যাতিত ও ত্যাগী দেশ-কমী শামসুদ্দিনের মন্ত্রিত্ব, অপর দিকে কোটি-কোটি কৃষক খাতকের স্বার্থ। বোধ হয় একটু বাহ্যজ্ঞানও হারাইয়া ছিলাম। খুব সম্ভব কল্পনা রাজ্যে বিচরণ করিতেছিলাম। দু’জনের কে ঠিক মনে নাই, একজন বলিলেন, শামসুদ্দিনের সীটটা খালি রাখিয়া পরের দিন দশজন মন্ত্রী লইয়া মন্ত্রিসভা গঠিত হইয়া যাক, পরে লাট সাহেবকে বুঝাইয়া-সুঝাইয়া রাযী করিয়া শামসুদ্দিনকে নিলেই চলিবে। আমি বোধ হয় মন্দের ভাল হিসাবে এতেই রাযী হইয়াছিলাম। কারণ এক সময় যখন নলিনী বাবু আমার জবাবের জন্য যিদ করিতেছিলেন, তখন আমার পক্ষ হইতে হক সাহেবই জবাব দিয়াছিলেন : সে ত জবাব দিয়াই দিছে। আগামীকাল দশজনের মন্ত্রিসভা করতে তার ত আপত্তি নাই। আবুল মনসুর, চল এইবার উঠি।

হক সাহেব সত্যসত্যই উঠিয়া পড়িলেন। আমি শেষ চেষ্টা স্বরূপ বলিলাম। ‘শামসুদ্দিনকে তবে কবে নেওয়া হৈব?’ হক সাহেব আমার হাত ধরিয়া টানিতে টানিতে বলিলেন : ‘লিভ ইট টুমি। আমি কি সমিতির সেক্রেটারি ছাড়া বেশি দিন মন্ত্রিত্ব করতে পারব? যত শীঘগির পারি তারে নিয়া নিবই। এইটা আমার ওয়াদা, তারে আমি একদিন মন্ত্রী করবই। তুমি কোনও চিন্তা কৈর না।‘

ফিরিবার পথে গাড়িতে হক সাহেব আমাকে বলিলেন : দেখছ মনসুর, বেটার শয়তানিটা? কি কৌশলেই না সে হিন্দু-মুসলিম মন্ত্রীদের সংখ্যা সমান করবার ব্যবস্থা কৈরা ফেলছে। নিশ্চয়ই বেটা লাটে বুদ্ধি এটা।

আমি চমকিয়া উঠিলাম। এই দিক হইতে ব্যাপারটা আমি মোট্রেই চিন্তা করি নাই ত। হক সাহেব আরও দেখাইলেন যে লোকটা যে শুধু হিন্দু-মুসলিম কোটাই ফিফটি ফিফটি করিতেছে তা নয়। মুসলিম কোটায় মুসলিম লীগের মোকাবিলায় হক সাহেবের পার্টির দুইজন করিতেছে। মন্ত্রিসভায় তাঁকে মাইনরিটি করিবার ব্যবস্থা হইয়াছে। প্রধান মন্ত্রী হইয়াও তিনি কিছু করিতে পারিবেন না। প্রজা-পার্টির কোটায় আর নেওয়াই বা যায় কাকে? আমি একগুয়েমি করিয়া দাঁড়াই নাই। রেযায়ে করিম ও হুমায়ুন কবিরটা ইলেকশনে ফেল করিয়াছে। হাসান আলীটা একেবারে নাবালক ইত্যাদি।

একদমে একতরফাভাবে এই সব কথা বলিতে-বলিতে গাড়ি আমার বাসার সামনে আসিয়া পড়িল। আমি কোনও জবাব দিতে পারিলাম না, আমার পায়ের একযিমাটা খুবই টাটাইতেছিল। এতক্ষণে শরীরে বেশ তাপ উঠিয়াছে বলিয়া মনে হইল। আদাব দিয়া বিদায় হইলাম। পরদিন সকাল দশটার আগেই তার বাসায় যাইতে আমাকে নির্দেশ দিয়া হক সাহেব চলিয়া গেলেন।

রাত্রে আমার একযিমাটা আরও বেশি টেকিয়া গেল। শরীরের তাপ বাড়িল। সকালে উঠিয়াই বুঝিলাম ঘটিতে পারি না। কুচকি ফুলিয়া গিয়াছে। কাজেই চেষ্টা চরিত করিয়া হক সাহেবের বাড়িতে পৌঁছাইতে আমার প্রায় এগারটা বাজিয়া গেল। তখন বোধ হয় আমার গায় এক শ’ তিন ডিগ্রি জ্বর। কিন্তু হক সাহেবের বাড়ি গিয়া যা শুনিলাম ও দেখিলাম, তাতে আমার জ্বর ছাড়িয়া শরীর-মন ঠাণ্ডা বরফ হইয়া গেল। নবাবযাদা হাসান আলী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির প্রভৃতি বন্ধুরা বিষণ্ণ মুখে কানাকানি করিতেছেন। আমার বিল দেখিয়া তাঁরা আমার উপর রাগ করিয়া আছেন। শামসুদ্দিন সাহেব ও আশরাফুদ্দিন সাহেব গোস্বা করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। এ সবের কারণ হক সাহেব শামসুদ্দিন সাহেবকে সংগে না লইয়াই শপথ নিতে চলিয়া গিয়াছেন। ইহাতে সবাই আপ-সেট হইয়া গিয়াছেন। গত রাত্রের ঘটনা বেচারারা কিছুই জানিতেন না। হক সাহেবের বাড়িতে যে লোকের ভিড় ছিল, তাঁদের অধিকাংশই স্বভাবতঃই আনন্দ-উল্লাসে মাতোয়ারা। বেচারা শামসুদ্দিনের কথাটা তাঁদের আনন্দের মাত্রা খুব বেণি কমাইতে পারে নাই। এই পরিবেশ আমাদের ভাল লাগিল না, অথবা আমাদের বিষণ্ণ মুখ তাঁদেরই ভাল লাগিল না। নিকটেই নবাবযাদা হাসান আলীর বাড়ি। আমরা সেখানে চলিয়া আসিলাম। ক্রমে সেখানেও ভিড় বাড়িল। আনেক গরম কথাবার্তা হইল। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্ত করা গেল না। আমার শরীরের তাপ ও একফিমার টাটানি অসহ্য হইল। নবাবদা তাঁর গাড়িতে আমাকে বাসায় পৌঁছাইয়া দিলেন। আমার বাসা মানে বন্ধুবর আয়নুল হক খাঁ সাহেবের বাসা। তিনি তখন ৪৯ নং আপার সারকুলার রোডে থাকিতেন। আমি তাঁর মেহমান ছিলাম। নবাবযাদার বাড়ির বৈঠকে সাব্যস্ত হইল যথাসম্ভব সত্বর কলিকাতায় উপস্থিত সমস্ত কৃষক-প্রজা নেতাদের একটি সভা ডাকিয়া আমাদের কর্তব্য ঠিক করা হইবে।

৩. হক-মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ

বিকালের দিকে খবর পাইলাম হক মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করিয়াছেন। শামসুদ্দিন সাহেবের জায়গা খালি রাখা হয় নাই। তাঁর স্থলে নবাব মোশাররফ হোসেন সাহেবকে দিয়া কৃষক-প্রজা-কোটা পূর্ণ করা হইয়াছে। আমি আসমান হইতে পড়িলাম। ভয়ানক রাগ হইল। এমন সময় হক সাহেবের একখানা পত্র পাইলাম। নবাব্যাদা নিজেই এই পত্র লইয়া আসিয়াছেন। চিঠিখানা খুবই লম্বা। তাতে তিনি তাঁর স্বাভাবিক ওজস্বিনী ভাষায় সমস্ত অবস্থা বর্ণনা করিয়াছেন। অপর পক্ষ তাঁকে মন্ত্রিসভায় মাইনরিটি করিবার যে ষড়যন্ত্র করিয়াছিল তা রুখিবার জন্যই তিনি শামসুদ্দিনের সীটটা খালি না রাখিয়া নবাব মোশাররফ হোসেনকে দিয়া তা পূর্ণ করিয়াছেন। নবাব। সাহেব কৃষক-প্রজা পার্টির কার্যক্রম পুরাপুরি গ্রহণ করিয়াছেন। হক সাহেব আমাকে বিশ্বাস করিতে অনুরোধ করিয়াছেন যে কেবল মাত্র কৃষক-প্রজা-পার্টির স্বার্থেই তিনি এ কাজ করিয়াছেন। আমি কারও কথায় যেন তাঁকে তুল না বুঝি। যে মুহূর্তে তিনি বুঝিবেন যে তাঁর পক্ষে প্রজার স্বার্থরক্ষা অসম্ভব হইয়াছে সেই মুহূর্তে তিনি পদত্যাগ করিবেন। আমি যেন তাঁর উপর আস্থা রাখিয়া তাঁর কাজে সহযোগিতা করি। আমি যেন তাঁর পক্ষ হইতে শামসুদ্দিনকে বলি : হক সাহেব শামসুদ্দিনের কথা ভুলেন। নাই, তুলিবেন না; তাঁকে তিনি একদিন-না-একদিন মন্ত্রী করিবেনই। উপসংহারে তিনি আমার অসুখের জন্য দুঃখ করিয়াছেন এবং আল্লার কাছে আমার রোগমুক্তির জন্য সর্বদাই দোয়া করিতেছেন, তা লিখিয়াছেন। প্রথম সুযোগেই তিনি আমাকে দেখিতে আসিবেন সে আশ্বাসও দিয়াছেন।

হক সাহেবের এই পত্র লইয়া বিশেষ চিন্তা করিবার অবসর পাইলাম না। একা দু-দশ মিনিট শুইয়া থাকিতে পারিলাম না। সারা বিকাল কৃষক-প্রজা-নেতা ও এম এল এ-দের যাতায়াত চলিল। সন্ধ্যার দিকে শুনিলাম, ঐদিন প্রজা-নেতাদের জরুরী বৈঠক দেওয়া হইয়াছে। আমার সুবিধার জন্য আমারই বাসায় স্থান করা হইয়াছে। দুতালার বিশাল ছাদে সভার আয়োজন হইয়াছে।

সন্ধ্যার পর সিঁড়িতে অবিরাম জুতার খটাখট আওয়াযে বুঝিলাম সভার সময় হইয়াছে। ইযিচেয়ারে শোওয়াইয়া ধরাধরি করিয়া আমাকে ছাদে তুলা হইল। দেখিলাম অল্প কালের মধ্যেই আলো ও আসনের সুন্দর ব্যবস্থা হইয়াছে। আশাতীত রকম নেতৃ-সমাগম হইয়াছে। গম্ভীর পরিবেশে আলোচনা শুরু হইল। অল্পক্ষণেই সভা গরম হইয়া উঠিল। বক্তাদের কথায় বুঝা গেল হক সাহেব ইতিমধ্যেই প্রচার করিয়াছেন, আমার সম্মতি লইয়াই ঐ ভাবে মন্ত্রিসভা গঠন করিয়াছেন। আমার নিকট হক সাহেব পত্র লিখিয়াছেন, একথা দেখিলাম অনেক বক্তাই জানেন। অনেকেই আমার নিন্দা করিলেন। দু-দশ জন আমার নিকট লেখা হক সাহেবের পত্র দেখিতে চাহিলেন। আমার সৌভাগ্য বশতঃ নিন্দার ভাগী আমি একা ছিলাম না। বন্ধুবর আশরাফুদ্দিনকে আমার চেয়ে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা হইল। অনেক বাই বলিলেন, চৌধুরী আশরাফুদ্দিনের চেষ্টাতেই শামসুদ্দিন সাহেবকে বাদ দিয়া নবাব সাহেবকে নেওয়া হইয়াছে। আশরাফুদ্দিন সাহেবনবাব সাহেবকে লইয়া একাধিকবার হক সাহেবের সাথে দেখা করিয়াছেন তারও চাক্ষুষ সাক্ষী পর্যন্ত পাওয়া গেল। চৌধুরী সাহেব ও আমি উভয়েই আত্মপক্ষ সমর্থন করিবার চেষ্টা করিলাম। চৌধুরী সাহেবের বক্তব্য আমার ঠিক মনে নাই। তবে যতদূর মনে পড়ে তিনি বলিয়াছিলেন যে শামসুদিন সাহেবকে বাদ দেওয়া যখন একদম অবধারিত হইয়া গিয়াছিল, তখনই তিনি নিতান্ত মন্দের ভাল হিসাবে ঐ ব্যবস্থায় রাযী হইয়াছিলেন। আমি অসুখের দরুল বেশি কথা বলিতে পারিলাম না। তবে হক সাহেবের পত্রখানা আমার খুব উপকারে লাগিল। তাতে ইহা স্পষ্ট বোঝা গিয়াছিল যে হক সাহেবের কাজে আমার পূর্ব-সম্মতি ছিল

৪. উপদেষ্টা বোর্ড

যা হোক, বক্তাদের উত্তাপ শেষ পর্যন্ত কমিয়া গেল। ধীর-স্থিরভাবে আলোচনা শুরু হইল। মন্ত্রিসভা বয়কট করা বুদ্ধিমানের কাজ হইবে না। তাতে হক সাহেবেকে জমিদারদের হাতে অসহায় অবস্থায় ছাড়িয়া দেওয়া হইবে, এ বিষয়ে আমরা একমত হইলাম। অতএব মন্ত্রিসভার উপর কড়া নযর রাখিয়া ইহার সহিত সহযোগিতা করিয়া যাওয়াই সাব্যস্ত হইল। সুষ্ঠভাবে এই কাজ করিবার উদ্দেশ্যে মন্ত্রিসভার একটা উপদেষ্টা বোর্ড গঠনের দাবি করা হইল। এই উপদেষ্টা বোর্ড গঠনে এবং তাতে প্রজ সমিতির মেজরিটির ব্যবস্থা করায় হক সাহেবকে রাযী করার ভার আমার উপর দেওয়া হইল। এইভাবে ভালয়-ভালয় সেদিনকার উত্তেজনাপূর্ণ সতার কাজ শেষ হইল।

হক সাহেবের ধারণা হইয়াছিল যে তাঁর পত্রের মর্ম অনুযায়ী আমিই সেদিনকার সতাটা সামলাইয়াছিলাম। কাজেই তিনি অতি সহজেই আমার প্রস্তাবে রাখী হইয়াছিলেন এবং মন্ত্রিসভাকে রাযী করিয়াছিলেন। সকল দলের ইলেকশনী ওয়াদার ভিত্তিতে একটি সাধারণ কর্মপন্থা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে শীঘ্রই একটি উপদেষ্টা বোর্ড গঠিত হইল। ইহাতে ছয়জন সদস্য থাকিলেন। এতে মুসলিম লীগের পক্ষে থাকিলেন নবাব বাহাদুর হবিবুল্লাহ, সার নার্যিমুদ্দিন ও মিঃ শহীদ সুহরাওয়াদী। কৃষক-প্রজা পার্টির তরফে থাকিলেন হক সাহেব, সৈয়দ নওশের আলী এবং আমি। প্রস্তাব হইল মন্ত্রিসভা এই উপদেষ্টা বোর্ডের প্রস্তাব কার্যকরী করিতে বাধ্য থাকিবেন। ফলে মন্ত্রী ও এম.এল.এরা এই বোর্ডকে ‘সুপার ক্যাবিনেট’ আখ্যা দিলেন।

ইতিমধ্যে বন্ধুদের চেষ্টায় এবং হক সাহেবের সহায়তায় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা হইল। অটো-ভ্যাক্সিন চিকিৎসায় আমি সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করিলাম। মন্ত্রিসভার কাজ পুরাপুরি শুরু হইবার আগেই উপদেষ্টা বোর্ডের সভা হওয়া দরকার। সে মতেই ইহার বৈঠক দেওয়া হইল এবং আমি মফস্বলের লোক বলিয়া আমার সুবিধার খাতিরে দিনের-পর-দিন ইহার বৈঠক চালাইবার ব্যবস্থা হইল। প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, মহাজনি আইন প্রণয়ন, কৃষিখাতক আইন অনুসারে সালিশী বোর্ড গঠন, প্রাথমিক শিক্ষা আইন কার্যকরী। করণ প্রভৃতি যরুরী প্রশ্নগুলি সম্বন্ধে সর্বসম্মত কর্মসূচী গৃহীত হইয়া গেল। কিন্তু দুইটি বিষয়ে একমত হইতে না পারায় দিনের পর দিন উহার আলোচনা পিছাইয়া যাইতে। লাগিল এর একটি জমিদারি উচ্ছেদ, অপরটি মন্ত্রি-বেতন। জমিদারি উচ্ছেদে মুসলিম। লীগ প্রতিনিধিরাও রাযী ছিলেন বটে, কিন্তু বিনা-ক্ষতিপূরণে তাঁরা কিছুতেই রাযী হইতেছিলেন না। আর মন্ত্রি-বেতন প্রশ্নে তাঁরা প্রজা-সমিতির নির্বাচনী ওয়াদা কিছুতেই গ্রহণ করিতেছিলেন না। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে কৃষক-প্রজা সমিতির নির্বাচনী ওয়াদায় ছিল মন্ত্রীরা এক হাজার টাকার বেশি বেতন নিতে পারিবেন। জমিদারি উচ্ছেদ সম্পর্কে আলোচনা লম্বা করা সম্ভব। কিন্তু মন্ত্রি-বেতনের আলোচনায় বিলম্ব করা যায় না। কারণ মাস গেলেই মন্ত্রীদের বেতন লইতে হইবে। কাজেই শেষ পর্যন্ত একদিন মন্ত্রি-বেতনের আলোচনা শুরু হইল। আমি প্রস্তাব দিলাম এবং সৈয়দ নওশের আলী সমর্থন করিলেন, মন্ত্রীরা এক এক হাজার টাকা বেতন পাইবেন। এই আলোচনায় একটি অপ্রিয় ঘটনা ঘটিয়াছিল এবং এই অপ্রিয় ঘটনা হইতেই পরবর্তীকালে জনাব শহীদ সাহেবের সহিত আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সেজন্য ঘটনাটি ঘোট হইলেও এখানে তার উল্লেখ করিতেছি। এক হাজার টাকা মন্ত্রি বেতনের নৈতিক ও অর্থনৈতিক যুক্তির বিরুদ্ধে লীগ-নেতাদেরও কিছু বলিবার ছিল না। তাঁদের একমাত্র যুক্তি ছিল, মাত্র এক হাজার টাকায় মন্ত্রীদের চলা অসম্ভব। সুতরাং প্রস্তাবটি অবাস্তব। লীগ নেতাদের এই যুক্তির জবাবে আমি বলিয়াছিলাম যে মন্ত্রীরা বিনা-তাড়ায় বাড়ি পাইবেন, বিনা-খরচে গাড়ি পাইবেন, ভ্রমণে টি এ. ডি.এ.পাইবেন, বিনা খরচে চাপরাশী আরদালী পাইবেন। সুতরাং হাজার টাকা বলিতে গেলে মন্ত্রীদের নিট আয় থাকিবে। অতএব টাকার অপ্রতুলতার যুক্তি ঠিক নয়। প্রস্তাবটা কাজেই অবাস্তব নয়।

আমার প্রস্তাবের সমর্থনে কংগ্রেসের পাঁচশ টাকা মন্ত্রি-বেতনের এবং অন্যান্য দেশের মন্ত্রি-বেতনের দু’একটা নযির দিলাম। এই তক স্বভাবতঃ খুবই গরম হইয়াছিল। উভয় পক্ষ হইতে তীব্র ও রুঢ় কথাও আদান-প্রদান হইতেছিল। হঠাৎ শহীদ সাহেব উত্তেজিত সুরে আমাকে বলিলেন : ‘তুমি দেড় শ টাকা আয়ের মফস্বলের উকিল। তুমি কলিকাতাবাসী ভদ্রলোকের বাসা-খরচের জান কি?’

আমি এই আক্রমণে আরও রাগিয়া গেলাম। পকেট হইতে এক টুকরা হিসাবের কাগ্য সশব্দে টেবিলের উপর রাখিয়া ক্রোধ-কম্পিত গলায় বলিলাম : এই হিসাবে কলিকাতাবাসী একটি ভদ্র-পরিবারের সমস্ত আবশ্যক খরচ ধরা হইছে। এতে শুধু মদ ও মাগির হিসাব ধরা হয় নাই। ও দুইটা ছাড়া আর কি এই হিসাবে বাদ পড়ছে, দেখাইয়া দেন।

শহীদ সাহেব রাগে চেয়ার ছাড়িয়া উঠিলেন। আমিও উঠিলাম। হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম আর কি? সভা ভাংগিয়া যায়। নবাব বাহাদুর হবিবুল্লাহ ছিলেন হাড়ে-মজ্জায় আদৎ শরিফ লোক। তিনি মধ্যে পড়িলেন। আমরা উভয়ে সমান দোষী হইলেও নিজের দলের শহীদ সাহেবকেই তিনি দোষী করিলেন এবং আমার কাছে মাফ চাইতে তিনি শহীদ সাহেবকে কড়া হুকুম দিলেন, অন্যথায় তিনি পদত্যাগ করিবেন বলিয়া হমকি দিলেন। কিন্তু এর দরকার ছিল না। শহীদ সাহেব দিল-দরিয়া লোক। তিনি হাত বাড়াইয়া শুধু আমার হাত ধরিলেন না, টানিয়া আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন এবং বলিলেন : মাফ কর এবং তুলিয়া যাও। আমিও ঐ কথা বলিলাম। উভয়েই উভয়কে মাফ করিলাম বটে, কিন্তু ভুলিলাম না। সেই হইতে আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়িতে লাগিল। পরবর্তীকালে তিনি অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজ দিয়া আমাকে বিশ্বাস করিয়াছেন এবং আমি সাধ্যমত সে বিশ্বাস রক্ষা করিয়াছি।

৫. নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভংগ

যাহোক শেষ পর্যন্ত স্থির হইল মন্ত্রি-বেতনের প্রশ্নটা কোয়ালিশন পার্টি মিটিং-এ দেওয়া হইবে। আমি এম, এল, এ. না হওয়া সত্ত্বেও এ্যাডভাইযারি বোর্ডের মেম্বর হিসাবে আমাকে পার্টি মিটিং ডাকা হইবে। আমি সানন্দে এই সিদ্ধান্ত মানিয়া লইলাম। কারণ আমি জানিতাম সকল দলের মেম্বরদের বিপুল সংখ্যাধিক্য লোক মন্ত্রি-বেতন হাজার টাকার পক্ষপাতী। কিন্তু পার্টি মিটিং-এর দিন আমি নিরাশ হইলাম। কারণ কৌশলী মন্ত্রীরা মেম্বারদের জন্য আড়াইশ টাকা বেতনের প্রস্তাব করিলেন এবং মেম্বরও মন্ত্রি-বেতনটা একই প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত করিলেন। তাতে মন্ত্রীদের বেতন আড়াই হাজার এবং প্রধান মন্ত্রীর জন্য অতিরিক্ত পাঁচশ টাকার ব্যবস্থা হইল। রকম সর্বসম্মতিক্রমে অর্থাৎ নেমক (বিনা প্রতিবাদে) প্রস্তাবটি পাস হইয়া গেল।

কৃষক-প্রজা কর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া শুরু হইল। চারিদিকেই নৈরাশ্য দেখা দিল। মন্ত্রিসভা গঠনে কৃষক-প্রজা সমিতির সুস্পষ্ট পরাজয় ঘটিয়াছে, এ ধারণা ক্রমে বন্ধমূল হইল। ইতিমধ্যে পরোক্ষ নির্বাচনে অধ্যাপক হুমায়ুন কবির সাহেবকে ব্যবস্থাপক সভার (উচ্চ পরিষদ) মেম্বর করিতে পারায় আমাদের একটু সুবিধা হইল। কৃষক-প্রজা কর্মীরা আমরা সবাই একমত ছিলাম যে আমাদের পক্ষ হইতে হক সাহেবের উপর ন্যর রাখা কর্তব্য। প্রথমতঃ ইউরোপীয় দল মুসিলম লীগ নেতারা এবং হিন্দু জমিদাররা হক সাহেবকে বাধ্য হইয়া প্রধানমন্ত্রী মানিয়া লইলেও তলেতলে তাঁকে ডিসক্রেডিট করিবার চেষ্টা তাঁরা চালাইয়া যাইতেছেন। দ্বিতীয়তঃ, হক সাহেব কখন কি করিয়া বসেন, তার ঠিক নাই। এ অবস্থায় হক সাহেবের সহিত ঘনিষ্ঠ ও তাঁর বিশ্বস্ত দু-এক জন কৃষক-প্রজা-নেতার সর্বদাই হক সাহেবের সংগে সংগে থাকা দরকার। শামসুদ্দিন সাহেব স্বভাবতঃই কাজ করিতে রাযী না হওয়ায় অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও নবাবযাদা হাসান আলীর উপর এই দায়িত্ব পড়িল।

সমিতির সেক্রেটারী শামসুদ্দিন সাহেবকে মন্ত্রী না করা হইছে কৃষক-প্রজা কর্মীদের মধ্যে যে অসন্তোষ ধূমায়িত হইতেছিল, মন্ত্রী-বেতন আড়াই হাজার ও মেম্বর-বেতন আড়াই শ’ রায় কর্মীদের মধ্যে সে অসন্তোষ আরও বাড়িয়া গেল। শেষ পর্যন্ত জমিদারি উচ্ছেদের প্রশ্নটাকে শিকায় তুলিয়া যখন ফ্লাউড কমিশন নিয়োগ করা হইল, তখন কর্মীদের অসন্তোষ প্রকাশ্য ক্রোধে পরিণত হইল। আমি স্বস্তির সংগে ময়মনসিংহ বসিয়া ওকালতি করিতে পরিলাম না। হক সাহেব আমাদের কথা রাখেন না দেখিয়া ‘দুত্তোর যা-ইচ্ছা তাই হোক’ বলিয়া রাজনীতি হইতে হাত ধুইয়াও ফেলিতে পরিলাম না। কেবলি মনে হইত, হক সাহেবের নেতৃত্বকে সফল করা এবং তাঁকে দিয়া কৃষক-প্রজা সমিতির নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করার দায়িত্ব আমার কম নয়। এই সব চিন্তা করিয়া অবসর পাইলেই, এমনকি অনেক সময় ওকালতি ব্যাঘাত করিয়াও, কলিকাতা ছুটিয়া যাইতাম। এতে মণ্ডকেলরা অসন্তুষ্ট হইতেন। আমার ব্যবসার অনিষ্ট হইত। কিন্তু আমি এটা উপক্ষো করিতাম। কারণ পাঁচ-সাত বছরের আমার এই অভিজ্ঞতা হইয়াছে যে স্বয়ং মণ্ডলেরাই এ সম্পর্কে দুই অবস্থায় দুই রকম কথা বলেন। একজন আসিয়া শুনিলেন আমি সেই রাত্রের ট্রেনেই অন্যত্র মিটিং করিতে যাইতেছি। পরদিনই তাঁর কেসের শুনানি। তিনি চিৎকার করিয়া বলিলেন : ‘আপনে যাইতেছেন সভা করতে; আমার কেসের তবে কি হৈব?’ আমি বলিতাম, ‘আমি হাকিমেরে কৈয়া রাখছি। দরখাস্ত দিলেই টাইম দিবেন।‘ তাতেও মওক্কেল সন্তুষ্ট হইতেন না। নিজের স্বার্থের কথা বাদ দিয়া আমার হিতের চিন্তা করিতেন। বলিতেন : ‘এভাবে কেবল সভা কৈরা বেড়াইলে আপনের ওকালতি চলব কেমনে?’ আমি হাসিয়া বলিতাম : ‘এর পর আর সভা-সমিতি না কৈরা শুধু ওকালতিই করব। কথা দিয়া ফেলছি বৈলাই আজ যাইতেছি।‘ কয়েকদিন পরে ঐ ভদ্রলোকই এক সভার আয়োজন করিয়া বিজ্ঞাপনে আমার নাম ঘোষণা করিয়া আমাকে নিতে আসিয়াছেন। আমি মাথা নাড়িয়া বলিলাম : ‘অসম্ভব, আমি যাইতে পারব না। কাল আমার খুব বড় মামলা আছে।‘ ভদ্রলোক বিস্মিত হইয়া বলিলেন : ‘ওঃ আপনেও শেষ পর্যন্ত টাকা চিনছেন? আপনেও যদি আর দশ জনের মতই টাকা রোযগারে ধাওয়া করেন, তবে প্রজা-আন্দোলন চাংগে তুইলাই যান। মামলার কপালে যাই থাকুক, আমাদের সভায় আপনের যাইতেই হৈব। আপনে না গেলে ঐ অঞ্চলের জনসাধারণ আমারে মাইরা ফেলব, আপনেরেও ছাড়ব না।‘ সুতরাং আমি মামলা মুলতবির ব্যবস্থা করিয়া সভা করিতে যাইতাম।

এইভাবে আমি কৃষক-প্রজা পার্টির পার্লামেন্টারি রাজনীতির সাথেও সম্পর্ক রাখিতে বাধ্য হইতাম। কলিকাতা যাতায়াত করিতাম। এতে আমার ওকালতির ব্যাঘাত, আর্থিক ক্ষতি ও পরিবারের কষ্ট হইত, বুঝতাম। কিন্তু উপায়ন্তর ছিল না। নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখিবার গরযেই তা করিতে হইত। প্রধান মন্ত্রী হক সাহেব আমার কথা রাখেন না, এ কথা এ জিলার কেউ বিশ্বাস করি না। তাদের ধারণা আমি হক সাহেবের উপদেষ্টা। আমার বুদ্ধি ছাড়া তিনি কখনও কোনও কাজ করেন না। হক সাহেবের এমন আস্থা আমি হারাইয়াছি, রাজনৈতিক চালে মুসলিম লীগের কাছে হারিয়া গিয়াছি, ময়মনসিংহের ভোটাররা কৃষক-প্রজা পার্টিকে ভোট দিয়া ভুল করিয়াছে, এসব কথা স্বীকার করিতেও আত্ম-সম্মানে কেমন বাধিত। পক্ষান্তরে বড়-বড় কথা বলিয়া ধাপ্লা দিয়া কৃষক-প্রজার ভোট নিয়াছি, এ কথাও বলা যায় না, কারণ কথাটা সত্য নয়। কাজেই বলিতে হয় হক সাহেব ঠিকই আছেন। মুসলিম লীগের জমিদার মন্ত্রীরা হিন্দু-জমিদার মহাজন মন্ত্রীদের সাথে জোট পাকাইয়া হক সাহেবকে কোন্‌ঠাসা করিয়াছেন। কথাটা যে একদম মিথ্যা নয়, তার প্রমাণও হাতে কলমে পাইলাম। আমার ‘নয়া পড়া’ নামে একটি শিশুপাঠ্য বই পাঁচ বছর ধরিয়া পাঠ্য থাকার পর আরবী-ফারসী শব্দের ‘আথিশয্য-দোষে’ বাদ গেল হক সাহেবের প্রধান মন্ত্রী-শিক্ষা মন্ত্রিত্বের আমলে। তিনি চিৎকার হৈ চৈ করিয়া ছাত ফাটাইয়াও প্রতিকার করিতে পারিলেন না। আমি আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হইলাম। দুঃখিত হইলাম। কিন্তু সহ্য করিলাম। রিযনেবল হইলাম।

চিন্তিত হইলাম তার চেয়ে বেশি। কৃষক-প্রজা-পার্টি ও কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সাথে মন্ত্রিসভার একটা সংঘাত ক্রমেই আসন্ন হইয়া আসিতেছে, তা স্পষ্টই দেখিতে পাইলাম।

 ১১. কালতামামি

কালতামামি
এগারই অধ্যায়

১. রাজনীতির দুই দিক

আমার নিজের দেখা রাজনীতির একটা যুগ এইখানে শেষ হইল। এক সালের হিসাব-নিকাশকে আমরা বলি সাল তামামি। একটা কালের হিসাব-নিকাশকে তাই কাল ভামামি বলিতে চাই। ইংরাজীতে যাকে বলা হয় রিট্রোসপেক্ট। কাল মানে এখানে একটা যুগ যুগ এখানে বার বছরের যুগ বা দশ বছরের ডিকেন্ড নয়। এটা একটা এরা, একটা যমানা, একটা আমল। জাতির ইতিহাসে ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ এক বিশেষ ধরনের ঘটনাবলীর একটা মুদ্দত। একটা পিরিয়ড। এই ঘটনাপুঞ্জ প্রধানতঃ রাজনীতিক।

এই রাজনীতির দুইটা দিক : একটা ভারতীয়, অপরটা বাংগালী। ভারতীয় রূপে এই রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মাইল খুটি এই কয়টি : খিলাফত ও স্বরাজ আন্দোলন। গান্ধীজী ও আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে সারা ভারতে একটা অপূর্ণ গণ-বিপ্লব। অভাবনীয় হিন্দু-মুসলিম মিলন। জিন্নার কংগ্রেস ত্যাগ। আন্দোলনের ব্যর্থতা। আকস্মিক অবসান। সাম্প্রদায়িক দাংগা। জিন্নার হিন্দু-মুসলিম-আপোস চেষ্টা। কংগ্রেসের অনমনীয় মনোভাব। গোল টেবিল বৈঠক। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন। কংগ্রেস ও লীগ কর্তৃক উহার প্রাদেশিক অংশগ্রহণ ও কেন্দ্রীয় অংশ বর্জন। কংগ্রেস কর্তৃক ছয়টি, মুসলিম লীগ কর্তৃক পাঁচটি প্রদেশে মন্ত্রিত্ব। ১৯১৬ সালের লাখনৌ প্যাকট নামে পরিচিত কংগ্রেস মুসলিম লীগ চুক্তি আমার দেখা রাজনীতির মধ্যে পড়ে না। কারণ ওটার সংগে আমার যে সাক্ষাৎ পরিচয় নাই, শুধু তাই নয়। ঐ সময়ে আমার কোনও রাজনৈতিক চেতনাই ছিল না। তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র মাত্র। ওটা যে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বিশ্বযুদ্ধের খবরের ভিড়ের মধ্যে তাও আমার মনে হয় নাই। কিন্তু, আমার দেখা রাজনীতির মধ্যেও উপরে তার যে একটা ইমপ্যাক্ট, একটা প্রভাব ছিল তা আমি পরে বুঝিয়াছিলাম।

রাজনীতির বাংগালী রূপে প্রজা-আন্দোলন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টা, তাঁর বেংগল প্যাক্ট, কলিকাতা কর্পোরেশনে তার প্রয়োগ শুরু, দেশবন্ধুর আকস্মিক মৃত্যু, কংগ্রেসের প্রজা-স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ, বেংগল প্যাট বাতিল, মুসলমানদের কংগ্রেস ত্যাগ ও প্রজা-সমিতি গঠন ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য মাইল খুঁটি। ১৯০৫ সালে পূর্ব-বাংলা ও আসাম প্রদেশের সৃষ্টি ও ১৯১১ সালে তা বাতিল আমার দেখা রাজনীতিতে পড়ে না। কিন্তু আমার দেখা রাজনীতির উপর তার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ইমপ্যাক্ট হইয়াছিল, তৎকালীন মুসলিম সমাজের মনোভাব হইতে তা স্পষ্ট বুঝা যাইত। তাদের চিন্তার প্রভাব আমার নিজের পরবর্তীকালের রাজনৈতিক চিন্তায়ও কম পড়ে নাই। সেটা অবশ্য বুঝিয়াছিলাম অনেক দিন পরে।

এতকাল পরে পিছন দিকে তাকাইয়া একজন রাজনৈতিক কর্মী লেখক ও সাংবাদিক হিসাবে আমার যা মনে পড়ে, তার সারমর্ম এই যে ভারতের মুসলমানরা আগা-গোড়াই একটা রাজনৈতিক স্বতন্ত্র সত্তা হিসাবেই চিন্তা ও কাজ করিয়াছে। এটা তারা খিলাফত যুগের ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই’ বলার সময়েও যেমন করিয়াছে, সাম্প্রদায়িক দাংগার সময় ‘মারি অরি পারি যে প্রকারে’ বলার সময়ও তেমনি করিয়াছে। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের পত্তন, ১৯১৫ সালের লাখনৌ প্যাক্ট, ১৯২৩ সালের বেংগল প্যাকট, ১৯২৮ সালে কলিকাতা কংগ্রেস হইতে ওয়াক-আউট, ১৯২৯ সালে সর্বদলীয় মুসলিম কনফারেন্স, জিন্নার চৌদ্দ-দফা রচনা, ১৯৩০-৩৩ সালে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে যোগদানও ইত্যাদি সব-তাতেই মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তা-ধারার এই দিকটা সুস্পষ্টরূপে ধরা পড়িয়াছে। কি কংগ্রেসের সাথে দেন দরবারে কি বৃটিশ সরকারের নিকট দাবি দাওয়ায়, এই কথাই বলা হইয়াছে। কি কংগ্রেসী মুসলিম নেতা আলী ভাই-আনসারী-আজমল খাঁ, কংগ্রেস বিরোধী নাইট নবাব সবাই এ ব্যাপারে মূলতঃ একই সুরে কথা বলিয়াছেন। কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও তারও আগে গোপাল কৃষ্ণ গোখেল-দাদাভাই নওরোযীর মত বাস্তববাদী উদার নেতা অনেক ছিলেন। তা না থাকিলে লাখনৌ প্যাকট হইত না। পরবর্তীকালে মিঃ সিঃ রাজা গোপালাচারির মত বাস্তববাদী দূরদশী হিন্দু নেতা না থাকিলে রাঁচি কনফারেন্সে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ সম্পর্কে ‘না গ্রহণ না বর্জন’ প্রস্তাবও গৃহীত হইত না। মুসলমানদের সাথে আপোস ও সহযোগিতা করিতে এঁরা অনেকদূর অগ্রসর হইতে রাযী ছিলেন। তাই তুর্কী সাম্রাজ্য ভাগ করিয়া ইংরাজ ফরাসী–গ্রীসের মধ্যে বন্টন করিয়া নেওয়ার প্রতিবাদে মুসলিম ওলামারা যখন শেখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে তর্কেমমাওয়ালাত (অসহযোগিতা) আন্দোলন ও আলী ভাই-র নেতৃত্বে ১৯২০ সালে খিলাফত আন্দোলন শুরু করেন, তখন এই আন্দোলনের মধ্যে প্যানইসলামিযমের বীজ আছে জানিয়া গান্ধীজীর নেতৃত্বে হিন্দুরা খিলাফত আন্দোলনকে নিজের করিয়া লন। খিলাফত আন্দোলনকে ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তির ধর্মীয় আন্দোলন বলিয়া মিঃ জিয়ার মত মুসলিম নেতা যেখানে ঐ আন্দোলনে যোগ দেন নাই, সেখানে হিন্দু নেতৃবৃন্দ অতি সহজেই এই আন্দোলন হইতে দূরে থাকিতে পারিতেন। কিন্তু তাঁরা তা করেন নাই। কারণ এরা হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে সত্যই বিশ্বাসী ছিলেন এবং খিলাফতকে মুসলমানের ধর্মীয় দাবি বলিয়া বিশ্বাস করিতেন। মহাত্মা গান্ধী ১৯২০ সালে তাঁর ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ নামক ইংরাজী সাপ্তাহিকে লেখেনঃ ‘হিন্দু-মুসলিম একতা ছাড়া ভারতের কোনও মুক্তি নাই। গান্ধীজীর আগেও গোখেল-দাদাভাই হিন্দু-মুসলিম একতার উপর খুবই জোর দিয়াছিলেন। কিন্তু হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে গান্ধীজীই সর্ব প্রথম হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে ভারতের মুক্তির অপরিহার্য শর্ত ‘সাইন-কোয়া-ন’ রূপে পেশ করেন। অবশ্য তাঁরও আগে জিয়া সাহেব বলিয়াছিলেনঃ ‘হিন্দু-মুসলিম একতা ছাড়া ভারতের মুক্তি নাই। কিন্তু মাইনরিটি মুসলমানের মুখেও মেজরিটি হিন্দুর মুখে কথাটার তাৎপর্য অনেক বেশ কম। হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে একমাত্র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনই কথাটাকে কাজে প্রয়োগ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু নিখিল ভারতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধতায় দেশবন্ধুর অরকাল স্থায়ী রাজনৈতিক জীবনে তা সফল হয় নাই। তাঁর অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুর পর দেশবন্ধুর অনুসারী বাংলার হিন্দু নেতৃবৃন্দ নিজেরাই দেশবন্ধুর বেংগল প্যাকট বাতিল করিয়া ভারতীয় হিন্দু-নেতৃত্বের সাথে এক কাতারে দাঁড়ান।

২. সাম্প্রদায়িক মিলনের দুই রূপ

এইসব ঘটনা হইতে দুইটা সত্য প্রকট হইয়া উঠে। এক, ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্ব স্বত্ত্ব সত্তা বজায় রাখিয়া হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের চেষ্টা করিয়াছেন। এক শ্রেণীর উদারপন্থী হিন্দু নেতা মুসলিম দাবি-দাওয়া মানিয়া লইয়া সাম্প্রদায়িক ঐক্যের সদিচ্ছা প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু অধিকাংশ হিন্দু মতের চাপে তাঁরা পিছাইয়া গিয়াছেন। দুই, এই ঐক্যচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণ এই যে ঐক্যবাদী মুসলিম নেতৃত্ব ও ঐক্যবাদী হিন্দু-নেতৃত্বের মধ্যে একটা মৌলিক বিরোধ ছিল। মুসলিম নেতৃত্ব চাহিয়াছিলেন দুই স্ব সত্তার মধ্যে রাজনৈতিক মিলন বা ফেডারেশন। পক্ষান্তরে হিন্দু-নেতৃত্ব চাহিয়াছিলেন সার্বিক মিশ্রণ বা ফিউশন। একমাত্র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনই তাঁর উদার দূরদৃষ্টি বলে হিন্দু-মুসলিম-ঐক্যের বাস্তব রূপ দেখিতে পাইয়াছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম-ঐক্যের পক্ষে দরদী ভাষায় প্রাণস্পর্শী বাগিতায় বলিয়াছিলেন : ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্য অর্থ সংমিশ্রণ নয়, মিলন। ফিউশন নয় ফেডারেশন। দুইটি স্বতন্ত্র সত্তাবিশিষ্ট সম্প্রদায় রাজনৈতিক কারণে ও উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হইবে মাত্র; মিশিয়া এক সদায় হইয়া যাইবেন না। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য অর্থ যদি দুই সম্প্রদায়ের মিশ্রণে এক সম্প্রদায় হওয়ার কথা হইত, তবে আমি সে ঐক্যের কথা বলিতাম না।‘ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ছিলেন নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব হিন্দু। নিজের ধর্মমতে তাঁর অটুট প্রাণ-ভরা আস্থা ছিল। সে আস্থায় কোনও দ্বেষ ছিল না। ছিল শুধু ভালবাসা। তাই দেশবাসী মুসলমানের ধর্মের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ছিল তাঁর। নিজের বাপকে যে সন্তান শ্রদ্ধা করে, পরের বাপের প্রতি সেকদাচ অশ্রদ্ধা দেখাইতে পারেনা। ইহাই ছিল দেশবন্ধুর জীবনদর্শন। নিষ্ঠাবান হিন্দু হইয়াও হিন্দু-মুসলিম এঁকে কেমন করিয়া আন্তরিক বিশ্বাস করা যায়, দেশবন্ধু ছিলেন তার আদর্শ নিদর্শন। দেশবন্ধু পরে আমি আর একজন মাত্র বাংগালী হিন্দু নেতার মধ্যে এই গুণ দেখিয়াছি। ইনি ছিলেন সুভাষ বাবুর জ্যেষ্ঠ সহোদর মিঃ শরৎ বসু। তিনি দেশবন্ধুর মতই নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন। পূজা-অর্চনায় বিশ্বাস করিতেন। নিজের ধর্ম-মরে জন্য যে কোনও ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলেন। এমন ধর্ম-নিষ্ঠ হিন্দু শরতবাবু মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় প্রাপ্যাধিকার মানিয়া লইতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ও সংকোচ বোধ করিলে না।

কিন্তু অধিকাংশ হিন্দু নেতা চাহিতেন হিন্দু-মুসলমানে মিশ্রণ। তাই বলিয়া এঁরা সকলে দেশবন্ধু ও শরৎবাবুর মত নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন না। হিন্দুধর্মের প্রতি তাঁদের কোনও আস্থা ছিল না, তা নয়। হিন্দু-মুসলিম দুই সামাজিক পৃথক সত্তার স্থলে মিশ্রিত এক সম্প্রদায় হওয়ার অর্থে তাঁরাও না-হিন্দু-না মুসলমান কোনও নয়া সম্প্রদায় বুঝিতেন না। তাঁরা বুঝিতেন মাইনরিটি মুসলমান সমাজ বিপুল বেগবান হিন্দু সম্প্রদায়ে ‘হইবে লীন’। যেমন ক্ষুদ্র জলাশয়ের জল মহাসমুদ্রে লীন হয়। এটাকে তাঁর অন্যায় বা অসম্ভব মনে করিতেন না। ধর্মে পৃথক হইয়াও যখন ব্রাহ্ম-খৃষ্টান বৌদ্ধ জৈন-পার্শি-গুর্গা-শিখেরা মহান হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত থাকিতে বাধে নাই, তখন মুসলমানের বাধিবে কেন?

মুসলিম নেতৃবৃন্দ স্পষ্টতঃই এমন ঐক্যে বিশ্বাস করিতেন না। মুসলিম নেতারা এটাকে নিছক একটা রাজনৈতিক ঐক্য হিসাবে দেখিয়াছেন। সামাজিক ঐক্য হিসাবে দেখিবার উপায় ছিল না। হাজার বছর মুসলমানরা হিন্দুর সাথে একদেশে একত্রে বাস করিয়াছে। হিন্দুদের রাজা হিসাবেও, হিন্দুদের প্রজা হিসাবে। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই হিন্দু-মুসলমানে সামাজিক ঐক্য হয় নাই। হয় নাই এইজন্য যে হিন্দুরা চাহিত আর্য-অনাৰ্য্য শক-হন যে ভাবে মহাভারতের সাগরতীরে লীন হইয়াছিল, মুসলমানরাও তেমনি মহান হিন্দু সমাজে লীন হইয়া যাউক। তাদের শুধু ভারতীয় মুসলমান থাকিলে চলিবে না, ‘হিন্দু-মুসলমান’ হইতে হইবে। এটা শুধু কংগ্রেসী বা হিন্দু-সভার জনতার মত ছিল না, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথেরও মত ছিল।

. অবাস্তব দৃষ্টিভংগি

এই কারণে ১৯২০ হইতে ১৯৪০ সাল এই বিশ বছরে ভারতীয় রাজনীতির হিন্দু-মুসলিম আপোস চেষ্টা প্রধানতঃ যুক্ত বনাম পৃথক নির্বাচন প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই নির্বাচনের প্রশ্নটাকে হিন্দুরাজনীতিক নেতৃত্ব কিরূপ গুরুত্বপূর্ণ মনে করিতেন সেটা প্রমাণিত হয় তফসিলী হিন্দুদের পৃথক-নির্বাচনাধিকার স্বীকৃতির বিরুদ্ধে মহাত্মাজীর আমরণ অনশন-ব্রতে। ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদে মুসলমানদের মত তফসিলী হিন্দুদেরও পৃথক নির্বাচন দেওয়া হইয়াছিল। ১৯৩২ সালের আগস্ট মাসে যখন এই এওয়ার্ড ঘোষণা করা হয়, তখন মহাত্মাজী পুণা জেলে বন্দী। সেখান হইতেই তিনি সেপ্টেম্বর মাসে এই ব্যবস্থার প্রতিবাদে আমরণ অনশন-ব্রত গ্রহণ করেন। তফসিলী নেতৃবৃন্দ শুধুমাত্র মহাত্মাজীর জান বাঁচাইবার জন্য আসন সংরক্ষিত যুক্ত নির্বাচন প্রথা মানিয়া লন। বৃটিশ সরকারও ত্বরিতে এই প্রস্তাব মানিয়া লইয়া এওয়ার্ড সংশোধন করেন। মহাত্মাজী অনশন ভংগ করেন। লক্ষণীয়, মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের প্রতিবাদে মহাত্মাজী অনশন করেন নাই। কারণ সুস্পষ্ট। প্রথমতঃ মুসলমানদের পৃথক নির্বাচন অধিকার আগে হইতে স্বীকৃত ছিল। দ্বিতীয়তঃ গান্ধীজী মুসলমানদের পৃথক সত্তা স্বীকার করিতেন। সুতরাং দেখা যাইতেছে, পৃথক নির্বাচনকে হিন্দু-নেতৃবৃন্দ বরাবরই এই নযরে দেখিয়া আসিয়াছেন। মুসলিম নেতৃত্বও কাজেই অন্য ন্যরে দেখেন নাই। এই কারণেই মুসলিম নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলী ভাই, ডাঃ আনসারী, মাওলানা আযাদ প্রভৃতি যাঁরা বরাবর যুক্ত নির্বাচন সমর্থন করিয়াছেন, তাঁরা অবিমিশ্র যুক্ত নির্বাচন চান নাই। ‘মোহাম্মদ আলী ফরমুলা’ নামে মওলানা মোহাম্মদ আলীর প্রস্তাবিত যে নির্বাচন পদ্ধতি একবার আলোচনার বিষয়বস্তু হইয়াছিল, তাতেও দুই স্তরে নির্বাচন হওয়ার প্রস্তাব ছিল। প্রথম স্তরে শুধু মুসলিম ভোটাররা আসন-সংখ্যার চেয়ে বেশি প্রার্থী নির্বাচন করিবে। ঐ নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্য হইতেই দ্বিতীয় স্তরে হিন্দু মুসলমান যুক্ত ভোটে মেম্বর নির্বাচিত হইবেন। পদ্ধতিগত-মত-বিরোধে শেষ পর্যন্ত এই স্কীমও পরিত্যক্ত হয়। নির্বাচন প্রথার প্রশ্নকে হিন্দু নেতৃবৃন্দ এমন গুরুত্ব দিতেন বলিয়াই প্রতিনিধিত্ব ও সরকারী চাকুরির হারের বেলা তাঁরা নিতান্ত বানিয়া-নীতিতে দরকষাকষি করিয়াও একটু-একটু করিয়া ডোর ছাড়িয়াছেন। কিন্তু কিছু বেশি আসনের বদলে নির্বাচনের বেলা এক ইঞ্চি টলেন নাই। লাখনৌ প্যাটে স্বতন্ত্র নির্বাচন মানিয়া লইয়া যে সব হিন্দু-নেতা ভুল করিয়াছিলেন, হিন্দুরা কোনদিন তাঁদের ক্ষমা করেন নাই। তেমন ভুলের পুনরাবৃত্তি করিতেও তাঁরা রাযী ছিলেন না।

দৃষ্টিকোণের এই মৌলিক পার্থক্য হেতু হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সবচেয়ে বাস্তবদশী মুসলিম প্রবক্তা জিন্না সাহেবকে হিন্দু নেতারা ভুল বুঝিয়াছিলেন। মুসলিম নেতাদের মধ্যে একমাত্র মিঃ জিন্নাই রাজনৈতিক সংগ্রামে হিন্দু-মুসলিমকে ও কংগ্রেস-লীগকে খুব কাছাকাছি রাখিয়া চলিয়াছেন। সাম্প্রদায়িক আপোসে হিন্দু নেতৃত্বের অনমনীয় মনোভাবের মুখেও তিনি কংগ্রেসের সাথে একযোগে মুসলিম লীগকে দিয়া সাইমন কমিশন বয়কট করাইয়াছেন। রাউভটেবল কনফারেন্সে ভারতবাসীর রাষ্ট্রীয় দাবি-দাওয়া ও ডোমিনিয়ন স্টেটাসের পক্ষে কঠোর ইংরাজ বিরোধী বক্তৃতা করিয়াছেন। ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস লীগে নির্বাচনী মৈত্রী করিয়াছেন। বাংলা পাঞ্জাব সিন্ধু সরহদ্দ প্রভৃতি মুসলিম মেজরিটি প্রদেশ জিন্না সাহেবের এই লীগ-কংগ্রেস নির্বাচনী-মৈত্রী মানিয়া লয় নাই সত্য, কিন্তু যুক্তপ্রদেশ বোম্বাই মাদ্রাজ প্রভৃতি মুসলিম মাইনরিটি প্রদেশে সে চুক্তি ফলপ্রসূ হইয়াছিল। তথাপি কংগ্রেস ঐসব প্রদেশে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিবার সময় মুসলিম লীগের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মানিয়া লইতে অস্বীকার করিল। নির্বাচনের আগে ও পরে কংগ্রেসের এই দুই রকম মতকে জিন্না সাহেব বিশ্বাস ভংগ মনে করেন। ফলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে তাঁর আজীবন আস্থা একরূপ ভাংগিয়া যায়। কিন্তু তাতেও জিন্না সাহেব তাঁর আসল ভূমিকা হইতে মুহূর্তের জন্য বিচ্যুত হন নাই! সেকথাটা একটু পরে বলিতেছি।

৪. বাংগালী জাতীয়তা বনাম ভারতীয় জাতীয়তা

হিন্দু-নেতৃত্বের অনমনীয় মনোভাবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্রদর্শিত পথ হইতে তাঁদের অদূরদর্শী বিচ্যুতিতে কিভাবে রাজনীতির মোড় ফিরিয়াছিল, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমি লাভ করিয়াছি বাংলার রাজনীতিতে। বাংলার রাজনীতি ভারতীয় রাজনীতি হইতে ছিল বেশকিছু পৃথক ও স্বতন্ত্র। নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে হিন্দুরা যে নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক শাসন চাহিতেন, বাংলার বেলা তা চাহিতেন না। বাংগালী হিন্দুরা বাংলায় মেজরিটি শাসন ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন উভয়টারই বিরোধী ছিলেন। এটা ছিল অবশ্য হিন্দুদের সাম্প্রতিক মনোভাব। উনিশ শতকের শেষে বিশ শতকের গোড়ার দিকে হিন্দু কবি সাহিত্যিক ও রাষ্ট্র নেতারা ‘বাংগালী জাতিত্ব’ ‘বাংলার বিশিষ্ট’ ‘বাংলার কৃষ্টি’ ‘বাংলার স্বাতন্ত্র’ ইত্যাদি প্রচার করিতেন। অনেকে বিশ্বাসও করিতেন। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় ভোটাধিকার প্রসারে বাংলার রাষ্ট্রীয় অধিকার মেজরিটি মুসলমানের হাতে চালিয়া যাইবে এটা যে দিন পরিষ্কার হইয়া গেল, সেই দিন হইতেই হিন্দুর মুখে বাংগালী জাতিত্বের কথা, বাংলার কৃষ্টির কথা আর শোনা গেল না। তার বদলে ‘ভারতীয় জাতি’ ‘ভারতীয় কৃষ্টি’ ‘মহাভারতীয় মহাজাতি’ ও ‘আৰ্য সভ্যতার’ কথা শোনা যাইতে লাগিল। এর কারণও ছিল সুস্পষ্ট। শেরে-বাংলা ফজলুল হক একদা বলিয়াছিলেন : ‘পলিটিকস অব বেংগল ইয় ইন রিয়েলিটি ইকনমিক্স অব বেংগল। বাংলার অর্থনীতিই বাংলার আসল রাজনীতি। খুব সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিপর্যয়ে বাংলার গোটা মুসলমান সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অধঃপতিত জাতিতে পরিণত হয়। ধর্ম ও কৃষ্টির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম দুইটা স্বতন্ত্র সমাজ আগে হইতেই ছিল। অর্থনীতিতে মুসলমানদের এই অধঃপতনে জীবনের সকল স্তরে হিন্দু ও মুসলমান সুস্পষ্ট দৃশ্যমান দুইটা পৃথক জাতি হইয়া গেল। পরিস্থিতিটা এমন হৃদয়বিদারক ছিল যে কংগ্রেসের নিষ্ঠাবান কর্মী হইয়াও আমি কংগ্রেস সহকর্মীদের সামনে জনসভায় কঠোর ভাষায় এই পার্থক্যের কথা বলিয়া হিন্দু বন্ধুদের বিরক্তি ভাজন হইতাম। আমি বলিতাম : বাংলার জমিদার হিন্দু প্রজা মুসলমান বাংলার মহাজন হিন্দু খাতক মুসলমান; উকিল হিন্দু মক্কেল মুসলমান; ডাক্তার হিন্দু রোগী মুসলমান; হাকিম হিন্দু আসামী মুসলমান; খেলোয়াড় হিন্দু দর্শক মুসলমান; জেইলার হিন্দু কয়েদী মুসলমান ইত্যাদি ইত্যাদি। এইভাবে আমি তালিকা বাড়াইয়া যাইতাম। যতই বলিতাম ততই উত্তেজিত হইতাম। ততই তালিকা বাড়িত। হাজারবার কওয়া এই কথাগুলিই তীব্রতম কর্কশ ভাষায় বলিয়াছিলাম ১৯৩৩-৩৪ সালে ময়মনসিংহের এক রিলিফ কমিটির বৈঠকে। সেবার ব্রহ্মপুত্র নদীতে বন্যা হইয়া দুকুল ভাসিয়া গিয়াছিল। বন্যা-পীড়িত দুর্গতদের জন্য অন্যান্যদের মত বার এসোসিয়েশনের পক্ষেও একটা রিলিফ কমিটি করা হয়। বেশ টাকা উঠিয়াছিল। প্রায় সব টাকাই হিন্দুরাই দিয়াছিলেন। মুসলমানদের দান খুবই নগন্য। এই তহবিলের টাকা বন্টনে এক সভায় সমিতির প্রেসিডেন্ট রায় বাহাদুর শশধর ঘোষের সাথে আমার তর্ক বাধে। তিনি আমাকে স্মরণ করাইয়া দেন যে চাঁদাদাতারা প্রায় সবাই হিন্দু। আর যায় কোথায়? আমি গর্জিয়া উঠিলাম। আমার হাজার-বার-কওয়া ঐসব কথা মুখস্থ বলিয়া গেলাম এবং উপসংহার করিলাম : অতএব বাংলার দাতা হিন্দু ভিক্ষুক মুসলমান। রায় বাহাদুর ও সমবেত মেম্বরদেয়ে আমি স্মরণ করাইয়া দিলাম বাংলার হিন্দুদের যার ঘরে যত টাকা আছে সব টাকা মুসলমানের। মুসলমান চাষী-মজুরের মাথার-ঘাম পায়ে ফেলিয়া-রোযগারকরা টাকায় হিন্দুরা সিন্দুক ভরিয়াছে, দালান ইমরাত গড়িয়াছে; গাড়ি-ঘোড়া দৌড়াইতেছে। রায় বাহাদুরের নিজের টাকা ব্যাংক ও বাড়ির কথাও উত্তেজনার মুখে বলিয়া ফেলিলাম। রায় বাহাদুরসহ উপস্থিত সকলে হতভম্ব হইয়া গেলেন। কিন্তু রায় বাহাদুর ছিলেন বিচক্ষণ সুচতুর জ্ঞানী লোক। তিনি রাগ গোপন করিলেন। বিতরণের পন্থা হিসাবে আমার প্রস্তাবটা মানিয়া লইলেন, আসন্ন ঝড় কাটিয়া গেল। ব্যাপারটার মধুর উপসংহার হইল।

৫. প্রজা আন্দোলনের স্বরূপ

এটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। কারণ ব্যাপারটা অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজ জীবনের সকল খুটিনাটিতেও এই পার্থক্য পবিত, প্রকটিত ও প্রতিফলিত হইয়াছিল। বাংলার মুসলমানদের নিজের আন্দোলন বলিতে ছিল একমাত্র প্রজা-আন্দোলন। তিতুমীর পীর দুদু মিয়া ও ফকির আন্দোলনের ঐতিহাসিক পুরাতন নযির টানিয়া না আনিয়াও বলা যায়, বাংলার প্রজা-আন্দোলন খিলাফত-স্বরাজ আন্দোলনেরই দশ বছর আগেকার আন্দোলন। আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা হইতেই বলিতে পারি, এ আন্দোলন গোড়ায় ছিল মুসলমানদের সামাজিক মর্যাদার দাবি। শুধু হিন্দু জমিদাররাই মুসলমান প্রজাদিগকে তুই-তুংকার করিয়া অবজ্ঞা করিতেন এবং তাঁদের কাঁচারিতে ও বৈঠকখানায় এদের বসিতে আসন দিতে অস্বীকার করিতেন, তা নয়। তাঁদের দেখাদেখি তাঁদের আমলা-ফয়লা তাঁদের আত্মীয়স্বজন, তাঁদের ঠাকুর-পুরোহিত, তাঁদের উকিল-ডাক্তাররাও মুসলমানদের নিজেদের প্রজা ও সামাজিক মর্যাদায় নিম্নস্তরের লোক মনে করিতেন। এটা জমিদারপ্রজার স্বাভাবিক সাধারণ সম্পর্ক ছিল না। ছিল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক। কারণ একদিকে বামন-কায়েত প্রজারা জমিদারের কাছারি বৈঠকখানায় বসিতে পাইত। অন্যদিকে বর্ণ হিন্দুর কাছে অমন নিগৃহিত হইয়াও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু তালুকদার বা ধনী মহানজরাও মুসলমানদের সাথে বর্ণহিন্দুদের মতই ব্যবহার করিত।

এইভাবে ব্যবহারিক জীবনে বাংলার হিন্দু ও মুসলমানরা ছিল দুইটি পৃথক সমাজ, ভিন্ন জাত ও স্ব সম্প্রদায়। এদের মিশ্রণে এক সম্প্রদায় ছিল কল্পনাতীত। বিরাট ধর্মীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না। হিন্দুর দিক হইতেও না মুসলমানের দিক হইতেও না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন যে এই দুই সম্প্রদায়ের স্বান্ত বজায় রাখিয়া হিন্দু-মুসলিম ফেডারেশন করিতে চাহিয়াছিলেন, সেটা মুসলমানের চেয়ে হিন্দুর মনের দিকে কম চাহিয়া নয়। এটাই ছিল রাজনৈতিক বাস্তববাদ। অধিকাংশ হিন্দুনে দেশবন্ধুর এই বাস্তব দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন না বলিয়াই তাঁর অবর্তমানে বাংলার মুসলমানরা কংগ্রেস ছাড়িয়া প্ৰজা-পার্টি গঠন করিয়াছিল। সকল দলের সকল মতের এমনকি পরস্পর বিরোধী মতের মুসলমানরা যে ১৯২১ সালে সার আবদুর রহিমের নেতৃত্ব প্রজা-সমিতি গঠন করেন এবং কংগ্রেসী-অকংগ্রেসী জেল-খাটা প্রমহী ও খেতাবধারী মডারেটরা এক পার্টিতে মিলিত হইতে পারেন, এটা বাহির হইতে বিশ্বয়কর মনে হইলেও আসলে তা ছিল না। এক বছর আগে বাংলার আইন পরিষদে কংগ্রেসী হিন্দু মেষরাই প্রজাস্বত্ব বিলের ভোটাভুটিতে এই সাদায়িক কাতারবন্দি এলাইনমেন্ট করিয়া সেই পথ প্রদর্শন করিয়াছিলেন। সে বিলে কংগ্রেসী-অকশ্রেণী প্রজা-জমিদার সব হিন্দু জমিদারের পক্ষে এবং কংগ্রেসী-অকংগ্রেসী প্রজা-জমিদার সব মুসলমান প্রজার পক্ষে ভোট দিয়াছিলেন। তাই প্রজা-সমিতি নামে ও রপে অসাম্প্রদায়িক হইলেও উপরোক্ত কারণে উহা ছিল আসলে বাংলার মুসলিম প্রতিষ্ঠান। বক্তৃত প্রজা-সমিতি গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা মওলানা মোহামদ আকরম খাঁ আমাদেরে বলিয়াই ছিলেন : “হিন্দুরা যেমন অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেস নামে হি-প্রতিষ্ঠান চালায়, আমরাও তেমনি অসাম্প্রদায়িক প্রজা-সমিতি নামে মুসলিম প্রতিষ্ঠান চালাইব।” দশ বছর পরে তারই স্থান দখল করে মুসলিম লীগ খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক নামে ও দাবিতে। হিন্দুদের অনেকেই যে প্রজা-আন্দোলনকে আসলে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন বলিতেন, সেটা নিতান্ত মিথ্যা অভিযোগ ছিল না। আগেই বালিয়াছি, এই মুদতে বাংলার আর্থিক সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর আগাগোড়াই এমন দুই-জাতি-ভিত্তিক ছিল যে এজী-খাত নামের চুলে ধরিয়া টান দিলে মুসলমান নামের মাথাটি আসিয়া পড়িত। অপর পক্ষে জমিদার-মহাজনের নামের টানে হিন্দুরাও কাতারবন্দি হইয়া যাইত। প্রজা-আন্দোলনের ডাকে যে কাতারবন্দিটা হইত, তা ছিল এই কারণেই মুসলমান জনসাধারণের আর্থিক ও সামাজিক মুক্তি চেষ্টা, সামাজিক মর্যাদার দাবি। প্রজা আন্দোলনকে যে অনেকে কৃষক-বিরোধী জোতদার আন্দোলন বলিয়া নিন্দা করিতেন, তাঁদের কথাও একেবারে ভিত্তিহীন ছিল না। প্রজা-আন্দোলন সত্যসত্যই কৃষক আন্দোলন ছিল না। লাংগল যার মাটি তার যিকিরটা তখনও উঠে নাই। ১৯৩৩ সালে বাংলা সরকারের প্রচারিত এক প্রশ্নাবলীর উত্তরে ময়মনসিহ প্রজা-সমিতির কার্যকরী কমিটির সভায় উপস্থিত বত্রিশজন মেম্বরের মধ্যে মাত্র তিনজন বর্গাদারকে দখলী স্বত্ব দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়াছিলেন। অন্যান্যেরা শুধু বিরুদ্ধে ভোটই দেন নাই, তীব্র ও ক্রুদ্ধ প্রতিবাদও করিয়াছিলেন।

৬. প্রজা বনাম কৃষক-প্রজা

আসলে ব্যাপার এই যে বাংলার অধিকাংশ জিলায় প্রজা মানেই কৃষক, কৃষক মানেই প্রজা। তাঁদের শতকরা আশিজন নিজের হাতে নিজের জমিতে হালচাষও করেন। কিছু জমি বর্গাও দেন। এঁদের বিপুলসংখ্যক মেজরিটির পরিবারপিছে দশ একরের বেশি জমি নাই। কাজেই তাঁদের জোতদার বলা যায় না। এদের প্রকৃত নাম কৃষক প্রজা। এই জন্যই ১৯৩৬ সালে নিখিল বংগ প্রজা সমিতির নাম বদলাইয়া যখন কৃষকপ্রজা রাখা হয়, তখন কোনও বিপ্লবী পরিবর্তনের কথা কারও মনে পড়ে নাই। কালক্রমে গণআন্দোলনের প্রসারে ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের রাস্ত্রীয় প্রয়োগে এই কৃষক-প্রজা সমিতিই একদিন ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকসহ বাংলার জনগণের প্রকৃত গণপ্রতিষ্ঠান হইত যদি না নিখিল ভারতীয় সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক অন্যদিকে মোড় ফিরাইত। এটা শুধু মুসলমান দিকের কথা নয়, হিন্দুর দিকের কথা। গণতন্ত্রের বিকাশের প্রসারের সংগে সংগে হিন্দুরা যখন বুঝিতে পারেন যে স্বায়ত্তশাসিত বা স্বাধীন বাংলার গণতান্ত্রিক রাষ্টপরিচালনায় হিন্দু রাষ্ট্রীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূঞ্জিত অধিকার বিপন্ন হইবে, সেই দিন হইতেই তারা বাংলার মুসলিম মেজরিটির আওতা হইতে নিখিল ভারতীয় হিন্দু মেজরিটির আশ্রয়ে চলিয়া গেলেন। বাংলাদেশ ভারতের প্রদেশ হইল। বাংগালী জাতি ভারতীয় জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশমাত্র হইয়া গেল। এদিকে না গিয়া বাংলার কংগ্রেস যদি বাস্তববাদী দৃষ্টিভংগি লইয়া প্ৰজাপার্টির সহিত সহযোগিতা করিত, তবে ভারতের না হউক বাংলার রাজনীতি অন্যরূপ ধারণ করিত। বাংলার কংগ্রেস তথা বংলার হিন্দু নিখিল ভারতীয় হইয়া পড়ায় বাংলার মুসলমানদের নিখিল ভারতীয় না হইয়া উপায়ান্তর ছিল না।

এই ঘটনাটিই ঘটে ১৯৩৭ সালে হক মন্ত্রিসভা গঠনের সময়। এই কারণেই আমি এ সম্পর্কিত খুটিনাটি বিবরণ দেওয়া দরকার মনে করিয়াছি। হক মন্ত্রিসভা গঠনের সময় বাংলার কংগ্রেসের নেতৃত্ব ঐ অবাস্তব ও অদূরদশী মনোভাব গ্রহণ করার ফলে হক সাহেব তথা প্ৰজাপার্টির মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। এর পরে হক সাহেবের তথা গোটা মুসলিম বাংলার লীগে যোগদান করা এবং প্রজাপার্টির মৃত্যু ঘটা ঐতিহাসিক ঘটনা-স্রোতেই অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছিল। বস্তুতঃ বাংলার নিজস্ব রাজনীতির অবসান ঐদিনই ঘটিয়াছিল।

হিন্দু-মুসলিম-সম্পর্কের এই তিক্ততার জন্য শুধু হিন্দুদেরেই দায়ী করিলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হইবে। ১৯২৮ সালে বাংলার হিন্দু-মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক সভায় সার আবদুর রহিম ও ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের মধ্যে যে কথা কাটাকাটি হইয়াছিল সেদিক পাঠকদের দৃষ্টি আবার আকর্ষণ করিতেছি। ঐ সভায় ডাঃ রায় বলিয়াছেন : ‘মুসলমানরা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয় না; শুধু প্রতিনিধিত্ব ও চাকরি-বাকরিতে অংশ চায়। সার আবদুর রহিম অবশ্যই সে কথার জবাব দিয়াছিলেন। কিন্তু একটু ধীরভাবে বিচার করিলে স্বীকার করিতে হইবে, ডাঃ রায়ের ঐ অভিযোগ ভিত্তিহীন ছিল না। বস্তুতঃ আইন সভায় প্রতিনিধিত্ব ও সরকারী চাকুরিতে মুসলমানদের দাবি-দাওয়া মানিয়া লওয়ার ব্যাপারে হিন্দু-নেতৃত্বের কৃপণতার ও শাির যথেষ্ট কারণ ছিল। ডাঃ রায়ের কথাটা তাঁর ব্যক্তিগত মত ছিল না। ওটা ছিল সাধারণভাবে হিন্দুদের এবং বিশেষভাবে কংগ্রেসের নেতৃত্বের অভিযোগ। এমন যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তিনি পর্যন্ত বলিয়াছেন : ‘দেশকে ভাল না বাসিয়া দেশের স্বার্থে কোনও কাজ না করিয়া মুসলমানরা শুধু ফললাভে সিংহের ভাগ বসাইতে চায়।‘ ‘সিংহের ভাগ’ কথাটা অতিশয়োক্তি কিন্তু মোটের উপর কথাটা সত্য। ঐতিহাসিক যত কারণ ও পারিপার্শ্বিক যত যুক্তিই থাকুক না কেন, এই যুগের বাস্তব অবস্থা ছিল এই যে মুসলমানরা সাধারণভাবে ও শিক্ষিত সম্প্রদায় বিশেষভাবে নিজেদের মাতৃভূমিকে আপন দেশ মনে করি না। তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কামে-কাজে এটা মনে হওয়া মোটই অযৌক্তিক ছিল না যে মুসলমানরা নিজের দেশের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম, দেশগুলিকেই বেশি আপন মনে করে। প্রথমতঃ মুসলমানদের কোনও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক চিন্তা-ধারা ছিল না। যদি কিছু থাকিয়া থাকে সেটা ছিল প্যানইসলামিযম। ‘মুসলিম হায় হাম সারা জাহী হামরা’ই যেন ছিল তাদের সত্যকার রাষ্ট্র-দর্শন। ১৯২০-২১ সালে খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলন যে ভারতীয় মুসলমানদের একটা অভূতপূর্ব। গণ-আন্দোলনে পরিণত হইয়াছিল, সেটা খিলাফত ও তুর্কী সাম্রাজ্যের জন্য যতটা ছিল, ভারতের স্বরাজ্যের জন্য ততটা ছিল না। এটা হাতে-নাতে প্রমাণিত হইল দুই বছরের মধ্যে। ১৯২৩ সালে কামাল পাশা যখন খলিফাঁকে দেশ হইতে তাড়াইয়া খিলাফতের অবসান ঘোষণা করিলেন, তখনই ভারতের মুসলমানদের উৎসাহে ভাটা পড়িল। খিলাফত কমিটি মরিয়া গেল, মুসলমানরা কংগ্রেস ছাড়িয়া দিল। এতে তারা এটাই বুঝাইল যে খিলাফতই যখন শেষ হইয়া গেল, তখন দেশের স্বাধীনতায় তারা আর ইন্টারেস্টেড নয়।

৭. মুসলিম রাজনীতির বিদেশ-মুখিতা

এটার না হয় রাজনৈতিক কারণ ছিল। কিন্তু জন-সেবার মধ্যে ত কোনও রাজনীতি আসিবার কথা নয়। সেখানেও মুসলমানদের মনোভাব ছিল বিদেশ-মুখী। মুসলমানদের মধ্যে ধনী ও দানশীল লোকের খুব বেশি অভাব ছিল না। কিন্তু সারা ভারতে মুসলমানদের ব্যক্তিগত দানে একটা হাসপাতাল বা কলেজ স্থাপনের নযির নাই। সমস্ত দানশীলতা এদের মসজিদ নির্মাণে সীমাবদ্ধ। ওটাও নিশ্চয়ই মুসলিম জনতার সুবিধার জন্য ততটা ছিল না যতটা ছিল সওয়াব হাসিল করিয়া নিজে বেহেশতে যাইবার উদ্দেশ্যে। নৈসর্গিক বিপদ-আপদেও তারা অর্থ-সাহায্য যে না করিতেন তা নয়। কিন্তু সেটাও দেশে নয় বিদেশে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতেই বলিতেছি। এই বাংলাতেই মুসলিম প্রধান এলাকাতে যদি বন্য-মহামারী হইত, তবে তার রিলিফের কাজেও হিন্দুদাতাদের উপরই নির্ভর করিতে হইত; মুসলমান দাতারা থলির মুখ খুলিতেন না। হাজারের মধ্যে একটা নযির দেই। উত্তর বাংলার এক বিশাল এলাকার বন্যা হইয়া প্রায় আশি লক্ষ লোক বিপন্ন হইল। ইহাদের বিপুল মেজরিটি ছিল মুসলমান। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের নেতৃত্বে সংকট-ত্রাণ সমিতির প্রায় কোটি টাকা চাঁদা তুলিয়া বহুদিন পর্যন্ত এই এলাকায় রিলিফ চালাইল। এই সমিতির বেঘসেবক হিসাবে কাজ করিয়া আমরা কলিকাতার ধনী মুসলমানদের নিকট উল্লেখযোগ্য কোনও চাঁদা পাই নাই। কিন্তু এর কিছুদিন পরে তুরস্কের আনাতোলিয়ার ভূমিকম্পের দুর্গতের রিলিফের জন্য মোহাম্মদ আলী পার্কের এক জনসভাতেই তিন লাখ টাকা চাঁদা উঠাইয়াছিল। ফলে হিন্দু প্রতিবেশী ত দূরের কথা কোন নিরপেক্ষ বিদেশী পর্যটকেরও এই সময়ে মুসলমানদের ব্যবহারে মনে হইত এরা ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভালমন্দের চেয়ে মধ্য প্রাচ্যের মুসলিম জাহানের ভাল-মন্দের কথাই বেশি চিন্তা করে। এই ভাব-গতিক দেখিয়া হিন্দু নেতৃবৃন্দের এমন সন্দেহ হওয়াও বিচিত্র বা অযৌক্তিক ছিল না যে মুসলমানদের দাবি-দাওয়া-মত চাকরি-বাকরি দিলেও তারা ভারতের রাজনৈতিক অধিকারের জন্য লড়িবার বদলে ইংরাজ সরকারকেই সমর্থন করিবে। এটা আরও বেশি সম্ভব মনে হইত এই জন্য যে এই মুদতে মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব মোটের উপর ছিল নাইট-নবাব ও খান বাহাদুরদের হাতে। এরা বিশ্বাস করিতেন এবং খোলাখুলি বক্তৃতা বিবৃতিতে বলিতেনও যে যতদিন এদেশে ইংরাজ আছে ততদিনই আমরা বাঁচিয়া আছি। ইংরাজ চলিয়া যাওয়ার সাথে সাথে হিন্দুরা আমাদেরে শেষ করিয়া ফেলিবে। হিন্দু নেতা সরকারী কর্মচারী ও উকিল মোখতারাদি ব্যবসায়ী এবং সর্বোপরি জমিদার-মহাজনদের অদূরদশী ব্যবহারে মুসলমানের এই সন্দেহ আরও দৃঢ় হইত। বাস্তবে প্রমাণিত হইত। মোট কথা ভারতের মুসলমানরা এই যুগে ছিল কার্যতঃ একটা দেশহীন ধর্মসম্প্রদায় মাত্র। নিজের দেশকে অবস্থা-বৈগুণ্যে এরা হিন্দুর দেশ মনে করিত। কেউ কেউ এই ‘দারুলহর্ব’ ছাড়িয়া পশ্চিমে ‘দারুল ইসলামে’ হিজরত করিবার কথাও ভাবিতেন। কাজেই এই ‘হিন্দুর দেশ’ হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা বা অর্থনৈতিক উন্নতির কথা তাঁরা ভাবিতে যাইবেন কেন? এই দেশ যে তাঁদের, এই দেশ শাসন করিবার অধিকার ও এই দেশের কল্যাণ সাধনের দায়িত্ব যে তাঁদের, তাঁদেরই ভাইয়েরা যে কৃষক-মদুর হিসাবে দেশের খোরাকি ও অন্যান্য সম্পদ সৃষ্টি করিতেছে মাথার ঘাম পায় ফেলিয়া, একথা যেন তাঁদের মনেই পড়িত না। কাজেই দেশগপ্রাণ, দেশের জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তৃত, পরাধীনতার জ্বালায় দগ্ধ এবং স্বাধীনতা-সংগ্রামেলিও হিন্দুরা যদি মুসলমান নেতাদের দেশপ্রেমে সন্দেহ করিয়া থাকে, তবে তাদের দোষ দেওয়া যায় না।

৮. বাস্তববাদী জিন্নাহ

এই সার্বিক বিভ্রান্তি-বিরোধের অন্ধকার যুগে যে একজন মাত্র লোক বাস্তববাদীর দৃষ্টিকোণ হইতে সকল অবস্থায় হিন্দু-মুসলিম আপোসের কথা বলিয়াছিলেন, তিনি ছিলেন মিঃ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর মৈত্রী প্রচেষ্টার যে বিশেষ দিকটা তৎকালে আমরা বুঝিতে পারি নাই এবং পরবর্তীকালে পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছিল, তা এই যে তিনি শুধু মুসলমানদের অধিকারের কথা বলেন নাই, তাদের দায়িত্বের কথাও বলিয়াছেন। আরও স্পষ্ট ভাষায় বলিতে গেলে বলিতে হয় তিনিই একমাত্র মুসলিম নেতা যিনি মুসলমানদের বিদেশ-মুখিতা হইতে স্বদেশমুখী করিয়াছেন। কংগ্রেসের বাইরে তিনিই একমাত্র মুসলিম নেতা যিনি মুসলমানদের ইংরেজ বিরোধিতায় কংগ্রেসের পাশাপাশি রাখিয়াছিলেন। নিজেদের অধিকারের জন্য হিন্দুদের বিরুদ্ধে লড়িবার সংগে সংগে দেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার জন্য ইংরাজের সহিত সংগ্রামে তিনিই মুসলমানদের আগাইয়া নিয়াছেন। জিন্না সাহেবের এই রাষ্ট্রদর্শনের সবটুকু ব্যক্তিগতভাবে আমি তখনও বুঝি নাই, একথা সরলভাবে স্বীকার করিতেছি। এই কারণে আমি কখনও-কখনও তাঁর ভক্ত সমর্থকও যেমন ছিলাম, আবার কখনও কখনও তেমনি কঠোর সমালোচকও ছিলাম। যে সময় এবং যে কাজে তাঁর সমর্থন করিয়াছিলাম, তাও করিয়াছি তাঁর খাতিরে নয় কংগ্রেসের খাতিরে। অর্থাৎ যে-যে। কাজে কংগ্রেসের সাথে তাঁর মিল ছিল, যখন-যখন তিনি কংগ্রেসের নীতির সমর্থন করিয়াছিলেন, কংগ্রেসের সাথে সাথে সংগ্রাম করিয়াছেন, যখন-তখন তিনি মুসলিম .নাইট-নবাব ইত্যাদি খেতাবধারীকেইংরাজের পো-ধরা বলিয়া গাল দিয়াছেন, তখন–তখন আমি পরম উৎসাহে তার সমর্থন করিয়াছি। পক্ষান্তরে যখন তিনি কংগ্রেসের বিরোধিতা করিয়াছেন, তখন আমিও তাঁর বিরোধিতা করিয়াছি। লাখনৌ-প্যাকট গ্রহণ হইতে শুরু করিয়া সাইমন কমিশন বয়কট ও ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে হিন্দু প্রধান প্রদেশগুলিতে কংগ্রেস-লীগ নির্বাচনী মৈত্রী পর্যন্ত সব কাজই আমার আন্তরিক সমর্থন পাইয়াছে। পক্ষান্তরে ১৯২১ সালে যখন তিনি কংগ্রেসের খিলাফত ও অসহযোগ নীতির প্রতিবাদে কংগ্রেস ত্যাগ করেন তখন আমি তাঁর উপর মনে মনে ক্রুদ্ধ হইয়া উঠি। খিলাফত আন্দোলনকে যখন তিনি অবস কিউরেন্টিস্ট ধর্মীয় গোড়ামি আখ্যা দেন, আর রাজনীতিতে ধর্ম আমদানির দোষারোপ করেন, তখন আমি তার মুসলমানী ঈমানেই সন্দেহ করিয়া বসি এবং তিনি যে শিয়া সেকথাও স্মরণ করি। পক্ষান্তরে তিনি যখন গান্ধীজীর হরিজন অস্পৃশ্যতা ও গো-রক্ষা নীতিকে অবস্ কিওরেন্টিস্ট ধর্মীয় গোড়ামি বলিয়া নিন্দা করেন এবং রাজনীতিতে ধর্মের আমদানির বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তখন আমার বিশ্বাস ও মতবাদে একটা প্রচন্ড ঝকি লাগে। জিন্না সাহেবের অভিমতের একটা দাম আছে বলিয়াও আমার মনে হয়। কিন্তু এটাই যে সেকিউলারিযম বা ধর্ম-নিরপেক্ষ রাজনীতি তখনও তা বুঝি নাই।

মোট কথা, এই যুগের রাজনীতির মধ্যে তেসরা দশকের আগেরও চৌথ দশকের শেষ দিকে কয়েক বছর ছাড়া জিন্না সাহেবের ব্যক্তিগত নেতৃত্ব দেখিতে কুয়াশাচ্ছন্ন থাকা সত্ত্বেও আসলে কিন্তু তা ছিল না। গান্ধীজী ও আলী ভাইর চান-সুরুজের মত প্রখর চাকচিক্যপূর্ণ সর্বগ্রাসী ব্যক্তিত্ব ও দৈত্যের মত দুঃসাহসিক নেতৃত্ব দেশবাসীর হৃদয় এমনভাবে জয় করিয়াছিল যে জিন্না সাহেবকে এই মুদতে কিছুদিনের জন্য দেশে ও বিদেশে রাজনৈতিক নির্বাসন যাপন করিতে হইয়াছিল। কিন্তু পরবর্তী কালের ইতিহাস প্রমাণ করিয়াছে যে, এই যুগেও তিনি তাঁর চির জীবনের স্বপ্নসাধ হিন্দু মুসলিম আপোসের ভিত্তিতে ভারতীয় রাজনীতিতে একটা সুস্থতা আনিবার চিন্তাতেই নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু আমি তৎকালে অত গভীরে তলাইয়া দেখি নাই। তার কয়েকটি কারণ ছিল। আমি বাংলার রাজনীতিকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করিতাম, ভারতীয় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করিতাম না। ওটাকে বরং আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ মনে করিতাম। বাংলায় মুসলিম মেজরিটি ছিল বলিয়াই বোধ হয় আমি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধী ছিলাম। জমিদারি উচ্ছেদকে বাংলার গণ-মুক্তির বুনিয়াদ ও কৃষক-প্রজা সমিতিকে বাংলার ভবিষ্যৎ জাতীয় প্রতিষ্ঠান মনে করিতাম। জিন্না সাহেব এই দুইটা মৌলিক ব্যাপারেই ভিন্নমত পোষণ করিতেন। তাঁর রাজনীতিও ছিল স্বভাবতঃই নিখিল ভারতীয়।

১২. কৃষক-প্রজা পার্টির ভূমিকা

কৃষক-প্রজা পার্টির ভূমিকা
বারই অধ্যায়

১. হক মন্ত্রিসভায় অনাস্থা

হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে কৃষক-প্রজা-কর্মীদের অসন্তোষের ফলে ক্রমে সকল শ্রেণীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল। মন্ত্রীদের অন্তর্বিরোধের বিভিন্ন খবর সংবাদপত্রে বাহির হইতে লাগিল। শেষ পর্যন্ত মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী সাহেবের সহিত মন্ত্রিসভার বিরোধ বাধিল। কিন্তু নওশের আলী সাহেব পদত্যাগ করিতে অস্বীকার করায় হক সাহেব নিজেই পদত্যাগ করিয়া নওশের আলীকে বাদ দিয়া পুনরায় দশজন মন্ত্রীর মন্ত্রিসভা গঠন করেন ১৯৩৭ সালে অক্টোবর মাসে। ফলে হক সাহেব ছাড়া তাঁর মন্ত্রিসভায় কৃষক-প্রজা পার্টির কেউ রহিলেন না। এইভাবে বৎসরাধিক কাল চলিয়া গেল। কৃষক-প্রজার কোন কাজই হইল না। ক্লাউড কমিশন গঠন করিয়া জমিদারি উচ্ছেদের প্রশ্নটা শিকায় তুলা হইল। এমনকি ১৯৩৫ সালে পাস-করা প্রাথমিক শিক্ষা আইন ও ১৯৩৬ সালের পাস-করা কৃষি-খাতক আইনটি পর্যন্ত প্রয়োগ করা হইল না।

কৃষক-প্রজা পার্টির কৃষক সমাজের পুঞ্জীভূত অভিযোগের সংগে কংগ্রেসের রাজনৈতিক বন্দী-মুক্তির প্রশ্নটা যোগ দিল। শহরে-মফস্বলে, রাস্তা-ঘাটে, হাটে বাজারে হক মন্ত্রিসভার নিন্দায় আকাশ-বাতাস মুখরিত হইতে লাগিল। কৃষক-প্রজা নেতা হক সাহেবের মন্ত্রিসভাকে জমিদার-মন্ত্রিসভা আখ্যা দেওয়া হইল। কথাটা সত্যও বটে। কারণ দশজন মন্ত্রীর মধ্যে ছয় জনই জমিদার। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৮ সালের এপ্রিলে বাজেট সেশনেই হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়া হইল। আশা করা গিয়াছিল হক মন্ত্রিসভার পতন অবশ্যম্ভাবী।

কিন্তু এই অনাস্থা প্রস্তাবই হক মন্ত্রিসভার শাপে বর হইল। ইহাতে মন্ত্রিসভার অন্তর্বিরোধই যে শুধু দূর হইল তা নয়, অন্ততঃ মুসলিম জনমতের মোড় ঘুরিয়া গেল। একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। মরহুম হাকিম মসিহুর রহমানের সাহেবের পুত্র হাকিম শামসুযযামানের ধর্মতলাস্থ ডিসপেনসারি আমাদের আড্ডা ছিল। এই খানে বসিয়া আমরা হক মন্ত্রিসভার মুন্ডপাত করিতাম। হাকিম সাহেব স্বয়ং হক সাহেবের নিন্দায় সবচেয়ে বেশি গলায় ছিলেন। অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়ার পর তার সাফল্যের চেষ্টায় আমি কলিকাতায় আসিয়াছি। বরাবরের অভ্যাস মত হাকিম সাহেবের ডিসপেনসারিতে গেলাম। হাকিম সাহেব আমাকে দেখামাত্র বলিলেন : হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়া কৃষক-প্রজা পার্টি ঘোরর অন্যায় কাজ করিয়াছে। আমাকে অবিলম্বে এ কাজে পার্টিকে বিরত করিতে হইবে। আমি বিস্মিত হইয়া চলিলাম : আপনে এটা কি কইতেছেন? হক মন্ত্রিসভার নিন্দায় আপনে ত আমার চেয়ে অনেক বেশি যান। হাকিম সাহেব কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হইয়া বলিলেন : ‘ঠিক। এখনও তা করি। হক মন্ত্রিসভাকে আমি চাবুক মারতে চাই। কিন্তু আপনারা যে চাবুক ফেলে বন্দুক ধরেছেন।’

এই একটি মাত্র কথার মধ্যে হক মন্ত্রিসভার প্রতি মুসলিম জনমত প্রতিবিম্বিত হইয়াছে। ট্রেন-বাসের যাত্রীরা চা-খানার আলাপীরা এই কথাই বলিয়াছে। হক সাহেবের মন্ত্রিসভা আদর্শ মন্ত্রিসভা নয়, এ কথা সত্য কিন্তু এটা ভাংগিলে এর চেয়ে ভাল মন্ত্রিসভা হইবে না। যা হইবে তা এর চেয়ে খারাপ হইবে। তা হইবে পুরাপুরি। জমিদার মন্ত্রিসভা এই ধারণা জনসাধারণের মধ্যে সার্বজনীন হইয়া পড়িয়াছিল। তর্ক করিলে বলা হইত ও ‘হক মন্ত্রিসভা কৃষক-প্রজার কোন হিত করিতেছে না ঠিক, কিন্তু অহিতও কিছু করিতেছে না। এটাও কম কথা নয়’ এটাই ছিল সাধারণভাবে মুসলিম জনমত।

২. আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের ভবিষ্যদ্বাণী

হিন্দু জনমতের এক অংশ যে হক মন্ত্রিসভার সমর্থক তার প্রমাণ পাইলাম আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের দরবারে। আমি আচার্য রায়ের একজন অনুরক্ত ভক্ত ছিলাম। বিজ্ঞানের এক হরফ না জানিয়াও আমি আচার্য রায়ের একজন স্নেহের পাত্র ছিলাম। কলিকাতা ছাড়ার পরেও আমি সুযোগ পাইলাম আচার্য রায়ের বিজ্ঞান কলেজস্থ আস্তানায় হাযির হইতাম। ৯২ নং আপার সার্কুলার রোডস্থ বিজ্ঞান-কলেজের বিশাল ইমারতের পিছন দিককার একটি কামরাই ছিল এই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর বাসস্থান। একটি দড়ির খাঁটিয়াই ছিল তাঁর শয়ন-শয্যা। এতে তিনি অর্ধশায়িত থাকিয়া ভক্তগণকে উপদেশ দিতেন। খাঁটিয়ার সামনে মেঝেয় পাতা থাকিত একটা বিশাল শতরঞ্জি। সর্বোচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ভক্তেরা এই শতরঞ্জিতে বসিয়াই তাঁর কথা শুনিতেন। আমিও তাঁদের মধ্যে বসিয়া গুরুদেবের উপদেশ শুনিতাম। আচার্য রায়ের কাজ ও চিন্তা-ধারার একটা দিক আমাকে মোহবিষ্ট করিয়াছিল। আচার্য রায় ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর মতই নির্বিলাস ‘প্লেইন লিভিং হাই থিংকিং’-এর চিন্তা-নায়ক। তবু আচার্য রায়ের নৈকট্য ও সান্নিধ্য আমার কাছে যেমন অনির্বচনীয় আকর্ষণীয় ছিল, মহাত্মাজীর নৈকট্যও তেমনি ছিল না। মহাত্মাজীর কঠোর বৈরাগ্যের দরবারের আবহাওয়ার মধ্যেও যেন এটা কৃত্রিম রাজকীয়তা বোঝার মত আমার বুকে পীড়া দিত। আচার্য রায়ের দরবারে এই কৃত্রিমতা আমি অনুভব করিতাম না। তার বদলে আমি যেন কল্পনায় প্রাচীনকালের মুনি-ঋষির তপোবনের শান্ত-শীতলতায় ডুবিয়া যাইতাম। তাঁর মত লোকের স্নেহ পাইবার কোনও যোগ্যতা বা অধিকার আমার ছিল না। তবু আমার প্রতি তাঁর অতিরিক্ত নেহাদর তাঁর অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বস্ত ছাত্রকেও বিস্মিত করিয়া দিত। অন্য কেউ তাঁকে যে কাজে– রাযী কইতে পারেন নাই, আমি তাঁকে অনেকবার তেমন কাজে রাযী করাইয়াছি। অসুস্থতাহেতু তিনি যে সব সভায় যাওয়া বাতিল করিয়াছেন, তার অনেক গুলিতে আমি গিয়া তাঁকে ধরিয়া আনিয়াছি। ১৯৩০ সালে আলবার্ট হলে নয়রুল-অভ্যর্থনার সভা ছিল এমনি একটি উপলক্ষ্য। উদ্যোক্তাদের সকলের এবং বিজ্ঞান কলেজের অধ্যাপকদের সমবেত চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আমি গিয়া আচার্য রায়কে ধরিয়া আনি। তিনি আমার কাঁধে তর করিয়া সভায় যোগ দেন।

১৯৩৮ সালে এপ্রিল মাসে আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশনে হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে কৃষক-প্রজা পার্টির পক্ষ হইতে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করা হয়। কংগ্রেস দল এক বাক্যে তা সমর্থন করে। দেশময় হৈ চৈ। কলিকাতা গরম। রেলে-ট্রামে হোটেল চাখানায় তুমুল বাদবিতন্ডা। এই সময় আমি একদিন আচার্য রায়ের দরবারে হাযির। আমাকে দেখিয়াই তিনি বলিলেন : ‘শোন মনসুর, আমি রাজনীতি বুঝি না। রাজনীতিক ব্যাপারে নাকও গলাই না কিন্তু আমার অনুরোধ হক মিনিস্ট্রির বিরুদ্ধে তোমরা যে অনাস্থা দিয়েছে, অবিলম্বে তা প্রত্যাহার কর।‘

জবাবে আমি হক সাহেবের বিশ্বাস ভংগ ও হক মন্ত্রিসভার অকর্ম ও কুকর্মের লম্বা ফিরিস্তি দিলাম। আচার্য রায়ের মন জয় করিবার মতলবে হক সাহেবের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগও আনিলাম। আচার্য রায় ধৈর্যের সাথে সব কথা শুনিলেন। বিশাল মোচের নিচে তিনি মুচকি হাসিতে থাকিলেন। আমার কথা শেষ হইলে তিনি তাঁর শীর্ণ হাতটি উচা করিয়া বলিলেন : “তুমি যা বললে সবই রাজনীতির কথা। আমি রাজনীতির কথা বলছি না। আমি বলছি বাংগালী জাতির ভবিষ্যতের কথা। সমস্ত রাজনীতিক সত্যের উপর আরেকটা বড় সত্য আছে। সেটা বাংগালী জাতির অস্তিত্ব। বাংগালী জাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নির্ভর করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উপর। ফযলুল হক এই ঐক্যের প্রতীক। আমি কংগ্রেসীদের ভারতীয় জাতীয়তা বুঝি না। আমি বুঝি বাংগালীর জাতীয়তা। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠা করতে পারে একমাত্র ফযলুল হক। ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাংগালী। সেই সংগে ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাংগালীত্বের সাথে খাঁটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফযলুল হক আমার ছাত্র বলে এ কথা বলছি না। সত্য বলেই এ কথা বলছি। খাঁটি বাংগালীত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের সময়ই ভবিষ্যৎ বাংগালীর জাতীয়তা। ফযলুল হক ঐ সময়ের প্রতীক। এ প্রতীক তোমরা ভেংগে না। ফযলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করো না। শোন মনসুর আমি বলছি, বাংগালী যদি ফযলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাংগালীর বরাতে দুঃখ আছে।”

কথাগুলি আচার্য রায় আমার চেয়ে সমবেত অধ্যাপক ও ছাত্রদের উদ্দেশ্য করিয়াই বলিয়াছিলেন বেশি। তাঁর কথাগুলি কোনও ব্যক্তির মুখ হইতে আসিতেছিল না। আমার মনে হইতেছিল কথাগুলি ভবিষ্যৎ বাণীর মতই বাহির হইতেছিল কোন গায়েবী ‘অরেকলের’ মুখ হইতে। আমি ভিতরে ভিতরে একেবারে মুষড়াইয়া গেলাম। মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে কাজ করিবার উৎসাহ উদ্যম একেবারে হিম হইয়া গেল। আচার্য দেবকে কি একটা কৈফিয়ৎ দিয়া আমি ধীরে ধীরে বাহিরে আসিলাম। সারা রাস্তায় আমার কানে ও মনে আচার্য রায়ের কথাগুলি ঝংকৃত হইতে থাকিল। আজও এই ত্রিশ বছর পরেও সেই সব কথা আমার মনে ঝংকৃত হইতেছে। এটা কি ছিল দার্শনিক মানব প্রেমীর ভাবাবেগ? না, বিজ্ঞানীর বাস্তব-দর্শন? যখনই দেশ ও জাতির কথা, জনগণের কথা, ভাবিতে চাই তখনই এই দুই মহাপুরুষের মুখ আমার চোখে ভাসিয়া উঠে। কি করিতে গিয়া কি করিয়াছিলাম! আচার্য রায়ের নির্দেশ পার্টি নেতাদের কাছে। বলিয়াছিলাম বোধ হয়। কিন্তু কেউ বোধ হয় কানে তুলেন নাই।

. হক মন্ত্রিসভার কৃতিত্ব

আচার্য রায়ের মত শ্রদ্ধেয় ও প্রভাবশালী বিজ্ঞানীর এই অভিমত আমার মত অনেক হিন্দু নেতাকেও নিশ্চয়ই প্রভাবিত করিয়াছিল। যা হোক, কলিকাতার মুসলিম জনমত আমাদের বিরুদ্ধে একেবারে ক্ষিপ্ত হইয়া ফাটিয়া পড়িয়াছিল। অবশ্য একথাও ঠিক তারা যে যতটা ক্ষিপ্ত হইয়াছিল, ডিমনস্ট্রেশন হইয়াছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। শহীদ সাহেবের মত সংগঠনী প্রতিভা মিছিল-প্রসেশন দিয়া একেবারে কলিকাতা মাথায় তুলিয়া লইয়াছিলেন। এমনি এক উত্তেজিত সংঘবদ্ধ জনতা অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমাকে আক্রমণ করিয়া আহত করিয়াছিল। আহত অবস্থায় আমরা পার্শবর্তী বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। ক্ষিপ্ত জনতা সে বাড়ি ঘেরাও করিল। অল্পক্ষণ পরেই হক সাহেব, নবাব হবিবুল্লাহ ও সার নাযিমুদ্দিন আসিয়া আমাদিগকে জনতার হাত হইতে রক্ষা করেন। আমাদের মধ্যে অকৃতজ্ঞ কেউ কেউ বলিতে লাগিলেন : ‘উহারাই আমাদের পিটাইবার জন্য আগে লোক পাঠাইয়া দিয়াছেন এবং পরে আমাদের রক্ষা করিতে আসিয়াছেন।‘ কৃষক-প্রজা পার্টির মেম্বারদের পক্ষে কলিকাতার রাস্তা-ঘাটে চলাফেরা বিপজ্জনক হইয়া পড়িল। অনাস্থা প্রস্তাব আলোচনার জন্য আইন পরিষদের বৈঠকের একদিন আগে হইতেই সমস্ত অপযিশন মেম্বরকে আইন পরিষদের দালানে স্থান দেওয়া হইল। এত করিয়াও আমরা হারিয়া গেলাম। হক মন্ত্রিসভা টিকিয়া গেল।

অনাস্থা-প্রস্তাবের ফলে একটি লাভ ও দুইটি অনিষ্ট হইল। লাভ হইল এই যে দেশের কিছু কাজ হইল। যে মন্ত্রিসভা বিশেষ কিছু কাজ না করিয়া প্রায় বছর কাল সময় কাটাইয়াছিল, তারাই ঝট পট করিয়া কতগুলি ভাল কাজ করিয়া ফেলিল। ১৯৩৮ সালের মধ্যেই সালিশী বোর্ড স্থাপন শেষ হইল। ১৯৩৯ সালের মধ্যে কৃষক প্রজার দাবি মত প্রজাস্বত্ব আইন পাস হইল ও মুসলিম লীগের দাবি মত কলিকাতা মিউনিসিপাল আইন সংশোধন করিয়া কর্পোরেশনে পৃথক নির্বাচন প্রথা প্রবর্তন করা হইল। ১৯৪০ সালের মধ্যে মহাজনি আইন পাস হইয়া গেল। সালিশী বোর্ড প্রজাস্বত্ব আইন ও মহাজনি আইনে বাংলার কৃষক-প্রজা ও কৃষি-খাতকদের জীবনে এক শুভ সূচনা হইল। তারা কার্যতঃ আসন্ন মৃত্যুর হাত হইতে বাঁচিয়া গেল। ফলে হক মন্ত্রিসভার এই দুই-তিনটা বছরকে বাংলার মুসলমানদের জন্য সাধারণভাবে, কৃষক প্রজা-খাতকদের জন্য বিশেষভাবে, একটা স্বর্ণ যুগ বলা যাইতে পারে।

এই কৃতিত্বের বেশির ভাগ প্রাপ্য সাধারণভাবে অপযিশনের বিশেষভাবে কৃষক প্রজা মেম্বর ও কর্মীদের। মেম্বররা ঐ অনাস্থা প্রস্তাব না দিলে এবং কর্মীরা বাইরে আন্দোলন না করিলে এই সব কাজ অত সহজে হইত না। মুসলিম লীগ মন্ত্রীদের মধ্যে এক শহীদ সাহেব ছাড়া আর সবাই ছিলেন জমিদার। তাঁদের চেষ্টায় বা ষড়যন্ত্র হক সাহেব প্রধানমন্ত্রী হইয়াও অসহায়। সামসুদ্দিন সাহেব গোড়াতেই বাদ পড়ায় এবং নওশের আলী সাহেব অল্পদিনের মধ্যে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করিতে বাধ্য হওয়ায়, এবং অবশেষে হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দেওয়ায় বাংলার এই মন্ত্রিসভা সত্য-সত্যই জমিদার সমর্থিত মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা হইয়া গিয়াছিল। কৃষক-প্রজার জন্য সত্যিকার কোনও কাজ হওয়া এই মন্ত্রিসভার দ্বারা কার্যত অসম্ভব ছিল। তেমন অবস্থায় এই অনাস্থা প্রস্তাবই মন্ত্রিসভার টনক নড়াইয়াছিল।

গণতন্ত্রে অপযিশনের কর্তব্য ও অবদান এটাই। অপযিশনের চাপ ও সমালোচনাই হক মন্ত্রিসভাকে এই সব ভাল কাজে বাধ্য করিয়াছিল। কিন্তু সবটুকু কৃতিত্ব হক মন্ত্রিসভাই পাইল। অপযিশন এক বিন্দু ধন্যবাদ পাইল না! হক মন্ত্রিসভা যিলাবাদে দেশের আকাশ-বাতাস মুখরিত হইল। পক্ষান্তরে অপযিশনের ভাগ্যে জুটিল নিন্দা। অমন ভাল মন্ত্রিসভার যারা বিরোধিতা করে, তারা দেশ-হিতৈষী হইতেই পারে না। অপযিশনের এই পরোক্ষ লোকসান ছাড়া আরও দুইটা প্রত্যক্ষ লোকসান হইল। এক কৃষক-প্রজা পার্টি দুই টুকরা হইয়া গেল। ৫৮ জন মেম্বরের মধ্যে ২৮ জন মাত্র মেম্বর লইয়া আইন পরিষদের মধ্যে কৃষক-প্রজা-পার্টি গঠিত হইল। বাকী ৩০ জন হক সাহেবের সমর্থক রূপে কোয়ালিশন পার্টির মেম্বর রহিয়া গেলেন। দুই হক সাহেব কৃষক-প্রজা সমিতির সভাপতিত্বে ইস্তফা না দিয়াই প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতিত্ব গ্রহণ করায় হক সাহেবের সমর্থক কৃষক-প্রজা মেধররা তাঁদের স্বাত্ম রক্ষার বা নিজস্ব কৃষক-প্রজা-সমিতি চালাইবার কাজে হক সাহেবের পদ-মর্যাদার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পাইলেন না। সংগঠনের বিশেষ চেষ্টাও হক সাহেব করিলেন না। অথচ কৃষক-প্রজা-সমিতির সভাপতিত্বও ছাড়িলেন না। এত দ্বন্দ্ব কলহের মধ্যেও হক সাহেবের সহিত আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালই ছিল। পার্টির নেতাদের অনুরোধে একদিন আমি তাঁকে মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা-সমিতি উভয়টার সভাপতি থাকার মত স্ববিরোধী কাজ না করিয়া একটা হইতে পদত্যাগ করিতে অনুরোধ করিলাম। তিনি সুস্পষ্ট আন্তরিকতার সাথে জবাব দিলেন যে, মুসলিম বাংলাকে বাঁচাইতে হইলে মুসলিম লীগও করিতে হইবে, কৃষক-প্রজা-সমিতিও চালাইতে হইবে। তাঁর এই সুস্পষ্ট অসংগত কথার সমর্থনে তিনি শক্তিশালী যুক্তিও দিলেন। তিনি বলিলেন : বাংলার ক্ষেত্রে প্রজা-আন্দোলন ও মুসলিম-আন্দোলন একই কথা। মুসলিম লীগ ক যেমন ভারতীয় মুসলমানের জন্য দরকার কৃষক-প্রজা সমিতি করা তেমনি বাংগালী মুসলমানের জন্য দরকার। তিনি কৃষক-প্রজা-সমিতির সভাপতিত্ব ছাড়িয়া দিয়া এটাকে কংগ্রেস-নেতাদের হাতে তুলিয়া দিতে পারে না। তেমনি মুসলিম লীগের সভাপতিত্ব ছাড়িয়া দিয়া ওটাকে খাজা-গজাদের হাতে তুলিয়া দিতে পারেন না।

৪. কৃষক-প্রজা আন্দোলনের ভূমিকা

সে সব যুক্তি অনুসারে যদি হক সাহেব কাজ করিতেন তবে হয়ত একদিন তাঁর মত সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইত। কিন্তু তা হয় নাই। তাঁর সমর্থক কৃষক-প্রজা মেম্বরদের অস্তিত্ব আস্তে-আস্তে মুসলিম লীগের তলে চাপা পড়িয়া গেল। স্বয়ং হক সাহেব মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ায় কৃষক-প্রজা সমিতির ঐ অংশ কার্যতঃ মুসলিম লীগের মধ্যে মার্জ হইয়া গেল। পক্ষান্তরে ঐ একই অবস্থা-গতিকে কৃষক প্রজা সমিতির আমাদের অংশ আস্তে আস্তে কার্যতঃ কংগ্রেসের শাখা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইয়া গেল।

পরবর্তী দুই-তিন বছরের মধ্যেই বাংলার কৃষক-প্রজা পার্টির অস্তিত্ব লোপ পাইল। এই জন্যই অনেক রাষ্ট্র বিজ্ঞানী হক সাহেবকে বাংলার ম্যাকডোনান্ড বলিয়া থাকেন। অনেকের মতে মিঃ রামযে ম্যাকডোনান্ডই নিজ হাতে লেবার পার্টি গঠন করিয়াছিলেন। তিনি নিজ হাতেই তা ভাংগিয়া গিয়াছেন, হক সাহেবও বাংলার প্রজা-পার্টির যুগপৎভাবে সৃষ্টিকর্তা ও সংহার-কর্তা। বিলাতের লেবার পার্টি আবার পূনর্জন্ম লাভ করিয়াছে এবং অধিকতর শক্তিশালী হইয়াই জন্মিয়াছে। বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি এবারের মত চূড়ান্তভাবে মরিয়াছে। লেবার পার্টির পুনর্জন্মের কারণ তার উদ্দেশ্য এখনও সফল হয় নাই; ইংলন্ডে সমাজবাদ আজও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। বাংলার কৃষক-প্রজা পার্টির আদর্শ সমাজবাদের মত সুদূরপ্রসারী কর্মপন্থা ছিল না। এর আদর্শও খুব বিপ্লবাত্মক হইলেও সেটা ছিল সীমাবদ্ধ। ‘লাংগল যার মাটি তার’ এটা কৃষক-প্রজা পার্টির বামপন্থী দলেরই শ্লোগান ছিল। নেতারা এতে বিশ্বাস করিতেন না। নেতাদের দৃষ্টি ছিল অন্যদিকে। বাংলার প্রজা-আন্দোলন একটা মুসলিম-আন্দোলন বটে। আচার্য রায় ঠিকই বলিয়াছিলেন, কৃষক-প্রজা নেতা হক সাহেব মাথার চুল হইতে পায়ের নখ পর্যন্ত মুসলমান। তাঁর নেতৃত্ব কাজেই নিজ কৃষক-নেতৃত্ব ছিল, ছিল মুসলিম নেতৃত্ব। প্রজা-পার্টির অভিযোগে শুধু অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি ছিল, সামাজিক মর্যাদার দাবিও ছিল আমার নিজের বেলা যেমন জমিদারের কাঁচারিতে মুসলমান প্রজাদের বসিবার আসনের এবং সম্মানজনক সোধনের দাবি হইতেই আন্দোলন শুরু হইয়াছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবিকল তাই হইয়াছিল। কংগ্রেসের এবং কিষাণ সভার বন্ধুরা বাংলার প্রজা-আন্দোলনকে মুসলমান জোতদারদের আন্দোলন বলিতেন। তাঁদের এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল না। কৃষক-প্রজা আন্দোলন যে সময় খুবই জনপ্রিয় আন্দোলন কৃষক-প্রজা-সমিতি যখন খুবই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সেদিনেও বর্গাদারদেদখলী স্বত্ব দেওয়ার প্রশ্নে অনেক প্রজা নেতাই ছাঁৎ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতেন। সার আব্দুর রহিম, মৌলবী আবদুল করিম, খান বাহাদুর আবদুল মোমিন প্রভৃতি বড়-বড় মুসলিম নেতার প্রজা-সমিতির কর্মকর্তা থাকা হইতেই প্রজা-সমিতির মধ্যকার রূপ বোঝা যায়। সোজা কথায় প্রজা আন্দোলন ছিল সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আন্দোলন। সামন্ত-রাজদের বিপুল সংখ্যাধিক লোক হিন্দু হওয়ায় মুসলমানদের মধ্যবিত্তেরা এই সামন্ততন্ত্রের কোনও সুবিধা না পাওয়ায় মুসলমানদের মধ্যে প্রজা-আন্দোলনের এতটা জনপ্রিয় হইয়াছিল। সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলমান শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ক্রোধের কারণ এই হইতেই বোঝ যাইবে যে হিন্দু সামন্ত-রাজদের চাকুরি-বাকুরি ত দূরের কথা, যে কজন মুসলমান সামন্ত ছিলেন তাঁদের চাকুরিগুলিও মুসলমানরা পাইত না। চাকুরি-বাকুরি ছাড়াও সামন্ত-রাজেরা মামলা-মোকদ্দমা আমোদ-প্রমোদ বিলাস-বাসনে যে অজস্র টাকা ব্যয় করিতেন, তাও হিন্দুরা পাইত। কাজেই বাংলার এজা-আন্দোলন মূলতঃ এবং প্রধানতঃ হিন্দু সামন্ত-তন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলিম মধ্যবিত্তের আন্দোলন। এই আন্দোলনে সমাজবাদী ও সাম্যবাদী বামপন্থী এক দল কর্মী ছিলেন বটে, এবং তাঁদের চেষ্টায় প্রজা-আন্দোলন বাধ্য হইয়া কৃষক আন্দোলনের আকৃতি প্রকৃতিও কিছুটা পাইয়াছিল বটে, কিন্তু স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক কারণেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পান নাই। মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের মধ্যে হক সাহেবই ছিলেন একমাত্র গণ-নেতা ম্যান-অব-দি মাসে। তিনি বিপুল কর্মী সুচতুর টেকনিশিয়ান রাজনৈতিক ম্যাজিশিয়ান ও কৌশলী যোদ্ধা ছিলেন। তিনি জনগণের ভাষায় জনগণের যুক্তি দিয়া জনগণকে নিজের কথা বুঝাইতে পরিতেন। তাঁর কথায় ও কাজে ইমোশন ছিল। ঈর বুকে দরদ ছিল। কাজেই এ দরদী ভাব প্রবণ নেতাকে ভাবালু জনসাধারণ অতি সহজেই বুঝিতে পারিত।

৫. হক-নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য

এমন নেতা যেদিন এক পকেটের কৃষক-প্রজা পার্টি এবং আরেক পকেটে মুসলিম লীগ লইয়া মাঠে নামিলেন, এবং দুদিন আগে-কওয়া কথার বিপরীত কথা বলিতে লাগিলেন, জনসাধারণ সেদিনও তাঁর কথা মানিয়া লইল। ডাল ভাতের যুক্তি দিয়া দুদিন আগে তিনি মুসলিম লীগের ‘মুসলমান ভাই ভাইর’ যে কথাটাকে একটা হাস্যকর ভন্ডামি বলিয়া উড়াইয়া দিয়াছিলেন এবং জনসাধারণও উহাকে বিদ্রূপ করিয়াছিল, দুই দিন পরে সেই হাস্যকর কথাকেই তিনি জনপ্রিয় সত্যে পরিণত করিলেন। মুসলিম লীগ নেতাদের মুখে যেটা শুনাইত অবিশ্বাস্য হাস্যর উক্তি, হক সাহেবের মুখে সেটাই শুনাইত ঘোরতর সত্য কথারূপে। তিনি যেদিন মাঠে নামিয়া বলিলেন : প্রজা-সমিতিও দরকার, মুসলিম লীগও দরকার, তখন জনসাধারণও তাই বিশ্বাস করিল। আমরা কৃষক-প্রজা পার্টির ঝাণ্ডা খাড়া রাখিবার চেষ্টা করিয়া হক সাহেবের স্থলে মওলানা আব্দুল্লাহিল বাকীকে সভাপতি করিলাম। কৃষক-প্রজা সমিতির সংগঠনে মনও দিলাম। কিন্তু হক সাহেবের জনপ্রিয়তার সংগে সরকারী শক্তির যোগ হওয়ায় তার দুর্বার স্রোতের মুখে আমরা ভাসিয়া গেলাম।

আচার্য রায় ঠিকই বলিয়াছিলেন : হক সাহেব খাঁটি মুসলমানও বটে, তিনি খাঁটি বাংগালীও বটে। অনাস্থা প্রস্তাবে জিতিয়াও তিনি অল্পদিনেই বুঝিলেন একদিকে মুসলিম সংহতি প্রচারের দ্বারা অপরদিকে কৃষকপ্রজা পার্টিকে ধ্বংস করিয়া দুইদিক হইতেই তিনি বাংলার নেতৃত্ব অবাংগালীর হাতে তুলিয়া দিতেছেন। তিনি নিজে যাইতেছেন মুসলিম লীগের দিকে; আর তাঁর দুঃখের দিনের সহকর্মীদের ঠেলিয়া দিতেছেন তিনি কংগ্রেসের দিকে। এ দুইটার নেতৃত্বই বাংলার বাইরে। নিজে প্রধানমন্ত্রী হইয়াও মন্ত্রিসভার মধ্যে তিনি মাইনরিটি হইয়া পড়িয়াছেন এটা তিনি সহজেই বুঝিতে পারিলেন।

এটা তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন বিশেষভাবে প্রজাস্বত্ব আইন পাস করার সময়। কোয়েলিশন পার্টিতে সচ্ছল মেজরিটি থাকায় আইন পরিষদে বিলটি পাস হইল বটে কিন্তু লাট সাহেব উক্ত আইনের দস্তখত দিতে গড়িমসি করিতে লাগিলেন। উক্ত আইনের বড় লাটের অনুমোদন লাগিবে বলিয়াও লাটসাহেব মত প্রকাশ করিলেন। শোনা যায় স্বয়ং মন্ত্রীদের কারো-কারো কথায় লাট সাহেব ঐ রূপ করিয়াছিলেন। অবশেষে হক সাহেব পদত্যাগের হুমকি দিলে লাট সাহেব প্রজাস্বত্ব আইনে দস্তখত দেন। তাই হক সাহেব সাবধান হইবার চেষ্টা করিলেন। তিনি প্রজা নেতাদের সংগে আপোস করিয়া মন্ত্রিসভার ভিতরে অধিকতর শক্তিশালী হওয়া দরকার বোধ করিলেন। এ দরকার যরুরী হইয়া পড়িয়াছিল। ১৯৩৮ সালের অক্টোবর মাসে মৌঃ তমিমুদ্দিনের নেতৃত্বে একদল সদস্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রজা পার্টি নামে দল করিয়াই ইতিমধ্যে কোয়েলিশন পার্টি হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছিলেন। তাই হক সাহেব মৌ শামসুদ্দিন ও মৌঃ তমিযুদ্দিন উভয়কে মন্ত্রী করিয়া কৃষক-প্রজা পার্টি ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রজা পার্টি উভয় দলের সহিত মিটমাট করার প্রস্তাব দেন। উক্ত দুই পার্টির যুক্ত বৈঠকে কতিপয় শর্ত পেশ করা হয়। প্রধান মন্ত্রী সব শর্ত মানিয়া নেন। ইতিমধ্যে কৃষক-প্রজা। পার্টির দৈনিক মুখপত্ররূপে ‘কৃষক’ বাহির হইল। আমি তাঁর সম্পাদকতার ভার নিলাম। ফলে আমি কলিকাতার স্থায়ী বাশো হইলাম। তাতে পার্লামেন্টারি পলিটিকসে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়াইয়া পড়িলাম। সকলের চেষ্টায় ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ ও মৌঃ তমিযুদ্দিন খাঁ হক মন্ত্রিসভায় প্রবেশ করিলেন। কৃষক-প্রজা সমিতির বিনা অনুমতিতে মৌঃ শামসুদ্দিন সাহেব মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াছেন, এই অভিযোগে সমিতির কাউন্সিলের এক রিকুইযিশন সভায় অধিবেশন দেওয়া হইল। ২৩শে ডিসেম্বর হইতে তিন দিন ধরিয়া এই সভার অধিবেশন চলিল। অবশেষে হক সাহেব এই সভায় যোগদান করিলেন। হক সাহেবের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত কৃষক-প্রজা সমিতি ১২টি শর্তে শামসুদ্দিন সাহেবের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ অনুমোদন করিল। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ঐ সব শর্ত পূর্ণ করিতে না পারিলে হক সাহেব নিজেই পদত্যাগ করিবেন প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় বিক্ষুব্ধ কৃষক-প্রজা নেতৃবৃন্দ ও এম. এল. এ. গণ শান্ত হইলেন।

নির্ধারিত দিন আসিল, গেল। কিন্তু হক সাহেবের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখা হইল। ১২টি শর্তের একটিও পূর্ণ হইল না। ফলে কৃষক-প্রজা সমিতির ওয়ার্কিং কমিটি ও কৃষক-প্রজা পার্টির যুক্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হইল। শামসুদ্দিন সাহেবের বক্তব্য শুনিয়া ঐ ১২টি শর্তকে দুই ভাগে ভাগ করা হইল। তিনটিকে আশু পূরণের দাবি করা হইল। এই আশু শর্ত তিনটি পূরণের জন্য আরও পনর দিন সময় দেওয়া হইল। প্রস্তাবে বলা হইল এটাই শেষ কথা : এর পর আর সময় দেওয়া হইবে না। এই প্রস্তাবকে চরমপত্র হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিবার জন্য সমিতির প্রেসিডেন্ট মওলানা আবদুল্লাহ হিল বাকী ও আমাকে লইয়া একটা ডিপুটেশন গঠিত হইল।

তদনুসারে মওলানা সাহেব ও আমি হক সাহেবের ঝাউতলায় বাড়িতে গেলাম। তিনি পরম সমাদরে আমাদেরে অভ্যর্থনা করিলেন এবং শর্ত পূরণ করিতে না পারার অনেকগুলি যুক্তিপূর্ণ কারণ প্রদর্শন করিলেন। তার মধ্যে লাটের সাথে জমিদার মন্ত্রীদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথাই বেশি। আমার ত বটেই স্বয়ং মওলানা সাহেবের দিলটাও নরম হইয়া গেল। হক সাহেব দুচার দিনের মধ্যে সবগুলি না হউক অন্ততঃ তিনটা আশু শর্ত পূরণ করিতে পারিবেন বলিয়া আশ্বাস দিলেন। আমরা আশ্বস্ত হইয়া বিদায় হইলাম।

৬. দুর্জ্ঞেয় হক সাহেব

কিন্তু হক সাহেব আমাকে ডাকিয়া ফিরাইলেন। আমি মওলানা সাহেবকে বিদায় দিয়া একা তাঁর ঘরে গেলাম। হক সাহেব আমাকে বসাইয়া রাখিয়া সেক্রেটারিয়েটে যাইবার সাজ-পোশাক পরিলেন। তারপর আমাকে লইয়া গাড়িতে উঠিলেন। সোজা গেলেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ। প্রধানমন্ত্রীর কামরায় ঢুকিয়াই দেখিলাম নবাব হবিবুল্লাহ সহ কয়েকজন মন্ত্রী বসিয়া আছেন। আমার সংগে যরুরী কথা আছে বলিয়া তিনি অল্প কথায় সব কয়জন মন্ত্রীকে বিদায় করিলেন। একে একে মন্ত্রীরা সব বাহির হইয়া গেলে হক সাহেব নিজে চেয়ার ছাড়িয়া উঠিলেন। প্রথমে সামনের বড় দরজাটা, তার পর অন্যান্য দরজা এবং শেষ পর্যন্ত সবগুলি জানালা নিজ হাতে বন্ধ করিলেন। ঠিক মত বন্ধ হইয়াছে কি না, ছিটকানিগুলি লাগিয়াছে কিনা, টিপিয়া-টিপিয়া দেখিলেন। আমি অবাক বিস্ময়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী বিশাল-বপু শেরে-বাংলা ফযলুল হক সাহেবের কার্যকলাপ দেখিতে লাগিলাম। আমার মত পদ-মর্যাদাহীন নগণ্য একটা লোকের সাথে যরূরী আলাপ করিবার জন্যই এত সাবধানতা অবলম্বন করিতেছেন, এটা বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। তবে কেন, কি উদ্দেশ্যে তিনি এত পরিশ্রম করিতেছেন? আমার কৌতূহল সীমা ছাড়াইয়া যাইতে লাগিল।

অবশেষে তিনি ফিরিয়া টেবিলের দিকে আসিলেন। কিন্তু নিজের চেয়ারে না বসিয়া আমার পাশের একটা চেয়ার টানিয়া আরও কাছে আনিয়া তাতে বসিলেন। তার পরও অতিরিক্ত সাবধানতা হিসাবে আরেক বার ডাইনে-বাঁয়ে তাকাইয়া ছোট গলায় বলিলেন : দেখ আবুল মনসুর, আজ যে কথা কইবার লাগি তোমারে এখানে লৈয়া আসছি, সেটা এতই গোপনীয় যে উপরে আরা ও নিচে তুমি আমি ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না। আর ওয়াস্তে ওয়াদা তুমি একথা কেউরে কইতে পারবা না। মরুবির কথা। আমি আর কি করিতে পারি। ওয়াদা করিলাম। তিনি আরেক টানে চেয়ারটা আমার আরও কাছে আনিয়া তীর বেলচার মত বিশাল হাতে আমার ডান হাতটা ধরিয়া ফেলিলেন। তারপরই দুই হাতে আমার হাতটা চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন : ‘শর্ত-টর্তের কথা ভুইলা যাও। আমি ওর একটাও পূরণ করতে পারব না। পারব না মানে করব না। ঐ সব শর্ত যদি আমি পূরণ করি, তবে কৃষক-প্রজা পার্টি ন্যায়তঃ কোয়ালিশন পার্টির অংগ হইয়া যাইতে বাধ্য। কিন্তু আমি তা চাই না। আমি চাই কৃষক-প্রজা পার্টি অপযিশনেই থাকুক। মুসলিম লীগওয়ালাদের সাথে আমার সম্পর্ক খুবই খারাপ। কখন কি হয় কওয়া যায় না। হৈতে পারে শীগগির আমাকে রিযাইন করতে হৈব। সে সিচুয়েশনে আমার একটা জাম্পিংগ্রাউও থাকার দরকার। বুঝলা ত?

আমি আর কি বুঝিব? বিস্ময়ে আমার ভালুজিত লাগিয়া গিয়াছিল। গলা শুকাইয়া গিয়াছিল। পা অবশ হইয়া আসিয়াছিল। মাথা তো তো করিতেছিল। কাজেই জবাব দিতেছিলাম না। তিনি আমার হাতে একটা যবর চাপ দেওয়ায় আমি চমকিয়া উঠিলাম। অনেক কষ্টে বলিলাম : তবে যে শামসুদ্দিনের পদত্যাগ কতেই হৈব।

আমার হাত হইতে নিজের ডান হাতটা আমার কাঁধে তুলিলেন। বলিলেন : ‘না সে পদত্যাগ করতে পারে না; তারে কিছুতেই পদত্যাগ করায়ো না। আসল কথা কি জান, আমি কোয়েলিশন পার্টিতে মাইনরিটি নই। কিন্তু ক্যাবিনেটে আমি মাইনরিটি। শামসুদ্দিন মন্ত্রী থাকলে আমার জোর বাড়ে। তুমিষুদ্দিনকে আমি পুরাপুরি বিশ্বাস করি না। তবু শামসুদ্দিন ক্যাবিনেটে থাকলে তুমিষুদ্দিন আমার পক্ষে ভোট দিব। কিন্তু সে বার হৈয়া গেলে তুমিষুদ্দিন খাজাদের সাথে যোগ দিব।‘

গোড়াতে হক সাহেবের এই অসাধু প্রস্তাবে আমি চাটয়া গিয়াছিলাম। কিন্তু ক্রমে তাঁর অসুবিধা উপলব্ধি করিলাম। তার যুক্তির সারবৃত্তান্ত আমি বুঝিলাম। তবু বন্ধুবর শামসুদ্দিনকে ওয়াদা খেলাফের অপরাধে অপরাধী করিতে এবং কৃষক-প্রজা পার্টির নির্দেশ অমান্য করায় উদ্বুদ্ধ করিতে মন মানিল না। বলিলাম : ‘সার, এটা হয় না। শামসুদ্দিন পার্টি ম্যান্ডেট অমান্য কৈরা যদি মন্ত্রিত্ব আঁকড়াইয়া থাকে, তবে তাঁর সুনাম নষ্ট হৈব, তার রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটব।’

হক সাহেব ধাক্কা মারিয়া আবার হাতটা ছাড়িয়া দিয়া গর্জিয়া উঠিলেন। বলিলেন : ওসব বাজে কথা আমার কাছে কইও না। আমি যদি শামসুদ্দিনের পিছনে দাঁড়াই তবে সে যাই করুক না কেন, তার রাজনৈতিক জীবন নষ্ট হবার পারে না। তুমি গিয়া তারে কও, আমি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ভার নিলাম।

আমি খুবই বিভ্রান্ত হইয়া হক সাহেবের নিকট হইতে বিদায় নিলাম। কিন্তু আসল কথা। কার, কাছে বলিলাম না। সমিতির সভাপতি মওলানা বাকী সাহেবের নিকট হইতে মেরা আগেই রিপোর্ট পাইয়াছিলেন, হক সাহেব শীঘ্রই শর্ত পূরণ করিতেছেন। কাজেই আমার আর নূতন কি কথা থাকিতে পারে? ফলে আমাকে কেউ, বিশেষ কিছু জিগাস করিলেন না। মওলানা সাহেব পার্টি হাউসে থাকিতেন না, নিজের বাসায় থাকিতেন। কাজেই পরদিন সভার আগে তার সাথে আমার দেখা হইল না। পরদিন সভায় স্বয়ং সভাপতি সাহেবই হক-মোলাকাতের বর্ণনা দিলেন। তিনি বলিলেন : হক সাহেব শীঘ্রই শর্তগুলি অন্ততঃ তার বেশির ভাগ, পূর্ণ করিবেন ওয়াদা করিয়াছিলেন। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট তারিখ দেন নাই। দীর্থ আলোচনার পর ঐদিন হইতে পনর দিন পরে পদত্যাগ করিতে শামসুদ্দিন সাহেবকে নির্দেশ দিয়া প্রস্তাব গৃহীত হইল। আমি পনর দিনের জায়গায় একমাস সময় দেওয়ার প্রস্তাব দিলাম। ইতিমধ্যে তিনমাসের বেশি সময় অতিবাহিত হইয়াছে এই যুক্তিকে আমার এক মাসের প্রভাব গ্রাথ হইল। সভাশেষে মওলানা সাহেব একা আমার সাথে কথা বলিলেন। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজিকার সভায় আমার অল্পভাষিতা মওলানা সাহেবকে চিন্তাযুক্ত করিয়াছে সে কথা তিনি বলিলেন। প্রসংগ ক্রমে আগের দিন হক সাহেবের সাথে আমার আর কি আলাপ হইল তাও জিগাস করিলেন। আমি অনেক দ্বিধা-সন্দেহ কাটাইয়া খুব সাবধানে অল্প কথায় হক সাহেবের প্রস্তাবের মূল কথাটা বলিলাম। ঐ সাথে এর সুবিধা ও যুক্তিটাও বলিলাম। মওলানা বাকী সাহেব ছিলেন তীবুদ্ধি দূরদর্শী রাজনীতিজ্ঞ। তিনি চট্‌ করিয়া কথাটা ধরিয়া ফেলিলেন। বলিলেন : ‘হক সাহেবের কথায় জোর আছে। এ কথা যদি সতায় আপনি বলিতেন তবে প্রস্তাব অন্য রকম হইত। যাক এখন আর সময় নাই। যা হইবার ভালই হইয়াছে। হক সাহেব যদি লীগের সহিত আংগিয়া আসেন, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মত এই যে, তাঁকে আমাদের গ্রহণ করা উচিৎ।‘

হক সাহেবের সাথে মুসলিম লীগের বিরোধের কোনও লক্ষণ দেখা গেল না পনর দিন চলিয়া গেল।

৭. শামসুদ্দিনের পদত্যাগ

হক সাহেব শেষ পর্যন্ত তাঁর কথা রাখিলেন, অর্থাৎ একটি শর্ত পূরণ করিলেন না। কিন্তু আমি হক সাহেবের কথামত কাজ করিতে পরিলাম না। শামসুদ্দিনের সাথে গোপন আলাপে আমি হয়ত তাঁকে আভাসেইগতে হক সাহেবের মনের কথা বুঝিতে দিয়াছিলাম। ভাই শামসুদ্দিন পদত্যাগ করিতে প্রথমে অনিচ্ছা প্রকাশ করিলেন। মন্ত্রী থাকার সুবিধার কথাও অনেক আলোচনা হইল। কৃষক-প্রজা পার্টির শর্তসমূহ নিশ্চিতরূপেই কৃষক-প্রজার স্বার্থের অনুকূল। প্রতমতঃ শামসুদ্দিন সাহেব মন্ত্রী থাকিয়া গেলে ঐগুলি ক্রমে ক্রমে পূর্ণ হইবার আশা থাকে। পদত্যাগ করিয়া ফেলিলে সে আশা থাকে না। দ্বিতীয়তঃ ইতিমধ্যে কৃষক-প্রজা পার্টির মুখপত্ররূপে দৈনিক ‘কৃষক’ বাহির করিয়াছিলাম। আমিই ওটার সম্পাদক। শামসুদ্দিন মন্ত্রী থাকিলে কাগজটা চালান সহজ হইবে। মন্ত্রী না থাকিলে কাগজ চালান খুবই কঠিন, হয়ত অসম্ভব হইবে। তৃতীয়তঃ ইতিমধ্যে ময়মনসিংহ জিলার টাংগাইল মহকুমার ভেংগুলা গ্রামে নিখিলবংগ কৃষক-প্রজা-সম্মিলনীর আয়োজন করা হইয়াছে। নবাবযাদা হাসান আলী অভ্যর্থনা সমিতির সেক্রেটারি ও আমি নিজে উহার চেয়ারম্যান। কৃষিমন্ত্রী হিসাবে শামসুদ্দিন সাহেব ঐ সম্মিলনী উদ্বোধন করিবেন। এসব কথা ঘোষণা ও প্রচার করা ইয়াছে। এই সময় তিনি পদত্যাগ করিলে কর্মীদের উৎসাহ উদ্যম দমিয়া যাইবে। সম্মিলনীর সাফল্য ব্যাহত হইবে। ঐ সংগে মন্ত্রিত্ব না ছাড়িবার প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া ও কুফলগুলির কথাও বিবেচনা করা হইল।

সমস্ত বিষয় ধীরভাবে বিবেচনা করিয়া অবশেষে মৌঃ শামসুদ্দিন ১৯৩৯ সনের ১৭ই ফেব্রুয়ারি এক সুদীর্ঘ বিবৃতিতে আদ্যোপান্ত সমস্ত বিষয় বর্ণনা করিয়া মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করেন। কোনও পার্লামেন্টারি দল স্বীয় মন্ত্রীকে কল ব্যাক করা এবং কর্মসূচির ভিত্তিতে কোন মন্ত্রীর পদত্যাগ করা বাংলা ও ভারতের রাজনীতিতে ছিল উহাই প্রথম। সকলে মিলিয়া আমরা শামসুদ্দিন সাহেবের এই সাহসী পদত্যাগে ও স্বার্থত্যাগে তাঁকে ধন্যধন্য করিলাম।

৮. শেষ কৃষক-প্রজা সম্মিলনী

নির্ধারিত তারিখে (২০শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৯) ময়মনসিংহ জিলার টাংগাইল মহকুমার অন্তর্গত তেংগুলা গ্রামে নিখিল বংগ কৃষক-প্রজা সম্মিলনীর অধিবেশন বসিল। আশা ছিল কৃষিমন্ত্রী হিসাবে শামসুদ্দিন সাহেবকে লইয়া আমরা ভেংগুলা নিখিল বংগ কৃষক-প্রজা সম্মিলনী করিব। আমাদের বরাতে তা আর হইল না। তবু সম্মিলনীর সৌষ্ঠব ও সাফল্যের কোনও নি হইল না। নবাবযাদা হাসান আলী অভ্যর্থনা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে সম্মিলনীর সাফল্যের জন্য শারীরিক পরিশ্রম ও অসংকোচে অর্থ ব্যয় করিতে কোনও কৃপণতা করিলেন না। অজ পাড়াগাঁয়ে নিখিল বংগীয় সম্মিলনীর এমন সুন্দর প্যাণ্ডাল সুউচ্চ মঞ্চ দুই ডজন লাউডস্পিকারসহ একাধিক মাইক্রোফোন, সমাগত নেতৃবৃন্দের থাকা-খাওয়া এমন সুবন্দোবস্ত ইতিপূর্বে, এবং দেখা গেল এর পরেও, আর কখনও হয় নাই। ডেলিগেট ও দর্শকসহ প্রায় লক্ষ লোকের সমাগম হইয়াছিল বলিয়া সকলে অনুমান করিয়াছিল। সভাপতি হিসাবে মওলানা আবদুল্লাহিল বাকী সাহেব খুব সারগর্ত সুচিন্তিত অভিষণ দিয়াছিলেন। ভূতপূর্ব মন্ত্রী মৌঃ সৈয়দ নওশের আলী ও মৌঃ শামসুদ্দিন সম্মিলনীতে বিপুলভাবে সম্বধিত হইয়াছিলেন। হক সাহেবের বিরুদ্ধে যাওয়ায় এবং মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করায় উক্ত নেতৃদ্বয় ও কৃষক-প্রজা সমিতি কিছুমাত্র জনপ্রিয়তা হারাইয়াছেন মনে হইল না। বরঞ্চ দুইটি ঘটনা হইতে মনে হইয়াছিল যে গণ-মনে কৃষক-প্রজা সমিতির প্রতি যথেষ্ট টান তখনও অটুট রহিয়াছে। একটি ঘটনা এই যে কলিকাতা হইতে নেতৃবৃন্দ আসিবার কালে পিংনা স্টিমার স্টেশনের স্থানীয় ম্যারেজ রেজিস্টারের নেতৃত্বে কতিময় খায়েরখাহ ইউ.বি.প্রেসিডেন্ট নেতৃবৃন্দকে কালা নিশান দেখাইবার চেষ্টা করিয়া বিফল হন। দ্বিতীয় ঘটনা এই যে করটিয়ার জনাব মঊদ আলী খান পন্নি (নবাব মিয়া) এক দল লোক লইয়া আমাদের সম্মিলনীতে গন্ডগোল বাধাইতে আসিতেছিলেন। পথেজনসাধারণ তাঁদের বাধা দেওয়ায় তাঁরা মধ্য পথহইতে ফিরিয়া যান।

ইহাই ছিল নিখিল বংগ কৃষক-প্রজা সম্মিলনীর শেষ অধিবেশন। প্রকাশ্য অধিবেশন ত আর হয়ই নাই। সমিতির কাউন্সিলের বৈঠকও এর পর হয় নাই। কৃষক-প্রজা পার্টিই পার্লামেন্টারি ব্যাপারাদি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিত। বড় জোর সমিতির ওয়ার্কিং কমিটি ডাকা হইত। প্রতিষ্ঠান হিসাবে কৃষক-প্রজা সমিতি নির্জীব ও নিষ্ক্রিয় হইয়া পড়িবার প্রধান কারণ ছিল এই যে, খোদ কৃষক-প্রজা আন্দোলনই তার তীক্ষ্ণতা ও তীব্রতা হারাইয়া ফেলিয়াছিল। ঢিমা-তেতালা-ভাবে হইলেও হক মন্ত্রিসভা কৃষক-প্রজা ও মুসলমানদের জন্য যথেষ্ট ভাল কাজ করিয়াছিলেন এবং করিতে ছিলেন। ১৯৩৮ সালে সালিশী বোর্ড স্থাপন, ১৯৩৯ সালের প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪০ সালের মহাজনি আইন, প্রাথমিক শিক্ষা আইন অনুসারে স্কুলবোর্ড গঠন, কলিকাতা কর্পোরেশন আইন সংশোধন করিয়া পৃথক নির্বাচন প্রবর্তন, মাধ্যমিক শিক্ষা বিল আনয়ন ইত্যাদি কাজ করিয়া ও করিতে চাহিয়া মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে হক মন্ত্রিসভা দোষে-গুণে সবচেয়ে ভাল মন্ত্রিসভা বলিয়া জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাছাড়া হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ ও নেতৃবৃন্দ হক মন্ত্রিসভার যে সব সমালোচনা নিন্দা ও প্রতিবাদ করিতেন, তার প্রায় কোনটাই জনগণের স্বার্থে করা হইত না। প্রায় সবগুলিই করা হইত হিন্দু বা কায়েমী স্বার্থের খাতিরে। এই পরিবেশে কৃষক-প্রজা পার্টির  প্রকৃত জনস্বার্থমূলক সরকার-বিরোধিতাও ভুল বুঝা হইত। কৃষক-প্রজা পার্টি কংগ্রেসীদের সাথে হাত মিলাইয়া এই মন্ত্রিসভারই পতন ঘটাইতে চায়। মুসলিম গণ মনে এই সন্দেহ বদ্ধমূল হওয়ায় তাদের মুখে ভাল কথা শুনিতেও জনসাধারণ রাযী ছিল না। ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধ বাধায় এবং জাপান প্রায় ভারত দখল করে-করে অবস্থা আসিয়া পড়ায় সভা সমিতির ও প্রচারণা প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়ে।

১৯৪০ সালের মার্চ মাস ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটা চিরস্মরণীয় ঐতিহাসিক, গুরত্বপূর্ণ মাস। এই মাসে মিঃ জিন্নার সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ গৃহীত হয়। আর বিহারের অন্তর্গত রামগড় নামক স্থানে মাত্র আধ মাইলের ব্যবধানে মওলানা আবুল কালাম আযাদের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের অধিবেশন এবং সুভাষ বাবুর সভাপতিত্বে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী কংগ্রেসের (ফরওয়ার্ড ব্লক) সম্মিলনী হয়। কংগ্রেস প্রস্তাবে বলা হয়, চলতি যুদ্ধ বৃটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থে পরিচালিত হইতেছে। ভারতের স্বাধীনতা স্বীকার না করা পর্যন্ত কংগ্রেস এ যুদ্ধে সহযোগিতা করিতে পারে না। সুভাষ বাবুর সম্মিলনীতে সোজাসুজি সরকারের যুদ্ধ-প্রচেষ্টার বিরোধিতা করিবার সিদ্ধান্ত করা হয়।

১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ হক সাহেবের প্রস্তাবে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় মুসলমানদের রাজনৈতিক চিন্তাধারাও নূতন দিগন্তের দিকে আকৃষ্ট হয়। এটাই মুসলিম লীগের সর্বপ্রথম রাজনৈতিক পঠিটিভ পদক্ষেপ। লাহোর প্রস্তাবই মুসলিম ভারতের রাজনৈতিক আদর্শকে গোটা ভারতের রাজনৈতিক দাবির সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ করিয়া তুলে। মুসলিম লীগ তার ভারতের স্বাধীনতা বিরোধী থাকে না। হইয়া উঠে স্বাধীনতার দাবিদার। এদিকে হক মন্ত্রিসভার দ্বারা সালিশী বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে বাংলার কৃষক-খাতকের অর্থনৈতিক জীবনে একটা আর্থিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। এইভাবে কৃষক-প্রজা সমিতির মূল দাবিগুলি আস্তে আস্তে মুসলিম লীগ কর্তৃক গৃহীত হওয়ায় স্বতন্ত্র শ্রেণী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কৃষক-প্রজা সমিতির বাঁচিয়া থাকার একমাত্র রেইনডেটর যুক্তি ছিল শ্লোগান হিসাবে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদের দাবিটা। এ দাবির পিছনে জন মতের যে বিপুলতা দুইদিন আগে বিদ্যমান ছিল, প্রজাস্বত্ব আইন ও মহাজনি আইন পাস হওয়ার এবং সালিশী বোর্ড স্থাপনের পর সে বিপুলতা অনেকখানি হ্রাস পাইল স্বাভাবিক কারণেই। হক মন্ত্রিসভা এই সময় কার্যতঃ মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা হইয়া যাওয়ায় এবং প্রজা-খাতকদের কল্যাণকর এই সব আইন-কানুন এই মন্ত্রিসভার দ্বারাই সাধিত হওয়ায় মুসলিম জন-মত প্রায় সম্পূর্ণরূপে মুসলিম লীগের পক্ষে চালিয়া গেল।

৯. শেষ চেষ্টা

এইভাবে এই মুদ্দতটা হইয়া গেল আমার জন্য চরম বিভ্রান্তির যুগ। বস্তুতঃ আমার চিন্তারাজ্য এমন গোলমাল আর কখনো ঘটে নাই। চিন্তার অস্পষ্টতাহেতু মতের দৃঢ়তা আর আমার থাকিল না। সব কথায় এবং সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই আমি কিছু কিছু ভাল এবং কিছু কিছু মন্দ দেখিতে লাগিলাম। বলিতে লাগিলাম, কৃষক-প্রজা পার্টির এইটুকু কংগ্রেসের সেইটুকু আর মুসলিম লীগের ঐটুকু ভাল। ফলে আমার বন্ধুরা এই সময় আমার না দিলেন : ‘মিঃ এটাও সত্য ওটাও সত্য।‘ প্রকৃত অবস্থাও হইয়া উঠিয়াছিল তাই। তেজস্বী দৃঢ়তা ও স্পষ্টতার জন্য ‘কৃষকের’ সম্পাদকীয় গুলির যে সুনাম ছিল তা আর থাকিল না। অস্পষ্টতা ও দুর্বলতা ঢাকিবার জন্য নাকি তাতে ফুটিতে লাগিল ন্যায়শাস্ত্রের কচকচি। চিন্তায় দৃঢ়তা না থাকিলে লেখায় দৃঢ়তা আসিবে কোথা হইতে? অথচ কৃষক-প্রজা পার্টিকে বাঁচাইয়া রাখিতে হইলে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদের দাবিটাকে জোরদার করিতেই হইবে। এই উদ্দেশ্যে এই সময়ে আমরা তিন বন্ধু (থ্রি-মাস্কিটিয়ার্সই বলা যাইতে পারে) অধ্যাপক হুমায়ুন কবির, নবাবযাদা হাসান আলী ও আমি, কংগ্রেসী বামপন্থী, কিষাণ সভা ও কমিউনিস্টদের সাথে যোগাযোগ করিতে লাগিলাম। এই উপলক্ষ্যে মিঃ নীহারে দত্ত মজুমদার, কমরেড বংকিম মুখার্জী, কমরেড ভবানী সেন, কমরেড এম. এন. রায়, এমনকি স্বয়ং সুভাষ বাবুর সংগে দেন-দরবার চালাইলাম। কমিউনিস্ট বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র কমরেড রায় ছাড়া আর কারও সংগে অন্ততঃ আমার মতের মিল হইত না। বন্ধু হুমায়ুন কবির বোধ হয় আমার চেয়ে বেশি উত্যক্ত হইয়াছিলেন। এ ব্যাপারে একটা বড় মজার ঘটনা না বলিয়া পারিতেছি না। আমরা উভয়ে কমিউনিস্ট বন্ধুদের সাথে এই সময় ঘনিষ্ঠভাবে মিলামিশা করিতেছি। কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রতি এই সময়ে আমরা উভয়ে আস্থা হারাইয়াছি। কমিউনিস্ট বন্ধুদের সাথে আলোচনা করিয়া আমরা উভয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম যে, কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া আর কোন পার্টি দিয়া ভারতের স্বাধীনতা উদ্ধার হইবে না। আমাদের মনের গতিক যখন এই, এমনই একদিন আমরা ইডেন গার্ডেনে ক্রিকেট খেলা দেখিতে-দেখিতে এবং চীনাবাদাম খাইতে খাইতে এই সিদ্ধান্ত করিলাম যে, ভারতের স্বাধীনতার খাতিরে আমরা অগত্যা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিব। কিন্তু কমিউনিস্ট নেতৃত্বে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরদিনই আমরা ভারত ছাড়িয়া চলিয়া যাইব। কারণ কমিউনিস্ট শাসনের রেজিমেন্টেড ইন্টেলেকচুয়াল জীবন আমরা সহ্য করিতে পারি না। কমিউনিস্ট শাসন সম্পর্কে আমাদের তৎকালীন এই ধারণা ঠিক না হইতে পারে, কিন্তু দেশের স্বাধীনতার খাতিরে আমরা কতদূর ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলাম এতে সেটা বুঝা যাইবে। সংগে সংগে এটাও বুঝা যাইবে যে, কমিউনিস্ট মানে স্টালিনী, শাসন সম্পর্কে তৎকালে আমাদের ধারণা খুব ভাল ছিল না।

১০. চিন্তার নূতন দিগন্ত

কংগ্রেস-লীগ আপোসের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধান যতই পিছাইয়া যাইতে লাগিল আমি ততই মুসলিম লীগের দিকে হেলিয়া পড়িতে লাগিলাম। আমার কংগ্রেসী নেতারা যতই ‘হিন্দু’ হইতে লাগিলেন, আমি ততই ‘মুসলিম’ হইতে লাগিলাম। আমার এই ‘মুসলিম’ত্বে অবশ্য ধর্মীয় গোড়ামি ছিল না; পর-ধর্ম বিদ্বেষেও ছিল না। ছিল শুধু তীব্র স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদাবোধ। স্বান্ত-চেতনা। হিন্দু ও মুসলমানের মতপার্থক্যটা এই সময় আমার কাছে বুনিয়াদী মানস পার্থক্য বলিয়া প্রতীয়মান হইল। অবস্থা এমন হইল যে, একদিন এক বন্ধু আমার ধর্ম-মত শুনিয়া বলিলেন : তুমি তা হৈলে নাস্তিক।

জবাবে আমি বলিলাম : নাস্তিক হৈলেও আমি মুসলমান নাস্তিক।

আরেকবার আমার আরেক বন্ধু আমার রাজ-নীতিক-অর্থ-নীতিক মত শুনিয়া বলিয়াছিলেন : তুমি ত কমিউনিস্ট।

জবাবে আমি বলিয়াছিলাম : তা কৈতে পার। তবে আমি মুসলমান কমিউনিস্ট।

এই ‘হিন্দু-মুসলিম কমিউনিযম’ সম্বন্ধে একটা মজার গল্প মনে পড়িতেছে। একবার বন্ধুবর কমরেড বংকিম মুখার্জী আফসোস করিয়া আমাকে বলিয়াছিলেন : ‘অক্টার্লনি মনুমেন্টের নিচে শ্রমিক জনসভায় চার ঘন্টা ধর্ম-বিরোধী বক্তৃতা করি। করতালিও পাই। কিন্তু সভাশেষে মুসলিম শ্রমিকরা টিপু সুলতানের মসজিদে এবং হিন্দু শ্রমিকরা কালী মন্দিরে ঢুকে পড়ে। এর কি করি বলুন ত?’

আমি বলিলাম : এটাই আসল সত্য। আমার মনে হয় চল্লিশ কোটি ভারতবাসীর সকলে এবং প্রত্যেকে যেদিন কমিউনিস্ট হৈয়া যাবে সেদিনও তারা হিন্দু কমিউনিস্ট ও মুসলিম কমিউনিস্ট এই দুই দলে বিভক্ত থাকবে।

কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি সম্বন্ধে এমন ধারণা লইয়া আমরা বেশিদিন রাজনৈতিক অস্পষ্ট পরিবেশের মধ্যে থাকিতে পারিলাম না। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজের অজ্ঞাতসারে মুসলিম লীগের মতবাদে দীক্ষিত হইয়া যাইতে লাগিলাম। হক সাহেবের মতবাদ এ বিষয়ে আমাকে অনেকখানি প্রভাবিত করিল। অথচ কিছুদিন আগেও আমি মনে করিতাম হক সাহেবের নিজস্ব কোন রাজনৈতিক মতবাদ নাই। বাংলার মুসলিম সমাজের যাতে ভাল হয়, সেটাই তার মতবাদ, চাই সেটা যা-কিছুই হউক। আমাকেও যেন ধীরে ধীরে এই রোগে পাইয়া বসিল। তাই বন্ধুরা যখন আমাকে বিদ্রূপ করিয়া ‘মিঃ এটাও সত্য এটাও সত্য’ বলিতেন, তখন অন্তর দিয়া দুঃখিত হইতাম না। জবাবে শুধু হাসিয়া বলিতাম : ফ্যানাটিক বা ডগমেটিক না হৈয়া র‍্যাশনালিস্ট হওয়ার ওটাই শাস্তি।

১৩. পাকিস্তান আন্দোলন

পাকিস্তান আন্দোলন
তেরই অধ্যায়

১. সুভাষ বাবুর ঐক্যচেষ্টা

১৯৪০ সাল। এপ্রিল মাস। এক বিস্ময়কর ঘটনা। সাবেক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সুভাষ বাবু কলিকাতা কংগ্রেস ও কলিকাতা মুসলিম লীগের মধ্যে এক চুক্তি ঘটান। সেই চুক্তির ভিত্তিতে তাঁরা কলিকাতা কর্পোরেশনের সাধারণ নির্বাচন করেন। প্রায় সবগুলি আসনই তাঁরা দখল করেন। কিছুদিন আগে হক মন্ত্রিসভা কলিকাতা মিউনিসপ্যাল আইন সংশোধন করিয়া কর্পোরেশনের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করিয়াছিলেন। মোট ৯৩টি নির্বাচিত সীটের মধ্যে ২২টি মুসলমানের জন্য রিযার্ভ করা হইয়াছিল। মহাত্মাজীর সাথে বিরোধ করিয়া কংগ্রেস ত্যাগ করাতেও সুভাষ বাবুর জনপ্রিয় মোটেই কমেনাই,বরঞ্চ বাড়িয়াছে। বস্তুতঃ এই সময়ে সুভাষ বাবু বাংলার তরুণদের এক রকম চোখের পুতুলি। আর ওদিকে কলিকাতা মুসলিম লীগও মুসলিম ভোটারদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এই দুই পক্ষের মৈত্রী ভোটারদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি করিল। নির্বাচনে জয়জয়কার। মুসলিম লীগ নেতা আবদুর রহমান সিদ্দিকী মেয়র হইলেন। স্বয়ং সুভাষ বাবু তাঁর নাম প্রস্তাব করিলেন। মেয়র ছাড়া পাঁচজন অভায়মনের মধ্যে দুইজন হন মুসলিম লীগের। এ ছাড়া শর্ত হইল যে, পর্যায়ক্রমে প্রতি তিন বছরে মুসলিম মেয়র হইবেন। মুসলিম লীগের জন্য এটা সুস্পষ্ট বিজয়। কংগ্রেস নেতাদের পক্ষে মুসলিম লীগকে মুসলমানদের প্রতিনিধি-প্রতিষ্ঠান রূপে মানিয়া নেওয়ার এটা প্রথম পদক্ষেপ। অপরদিকে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের এটা পরম পরাজয়। কংগ্রেস সাম্প্রদায়িকতার সাথে আপোস করিলে জাতীয়তার আশা থাকিল কই? কাজেই আমরা জাতীয়তাবাদী মুসলিম লীগ-বিরোধী মুসলমানরা সুষকুর উপর খুব চটিলাম। ডাঃ আর. আহমদ, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমি সুষ বাবুর এই কার্যের তীব্র নিন্দা করিলাম। খবরের কাগযে এক যুক্ত বিবৃতি দিলাম। সুষ বাবু এ বিষয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে আমাদেরে চায়ের দাওয়াত দিলেন। সূতাবাবুর বাড়িতে চায়ের দাওয়াত রাখা আমাদের জন্য নূতন নয়। অধ্যাপক কবির ‘দৈনিক কৃষকে’র ম্যানেজিং ডিরেকটর, ডাঃ আর. আহমদ ডিরেক্টর ও আমি তার এডিটর। সুষ বাবু কৃষক’র একজন পৃষ্ঠপোষক। কংগ্রেসের মেম্বর না হইয়াও আমরা তিনজনই কংগ্রেসী রাজনীতিতে সুভাষ বাবুর সমর্থক। এ অবস্থায় উক্ত বিবৃতির আলোচনার জন্য আমাদেরে চা খাইতে ডাকিয়া পাঠান সুভাষ বাবুর পক্ষে নূতন কিছু ছিল না। অন্যায় ছিল না। তবু আমার বন্ধুদ্বয় সুভাষবাবুর দাওয়াত রাখিলেন না। এতই গোস্বা হইয়াছিলেন তাঁরা কাজেই আমাকে একাই যাইতে হইল। আমি যথসময়ে সুভাষ বাবুর এলগিন রোডস্থ বাসভবনে গেলাম। বন্ধুদ্বয়ের না আসার বানাওট কৈফিয়ৎ দিলাম। সুভাষ বাবু মুচকি হাসিলেন। তিনি আসল কারণ বুঝিলেন। আমরা দুইজনে আলাপে বসিলাম। সুভাষ বাবু পাক্কা মেহমানদার। আমরা কয়েক তরি মিঠাই ও বহু কাপ চা খাইলাম। আমার জন্য এক টিন সিগারেট আনাইলেন। নিজে তিনি সিগারেট খাইতেন না।

আলাপের গোড়াইতে তিনি দুঃখ করিলেন : তাঁর সাথে আলাপ না করিয়া কাগযে বিবৃতি দিলাম কেন? এটা কি বন্ধুর কাজ হইয়াছে? জবাবে আমি বলিলাম : আমাদেরে ঘুণাক্ষরে না জানাইয়া মুসলিম লীগের সংগে তিনি আপোস করিলেন কেন? এটা কি বন্ধুর কাজ হইয়াছে? ঝগড়ার সুরে আরম্ভ করিলাম বটে, কিন্তু পর মুহূর্তেই উভয়েই উচ্চস্বরে হাসিয়া উঠিলাম। শেয়ানে-শেয়ানে কোলাকুলি। কারণ বিলম্ব এড়াইবার জন্যই উভয়ে পরস্পরকে জানাইয়া যার তার কাজ করিয়াছিলাম। আচ্ছা বেশ। এখন কি করা যায়?

সূভাষবাবু অন্তরের দরদ দিয়া যা বলিলেন, তার মর্ম এই : হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছাড়া ভারতের মুক্তি নাই। মুসলিম লীগ মুসলিম জনগণের মন জয় করিয়াছে। জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের দ্বারা কোনও আশা নাই। ফলে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে একটা চীনা দেওয়া উঠিয়া পড়িয়াছে। সে দেওয়ালের জানালা নাই। একটা সুরাখও নাই যার মধ্যে দিয়া মুসলমানদের সাথে কথা বলা যায়। এখানে সুভাষ বাবু আবেগপূর্ণ। ভাষায় বলিলেন : ‘আমি মুসলমানদের সাথে কথা বলতে চাই; তাদের সাথে মিশতে চাই; তাদের একজন হতে চাই। বলুন মনসুর সাব, মুসলিম লীগ ছাড়া আর কার মারফত এটা করতে পারি? আর কোনও রাস্তা আছে কি?’

আমি তাঁর সাথে একমত হইলাম। সত্যই আর কোনও রাস্তা নাই। বলিলাম : ‘কিন্তু আপনে যে সুরাখ বার করছেন ওটা বড়ই ছোট। বড় সুরাখ করেন। জানালা, এমনকি দরজা, বার করেন। সিদ্দিকী ইস্পাহানিরে না ধৈরা স্বয়ং জিন্না সাহেবরে ধরেন। মুসলিম লীগই মুসলমানদের প্রতিনিধি-প্রতিষ্ঠান এটা মানলে জিন্ন সাহেবের সাথে কথা বলাই আপনের উচিৎ।‘

সুভাষ বাবু পরম আগ্রহে টেবিলের উপর দিয়া গলা বাড়াইয়া বলিলেন : ‘আমি কিছুদিন থেকে মনে-মনেই তাই ভাবছিলাম। কিন্তু সেদিন লাহোর ঐ যে ধর্মীয় রাষ্ট্রের কি একটা প্রস্তাব পাস করিয়ে ফেলেছেন তিনি। এরপর নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে আপোসের আশা আমি প্রায় ত্যাগ করেছি।‘

২. লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা

আমি প্রতিবাদ করিলাম। বলিলাম : ‘জিন্না সায়েবের সাথে দেখা না করার আপনের একশ’ একটা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু লাহোর প্রস্তাব তার একটা, একথা বলবেন না। লাহোর প্রস্তাব আপনে পৈড়া দেখছেন?’

সূতাষ বাবু স্বীকার করিলেন তিনি পড়েন নাই, শুধু হেডিং ও রাইটআপ দেখিয়াছেন। পড়িবার কি আছে? পাকিস্তান চাহিয়াছে। পাকিস্তান মানেই থিওক্রাসি। আমি বলিলাম : তাঁর ধারণা ভুল। পাকিস্তান শব্দটাও প্রস্তাবের কোথাও নাই। তিনি বিশ্বাস করিতে চাহিলেন না। আমি যথাসম্ভব প্রস্তাবের ভাষা ‘কোট’ করিয়া লাহোর প্রস্তাবের এইরূপ ব্যাখ্যা দিলাম। প্রথমতঃ ভারতের বর্তমান এগারটি প্রদেশকে রেসিডুয়ারি পাওয়ারসহ পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হইবে। দ্বিতীয়তঃ মাত্র তিন-চারটি কেন্দ্রীয় বিষয় দিয়া একটি নিখিল ভারতীয় ফেডারেশন কায়েম করিতে হইবে। তৃতীয়তঃ এগারটির মধ্যে যে পাঁচটি মুসলিম প্রধান প্রদেশ আছে, তাদের মেজরিটি অর্থাৎ তিনটি প্রদেশ যদি দাবি করে তবে মুসলিম প্রধান পাঁচটি প্রদেশকে নিখিল ভারতীয় ফেডারেশন হইতে আলাদা হইয়া স্বতন্ত্র ফেডারেশন করিবার অধিকার দিতে হইবে।

আমার এই ব্যাখ্যা তিনি মানিলেন বলিয়া মনে হইল না। তিনি লাহোর প্রস্তাবের ফুল টেক্সট দেখিতে চাহিলেন। আমি তা দেখাইতে রাযী হইলাম। সোভিয়েট ইউনিয়নের কনস্টিটিউশনের এমন একটা বিধান আছে বলিয়া তিনি এক কপি রুশ শাসনতন্ত্র যোগাড় করিবার দায়িত্ব নিলেন। আলোচনা পরের দিনের জন্য মুলতুবি হইল। পরের দিন তিনি আমাকে তাঁর ফরওয়ার্ড ব্লক অফিসে নিয়া গেলেন। বৌবাজারের ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন হলের ত্রিতলে তিনি একটি সুষ্ঠু পরিচ্ছন্ন অফিস ইতিমধ্যেই খুলিয়া ফেলিয়াছিলেন। নিজে তিনি রীতিমত নিয়মিতভাবে এই অফিসে হাযিরা দিতেন। তাঁর সুসজ্জিত রুমে প্রবেশ করিয়া তিনি কয়েকখানি বই আনাইলেন। দেখিয়া পুলকিত হইলাম যে শুধু রুশ শাসনতন্ত্র নয়, সুইয়ারল্যান্ড, ইউ. এস, এ, কানডা ইত্যাদি কয়েকটি ফেডারেশনের কনস্টিটিউশনও যোগাড় করিয়াছেন।

রাজনীতি পঞ্চাশবর আমি লাহোর প্রস্তাবের খবরের কাগবে প্রকাশিত ফুলটেক্সট লইয়া গিয়াছিলাম। সেটা উচ্চস্বরে পড়িয়া-পড়িয়া আমার আগের দিনের ব্যাখ্যার সাথে মিল ফেলাইলাম। তিনি সব শুনিয়া বলিলেন : আপনার ব্যাখ্যা যদি ঠিক হয়, তবে তার সবটুকু আমি মেনে নিলাম। এমন কি আমি আরও বেশি যেতেও রাযী। যদি পাঁচটা মুসলিম প্রদেশের মেজরিটি আলাদা ইউনিয়ন করতে চায় তবে তাতে আমি ত রাযী আছিই এমনকি একটা প্রদেশও যদি সিসিড করতে চায়, আমি তাতেও রাযী।

এই কথা বলিয়া রুশ শাসনতন্ত্রের ঐ ধারাটা আমার সামনে মেলিয়া ধরিলেন যাতে প্রত্যেক ইউনিয়ন রিপাবলিককে সিসিড করিবার অধিকার দেওয়া হইয়াছে।

. জিন্না-সুভাষ মোলাকাত

আমরা উভয়ে একমত হওয়ায় স্থির হইল যে সুভাষ বাবু জিন্ন সাহেব দেখা চাহিয়া শীঘ্রই তাঁর নিকট পত্র লিখিলেন। বিপুল আশা-উৎসাহের মধ্যে আমি সুভাষ বাবুর নিকট হইতে বিদায় হইলাম। ভারতীয় রাজনৈতিক সংকটের অবসান ও হিন্দু মুসলিম ঐক্যের একটা গোলাবী স্বপের মধ্যে বিচরণ করিতে-করিতে পরবর্তী কয়েকটা দিন কাটাইলাম। মাঝে মাঝে সুভাষ বাবুকে টেলিফোন করিতে লাগিলাম : ‘জিয়া সাহেবের নিকট চিঠি লেখছেন? সপ্তাহ খানেক বা তারও বেশি একই জবাব পাইলাম : লিখিনি আজো, তবে শীগগিরই লিখব।

আমি বিরক্ত ও নিরাশ হইয়া এ ব্যাপারে খোঁজ করা ছাড়িয়া দিলাম। ভাবিলাম সুভাষ বাবুর নিজেরই মনের পরিবর্তন হইয়াছে। এমন সময় তিনি নিজেই একদিন ফোন করিয়া বলিলেন, তিনি জিন্ন সাহেবের নিকট পত্র লিখিয়াছেন, এবং নিশ্চিত ডেলিভারির আশায় ডাকে না দিয়া মেয়র সিদ্দিকীর হাতে হাতে দিয়াছেন। আমি সেইদিনই সকালের কাগযে পড়িয়াছিলাম, কলিকাতা কর্পোরেশনের মেয়র মিঃ আবদুর রহমান সিদ্দিকী বোম্বাই কর্পোরেশনের কর্তৃপক্ষের সংগে কি বিষয়ে আলোচনার জন্য বোম্বাই রওয়ানা হইলেন।

আমি নিরুৎসাহ হইলাম সে কথা সুভাষ বাবুকে বলিলাম। ব্যাপারটা ভণ্ডুল হইয়া গেল। কারণ সিদ্দিকী জিন্ন সাহেবের সূন্যরে নাই। সুভাষ বাবুও একটু আতংকিত হইলেন। আগে জানিলে তিনি এটা করিতেন না। কিন্তু এক্ষণে আর তার কোনও প্রতিকার নাই। দেখা যাক কি হয়। আমিও তার সাথে একমত হইলাম।

পাকিস্তান আন্দোলন কাগযে পড়িলাম, সিদ্দিকী সাহেবের জিন্ন সাহেবের সহিত মোলাকাত করিলেন। পরে কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলেন। কিন্তু সুভাষ বাবু জিন্না সাহেবের কোনও পত্র পাইলেন না। আমার জিজ্ঞাসার উত্তরে সুভাষ বাবু জানাইলেন, মিঃ সিদ্দিকীর মতে তিনি যে-কোনও দিন মিঃ জিন্নার পত্র পাইবেন। কিন্তু পনর দিনের বেশি সময় চলিয়া গেল। সুভাষ বাবু জিন্ন সাহেবের পত্র পাইলেন না। ইতিমধ্যে জিন্না সাহেব যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সাহায্য-সহযোগিতা করা হইতে বিরত থাকার জন্য মুসলিম লীগারদের উপর নির্দেশ জারি করিলেন। সুভাষ বাবু এ কাজের জন্য জিন্না সাহেবকে কংগ্রেচুলেট করিলেন। সুভাষ বাবুই একরকফানে হাসিয়া বলিলাম : করিয়া খবরের কাগযে বিবৃতি দিলেন। আমি সুভাষ বাবুকে ফোনে হাসিয়া বলিলাম। ‘এবার জিন্না সাহেবের পত্র না আইসা পারে না।’ তিনিও হাসিলেন, বলিলেন : কিন্তু কোন মতলবে তাঁকে কংগ্রেচুলেট করিনি। তাঁর কাজটি সত্যই প্রশংসার যোগ্য।

এরও বোধ হয় সপ্তাহখানেক পরে সুভাষ বাবু জিন্না সাহেবের পত্র পান। আমাকে ডাকিয়া পাঠান। লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যায় যা-যা আগে আলোচনা করিয়াছিলাম, তাই আবার দুহরাইলাম। তিনি এবার সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নির্ধারিত দিনে সুভাষ বাবুকে সি-অফ। করিবার জন্য শত-শত কর্মীর সাথে আমিও হাওড়া স্টেশনে গেলাম। সুভাষ বাবু বোম্বাই যাইতেছেন সত্য, কিন্তু তাঁর আসল উদ্দেশ্যের কথা আমি ছাড়া বোধ হয় আর কেউ জানিত না। গাড়ি ছাড়িবার প্রাক্কালে আমি সুভাষ বাবুর কাছ ঘেষিয়া কানে কানে বলিলাম : ওয়ার্ধায় নাইমা বুড়ার দোওয়া নিয়া যাবেন।

সুভাষ বাবু চমকিয়া উঠিলেন, মুখ বিষণ করিলেন। বোধ হয় বিরক্ত হইলেন। বুড়া মানে মহাত্মাজী। তাঁর সাথে সুভাষ বাবুর সম্পর্ক ভাল নয়। মাত্র সম্প্রতি তাঁর সমর্থক বলিয়া কথিত লোকেরা মহাত্মাজীকে হাওড়া বলে ও লিলুয়া স্টেশনে অপমান করিয়াছে। আমি সুভাষ বাবুর মনের কথা বুঝিলাম। আমার শক্ত হাতে সুভাষ বাবুর নরম হাতটি চাপিয়া ধরিলাম। আমার অনুরোধ রাখবেন। শুধু এই কথাটি বলিলাম। তাঁর হাত ছাড়িলাম না। গাড়ি ছাড়িয়া দেয় দেখিয়া তিনি শুধু বলিলেন : ‘আচ্ছা ভেবে দেখব।’

তাই যথেষ্ট। আমি দৌড়িয়া লাফাইয়া ট্রেন হইতে নামিলাম। অন্যান্যের সাথে হাত নাড়িলাম। তিনিও জানালায় মুখ বাড়াইয়া হাত ও রুমাল নাড়িতে থাকিলেন। যতক্ষণ দেখা গেল চাহিয়া থাকিলাম। তিনি দৃষ্টির বাহিরে গেলে আমার মন বলিল : ভারতের ভবিষ্যৎ, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, এ সবেরই ক্ষীণ সূতাটি ঐ ট্রেনে ঝুলিতেছে।

পরদিন খবরের কাগয়ে পড়িলাম বোম্বাই যাওয়ার পথে সুভাষ বাবু ওয়াধায় নামিয়া মহাত্মাজীর সাথে দেখা করিয়াছেন। তাঁদের মধ্যে আধঘন্টা কথা হইয়াছে। তারপর পর-পর কয়েক দিনের কাগযে পড়িলাম। তিনি বোম্বাই পৌঁছিয়া জিন্না সাহেবের সাথে দেখা করিয়াছেন। কয়েক দিন কয়েকবার দেখা হইয়াছে। প্রতিবার দুই-তিন ঘন্টা আলাপ হইয়াছে। এক রাত্রে সুভাষ বাবু জিন্না সাহেবের বাড়িতে ডিনার খাইয়াছেন। ইতিমধ্যে কয়েক বার সুভাষ বাবু সর্দার প্যাটেল ও মিঃ ভুলাভাই দেশাইর সাথে দেখা করিয়াছেন।

সাফল্যের সম্ভাবনায় পুলকে আমার রোমাঞ্চ হইল। শীঘ্রই একটা ঘোষণা শুনিবার জন্য কান খাড়া করিয়া রহিলাম। এতদিনের হিন্দু-মুসলিম সমস্যা আজ চূড়ান্তরূপে মীমাংসা হইয়া যাইতেছে। ভারতের স্বাধীনতা ইংরাজ আর ঠেকাইয়া রাখিতে পারিল না। দেশবাসী জানে না এত বড় একটা শুভ ঘটনার মূলে রহিয়াছে আমার মত একজন নগণ্য ব্যক্তি। আল্লাহ কত ছোট বস্তু দিয়া কত বড় কাজ করাইতে পারেন। সত্যই তিনি কাঁদেরে-কুদরত। অপূর্ব তাঁর মহিমা!

সোনায় আবার সুহাগা! খবরের উপর যবর খবর! গান্ধীজী ও জিন্ন সাহেব উভয়কেই বড়লাট সিমলায় দাওয়াত করিয়াছেন। ব্যস, আর কি? কাম ফতে! সুভাষ বাবুর সাথে আলাপ হওয়ার পরই এ সব ঠিক হইয়াছে নিশ্চয়ই।

কয়দিন হাওয়ায় উড়িয়া বেড়াইলাম। একটা ঘোষণা প্রতিদিন আশা করিতে থাকিলাম। লটারির টিকিট কাটিয়া যেভাবে মানুষ পায়ের আঙ্গুলে দাঁড়াইয়া থাকে।

গান্ধীজী ও জিন্ন সাহেব সিমলা গেলেন। কোন ঘোষণা বাহির হইল না। সুভাষ বাবুও ফিরিয়া আসিলেন না।

আমি পরম আগ্রহে সুভাষ বাবুর প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষা করিতে থাকিলাম। তিনি এত দেরি করিতেছেন কেন? তবে তিনিও গান্ধীজিন্নার সাথে সিমলায় গেলেন নাকি? শেষ খবরে পড়িয়াছিলাম জিন্না সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া তিনি দিল্লীর পথে বোম্বাই ত্যাগ করিয়াছেন। কিন্তু তাঁর সিমলা যাওয়ার খবর বাহির হইল না। তার বদলে খবরের কাগযে পড়িলাম, সুভাষ বাবু এলাহাবাদে জওয়াহের লালের মেহমান হইয়াছে। তারপর বেশ কয়েকদিন আর কোনও খবর নাই। ইতিমধ্যে গান্ধীজী ও জিন্না সাহেব সিমলা হইতে ফিরিয়া আসিলেন, সে খবরও কাগযে পড়িলাম। হায়! ঘোষণাটা হইতে-হইতে হইল না বুঝি। আমি ব্যাকুলভাবে রোয সুভাষ বাবুর বাড়ি টেলিফোন করি। জবাব পাই, কোন খবর নাই। রোয টেলিফোন করায় তার বাড়ির কোনও লোক বোধ হয় ত্যক্ত হইয়াই বলিলেন: ‘আপনি খবরের কাগযের এডিটর। তিনি কোলকাতা ফিরলে আপনি আমাদের আগেই জানতে পারবেন।‘ সত্যই ত! লজ্জায় আর ফোন না করিয়া খবরের কাগযেই পড়িতে লাগিলাম। বেশ কিছুদিন কাটিয়া গেল। বাঞ্ছিত খবর আর বাহির হইল না। ইতিমধ্যে সুভাষ বাবু সম্পাদিত ‘ফরওয়ার্ড’ নামক ইংরাজী সাপ্তাহিকের যামিন তলব হইল। এই দিন জানিতে পারিলাম বেশ কয়েক দিন আগেই তিনি ফিরিয়া আসিয়াছেন। এবার সাহস করিয়া টেলিফোন করিলাম। ফোন ধরিলেন সুভাষ বাবু নিজে। স্বীকার করিলেন দুই দিন আগেই ফিরিয়াছেন। ইচ্ছা করিয়াই খবরের কাগযে খবরটা যাইতে দেন নাই। অন্ততঃ আমাকে খবরটা না-দেওয়ায় অভিমান করিলাম। তিনি হাসিয়া বলিলেন : ‘খবর দেবার মত কিছু নেই বলেই দেইনি। আচ্ছা আসুন, এক কাপ চা খেয়ে যান।‘

সুভাষ বাবু যতই বলুন দেওয়ার মত খবর নাই। আমি কিন্তু আমার আগ্রহ দমাইতে পারিলাম না। তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া গেলাম। মুখ-ভাবে কোন নৈরাশ্য ধরিতে পারিলাম না। আগের মতই হাসি মুখ। ও সুন্দর মুখে হাসি ছাড়া আর কিছু বড় একটা দেখি নাই তা

আমাকে চা-মিঠাই খাইতে দিয়া তিনি তাঁর জিন্না-মোলাকাতের বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। জিন্না সাহেব তাঁর সাথে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহার করিয়াছেন। লাহোর প্রস্তাবের যে ব্যাখ্যা সুতাষ বাবু করিয়াছেন জিন্না সাহেবের ধারণার সাথে তা হুবহু মিলিয়া গিয়াছে। বস্তুতঃ সুভাষ বাবু জিন্না সাহেবের ধারণা মত লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা করিতে পারায় জিন্না সাহেব বিস্মিত হইয়াছিলেন। এইখানে সুভাষ বাবু হাসিয়া বলিলেন : ‘জিন্না সাহেব পুনঃপুনঃ জিগ্গাস করা সত্ত্বেও আমি তাঁকে বলেছি এটা আমার নিজেরই ব্যাখ্যা; অন্য কেউ আমাকে এ ব্যাখ্যা দেননি। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। নিজের বাহাদুরির জন্য একাজ করিনি। অপরের ধার-করা বুদ্ধি নিয়ে তাঁর কাছে গিয়েছি, এটা স্বীকার করলে জিন্ন সাহেবের কাছে আমার দাম কমে যেত না? কি বলেন আপনি?’

আমি স্বীকার করিলাম। বলিলাম, তিনি ঠিক কাজই করিয়াছেন। তারপর সুভাষ বাবু বলিলেন, লাহোর প্রস্তাবের এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধান করিতে জিন্না সাহেব খুবই আগ্রহী। কিন্তু তাঁর দৃঢ় মত এই যে আপোস কোনও ব্যক্তির মধ্যে হইবে না। সে ব্যক্তিরা যতই প্রভাবশালী হউন। আপোস হইতে হইবে কংগ্রেস ও লীগ এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। জিন্না সাহেব সুভাষ বাবুকে স্পষ্টই বছর। বলিয়াছেন, সুভাষ বাবু যতই জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নেতা হউন, কংগ্রেসকে সাথে আনিতে না পারিলে জিন্না সাহেব তাঁর সাথে জাপোস করিতে পারেন না। এমন কি তাঁর ফরওয়ার্ড ব্লকের সাথেও না। তিনি সুভাষ বাবুকে খোলাখুলি উপদেশ দিলেন, সুভাষ বাবু কংগ্রেস ছাড়িয়া বুদ্ধির কাজ করেন নাই। তাঁর আবার কংগ্রেসে ফিরিয়া যাওয়া উচিৎ। এই ব্যাপারে জিন্না সাহেবের মধ্যে এতটা ব্যাকুল আগ্রহ ফুটিয়া উঠিয়াছিল যে শেষ বিদায়ের দিন জিন্ন সাহেব বাড়ির গেট পর্যন্ত সুভাষ বাবুকে আগাইয়া দিয়া এই শেষ কথাটা বলিয়াছিলেন : ‘কলিকাতা ফিরার আগে তুমি এলাহাবাদে জওয়াহের লালের কাছে যাও। তাঁকে তোমার মতে আন। তারপর তোমাদের যুক্ত শক্তিতে তোমার ব্যাখ্যা মত লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে কংগ্রেস-লীগে যেদিন আপোস করিতে পারিবে সেটা হইবে ভারতের জন্য ‘লাল হরফের দিন।‘ ‘প্রিয় সুভাষ, আমায় বিশ্বাস কর, আমি পরম আগ্রহে সেদিনের অপেক্ষা করিতে থাকিলাম।‘

জিন্না সাহেবের ইংরাজী কথাগুলি হুবহু উদ্ধৃত করিবার সময় সুভাষ বাবুর মুখে যে আন্তরিকতা ফাটিয়া পড়িতেছিল, তাঁর মধ্যে জিন্না সাহেবের আন্তরিকতাও প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল। উপসংহারে সুভাষ বাবু বলিলেন : ‘জওয়াহের লাল আমার মত গ্রহণ করবেন এ বিশ্বাস আমার আদৌ ছিল না। তবু শুধু জিন্ন সাহেবের অনুরোধ রক্ষার্থে আমি তাঁর কাছে গেলাম। একদিন এক রাত উভয়ে মত বিনিময় করলাম। আমি দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত হলাম যে জওয়াহের লাল লাহোর প্রস্তাবের আমার ব্যাখ্যা মেনে নিলেন এবং তাতে কংগ্রেস-লীগে আপোস হতে পারে তাও স্বীকার করলেন। কিন্তু গান্ধীজীর মতের বিরুদ্ধে কোনও কাজ করতে তিনি রাজি নন। তাই নিরাশ হয়ে ফিরে এলাম।’

প্রফুল্লতা ও মনোবল নিয়াই কথা শুরু করিয়াছিলেন। কিন্তু স্পষ্ট দেখিলাম, শেষ পর্যন্ত নৈরাশ্য গোপন করিবার চেষ্টায় ব্যর্থ হইলেন। অবশেষে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন : ‘নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলিম মিলনবোধ হয় আর সম্ভব হল না। বাংলা-ভিত্তিতে এ আপোস করার চেষ্টা করা যায় নাকি?’

৪. সুভাষ বাবুর অন্তর্ধান

এরপর বাংলা ভিত্তিতে মুসলমানদের সাথে কাজ করিবার বড় রকমের একটা চেষ্টা তিনি সত্য-সত্যই করিয়াছিলেন। সেটা সিরাজুদ্দৌলাকে বাংগালী জাতীয়তার প্রতীকরূপে জীবন্ত করা এবং তার প্রথম পদক্ষেপরূপে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাংগার অভিযান চালান। আমার বিবেচনায় এইবার সুভাষ বাবু দেশবন্ধু ও আচার্য রায়ের রাজনীতিক দর্শনে পুনরায় বিশ্বাসী হন।

সিরাজুদ্দৌলার প্রতি আমার মমত্ববোধ ছিল অনেক দিনের। ছেলেবেলা ছিল এটা বাংলার মুসলিম শাসনের শেষ প্রতীক হিসাবে। পরবর্তীকালে কংগ্রেস কর্মী-হিসাবে বাংগালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হওয়ার পর সিরাজুদ্দৌলাকে বাংগালী জাতীয়তার প্রতীকরূপে গ্রহণ করার জন্য অনেক কংগ্রেসী সহকর্মীকে ক্যানভাস করিয়াছি। বাংলার নাট্যগুরু গিরিশ ঘোষ ও খ্যাতনামা ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রের সিরাজুদ্দৌলাকে এই হিসাবেই বিচার করিয়াছেন বলিয়াও বহু মনগড়া যুক্তি খাড়া করিয়াছি। কিন্তু হিন্দু কংগ্রেসকর্মীদের কেউ এদিকে মন দেন নাই। কাজেই সূতাষ বাবুর মত জনপ্রিয় তরুণ হিন্দু নেতা এই মতবাদের উদ্যোক্তা হওয়ায় আমার আনন্দ আর ধরে না। ‘দৈনিক কৃষকে’র সম্পাদকীয়তে এই মতবাদের সমর্থনে প্রচুর যুক্তি দিতে লাগিলাম।

সুভাষ বাবু হলওয়েল মনুমেন্ট ভাংগার আন্দোলনে তাঁর পরিচালিত প্রাদেশিক কংগ্রেস ও ফরওয়ার্ড ব্লকের কমিগণসহ যোগ দিলেন। মুসলিম ছাত্র সমাজের তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা মিঃ আবদুল ওয়াসেক, মিঃ নূরুল হুদা ও মিঃ আনওয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এই আন্দোলন আগেই শুরু হইয়াছিল। সুভাষ বাবু এতে যোগ দেওয়ায় সত্যাগ্রহের আকারে এই আন্দোলন খুব জোরদার হইল। জনপ্রিয় তরুণ মুসলিম নেতা চৌধুরী মোওয়ায্যম হোসেন (লাল মিয়া) অছাত্র মুসলিম তরুণদেরও এ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিলেন। প্রতি দিন দলে-দলে সত্যাগ্রহী গ্রেফতার হইতে লাগিল। আমার ‘কৃষক’–আফিস ৫নং ম্যাংগো লেন ডালহৌসি স্কোয়ারের খুব কাছে। সময় পাইলেই সত্যাগ্রহ দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শকের শামিল হইতাম। সম্পাদকতার দায়িত্ব না থাকিলে হয়ত আন্দোলনে জড়াইয়াই পড়িতাম।

আন্দোলনকে জাতীয় রূপ দিবার জন্য সুভাষ বাবু ৩রা জুলাইকে (১৯৪০) ‘সিরাজ-স্মৃতি দিবস’ রূপে দেশব্যাপী পালন করা স্থির করিলেন। ১লা জুলাই আলবার্ট হলে জন-সভা হইল। লাল মিয়া এতে সভাপতিত্ব করিলেন। ওয়াসেক ও নূরুল হুদা এতে তেজঃদৃপ্ত বক্তৃতা করিলেন। সুভাষ বাবু ঐ সভায় ৩রা জুলাই দেশব্যাপী ‘সিরাজ-স্মৃতি দিবস’ পালনের আবেদন করিলেন। আরও ঘোষণা করিলেন যে ঐ দিন তিনি স্বয়ং কুড়াল,হাতে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাংগার সত্যাগ্রহীদের নেতৃত্ব করিবেন। সুভাষ বাবুর এই ঘোষণার জবাবে প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব ঐদিনের আইন পরিষদের সান্ধ্য অধিবেশনে ঘোষণা করেন যে বাংলা সরকার শীঘ্রই হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ করিবেন। অতএব সত্যাগ্রহ বন্ধ হওয়া উচিৎ। পরদিন ২রা জুলাই সংবাদপত্রে এক বিবৃতি দিয়া সুভাষ বাবু বলেন যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অস্পষ্ট। অতএব এ ঘোষণা সত্ত্বেও সত্যাগ্রহ অব্যাহত থাকিবে এবং তিনি পরদিন (৩রা জুলাই) কুড়াল হতে সত্যাগ্রহে নেতৃত্ব করিবেন। কিন্তু ২রা জুলাই রাত্রিতেই সুভাষ বাবু ভারতরক্ষা আইনে গ্রেফতার হইয়া প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী হইলেন।

সুভাষ বাবুর গ্রেফতারেও আন্দোলন দমিল না। মেয়র আবদুর রহমান সিদ্দিকী সুভাষ বাবুর গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিবৃতি দিলেন। কলিকাতা কর্পোরেশন মুলতবী হইয়া গেল। ইসলামিয়া কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা মিছিল করিতে লাগিল। সত্যাগ্রহ পূর্ণোদ্যমে চলিল। প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব ৮ই জুলাই আবার ঘোষণা করিলেন যে বাংলা সরকার হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের সিদ্ধান্তে অটল আছেন। ইউরোপীয় মেম্বাররা হক মন্ত্রিসভাকে সমর্থন না করিলেও সরকার তাঁদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করিবেন না। এর আগের দিন ইউরোপীয় দলের নেতা মিঃ পি. জে. গ্রিফিথ সত্যসত্যই ঘোষণা করিয়াছিলেন যে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ করিলে ইউরোপীয় দল মন্ত্রিসভার প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করিবে।

কিন্তু সপ্তাহ কাল চলিয়া গেল সরকার মনুমেন্ট অপসারণ করিলেন না। কাজেই সত্যাগ্রহ খুব জোরেই চলিতে থাকিল। ওদিকে সরকার ১৭ই জুলাই হইতে সত্যাগ্রহ সম্পর্কিত সমস্ত খবরের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিলেন। প্রচারের অভাবে সত্যাগ্রহ স্তিমিত হইয়া পড়িল। মিঃ ওয়াসেক ও মিঃ নূরুল হুদা প্রভৃতি ছাত্রনেতা তখন মিছিল বাহির করিলেন। এই মিছিল উপলক্ষে ইসলামিয়া কলেজে পুলিশ-মিলিটারি হামলা হইল। গুৰ্গা সৈন্যরা ছাত্রদের বেদম মারপিট করিয়াছে বলিয়া খবর রটিল। ছাত্রনেতা মিঃ ওয়াসেক ও মিঃ. আনওয়ার হোসেন আহত হইয়া হাসপাতালে গেলেন। মিঃ নূরুল হুদার নেতৃত্বে বহু ছাত্র প্রধানমন্ত্রী হক সাহেবের ঝাউতলার বাড়ি ঘেরাও করিল। হক সাহেব তাঁর স্বাভাবিক মিষ্টি কথায় ভরশা দিয়া ছাত্রদের ফিরাইয়া দিলেন।

সুভাষ বাবুর অবর্তমানে হলওয়েলে মনুমেন্ট সত্যাগ্রহ আস্তে-আস্তে ধিমাইয়া পড়িল। ছাত্র-নেতৃবৃন্দ বুঝিলেন সুভাষ বাবুকে খালাস করাই সত্যাগ্রহ তাজা করিবার একমাত্র উপায়। তখন ছাত্র-তরুণরা ইসলামিয়া কলেজ পুলিশী যুলুমের তদন্তের এবং সুভাষ বাবুর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু করিল। মুসলিম লীগ নেতারা ও কর্পোরেশনের মেয়র খবরের কাগযে বিবৃতি দিয়া সুভাষ বাবুর মুক্তি দাবি করিলেন। হক সাহেব ইসলামিয়া কলেজে পুলিশী হামলার তদন্তের জন্য হাই কোর্টের বিচারপতি মিঃ তরিক আমির আলির পরিচালনায় একটি তদন্ত কমিশন গঠন করিয়া এবং সুভাষ বাবুর মুক্তির আশ্বাস দিয়া ছাত্রদেরে শান্ত করিলেন। কিন্তু সুভাষ বাবু ভারতরক্ষা আইনে গ্রেফতার হওয়ায় প্রাদেশিক সরকারের এতে কোন হাত ছিল না। তাই ভারত সরকারের সাথে দরবার করিয়া অবশেষে ডিসেম্বর মাসে সুভাষ বাবুকে মুক্তি দিলেন। কিন্তু সুভাষ বাবু স্বগৃহে অন্তরীণ থাকিলেন। তাঁর উপর একটি ফৌজদারী মামলাও ঝুলাইয়া রাখা হইল।

অন্তরীণ থাকিলেও সুভাষ বাবুর সাথে দেখা-সাক্ষাতের খুব কড়াকড়ি ছিল না। মুক্তির দুই-তিন-দিন পরেই তাঁর সাথে দেখা করিলাম। দেখিয়া তাজ্জব হইলাম। মনে হইল সপ্তাহ কাল শেভ করেন নাই। সুভাষ বাবুর দাড়ি-গোঁফ ও তাঁর সুন্দর মুখ শীর উপযোগী চাপ দাড়ি শেভ না করার কারণ জিগ্গাসা করিলে তাঁর স্বাভাবিক মধুর হাসি হাসিয়া বলিলেন : শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের সাথেই পলিটিকস্ করব যখন ঠিক করেছি, তখন তাদের একজন হতে দোষ কি? ঐ একবারের বেশি তার দেখা পাই নাই। শুনিলাম তিনি মৌন-ব্রত গ্রহণ করিয়াছেন।

এটা ছিল বোধ হয় ১৯৪১ সালের জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ। পরে জানা গিয়াছিল ১৬ই জানুয়ারি হইতে তিনি নিজেও ঘর হইতে বাহির হইতেন না। কাউকে তাঁর ঘরে ঢুকিতেও দেওয়া হইত না। নির্ধারিত সময়ে তাঁর খানা দরজার সামনে রাখিয়া কপাটে টুকা দিয়া ঠাকুর সরিয়া আসিত। সুভাষ বাবু তীর সুবিধা মত খাবার ভিতরে নিতেন এবং খাওয়া শেষে বুটা বাসনপত্র দরজার বাহিরে নির্ধারিত স্থানে রাখিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিনে। এইভাবে কিছুকাল চলার পর ২৫শে জানুয়ারি দেখা গেল ২৪শে তারিখের-দেওয়া খাবার অছোওয়া অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। ঠাকুরের মূখে এটা জানিয়া বাড়ির সবাই সুষ বাবুর ঘরের সামনে সমবেত হইলেন। দরজা খুলিয়া দেখিলেন ঘর শূন্য। মুহূর্তে সারা কলিকাতা ফাটিয়া পড়িল। যথাসময়ে দেশবাসী জানিতে পারিল তিনি ছদ্মবেশে দেশ ত্যাগ করিয়াছেন।

সুভাষ বাবুর অন্তধানে আমি সত্যই খুব দুঃখিত হইয়াছিলাম। কারণ এর পরে হিন্দু নেতৃত্বের অখণ্ড ভারতীয় মনোবৃত্তির বন্যা রোধ করিবার মত শক্তিশালী নেতা হি-বাংলায় আর কেউ থাকিলেন না। একথা শরৎ বাবুর কাছেও আমি বলিয়াছি। তিনি আমার সাথে একমত ছিলেন। কিন্তু তার সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠ হইয়া আমার আশা হইয়াছিল সুভাষ বাবুর রাষ্ট্র-দর্শনের নিশান বহন করিতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমার বিশ্বসও হইয়াছিল। নিষ্ঠাবান সাত্বিক হিন্দু হইয়াও যে রাজনীতিতে উদার। অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রী হওয়া যায় শরৎ বাবু ছিলেন তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ। তাঁর চরিত্রের এই দিকটা আমাকে এত মুগ্ধ করিয়াছিল যে সুভাষ বাবুর অন্তর্ধানের পর শরৎ বাবুর উডবর্ণ পার্কের বাড়ি আমার প্রায় প্রাত্যহিক আড্ডায় পরিণত হইয়াছিল।

সুভাষ বাবুর উত্তরাধিকারী হিসাবে পরবর্তীকালে শরৎ বাবুই নিখিল ভারতীয় কংগ্রেস-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বাঙালীর স্বাতন্ত্রের সংগ্রাম চালাইয়া যান জীবনের শেষ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সালে শহীদ সাহেব ও আবুল হাশিম সাহেবের সাথে মিলিয়া তিনি যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাতেও শরৎ বাবুর এই বাংগালীর স্বাতন্ত্রের মনোভাব সুস্পষ্ট ছিল। ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ কলিকাতা নির্বাচক মণ্ডলীতে কংগ্রেসের সকল শক্তির বিরুদ্ধে একা লড়াই করিয়া তিনি কংগ্রেসকে পরাজিত করিয়াছিলেন। এসব ব্যাপারেই আমার প্রাণ ছিল শরৎ বাবুর সাথে। হিন্দু ভোটারদের উপর কোনও প্রভাব না থাকা সত্ত্বেও আমার সম্পাদিত ‘ইত্তেহাদ’ পুরাপুরি শরৎ বাবুর সমর্থক ছিল।

৫. কমরেড এম, এন, রায়ের প্রভাব

জিন্না-সুভাষ মোলকাত ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও তার একটা ছাপ আমার মনে স্থায়ী হইয়াছিল। আমি নয়া ধারায় চিন্তা করিতে শুরু করি। এই চিন্তায় কমরেড এম এন রায়ের সাহচর্য আমাকে অনেক দূর আগাইয়া নিয়া যায়। ১৯৩৮ সালে দিল্পী কংগ্রেস কাউন্সিল অধিবেশন উপলক্ষে কমরেড রায়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। তার আগে কমরেড রায়ের প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল নিতান্তু রোমান্টিক। বিশ্ব কমিউনিয়মের অন্যতম নেতা স্ট্যালিনের সহকর্মী হিসাবে তিনি ছিলেন আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে এক মনীষী। তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর আমার ভক্তির রোমান্টিক দিকটার অবসান হইলেও শ্রদ্ধা-ভক্তি এতটুকু কমে নাই। বরঞ্চ বাড়িয়াছে। বাস্তব রাজনীতিতে অবশ্য তাঁর মতবাদ ও উপদেশ নির্ভরযোগ্য মনে করিতাম না। সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যাপারে তাঁর মত ধৈর্য ছিল না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় প্রথম দিকে তিনি আমাকে কৃষক-প্রজা পার্টি ভাংগিয়া সমস্ত কর্মীদের লইয়া সদলবলে কংগ্রেসে যোগ দিবার পরামর্শ দেন। তাঁর উপদেশ অগ্রায় করার পর তিনি নিজেই কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং আমরা কৃষক-প্রজা কর্মীর কংগ্রেসে যাওয়ায় আমাদের প্রশংসা করেন। কলিকাতার মুসলিম ছাত্রদের উদ্যোগে আহত মুসলিম ইনষ্টিটিউটের এক সভায় তিনি কংগ্রেসকে ‘নিমজ্জমান নৌকা বলেন এবং উহা হইতে সাঁতরাইয়া পার হওয়ার জন্য দেশ-প্রেমিকদের অনুরোধ করেন। কিন্তু আদর্শগত দিক হইতে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে তাঁর বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত আমাকে বিস্মিত ও মোহিত করিয়াছিল। কংগ্রেস-মুসলিম লীগ-কমিউনিস্ট পার্টি কৃষক এজা-পার্টির প্রভাবে ভারতের সকল গণ-প্রতিষ্ঠান যখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলিতেছিলেন, তখন কমরেড রায় একাই ফ্যাসি-নাযিবাদকে মানবতার শত্রু ও সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে বড় দুশমন প্রমাণ করেন এবং এই যুদ্ধকে গণযুদ্ধ বা পিপলস ওয়ার’ আখ্যা দেন। বিশ্বের একমাত্র সমাজবাদী রাষ্ট্র রাশিয়া হিটলারের সমর্থন করায় আমরা কমরেড রায়ের কথায় তখন বিশ্বাস করি নাই। তাঁর উপদেশ মানি নাই। পরে ১৯৪১ সালের জুন মাসে যখন হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেন এবং রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ায়, তখন কমরেড রায়ের কথার সত্যতায় এবং তাঁর জ্ঞানের গভীরতায় আমার শ্রদ্ধা আকাশচুনী হইয়া গেল।

১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষক-প্রজা সমিতির সেক্রেটারি ও আইন পরিষদে কৃষক-প্রজা পার্টির লীডার বন্ধুবর শামসুদ্দিন পদত্যাগ করার পর হক মন্ত্রিসভার সহিত কৃষক-প্রজা সমিতির সম্পর্ক আগের চেয়েও তিক্ত হইয়া পড়িল। ফলে আমার পক্ষে হক সাহেবের সহিত ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও যাতায়াত রক্ষা করাও আর সম্ভব রহিল না।

১৯৩৯ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ইউরোপে মহাযুদ্ধ বাধিয়া গেল। ভারতবাসীর বিনা-অনুমতিতে ভারতবর্ষকে ইউরোপীয় যুদ্ধে জড়ানোর প্রতিবাদে সাতটি কংগ্রেসী প্রদেশ হইতেই কংগ্রেসী মন্ত্রীসভারা ২২শে ডিসেম্বর পদত্যাগ করিলেন। ইতিপূর্বে ১৯৩৮ সালে মুসলিম লীগ পীরপুর রিপোর্ট নামে একটি রিপোর্টে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা সমূহের মুসলমানদের উপর যুলুমের ফিরিস্তি প্রচার করিয়াছিল। কংগ্রেসী মন্ত্রীদের পদত্যাগকে মুসলিম লীগ কংগ্রেসী যুলুম হইতে মুসলমানদের নাজাত ঘোষণা করিয়া ২৩শে ডিসেম্বর সারা ভারতে ‘নাজাত দিবস’ পালন করে। এতে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে এবং হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরও তিক্ত হইয়া পড়ে। এমন সাম্প্রদায়িক তিক্ততার মধ্যে কৃষক-প্রজা সমিতির অসাম্প্রদায়িক অর্থনীতিক রাজনীতি পরিচালন মুসলমান জনসাধারণ্যে খুবই কঠিন হইয়া পড়িল। তার উপর ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় এবং স্বয়ং হক সাহেবই সেই প্রস্তাব উত্থাপন ও তার সমর্থনে মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করায় বাংলার মুসলমানদের মধ্যেও পাকিস্তান দাবির ও মুসলিম লীগের শক্তি শতগুণে বাড়িয়া গেল। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সভা-সমিতি ও প্রচার-প্রচারণা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়সাধ্য হইয়া পড়ায় কৃষক-প্রজা সমিতির মত গরিব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সভা সম্মিলন করা অসম্ভব হইয়া পড়িল। ফলে কৃষক-প্রজা সমিতির দাবিদাওয়া এবং হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা কেবল মাত্র সমিতির দৈনিক মুখপত্র ‘কৃষকে’র পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ হইল।

৬. দৈনিক কৃষক

‘কৃষকে’র সম্পাদক গ্রহণ করিয়াছিলাম আমি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। সুতরাং ‘কৃষকের কথাটাও আমার দেখা-রাজনীতির এলাকায় পড়ে। কাজেই এ সম্বন্ধে দুচার কথা বলা এখানে অবান্তর হইবে না।

সমিতির সেক্রেটারি শামসুদ্দিন সাহেবের মন্ত্রিত্বের আমলেই দৈনিক কৃষক বাহির করা স্থির হয়। আমারই উপর উহার সম্পাদকতার ভার চাপান হয়। কোম্পানি রেজিস্টারি করা হয়। মৌঃ শামসুদ্দিন সাহেব, মৌঃ সৈয়দ নওশের আলি, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির, নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলী, খান বাহাদুর মোহাম্মদ জান ও ডাঃ আর, আহমদ সাহেবান লইয়া বোর্ড-অব-ডিরেক্টর গঠিত হয়। অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হন ম্যানেজিং ডিরেক্টর। ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক ‘কৃষক’ বাহির হয়। কিন্তু কাগযের বয়স দুইমাস পুরা হইবার আগেই মৌঃ শামসুদ্দিন মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করেন। ফলে মন্ত্রিত্বের জোরে বিজ্ঞাপনাদি জোগাড় করিয়া কাগয চালাইবার আশা দূর হইল। অধ্যাপক কবির অতি কষ্টে বছর খানেক কাগয় চালাইয়া খান বাহাদুর মোহাম্মদ জানের কাঁধে এ ভার চাপাইলেন। খান বাহাদুর দাতা-দয়া কংগ্রেস সমর্থক ব্যবসায়ী পশ্চিমা লোক ছিলেন। বাংলার কৃষক-প্রজার সমস্যা তিনি বুঝিতেন না। কাজেই কংগ্রেসী মুসলমান হিসাবে যতটা পারেন ‘কৃষক’কে সাহায্য করিতেন। তিনিও বেশিদিন কৃষকের বিপুল ঘাটতি সইতে পারিলেন না। ডিরেক্টরদের সমবেত চেষ্টায় বিশেষতঃ অধ্যাপক কবিরের মধ্যস্থতায় কলিকাতার অন্যতম বিখ্যাত ব্যাংকার। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী মিঃ হেমেন্দ্র নাথ দত্ত ‘কৃষকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হইতে রাজি হইলেন। তিনি ময়মনসিংহ জেলার অধিবাসী এবং অধ্যাপক কবিরের বিশেষ বন্ধু। কাজেই তিনি আমাদের দ্বারা অভিনন্দিত হইলেন। তাঁর পরিচালনায় ‘কৃষক’ বেশ সচ্ছন্দে চলিতে লাগিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে ১৯৪১ সালের জুলাই মাসে কৃষক ছাড়িয়া দিতে আমি বাধ্য হইলাম। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝার সুবিধার জন্য সে কারণটাও এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করিতেছি।

এই সময় হক মন্ত্রিসভা বেংগল সেকেণ্ডারি এডুকেশন বিল আইন পরিষদে পেশ করেন। এই বিলের মর্ম এই যে মাধ্যমিক শিক্ষা (ম্যাট্রিক পরীক্ষা) কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত হইতে নিয়া সরকার গঠিত একটি মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের হাতে দেওয়া হইবে। উদ্দেশ্যটি মহৎ এবং তৎকালে সভ্য-জগতের সর্বত্র শিক্ষা-ব্যবস্থায় এই পন্থাই চালু ছিল। স্বাধীনতা লাভের পরে ভারতে ও পাকিস্তানে এই ব্যবস্থাই চালু হইয়াছে। বর্তমানে পশ্চিম বাংলাতেও তথাকার মাধ্যমিক শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে নাই। একটি মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের হাতেই আছে।

কিন্তু তৎকালে দল-মতনির্বিশেষে সমস্ত হিন্দু হক মন্ত্রিসভার এই বিলের প্রতিবাদ করেন। এমন কি, বিল আসিতেছে শুনিয়াই প্রায় বছর দিন ধরিয়া বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই বিলের আগাম প্রতিবাদ চলিতেছে। কয়েক মাস আগে (২৫শে জানুয়ারি) কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করা হইয়াছে এবং সরকারী সাহায্য ব্যতিরেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার হুমকি দিয়াছে।

এমন সময়ে এই বিলের সমর্থনে কৃষকে আমি পরপর কয়েকটা সম্পাদকীয় লিখি। মিঃ দত্তের নযরে পড়ে তা। তিনি আমার সাথে দেখা করিয়া প্রতিবাদ করেন। বলেন : আপনি একটা সাম্প্রদায়িক বিল সমর্থন করিয়া ‘কৃষকের অসাম্প্রদায়িক নীতির’ খেলাফ কাজ করিয়াছেন। আমি জবাবে তাঁকে বুঝাইবার চেষ্টা করি : ‘বিলটা সাম্প্রদায়িক নয়।‘ হিন্দুদের প্রতিবাদটাই সাম্প্রদায়িক সম্পাদকীয় গুলিতে উল্লেখিত বিভিন্ন সভ্য দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার নযিরের দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কিন্তু তিনি মানেন না। ঐ বিলের সমর্থনে আর লেখা হইলে তিনি ম্যানেজিং ডিরেক্টর থাকিবেন না বলিয়া আমাকে হুশিয়ার করিয়া দিলেন। অন্যান্য ডিরেক্টরদেরও জানাইলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁরা সবাই আমার সমর্থক ছিলেন। তাঁরা আমাকে কিছু বলিলেন না। আমি এ বিষয়ে আরও দু’একটা সম্পাদকীয় লিখিলাম।

ফলে এ দাঁড়াইল যে আমি নীতি না বদলাইলে অথবা ‘কৃষক’ ত্যাগ না করিলে মিঃ দত্ত আর কৃষক’ চালাইবেন না বলিয়া দিলেন। মিঃ দত্ত সরিয়া পড়িলে কৃষক বন্ধ হইবে, এটা নিশ্চিত। অতএব ‘কৃষক বাঁচাইয়া রাখিবার উদ্দেশ্যে আমিই কৃষক ত্যাগ করিলাম। অন্যান্য ডিরেক্টররাও সকলেই পদত্যাগ করিলেন। স্টাফেরই একজন মুসলমানের নাম সম্পাদকরূপে ছাপিয়া ‘কৃষক’ চলিতে লাগিল।

কিন্তু আমি আর্থিক বিপদে পড়িলাম। ময়মনসিংহে ওকালতি গুটাইয়া বাসা ছাড়িয়া টেবিল-চেয়ার বিলি করিয়া সপরিবারে ময়মনসিংহ ছাড়িয়া ছিলাম। যাকে বলে ‘নদী পার হইয়া একেবারে নৌকা পোড়ানো’ আর কি?

এমন অবস্থায় বিপদের বন্ধুরূপে দেখা দিলেন আমার সহোদর-তুল্য ছোট ভাই খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম। তিনি তখন বাংলা সরকারের সহকারী জুডিশিয়াল সেক্রেটারি। তার পরামর্শে আলিপুর কোর্টে এবং কলিকাতা স্মলক কোর্টে প্র্যাকটিস করা সাব্যস্ত করিলাম। তৎকালে উকিল (প্লিডারদের ওকালতি ছাড়া অন্য কাজ করিতে হাইকোর্টে দরখাস্ত দিয়া ওকালতি সসপেণ্ড করিতে হইত। আমি কৃষকের সম্পাদক নিবার সময় তাই করিয়াছিলাম। এবার পুনরায় ওকালতি শুরু করিবার দরখাস্ত দিয়া তার জবাবের অপেক্ষা করিতে লাগিলাম।

৭. হক সাহেবের ‘নবযুগে’

এমন সময় হক সাহেব ডাকিয়া পাঠাইলেন। তিনি দৈনিক ‘নবযুগ’ বাহির করা স্থির করিয়াছেন। আমাকে তার সম্পাদনার ভার নিতে হইবে। দুইটা কারণে হক সাহেবের এই প্রস্তাবে আকৃষ্ট হইলাম। এক অর্থনৈতিক, দুই রাজনৈতিক। ‘কৃষকে’ দুইশত টাকা বেতন ও পঞ্চাশ টাকা এলাউন্স একুনে আড়াইশ টাকা পাইতাম। কলিকাতায় ওকালতি শুরু করিয়াই এত টাকা পাওয়ার আশা ছিল না। হক সাহেব আমার আর্থিক অবস্থার সব খবর জানিতেন। তিনি পঞ্চাশ টাকা বেশি করিয়া তিনশত টাকা বেতন-ভাতার কথা বলিলেন। বন্ধুবর সৈয়দ বদরুজা, সৈয়দ আযিযুল হক (নান্না মিয়া) ও ওয়াহিদুযযামান (ঠাণ্ডা মিয়া) সকলেই এই প্রস্তাবে আমাকে রাযি করাইতে চেষ্টা করিলেন। আমার আর্থিক আসন্ন দুরবস্থার একটা প্রতিকার হয় এটা আমি স্পষ্টই বুঝিলাম। রাজনৈতিক কারণটা আরও সুদূরপ্রসারী। উক্ত তিন বন্ধু সেদিকে আরও বেশি জোর দিলেন। জিন্না-নেতৃত্ব মুসলিম বাংলার স্বার্থবিরোধী তা হক সাহেব বুঝিতে পারিয়াছেন। তাই তিনি সসম্মানে মুসলিম লীগ হইতে বাহির হইয়া আসার উপায় উদ্ভাবন করিতেছেন। ‘নবযুগ’ বাহির করা তারই প্রথম পদক্ষেপ। হক সাহেবের কথা-বার্তায় তা বুঝিলাম। উক্ত তিন বন্ধু এ কাজকে অর্থাৎ হক সাহেবকে মুসলিম লীগের কবল হইতে উদ্ধার করাকে মুসলিম-বাংলার স্বার্থে একটা বড় কাজ বলিয়া আমার দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করিলেন। আকৃষ্ট হইবার জন্য আমি এক পায় খাড়াই ছিলাম। অতি সহজেই তাঁদের এই যুক্তি মানিয়া লইলাম। আমার সিদ্ধান্ত দ্রুততর করিলেন বন্ধুবর শামসুদ্দিন। হক সাহেবকে মুসলিম লীগের কবলমুক্ত করিবার চেষ্টা তিনি বেশ কিছুদিন আগে হইতেই করিতেছিলেন। তিনি আমাকে জোর দিয়াই বলিলেন, আমি ‘নবযুগের’ দায়িত্ব না নিলে তাঁর এতদিনের চেষ্টা সাফল্যের তীরে আসিয়া নৌকাডুবি হইবে।

কথাবার্তা অনেক দিন ধরিয়া চলিল। বন্ধুবর সিরাজুল ইসলামের কানে কথাটা গেল। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠান হিসাবে মুসলিম লীগের এবং ব্যক্তিগতভাবে সার নাযিমুদ্দিনের সমর্থক। হক সাহেবের তিনি ছিলেন খুব বিরোধী। তিনি আমাকে হুশিয়ার করিলেন আমার ওকালতি আবার সসপেণ্ড করিলে তাঁর পক্ষে আমাকে সাহায্য করা সম্ভব হইবে না। আমি সে কথাটা হক সাহেবের সাথে পরিষ্কার করিয়া লইলাম। কাগযের সম্পাদক রূপে নাম থাকিবে হক সাহেবের নিজের। কাজেই আমার নামও দিতে হইবে না, ওকালতিও সসপেণ্ড করিতে হইবে না। আমি বুঝিলাম নূতন কাগয প্রতিষ্ঠিত করিতে গিয়া আমি ওকালতির সময় পাইব খুব কমই। কিন্তু সেটা আমার চিন্তার কারণ ছিল না। দরখাস্ত করিয়া ফরম্যালি ওকালতি সসপেণ্ড না করিলেই হইল।

শামসুদ্দিন সাহেব নানা মিয়া, ঠাণ্ডা মিয়া ও ছাত্রনেতা নূরুল হুদা আমাকে সংগে লইয়া দিনরাত দৌড়াদৌড়ি করিয়া বাড়িভাড়া করা হইতে মেশিন ও টাইপ আদি ছাপাখানার সাজ-সরঞ্জাম কিনার সমস্ত ব্যবস্থা করিয়া ফেলিলেন। কাগযের ডিক্লারেশন লওয়া হইয়া গেল। তৎকালে ডিক্লারেশন লইতে সম্পাদকের নাম দিতে হইত না। শুধু প্রিন্টার-পাবলিশারের নাম দিতে হইত।

কিন্তু সব ওলট-পালট করিয়া দিলেন একদিন হক সাহেব নিজে। তিনি আমাকে জানাইলেন, সম্পাদকের নাম আমারই দিতে হইবে। কারণ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি পাকিস্তান আন্দেলন কোনও কাগযের সম্পাদক হইতে পারেন না। লাট সাহেব স্বয়ং তাঁকে বারণ করিয়া দিয়াছেন। আমার সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থ হইয়া যায় দেখিয়া আমি চটিয়া গেলাম। সন্দেহ হইল, এটা হক সাহেবেরই চালাকি। আগে হইতে আমাকে ভাড়াইয়া আনিয়া একাদশ ঘটিকায় লাট সাহেবের দোহাই দিয়া আমাকে নাম দিতে বাধ্য করিবেন, এটা তাঁর আগেরই ঠিক-করা ফন্দি ছিল। আমি তর্ক করিলাম। প্রধানমন্ত্রীর কাগযের সম্পাদক হওয়ায় কোন আইনগত বাধা থাকিতে পারে না। আজকাল গণতন্ত্রের যুগ। পার্টি গবর্নমেন্ট। পার্টি লিডাররাই প্রধানমন্ত্রী। কাজেই পার্টির মুখপত্রের সম্পাদক হওয়ায় লিডারের কোন বাধা থাকিতে পারে না। কথা-বার্তায় বেশ বুঝা গেল এটা হক সাহেবের চালাকি নয়। লাট সাহেব সত্য-সত্যই আপত্তি করিয়াছেন। তবে আসলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সার নাযিমুদ্দিনই সেক্রেটারিদেরে দিয়া লাট সাহেবের মুখ হইতে ঐ আদেশ বাহির করিয়াছেন। হক সাহেবের ভাব-গতিক হইতে স্বয়ং লীগ মন্ত্রীরা বুঝিয়াছিলেন, হক সাহেব কি উদ্দেশ্যে দৈনিক বাহির করিতেছেন। সম্পাদক হিসাবে। হক সাহেবের নাম থাকিলে উহার ওজন ও জনপ্রিয়তা বাড়িবে, এটাও নিশ্চয়ই তাঁরা

বুঝিয়াছেন। তাই লাট সাহেবকে দিয়া তাঁরা এই কাজ করাইয়াছেন। কিন্তু লাট সাহেবের আদেশে তিনি ভয় পাইয়াছেন এমন মর্যাদাহানিকর ব্যাখ্যা হক সাহেব দিলেন না। তিনি আমার ‘পার্টি লিডার’ ‘পার্টি মুখপত্র’ ‘পার্টি গবর্নমেন্ট’ ইত্যাদি কথার জবাবে মুচকি দুষ্ট হাসি হাসিয়া বলিলেন : ‘ওসব কথা কেন কও? কি উদ্দেশ্যে কাগ্য বাইর হৈতেছে তাত জানই।‘

আমি পরাজিত হইলাম। কিন্তু নিজের নাম দিতে কিছুতেই রাজি হইলাম না। সিরাজুল ইসলামও বলিলেন, আমিও বুঝিলাম, হক সাহেবের মতের স্থিরতা এবং কাগযের স্থায়িত্ব সম্বন্ধে কোনও ভরশা নাই। কাজেই এই কাজ করিতে গিয়া ওকালতি আবার সসপেণ্ড করিলে সেটা নিতান্তই রিস্কি হইবে। অতএব আমি রাজি হইলাম না। একটা অচল অবস্থার সৃষ্টি হইল। কাগয বাহির না হইলে সকলের চেয়ে বেশি লোকসান আমারই। সুতরাং খুব-তেরেসে ভাবিতে লাগিলাম। একটা ব্রেন ওয়েভ হইল। আমাদের সকলের প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম এই সময়ে দারুণ অর্থ কষ্টে ভুগিতেছিলেন। ডিক্রিদাররা তাঁকে কোর্টে টানাটানি করিতেছিল। অতএব তাঁকে ভাল টাকা বেতন দিয়া তাঁর নামটা সম্পাদক রূপে ছাপিলে আমাদের উদ্দেশ্যও সফল হয়; কবিরও অর্থ-কষ্টের লাঘব হয়। কথাটা বলা মাত্র বন্ধুবর নান্না-ঠাণ্ডা মিয়া ও নূরুল হুদা লুফিয়া লইলেন। আমরা দল বাঁধিয়া তাঁর বাড়ি গেলাম। তিনি সানন্দে রাজি হইলেন। তাঁকে লইয়া আমরা হক সাহেবের নিকট আসিলাম। এক দিনে সব ঠিক হইয়া গেল। কবিকে বেতন দেওয়া হইবে তিনশ’, এলাউন্স পঞ্চাশ, একুনে সাড়ে তিনশ’।

যথাসময়ের একটু আগে-পিছে ১৯৪১ সালের অক্টোবর মাসে ধুম-ধামের সাথে ‘নবযুগ’ বাহির হইল। জোরদার সম্পাদকীয় লিখিলাম। সোজাসুজি মুসলিম লীগ বা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কিছু বলিলাম না। মুসলিম বাংলার বাংলা দৈনিকের আধিক্যের প্রয়োজনের উপরেই জোর দিলাম। তোখড় সম্পাদকীয় হইল। অমনি জোরের সম্পাদকীয় চলিতে লাগিল। সবাই বাহ্বাহ করিতে লাগিলেন।

কিন্তু আমাদের আসল আশা পূর্ণ হওয়ার আশু কোন সম্ভাবনা দেখা গেল না। আমাদের আসল আশা ছিল হক সাহেবকে মুসলিম লীগ হইতে বাহির করিয়া আনা। আমরা যখন ‘নবযুগের আয়োজন শুরু করি, তখনই হক-জিন্না বিরোধ চরমে উঠিয়াছে। দুই-একদিনের মধ্যেই শুভ কাজটা হইয়া যাইবে, এটাই ছিল আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়। বিরোধটা ছিল ভারত সরকার-গঠিত জাতীয় সমর-পরিষদ (ন্যাশন্যাল ওয়ার কাউন্সিল) হইতে হক সাহেবের পদত্যাগ উপলক্ষ করিয়া। ব্যাপারটা অনেকেরই খবরের কাগযে পড়া আছে নিশ্চয়ই। তবু পাঠকদের স্মৃতি ঝালাইবার জন্য সংক্ষেপে ব্যাপারটার পূনরুল্লেখ করিতেছি। ১৯৪১ সালের জুন মাসে ইউরোপীয় যুদ্ধে হিটলারের জয়-জয়কার। অন্যতম প্রধান মিত্রশক্তি ফ্রান্স যুদ্ধে হারিয়া আত্মসমর্পণ করিয়াছে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারে হিটলারের স্বস্তিকা’ পতাকা উড়িতেছে। হিটলারের খ্যাতনামা সেনাপতি ফিল্ড মার্শাল রোমেল মিসরের আল-আমিনের যুদ্ধে বৃটিশ বাহিনীকে পর্যদস্ত করিয়া সুয়েজ খাল ধরে-ধরেন। সমগ্র ইউরোপ জয়ের উল্লাসে উন্মত্ত হইয়া হিটলার এই জুন মাসেই তাঁর এত দিনের মিত্র এবং নিরপেক্ষ সোভিয়েট রাশিয়া আক্রমণ করিয়াছেন। এক মাসের মধ্যে অর্থাৎ জুলাই পার হইবার আগেই মস্কো দখল করিবেন বলিয়া সদম্ভে ঘোষণা করিয়াছেন।

৮. হক সাহেব ও সমর-পরিষদ

আমরা ভারতবাসীরা ইংরেজের পরাজয় কামনাই করিতেছিলাম। হিটলারের পরিণম জয় সম্পর্কেও আমাদের কোন সন্দেহ ছিল না আগে হইতেই। জুন মাসে দেখা গেল স্বয়ং ইংরাজরা ঘাবড়াইয়া গিয়াছে। তার প্রমাণ স্বরূপ ভারতীয় নেতাদেরে, বিশেষতঃ কংগ্রেস ও লীগকে, খুশী করার জন্য বড়লাট তৎপর হইয়া উঠিলেন। বড় লাটের শাসন-পরিষদকে বড় করিয়া বেশির ভাগ ভারতীয় নিবার প্রস্তাব দিলেন। আর যুদ্ধ-পরিচালনা ব্যাপারেও ভারতবাসীর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের পন্থা হিসাবে ‘জাতীয় সমর-পরিষদ’ এই গাল-রা নামে এক কাউন্সিল গঠন করিলেন। ঘোষণায় বলা হইল প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রীরা পদাধিকারের বলে স্বতঃই কাউন্সিলের মেম্বার হইলেন। সে পদ গ্রহণ করিবার জন্য বড় লাট তাঁদেরে পত্র দিলেন। সকলেই তা গ্রহণ করিলেন। সাতটি প্রদেশ হইতে কংগ্রেসীরা আগেই মন্ত্রিত্বে ইস্তফা দিয়াছিলেন। সে সব প্রদেশে লাটের শাসন চলিতেছিল। শুধু বাংলা, আসাম, পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে মন্ত্রিসভা চলিতেছিল। কাজেই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শুধু তারাই সমর-পরিষদের মেম্বার হইলেন। এঁরা সবাই মুসলিম লীগের লোক। কাজেই লীগ সভাপতি জিন্না সাহেব এদেরে নির্দেশ দিলেন সমর-পরিষদ হইতে পদত্যাগ করিতে। জিন্না সাহেবের যুক্তি এই যে বৃটিশ সরকার মুসলিম লীগের দাবির ভিত্তিতে আপোস না করা পর্যন্ত মুসলিম লীগ যুদ্ধ প্রচেষ্টায় কোনও সাহায্য করিবে না। মুসলিম লীগের এই সিদ্ধান্তটা ঠিক কংগ্রেসী সিদ্ধান্তের অনুরূপ। কংগ্রেসও ১৯৪০ সালের মার্চ হইতে বিভিন্ন অধিবেশনে এই দাবি করিয়া আসিতেছিল যে বৃটিশ সরকার ভারতের স্বাধীনতার ভিত্তিতে কংগ্রেসের সহিত একটা রফা না করা পর্যন্ত কংগ্রেস যুদ্ধ-প্রচেষ্টায় কোনও সহযোগিতা করিবে না।

৯. মিঃ জিন্নার যুদ্ধ-প্রচেষ্টার বিরোধিতা

মুসলিম লীগেরও এটা নূতন কথা নয়। মুসলিম লীগের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুসারে জিন্না সাহেব ১৯৪০ সালের ১০ই জুন তারিখে এক বিবৃতিতে সমস্ত মুসলিম লীগারদেরে, বিশেষতঃ মুসলিম মন্ত্রীদেরে, যুদ্ধ প্রচেষ্টায় কোন সহযোগিতা না করিবার নির্দেশ দেন। কেউ এ নির্দেশের কোনও প্রতিবাদ করেন নাই। শুধু পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী সার সেকান্দর হায়াত খাঁ ১৮ই জুন তারিখে এক বিবৃতি দিয়া বলেন যে মুসলিম লীগের এ অসহযোগের সিদ্ধান্ত বাংলা ও পাঞ্জাবের উপর প্রযোজ্য নহে। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব তখন দিল্লি ছিলেন। সম্ভবতঃ তাঁর সাথে পরামর্শ করিয়াই সেকান্দর হায়াত ঐ ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি দিয়াছিলেন। যুদ্ধে বাংলা ও পাঞ্জাবের বিশেষ অবস্থা বর্ণনা করিয়াই তিনি ঐ যুক্তিপূর্ণ বিবৃতিটি দিয়াছিলেন। তাতে কংগ্রেস নেতাদের সাথে আপোস আলোচনা চালাইবার জন্য জিন্না সাহেবকে অনুরোধও করিয়াছিলেন। কাজেই আশা করা গিয়াছিল স্বয়ং জিন্না সাহেবের তাতে সম্মতি আছে। কিন্তু পরদিন ২৯শে জুন জিন্ন সাহেব সেকান্দর সাহেবের বিবৃতিকে শিশু-সুলভ ও তার যুক্তিকে হাস্যকর বলিয়া উড়াইয়া দেন এবং সমস্ত মুসলিম লীগারকে যুদ্ধ প্রচেষ্টা হইতে দূরে থাকিতে নির্দেশ দিয়া লীগ সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি করেন।

জিন্না সাহেবের এই কড়া বিবৃতির জবাবে হক সাহেব বা সেকান্দর হায়াত সাহেব কেউ কিছু বলিলেন না। কিন্তু জিন্না সাহেবের আদেশ অমান্য করিয়া তাঁরা উভয়ে দিল্লীতে ৭ই জুলাই তারিখে কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আযাদসহ অন্যান্য কংগ্রেসী নেতাদের সাথে সাম্প্রদায়িক মিটমাটের আলোচনা করিলেন।

কিন্তু এবার জিয়া সাহেব সোজাসুজি মুসলিম লীগ প্রধান মন্ত্রীদেরে ওয়ার কাউন্সিল হইতে পদত্যাগ করিবার নির্দেশ দিলেন। সে নির্দেশ পালনে গড়িমসি করিয়া সময় কাটাইলেন সকলেই। কিন্তু হক সাহেব ছাড়া আর কেউ প্রতিবাদ করিলেন না। এক দুই করিয়া শেষ পর্যন্ত আর সকলেই পদত্যাগ করিলেন। কিন্তু হক সাহেব করিলেন না। ফলে ১৯৪১ সালে ২৫শে আগস্ট তারিখে মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি হক সাহেবের বিরুদ্ধে কঠোর নিন্দা-সূচক ভাষা প্রয়োগ করিয়া দশ দিনের মধ্যে ‘ওয়ার কাউন্সিল’ হইতে পদত্যাগের নির্দেশ দিলেন। ঠিক এই সময়ে আমরা ‘নবযুগ’ প্রকাশের ব্যবস্থা করিতেছি। সুতরাং আমরা ধরিয়া নিলাম ‘নবযুগ’ বাহির হইবার আগেই হক সাহেবকে মুসলিম লীগ ছাড়িতে হইবে।

কিন্তু নবযুগ বাহির হইয়া বেশ কয়েক দিনের পুরান হইয়া গেল। কিন্তু হক সাহেবের লীগ হইতে বাহির হওয়ার নামটি নাই। হক সাহেব লীগ ওয়ার্কিং কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ মধ্যে পদত্যাগ করিলেন না। কোন জবাবও দিলেন না। আমাদের সাথে আলাপে তিনি দৃঢ়তা দেখাইলেন। তাতে আমাদের আশা বাড়িতে লাগিল। ওদিকে কিন্তু লীগ মন্ত্রীরা ও নেতারা হক সাহেবকে খুব চাপ দিতে থাকিলেন ‘ওয়ার কাউন্সিল’ হইতে পদত্যাগ করিয়া জিন্না সাহেবের সাথে একটা আপোস করিয়া ফেলিতে। হক সাহেব শেষ পর্যন্ত কি করিবেন তা বোঝা আমাদের পক্ষে খুব মুশকিল হইল। আমি এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও উভয় কুল ঠিক রাখিয়া সম্পাদকীয় লিখিয়া চলিলাম।

১০. হক-জিন্না অস্থায়ী আপোস

বহু মুসলিম লীগ নেতার চেষ্টা ও মধ্যস্থতায় হক সাহেব শেষ পর্যন্ত, ১৯৪১ সালের ১৮ই অক্টোবর ‘ওয়ার কাউন্সিল’ হইতে পদত্যাগ করেন। এই পদত্যাগে দ্বিধা ও বিলম্বের কারণ এবং পদত্যাগের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করিয়া তিনি জিন্না সাহেবের নামে লিখিত একটা খোলা চিঠির আকারে সংবাদ পত্রে একটি বিবৃতি দেন। এই পত্রে তিনি জিন্না সাহেবের নেতৃত্বের এবং আন্দোলনের ধারা ও গতির কঠোর ভাষার নিন্দা করেন। প্রথমেই তিনি স্পষ্ট বলিয়া দেন যে জিন্না সাহেবের নির্দেশে বা মুসলিম লীগের ধমকে ভয় পাইয়া তিনি ‘ওয়ার কাউন্সিল’ ছাড়িতেছেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের স্বার্থের দিক হইতে ‘ওয়ার কাউন্সিলের’ মেম্বরগিরির কোনও গুরুত্ব ও আবশ্যকতা নাই বলিয়াই তিনি পদত্যাগ করিতেছেন।

জিন্না নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করিতে গিয়া হক সাহেব মুসলিম বাংলার ভবিষ্যৎ বিপদ সম্বন্ধে অভিজ্ঞ গণকের মতই এমন সব কথা বলিয়াছিলেন, যার প্রায় সবই আজ সত্য হইয়াছে। এই দিক দিয়া এই পত্রখানার ঐতিহাসিক মূল্য অসাধারণ। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের দেশে এর কোনও কপি পাওয়া যায় না। আমার বেশ মনে আছে, ঐ পত্রে তিনি বলিয়াছিলেন, জিয়া সাহেব ও মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির শুধু এই সিদ্ধান্তটাই ভ্রান্ত, তা নয়। তিনি পাকিস্তান প্রস্তাবের যে ব্যাখ্যা ও আন্দোলনের যে ধারা প্রচলন করিয়াছেন, তাও ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক। তাতে মুসলিম ভারতের, বিশেষতঃ মুসলিম বাংলার, ঘোরতর অনিষ্ট হইবে। গোটা বাংলা ও আসাম পূর্ব পাকিস্তানে পড়িবে বলিয়া বাংলার মুসলমানদিগকে ধোকা দেওয়া হইতেছে। মুসলিম লীগে ব্যক্তিবিশেষের ডিটেটরি চলিতে থাকিলে মুসলিম ভারতের রাজনীতিতে মুসলিম বাংলার যে প্রভাব ও মর্যাদা আছে তাও আর থাকিবে না। পশ্চিমা রাজনীতিকদের ইচ্ছামত মুসলিম বাংলার ভাগ্য নির্ধারিত ও পরিচালিত হইবে। সে অবস্থায় আসাম ত পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হইবেই না, বাংলাও বিভক্ত হইবে।

হক সাহেবের কথিত পত্রের ভাষা এখন এতদিন পরে আমার মনে নাই। পত্রটি যোগাড়ের চেষ্টা সাধ্যমত করিয়াছি। পাই নাই। কিন্তু পত্রখানার মর্ম আমার মনে আছে। পত্রখানি আমাদের সকলের বিবেচনায় অতিশয় মূল্যবান ও দূরদর্শিতামূলক ছিল। সেজন্য ‘নবযুগের’ নিউয ডিপার্টমেন্টকে দিয়া উহার বাংলা তর্জমা করাইয়া আমি নিজে তা দেখিয়া দিয়া ‘নবযুগে’ ছাপাইয়াছিলাম। পত্রটি এত বড় ছিল যে উহা সম্পূর্ণ ছাপিতে কয়েক দিন লাগিয়াছিল।

ফলে ‘ওয়ার কাউন্সিল’ হইতে হক সাহেব পদত্যাগ করিলেই লীগের সাথে, মানে জিন্না সাহেবের সাথে, তাঁর আপোস হইয়া যাইবে বলিয়া আমরা যে আশংকা করিতেছিলাম সে আশংকা সত্যে পরিণত হইল না। আশা আমাদের অটুটই থাকিল। হক-জিন্না বিরোধের মধ্যে শুধু রাজনৈতিক আদর্শটাই আমাদের সকলের বিবেচ্য ছিল না। ব্যক্তিগত লাভালাভের প্রশ্নও জড়িত ছিল। আমার স্বার্থটাই ধরা যাক। হক সাহেব লীগ না ছাড়িলে ‘নবযুগের’ দরকার থাকে না। কাজেই আমারও চাকুরি থাকে না। ‘নবযুগ’ বাহির হওয়ায় আমরা সাংবাদিকরা লাভবান হইয়াছি। কিন্তু লীগ মন্ত্রীরা না থাকিলে যাঁরা মন্ত্রী হইবেন, তাদের ত আজও কিছু হইল না। আসল কথা এই যে লীগ মন্ত্রীদেরে তাড়াইয়া যাঁদেরে লইয়া নয়া হক মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে, তাঁদের নাম ঠিক হইয়াই ছিল। কে কোন দফতর পাইবেন, তারও মীমাংসা হইয়া গিয়াছিল। এই সব নিশ্চিত ভাবী মন্ত্রীরা আমাকে অস্থির করিয়া ফেলিলেন। যথেষ্ট জোরে সম্পাদকীয় লেখা হইতেছে না। হক-লীগ-বিরোধের আগুন দাউদাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছে না। তবে আর আগে হইতে ‘নবযুগ’ বাহির করিয়া কি ফল হইল? একমাত্র আমার ছাড়া আর কার কি লাভ হইল? অতএব জিন্না-হক বিরোধটা চরমে আনিবার সাধ্য মত কলমের চেষ্টা করিতে লাগিলাম।

কিন্তু মুসলিম লীগাররাও হক সাহেবের মত জনপ্রিয় প্রভাবশালী নেতাকে হাতছাড়া করিতে রাজি ছিলেন না। তাঁরাও জিন্না-হক আপোসের জন্য তাঁদের সমস্ত শক্তি ও প্রতিপত্তি খাটাইতে লাগিলেন। আপাততঃ তাঁরাই জয়ী হইলেন। হক সাহেবকে দিয়া তাঁর বিবৃতির ব্যাখ্যা করাইলেন। সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ১৬ই নবেম্বর (১৯৪১) মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির দিল্লী বৈঠকে হক সাহেবের সহিত লীগের বিরোধের অবসান ঘটিল। এতে বাংলার লীগ মহল খুব উল্লসিত হইল। কিন্তু আমাদের কলিজা ও মুখ শুকাইয়া গেল। প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন তখন চলিতে ছিল। কাজেই হক সাহেবের দলীয় মেম্বরদের মধ্যে এবং হক সাহেবের সাথে আমাদের দেন-দরবার চলিতে থাকিল। মুসলিম লীগের সাথে তাঁর মিটমাট হইয়া যাওয়ার কথা তুলিলেই তিনি জবাবে মিচকি হাসিয়া আমাদেরে বলিতেন : ‘ওয়েট এণ্ড সী’।

১১. প্রগ্রেসিভ কোয়েলিশন

এর কয়দিন পরেই হক সাহেব আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং ‘নবযুগে’ প্রচারের নূতন ধারা সম্পর্কে আমাকে নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ দিতে গিয়াই তিনি সর্বপ্রথম আমাকে জানান যে শুধু কৃষক-প্রজা ও কংগ্রেসের সাথেই তিনি আপোস করিতেছেন না। হিন্দু সভানেতা ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের সাথেও তাঁর আপোস হইতেছে। ডাঃ শ্যামা প্রসাদকেও তিনি তাঁর নয়া মন্ত্রিসভায় নিতেছেন। আমি শুধু আকাশ হইতে পড়িলাম না। আস্তা আসমানটাই আমার মাথায় পড়িল। আমি জানিতাম হক সাহেব সময়-সময় খুবই বেপরোয়া হইতে পারেন। কিন্তু এতটা হইতে পারেন, এতকাল তাঁর শাগরেদি করিয়াও আমি তা জানিতাম না। কথাটা শুনিয়া আমি এমন স্তম্ভিত হইলাম যে সে-ভাব কাটিতে বোধ হয় আমার পুরা মিনিট খানেকই লাগিয়াছিল। তিনি আমার মনোভাব বুঝিলেন। গম্ভীর মুখে বলিলেন : ‘শোন আবুল মনসুর, তুমি শ্যামা প্রসাদকে চিন না। আমি চিনি। সে সার আশুতোষের বেটা। করুক সে হিন্দুস। কিন্তু সাম্প্রদায়িক ব্যাপারে তার মত উদার ও মুসলমানদের হিতকামী হিন্দু কংগ্রেসেও একজনও পাবা না। আমার কথা বিশ্বাস কর। আমি সবদিক ভাইবা-চিন্তাই তারে নিতেছি। আমারে যদি বিশ্বাস কর, তারেও বিশ্বাস করতে হবে।‘

আমি খুবই চিন্তায় পড়িলাম। কিন্তু মনে-মনে হাসিলাম ভাবিলাম, শ্যামাপ্রসাদকে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নই উঠে না। কারণ স্বয়ং হক সাহেবকেই বিশ্বাস করা যায় না। শ্যামাপ্রসাদকে বিচার করিবার কি অমূল্য মাপকাঠিই না হক সাহেব আমাকে দিয়াছেন। সব অবস্থায়ই হক সাহেব রসিক লোক ছিলেন। হক সাহেবের কথায় বুঝিলাম, পরদিনই মিঃ জে সি গুপ্তের বাড়িতে অপযিশন পার্টি সমূহের নেতাদের সংগে হক সাহেবের বৈঠক বসিতেছে। চাঁদ উঠিলে সবাই দেখিবে। আগামী কালই সবাই জানিয়া ফেলিবে। কাজেই এই অশুভ সংবাদটা আমি কারও কাছে বলিলাম না। কিন্তু বিকালেই দেখিলাম সবাই ব্যাপারটা জানেন। ভাবী মন্ত্রীরাই হাসিমুখে এই খবরটা আমাকে দিলেন।

পরদিন ২৮শে নবেম্বর সত্য-সত্যই মিঃ গুপ্তের বাড়িতে ঐ বৈঠক বসিল। দীর্ঘ আলোচনার পর প্রগেসিত কোয়েলিশন পার্টি নামে নয়া কোয়েলিশন গঠিত হইল। হক সাহেব তার লিডার ও শরৎ বাবু ডিপুটি লিডার নির্বাচিত হইলেন। হাসি-খুশির মধ্যে অনেক রাতে সভা ভংগ হইল। রাত্রেই সারা কলিকাতা, বিশেষতঃ খবরের কাগ আফিসগুলি, গরম হইয়া উঠিল। পরদিন সকালে লীগ সমর্থক মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিল। বিকালেই আইন পরিষদের বৈঠকে (২৯শে নবেম্বর) লীগ মেম্বরদের মধ্য হইতে এ ব্যাপারে সোজাসুজি প্রশ্ন উত্থাপিত হইল। হক সাহেব খুব জোরের সাথে সোজাসুজি ও-কথা অস্বীকার করিলেন।

লীগ মন্ত্রী ও মেম্বাররা স্বভাবতঃই হক সাহেবের কথায় আস্থা স্থাপন করিতে পারিলেন না। তাঁরা হক সাহেবের সহিত দেন-দরবার চালাইলেন। শোনা গেল, ইউরোপীয় দলের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ রক্ষা করিতে লাগিলেন। পর্দার আড়ালে কি হইল, আমরা পথের মানুষেরা তার খবর রাখিলাম না। দেখা গেল, ১লা ডিসেম্বর তারিখে মুসলিম লীগ মন্ত্রীরা সকলে এক সাথে হক মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করিলেন। মুসলিম লীগ পার্টিও আর হক মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করে না বলিয়া ঘোষণা করিল। অগত্যা হক সাহেবও পদত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। পরদিন ৩রা ডিসেম্বর হক সাহেব খবরের কাগয়ে বিবৃতি দিয়া নব-গঠিত প্রগেসিভ কোয়েলিশন পার্টির নেতৃত্ব ‘কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদের সহিত’ গ্রহণ করিলেন।

লীগ মন্ত্রীরা যে সাত তাড়াতাড়িতে হক মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করিয়াছিলেন, তার আসল কারণ এতদিনে বোঝা গেল। তা এই যে ইউরোপীয় দল ও কোন কোন শ্বেতাংগ আই.সি.এস, সেক্রেটারির পরামর্শে লাট সাহেব সার নাযিমুদ্দিনকে ভরসা দিয়াছিলেন, হক মন্ত্রিসভার অবসানে লীগ দলকেই মন্ত্রিসভা গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হইবে। লাট সাহেবের কাজ-কর্মেও তা বোঝা গেল। হক সাহেব প্রগেসিভ কোয়েলিশন পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়া বিবৃতি ও লাট সাহেবকে তা জানাইয়া দেওয়া সত্ত্বেও এবং এই দলের সুস্পষ্ট মেজরিটি থাকা সত্ত্বেও লাট সাহেব হক সাহেবকে নয়া মন্ত্রিসভা গঠনের দায়িত্ব দিতে গড়িমসি করিতে থাকিলেন। মুসলিম মেম্বরদের অধিকাংশের রাজনৈতিক চরিত্র সম্বন্ধে সকলের তখন এই ধারণা হইয়া গিয়াছে যে, যে-দল মন্ত্রিসভা গঠন করিবে, শেষ পর্যন্ত তাঁদের বেশির ভাগ সেই দলেই যোগ দিবেন। অতএব আপাতঃদৃষ্টিতে মুসলিম লীগ পার্টিতে মুসলমান মেম্বরদের মেজরিটি না থাকা সত্ত্বেও এই পার্টিকে মন্ত্রিসভা গঠনে আহবান করা হইবে, এমন গুজবে কলিকাতা শহর, বিশেষতঃ সংবাদপত্র আফিস, প্রতিমুহূর্তে মুখরিত হইয়া উঠিতে লাগিল। আমাদের বুকও আশংকায় দূর-দূর করিতে থাকিল।

কিন্তু এই অবস্থায় বেশিদিন গেল না। ৭ই ডিসেম্বর জাপান জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে অবতরণ করিল এবং ঝটিকা আক্রমণে পার্ল হার্বার নামে বিখ্যাত মার্কিন বন্দর বোমা-বিধ্বস্ত করিল। পরদিন ৮ই ডিসেম্বর বৃটিশ ও মার্কিন সরকার জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিলেন। ইউরোপীয় যুদ্ধ এতদিনে সত্য-সত্যই বিশ্বযুদ্ধে রূপান্তরিত হইল। বোধহয় বড় লাটের নির্দেশে বাংলার লাটের নীতির পরিবর্তন হইল। তিনি ১০ই ডিসেম্বর হক সাহেবকে নয়া মন্ত্রিসভা গঠনে কমিশন করিলেন। আমাদের মধ্যে বিপুল উল্লাস দেখা দিল। লীগ মহলে বিষাদ! কিন্তু হরিষে-বিষাদ হইল আমাদের। লাট সাহেব ইচ্ছার বিরুদ্ধে হক সাহেবকে মন্ত্রিত্ব দিলেন বটে, কিন্তু তাঁর ডান হাতটি ভাংগিয়া দিলেন। প্রগেসিভ কোয়েলিশনকে সত্য-সত্যই প্রগতিবাদী জাতীয় পার্টি হিসাবে রূপ দিতে পারিতেন যিনি তিনি ছিলেন মিঃ শরৎ চন্দ্র বসু। হক সাহেবের পরেই তাঁর দ্বিতীয় স্থান। নয়া মন্ত্রিসভার তালিকাও সেই ভাবেই করা হইয়াছিল। শরৎ বাবুকে দেওয়া হইয়াছিল স্বরাষ্ট্র দফতর। কিন্তু ১১ই ডিসেম্বর বেলা ১০টায় মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ করিবার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে শরৎ বাবুকে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেফতার করিয়া প্রেসিডেন্সী জেলে নেওয়া হইল। আমরা যারা মন্ত্রী হইতেছিলাম না, তারা সবাই রাগে উন্মত্ত হইয়া উঠিলাম এবং হক সাহেবকে এই গ্রেফতারির প্রতিবাদে মন্ত্রিসভা গঠন করিতে অস্বীকার করিতে উপদেশ দিতে লাগিলাম। কিন্তু যারা মন্ত্রী হইতে যাইতেছিলেন তাঁরা সকলেই আমাদের চেয়ে অনেক বিদ্ধান জ্ঞানী অভিজ্ঞ দূরদশী ধীর চিত্তের লোক ছিলেন। তাঁরা উপদেশ দিলেন যে শরৎ বাবুর পোর্টফলিও খালি রাখিয়া অবশিষ্ট মন্ত্রীদের শপথ নেওয়া হইয়া যাক। শপথ নেওয়ার পর পরই প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব লাট সাহেবের সহিত দরবার করিয়া শরৎ বাবুর মুক্তির বন্দোবস্ত করুন। হক সাহেব মন্ত্রিসভা গঠনে অস্বীকার করিলে শীগকেই মন্ত্রিত্ব দেওয়া হইবে, এ বিষয়ে সকলেই একমত হইলেন। তাই হইল। নয়া হক মন্ত্রিসভার শপথ যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হইল। শপথ শেষে প্রধানমন্ত্রী লাট সাহেবের সহিত দেখাও করিলেন। লাট সাহেব বলিয়া দিলেন, ভারত রক্ষা আইনে কেন্দ্রীয় সরকারের হুকুমেই শরৎ বাবুকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। প্রাদেশিক লাটের বা সরকারের এ ব্যাপারে কিছুই করণীয় নাই। সত্যই তাঁদের কিছু করণীয় থাকিল না। অতএব শরৎ বাবুকে জেলে রাখিয়াই মন্ত্রিসভার কাজ চলিতে থাকিল। শেষ পর্যন্ত শরৎ বাবুকে বাদ দিয়াই এগার জনের পূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠিত হইল। হক সাহেব ছাড়া মুসলিম মন্ত্রী থাকিলেন পাঁচ জন। যথা : (১) নবাব হবিবুল্লা (2) মৌঃ শামসুদ্দিন (৩) খান বাহাদুর আবদুল করিম (৪) খান বাহাদুর হাশেম আলী (৫) খান বাহাদুর জালালুদ্দিন। হিন্দু মন্ত্রী থাকিলেন পাঁচ জন। যথা : (১) সন্তোষ কুমার বসু (2) ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী (৩) প্রমথ নাথ ব্যানাজী (৪) হেম চন্দ্র লস্কর ও (৫) উপেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ।

১২. মন্ত্রীদের প্রতি অযাচিত উপদেশ

মন্ত্রিসভার সাফল্য-নিষ্ফলতা সম্বন্ধে নিরাসক্ত থাব্বিার যে সিদ্ধান্ত গোড়াতে করিয়াছিলাম, শরৎ বাবুর গ্রেফতারে সে সংকল্প আর ঠিক রাখতে পারিলাম না। মেম্বর-মন্ত্রী না হওয়ায় স্বভাবতঃই আমার পার্লামেন্টারি কোনও দাম ছিল না। কিন্তু হক সাহেবের কাগ ‘নবযুগের সম্পাদকের দায়িত্বের জোরে এবং হক সাহেবের দেওয়া গুরুত্বের বলে মন্ত্রীদিগকে চাওয়া-না-চাওয়া, বাঞ্ছিত-অবাঞ্ছিত উপদেশ দিতে লাগিলাম। আমার মনে হইল প্রগেসিত কোয়েলিশনকে সফল করার উপর শুধু হক সাহেবের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যত নয়, সারা বাংলার, বিশেষতঃ মুসলিম বাংলার, ভবিষ্যৎ নির্ভর করিতেছে। এটাকে সফল করার দায়িত্ব শরৎ বাবুর অভাবে যেন আমারই একার ঘাড়ে পড়িয়াছে। একদিকে দিনের পর দিন সম্পাদকীয় লিখিয়া প্রগেসিভ কোয়েলিশনের গুরুত্ব বুঝাইতে লাগিলাম। অপর দিকে তাকে সফল করিবার ফন্দি-ফিকির মন্ত্রীদের সমঝাইতে লাগিলাম। সম্পাদকীয়গুলি যে খুবই যুক্তিপূর্ণ প্রাণস্পর্শী ও হৃদয়গ্রাহী হইতেছিল তার প্রমাণ পাইলাম শ্রদ্ধেয় সৈয়দ নওশের আলী ও বন্ধুবর সৈয়দ বদরুজার মুখে। এরা দুইজনেই প্রগেসিভ কোয়েলিশন গঠনে এবং ‘নবযুগ’ প্রতিষ্ঠায় আপ্রাণ খাঁটিয়েছেন। কিন্তু এঁরা কেউই মন্ত্রী হন নাই। নওশের আলী সাহেবকে পরে আইন পরিষদের স্পিকার করা হইয়াছিল এবং সৈয়দ বদরুজাকে কর্পোরেশনের মেয়র করা হইয়াছিল। এই দুই বন্ধুই আমার সম্পাদকীয়গুলি পড়িয়া পড়িয়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যুক্তিতে যাঁর-তাঁর ভাষায় প্রায় একই কথা বলিয়াছিলেন : প্রগেসিত কোয়েলিশনটা যে দেশের জন্য এমন প্রয়োজনীয় ছিল, এটার প্রতিষ্ঠা করিয়া আমরা সে সত্যই একটা মহৎ কাজ করিয়াছি, আপনার সম্পাদকীয় পড়িবার আগে আমরা নিজেরাই তা জানিতাম না। আমি এই প্রশংসার জন্য তাঁদেরে ধন্যবাদ দিয়াছিলাম। কিন্তু মনে মনে হাসিয়া বলিয়াছিলাম : ‘লিখিবার আগে আমিই কি জানিতাম?’

কিন্তু মন্ত্রীদের প্রতি আমার উপদেশ কার্যকরী হইল না। হক সাহেব হইতেই শুরু করা যাক। তিনি একটি বিবৃতিতে বলিলেন : শ্যামাপ্রসাদ মুসলিম বাংলার স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব নিয়াছেন। আর আমি নিয়াছি হিন্দু-বাংলার স্বার্থরক্ষার দায়িত্ব। রাজনৈতিক স্ট্যান্টের রাজা হক সাহেব। তাঁর জন্যও ছিল এটা একটি অসাধারণ স্ট্যান্ট। সত্য সত্যই এটা ঘটাইতে পারিলে বাংলার সার্বিক মুক্তি ছিল অবধারিত। তাতে শুধু বাংলার নয় ভারতের হিন্দু-মুসলিম সমস্যাও সম্পূর্ণ মিটিয়া যাইত। কাজেই ভাব-প্রবণতা হেতু আমি হক সাহেবের এই স্ট্যান্টে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত হইয়া উঠিলাম। হক সাহেব ও শ্যামাপ্রসাদ বাবুকে মুখে বলিলাম এবং বহু যুক্তি দিয়া ‘নবযুগে’ লম্বা সম্পাদকীয় লিখিলাম। হক সাহেবের পশ্চিম বাংলা ও ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের পূর্ব বাংলা সফরে বাহির হওয়া উচিৎ এবং কালবিলম্ব না করিয়াই এ সফর শুরু করা আবশ্যক। ডাঃ শ্যামাপ্রসাদকে আমি আমার নিজের জিলা ময়মনসিংহ হইতেই সফর শুরু করিবার প্রস্তাব দিলাম। আমি বলিলাম : আমি আগেই সেখানে চলিয়া যাইব এবং সমস্ত জনসভা ও নেতৃ-সম্মিলনীর ব্যবস্থা আমিই করিব। জনসভায় কোনও গণ্ডগোল না হওয়ার দায়িত্ব আমার। কিন্তু মুসলিম-জনতার মনে আস্থা সৃষ্টি করিবার দায়িত্ব ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের।

ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ ইচ্ছা করিলে তা পারেন সে বিশ্বাস আমার হইয়াছিল। প্রথমতঃ তিনি অসাধারণ সুবক্তা ছিলেন। দ্বিতীয়তঃ আমি তাঁর সাথে কয়েকদিন মিশিয়াই বুঝিয়াছিলাম, তাঁর সম্বন্ধে হক সাহেব যা বলিয়াছেন, তা ঠিক। সাম্প্রদায়িক ব্যাপারে সত্য-সত্যই তিনি অনেক কংগ্রেসী নেতার চেয়েও উদার। হিন্দু সভার নেতা হইয়াও কোনও হিন্দু নেতার পক্ষে মুসলমানদের প্রতি এমন উদার মনোভাব পোষণ করা সম্ভব, আমার এ অভিজ্ঞতা হইল প্রথমে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদকে দেখিয়া! অবশ্য পরবর্তী কালে তেমন মনোভাবের লোক আরও দেখিয়াছিলাম। আমার নিজের জিলাতেই এমন কয়জন হিন্দু-সভা নেতা দেখিয়াছি, যাঁরা পাকিস্তান হওয়া মাত্র অনেক কংগ্রেস নেতার মত দৌড় মারিয়া সীমান্ত পার হন নাই। বরঞ্চ পাকিস্তানের অনুগত উৎসাহী নাগরিক হিসাবে সকল কাজে মুসলমানদের সহিত সহযোগিতায় ও বন্ধুভাবে পাকিস্তান আন্দোলন সপরিবারে বসবাস করিতেছেন। তবে এটা ঠিক যে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের বেলা কিছুদিন পরেই বুঝিয়াছিলাম তাঁর উদারতা প্রধানতঃ ব্যক্তিগত মহত্ব, রাজনৈতিক সমস্যা ঘটিত দূরদৃষ্টি নয়।

যা হোক, আমার প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত রহিত হইল না। যতদূর বোঝা গেল, তাতে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের চেয়ে হক সাহেবের দোষই এতে বেশি ছিল। এক দিকে হক সাহেব আমাকে বলিলেন : তোমার প্রস্তাব শুনিতে ভাল; কিন্তু ওটা কাজে কতদূর সফল করিতে পারি তা চিন্তা করিয়া দেখ। অপর দিকে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ বলিতে থাকিলেন : আপনার প্রস্তাবে আমি এখনি রাযী। প্রধ