তাই হইল।
ইসলাম সাহেব অন্যলোক না পাইয়া নিজেই প্রেসের ‘কিপার’ হইলেন।
.
তিন
নূতন বাড়িতে ‘আহলে-হাদিস-গুর্যের’ আফিস প্রতিষ্ঠিত হইল।
ইসমাইল সাহেব সম্পাদকের স্থলে নিজের নামের পরিবর্তে স্বীয় নিতান্ত অনুগত শ্যালক-কেরানির নাম ছাপাইলেন এবং কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় শীর্ষদেশে বড় বড় অক্ষরে ছাপা হইল : মওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেব প্রতিষ্ঠিত।
কাগজের উদ্দেশ্যের স্থলে লেখা হইল : বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে একতা ও সম্প্রীতি স্থাপন এবং তাহাদের সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সমাজনীতিক ও বাণিজ্যনীতিক উন্নতিবিধান।
নূতন বাড়িতে ‘আহলে-হাদিস-গুর্য’ প্রতিষ্ঠিত হইবার পর প্রথম সংখ্যাতেই সম্পাদকীয় স্তম্ভে লেখা হইল : দয়াময় আল্লাহতালার অসীম কৃপায় ও সমাজের অকৃত্রিম হিতৈষী বঙ্গবিখ্যাত আলেম, মুসলিম বঙ্গের অবিসম্বাদিত নেতা মওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেবের অসাধারণ ত্যাগ স্বীকারের ফলে ‘আহলে-হাদিস-গুর্য’ আজ অষ্টম বর্ষে পদার্পণ করিল। গ্রাহক-অনুগ্রাহকগণের সহানুভূতি মাত্র সম্বল করিয়া মওলানা সাহেব এই দায়িত্বপূর্ণ কাজে হস্তক্ষেপ করিয়াছিলেন। এ কাজে তিনি মুসলিম বঙ্গের আশাতীত সহায়তা পাইয়াছেন। তারই ফলে সামান্য মূলধন লইয়া মওলানা সাহেব এই কাজে হাত দিয়াও আজ ‘আহলে-হাদিস-গুর্য’কে নিজের পায়ে দাঁড় করাইতে সমর্থ হইয়াছেন। মওলানা সাহেবের বাড়ির অবস্থা স্বচ্ছল না হলেও তিনি এযাবৎ কাগজের তহবিল হইতে এক কপর্দকও গ্রহণ করেন নাই। বরং সংসার হইতে আহলে-হাদিস-গুর্যকে সাহায্য করিতে গিয়া তিনি ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছেন। ইহার জন্য মওলানা সাহেব বিন্দুমাত্র দুঃখিত নহেন। তাহার প্রাণের ধন সাধারণ বস্তু ‘আহলে-হাদিস-গুর্য’কে তিনি হৃদয়ের প্রতি শোণিতবিন্দু দিয়া জীবনের পথে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে পারিয়াছেন, তজ্জন্য তিনি সেই পরম করুণাময় আল্লাহতালার দরবারে শোকর গুজারি করিতেছেন।
এই ধরনের অন্যান্য কথার পর লেখা হইল : মওলানা সাহেব কেবল মাত্র আহলে হাদিস-সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্যই প্রথম ‘গুর্যের প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু যাহার কর্মশক্তির নেয়ামত খোদাতালা সমস্ত মুসলিম-বঙ্গের ভোগ্য বলিয়া বিধান করিয়া দিয়াছেন, তাঁহার সেই অসাধারণ কর্মশক্তি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকিবে কেন? সমস্ত মুসলমানদের জন্যই খোদা যাহাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনি সাম্প্রদায়িক গণ্ডির মধ্যে নিজেকে লুকাইয়া রাখিয়া স্বীয় জ্ঞানের আলো হইতে অধঃপতিত মুসলমান সমাজকে বঞ্চিত করিয়া খোদার আদেশ অমান্য করিতে পারেন না। সমস্ত বাঙলার মুসলমান সম্প্রদায়ের অধঃপতিত অবস্থা দর্শন করিয়া মওলানা সাহেবের উদার প্রাণ হাহাকার করিয়া উঠিয়াছে। তাই তিনি সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সমস্ত মুসলমানের কল্যাণ সাধনের জন্য এহতেকাফে বসিয়াছেন। কি উপায় অবলম্বন করিলে মুসলিম-বঙ্গের সার্বজনীন কল্যাণ সাধন করা যায়, কি কর্মপন্থার দ্বারা খোদার প্রেম ইসলামকে দেশের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায়, গত দুই সপ্তাহ যাবৎ তিনি তজ্জন্য কঠোর ধ্যানে মগ্ন হইয়াছেন। শীঘ্রই ‘গুর্যের মারফত তার ফলাফল সাধারণ্যে ঘোষণা করা হইবে। মুসলিম-বঙ্গ প্রস্তুত হও।
অতঃপর ‘গুর্যে’র ভবিষ্যৎ ‘অসাম্প্রদায়িক’ নীতির কথা বর্ণনা করিয়া এইভাবে প্রবন্ধের উপসংহার করা হইল : ইসলাম ও মুসলিম-বঙ্গের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য আমাদের ধর্মীয় ও রাজনীতিক গুরু মওলানা সাহেব বিষয়ান্তরে মনোনিবেশ করায় ‘গুর্য’ পরিচালনের গুরু দায়িত্ব আমাদের দুর্বল ও অযোগ্য স্কন্ধে ন্যস্ত হইয়াছে। গুর্য পরিচালনে মওলানা সাহেবের জ্ঞানালোকে, অনুপ্রেরণা ও উপদেশই আমাদের পথ-নির্দেশ করিবে বটে তথাপি সমাজের হিতৈষী ব্যক্তিগণের ও জনসাধারণের আন্তরিক সহযোগিতাও কামনা করিয়া আমরা আজিকার এ জয়যাত্রা আরম্ভ করিলাম।
ইহার পর হইতে ‘গুর্যের’ সম্পাদকীয় স্তম্ভে মযহাবী ঝগড়া বিবাদের তীব্র নিন্দা করিয়া, প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের সহিত মুসলমান সম্প্রদায়ের দূরবস্থার তুলনা করিয়া এ বিষয়ে কোনও সমাজ হিতৈষী ব্যক্তি দৃষ্টি দিতেছেন না বলিয়া আর-আর নেতৃবৃন্দের কার্যের নিন্দা করিয়া এবং যে একজন মাত্র লোক সমাজের জন্য শিবরাত্রির শলিতার মতো গোপনে বিন্দু বিন্দু করিয়া নিজের শোণিত দান করিতেছেন, তাঁহার দীর্ঘ জীবনের জন্য খোদার নিকট দোয়া করিতে সমস্ত পাঠক-পাঠিকাকে অনুরোধ করিয়া সপ্তাহের পর সপ্তাহ রাশি রাশি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ বাহির হইতে লাগিল।
বলাবাহুল্য, ইসমাইল সাহেবই নিজ হাতে ঐসব সম্পাদকীয় লিখিতেন এবং ধ্যান এহতেকাফ যা করিয়া সশরীরে ‘গুর্য-কার্যালয়ে অবস্থান করিয়াই সব করিতেন।
‘গুর্যে’র লেখা জনসাধারণের অধিকাংশের হৃদয় জয় করিল। সাম্প্রদায়িক কলহের অবসান-প্রাক্কালে এমন উদার বাণী অনেকের নিকটই নূতন ও মহান বোধ হইল।
দলে-দলে ‘গুর্যে’র গ্রাহক বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।
যথাসময়ে সব কথা হাজি সাহেবের কানে গেল। তিনি ইসমাইল সাহেবকে ডাকিয়া বলিলেন : বাবা অন্য সব যা লিখেছ, তার জন্য আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই না। তোমার ঈমানে যা নেয়, তাই করো? আমি ওথেকে লাভ করব বলে কাগজ বের করি নাই। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য ত্যাগ করতে যাচ্ছ, তাতেই আমার আপত্তি।
