.
পাঁচ
যথা সময়ে সভা বসিল।
বহুলোকের সমাগম হইল।
বহু পুলিশসহ থানার বড় দারোগা সাহেবও উপস্থিত হইলেন। সংখ্যায় পুলিশের লাল পাগড়ি ও মওলানা সাহেবদের সাদা পাগড়িতে প্রতিযোগিতা চলিলেও আকারে মওলানা সাহেবদের পাগড়িই ইসলামের জয় ঘোষণা করিল।
তরুণদের নেতা সাদতই কেবল শেষ পর্যন্ত বাহাসে উৎসাহিত হইয়া উঠে নাই।
সে আগের দিন শহরে গিয়া জিলায় মুসলমান স্কুল ইনস্পেক্টরকে অনেক বলিয়া কহিয়া বাহাসের সভায় উপস্থিত করিল। দারোগা সাহেবও মুসলমান ছিলেন। তাঁহাকেও দুই-এক কথা বলিতে রাজি করিল।
ফলে সভা শুরু হইবার আগে স্কুল-ইনস্পেক্টর সাহেব ও দারোগা সাহেব দু’এক কথা বলিবার সুযোগ পাইলেন। তাঁহারা উভয়ে সাম্প্রদায়িক প্রীতি ও সামাজিক শান্তির দিক দিয়া এবং নব-প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি স্থায়িত্বের দিক দিয়া বাহাসের বিষময় ফলের কথা নানা যুক্তিতে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। জনতার উপর তার খানিকটা ক্রিয়াও হইল।
কিন্তু পর পর উভয়পক্ষের দুইজন মওলানা সাহেব উঠিয়া বলিলেন : এ সব শরিয়তের মসলা, এসব ব্যাপারে কথা বলিবার তাঁহাদের কোন অধিকার নাই। দুনিয়াবী মসলার উপর দীনি মামলার ফয়সলা করা ইসলামের খেলাফ। যে সমস্ত মুজাহেদিন ইসলামের জন্য জেহাদ করিয়াছেন, তাহারা দুনিয়ার ভালমন্দ চিন্তা করেন নাই।
বক্তৃতায় হানাফী মওলানা সাহেব ইনস্পেক্টর সাহেবকে বেনামাযী বলিয়া তাম্বিহ করিলেন এবং মোহাম্মদী মওলানা সাহেব দারোগা সাহেবের দাড়িহীনতা লইয়া রসিকতা করিলেন।
বাহাস হউক, জনতা এই অভিমত প্রকাশ করিল।
সাদতের তরুণ প্রাণে আর সহ্য হইল না। সে নিজেই বক্তৃতা করিতে দাঁড়াইল। প্রাণস্পর্শী ভাষায় সে হিন্দুদের শুদ্ধিসংগঠনের কথা বলিয়া তার সঙ্গে মুসলমানদের আত্মকলহের তুলনা করিল। অশুদ্ধ আরবী উচ্চারণ করিয়া সে ‘ওয়াতাসিমু বিহাবুলিল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর রশি ধরিবার সেই অতি পুরাতন আয়াতটি পর্যন্ত আবৃত্তি করিল।
কিন্তু কেহ তাহার কথা শুনিল না।
মওলানারা তাহাকে বেতমিষ বলিয়া বসাইয়া দিলেন।
বাহাসের অন্যতম শর্তরূপে নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে স্থানীয় জমিদারের হিন্দু নায়েব মহাশয় সভার বিচারক সভাপতি। তিনিও সভাপতির আসন গ্রহণ করিয়াই প্রথমে উভয় সম্প্রদায়ের মিলনের পক্ষে দু’চার কথা বলিতে শুরু করিলেন।
কিন্তু বাধা দিয়া মওলানাদের দু’চারজন সমস্বরে বলিলেন : এই কাজের জন্য তাহাকে সভাপতি করা হয় নাই।
তিনি অগত্যা নিরস্ত্র হইলেন এবং বাহাস আরন্তের আদেশ দিলেন।
বাহাস শুরু হইল।
প্রথমে দণ্ডায়মান হইলেন হানাফী পক্ষ হইতে মওলানা দুরায়েগায়ের মোকাল্লেদিন সাহেব। তিনি নাকি তাঁহার বাহাসে গায়েব-মোকাঁদেদিগকে ভাষার চাবুক মারিতে পারিতেন এবং বহু বাহাসের সভায় তা করিয়াছেনও। এটা তাহার নিজেরই দাবি; তাই তিনি নিজেই এই উপাধি গ্রহণ করিয়াছেন। কাজেই ভক্তদের মধ্যেও তিনি ঐ নামেই পরিচিত। তিনি দাঁড়াইয়া যথারীতি দাড়িতে হাত বুলাইয়া হামদু-সানা পাঠ করতঃ এরশাদ ফরমাইলেন : আমার প্রথম সওয়াল এই যে, গায়ের-মোকাঁদেরা যে নিজেদের মোহাম্মদী বলে, এ কোন মোহাম্মদ–জনাব পয়গম্বর সাহেব, না আবদুর ওহাবের পুত্র মোহাম্মদ?
সওয়াল শেষ করিয়া দুররা সাহেব দাঁড়াইয়া নিশ্চিত বিজয়-গর্বে মুচকি হাসিতে লাগিলেন।
মোহাম্মদী তরফ হইতে মওলানা দহশতে-মোকাল্লেদিন সাহেবই জওয়াব দিতে দণ্ডায়মান হইলেন। ইনি স্বীয় ভক্তদের মধ্যে ঐ নামেই বিখ্যাত, কারণ তাঁহার দশতে হানাফীরা থরথরি কম্পমান। তিনি মওলানা দুররার সওয়ালের কোন জওয়াব না দিয়া পাল্টা সওয়াল করিলেন। বলিলেন : আপনি আগে কোরআন শরীফ থেকে মযহাব সাবেত করুন।
মওলানা দুররা চিৎকার করিয়া বলিলেন : আমার সওয়ালের জওয়াব দিন।
মওলানা দহশত সমান জোরে চিৎকার করিলেন : আমার সওয়ালের জওয়াব দিন।
কেহ কাহারও জওয়াব দিলেন না। উভয়ে বলিলেন : অপর পক্ষ মোনতেক মানিতেছে না, কাজেই এভাবে বাহাস চলে না।
বলিলেন বটে চলে না, কিন্তু বাহাস চলিতে লাগিল। অর্থাৎ কাহারো কথা কেহ না শুনিয়া উভয়েই একসঙ্গে কথা বলিয়া যাইতে লাগিলেন। কেহ কিছু প্রমাণ করিলেন না। বটে, কিন্তু একপক্ষ যে রাফেযী, খারেজী, দুখী, জাহান্নামী এবং ইহাতকে কাফের, একথা অপর পক্ষ খুব জোরের সঙ্গেই ঘোষণা করিতে লাগিলেন।
মাঝে মাঝে উভয় পক্ষের অতি উৎসাহী কেহ-কেহ দুই মওলানার পিছনে জোর দিবার চেষ্টা করিল। ফলে একসঙ্গে একাধিক তার্কিকের মধ্যে তর্ক শুরু হইল। ক্রমে হযরত মওলানাদের সঙ্গে-সঙ্গে মওলানারা তারপরে মৌলবীরা এবং অবশেষে মুনসী সাহেবেরাও তর্কে যোগদান করিলেন।
সভাপতি চিৎকার করিয়া গলা ফাটাইলেন। কেহ তাহার কথা শুনিল না।
অবশেষে বিরক্তি ভরে তিনি কখন যে সভা ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন বাহাসরত মওলানারা তা টেরও পাইলেন না।
বিষম কোলাহলের আকারে বাহাস চলিতে লাগিল।
দেখিতে দেখিতে গ্রামের মাতব্বর সাহেবরাও তর্ক-যুদ্ধে অবতরণ করিলেন।
মাতব্বররা তর্কে অবতরণ করায় জনতাও নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন হইয়া উঠিল।
সুতরাং তর্ক অধিকক্ষণ মুখে সীমাবদ্ধ থাকিল না। হাত মুখের স্থান অধিকার করিল। হাতাহাতি কিলঘুষি বেদেরেগ চলিতে লাগিল।
