তাহারা বিশেষ ভাবনায় পড়িল।
মওলানা সাহেব বলিয়া যাইতে লাগিলেন : আমি তসলিম করি, ওদেরকে সামনা সামনি দুখী বলে গাল দিয়ে ওদের মনে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। লেকেন দিলে-দিলে তাদেরকে দুখী বলে না জানলে আপনাদের নিজেদের মহাবে ইমাম পোখতা হবে না। যইফ-ইমান লোকের এবাদত আল্লাহর দরগায় কবুল হয় না। কাজেই আখেরাতে দুজখের আগুন থেকে বাঁচবার জন্য মোহাম্মদীকে আমাদের দুজখী জানতেই হবে। শুধু তাই নয়। আপনারা বেহেশতী ফেরকা; সুতরাং খোদার দরগায় আপনারা শরীফ। মোহাম্মদীরা দুজখী; সুতরাং খোদার তারা রযিল। রযিল লোক শরীফ লোকের আগে রাস্তা চলতে পারে না। যদি চলে এবং শরীফ লোক যদি বিনা-প্রতিবাদে রজিলের পিছনে যায়, তবে তাতে সেও রযিলের দরজায় নেমে যায়। সেইরূপ শরীফ লোকের পক্ষে রযিল লোকের সরদারি মেনে না নেওয়ার শানেও হাদিসে বহুৎ-বহুৎ খবর এসেছে। দুনিয়াবী শরাফতেরই যখন এত ইযযৎ, তখন দীনা শরাফতের কত ইষৎ হওয়া উচিত, তা আপনারাই খেয়াল করুন। আপনারা দীনা শরীফ ফেরকা হয়েও দীনা রযিল ফেরকার সরদারি মেনে নিয়েছেন। আপনাদের মধ্যে ধনী বেশি, আপনাদের ফেরকায় আলেম বেশি, দুনিয়ায় প্রায় সমস্ত মুসলমানই এই ফেরকা-ভুক্ত। তবু আপনারা কেন মোহাম্মদীদের তাঁবেদারি করছেন? তাদের গ্রামেই স্কুল হবে, সেইখানেই সাহেব-সুবা আসবে, সেখানেই সব; আপনারা যেন কেউ নন। কেন? আপনারা এত জিল্লত কেন বরদাশত করবেন? আপনারা ইচ্ছা করলে এ গ্রামে কি স্কুল স্থাপন করতে পারেন না? সাহেব সুবা কি আপনাদের গ্রামে আসতে পারে না?
মওলানা সাহেব দীনা শরাফতের যুক্তি শ্রোতাদের মনে বিশেষ আসর করিতে না পারিলেও দুনিয়াবী শরাফতের শেষ দিকটার যুক্তিটা অধিকাংশের ভাল লাগিল। তার ফল ফলিল–হাটে মাঠে রাস্তাঘাটে বৈঠকখানায় সর্বত্র দিনরাত এই আলোচনাই চলিতে লাগিল।
.
চার
মোহাম্মদীর সরদার-মৌলবী সাহেবের কানে এ-খবর পৌঁছিল।
তিনি জন-চার–পাঁচেক আসহাবা লইয়া তীরবেগে গ্রামে তশরিফ আনিলেন। মযহাবী কলহে তাঁহার ইচ্ছা নাই, এই অভিমত প্রকাশ করিয়াও তিনি মওলানা সাহেবের পিছনে ধাওয়া করিলেন। মওলানা সাহেবের নিকট সদলবলে হাজির হইয়া তিনি বলিলেন : আপনি মোহাম্মদীগণকে দুজখী বলেছেন। আপনার কথা হাদিস কোরআন থেকে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে।
মওলানা সাহেব ইহাই চাহিতেছিলেন। তিনি বলিলেন : আলহামদুলিল্লাহ, আমি প্রস্তুত।
বাহাসের দিন-তারিখ ধার্য হইয়া গেল।
গ্রামের তরুণরা প্রবীণদের ধরিল; বাহাস হইলে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মনোমানিন্য হইবে; তাতে স্কুলের ক্ষতি হইবে।
দুই-একজন মাতব্বর গ্রামে গ্রামে হাঁটিয়া বাহাসের অপকারিতা বুঝাইবার চেষ্টাও করিলেন।
কিন্তু সমস্ত লোক তখন বাহাসের নামে উন্মত্ত। অনেকে তাঁহাদের কথা শুনিলই না। যাহারা শুনিল তাহাদের অনেকেই তর্ক করিয়া বাহাসের সমর্থন করিল; যাহারা মুখে মুখে সায়ত্ত দিল, তাহারাও তলে তলে বাহাসের জন্য চাঁদা দিল।
গ্রামময় সাজ-সাজ সাড়া পড়িয়া গেল। চাঁদা আদায়ের ধুম লাগিয়া গেল। আশে পাশের দশ-বারখানা গ্রাম হইতে উভয় পক্ষে দশ হাজার টাকা চাঁদা উঠিয়া গেল। যাহারা অসচ্ছলতাহেতু স্কুলের তহবিলে এক পয়সাও চাঁদা দিতে পারেন নাই, নিতান্ত গরীব বলিয়া যাহারা মুষ্টিভিক্ষার দায় হইতেও রেহাই পাইয়াছিল, তাহারাও বাহাসের তহবিলে একটাকা চাঁদা দিয়া ফেলিল।
বাহাসের সমস্ত ঠিক হইয়া গেল।
এই মর্মে শর্তনামা দস্তখত ও রেজিস্টারী হইল : বাহাসের যে পক্ষ হারিবে সদলবলে তাহারা জয়ী পক্ষের মহাব গ্রহণ করিবে।
বিভিন্ন স্থানের উভয় সম্প্রদায়ের বড় বড় মওলানাকে দাওয়াৎ করা হইল। কোন মওলানার নযরানা ও গাড়ি ভাড়া বাবদ কত টাকা খরচ হইবে, তারও একটা বাজেট তৈয়ার হইয়া গেল। ন্যুরানা ও গাড়ি ভাড়ার টাকা অগ্রিম পাঠাইয়া দেওয়া হইল।
সর্বত্র উৎসাহের একটা তুফান বহিতে লাগিল।
প্রথম-প্রথম যাহারা বাহাসের বিরুদ্ধতা করিয়াছিল, শেষদিকে তাহারাও ভীষণ উৎসাহে কর্মক্ষেত্রে নামিয়া পড়িল।
তিন-চার দিন আগে হইতেই উভয় পক্ষের আলেমগণ সদলবলে তশরিফ আনিতে লাগিলেন। গ্রাম বড়-বড় পাগড়িতে ভরিয়া গেল। দেদার পোলাও-কোর্মা চলিতে লাগিল। পোলাও-কোর্মার খুশবুতে গ্রামের দীন-দরিদ্র ক্ষুধাকাতর হতভাগারা বাবুর্চিখানায় উঁকি মারিয়া মারিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়িতে লাগিল।
বিকালের দিকে মওলানারা দলে-দলে গ্রামের রাস্তায় ও মাঠে যখন বেড়াইতে বাহির হইতেন, তখন এই সমস্ত মুজাহেদিনে-ইসলামের সাদা পাগড়ি দেখিয়া মনে হইত জার্মান যুদ্ধের প্রাক্কালে গোরা সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করিতেছে।
নির্ধারিত দিনের সকাল হইতেই প্যান্ডেল রচনা কার্য শুরু হইল। বিরাট শামিয়ানা খাটান হইল। যাত্রা গানের মঞ্চের ন্যায় আসরের মাঝখানে বিরাট মঞ্চ প্রস্তুত হইল। মঞ্চের দুই পাশে দুই সম্প্রদায়ের যথাক্রমে মুনশী মৌলবী, মওলানা ও হযরত মওলানাদের জন্য পদমর্যাদা অনুযায়ী আসন নির্দিষ্ট হইল।
দুই সম্প্রদায়ের গ্রাম্য মাতব্বরদের জন্য সম্মুখ ভাগে দুইটি পৃথক সতরঞ্চি বিছান হইল।
তার পিছনে সর্বসাধারণের বসিবার জন্য চাটাইর উপর ছালার চট দেওয়া হইল।
মোটকথা, মহফিলে ইসলামী শান-শওকতের কোন কমতি হইল না।
