চোখ মুছার পর আবার তিনি ওয়াজ ধরিলেন। বলিলেন : দীনি-এলেম শিক্ষার মাদ্রাসা নষ্ট করিয়া নাসারার ভাষা শিক্ষার স্কুলে সাহায্য করা বহুত গোনার কাজ। ইহা আমার ঘরের কথা নয়- হাদিস কোরআনের কথা।
বিশেষ করিয়া আখেরী জমানায় আরবী শিক্ষার পক্ষে তিনি যেসব যুক্তি দেখাইলেন, তার মধ্যে সর্বপ্রধান যুক্তিটি হইতেছে এই : ইমাম মেহদি ও খানে-দয়ালের নাযিল হইবার আর বিলম্ব নাই! আরবী জানা না থাকিলে ইহাদিগকে চিনিতে পারা যাইবে না। কারণ আরবী ভাষাতেই দলের কপালে ‘কাফের’ এবং ইমাম মেহদির কপালে ‘মোমিন’ লেখা থাকিবে। উহারা কখন আসিয়া পড়েন, তার নিশ্চয়তা নাই। সেজন্য সকলেরই আরবী শিখিয়া সব সময় প্রস্তুত থাকা দরকার।
আর স্কুলের শিক্ষার বিরুদ্ধে মওলানা সাহেব যে সব যুক্তি প্রয়োগ করিলেন, তার মধ্যে সর্বপ্রথম যুক্তি এই : স্কুলসমূহএমন ধর্ম বিরুদ্ধে গাঁজাখোরি গল্পও শিক্ষা দেওয়া হয় যে, দুনিয়াটা গোল এবং তা ঘুরিতেছে। কোরআন-পাকে আল্লাহু-জলুশান সাফ ফরমাইয়াছেন : পৃথিবী ফরাশের মতো চ্যাপটা এবং স্থির। ছেলেবেলা হইতে কোরআনের খেলাফ শিক্ষা দান করিলে ছেলেরা কেন নাস্তিক হইবে না? ইহার জন্য দায়ী ছেলেরা নয় ছেলেদের অভিভাবকরা।
মওলানা সাহেব ওয়াজ খতম করিলেন। সকলে এক বাক্যে তাঁহার ওয়াজের তারিফ করিল।
কিন্তু আসল কাজের কিছু হইল না। গ্রামের মধ্যে একদল তাঁহার সমর্থক জুটিল বটে, কিন্তু মাতব্বরের অধিকাংশ মাইনর স্কুলের দিকে থাকায় মুষ্টি চাউলটা স্কুলের তহবিলে যাইতে থাকিল।
তাই মৌলবী ও মওলানা সাহেব ইসলামের ইজ্জতের জন্য নূতন উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন।
.
তিন
এই অঞ্চলে হানাফী ও মোহাম্মদী উভয় সম্প্রদায়ের বাস। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ-শাদি সমাজ-নমাজ মিলিয়া-মিশিয়া চলিত, কোন কলহবিবাদ ছিল না।
মাদ্রাসাটি যে পাড়ায় ছিল, তা হানাফী পাড়া; স্কুলটি যে পাড়ায় স্থাপিত হইয়াছিল, উহা ছিল মোহাম্মদী পাড়া। স্কুল-কমিটির অধিকাংশ সদস্য হানাফী হইলেও সেক্রেটারি সাহেব। মোহাম্মদী।
নবাগত মওলানা সাহেব কয়েকদিন বিশেষ পর্যবেক্ষণের সহিত এই ব্যাপার লক্ষ্য করিয়া একদিন গোপনে মৌলবী সাহেবকে বলিলেন : আপনার উদ্দেশ্য সফল করতে হলে এখানে মযহাবের সওয়াল তোলা ছাড়া উপায় নাই।
মৌলবী সাহেব মাথা নাড়িয়া বলিলেন : আমি ত্রিশ বৎসর এ গ্রামে বাস করছি; কোন দিন হানাফী-মোহাম্মদী ঝগড়া দেখিনি। কাজেই এদিকে আমার ভরসা হচ্ছে না।
হাসিয়া মওলানা সাহেব বলিলেন : আপনার কিছু করতে হবে না; সব ব্যবস্থা আমি। করব।
ব্যস্ত হইয়া মৌলবী সাহেব বলিলেন : না না ও-কাজে আপনি হাত দেবেন না! শেষে আপনি বেইজ্জতি হবেন।
মওলানা সাহেব অধিকতর উচ্চ স্বরে হাসিয়া বলিলেন : আপনার কোন ভয় নেই। বাহাসের ব্যাপারটা বড়ই আজব। ও-কাজে আমি বিশেষ ওয়াকেফহাল আছি। মুখে মুখে বাহাসের বিরোধী সবাই, ইহাতককে আমি নিজেও লেকেন একবার একটা খোঁচা দিয়ে দিতে পারলে সবাই তাতে নেচে ওঠে। ও কাজে একটা নেশা আছে। আপনি ভাববেন। গ্রামকে গ্রাম যদি আমি নাচিয়ে না তুলতে পারি, তবে আমি বাপের পয়দাই নই।
মৌলবী সাহেব দেখিলেন, মওলানার কথাই সত্য। তিনি নিজে মযহাবি কলহের কথা স্বপ্নেও কল্পনা করেন নাই, অথচ আজ তার সম্ভাবনাতেই তাঁহার প্রাণ আনন্দে নাচিয়া উঠিয়াছে।
মওলানা সাহেব পরের জুমআতেই সুকৌশলে কথাটা পড়িলেন। তিনি বলিলেন ও হযরত নিজে বলে গিয়েছেন, তাঁর উম্মতের মধ্যে তেয়াতুর ফেরকা হবে; তেয়ারের মধ্যে সেরেফ এক ফেরকা বেহশতী, আর বাকি বাহাতুর ফেরকাই দুজখী। এখন সওয়াল এই যে, কোন্ ফেরকা.বেহেশতী?
মওলানা সাহেব জওয়াবের জন্য খানিকক্ষণ অপেক্ষা করিলেন। কিন্তু মুসল্লীদের নিকটই জওয়াব চাওয়া হইতেছে, এ কথা তাহারা কেউ বুঝিতে না পারায় কেউ জওয়াব দিল না। মওলানা সাহেব গর্জন করিয়া বলিলেন : আপনাদের ইমান কি এতই কমজোর? আপনারা যে মযহাবের পা-বন্দ সেই মহাব বেহেশতী কি দুজখী, সে সম্বন্ধে খোলাসা ধারণা আপনাদের নেই?
এইবার মুসল্লীদের-চৈতন্য হইল।
তাহারা বুঝিতে পারিল? প্রশ্ন তাহাদিগকেই করা হইতেছে।
সকলে প্রায় সমস্বরে বলিল : আমাদের মহাবই বরহক।
মওলানা সাহেব খুশি হইয়া বলিলেন : আমাদের মহাব যদি বরহক হয় তবে ঐ পাশের গ্রামের মোহাম্মদীরা দুজখী কি না?
বহু কণ্ঠে আপত্তি উঠিল? মোহাম্মদীদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলবেন না। কে বেহেশতী কে দুখী, সে বিচার করবেন খোদা।
মওলানা সাহেব বলিলেন : আপনারা হাদিস মানেন; সেই হাদিসই খোলাসা বলে দিচ্ছে, এক ফেরকা মাত্র বেহেশতী! এই এক ফেরকা যদি হানাফী মাযহাব হয়, তবে মোহাম্মদীরা বেশক দোযখী। আর যদি মোহাম্মদীরা বেহেশতী ফেরকা হয়, তবে হানাফিরা নিশ্চয় দুখী। আপনাদের এ-ফেরকা ছেড়ে দিয়ে মোহাম্মদী হওয়া উচিত। আর কোন্ ফেরকা বেহেশতী তাতে যদি আপনাদের সন্দেহ থাকে তবে আপনারা মুসলমান নন– আপনাদের কোন বন্দেগি কবুল হয় না। দীন-ইসলামের কথা বহুৎ সহজ কথা; এতে ঘোর-পাঁচ চলে না। এতে দিনকে দিন, রাতকে রাত-বলতেই হবে। না-ইধার না-ওধার এ-রকম মোনাফেকি ইসলাম পছন্দ করে না।
গ্রাম্য অশিক্ষিত সরল-বুদ্ধি লোকেরা এই তর্কের জাল কাটিতে পারিল না। তাহারা দেখিল : মযহাবের সওয়ালটাকে তাহারা এ যাবৎ যতটা সোজা মনে করিয়া আসিতেছিল, বাস্তবিক উহা তত সোজা নয়।
