তরুণের উৎসাহ ঝড়ের আগুন। যে আগুনে দেশের জনসাধারণও জ্বলিয়া উঠিল। তারা উৎসাহে মাতিয়া গেল। আহার-দ্রিা অবহেলিত হইল! দলে-দলে তরুণ বুড়া ‘আল্লাহু আকবার’ বলিয়া ভিক্ষায় বাহির হইল। ধান চাউল পাট কাঠ বাঁশ যে যা দিল, সবই গ্রহণ করিল। নিজেরা তা কাঁধে করিয়া এক ঠাই জড় করিল। সদলবলে জমিদারের বাড়ি ধন্না দিল। জমি আদায় করিল। ধান চাউল পাট বিক্রয় করিয়া সুতার ডাকিল। ঘর উঠিল।
যুবকেরা আবার বাড়ি বাড়ি দাওয়া করিল। ছেলে ধরিয়া আনিয়া এক সরগরম মাইনর স্কুল স্থাপন করিল। শহরে গিয়া স্কুল-পরিদর্শককে ধরিয়া আনিল। মাসে পঞ্চাশ টাকা করিয়া সাহায্য আদায় করিল।
এ সব ঝড়ের বেগেই হইয়া গেল। প্রবীণেরা বুঝিতেই পারিলেন না- কোথা দিয়া কি হইল।
তরুণদের উৎসাহে এবং জনমতের চাপে অবশেষে প্রবীণদের রক্তও উষ্ণ হইয়া উঠিল। মাইনর স্কুলকে কিভাবে হাইস্কুলে পরিণত করা যায় সে সম্বন্ধে কল্পনা-জল্পনা চলিতে লাগিল।
পাশের গ্রামে এক পুকুরপাড়ে অনাদিকাল হইতে একটি খারেজী’ মাদ্রাসা চলিয়া আসিতেছিল।
মৌলবী সাহেবের এলেমের দীর্ঘ-পাশ কতটা ছিল, তার এমতেহান লওয়ার সুযোগ কারো হয় নাই।
কারণ তালেব-এলেমদের পড়ান অপেক্ষা দাওয়াৎ খাওয়াতেই তার অধিক সময় ব্যয়িত হইত। তবু দাওয়াতের নাগাড় মরিত না। কারণ দাওয়াত সংগ্রহ করাই ছিল তালেব-এলেমদের প্রধান কাজ। এ কাজে তাদের উৎসাহ ছিল, কারণ মৌলবী সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও থোড়াবহুৎ রুখসতি মিলিত। আর এ কাজে তাদের দক্ষতাও ছিল যথেষ্ট, কারণ তাদের অধিকাংশেরই এমন বয়স হইয়াছিল যা ছাত্র অপেক্ষা ছাত্রের বাপকেই মানায় ভাল।
যাক, সেটা আসল কথা নয়।
আসল কথা এই যে, ঐ মাদ্রাসার ব্যয়-নির্বাহের জন্য এ-অঞ্চলের অনেকখানি স্থান জুড়িয়া মুষ্টিভিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। মৌলবী সাহেব স্থানীয় মসজিদের ইমাম ছিলেন বলিয়া এবং তাল-বেলেমরা বাড়ি-বাড়ি হাঁটিয়া আদায় করিত বলিয়া, সে মুষ্টি আদায়ে কারও ভুল ক্রটি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। এতদ্ব্যতীত পাটের মওসুমে পাট, ধানের মওসুমে ধানও কিছু আদায় হইত। এতে করিয়া মৌলবী সাহেব মাসে ত্রিশ চল্লিশ টাকা রোজগার করিতেন।
এত কাছে স্কুল স্থাপিত হওয়াতে ছাত্রের দিক দিয়া এই মাদ্রাসার ক্ষতি হওয়ার কোন সম্ভাবনা না থাকিলেও আসল জায়গায় ক্ষতি হইল- মুষ্টি চাউলের আয় আক্রান্ত হইল। মৌলবী সাহেব ইহার যথাসাধ্য প্রতিবাদ করিলেন। কিন্তু গ্রামবাসী অধিকাংশের মত অনুসারে মাইনর স্কুলের তহবিলেই মুষ্টি চাউল দেওয়া হইতে লাগিল।
.
দুই
হঠাৎ সেই গ্রামে একজন জবরদস্ত আলেমের উদয় হইল। মাদ্রাসার মৌলবী সাহেব নবাগত আলেম সাহেবকে লইয়া বাড়ি বাড়ি দাওয়াত খাইতে লাগিলেন। তাঁকে মওলানা সাহেব’ বলিয়া সকলের নিকট পরিচিত করিয়া দিলেন।
মওলানা সাহেব শরা-শরিয়ৎ সম্বন্ধে ওয়াজ করিতে লাগিলেন। গ্রামের লোক অল্পদিনেই তাঁর লিয়াকতে আকৃষ্ট এবং ব্যবহারে মুগ্ধ হইল।
সকলেই যখন তাহাকে একজন বড়দরের আলেম বলিয়া বুঝিয়া ফেলিল ও তখন তিনি একদিন এক ওয়াজের মজলিসে অন্যান্য কথার পর বলিলেন : খোদার ফলে এ গ্রামের সকলেরই অবস্থা ভাল, অথচ দিনী এলেম শিক্ষার জন্য এখানে কোন মাদ্রাসা নাই; ইহা বড়ই আফসোসের কথা। এই প্রসঙ্গে খারেজী মাদ্রাসার কথা উঠিল। মওলানা সাহেব বলিলেন : বড়ই দুঃখের কথা, বেশুমার আফসোসের কথা, যেখানে খোদা-রসূলের এলেম শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই মাদ্রাসার সাহায্য বন্ধ করিয়া, যেখানে বেদীন নাসারার ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়, যেখানে ছেলেদের ঈমান-আমান খাওয়ার কায়দা বালান হয়, হাযেরানে মজলিস কিনা সেই স্কুলে যাহায্য দিতেছেন।
ওয়াজের মহফেল বেশ বড়ই ছিল।
শ্ৰোতৃগণের কেহ কেহ এই প্রসঙ্গে কোন কথা বলিতে মওলানা সাহেবকে বারণ করিলেন।
মওলানা সাহেব গলা ভারী করিয়া বলিলেন : খোদার দীনের ইযযতের জন্য আমি তারই হুকুম তামিল করতে যাচ্ছিলাম, ওতে আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ নাই। আপনাদেরই আখেরাতের নেকবিদি ওর উপর নির্ভর করছে। আপনারা যদি না হককথা শুনতে চান, আমি জোর করে তা বলতে চাই না।
সভাস্থ দুই একজন খুব জোরে চিৎকার করিয়া বলিল : মওলানা সাহেব, আপনি বলুন। এ বিষয়ে আপনাদের কর্তব্য কি তা আমরা জানতে চাই।
তখন মওলানা সাহেব খুব ওজস্বিনী সুরে হাদিস শরীফ হইতে বহু রেওয়ায়েৎ বয়ান করিয়া যা বলিলেন, ‘লেকেন’, ‘মগর’, ‘ইয়ানে’ ও ‘ওগায়রা’ গুলি বাদ দিলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় : কেয়ামতের দিকে এমন এক যমানা আসিবে, যখন লোক আখেরাতের চিন্তা ছাড়িয়া কেবল দুনিয়াবী খেয়ালে মশগুল থাকিবে। খোদাকে ছাড়িয়া বনি-আদম ধন দওলতের এবাদত করিবে। মাদ্রাসা ভাঙ্গিয়া সেই জায়গায় স্কুল করিবে। মসজিদ ভাঙ্গিয়া
সে স্থলে তোক মদের দোকান খুলিবে। এই গ্রামের অবস্থা দেখিয়া মওলানা সাহেবের মনে হইতেছে, বুঝি বা সেদিন আসিয়া পড়িয়াছে। তিনি কেয়ামতের সমস্ত আলামত বয়ান করিয়া প্রমাণ করিলেন যে, খানে-দয়াল আসিবার আর অধিক দিন বাকি নাই। তার আগমনে মোমিন-মুসলমান ভাইদের উপর কি জুলুম-সেতম হইবে, ইসলামের কি বেইযতি হইবে, কাতর কণ্ঠে তার বিস্তারিত বয়ান করিতে করিতে মওলানা সাহেব চাওগার দামনে চোখ মুছিলেন। দেখাদেখি শ্লোতৃমণ্ডলির অনেকের চোখ ছলছল হইয়া উঠিল।
