ভদ্রলোক উচ্চস্বরে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন।
আমি বিরক্তিভরে লোকটার হাসি থামিবার অপেক্ষায় অন্যদিকে মুখ ফিরাই! রহিলাম। অবশেষে হাসি থামাইয়া তিনি বলিলেন : আপনার যে পরিচয় পেয়েছি, তাতে আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জন্মেছে। আপনি আমার কেবল ‘ব্রাদার-ইন-ল’ নন, আপনি আমার ধর্মের ভাই। আপনার নিকট আসল কথা আর গোপন রাখব না। আমি পুলিশের মি-আই-ডি বিভাগের লোক। এই বেটাদের মুখে দিনরাত বিদ্রোহের বুলি শুনে শুনে আমাদেরও প্রথমটা মনে হয়েছিল, চাই কি এরা ইংরাজের সাম্রাজ্যই চুরমার করে দেয়। তাই বড় মুখে বড় সাহেবের কাছে এদের সম্বন্ধে এত্তেলা নিয়েছিলাম এবং একটা বড় রকমের খানাতল্লাশেরও যোগাড় করে ফেলেছিলাম। আশা করেছিলাম, এতবড় একটা কেসের আশকারা করছি বলে ডবল প্রমোশনও একটা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সন্ধান নিয়ে দেখি কি, ওদের একটা বেটার মধ্যে রিভোলিউশনারি স্পিরিট নেই–সব বেটাই গর্দভ। বন্ধুরা বললে? ঐ গর্দভদের ধরিয়ে দিলে বড় সাহেব রাগ করবেন, চাই কি আমার চাকুরিও যেতে পারে। তাই দু’চার জন সত্যিকার রিভোলিউশনারিকে ঐ দলে ঢুকবার জন্য কিছুদিন আমাকে ঢাকা-কোলকাতা ছুটাছুটি করতে হয়েছে। এখন খোদার ফজলে আমি বেঁচে গিয়েছি। বড় সাহেব ইনকোয়ারির আদেশ না দিয়েই রিটায়ার করে গেছেন। আপনাকে বৃথা তকলিফ দিলাম। মাফ করবেন। আসসালামু আলায়কুম।
–বলিয়া ভদ্রলোক হন হন করিয়া চলিয়া গেলেন। আমি ক্রোধে ফুলিয়া উঠিয়াছিলাম! লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়িয়া বলিলাম : বেটা ‘ব্রাদার-ইন-ল’।
বাসায় ফিরিয়া আফতাবকে সব খুলিয়া বলিলাম। সে সি-আই-ডির উদ্দেশ্যে কটুক্তি করিয়াই চুপ করিয়া গেল।
আফতাব কথাটা কিভাবে দলে রিপোর্ট করিয়াছিল জানি না। দেখলাম ও দলের সবাই আমাকে এড়াইয়া চলিতে চাহিতেছেন।
সরদার আমাকে বলিলেন : তোমাকে আমরা প্রথমেই জানিয়েছি, বিশ্ব-মানবতাই আমাদের আদর্শ। এতদিনেও যদি তোমার মন থেকে সংকীর্ণ জাতি-বিদ্বেষ দূর হয়ে না থাকে, তবে তোমার আর আশা নেই।
আরেকদিন আড্ডার দ্বারে পা দিয়াই শুনিতে পাইলাম, সরদার বলিতেছেন : লোকটাকে আজই বিদেয় করে দাও। আর ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সাহেবের কাছে এখনই এই মর্মে দু’খানা পত্র লিখে দাও যে, বিশ্বমানবতাই আমাদের আদর্শ, সোশিয়্যাল রিফর্মই তোমাদের কর্মপদ্ধতি, আর রাজ-ভক্তি প্রচারই আমাদের জীবনের ব্রত, বৃটিশ সাম্রাজ্যের জন্য আমরা প্রাণ দিতে পারি। আর শোন, লিখে দাও যে আমাদের সভাপতির মামাত ভাই গত মহাযুদ্ধে সাম্রাজ্যের জন্য প্রাণ দিয়েছেন!
আমি একটু দেরি করিয়া ঘরে প্রবেশ করিলাম।
সরদারই প্রথম কথা বলিলেন : তোমার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করে গতানুগতিকতার প্রশ্রয় দিতে চাই নে। নইলে তোমাকে ‘আপনি’ এবং ‘জনাব’ বলে জানিয়ে দিতুম–আপনার সঙ্গে আমাদের আর সম্বন্ধ নেই। আশা করি, এতেই তুমি বুঝতে পাচ্ছ, কাল থেকে আর তোমার এখানে আসার দরকার নেই! এখনই তোমাকে বিদেয় করলে রাগ প্রকাশ করা হবে। রাগ একটা প্রথা, একটা গতানুগতিকতা। আমরা যে তোমার উপর রাগ করিনি, এখনি তার প্রমাণ দিচ্ছি। ওরে কে আছিস, এক কাপ চা নিয়ে আয় ত।
এত ক্রোধেও আমার হাসি পাইল। আমি হাসিয়া বলিলাম : চা যে দিবেন আমি আজ ত চিনি আনিনি।
সরদার বলিলেন : আত্মার দৈন্য! বেচারা সংস্কারমুক্ত হতে পারেনি। ওহে তোমরা কেউ যদি চিনি এনে থাক, চুপে-চুপে ওকে খানিকটা দিয়ে দাও।
আমি হাসিয়া বলিলাম : না ‘ব্রাদার-ইন-ল’, আমার চার দরকার নেই আমি আসি।
কিন্তু উঠিলাম না। পুলিশ সাহেব ও ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট লিখিত পত্রদ্বয়ের অবস্থা জানিবার জন্য বসিয়া রহিলাম।
আমার সরিবার কোন গতিক না দেখিয়া সরদার হুকুম করিলেন : আমার সেই জরুরী পত্র দু’খানা কি ডাকে দেওয়া হয়েছে? না হয়ে থাকলে জলদি পাঠিয়ে দাও।
বলিয়া তিনি জনৈক সদস্যের দিকে ইংতি করিলেন।
খানিক পরেই চাকর পত্র দু’খানা লইয়া সাইকেলে বাহির হইয়া গেল।
সুতরাং আমিও উঠিবার আয়োজন করিলাম।
এমন সময় হঠাৎ পত্র-বাহক চাকরটা ছুটিয়া আসিয়া হাঁপাইতে-হাঁপাইতে বলিল : এই দিকে একপাল পুলিশ আসছে দেখে এলুম।
সবাই একসঙ্গে চিৎকার করিয়া উঠিলেন? তবেই হয়েছে, শালার পুলিশ আসছে আমাদের গ্রেফতার করতে!
–বলিয়া সবাই ছুটাছুটি করিয়া পালাইতে লাগিলেন।
সরদার চিৎকার করিয়া বলিলেন : ‘ব্রাদার-ইন-ল’ তোমরা গতানুগতিক উপায়ে পালিও না; আত্মরক্ষার চিরন্তন সত্যকে স্বীকার করতে গিয়ে তোমরা অপবিত্র প্রথার প্রশ্রয় নিয়ে আমাদের সংঘের উদ্দেশ্যের অপমান করো না।
–বলিয়া তিনি সম্পূর্ণ অভিনব ধরনের পদক্ষেপ করিয়া নিতান্ত অসাধারণ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সর্বাগ্রে প্রাচীর টপক-ইয়া সৃটকিয়া পড়িলেন! সকলে তাহাকে অনুসরণ করিলেন।
আমি বিদ্রোহী বীরদের কাণ্ডকারখানা দেখিয়া বহুক্ষণ স্তম্ভিত হইয়া রহিলাম। তারপর যখন বাহিরে আসিলাম, তখন রমনার ময়দান নির্জাতায় খা খা করিতেছে!
মুজাহেদিন
প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সংগঠনের ঢেউ উঠিয়াছে। ও-পাড়ার ব্রাহ্মণ-বৈদ্য সবাই মিলিয়া শুদ্রদের জলগ্রহণ করিবার জন্য দৃঢ়-সংকল্প হইয়াছে।
দেখাদেখি এ-পাড়ার মুসলমান যুবকদের মধ্যেও উৎসাহের বান ডাকিয়াছে। তারা ফুটবল ও তাশ খেলা ছাড়িয়া দিন-রাত সভা-সমিতি করিতেছে, তনযিম কমিটি গঠন করিতেছে, আখড়া স্থাপন করিতেছে, লাঠি ভাজিতেছে, ‘বেদে’ ‘হাজাম’ প্রভৃতি ‘অস্পৃশ্য’ মুসলমানদিগকে সমাজে গ্রহণ করিবার কথা প্রবীণদিগের নিকট পাড়িবার পরামর্শও করিতেছে।
