এই পর্যন্ত বলিতেই সভায় শোরগোল উঠিলঃ সরদার ‘ব্রাদার-ইন-ল’র বক্তৃতা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। বেশি কথা আমরা শুনব না।
সরদার বলিলেন : ‘ব্রাদার-ইন-ল’গণ, তোমাদের বিদ্রোহের ভাবে আমি গর্ববোধ করছি। আমি আমার বক্তৃতা আর দীর্ঘ করব না। এই নতুন ‘ব্রাদার-ইন-ল’কে আমাদের আদর্শ বুঝাতে গিয়েই আমাকে এত কথা বলতে হয়েছে। সবাই একে ‘ব্রাদার-ইন-ল’ বল।
সকলে সমস্বরে চিৎকার করিল ও ‘ব্রাদার-ইন-ল’।
সরদার আমাকে বলিলেন : ‘ব্রাদার-ইন-ল’।
আমি বলিলাম : ‘ব্রাদার-ইন-ল’।
সরদার বলিলেন : ব্যাস, দীক্ষা কার্যকর হয়ে গেল।
.
চার
দীক্ষা পাইয়া আমি বলিলাম ও আমার গুটিকতক প্রশ্ন করবার আছে।
সরদার বলিলেন : বল।
আমি বলিলাম : ইংরাজ তাড়াবার আপনারা কদুর কি করেছেন?
সরদার একটু চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। বলিলেন : ইংরাজ তাড়ান মানে কি?
আমি বলিলাম : আপনাদের বিদ্রোহ ইংরাজের বিরুদ্ধে ত?
সরদার সমস্ত সদস্যের দিকে একবার চক্ষু ফিরাইয়া লইয়া বলিলেন : কেবল ইংরাজ কেন? বিধি-নিষেধের বেড়াজালে আটকিয়ে যারা মানুষের আত্মাকে খর্ব করছে, তাদের সবারই বিরুদ্ধে আমাদের বিদ্রোহ।
আমি বলিলাম ও ইংরাজ জাতি আজ বিধি-নিষেধের নিগড়ে ভারতের ত্রিশ কোটি লোকের হাত-পা বেঁধে রেখেছে। ওদের এদেশ থেকে তাড়াতে পারলে তবেই এই ত্রিশ কোটি লোকের মুক্তি হবে, এটা কি আপনারা মনে করছেন না?
সরদার বলিলেন : নিশ্চয়, নিশ্চয়। কিন্তু ইংরাজ আমাদের হাত-পাই বেঁধে রেখেছে, আত্মাতো বাধে নি। আমাদের স্কুল দেহই ইংরাজের অধীন, আমাদের সূক্ষ্ম দেহের উপর তাদের কোন হাত নেই। যত সব বিধি-নিষেধই আমাদের সূক্ষ্ম দেহকে বন্ধনের অধীন করে রেখেছে। সে জন্য ইংরাজের চেয়ে আমাদের বড় শত্রু এই সমস্ত কুসংস্কারপূর্ণ বিধি-নিষেধ। এ সমস্ত নিগড় না ভাঙলে সভ্যতার পথে আমাদের পথ চলা অব্যাহত হবে না। বিধি-নিষেধের বন্ধনের চাইতে তুমি যে ইংরাজের বাধনকেই বড় করে দেখেছ, এতে করে তুমি মানুষের দেহকে আত্মার উপর স্থান দিচ্ছ।
আমি উষ্ণ হইয়া বলিলাম : জালিয়ানওয়ালাবাগ, চরমনাইর, কুলকাঠি প্রভৃতি স্থানে যেভাবে মানুষকে কীট-পতঙ্গের মতো পিষে মারা হয়েছে, দেশবাসীর সাধারণ নাগরিকের অধিকার যেভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে, এ সকলকে কি আপনারা আমাদের আত্ম-বিকাশের পরিপন্থী মনে করেন না?
সরদার কোন কথা বলিবার আগেই সকলে চিৎকার করিয়া উঠিলেন? এ সবই চিন্তার দৈন্য; বুদ্ধির দাসত্ব। নতুন ‘ব্রাদার-ইন-ল’ আজও সংস্কারমুক্ত হতে পারেনি।
সরদার বলিলেন : শুনলে ত? তুমি আজো সংস্কারমুক্ত হতে পারনি। এ-সব তোমার জাতি-বিদ্বেষ-রেশিয়াল হ্যাঁট্রেড, ১৫৩-ক ধারার অপরাধ। সমস্ত বিষয় বিশ্ব মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখো৷ ইংরাজের অত্যাচারে এবং ভারতবাসীর অত্যাচারে মূলত কোন পার্থক্য নেই। এই সমস্ত তুচ্ছ অজুহাতে যারা জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছে, তারা সংকীর্ণ সংস্কারের দাস, বিশ্ব-মানবতার শত্রু।
আমি মনে মনে এই সমস্ত যুক্তির সারবত্তা স্বীকার করিয়া বলিলাম : আমি শুধু অত্যাচারের কথাই বলছি না। ইংরাজদের আমাদের দেশ শাসন করার কি অধিকার আছে?
সরদার হাসিয়া বলিলেন : এ সমস্তই পূর্ব-সংস্কার। ‘ইংরাজ জাতি’ ‘ভারতবাসী’ এ সবই বিশ্ব-মানবতার পরিপন্থী গণ্ডি-সংস্কার। বিশ্ব-মানবতা যাদের আদর্শ তাদের মধ্য ইংরাজ-বাঙালি-তুর্কীতে কোন ভেদজ্ঞান নাই। আর দেশ শাসনের কথা যে বলছ, দেশ শাসন কি আর সবাই করে। কতিপয় নির্দিষ্ট লোকই দেশের শাসনযন্ত্র পরিচালনা করে। এই নির্দিষ্ট কতিপয় কোন জাতের লোক তা যারা দেখে, তাদের দৃষ্টি সম্প্রসারিত হয়নি, তারা গতানুগতিকতার প্রভাব এড়াতে পারেনি, তারা প্রথা ও সংস্কারমুক্ত হতে পারেনি। আশা করি আমাদের দলের শিক্ষায় তোমার দৃষ্টি উন্নত হবে। আজকার সভার কাজ এখানে শেষ করা যাক। ‘ব্রাদার-ইন-ল’গণ তোমরা এবার ‘ওপেনিং সংটা’ গাও ত।
সকলে ডেমোক্রেটিক সংগীত আরম্ভ করিলেন।
আমরা বধির হইবার উপক্রম হইলেও কোন রকমে চোখ কান বুজি বসি রহিলাম।
.
পাঁচ
বিদ্রোহীদলের কাজ-কর্ম দেখিয়া আমি একরূপ নিরাশই হইয়া গিয়াছিল।
তবু কিন্তু দুইটি কারণে আমি ঢাকায় থাকিয়া গেলাম এবং বিদ্রোহীদলের বৈঠকে যোগদান করিতে লাগিলাম। প্রথম কারণ, আমার উত্তেজনা অনেকখানি কমিয়া যাওয়ায় এখন কি করা যায়, সে সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা; দ্বিতীয় কারণ, বিদ্রোহীদল হয়ত নতুন বলিয়া আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিতেছে না, এই সন্দেহে।
কিন্তু সপ্তাহকাল থাকিয়াও বিদ্রোহীদলের অস্ত্রের আড়ার কোন সন্ধান পাইলাম না। বিদ্রোহীদলের উপর রাগ হওয়া সত্ত্বেও কার্যান্তর না থাকায় উহাদের সহিত সম্পর্কচ্ছেদও করিলাম না।
একদিন রমনার মাঠে লেকের ধারে বসিয়া আকাশ-পাতাল ভাবিতেছি, এমন আমার কলিকাতার গড়ের মাঠে বন্ধু আসিয়া হাজির। আমি বিস্ময়ে দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিলাম : কি ‘ব্রাদার-ইন-ল’ আপনি এখানে? কোলকাতা থেকে কবে এসেছেন? দলে ত আপনাকে দেখতে পাওয়া যায় না।
বন্ধু হাসিয়া বলিলেন : বেশ ত এরই মধ্যে দলের সম্বোধনটা আয়ত্ত করে ফেলেছেন। তা, আছেন কেমন? দল লাগছে কেমন? এই বলিয়া তিনি আবার হাসিলেন।
আমি রাগতস্বরে বলিলাম : খুব বিদ্রোহীদলে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। বলুন ত সাব, আপনার মতলবখানা কি? রাগ করবেন না, আপনাকে আমার সত্যি সত্যি ‘ব্রাদার-ইন-ল’ ডাকতে ইচ্ছে হচ্ছে।
