আমি মনে মনে স্বীকার করিলাম। আমি সত্যই সংস্কারমুক্ত নই।
.
তিন
আমরা ঘরে প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম : সকলেই হা করিয়া চিৎকার করিতেছেন। কেহ হারমনিয়মে, কেহ বলে, কেহবা তদভাবে পাশে বসা বন্ধুর পিঠে হাত চালাইতেছেন। কেহ কথা বলিতেছেন এবং কেহ গান গাইতেছেন নিশ্চয়ই; কিন্তু কে কোন কাজ করিতেছেন, সে সম্বন্ধে নির্ভুল উক্তি করিবার কোনও উপায় নাই।
আফতাবের পিছনে আমাকে দেখিয়া প্রায় সকলেই আমার দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। আমি ঘরে প্রবেশ করিয়াই অভ্যাসবশত ‘আসসালামু আলায়কুম’ বলিলাম। অমনি, সকলে সমস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিলেন? কে এ প্রথার দাস, সংস্কারের গোলাম, আমাদের দলের পবিত্রতা নষ্ট করছে?
আফতাব আমার কানে-কানে বলিল : ভুল করেছ। এখানে সালাম আদাবের নিয়ম নাই। ওটা একটা প্রথা।
তারপর সে অন্যান্য সকলের ন্যায় চিৎকার করিয়া বলিল? আপনারা অস্থির হবেন না, নতুন লোক। ইনি আমার বন্ধু, আমাদের দলে দীক্ষা নেবার জন্য আজ নতুন এখানে এসেছেন।
সকলে শান্ত হইলেন অর্থাৎ আগের ন্যায় গোলমাল আরম্ভ করিলেন।
আমাকে লইয়া আক্তাব একপাশে বসিয়া পড়িল! আমার সামনে লজ্জাবশতই হোক, কিম্বা অন্য কোন কারণেই হোক, আফতাব সদস্যদের ‘গানে যোগ দিল না।
আমিও অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিলাম। কিন্তু আমার বুদ্ধি-বিবেচনা ছিল। আমি মনে করিলাম : হাজার হোক বিদ্রোহের পথে ইহাদের তুলনায় আমি নতুন পথিক; কাজেই ইহাদের কার্যের গূঢ় তাৎপর্য বুঝিতে হয়ত আমার একটু দেরি হইতেছে।
নতুন করিয়া ইহাদের প্রতি শ্রদ্ধার সঞ্চার হইল। মনোযোগ দিয়া ইহাদের কার্যাদি লক্ষ্য করিতে লাগিলাম।
এক ভদ্রলোক ‘গণ্ডগোল আরম্ভ করুন’ ‘গণ্ডগোল আরম্ভ করুন’ বলিয়া তিন-চার বার চিৎকার করিলে সকলে নীরব হইলেন। আফতাব আমার কানের কাছে বলিল : সরদার খুব বড় উকিল।
সরদার দাঁড়াইয়া বলিলেন : ‘ব্রাদার-ইন-ল’গণ (বিস্ময়ে আমি আফতাবের মুখের দিকে চাহিলাম, সে মুখে আঙ্গুল দিয়া আমাকে নীরব থাকিতে ইংগিত করিল) আমাদের আজিকার দরবারে কনক্লডি সং’ শেষ হয়েছে। এখন চা খেয়ে সবার কাজ আরম্ভ করা যাক। ‘ব্রাদার-ইন-ল’ আফতাবের মুখে তোমরা শুনেছ, আজ এক নতুন ‘ব্রাদার-ইন-ল’ আমাদের দলে দীক্ষা নিতে এসেছে; সুতরাং আজকে চা খাওয়ায় তোমরা পুরোপুরিভাবে প্রথা ও সংস্কার মুক্ত হয়ে চলবে, এই আমার কড়া হুকুম।
সকলে সমস্বরে চিৎকার করিলেন : চা।
অমনি জনৈক চাকর চা দিয়া যাইতে লাগিল। কেহ কাহারও অপেক্ষা না করিয়া চা খাইতে লাগিলেন। লক্ষ্য করিলাম : সকলেই পকেট হইতে মুঠ ভরিয়া চিনি মুখে দিয়া তারপর পিয়ালায় চুমুক দিতেছেন, মুখের চিনি ফুরাইয়া গেলে আরেক মুঠা মুখে দিতেছেন। এইভাবে সবাই চা পান করিলেন। আমিও করিলাম।
চা খাওয়ার পর সরদারের হুকুমে আমাকে তাঁহার নিকট লইয়া যাওয়া হইল। তিনি আমাকে পাশে দাঁড় করাইয়া বলিলেন : ‘ব্রাদার-ইন-ল’ আমাদের মতে দীক্ষা নিতে কোন আচার, প্রথা বা অনুষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না; কাজেই এখানে বাইয়াৎ পড়া বা মাথা মুড়ানোর দরকার নেই, পাগড়ি বা শালগ্রাম শিলারও আবশ্যকতা নেই। আমাদের আদর্শ কাজে পরিণত করতে যারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছেন, তাঁরাই আমাদের ‘ব্রাদার-ইন-ল’। তুমি আমাদের দলে ভর্তি হচ্ছ, সুতরাং তোমার সঙ্গে ভদ্রতা করে আমি গতানুগতিকতার প্রশ্রয় দিতে চাই না। আমাদের মটো তোমার মুখস্থ হয়েছে ত?
আমি অপ্রস্তুত হইয়া বলিলাম : জি না, আপনার দলের মটো ত আমার জানা নেই।
সরদার প্রবোধ দিয়া বলিলেন : আচ্ছা, আচ্ছা। দু’চার দিন চেষ্টা করলেই মুখস্থ হয়ে যাবে। ওই দেখ।
–বলিয়া তিনি চারিদিককার দেওয়ালে অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন। আমি দেখিলাম, দেওয়ালের বিভিন্নস্থানে বড় বড় হরফে লেখা আছে?
মোরা, অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
মোরা দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম-কানুন শৃঙ্খল!
মোরা ভীম ভাসমান মাইন,
মোরা মানিনাকো কোন আইন।
মোরা বিদ্রোহী বীর,
মোরা চির-উন্নত শির।
বল বীর!
আমি চারিদিকে চোখ ফিরাইলাম : সরদার বলিলেন : যত অনিষ্টের মূল এই আইন। যেদিকে কান পাত, যেদিকে চোখ ফেরাও কেবল নিয়ম-কানুন, আইন-শৃঙ্খলা, প্রথা সংস্কার, ল’ এ অর্ডার। এইসব আইন-শৃঙখলার বন্ধনের জন্যই মানুষের আত্মা মুক্তি পাচ্ছে না। এই সমস্ত বিধি-নিষেধের চাপে মানুষের আত্মা নুয়ে পড়ছে। মানুষের কল্যাণ করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন আত্মার মুক্তি। আত্মার মুক্তি সাধন করতে হলে সমস্ত। আইন-কানুনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে, সমস্ত বিধি নিষেধের বন্ধন পদাঘাতে ছিন্ন করতে হবে। এই আইন-কানুনের দোহাই দিয়ে, বিধি নিষেধের ছুতা করে, কত লোক অপর সহস্র লোককে দাস করে রেখেছে, তাদের মুক্তির পথ আগলে বসে আছে। এই। আইন-কানুন বিধি-নিষেধের বেড়ি ভাঙাই আমাদের জীবনের ব্রত। এজন্য আমরা প্রাণপাত করতে প্রস্তুত। আমরা নিজেরা কোনও আইন-শৃঙ্খলা বা বিধি-নিষেধ মানি না। সমস্ত গুতানুগতিকতা বিসর্জন দিয়ে চলি। ওই যে দেখছ, দেওয়ালের লেখা আছে : Spitting liberally allowed (যত ইচ্ছা থুথু ফেল), Simoking strictly prohibited (ধূমপান একেবারে নিষিদ্ধ)-ওর গূঢ় তাৎপর্য অবশ্য তুমি বুঝছ। এ ঘরের ভেতর থুথু কেউ ফেলবে না বটে, কিন্তু সে সম্বন্ধে কোনও বাধ্যবাধকতা থাকলে। সদস্যদের মনে বিধি-নিষেধের দাসত্ব বর্ধিত হবে এবং তাতে করে তাদের আত্মার মুক্তি অসম্ভব হয়ে পড়বে। বরঞ্চ এই যে থুথু ফেলবার অবাধ অধিকার দেওয়া সত্ত্বেও এরা কেউ থুথু ফেলছে না, এতে কি তাদের মুক্ত বুদ্ধিই সূচিত হচ্ছে না? আর ঐ স্মোকিং-এর কথা। ওই বড় বড় অক্ষরের নিষেধ বাক্য চোখের সামনে নিয়েও যে সদস্যরা বেদম ধুমপান করছে, এতে করে কি তাদের মধ্যে একটা বিদ্রোহের ভাবই কর্ষিত হচ্ছে না? তুমি লক্ষ্য করেছ, আমাদের দলের সদস্যরা চুপ করতে বললে গণ্ডগোল করে আর গণ্ডগোল করতে বললে চুপ করে। সদস্যদের মধ্যে বিদ্রোহের ভাব কর্ষণ করার জন্যই এরূপ করা হয়ে থাকে। আমি সরদার বলে সদস্যরা যে আমার কথামত চলে, তা তুমি মনে করো না। এই যে চা খাওয়ার সময়, বিশেষ করে আজকার দিনটায়, চাতে চিনি খেতে বারণ। করেছিলাম, তার উত্তরে সবাই যে আজ বেশি করে চিনি খেল, তাতে আমি বড়ই আনন্দিত হয়েছি। আমরা কেউ ছোট-বড় নই, সবাই আমরা সমান। আমরা জীবনের সর্বত্র ডিমোক্রেসি প্রবর্তনের পক্ষপাতী। তুমি লক্ষ্য করেছ, সংগীতেও আমরা ডিমোক্রেসি প্রবর্তন করেছি। একজন গান করবে আর সবাই শুনবে, এ ছিল গত যুগের মনাকিকাল সিস্টেম-অব-সং। আমরা সমস্ত মনাকির উচ্ছেদ করতে চাই। সকলের যে গান গাওয়ার। অধিকার আছে, মানুষের এই চিরন্তন জন্মগত অধিকার আমরা মেনে নিয়েছি। কিন্তু এই ডিমোক্রেসি প্রবর্তন করতে গিয়েও আমরা প্রথা ও গতানুগতিকার কবলে পড়িনি। আমরা পরস্পরকে সমান মনে করি বটে, কিন্তু সম্বোধন করবার বেল; ‘ভাই’ ‘ব্রাদার’ বলে। গতানুগতিকার প্রশ্রয় দিই না।
