ভদ্রলোকের সহিত করমর্দন করিয়া বিদায় হইলাম এবং পরদিন ঢাকার মেলে চড়িয়া বসিলাম।
.
দুই
সরকারি চাকুরিয়াদের আমি দুই চক্ষে দেখিতে পারিতাম না। কাজেই অন্য কোন বন্ধু থাকিলে আমি আমার পুরাতন বন্ধু সরকারি স্কুলের শিক্ষক আব হোসেনের বাসায় উঠিতাম না।
অনেকদিন পরে আফতাব হোসেন আমাকে পাইয়া খুব আদর-অভ্যর্থনা করিল। আমি আমার উদ্দেশ্যের কথা গোপন রাখিলাম। কারণ তাহার খাইয়া তাহাদেরই বিরুদ্ধে যড়ন্ত্র করিতে চাই, একথা তাহার নিকট বলিতে কেমন বাধ-বাধ ঠেকিল। আফতাব ও কোন কথা জিজ্ঞাস করিল না।
আমি গোপনে বিদ্রোহী সংঘের আড্ডার ঠিকানা যোগাড় করিলাম। শুনিলাম : রবিবার দিন দুপুরে এবং অন্যান্য দিন সন্ধ্যার পর সংঘের বৈঠক বসে।
সেদিন রবিবার। স্থির করিলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর আফতাব যখন তার সহধর্মিণীকে লইয়া বিশ্রাম করিবে, সেই ফাঁকে আমি বাহির হইয়া পড়িব।
কিন্তু সেদিকে আফতাবের মোটেই গা দেখা গেল না। সে খাওয়া-দাওয়া শেষ করিয়া তাহাদের ক্লাবে যাইতে আমাকে চাপিয়া ধরিল। আমি মাথা ফাঁইবার অনেক চেষ্টা করিলাম। কিন্তু সে ছাড়িল না। অগত্যা আমি জিজ্ঞাসা করিলাম ও তোমাদের ক্লাব কোথায়?
সে যে-ঠিকানা বলিল, তা শুনিয়া আমি চিৎকার করিয়া বলিলাম : সে যে বিদ্রোহীদের আচ্ছা!
আফতাব হাসিয়া বলিল : লোকে তাই বলে বটে!
আমি ঢোক গিলিয়া বলিলাম : তুমি বিদ্রোহী-দলভুক্ত? তুমি যে সরকারি চাকুরে!
আফতাব আরও হাসিতে লাগিল। বলিল : কেন সরকারি চাকুরেরা কি মানুষ নয়?
উভয়ে রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িলাম। যে বিদ্রোহী দলের লোক গবর্নমেন্টের কাজে পর্যন্ত ঢুকিয়াছে সে-দল কত শক্তিশালী, তা ভাবিয়া পুলকে আমার রোমাঞ্চ হইল! কল্পনা নেত্রে দেখিতে লাগিলাম; আমি টোটর্থ সাহেবের জায়গায় কলিকাতায় কমিশনার হইয়া বসিয়াছি, আর জেম্স সাহেব আমার নিকট চাকুরির উমেদারি করিতে আসিয়াছে, আমার আরদালি আমার হুকুমে জেমসকে বারান্দার খুটির সঙ্গে বাঁধিয়া জুতা-পেটা করিতেছে, আর সেই কুষ্ঠ-মুখো সার্জেন্টটা? অত তাড়াতাড়ি সে বেটার উপযুক্ত শাস্তি কল্পনা করিয়া উঠিতে পারিলাম না। যথা সময়ের জন্য সে ভাবনা রাখিয়া দিলাম। শুভদিনের আরামের গরম হাওয়া আমার গাত্র স্পর্শ করিল।
আমি খোদার উদ্দেশ্যে মাথা নত করিলাম।
পথে যাইতে যাইতে আফতাব এক মুদি দোকান হইতে দু’পয়সার দু’পুরিয়া চিনি কিনিয়া এক পুরিয়া আমাকে দিল এবং অপরটি নিজের পকেটে রাখিল।
আমি বিস্ময়ে বলিলাম : চিনি দিয়ে কি হবে?
আফতাব বলিল : আমাদের দলের প্রধান উদ্দেশ্য প্রথা ও সংস্কারের দাসত্ব থেকে মানুষের মানসিক মুক্তি সাধন।
আমি বলিলাম : সাধু উদ্দেশ্য। এই ত চাই। কিন্তু এর সঙ্গে চিনি কেনার সম্বন্ধটা কি, স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না।
আফতাব গভীরভাবে বলিল : আমাদের ক্লাবে চা খাওয়া হয়ে থাকে; তাই বলে চা খাওয়ার নিয়ম আছে, একথা বলতে পার না। কারণ কোন নিয়ম-কানুন আমরা মানি না। নিয়ম-কানুন, আইন-শৃঙ্খলা ও বিধি-নিষেধ নামে মানুষের আত্মার স্বাধীনতার পরিপন্থী। যেসব গতানুগতিকতা আছে, এসব পদদলিত করাই আমাদের সংঘের উদ্দেশ্য।
আমি বলিলাম ও এর সঙ্গে চা খাওরার সম্বন্ধটা কি হল?
আফতাব অসহিষ্ণুভাবে বলিল : আগে শোনোই না। আমাদের দলে চা খাওয়া হয়ে থাকে বটে, কিন্তু তাতে দুধ-চিনি খাওয়ার নিয়ম নেই। কারণ আমাদের মনে ওটা একটা প্রথা, একটা নিয়ম, একট। গতানুগতিকতা। নিয়ম মাত্রেই বাঁধন। চায়ে চিনি খাওয়া একটা নিয়ম! সে নিয়ম ভাঙাই আমাদের আদর্শ। কিন্তু আমরা আজও সম্পূর্ণ সংস্কার মুক্ত হতে পারিনি বলে চিনি ছাড়া চা খেতে পারি না। তাই বলে দলের আদর্শও নষ্ট করতে চাই না। সে জন্য দলের মেম্বররা আড্ডায় যাওয়ার সময় পকেটে চিনি নিয়ে যায়। অবশ্য চিনির দামটা মাসিক চাঁদা থেকে বাদ পেয়ে থাকে। এর উপর যাদের সামর্থ আছে, তারা কনডেনস্ড় মিল্কও নিয়ে যায়; আমি কিন্তু দলের আদর্শের অতটা বিরুদ্ধতা করার আবশ্যকতা বোধ করি না। আমরা চিনি খাই বটে, কিন্তু দলের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনহেতু সেটা সকলে অতি গোপনে খেয়ে থাকি। এই যে আমরা এসে পড়েছি। বলিতে বলিতেই আমরা একটি মাঝারি রকমের একতালা বাড়ির গেটে উপনীত হইলাম।
বাড়িটা আগে ভাল ছিল বলিয়াই বোধ হইল; সামনে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা। সেটাতে নানা প্রকার আগাছা জন্মিয়াছে। তারই মধ্যদিয়া একটি সরু রাস্তা।
আফতাব বলিল? আগে সেখানে একটি বাগান ছিল; কিন্তু বাগান মূর্তিমান নিয়ম শৃঙ্খলা বলিয়া বিদ্রোহীদ সেটা নষ্ট করিয়া দিয়াছে।
আমি কিছু বলিলাম না। ভাবিলাম বাড়িটা বিদ্রোহীদের আড্ডা হইবার মতো বড়ো গাছ বটে, কিন্তু উহা এত খোলা জায়গায় অবস্থিত যে, পুলিশের পক্ষে বিদ্রোহীদের গতিবিধি লক্ষ্য করা খুবই সহজ।
গেটে প্রবেশ করিয়াই একটা বিষম কোলাহল শুনিতে পাইলাম। সে কোলাহল আড্ডা হইতেই আসিতেছিল বলিয়া বোধ হইল।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম : এ আবার কি আফতাব?
আফতাব বলিল : দলের সভ্যরা গান গাইছে।
আমি বিস্ময়ে বলিলাম : গান? এমন তুমুল কোলাহলকে তুমি গান বলছ?
আফতাব গম্ভীর মুখে বলিল : সংস্কারমুক্ত হতে তোমার ঢের দেরি। গান সম্বন্ধে তুমি আজো মান্ধাতার আমলের ধারণা নিয়ে বসে আছ। জগৎ আজ সভ্যতার পথে দৈনিক কি স্পিডে এগিয়ে যাচ্ছে, তার কিছু খবর রাখ?
