প্রথমে নজর পড়িল স্বভাবতই কংগ্রেসের উপর। তাই কংগ্রেস অফিসে হাঁটাহাঁটি করিলাম, কংগ্রেস নেতাদের সহিত আলাপ করিলাম, কংগ্রেসের উদ্দেশ্যসমূহ ভাল করিয়া অধ্যায়ন করিলাম। কিন্তু হতাশ হইলাম। বুঝিলাম ও ইংরাজ তাড়ান ইহাদের কর্ম নয়। ইহারা অন্যসব ব্যাপারে ততটা নন-ভায়লেন্ট না হইলেও ইংরাজ-তাড়ানোর ব্যাপারে সত্য সত্যই ননভায়লেন্ট।
রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধায়োজন ইত্যাদি বড় বড় অপরাধে যাঁহাদের দীর্ঘদিন কারাদণ্ড হইয়াছিল, এমনও দুই-একজন সদ্যমুক্ত বিপ্লবী নেতার সঙ্গে দেখা করিলাম। দেখিলাম ও ষড়যন্ত্রে তাহারা মজবুত বটে, কিন্তু তা রাজার বিরুদ্ধে নয়; নিজেরা সহোদরের বিরুদ্ধে এবং যুদ্ধও তাঁহারা করেন বটে, কিন্তু তা রাজার সঙ্গে নয়, স্ত্রীর সঙ্গে অধিকন্তু তা বাক্-যুদ্ধ!
সশস্ত্র বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বহুদিন স্টেটপ্রিযনাররূপে যাহারা মান্দালয় ও বক্শা জেলে বাস করিয়া পীড়ার অজুহাতে সম্প্রতি মুক্তি পাইয়া আসিয়াছেন, এমনও অনেকের সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। আমার কথা শেষ হইবার আগেই তাঁহারা আমাকে “এজেন্ট-প্রভোকেটর” বলিয়া হাঁকাইয়া দিলেন।
দেখিলাম : সারা বাংলায় আমি ছাড়া ইংরাজের সত্যিকার শত্রু আর একজনও নাই। ইংরাজ তাড়াইয়া দেশ স্বাধীন করা যেন আমার একারই দায়িত্ব, আর সবাই যেন ইংরাজের অধীনে রাম-রাজত্বে বাস করিতেছে।
নেতাদের উপর বিষম রাগ হইল। দেশবাসীর নির্বুদ্ধিতায় আমি একেবারে অতিষ্ঠ হইয়া উঠিলাম। বাঙালির মেষ স্বভাবের উপর ভয়ঙ্কর চটিয়া গেলাম। মনে হইল? হাতে ক্ষমতা থাকিলে ইংরাজের আগে এই বাঙালি জাতিটাই নির্মূল করিয়া ফেলিতাম।
আপাতত কোনটাই সম্ভব ছিল না। তাই স্থির করিলাম : বাঙলা ত্যাগ করিয়া লাখনোয়ে মওলানা হযরত মোহানীর কাছে, কিম্বা নাগপুরে ডাঃ মুঙ্গের কাছে চলিয়া যাইব।
দেশত্যাগের মতলব স্থির করায় মনটা একটু খারাপ হইয়া গেল। তাই গড়ের মাঠে শেষবারের মতো বড়াইতে গেলাম।
উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক-ওদিক অনেকক্ষণ বেড়াইয়া সন্ধ্যা লাগে-লাগে অবস্থায় একটা নির্জন স্থানে বসিয়া পড়িলাম। আকাশ-পাতাল অনেক ভাবিতে লাগিলাম।
একটি ভদ্রলোক আসিয়া আমার পাশে বসিয়াই কোনও ভূমিকা না করিয়া নিতান্ত অপ্রতিভভাবে বলিলেন : জনাবের নিকট ধূমপানের ব্যবস্থা আছে কি?
আমি ইংরাজের উপর চটিয়া যাওয়ার পর হইতে সম্প্রতি সিগারেট বর্জন করিয়াছিলাম, এবং খাইতে পারিতাম না বটে, কিন্তু বিড়ি কিনিয়া পকেট ভর্তি করিয়া রাখিতাম।
বলিলাম : সিগারেট আমি বয়কট করেছি : বিড়ি আছে, দেব?
ভদ্রলোক দন্ত বিকাশ করিয়া আর একটু কাছ ঘেঁষিয়া বসিয়া বলিলেন : বিড়িই আমি ভালবাসি, দিন।
আমি তাঁহার হাতে বিড়ির আস্ত প্যাটাই দিয়া দিলাম।
ভদ্রলোক একটা বিড়ি খুলিয়া প্যাটা বেঞ্চিতে নিজের কাছ ঘেঁষিয়া রাখিয়া বলিলেন : দেয়াশলাইটাও নিশ্চয় আছে আপনার কাছে?
আমি পকেটে হাত দিয়া দেয়াশলাইটাও তাঁহার হাতে দিলাম। তিনি বিড়িটা ধরাইয়া বিড়ির প্যাকের উপর দেয়াশলাইটা রাখিয়া দিয়া বলিলেন : আপনি সিগারেট বয়কট করেছেন? বড় ভাল করেছেন, সাহেব। ঐ সব রাবিশ দিয়েই ত ইংরাজরা আমাদের দেশটা লুটে খাচ্ছে।
আমি ঈষৎ হেলান দিয়া বসিয়াছিলাম, একেবারে সোজা হইয়া বসিলাম। ভদ্রলোক বলিতে লাগিলেন? বাঙালি জাত ভাল নয়, নইলে বয়কটটা সফল করতে পারলে শ্বেতকুষ্ঠ-মুখো শালাদের মুখ দু’দিনেই একেবারে কালাজ্বরের রোগীর মতো হয়ে যেত!
তাই ত! আমার ভাবের ভাবুক অন্ততঃ একজন লোকও বাঙলায় আছে? আমি পুলকে অধীর হইলাম। ইংরাজের বিরুদ্ধে আমার মুখ খুলিয়া গেল। এতদিনে রুদ্ধ উচ্ছ্বাস ছাড়া পাইয়া আজ নিজেকে একেবারে নিঃশেষে উজাড় করিয়া দিল।
ভদ্রলোক ছিলেন সত্যসত্যই আমারই মতো ইংরাজ-বিদ্বেষী। তিনি শুধু আমার কথায় সায় দিলেন না–আমার কথার সমর্থনে অনেক উদাহরণও দিলেন! দেখিলাম : ইংরাজ তাড়ান ব্যতীত আমাদের মঙ্গল নাই, এ বিষয়ে ভদ্রলোক আমার সঙ্গে একমত।
এ বিষয়ে আমি যে সমস্ত বাধা বিঘ্নের সম্মুখীন হইয়াছি, সে সমস্ত কথা ভদ্রলোকের নিকট খুলিয়া বলিলাম।
ভদ্রলোক বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন : আপনি ঢাকার বিদ্রোহী দলের নাম শোনেন
আমি অপ্রতিভভাবে বলিলাম : জি না, আমি খবরের কাগজ পড়ি না।
ভদ্রলোক বলিলেন : এটা খবরের কাগজের লেখা নয়–সত্যি কথা। ঢাকায় এক বিদ্রোহী দলের সৃষ্টি হয়েছে। রুশিয়ার বলশেভিকরা ওদের আদর্শ বাঙলা সরকার ওদের ভয়ে কম্পিত হয়ে উঠেছেন। ভারত-সরকার সমর-বিভাগের খরচ বাড়াবার মতলব করেছেন। আসামে একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরির আয়োজন চলছে। ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল আপাতত ঢাকায় বিদ্রোহীদের গতিবিধি লক্ষ্য করছে।
আমি উৎসাহে লাফাইয়া উঠিলাম। বলিলাম : বলেন কি সাহেব এ-সব কথা কি সত্য? ইংরাজ তাড়াবার সত্যিকার একটা চেষ্টা হচ্ছে তা হলে?
প্রবোধ দিয়া ভদ্রলোক বলিলেন : হচ্ছে বই কি! দেশ কি আর আগেকার মতো ঘুমিয়ে আছে?
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম : আপনিও ইংরাজের শত্রু, তবে ঐ দলে ভর্তি হন নি কেন?
ভদ্রলোক চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টিপাত করিয়া গলার সুর নামাইয়া বলিলেন : কে বলেছে আমি ভর্তি হই নি? আমি ঐ দলেরই একজন নগণ্য সেবক। আপনার মতো লোক খুঁজতেই আমার কলকাতায় আসা।
