উভয়ের মত মতে জানাযা পড়ার কথা যে বলিয়াছিল, মৌলবী সাহেবরা কোন জবাব। দিবার আগেই সে দাঁড়াইয়া বলিল : আমি দু’বার জানাযা পড়ার কথা বলি নাই। এক বারেই দুই-এর মত মতো জানাযা পড়া যেতে পারে।
সকলে, বিশেষ করিয়া মৌলবীদ্বয়, চিৎকার করিয়া বলিলেন : কি রূপে?
সে বলিল : শির আর সিনা খুব তফাৎ নয় : পা একটু ফাঁক করে দাঁড়ালেই এক পাশির বরাবর আর এক পা সিনা বরাবর থাকবে। এতে উভয়ের মতই বজায় থাকবে। আর এমামতি কে করেন, সেটা ঠিক হয় এমামের পাওনা দিয়ে। এমামের পাওনা উভয় মৌলবীর মধ্যে সমান ভাগ করে দেওয়া হোক, তা হলেই উভয়ের এমামতি ঠিক থাকবে। কারও হারজিৎ হবে না।
এই ব্যবস্থা সকলের পছন্দ হইল! মাতব্বর সাব মৌলবী সাবদের জিজ্ঞেস করলেন : কেমন এ ব্যবস্থা চলতে পারে? হাদিসের বরখেলাফ হবে না ত?
নায়েবে-নবীদ্বয় পরস্পরের মুখের দিকে চাহিয়া মুহূর্তে দৃষ্টি বিনিময় করিলেন এবং প্রায় সমস্বরে বলিলেন : হাদিস শরীফে এ বিষয়ে কোন নিষেধ নাই।
বিদ্রোহী সংঘ
খেলাফত আন্দোলনে সমগ্র দেশটা যখন থৈ-থৈ করিয়া উঠিয়াছিল, তখন আমি পরম উৎসাহেই উহার নিন্দা করিয়াছিলাম। তখন আমি সবেমাত্র বি. এ. পাশ করিয়া কলেজ হইতে বাহির হইয়াছি। ডেপুটিগিরির স্বপ্নে আমি তখন বিভোর।
জালিয়ানওয়ালার ডায়ারী হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের বন্যায় যখন ভারতবর্য প্লাবিত হইয়া গিয়াছিল, তখনো আমি নেতাদের খামখেয়ালি বাড়াবাড়িতে বিরক্ত প্রকাশ করিয়াছিলাম। তখনো আমি প্রশংসাপত্রের টাইপ করা নকলের বস্তা-বগলে সাহেব-সুবার বাড়ি-বাড়ি ঘুরা ফেরা করিয়া আশা পাইতেছি।
তারপর যখন ইংরাজ সরকার বিশ হাজার ভারতবাসীকে কারানিক্ষেপ করিলেন, তব ভি হাস কু না কাহা। তখনও আমি কর্মখালি পাঠের জন্য দৈনিক কাগজে এবং চাকুরির দরখাস্তের জন্য ডাক-টিকিট ক্রয় বাবত দু’হাতে খরচ করিতেছি।
এমন কি যখন বাড়ির কাছে চাঁদপুর, সলঙ্গার হাট হইতে আরম্ভ করিয়া কুলকাঠি পর্যন্ত অনেক জায়গায় অনেক অকাণ্ড-কুকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ড এক রকম চোখের সামনেই হইয়া গেল, তখনো আমি ইংরাজ ভক্তিতে অবিচলিত থাকিয়া নিরুদ্বেগে ইংরাজের চাকুরির চেষ্টা করিতে থাকিলাম।
কিন্তু অবশেষে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেল। আমার ভিতরে ইংরাজ-বিদ্বেষে বহ্নি দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল সেইদিন- পুনঃ পুনঃ চাকুরির ভরসা দিয়াও যেদিন জেম্স সাহেব আমাকে তাঁহার অফিস গৃহ হইতে বাহির করিয়া দিবার জন্য তাঁহার আরদালিকে হুকুম দিয়া বসিলেন। আমি সাহেবটার অদ্রতায় ভয়ানক চটিয়া গিয়াছিলাম। সুতরাং আরদালি আসিয়া পৌঁছিবার আগেই আমি বাহির হইয়া আসিলাম। ফলে আরদালি আমার কেশ-স্পর্শ করিতেও পারিল না। কিন্তু আমি বুঝিলাম ও ইংরাজ জাতটার মধ্যে সত্যি সত্যি কোন বিচার নাই।
ইহার উপর বিনা টিকিটে ট্রামে চড়ার অপরাধে যেদিন গোরা চেকার আমাকে গোরা সার্জেন্টের হাতে সোপর্দ করিয়া এক টাকা জরিমানা লাগাইল, সেইদিন আমার মধ্যে বিদ্রোহের রক্ত টগবগ করিয়া উঠিল।
স্বরাজের আবশ্যকতা সম্বন্ধে আমার আর কোন সন্দেহ থাকিল না। জরিমানার টাকাটা দিয়া পুলিশ-কোর্ট হইতে বাহির হইয়া দেখিলাম, সার্জেন্টটা আমার দিকে চাহিয়া মুচকি হাসিতেছে। আমি ক্রোধ সম্বরণ করিতে পারিলাম না। চিৎকার করিয়া বলিলাম;
শোন ইংরাজ,
আজ হতে আমি বিদ্রোহী উন্মাদ!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া
গিয়াছে সব বাঁধ।
আমি মুক্ত, আমি সত্য, আমি বিদ্রোহী সৈন্য!
আমি ধন্য! আমি ধন্য!!
মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত,
আমি সেই দিন হব শান্ত।
যবে চাকুরির আশে বাঙালি ফিরিঙ্গীর পায়ে ধরিবে না!
আর ট্রাম কোম্পানি ভাড়া চাহিবার দুঃসাহস করিবে না।
সার্জেন্টের দিকে চাহিয়া দেখিলাম : তাহার হাসি বন্ধ হইয়া গিয়াছে, চক্ষু বড় হইয়াছে। ইংরাজ জাতির অভদ্রতায় আমি ইতিপূর্বেই নিঃসন্দেহ হইয়াছিলাম। তাই সেখানে আর দেরি করিলাম না; দ্রুতগতিতে রাস্তায় জনতার মধ্যে সান্ধাইয়া পড়িলাম। কিন্তু তার পূর্বে গোরাকে শুনাইয়া ‘আমি ফিরিঙ্গী বুকে একে দিই পদচিহ্ন’ বলিয়া সে কার্যে আমার যোগ্যতার প্রমাণস্বরূপ আপাতত ধরণীর বুকেই বাম পায়ের গোড়ালি চিহ্ন রাখিয়া আসিলাম।
বাঙালির ক্রোধ তালপাতার আগুনের মতই ক্ষণস্থায়ী বলিয়া একটা বদনাম আছে। আমিও বাঙালি। অথচ আমি ইংরাজ জাতির উপর সত্যই চটিয়া গিয়াছিলাম, সুতরাং বাঙালির জাতির এই দুর্নাম ঘুচাইবার জন্য আমি আমার ক্রোধটাকে তাজা রাখিবার প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিলাম।
আমি স্থির করিলাম। ইংরাজ জাতিকে হয় ভারতবর্ষ হইতে গলাধাক্কা দিয়া তাড়াইয়া দিব, নয় ত উহাদিগকে আমাদের আরদালি করিয়া রাখিব। এই মতলবে আমি এতই কঠোর হইয়া উঠিলাম যে, হাজার অনুরোধ-উপরোধও আমার মনে ইংরাজের প্রতি দয়ার উদ্রেক হইবার কোন সম্ভাবনা থাকিল না।
এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কি উপায় অবলম্বন করা যায়, সে ভাবনায় আমি অস্থির হইয়া উঠিলাম। পূর্বে স্থির করিয়াছিলাম, জেম্স সাহেবের নিকট চাকুরির শেষ চেষ্টা করিয়া বিফল হইলে বাড়ি ফিরিয়া আপাতত কিছুদিন বিশ্রাম করিব এবং বাড়িতে আদর আপ্যায়নের ত্রুটি দেখিলে গ্রাম্য কোন স্কুলে মাস্টারি করিব; কিন্তু ইংরাজ তাড়াইবার এই নূতন দায়িত্ব কাঁধে পড়ায় আমার প্রোগ্রাম চেঞ্জ করিতে হইল- আপাতত কিছুদিন কলিকাতায় থাকাই স্থির করিলাম।
