ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলিয়া গেল। মজা দেখিবার জন্য ভিড় বাড়িতে লাগিল।
বাপের দেহের উপর আযাব হইতেছে ভয়ে মৃত ব্যক্তির পুত্রেরা অনেক তাগাদা করিল। কিন্তু তাহারা ব্যতীত আর সকলে উৎসাহের বাহাস-শুনিতে লাগিল।
লাশ রৌদ্রের মধ্যে পড়িয়া রহিল।
বেলাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যখন নায়েবে-নবীদ্বয়ের ক্ষুধাবৃদ্ধি হইতে লাগিল, তখন স্বভাবতই তাঁহাদের কথার উষ্ণতাও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।
কিন্তু কেহ হার মানিল না। গরীবুল্লাহ সাহেবের নষ্ট সরদারি পুনরুদ্ধারের এই শেষ চেষ্টা, সুতরাং তিনি হারিতে পারেন না। আল সুধারামী সাহেবের এই যুদ্ধজয়ের উপরই সর্বস্ব নির্ভর করিতেছে, সুতরাং তিনিও হারিতে পারেন না।
অতএব বাহাস চলিতে লাগিল। এ বাহাসের পনর আনাই গালাগালি। হাদিস কোরআনের বাহাস হইলে এতক্ষণ আর কিছুতে না হইক শ্রোতার অভাবেই বাহাস শেষ হইত। কিন্তু ব্যক্তিগত গালাগালি হাদিস-কোরআন অপেক্ষা অনেক বেশি শ্রুতিমধুর বলিয়া শ্রোতার সংখ্যা হু হু করিয়া বাড়িতে লাগিল। যাহারা কাজের চাপে জানাযা পড়িতে আসিতে পারে নাই, তাহারাও বাহাস শুনিতে আসিল।
বেলা যত উপরের দিকে উঠিতে লাগিল, তার্কিকদ্বয়ের গালাগালিও ততই ধাপে ধাপে পরস্পরের পিতৃপুরুষের উধ্বদিকে উঠিতে লাগিল। কার বাপের পেটে এক হরফ খোদার কালাম পড়ে নাই, কার বাপ চাষা ছিল, কার দাদা লবণের দোকানদারি করিত, কার নানা পান বিক্রি করিত, হাদিস-কোরআনের এইসব গভীর তথ্য সম্বন্ধে পরস্পরের জ্ঞানের প্রতিযোগিতা চলিতে লাগিল।
কিন্তু বাক্-যুদ্ধেরও শেষ আছে। উভয়পক্ষ হইতেই গালাগালির গুদাম সাবাড় হইয়া আসিল।
সুধারামী সাহেব যুদ্ধের নূতন অধ্যায় শুরু করিলেন। তিনি তবে রে শালা’ বলিয়া এক পা হইতে দেলওয়ারী জুতা খুলিয়া গরীবুল্লাহ সাহেবের দিকে সাজোরে নিক্ষেপ করিলেন। কিন্তু গরীবুল্লাহ সাহেবের গায়ে না লাগিয়া উহা দূরে গিয়া পড়িল।
জুতাটা কুড়াইয়া আনিবার জন্য যেই সুধারামী সাহেব সেদিকে ছুটিয়া গেলেন, অমনি গরীবুল্লাহ সাহেব এক লাফে লাশের সামনে এমামের জায়গায় গিয়া দাঁড়াইলেন এবং চিৎকার করিয়া কহিলেন : হাদিস-কোরআনকে বেদ আতীদের হাত থেকে রক্ষা করে যারা সওয়াব হাসেল করতে চান, তারা আসুন-মাইয়েৎ ফেলে রেখে আর গোনাহ করিতে পারব না।
উপস্থিত লোকের বেশির ভাগ কাতার করিয়া দাঁড়াইল। গরীবুল্লাহ সাহেব তাড়াতাড়ি আল্লাহু-আকবর’ বলিয়া জানাজায় দাঁড়াইয়া গেলেন।
সুধারামী সাহেব জুতা কুড়াইয়া পায়ে লাগাইবার চেষ্টা করিতেছিলেন। এই না দেখিয়া তিনি এক জুতা হাতে লইয়াই ছুটিয়া আসিলেন এবং এক ধাক্কায় গরীবুল্লাহ সাহেবকে মাটিতে ফেলিয়া দিয়া আল্লাহু-আকবর বলিয়া নিজেই এমামতিতে দাঁড়াইলেন।
গরীবুল্লাহ সাহেবও উঠিয়া সুধারামীকে এক ধাক্কা মারিলেন।
হাতাহাতি লাগিয়া গেল। সমবেত লোকেরা বহু কষ্টে জেহাদরত নায়েবে-নবীদ্বয়কে পরস্পরের বজ্রমুষ্টি হইতে মুক্ত করিল!
একটি উম্মিলোক মন্তব্য করিল আলেমদের মধ্যে এইরূপ হাতাহাতি দেখতে বড়ই খারাপ।
জবাবে সুধারামী সাহেব বলিলেন : হাদিসের এক-একটি হরফের সত্যতা বুঝাবার জন্য কত বড় বড় মোজতাহেদ মোহাদ্দেস উম্মুরভর এত এজতেহাদ করেছেন; কোরআনের পবিত্রতা রক্ষার জন্য কত মোজাহেদ জান নেসার করেছেন, আর আমরা হাতাহাতি করেই কি এমন অন্যায় করেছি? হাদিস-কোরআন যে আমাদের জানের কতটা, তোমরা উম্মিলোক তা বুঝবে না।
সকলে শুনিয়া আশ্চর্য হইল, গরীবুল্লাহ সাহেব তাঁহারা বিশৃঙ্খল কাপড় ও দাড়ি বিন্যস্ত করিতে করিতে সায় দিলেন : ঠিক কথা।
মৃত ব্যক্তির পুত্ররা বিরক্ত হইয়াছিলেন।
এইবার বড়পুত্র কাঁদিয়া ফেলিয়া বলিল : আপনারা হাদিসের মসলা পরে ঠিক করবেন, আগে আমার মরা বাপকে গোর দিতে দিন।
প্রায় সকলেই বলিল : তাই ত, লাশ আর ফেলে রাখা যায় না।
কিন্তু এমাম শির বরাবর কি সিনা বরাবর দাঁড়াইবেন; তা নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত জানাযাও ত পড়া যায় না।
গ্রামের মাতব্বর সাহেব বলিলেন : দুই মৌলবী সাহেবের একজন আজকার জন্য জিদ ত্যাগ করুন। আজ একজনের মতেই জানাযা পড়া হয়ে যাক, পরে বাহাসের মহাফেল করে এই মসলা ঠিক করা হবে।
উভয় মৌলবীই বলিলেন : ইহা তাহাদের জিদও নয়, তাহাদের ঘরের কথাও নয়; হাদিস-কোরানের কথা নিয়া আপোস করা যাইতে পারে না।
সুতরাং কেহই জিদ ছাড়িলেন না।
গোলমালও মিটিল না।
বিশেষ ভাবনার কারণ হইয়া পড়িল।
মাতাব্বররা মণ্ডলি দিয়া বসিয়া এরপর কি করা যায় তাহাই ভাবিতে লাগিলেন।
অবশেষে একজন উম্মিলোক বলিল? আজকে উভয় মৌলবী সাহেবের মত মতই জানাযা পড়া যাক; দু’জনের জিদই বহাল থাক। পরে দু’চার দিনের মধ্যে বড় বড় আলেমের বাহাসের সভা ডেকে তাতে যে মত জিতবে, আমরা আগামীতে সেই মতই মনে চলব।
গরীবুল্লাহ সাহেব তৎক্ষণাৎ বলিলেন : বাহাসে যার মত টিকবে, সরদারি তারই হবে ত?
সুধারামী সাহেব বাধা দিয়া বলিলেন : জানাযা নামাজের সঙ্গে সরদারির কি তা আল্লুক আছে? সরদারি এখন যেমন আছে তখনও তেমনি থাকবে।
প্রধান মাতব্বর সাহেব বলিলেন : সে পরে দেখা যাবে। কিন্তু এখনকার মতো কি করা যায়? বাহাসের মহফেলও ত আর এমনি ডাকা যায় না। আর ও-যে বললে, দুই জনের মতে জানাজা পড়ার কথা, তাই বা কি করে হতে পারে? একই লাশের দু’বার জানাযা পড়া যায় কি? কি বলেন মৌলবী সাবরা?
