মাস্টার মৌলবীর দিকে একটা ক্রুর কটাক্ষ করিয়া মাতব্বরের দিকে চাহিয়া বলিলেন : তবে কি আপনারা চাঁদা দেবেন না?
মাতব্বর সাহেব ঘাড় চুলকাইয়া বলিলেন : লড়াই-টড়াই কথা যখন সব মিথ্যা, তখন—
বাধা দিয়া মাস্টার উপস্থিত অন্যান্য সকলের দিকে চাহিয়া বলিলেন : আপনাদেরও কি তাই মত?
রোমের সুলতান বড় কি ইংরাজ বড়, যুদ্ধ সত্যই লাগিয়াছে কি লাগে নাই, এসব কথা তাহারা মোটেই ভাবিতেছিল না। তাহারা ভাবিতেছিল? কোরবানির চামড়ার টাকাটা রোমের সুলতানকে দিয়া দিলে মৌলবী সাহেবের জন্য নতুন করিয়া চাঁদা দিতে হইবে। তাই তাহারা মাস্টারের প্রশ্নে প্রায় এক বাক্যে উত্তর দিল। আমাদের মাতব্বর সাব যা বলেছেন—
মাস্টার আর শুনিলেন না। চলে এসো–বলিয়া ছাত্রদের ডাকিয়া বাহির হইয়া গেলেন।
ছাত্রগণ সারি দিয়া রাস্তায় বাহির হইয়া চিৎকার করিল? আল্লাহু আকবর।
অহরহ-আল্লাহর-নামাজ-যেকেরে-অভ্যস্ত মৌলবী সাহেবের কানে ছেলেদের এ আল্লাহু-আকবর-ধ্বনি বিষাক্ত ছুরিকাঘাতের মতো বিদ্ধ হইল।
.
তিন
সেদিন গ্রামের একটি মাতব্বর লোক মারা গিয়াছেন।
আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী অনেক লোক জানাজা পড়িতে আসিয়াছে।
আত্মীয়-স্বজনদের মাঝখানে বহুদিনের-অব্যবহৃত-কাল-সাটিনের চওগা-পরা মৌলবী গরীবুল্লাহ সাহেবকেও দেখা গেল।
মৌলবী সুধারামী সাহেব সেখানে পৌঁছিয়া গরীবুল্লাহ সাহেবকে দেখিয়া অত্যন্ত গম্ভীর। হইয়া গেলেন এবং দন্তপূর্ণ সুরে আস্সালামু আলায়কুম” বলিয়া গরীবুল্লাহ সাহেবের প্রতি একটা ক্রুর দৃষ্টিপাত করিয়া আসন গ্রহণ করিলেন। আসন গ্রহণ করিয়াই তিনি খুব হয়বতের সঙ্গে চারিদিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন। তিনি দেখিলেন : জনতা চার-পাঁচ জনের ছোট ছোট দলে ভাগ হইয়া ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় কি যেন কানাকানি করিতেছে। মুহূর্তে তাঁহার মুখের ভাব বদলিয়া গেল। তিনি একটা অজ্ঞাত আশঙ্কায় ভীত হইয়া পড়িলেন।
ক্রমে তিনি অতিষ্ঠ হইয়া উঠিলেন। বলিলেন : সব তৈয়ার ত? তবে আর দেরি কিসের? লাশ নিয়ে বসে থাকা বহুত গোনার কাজ। হযরত তিনটা কাজের প্রতি বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। প্রথমতঃ স্ত্রীলোক বিধবা হলে জলদি তার নিকাহ দেওয়া, নামাজের ওয়াক্ত হলে জলদি নামাজ আদায় করা এবং মাইয়েৎকে ফওরান দাফন করা। এই তিন কাজের মধ্যে আবার হযরত মাইয়েৎ সম্বন্ধেই সবচেয়ে বেশি তাগিদ দিয়েছেন। কারণ লাশ যতক্ষণ কবরস্থ না করা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তার উপর আযাব হতে থাকে।
হযরতের এই তাগিদের কথা, বিশেষ করিয়া মৃত ব্যক্তির দেহের উপর আযাব হইতেছে শুনিয়া মাইয়েতের পুত্রেরা ছুটাছুটি করিতে লাগিল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই মেয়েলোকের কান্নাকাটি ও শোরগোলের মধ্যে লাশ বাড়ির বাহির করা হইল।
লাশ সামনে লইয়া সকলকে কাতার করিয়া দাঁড়াইবার জন্য মৌলবী সুধারামী সাহেব আদেশ করিলেন।
অনেকে দাঁড়াইল, অনেকে দাঁড়াইল না।
মৌলবী সাহেব অতিষ্ঠ হইয়া ধমকের সুরে তাঁহার আদেশের পুনরাবৃত্তি করিলেন।
গরীবুল্লাহ সাহেবের পুনঃ পুনঃ ইশারায় একজন বলিল : আগে জানতে চাই, জানাজা পড়া হবে কিভাবে?
সুধারামী সাহেব এই আশঙ্কাই করিতেছিলেন। তিনি কথা না বুঝিবার ভান করিয়া বলিলেন : কিভাবে কি রকম? এ সওয়ালের মানে কি? শরিয়তের হুকুম-মতেই জানাজা পড়া হবে।
প্রশ্নকর্তা গরিবুল্লাহ সাহেবের দিকে চাহিয়া বলিল : এইবার বলুন মৌলবী সাহেব আপনার কি বলবার আছে।
সকলের সমবেত দৃষ্টি গরীবুল্লাহ সাহেবের উপর পতিত হইল।
তিনি বলিলেন : শরিয়তের হুকুমটা কারও বাপের ঘরের কথা নয়। সাহেবান আপনারা বাপদাদার আমল থেকে মাইয়েতের সিনা বরাবর দাঁড়িয়ে জানাযা পড়ে আসছেন। আমি শুনতে পেলাম, আপনাদের এমাম মুনশী সুধারামী সাব নূতন শরিয়ত বের করেছেন। তিনি নাকি মাইয়েতের শির বরাবর দাঁড়িয়ে জানাযা পড়বার ফতোয়া দিয়েছেন। আল্লাহর কালাম, হযরত রসূলে করীমের হাদিস কি নূতন হচ্ছে? আল্লাহ্ রসূলের নামে যারা এইভাবে তামাশা করে, তারা যদি আলেম, তবে জাহেল কে?
সুধারামী সাহেব চটিয়া রাগে কাঁপিতেছিলেন : গরীবুল্লাহ সাহেবের কথায় বাধা দিয়া কথা বলিবার জন্য দুই-তিনবার চেষ্টাও করিয়াছিলেন। কিন্তু গরীবুল্লাহ সাহেবের গলা তাঁহার গলার চেয়ে বেশ কিছুটা মোটা ছিল বলিয়া তিনি সুবিধা করিয়া উঠতে পারেন নাই। এইবার গরীবুল্লাহ সাহেব চিৎকার করিয়া বলিলেন : আল্লাহর কালাম ও রসূলে-করিমের হাদিস বদলায় নাই; যে সব জাহেল ওর মানে বুঝতে পারে না, তারাই বলে যে ওর অর্থ বদলান হয়েছে।
গরীবুল্লাহ সাহেবও একথার যথোচিত জবাব দিলেন।
এইভাবে বাহাস শুরু হইল।
উভয় মৌলবী সাহেবেই বুঝিলেন? দু’জনের পক্ষেই লোক আছে; সুতরাং নির্ভয়ে তর্ক চলিতে লাগিল।
তর্কে প্রথম-প্রথম উভয় মৌলবীই পরস্পরকে ‘মুনশী সাব’ বলিয়া সম্বোধন করিতেছিলেন। কিন্তু বাহাস গরম হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে এই সম্বোধন ‘জাহেল’ নাদানে নামিল। কে কতটুকু পড়াশোনা করিয়াছেন, কে কবে মাদ্রাসায় মার খাইয়া পালাইয়াছিলেন আর যান নাই, এসব পুরাতন স্মৃতির দ্বারউদঘাটিত হইতে লাগিল। কে কবে কত টাকা লইয়া একজনের বিবাহিত স্ত্রীকে আরেকজনের সঙ্গে নিকাহ দিয়াছিলেন, গ্রামের অনেক অজ্ঞের-সামনে এই প্রকার অনেক নূতন তথ্যও প্রকাশ পাইতে লাগিল।
