পিএস আশেক মাহমুদ চোখমুখ শক্ত করে তাকালো চেয়ারে বসা বন্দীর দিকে। “মুশকান জুবেরি! কেমন আছেন!” দাঁতে দাঁত পিষে বললো
সে। এই মহিলা তার বড়বোনের সমবয়সী বলেই হয়তো অজ্ঞাতসারেই আপনি সম্বোধনটা চলে এসেছে।
বন্দী অবিশ্বাস্যে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “কী বলছেন?! আমি সুস্মিতা! সুস্মিতা সমাদ্দার!”
হা-হা-হা করে অট্টহাসি দিলো আশেক মাহমুদ।
অনেক দিন পর আসলাম তার বসকে এভাবে হাসতে দেখলো।
.
অধ্যায় ৭১
মুশকান জুবেরি এখন পিএসের হেফাজতে আছে!
ছফার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছে ব্যাপারটা।
রমাকান্তকামার যখন জানালেন, সুস্মিতা সুন্দরপুর থেকে চলে গেছে, তখন সে ভেবেছিলো আবারো পালিয়ে গেছে ঐ ডাইনি-তারপরও মাস্টারের কথাটাকে বেদবাক্য হিসেবে মেনে নেয়নি সে। পুলিশ ফোর্স নিয়ে পুরো স্কুলটা চষে বেড়িয়েছে। বেশ কয়েকজন কর্মচারীকেও জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছে, মাস্টার সত্যিই বলেছেন, শ্যামল নামের ছেলেটাকে নিয়ে সুস্মিতারূপী মুশকান গতকাল ঢাকায় চলে গেছে। কিন্তু কোথায় গেছে, কেউ জানে না।
ছফা অনেকটা হতাশ হয়েই পিএস আশেক মাহমুদকে ফোন দেয়, কিন্তু তার ফোনটা বন্ধ পেয়ে অধৈর্য হয়ে ওঠে সে। সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না কী করবে। তবে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি তাকে। একটু পরই পিএস তাকে ফোন দেয়। ছফা যখন জানালো, সুস্মিতারূপী মুশকান সুন্দরপুর থেকে পালিয়ে গেছে তখন দুঃসংবাদটি শুনে আশেক মাহমুদ উদ্বিগ্ন না হয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে, সুস্মিতা যদি মুশকান জুবেরি হয়ে থাকে তাহলে চিন্তার কিছু নেই, সে এখন তার হাতে বন্দী।
কথাটা শুনে যারপরনাই অবাক হয় ছফা। পিএস তখন সংক্ষেপে সবটা জানায়। হাসপাতালে তার পরিচিত এক ডাক্তার তাকে জানিয়েছিলো, ডাক্তার আসকারকে দেখতে এক মেয়ে এসেছে, নাম তার সুস্মিতা। ডাক্তারের খুবই ঘনিষ্ঠ, কেননা তাকে স্পেশাল কেবিনে ঢুকতে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পিএস তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, বুড়োকে বাগে আনার জন্য, তার কাছ থেকে মুশকানের খবর আদায় করার জন্য ঐ মেয়েকেও নজরদারিতে রাখবে। দরকার হলে তাকে কজায় নিয়ে নেবে যাতে করে ডাক্তারকে বাধ্য করা যায় মুশকানের সন্ধান দিতে। কিন্তু আজকে কলকাতা থেকে রওনা দেবার আগে ছফা যখন তাকে জানিয়ে দিলো, মুশকান জুবেরি কলকাতায় প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা পাল্টে ফেলেছে, সুস্মিতা সেজে সুন্দরপুরে আছে, তখন আর দেরি করেনি আশেক মাহমুদ। আসলামকে দিয়ে মেয়েটাকে নিজের কজায় নিয়ে নেয়। খবরটা ছফাকে তখনই জানাতে গেছিলো, কিন্তু ঐ সময় তার ফোন বন্ধ পায়। ছফা তখন কলকাতা থেকে রওনা দিয়ে দিয়েছে, নেটওয়ার্কের বাইরে ছিলো সম্ভবত। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সাথে জরুরী এক মিটিঙে চলে গেলে নিজের ফোনটাও বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় পিএস, তাই একটু আগে ছফাও তাকে ফোন করে পায়নি। যাই হোক, সুসংবাদটি শোনার পর ছফা আর দেরি করেনি, দ্রুত সুন্দরপুরের এসপির গাড়িটা ধার নিয়ে রওনা দেয় ঢাকার উদ্দেশ্যে।
এখন ঢাকার প্রবেশপথে আছে নুরে ছফা, টের পেলো উত্তেজনায় অস্থির হয়ে আছে সে। অবশেষে মুশকান জুবেরিকে সে ট্র্যাক ডাউন করতে পেরেছে! মহিলা এখন তাদের হাতে বন্দী!
*
ডাক্তার আসকার একটু আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আবারো ফোন দিয়েছিলেন। ভদ্রলোক যখন বিরোধীদলে ছিলো তখন নিয়মিত অরিয়েন্ট হাসপাতালের সেবা নিতে বিনেপয়সায়। প্রতিটি বেসরকারী হাসপাতালই কিছু রাজনীতিককে এভাবে বিনেপয়সায় সেবা দিয়ে থাকে, অরিয়েন্ট হাসপাতালও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান সরকারের তিন-চারজন মন্ত্রী আর বেশ কয়েকজন এমপির সাথে ডাক্তারের সখ্যতা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তার সেই সখ্যতা আরো বেশি। যেকোনো সময় যেকোনো প্রয়োজনে তাকে ফোন করতে পারেন তিনি। তারপরও এখন মনে হচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখে প্রধানমন্ত্রীর পিএস!
মন্ত্রীকে তিনি জানিয়েছেন, তার মেয়ে সুস্মিতা বনানীর বাসা থেকে উবারে করে এয়ারপোর্টে রওনা দিয়েছিলো, কিন্তু ফ্লাইট মিস করেছে। তারপর থেকেই ওর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এমন কি ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছেন। কথাটা শুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব অবাক হয়েছে। ডাক্তার কি কাউকে এ ব্যাপারে সন্দেহ করছেন? এমন প্রশ্নে আসকার ইবনে সায়িদ কোনো রকম ভণিতা না করেই বলেছেন, তাকে যে ব্যক্তি ইমিগ্রেশন পার হতে বাধা দিয়েছে, সেই একই ব্যক্তি নুরে ছফা নামের ডিবি অফিসারকে দিয়ে সুস্মিতাকে অপহরণ করেছে বলেই তার বিশ্বাস।
কিন্তু মন্ত্রী খুব অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, কী এমন ঘটে গেছে। যে, তার মেয়েকে অপহরণ করবে ওরা? ডাক্তার পরিহাসের হাসি দিয়ে বলেছিলেন, তিনিই বা কী অপরাধ করেছেন যে, তাকে ইমিগ্রেশনে আটকে দেয়া হলো?
এ কথা শুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলেছে, সে খোঁজ নিয়ে দেখবে কী ঘটেছে আসলে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো আপডেট জানতে পারেননি তিনি।
যেভাবে উদ্বিগ্নতা তাকে চেপে ধরছে, একটু পর হয়তো সত্যি সত্যি আইসিসিইউতে নেয়ার দরকার হবে। এর আগে নুরে ছফার হাত থেকে বাঁচতে সামান্য নাভাস ব্রেক ডাউনকে হার্ট অ্যাটাকের অভিনয় করে পার পেয়ে গেছিলেন। কিন্তু এখন সত্যি সত্যি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিতে পড়ে গেছেন।
