.
অধ্যায় ৭২
সুস্মিতা হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ মেরে গেছে এখন।
বার বার বলে যাবার পরও এ ঘরের দু-জন মানুষকে বিশ্বাস করাতে পারেনি, সে মুশকান জুবেরি নয়। তার নাম সুস্মিতা সমাদ্দার। ডাক্তার আসকার তার বাবা।
“সুস্মিতা সমাদ্দার কী করে ডাক্তার আসকারের মেয়ে হয়?” আশেক মাহমুদ জানতে চাইলো।
বিরক্তিতে ভরে উঠলো বন্দীর মুখ। অসভ্য আর অশিক্ষিতের মতো প্রশ্ন! আর এটা তাকে এই প্রথম শুনতে হচ্ছে না।
“আপনি যদি মনে করে থাকেন আপনাকে ধরে এনে এটা জানতে চাচ্ছি, আপনি মুশকান জুবেরি কিনা তাহলে ভুল করছেন। প্রধানমন্ত্রীর পিএস বেশ আয়েশ করে এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে সোফায় বসে আছে এখন। বন্দীর চেয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে আছে আসলাম।
“এসব করে সময় নষ্ট করার কোনো ইচ্ছেও আমার নেই,” আশেক মাহমুদ বললো। “এর চেয়ে অনেক জরুরী প্রশ্নের উত্তর আমাকে জানতে হবে।”
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সুস্মিতা।
“আমি স্রেফ দুটো প্রশ্ন করবো। আপনি যদি ভেবে থাকেন ছলচাতুরি করে পার পেয়ে যাবেন তাহলে বিরাট বড় ভুল করবেন।”
“কী প্রশ্ন, আপনার?” গভীর করে দম নিয়ে সন্দেহের সুরে জানতে চাইলো সুস্মিতা। তার আগে বলুন, আপনি কে।”
“চুপ, খানকি!” তেঁতে উঠলে আসলাম। পিএসের সামনে এই ডাইনিকে গালি দিতে মোটেও দ্বিধা করলো না সে। “বস্ যা বলবে তার জবাব দিবি, পাল্টা কোনো প্রশ্ন করবি না!”
সুস্মিতা কয়েক মুহূর্ত কটমট চোখে আসলামের দিকে চেয়ে থেকে আশেক মাহমুদের দিকে ফিরলো। তার মার্জিত পোশাক আর অভিজাত ভাবভঙ্গি দেখে গোলকধাঁধায় পড়ে গেছে সে। লোকটা কে হতে পারে, কোনো ধারণাই করতে পারছে না।
মেয়েটার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্থিরচোখে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বললো পিএস, “হাসিবকে কী করেছেন?”
বন্দী আবারো গভীর করে দম নিয়ে নিলো। “আমি মুশকান জুবেরি নই। আর হাসিব নামের কাউকে কখনও চিনতামও না। আমার কথা বিশ্বাস না করলে কিছু করার নেই, কিন্তু বার বার এক কথা জিজ্ঞেস করবেন না। বড্ড অসহ্য লাগছে।”
চোয়াল শক্ত করে চেয়ে রইলো আশেক মাহমুদ, তারপর আসলামের দিকে ফিরলো। আমি ওর সাথে একটু কথা বলবো।”
চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেলো পুলিশের সাবেক এসআই। বসের ইশারা বুঝতে এক সেকেন্ডও দেরি হয় না তার।
“মুশকান জুবেরি!” ঘর থেকে আসলাম চলে যাবার পর দাঁতে দাঁত পিষে বললো আশেক মাহমুদ। “আমি জানি হাসিবের সাথে কী করেছিস তুই!”
মুখ তুলে তাকালো সুস্মিতা। তাকে একা পেয়ে লোকটার ভাবভঙ্গি যে বদলে গেছে বুঝতে পারলো। কিন্তু সে-ও কম যায় না। রেগেমেগে বলে উঠলো, “ফাক ইউ!”
নিজের রাগটা দমন করে বেশ শান্তকণ্ঠে বললো পিএস, “তুই কি চাস, ঐ ছেলেটা বেঘোরে মারা যাক?”
এ কথায় কাজ হলো, অস্থির হয়ে উঠলো বন্দী। “ও একটা নিরীহ ছেলে…ওর কিছু করবেন না!” কাকুতি মিনতি করে জানালো সে। তার কণ্ঠ এখন ভঙ্গুর শোনাচ্ছে। “প্লিজ!”
শীতল চোখে তাকালো আশেক মাহমুদ। “যে তোকে এখানে তুলে এনেছে সে কতোটা ভয়ঙ্কর তোর কোনো ধারণাই নেই। আমি চাইলে, সে তোকে ছিঁড়ে-খুবলে খাবে!”
বন্দীর নিশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠলো।
“যা জানতে চাই তা বল, নইলে ঐ ছেলেটা মরবে।”
গভীর করে দম নিয়ে নিলো বন্দী। তার নার্ভ ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছে। “আপনি আসলে কী চান, বলুন তো?”
হেসে ফেললো আশেক মাহমুদ। “দ্যাটস গুড,” একটু থেমে সরাসরি বন্দীর চোখের দিকে তাকালো। “হাসিব আমার বড়বোনের ছেলে ছিলো, ঐ বোনই আমাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে। আর তুই তাকে…” অসমাপ্ত রাখলো কথাটা।
সুস্মিতার কপালে ভাঁজ পড়লো আবার।
“আমি জানতে চাই, ওকে খুন করলি কেন?”
মাথা দোলালো সুস্মিতা। ভঙ্গুর কণ্ঠে জোর দিয়ে বললো সে, “আমি মুশকান না!”
পিএস আর সুস্মিতার দৃষ্টি আঁটকে রইলো কয়েক মুহূর্ত পর্যন্ত। অবশেষে চোখটা সরিয়ে নিলো বন্দী, কিছুই বললো না। চোখ বন্ধ করে রাখলো কয়েক মুহূর্ত। যেনো নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না।
“ওকে,” মাথা নেড়ে সায় দিলো আশেক মাহমুদ। “সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না মনে হচ্ছে।”
সুস্মিতা কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
“আসলাম?” বেশ জোরেই ডাকলো। সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকলো পুলিশের সাবেক এসআই। “আঙুল বাঁকা করতে হবে।”
মুচকি হাসি দিলো ষণ্ডাটা। ঘরের এককোণে গিয়ে একটা কাগজের ব্যাগের ভেতর থেকে পলিথিনের ব্যাগ আর চওড়া স্কচটেপ বের করে নিয়ে এলো। জিনিসগুলোর দিকে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলো বন্দী।
আশেক মাহমুদ ঘর থেকে চলে যাবার আগে সুস্মিতার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আক্ষেপে মাথা দোলালো।
পিএস ঘর থেকে চলে যেতেই আসলাম এসে দাঁড়ালো সুস্মিতার ঠিক পেছনে। মেয়েটা আসন্ন বিপদ টের পেয়ে ছটফট করতে শুরু করে দিলো। সে পেছনে ফিরে তাকানোর আগেই আসলাম মেয়েটার মাথা গলিয়ে পলিথিনের ব্যাগটা ঢুকিয়ে দিলো, তারপর গলার কাছে পলিথিন ব্যাগের মুখটা চেপে ধরে চারদিক স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে রোল থেকে এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেললো সেটা।
উদভ্রান্তের মতো মাথা ঝাঁকাতে শুরু করে দিলো সুস্মিতা, বুঝে গেছে কী হতে যাচ্ছে তার সাথে। সামনে এসে আগ্রহভরে চেয়ে রইলো আসলাম।
এখন পলিথিন ব্যাগের ভেতরে সুস্মিতার মাথাটা, সে চিৎকার দিলেও ভোঁতা গোঙানি ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। কয়েক মুহূর্ত পরই সে হাসফাঁস করতে শুরু করে দিলো অক্সিজেনের অভাবে। দম নেবার চেষ্টা করতেই পলিথিনের ব্যাগটা লেপ্টে যেতে শুরু করলো তার মুখে। মুখ হা করে অক্সিজেন নেবার চেষ্টা করেও কিছুই পাচ্ছে না। তার চোখ দুটো বিস্ফারিত হবার উপক্রম হলো।
