গুলশান ২ নাম্বারের নির্জন এক রোডে গাড়িটা ঢুকে পড়লেও পেছনের সিটের যাত্রিদের কারো চোখে সেটা ধরা পড়েনি। মেয়েটা তখনও ফোন নিয়ে ব্যস্ত, আর ছেলেটা সম্ভবত এই এলাকাটা চেনে না। তার হাবভাব দেখে তা-ই মনে হয়েছে।
দূর থেকেই আসলাম দেখতে পায় এই বাড়ির খোলা মেইনগেটটা। গাড়ি নিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়তেই ব্রেক কষে সে। মেয়েটা বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত হতবাক হয়ে থাকলেও যেই না মুখ খুলতে যাবে অমনি আসলাম পেছন ফিরে তার পিস্তলটা তা করে। কিন্তু তাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে কানফাঁটা চিৎকার দেয় মেয়েটি, অবশ্য তার সেই চিত্তার ঢাকা পড়ে যায় মেইনগেটটা টেনে বন্ধ করার ঘরঘর শব্দে আর আসলামের হুমকির কারণে।
এমন সময় ফোনের রিংয়ের শব্দ হতেই তার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো পিএস কল দিয়েছে।
“স্লামালেকুম, স্যার।”
“কি অবস্থা?”
“কাজ হয়ে গেছে, স্যার।”
“দ্যাটস গ্রেট।” প্রশংসার সুরে বললো আশেক মাহমুদ। “তোমার জন্য বড়সর পুরস্কার অপেক্ষা করছে।”
গানম্যান কিছুই বললো না। পুরস্কার বলতে টাকা-পয়সা বোঝাচ্ছে নিশ্চয়। কিন্তু কাজ শেষে যদি এই মেয়েটাকেই দিয়ে দেয় তার বস্, তাহলে বরং সে বেশি খুশি হবে! ইদানিং তার আবার খুব ধর্ষণ করতে ইচ্ছে করে-সহজলভ্য মেয়েগুলো আর তাকে আকর্ষণ করে না!
“শোনো,” পিএস বললো। “শেষ মুহূর্তে পিএম একটা কাজ দিয়েছেন,..আটকে গেছি। আমার একটু দেরি হবে আসতে।”
“সমস্যা নেই, স্যার। আপনি কাজ সেরে আসুন।” মুচকি হাসি তার ঠোঁটে। বাড়তি কিছুটা সময় হাতে পেয়ে খুশি। তার বস্ এমনিতেও সন্ধ্যার পর আসতো, এখন মনে হচ্ছে আরো ঘণ্টাখানেক দেরি হবে।
পিএস কলটা কেটে না দিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ মেরে রইলো। “এই মেয়েটা খুবই ডেঞ্জারাস, বুঝতে পেরেছো?”
“জি, স্যার।” কিন্তু আসলাম আসলে বুঝতে পারছে না। মেয়েটাকে দেখে মোটেও সেরকম কিছু মনে হচ্ছে না তার।
“অনেকগুলো মানুষ খুন করেছে ও। একটু সাবধানে থাকবে।” কথাটা শুনে খুবই অবাক হলো গানম্যান, কিন্তু নিজে থেকে প্রশ্ন করলো। “ঠিক আছে স্যার।”
ফোনের ওপাশে পিএস যে দ্বিধার মধ্যে আছে সেটা বুঝতে পেলো।
“একেই আমরা খুঁজছিলাম!” আস্তে করে বললো আশেক মাহমুদ।
আসলাম যারপরনাই অবাক হলো। এই মেয়েটাই মুশকান জুবেরি? কিন্তু ঐ ডাইনির ছবি সে দেখেছে, সেই ছবির সাথে কোনোভাবেই এই মেয়ের চেহারার মিল নেই!
“প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা পাল্টে ফেলেছে। দেখা হলে সব বলবো…লম্বা ঘটনা।” পিএস আর কিছু না বলে কলটা কেটে দিলো।
পকেটে ফোন রেখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো আসলাম। ভুরু কুঁচকে তাকালো বন্দীর দিকে। দেখে মনেই হচ্ছে না, এই হালকা-পলকা মেয়েটি খুনখারাবি করতে পারে, তা-ও আবার অনেকগুলো! তার বস্ হন্যে হয়ে যাকে খুঁজছে, এই হালকাপলকা মেয়েটাই মুশকান জুবেরি!
যতোটুকু তার কানে গেছে, তাতে করে ভিরমি খেয়েছে সে-মহিলা নাকি মানুষের শরীরের বিশেষ একটি অঙ্গ খেয়ে নিজেকে চিরযৌবনা করে রেখেছে।
মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বন্দীর দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে গেলে আসলাম। মেয়েটার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। ফতুয়ার প্রশ্বস্ত গলা দিয়ে মসৃণ পিঠের অনেকটাই দেখা যাচ্ছে। হালকা ঘামে ভিজে আছে ফর্সা ত্বক। ঝুটি করে বাধা চুলের কারণে পিঠটা উন্মুক্ত। আসলাম আস্তে করে তার মুখটা নামিয়ে চুলের ঘ্রাণ নিলো।
মেয়েটা চমকে উঠলো একটু। সে বুঝতে পারছে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে সে, কিন্তু মুখ বেঁধে রাখার কারণে কিছুই বলতে পারছে না। আবারো ঘ্রাণটা নিলো স্ত্রীহত্যার দায়ে চাকরিচ্যুত সাবেক এসআই মাহবুব আসলাম। বন্দীর ঝুটি করা চুলের কাছে নাক নিলো সে। মেয়েটা বুঝতে পেরে মাথা সামান্য সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করতেই বামহাত দিয়ে তার থুতনীটা ধরে নিজের নাকের খুব কাছে নিয়ে এলো। বেয়াড়া মেয়েমানুষ তাকে অন্যরকম আনন্দ দেয়! আর এই মেয়েটা মুশকান জুবেরি জানার পর তার মধ্যে অন্য রকম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে!
চাপা গোঙানি দিলো মেয়েটি। সম্ভবত গালাগালি করছে। মাথাটা সরানোর অনেক চেষ্টা করলেও আসলামের শক্ত হাতের সাথে পেরে উঠছে না। বুকভরে চুলের গন্ধটা নিলো সে। সুগন্ধীটা বেশ ভালো কিন্তু মনীষার মতো নয়। ঐ মেয়ে কী সব ভেষজ সুগন্ধী মাখতো চুলে, মুখে, শরীরে। পাহাড়ে ওসব জিনিস পাওয়া যায়।
বন্দীকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আস্তে করে মেয়েটার চোখ আর মুখের বাধন খুলে দিলো সে।
“ইউ পারভার্ট!” রেগেমেগে বললো সুস্মিতা। দম ফুরিয়ে হাপাচ্ছে। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে আসলামের দিকে। “আমার ধারেকাছেও আসবি না! আই উইল কিল ইউ!” চিৎকার করেই বললো কথাটা।
কিন্তু আসলাম তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্বিকার চেয়ে রইলো। পারভার্ট সে ছিলো না কখনও, যদি না সোমাকে হত্যা করার মতো ভুল সিদ্ধান্তটা নিতো। যদি না, এসব ঘটনা জানাজানি হতো। যদি না, সব জানাজানি হবার পর মনীষা তাকে ছেড়ে চলে যেতো!
মুচকি হাসলো গানম্যান। “তোর আর আমার মধ্যে একটা মিল আছে। কিন্তু!”
কথাটা শুনে বন্দীর কপালে ভাঁজ পড়লো।
“আমরা দুজনেই মানুষ খুন করেছি!”
বিস্ময়ে চেয়ে রইলো সুস্মিতা। এ কথা এই স্কাউন্ট্রেলটা জানলে কী করে! মনে মনে বলে উঠলো সে।
৭০. রাগে চোয়াল শক্ত
অধ্যায় ৭০
