মেয়েটার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না সে। তার দেহসৌষ্ঠব যেকোনো পুরুষের কাছেই লোভনীয়। আর সেটা তাদেরকে পতঙ্গ বানিয়ে কাছে টেনে পুড়িয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে। একেবারে হালকা-পাতলা গড়ন-গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের মতো যা-পাও-তাই-খাও’টাইপের নয়, বেশ সচেতন। কথাবার্তাও বেশ মার্জিত, অন্তত যতোটুকু আসলাম শুনেছে। প্রবল একটা ব্যক্তিত্ব আছে। দেখে মনে হচ্ছে, বয়স ত্রিশের নীচেই হবে। মেয়েটার মসৃণ গ্রীবা থেকে সুডৌল বুকের দিকে তার চোখ আটকে আছে। পরনে ঘিয়েরঙা ফতুয়া আর কালো জিন্স প্যান্ট। চুলগুলো সামনে থেকে টেনে ঝুটি করে বাধা। ঘরে ফ্যান নেই বলে শরীরটা ঘেমে আছে, গায়ের সাথে লেপ্টে আছে ফতুয়াটি।
মনীষা দেওয়ানের কথা মনে পড়ে গেলো। ওর-ও এমন মসৃণ গ্রীবা আর সুডৌল বুক ছিলো। আরো ছিলো…।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার ভেতর থেকে। মেয়েটাকে হারানোর পর সারা দিনে কতো বার যে ওর কথা মনে পড়ে ইয়ত্তা নেই।
মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে বন্দীর দিকে তাকালো। তার ইচ্ছে করছে একটা তোয়ালে দিয়ে মেয়েটার মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীর মুছে দিতে।
নিজের ভেতরে জান্তব পশুটা জেগে ওঠা টের পেতেই ওটাকে দমন করার জন্য পকেট থেকে ফোন বের করে পুরনো মেসেজগুলো পড়তে লাগলো। পিএস এসে পড়বে আরেকটু পরই। তার বস্ কল্পনাও করতে পারেনি এতো সহজে মেয়েটাকে তুলে আনতে পারবে সে।
ডাক্তার আসকারের বাড়ির মেইন গেট থেকে একটু দূরে কালো রঙের গাড়িটা নিয়ে নজর রাখছিলো সে। এমন সময় তার বস্ ফোন করে বলে, তাদের প্ল্যানে একটু পরিবর্তন করা হয়েছে। আগের প্ল্যানটা ছিলো অনেকটা এরকম-নুরে ছফা যদি কলকাতা থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে তাহলে ডাক্তারের ঘনিষ্ঠ এই তরুণীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, ভদ্রলোককে বাধ্য করা হবে মুশকান জুবেরির খোঁজ দিতে। কিন্তু একটু আগে তার বস্ তাকে বলে, আসলাম যেনো সময় নষ্ট না করে দ্রুত এই মেয়েটাকে তুলে নিয়ে আসে এখানে।
কথাটা শুনে একটু অবাকই হয়েছিলো সে। ছফা কি তাহলে মুশকানের হদিস বের করতে পারেনি? কিন্তু গতকাল তার সাথে যখন কথা হলো, তখন তো ডিবি অফিসার বলেছিলো তার কাজ বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে। অবশ্য পিএসকে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি আসলাম।
যাই হোক, পিএস আশেক মাহমুদই তাকে জানিয়েছিলো মেয়েটা কখন বাড়ি থেকে বের হতে পারে। বসের ক্ষমতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ তার নেই, তারপরও কোত্থেকে কিভাবে এরকম মূল্যবান খবর জোগাড় করেছে সেটা ভেবে একটু অবাকই হয়েছিলো। যাই হোক, মেয়েটার গন্তব্য যেহেতু এয়ারপোর্ট, সে নিশ্চয় উবারই ব্যবহার করবে। হাসপাতাল থেকেও উবারে করেই এসেছে এখোন।
উবার ব্যবহার করবে!
পিএস তাকে পর্যাপ্ত লোকবলও দিতে চেয়েছিলো, কিন্তু তার মাথায় চট করেই একটা বুদ্ধি চলে আসে।
বাড়িতে ঢুকে হৈহল্লা করার কোনো দরকার নেই। অনেক সহজেই কাজটা করা যেতে পারে। আর সেটা করার জন্য সে একাই যথেষ্ট।
ডাক্তারের বাড়ির সামনে একটা প্রাইভেট কার থামতেই নড়েচড়ে ওঠে আসলাম। দূর থেকেই দেখে ড্রাইভার ফোনের ডিসপ্লের দিকে তাকিয়ে কী যেনো দেখছে। উবার! বুঝে যায় সে। সঙ্গে সঙ্গে ড্যাশবোর্ড থেকে সানক্যাপটা নিয়ে মাথায় চাপিয়ে নেয়। নজরদারি করার সুবিধার্থে গাড়িতে রেখেছিলো ওটা। এরপর নিজের গাড়িটা নিয়ে দ্রুত চলে আসে উবারের ঠিক সামনে, একেবারে পথরোধ করে। ড্রাইভার হতবাক হয়ে জানালার কাঁচ নামিয়ে মাথা বের করে কিছু বললেও আসলাম সেটা আমলে নেয়নি। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ না করেই হ্যান্ড ব্রেকটা টেনে দরজা খুলে বের হয়ে আসে। সে। বিস্মিত ড্রাইভার কিছু বলার আগেই একহাতে পকেট থেকে তার পুরনো আইডি কার্ডটা বের করে দেখায়, অন্য হাতে কোমর থেকে বের করে আনে পিস্তলটা, নিজেকে পুলিশের অ্যান্টি টেরররিস্ট স্কোয়াডের সদস্য পরিচয় দিয়ে ড্রাইভারের কাছ থেকে জেনে নেয়, গাড়িটা উবারের কিনা। নিশ্চিত হবার পর, ড্রাইভারকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, এই বাড়িটা তার স্কোয়াড কর্ডন করে রেখেছে সকাল থেকে। এখানে এক মহিলা জঙ্গি আছে, সে যেনো এক্ষুণি তার গাড়িটা নিয়ে চলে যায়। ঐ মহিলা কাস্টমার তাকে ফোন দিলে সে যেনো বলে, বাড়ির সামনে চলে এসেছে। ঠিক আছে? মাথা নেড়ে সায় দেয় বেচারা ড্রাইভার, তারপর এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করেনি, গাড়িটা ব্যাক গিয়ারে নিয়েই সোজা বাম দিকে টার্ন নিয়ে চলে যায়।
এরপর আসলাম তার গাড়িতে উঠে ঝটপট একটু পিছিয়ে নিয়ে মেইনগেটের সামনে এনে রাখে। মাথার ক্যাপটা আরো নীচু করে দেয় দারোয়ান যাতে তাকে দেখলেও চিনতে না পারে। কয়েক মিনিট পরই বাড়ির গেটটা খুলে যায়, সেখান থেকে বের হয়ে আসে ঐ তরুণী, তার সঙ্গে সেদিনের ছেলেটাও।
বনানীর অভিজাত অ্যাভিনু থেকে বের হবার সময় রিয়ার মিরর দিয়ে দেখে, পেছন সিটে বসে থাকা মেয়েটি কোনো কথাই বলছে না, মোবাইলফোন নিয়ে ব্যস্ত সে। তার সঙ্গি ছেলেটা গোবেচারার মতো বসে আছে। গাড়িটা কোন্ দিকে যাচ্ছে সে খেয়াল ছিলো না তাদের কারোরই। এরপর আস্তে করে বামহাতে ফোনটা নিয়ে এই বাড়িতে থাকা বদরুলের নাম্বারে মিস কল দেয় গেটটা খুলে রাখার সংকেত হিসেবে।
