অবশেষে প্রথমটাই বেছে নিলেন। রিং হতেই কর্কশ কণ্ঠের এক লোকের কণ্ঠ শুনেই কলটা কেটে দিলেন। এবার শেষ দুটো ডিজিটে ৮৪ যোগ করে কল করলেন। কিন্তু রিং হতে থাকলেও কেউ ধরলো না কলটা। আবারো ডায়াল করলেন তিনি।
ফোনটা ধরো…প্লিজ!
.
অধ্যায় ৬৮
তার কোনো ধারনাই নেই কোথায় নিয়ে আসা হয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, কে বা কারা তাকে এভাবে অপহরণ করেছে সে সম্পর্কেও বিন্দুমাত্র ধারনা করতে পারছে না। তার নার্ভ বেশ শক্ত, সহজে ভেঙে পড়ার মতো নয়। কিন্তু আকস্মিক এই ঘটনায় সাময়িক নার্ভাস ব্রেক ডাউনের শিকার হয়েছিলো।
একটা ঘরে হাত-পা-মুখ আর চোখ বেঁধে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কোনো রকম নড়াচড়া করলে তার ভালো হবে না বলেও শাসিয়ে দেয়া হয়েছে।
নিজেকে ধাতস্থ করে নেবার জন্য কিছুটা সময় পেতেই প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিতে পেরেছে সে কিন্তু তার দুশ্চিন্তা হচ্ছে শ্যামলকে নিয়ে। ছেলেটাকে কোথায় রেখেছে সে জানে না। এই বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে উবার ড্রাইভার ছাড়াও আরো দু-জনকে দেখেছে। তারপরই পিস্তলের মুখে তার হাত-মুখ আর চোখ বেঁধে ফেলা হয়। সে বার বার জানতে চেয়েছে, তারা কারা, কেন তাদের সাথে এরকম করা হচ্ছে-কিন্তু উবারের ড্রাইভার আর বাকি লোকগুলো কিছুই বলেনি। তবে এটা বুঝতে পারছে, ঐ। ড্রাইভারই এই অপহরণ দলের নেতা।
শ্যামলের হাত-মুখ-চোখ বাধার সময় বেশ কান্নাকাটি করেছিলো ভয় পেয়ে। তাকে সজোরে এক থাপ্পড় মেরে চুপ করিয়ে দেয় এক ষণ্ডা।
আমি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের খপ্পরে পড়েছি! মনে মনে বললো সে। নাকি এরা অন্য কেউ? কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলো না। সবটাই তার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকছে।
এরা পুলিশ নয়। ভালো করেই বুঝতে পারছে। পুলিশ হলে তাকে থানায় নিয়ে যেতো। কিংবা ওরকম কোথাও। কিন্তু এ জায়গাটা একেবারেই বিরাণ। চোখ বাধার আগে যতোটুকু দেখেছে, একটা পরিত্যক্ত বাড়ি বলেই মনে হয়েছে তার কাছে।
তহলে এরা কারা?!
এ প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই, তাই এসব চিন্তা বাদ দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। গভীর করে নিশ্বাস নিলো বার কয়েক। নিজেকে আরেকটু ধাতস্থ করা দরকার।
সে আছে এই বাড়ির দোতলায়। শ্যামলকে কোথায় নিয়ে গেছে জানে না। সিঁড়ি দিয়ে প্রায় টেনে নিয়ে এসেছে তাকে। বার কয়েক সে জোরাজুরি করেছিলো, কিন্তু ঐ ড্রাইভার পেছন থেকে তার চুলের মুঠি ধরে কানের কাছে মুখ এনে বলেছে, তার কথা না শুনলে, বাড়াবাড়ি করলে অকল্পনীয় শাস্তি দেয়া হবে।
এরপর আর কিছু করেনি সে। লোকটার হুমকি তার কাছে নিছক কথার কথা বলে মনে হয়নি। যে লোক উবারের ড্রাইভার সেজে, পিস্তলের মুখে দু দু-জন মানুষকে দিনে-দুপুরে অপহরণ করতে পারে, তার কোনো হুমকিকে হালকাভাবে দেখার উপায় নেই।
চোখ বাঁধার আগে সে আরো অবাক হয়েছে, ড্রাইভারের চেহারা দেখে। তার যতোটুকু মনে পড়ে, উবারে রিকোয়েস্ট দেবার পর উবার অ্যাপসে ড্রাইভারের যে ছবি দেখেছিলো, এই লোক সেই লোক নয়-এ ব্যাপারে সে পুরোপুরি নিশ্চিত। ছবির ড্রাইভার ছিলো হ্যাংলা পাতলা এক তরুণ। পুরু গোঁফ, মাথার চুল কোকড়ানো, চোখদুটো সামান্য ট্যারা। এ কারণে অ্যাপসে লোকটার ছবি অল্প কিছুক্ষণ দেখলেও তার মনে আছে। কিন্তু যে ড্রাইভার তাকে অপহরণ করেছে, সে বেশ পেটানো শরীরের, ক্লিনশেভড, ছোটোছোটো করে ছাটা চুল। লোকটার চোখমুখ দেখলেই মনে হয় ষণ্ডা প্রকৃতির।
কি কারণে আমাকে অপহরণ করেছে এরা? মনে মনে আবারো প্রশ্নটা আওড়ালো। টাকা? তার কাছে অবশ্য মনে হচ্ছে না। এরা তাকে টার্গেটই বা করলো কিভাবে? জানলোই বা কিভাবে সে ঢাকায় আছে? আর সে যে উবারে কল দিয়েছিলো সেই খবরই বা পেলো কোত্থেকে?–এসবের কোনো উত্তরই পেলো না।
হঠাৎ টের পেলো ঘরে কেউ ঢুকেছে। গভীর করে নিশ্বাস নিলো সে। ঘরে যে উবারের ড্রাইভার ঢুকেছে সেটা বুঝতে পারলো। লোকটার শরীরের গন্ধ তার মুখস্ত হয়ে গেছে এরইমধ্যে!
একটুও চমকালো না। নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করার কোনো ইচ্ছে তার নেই। যা কিছু মোকাবেলা করতে হবে, শক্ত থেকেই করবে।
.
অধ্যায় ৬৯
আসলাম ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালিয়ে বন্দী মেয়েটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আশ্চর্যের ব্যাপার, মেয়েটা স্থির হয়ে বসে আছে, একটুও চমকায়নি। খুবই স্বাভাবিক হতো, যদি চমকে উঠতো। বোঝাই যাচ্ছে এই মেয়ের নার্ভ বেশ শক্ত। আসলাম এরইমধ্যে সেটা টেরও পেয়েছে।
একটা পুরনো ডাবল সোফা আর কাঠের চেয়ার ছাড়া ঘরটা প্রায় খালি। এই বাড়িটা ক-দিন পরই ভেঙে ফেলা হবে, এখানে গড়ে উঠবে দশ তলার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। যে রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এটা ডেভেলপ করবে সেটা পিএস আশেক মাহমুদের নিজেরই। যদিও কাগজে-কলমে চারজন পার্টনার আছে কিন্তু আসল পুঁজি আসে আসলামের বসের কাছ থেকে। এরকম আরো অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই পিএসের বিনিয়োগ রয়েছে।
ঘরের এককোণে থাকা সোফাতে গিয়ে বসলো আসলাম। টর্চার করার কিছু সাধারণ ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে এসেছে সে-একটা কাটার প্লাঞ্জার, পলিথিনের কিছু ব্যাগ আর স্কচ টেপ-এসবই যথেষ্ট। যদি টর্চার করার আদৌ কোনো দরকার পড়ে তো! আসলামের অবশ্য ইচ্ছে নেই, এই মেয়েকে এসব জিনিস দিয়ে টর্চার করার। তার চেয়ে বরং মেয়েদের কাছে যেটা সবচে বিভীষিকাময়, সেই ‘অস্ত্রটা প্রয়োগ করতে পারলেই সে বেশি খুশি হবে। আর বলাই বাহুল্য, সেটা কাজেও দেবে বেশ!
